শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

আবদুল মান্নান সৈয়দের ছোটগল্পে ফ্রয়েডীয় মন

শাদমান শাহিদ

ষাট দশকে যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ছোট গল্পের শরীরে নতুন হাওয়া লেগে ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০০৯)। সাহিত্যের সুডৌল দেহে তাঁর হাতের স্পর্শ লাগা মানে নতুন কিছু প্রত্যক্ষ করা। একজন সফল সব্যসাচী লেখক হিসেবে সাহিত্যের অঙ্গনে ঈর্ষণীয় খ্যাতি অর্জন করেছেন। কি কবিতা- কি কথাসাহিত্য-কি প্রবন্ধ সবখানেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছেন। নতুন কিছু দেখলে প্রথমে অচেনা লাগবে এটাই স্বাভাবিক। অতীতেও এমন অনেক হয়েছে। শেষে চশমার গ্লাস পরিষ্কার করে সমালোচকরা লজ্জিত হয়েছে। মান্নান সৈয়দের বেলায়ও এমন একটা আবহাওয়া লেগে ছিল- বুঝি না। ‘মান্নান বুঝি না’। অথচ এখন অনেকের কাছেই মান্নান সৈয়দ অনুসরণীয়।

তাঁর প্রথম ছোটগল্পের বই ‘সত্যের মতো বদমাশ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। এবং অশ্লীলতার ধোঁয়া তুলে তৎকালীন সরকার সেটা বাজেয়াপ্ত করে দেয়। পরবর্তীতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে সেটা পুনরায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রতিটি গল্পেরই ভাব, ভাষা এবং আঙ্গিক সম্পূর্ণ নতুন। তিনি কাব্যের মতো গল্পের কোমল দেহেও ফ্রয়েডীয় এবং পরাবাস্তববাদের মসলা ঢেলেছেন। এটা তাঁর ব্যাপক গবেষণা কর্মের প্রভাব। তিনি মানিক আর জীবনানন্দের উপর ব্যাপক কাজ করেছেন। সেটাই তাঁর সাহিত্যের অন্তর নির্মাণে সামান্য রং লেগেছে। বিংশ শতাব্দির ঠিক শুরুতেই অর্থাৎ ১৯০০ সালের দিকে অস্ট্রীয় মনঃরোগবিশারদ সিগমন্ড ফ্রয়েড(Sigmund Freud, ১৮৫৮-১৯৩৯) মনঃসমীক্ষণ মতবাদ প্রবর্তন করলে সারা বিশ্ব জুড়ে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই এ মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তিনি মানব চরিত্রের একজন নিখুঁত বিশ্লেষক। ফ্রয়েডের মতে ব্যক্তিত্ব কাঠামোতে তিনটি উপাদান কাজ করে। অদস্‌ বা ইদ(Id), অহম বা ইগো(Ego) এবং অতি অহম বা সুপার ইগো (Super ego)। অদস্‌, অহম এবং অতি অহম কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। ব্যক্তিত্বের সাথে এগুলো নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে উপযোজনে এগুলো সম্মিলিত ভাবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। অহমকে বলা হয় ব্যক্তিত্বের নির্বাহী সত্ত্বা (Executive self )। অদস চায় জৈবিক তাড়নার চরিতার্থ। অতি অহম চায় জৈবিক তাড়নাকে একেবারে অস্বীকার করে আদর্শ ও উৎকর্ষের দিকে ব্যক্তিকে পরিচালিত করতে। অহমের কাজ হচ্ছে বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এনে অদস এবং অতি অহমের দাবির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ব্যক্তিকে সুষ্ঠু ও সফল উপযোজনে সাহায্য করা। এদিক থেকে অহমকে বেশ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হয়। অহম দুর্বল হলে এবং অদস,অতি অহমের যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ব্যক্তিত্বের বিপর্যয় দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। (ড. জহিরুল হক, সমাজ মনোবিজ্ঞান)।

অধ্যাপক মো. নূরনবীর মতে-‘মন শুধু কতকগুলো চেতনা, প্রতীতিবোধ এবং বিবেক ইত্যাদি সম্পন্ন প্রতিক্রিয়ার সমষ্টি নয়। মন চিন্তাশীল আধ্যাত্মিক দ্রব্যও নয়। মন হলো রহস্যময় সমুদ্রতলদেশের ন্যায়। মনে রহস্য উদঘাটন করতে হলে আমাদেরকে যেতে হবে আরো ভেতরে অর্থাৎ মনের অচেতন ও অজ্ঞানভাগের গভীরে। চেতনের চেয়ে অচেতন বেশি গভীর এবং বিস্তৃত। বিবেকের চেয়ে আবেগ বেশি অর্থপূর্ণ। স্বপ্ন এবং দিবাস্বপ্ন বা অলীক কল্পনা প্রাচীন মনোবিদ্যায় তত প্রয়োজনীয় বলে পরিগণিত হয়নি। কিন্তু ফ্রয়েডিয়ান মনোবিদ্যায় এগুলো বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কেননা তাদের মতে, এগুলোই আমাদের মনের গভীরে উৎসের উদঘাটন করে। ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, আবেগ, কামনা, বাসনা, লালসা, কামরিপু প্রভৃতি মনের স্বরূপকে বেশি জ্ঞাত করে। অবশ্য তাঁরা মনে বুদ্ধিক্রিয়াকে অস্বীকার করেন নি। বিবেক পাহারাদারের মত টহল দিতে থাকে বলে আমরা অশোভন কার্য এবং অন্যায় প্রবৃত্তি থেকে অনেকটা বিরত থাকি। ফলে বাইরে বাইরে আমরা ভদ্র মার্জিত। আসলে আমরা কুৎসিত এবং স্বার্থপর। বিবেকের শাসনে আমরা জোর করে ভদ্র হয়ে ওঠি। ফলে আমরা আমাদের অনেক কামনা, বাসনা, ইচ্ছাকে দমন করি, মনের গভীরে ঠেলে দিই। সেখানে সেগুলো সৃষ্টি করে নানা অশান্তি। ফলে আমরা ভুগি সাইকোসিস, নিউরোসিস, হিসটেরিয়া এবং আরো অনেক অশান্তিকর মানসিক রোগে।'(অধ্যাপক মো. নূরনবী: দর্শনের সমস্যাবলী)

আমি আগেই বলেছি ফ্রয়েডের এ ধরনের মনঃসমীক্ষণ মতবাদে অনেকই আকৃষ্ট হয়ে তাদের লেখায় এ নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন। মান্নান তাঁদেরই একজন কৌতূহলী উত্তরসূরী। তাঁর মাতৃহননের নান্দীপাঠ, চাবি, রাস্তা, গল্প ১০৬৪, জলপুরি, মাছ, অমরতার জন্যে মৃত্যু, অস্তিত্ব অন্যত্র, আম্রকাননে, রাজা, আব্দুল হাফিজ: জীবন ও সাহিত্য, হোসেন মিয়ার সঙ্গে, জীবনানন্দের একটি অপ্রকাশিত গল্প, নারী হৃদয় প্রেম গৃহ অর্থ কীর্তি সচ্ছলতা,বিদ্যা-সুন্দর কাহিনী, যাত্রা, চমৎকার অবচেতন, গতবৃষ্টি, সাপ, একরাত্রি, এক অমানুষের গল্প, ভয় ইত্যাদি গল্পে কোথাও না কোথাও হয় মানিক, নয় জীবনানন্দ। একজন না একজন আছেই। ‘মাতৃহননের নান্দীপাঠ’ গল্পে দর্শনের ছাত্র যুবক আতিকুল্লাহর ৪৫ বছর বয়স্কা বিধবা মা পরিণত এক ভদ্র লোকের প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ে। লোকটি প্রতিদিনই গোপনে তার সঙ্গে দেখা করে, সিগারেট খায়, আলাপ করে, সময় কাটায়। যা সমাজের চোখে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। মা সমাজের চোখে ফাঁকি দিলেও ঘরের ছেলেকে ফাঁকি দিতে পারে না। যে কোনো সময় ধরা পড়ে যেতে পারে, এ ভয়ে সব সময় ছেলেকে চোখে চোখে রাখে, তার গতি বিধি লক্ষ রাখে। যা আতিকুল্লাহর কাছে বিষের মতো লাগে। সে জানায়- যেখানেই আমি যাই দু’টি নির্নিমেষ চোখ পিছনে ছুটছে, পিছলে পড়ছে না একবারো, সরে যাচ্ছে না, এমনকি পলক ফেলছে না কখনো, যেন মানুষের চোখ নয়। মানুষের অবশ্য, তবু মানবীয় নয়। দানবীয় এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে সে … আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে মৃত্যুর অভিমুখে, কবর পর্যন্ত আমাকে পৌঁছিয়ে না দিয়ে শান্তি নেই তার।…’ সেটাকে সে মায়ের ভালোবাসা মনে করে। এবং এ অসম্ভব ভালোবাসায় অতিষ্ট হয়ে এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করতে প্রবৃত্ত হয় তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ায় যুক্তিবাদ। কী অপরাধে সে মাকে হত্যা করতে চায় ? এবং কাজের জন্য উপযুক্ত কারণও খুঁজে পায় সে। ৪৫ বছর বয়স্কা মায়ের ঘরে একজন অপিরিচিত লোককে দেখতে পায়। তার উপস্থিতিতে মাও বেশ বিব্রত বোধ করে। এতে তার চরম সন্দেহ হয়। মায়ের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়। কারণ হিসেবে এটাই যথেষ্ট। তারপরও যুক্তি আছে। মায়ের পদস্খলনের পিছনে আরো কারণ থাকতে পারে, দর্শনের ছাত্র হিশেবে যুক্তির পিঠে পাল্টা যুক্তি সেট করে সিদ্ধান্তে আসতে হবে তাকে। এজন্য সে নিজের সামনে নিজেকে হাজির করে এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীর মতো একের পর এক জেরা করতে থাকে। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে ফ্রয়েডকে। নিজেকে বোঝায়- ‘তুমি ফ্রয়েড পাঠ করেছো, অতএব তোমার বোঝা উচিত কেন তোমার মা এই বয়সে দ্বিধায় পড়েছেন।’
‘চাবি’ গল্পে তরুণ অধ্যাপক ভ্রমণ থেকে বাসায় ফিরে এসে পকেটে হাত দিয়ে দেখে চাবি নেই। চাবি নেই এবং কোথাও নেই। বাসার অন্যান্য ফ্ল্যাটের ভাড়াটেদের জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে পদে পদে বিব্রত হয়। এক পর্যায়ে তেতলার সবচেয়ে কোণার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখে কয়েকটি মেয়ে। তারা দেহ ব্যবসা করে। ওরা জানতে চায় তার কাছে টাকা আছে কি না। বেশি টাকা লাগবে না। তিনি ক্লান্ত ছিলেন বলে আগ্রহ দেখাননি। এক পর্যায়ে তিনি চলে আসেন। আসার সময় শুনেন, একটি মেয়ে বলছে- ‘উনি তো চাবি খুঁজতে এসেছিলেন, যান, আপনার যখন চাবি নেই, তখন এখানে থেকে কী করবেন।’ ‘চাবি পেলে আসবেন, এখানে কয়েকটি দরোজা-বন্ধ করা ঘর আছে’। ‘ আমরাও যে চাবি খুঁজছি গো-‘। তিনি মেয়েদের এ কাজটিকে ইতিবাচক ভাবে দেখেছেন। তিনি তাদের যাপিত জীবনের কষ্টের কথা চিন্তা করে ব্যথিত হয়েছেন,’ওরা হাসছিলো, আমি ওদের জন্যে মনে মনে কাঁদছিলাম। ওরা খিল খিল করে হাসছিলো। ‘চাবি খুঁজছি গো মহারাজ!’ আমি মনে মনে হু হু করে কাঁদছিলাম,’ চাবি খুঁজছি গো মহারাজ!’

‘গল্প ১৯৬৪’ গল্পে বন্ধু অমল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় নিরাপত্তার স্বার্থে বোন শোভাকে কবিরের কাছে রেখে সে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যায়। এদিকে কবিরও ছোট বোনের মতো দেখে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এবং প্রতিরাতেই তাঁর মধ্যে অসদ——————— তথা জৈবিক তাড়না নাড়া দিয়ে ওঠে। সুপার ইগো তথা বিবেক তাকে পাহারা দিয়ে রাখে। এভাবে চলতে চলতে একসময় অদসের কাছে বিবেক হেরে গেলে নেমে আসে বিপর্যয়। কবির বলে- ‘সব সমস্ত চলছিলো ঠিক ভাবে। কিন্তু এক রাতে আমার মধ্যে জানোয়ার জেগে উঠেছিলো; আমি কিছুতেই নিজেকে সংযত করতে পারিনি। শোভাও হয়তো ভয় পেয়ে বাধা দেয়নি, চিৎকার করেনি।’

জলপরি’ গল্পে তরুণ অধ্যাপক এক বিয়ের অনুষ্ঠানে শম্পাকে দেখে তার পছন্দ হয়ে যায়। তারপর পরিচয়। ‘পরিচয় থেকে আলাপ। শম্পা আমার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগলো। আমি তার চোখের ভেতরে পালাতে চাইলাম- যে চোখ ধরে ফেলেছে আমাকে। আমার ভালো লাগতে লাগলো। ধরা পড়েও আমি খুশি হলাম। যে ধরে সে শুধু ধরেই না, সে-ও খানিকটা ধরা দেয় এই সত্য আমি জানলাম। তাদের এ প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় না। শম্পার বিয়ে হয়ে যায় অন্যখানে। শম্পাকে হারিয়ে অধ্যাপকের বিপর্যস্ত অবস্থা। তাই একদিন তিনি শম্পার স্বামীর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। শম্পাকে দেখে ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠে অতীত। তিনি বলেন,’ শম্পা ঝকঝকে টিপয় থেকে চা ঢালছিলো। তার ডান কানের দুল বিকেলের তারার মতন জ্বলছিলো। তার মুখে খুশি, চুলে খুশি, পোশাকে খুশি। চার পাশে ফুলের বেড। তাতে একশরকম ফুল ফুটেছিলো। একশ রঙের স্বপ্ন ফুটেছিলো।’
তারপর থেকে তিনি প্রতিদিনই শম্পার বাড়িতে যান। গল্প করেন। তার ভালো লাগে। এ জায়গাটায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। সেখানেও নায়ক ইংরেজি অধ্যাপক স্ত্রী-ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়া পূর্ব প্রেমিকার প্রতি আসক্ত। এ যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী আত্মহত্যা করে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর অধ্যাপক সাহেব তার প্রেমিকার বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াত করেন। এ সবই ফ্রয়েডের তাড়না। যত বড় ব্যক্তিত্ববানই হোক না কেন, একবার তার মধ্যে অদস জেগে ওঠলে তাকে সামাল দেয়া বড় দায়। তরুণ অধ্যাপক দুজনই বিবেকহীন কাজে নেমে গিয়ে অপমানিত হন। শম্পার স্বামী তাকে (অধ্যাপককে) অপমান করে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বের করে দেয়ার পরও তিনি শম্পাকে ভুলতে পারেন না। রাতের আঁধারে শম্পার বাড়ির পেছনে অবস্থিত পুকুর পাড়ে গিয়ে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকেন। অদস শক্তিশালী হলে এভাবেই মানুষকে ব্যক্তিত্বের চরম নিম্নসীমায় নামিয়ে দেয়।

‘হোসেন মিয়ার সঙ্গে’ গল্পে বউবাজারের গলিতে পতিতালয়ের কথা আলোচিত হয়েছে। আগেই বলে রাখি মানিক, হোসেন মিয়া, কুবের মাঝি, কপিলা প্রভৃতি সব চরিত্রই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ পদ্মানদীর মাঝি’র অবলম্বনে রচিত। সে উপন্যাসে সমাজতন্ত্র চাপিয়ে ফ্রয়েডেরই বিজয় ঘোষিত হয়েছে। ‘আমারে নিবা মাঝি লগে’ বিবেকের শত বাধা সত্ত্বেও কাম উত্তেজক শ্যালিকার এ আহ্বান সে অস্বীকার করতে পারে না। উপন্যাসে প্রথম দিকে সমাজতন্ত্রের ঘন প্রভাব প্রকাশিত হলেও কপিলার আগমনে তা ফিকে হয়ে যায়। এ পরের সব টুকুই মান্নান সৈয়দকে আকৃষ্ট করে। যার কারণে বউবাজারের পতিতালয়ে মান্নান সৈয়দ ইচ্ছা করে স্বয়ং মানিককেই শেফালির ঘরে পাঠিয়ে দেয়। মানিক বাবু ঘন ঘন যাতায়াত করে। পুলিশ আসছে খবর শুনেও সে বিচলিত হয় না। বলে-‘কেন ভয় পাবো ? এখানে তো আইনতই বেশ্যাবৃত্তি হয়। বউবাজারের এটা চিহ্নিত রেড লাইট এরিয়া-‘। সেখান থেকে এসে দেখা হয় হোসেন মিয়ার সঙ্গে। তাকে নিয়ে যায় মানিক বাবুর প্রেসে, সেখানে হোসেন মিয়া কুবেরকে পায়। কিন্তু ময়নাদ্বীপ থেকে পালিয়ে এসেছে বলে হোসেন মিয়া কুবেরের উপর রাগ করে না। তার আজন্ম রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে বলে, কেমন আছো, কুবির ভাই?’…… তারপরে বর্ণনায় আসে কপিলার কথা। সংসারের যাপিত জীবনে সে মোটামুটি ক্লান্ত। কামনা ফিকে হয়ে আসছে কিছুটা। লুলা বোন মালারে একবার দেখার জন্য জন্য বড় কাতর। কিন্তু কুবের তারে নিয়ে কেতুপুরে যেতে চায় না। লজ্জা তাকে বেঁধে রাখে। এ গল্পটি সম্পূর্ণই ফ্রয়েড প্রভাবিত।
‘বিদ্যা-সুন্দর কাহিনী’ গল্পে বৃদ্ধ আজিজ আহমদ- তরুণ কবি স্বপ্না সুলতানার প্রেম।’ এখানেও ফ্রয়েড। এখানেও কাম চরিতার্থতার বাণী উচ্চারিত হয়েছে কবিতার মাধ্যমে। প্রেমের কবিতার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আজিজ আহমদ নিজেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ শেষের কবিতা’ উপন্যাসের নায়ক অমিত ভাবতে থাকে। ঘটনাক্রমে স্বপ্নাও লাবণ্য হয়ে উচ্চারণ করে-
‘ বৃষ্টির চাদর মুড়ি দিয়ে সারারাত আজ
ঘুমিয়েছি তর কোলে।
ফোঁটা ফোঁটা
জলের হিরে আদর বুলিয়েছে আমার চোখে,
মুখে, ঠোঁটে ও চিবুকে। অনর্গল করেছি
ঘ্রাণ সেই আদরের নরম নরম স্পর্শে।
প্রতি স্পর্শে শিহরণ, কম্পন, চমক,
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট শরীর ছুঁয়েছে তোর শরীরের ভাঁজ,
ঘ্রাণ আর ম-ম-করা নোনা আস্বাদ।
ভেজা ভেজা উষ্ণতা ছড়িয়েছে
তোর শরীরে ওম। সেই ওমে ঘুমিয়েছি
আমি শঙ্কাহীন
মধুর নিঃসংকোচে।
তৃপ্তির অনুপম মাধুর্যে।’
মান্নান সৈয়দ আপাদমস্তক একজন শক্তিশালী গদ্য লেখক ছিলেন বলেই চরিত্রের অনুভূতির সূক্ষ্ণ কণিকায় নিজেকে ঢুকাতে পেরেছেন। আর সেখানে প্রতি নিয়ত কী চাহিদা দাবি করছে তা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন। এটা হাতে গোণা কয়েকজন বাদে অন্যদের পক্ষে সম্ভব নয়। এভাবে চরিত্র নিয়ে বিশ্লেষণ ধর্মী কাজ করতে গিয়ে অনেকে খেই হারিয়ে ফেলেছেন। এ ক্ষেত্রে মান্নান সৈয়দ সার্থক। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন