সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

শাহনেওয়াজ বিপ্লবের গল্প : রাতের কাহিনীকার

যমুনার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখছিলেন কাহিনীকার নুসরাত রাজা লাহোরি । তামাম দিল্লিতে সবাই তাকে ডাকে বাবা লাহোরি । ওর কাছেই নাকি দুনিয়ার সব কিচ্ছা মজুদ আছে। সাঁঝ নামলে যমুনার এই পাড়ে বসে চলে বাবা লাহোরির গল্প শোনানো। সমঝদাররা বলে যে,সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের যেমন শেষ নেই,একটার শেষ হলে আরেকটার শুরু,তারপর সেটার শেষ তো অন্যটার শুরু,তেমনি ধারা বাবা লাহোরির কিচ্ছার...।শুরু...শেষ,শুরু...শেষ...শুরু।

বাবা অবশ্য মনে করেন গল্প হল জীবন আর মৃত্যুর মত। একটা আছে বলেই অন্যটাও আছে। আগ্রায় বসে জাহাঙ্গীর বাদশাহ একবার ওর গল্প শুনে বলেছিলেন,বাবা এখানেই আপনার গল্প শেষ? ব্যস?

বাবা লাহোরি মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম করে বলেছিলেন,শেষ? নহি জাহাপনা! এই তো শুরু।


গল্পটা ছিল বাংলাদেশের চট্টগ্রামের নবীন যুবক চয়ন আর তার প্রেমিকা কুঞ্জরানির গল্প। দিল্লির হারেমে জমা পরে যাদের নাম হয়েছিল ফৈজু আর দিলারা।

বাদশাহ এরপর জিজ্ঞেস করতে পারতেন,বাবা,ইস্কে বাদ ক্যা? তা না করে তিনি জোর কদমে হেঁটে গেলেন অন্দরমহলে বেগম নুরজাহানের কাছে। আর কপালে হাত দিয়ে বসে বললেন, বেগম কখনও ভেবে দেখেছ,গল্প যদি সত্যি হয়, তো তা কী ভয়ঙ্কর ব্যাপারে দাঁড়াতে পারে ?

নুরজাহান বাদশার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন মেরে মমতাজ,আপনার কেন এমনটা মনে হল হঠাৎ?

জাহাঙ্গীর বললেন, আজ বাবা লাহোরির একটা গল্প শুনে মনটা একদম ভেঙ্গে গেল,বেগমসাহেবান। বাংলার চট্টগ্রামের এক যুবকের গল্প। চাষির ছেলে,বাপ দাদারা কর দিতে পারেন নি,তাই ওকেই পাঠিয়ে দিয়েছিল আমাদের আমির ওমরাহদের দরবারে খোজা হবার জন্যে।

কপালে হাত রেখে ,মাথা ঝুকিয়ে বাদশার কথা শুনছিলেন নুরজাহান। এর মধ্যেই হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিলেন ঠিক তেমনি বেগে বেরিয়ে গেলেন বাইরের মহলের দিকে। ততক্ষণে তিনি মনঃস্থিরও করে ফেলেছেন যে, করের বদলে খোজা করার জন্যে যুবকদের নেয়া বন্ধ করবেন।

বাবা লাহোরির এসব পরিস্কার মনে আছে,বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সেদিনের সে হুকুমের পরও চট্টগ্রাম থেকে নওজোয়ানদের খোজা করার জন্যে আমদানি রদ হয়নি । সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত,জীবন ও মৃত্যু, কাহিনীর শুরু আর শেষের মত বাংলাদেশের এলাকায় এলাকায় গরিবীরও কোনো শেষ নেই। আর যতদিন এই কমবক্ত গরিবী থাকবে ততদিন...

বাবা লাহোরির চিন্তায় ছেদ পড়ল,এক নবীন যুবকের সালামে। বাবা ওর বরফের মত সাদা চুল দাঁড়িতে ঢাকা মুখটা তুলে জিজ্ঞেস করলেন,বেটা,চোখে ভাল দেখতে পাইনে। তুমি কে ?

যুবক এবার নিচু হয়ে বাবার পায়ের ধুলো নিয়ে বলল,বাবা, আমাদের গ্রামে একটা প্রবচন আছে যে, সাধু-সন্তদের কাছে,ঊষালগ্নে আর সূর্যাস্তকালে দয়াভিক্ষা করলে তা বিফল হয় না...

যুবকের কথার মধ্যেই রে রে প্রতিবাদ শুরু করলেন বাবা লাহোরি।বল কী! বল কী! আমি সাধু সন্ত পীর ফকির নই বাপু । আর আমার কাছে ভিক্ষে করার মত কিছু নেই বাপ। আমি নিজেই রাত বিরেতে কিসসা গেয়ে ভিক্ষে করে দিন গুজরান করি । তুমি ছোকরা ভুল লোকের শরণাপন্ন হয়েছ ।


যুবক এবার নদীর পাড়ের মাটিতে বসতে বসতে বলল, বাবা তিন মাস হিল্লি¬ দিল্লি¬ করেছি এই আপনার খোঁজে। কেউ বলে কবেই মারা গেছেন। কেউ বলে শুধু রাতেই আপনার দর্শন মেলে।শেষে হারেমের একজনের কাছে শুনলাম যে, দিনের এই সাঝবেলাতে আপনাকে যমুনার এই পাড়ে কিছুক্ষণ পাওয়া যায়।

ঠিক তখন সূর্য ডুবল । নদীতীর হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। আর কালচে নীল আকাশের গায়ে একটা মাটির ঢিবির মত দেখাল বৃদ্ধ বাবা লাহোরিকে। যুবকের কথায় কী রকম গুম মেরে গেছেন বৃদ্ধ। আর এই পর্ব চলল বেশ কিছুক্ষণ। যুবকের মনে হল, এই নীরবতা হল,ওকে চলে যাওয়ার নির্দেশ । ও ফের বৃদ্ধকে সালাম করে উঠে দাড়িয়ে বলল, বেয়াদবী মাফ করবেন হুজুর,আমি চললাম।

দাঁড়াও- সহসা গম্ভীর সরে নির্দেশ এল বাবা লাহোরির। যুবক থমকে দাড়াতেই ফের বললেন বৃদ্ধ, তুমি কিন্তু বলে গেলেনা কী চাইতে এসেছিল এখানে।

যুবক ফের বসে পড়ল,বাবার পায়ের কাছে। বাবা,আমি রাতের কিসসা গাওয়াইয়া হব। আপনি আমায় তালিম দিন।

গোটা অন্ধকার আকাশটা তার মাথায় টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পরলেও বাবা লাহোরি এতখানি তাজ্জব হতেন না । যা হলেন যুবকের আরজিতে। প্রায় গোঙ্গিয়ে উঠলেন, বলিস কী বেটা । দম থাকতে আর দেমাক থাকতে কেউ কখনও একাজ নেয়। ওরে ,এ তো সারা দুনিয়ার বেদনা আর দুঃখ বুকে আর মাথায় নিয়ে বেড়ানো। তুই এই কাজ নিবি ?

যুবক বল, হ্যা বাবা, আমাদের চট্টগ্রামে এরকম কাহিনীকারদের বলা হয় ঋষি। কারণ তারা মানুষের দুঃখ বেদনার ইতিহাস জানেন। আর আমাদের হিন্দুদের মধ্যে এই সুর করে কাহিনী গাওয়াকে বলে কীর্তন। আমি কীর্তন গাইতে গাইতে বহু পথ পার হয়ে এখানে চলে এসেছি,আপনার কাছে।

আমার কাছে? ফের একবার চমকে উঠলেন বাবা লাহোরি । তুই কি ভাবিস, আমি দেব দেবীর, লীলা –কীর্তন করি। আমি গল্প বলি পৃথিবীর লোকজনের উল্টাপালটা কাজের,দোজখের কেচ্ছাকাণ্ডের, চুরি চাকু নিয়ে হাতাহাতি মারামারির্। ব্যর্থ প্রেম,দুরন্ত শয়তানি,লোভীর জিভের জল আর দুখীর চোখের জল নিয়ে। এসব কাহিনী দিনে কেউই উচ্চারণও করবে না, রাতে শুনবে হাতে শরাব নিয়ে। আর চোখের জল ফেলবে।

যুবক বলল, কিন্তু আমাদের অবতার শঙ্করদেবের তৈরি কীর্তন গাই যখন আমরা ,তখনও তো কাঁদি।

বাবা লাহোরি অন্ধকারে ঢাকা যুবকের মুখ হাতড়ে হাতড়ে নিজের দুই তালুর মধ্যে এনে বললেন, তুমি শঙ্করদেবের কীর্তন গাও? আমায় একটু শোনাবে।

যুবক ওর কোচর থেকে একটা বাশি বের করে তাতে সুর তুলে তারপর গলায় গেয়ে গেল শঙ্করদেবের একটা কীর্তন । যমুনার তীরে অন্ধকারে বসে তাই শুনতে শুনতে তার প্রায় অন্ধ চোখে অশ্রু বর্জন করতে করতে সেই গান শুনলেন বাবা লাহোরি।

যুবক গান থামালে বাবা চোখ মেলে অন্ধকারের মধ্যে যুবকের আবছা মুখটা দেখলেন, জিজ্ঞেস করলেন,তুই কোথাকার মানুষরে ছোকরা ?

--চাটগাঁর

বাবা ফের চোখ মুছলেন। বললেন,তোর গান শুনেই আমি ধরেছি। তো তোর ওই গান ছেড়ে এইসব কাহিনী শোনাবি লোকজনকে।

যুবক বলল , চট্টগ্রামে বড্ড খরা । ফসল কিছু হয় না। ফসলের বদলে আমরা কজন জমা পরেছি হারেমে। খোজার গলায় কীর্তন,এখানে কে শুনবে হুজুর?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বাবা লাহোরি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,তোর নাম?

যুবক বলল,নন্দন। হারেমে ডাকে লক্কা বলে ।

বাবা বললেন, তোর বাপ মা তোকে এই দিল্লির পথে ছেড়ে দিল?

যুবক বলল,তারা কেউ নেই। আমি তাদেরও খোঁজে আছি।

--তাদের মুখ মনে আছে?

--তারা কোথায় জানিস?

--শুধু জানি দিল্লির কোনো হারেমে। কিন্তু তাদের মুখ আমি দেখিনি।

--তাদের নাম?

--চয়ন দেব আর কুঞ্জরানী

তার মানে হারেমের দুনিয়া যাদের চেনে ফৈজু আর দিলারা নামে।

এই নাম দুটো সম্পূর্ণ অজানা নন্দনের কাছে। সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে।



--দুই---

তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে,সন্ধ্যার আলো-আধারি এসে পড়েছে বাবা লাহোরির মুখের ওপর। নন্দন দেখল,বাবা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে নদীর পারের একটা গাছের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাচ্ছেন,আর বলছেন,

বেটা ওই দেখ বটবৃক্ষটি ! যা গিয়ে সালাম করে আয় আর তারপর এই কিসসা শোন।

নন্দন উঠে গিয়ে গাছটার গোঁড়ায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে এসে বৃদ্ধের সামনে এসে বলল, বলেন হুজুর ।

বাবা লাহোরি খুব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন,আজ থেকে একুশ বছর আগে তোর বাপ আর মাকে নদী থেকে তুলে এনে ওই গাছের নিচে শুইয়েছিলাম ।

তারপর তিন দিন তিন রাত ওরা আমার কুঠুরিতে ছিল। কিন্তু মুখে কোনও খাবার তুলল না । পানিরও কোনো পিপাসা দেখলাম না। পাশের ঘর থেকে শুনলাম, কখনও চয়ন কখনও কুঞ্জরানী নিজের নিজের দুখের কথা অন্যজনকে শুনিয়ে যাচ্ছে। সারাদিন,সারারাত। তিন দিন , তিন রাত ।

এই তিন দিন, তিন রাত আমি কোনো কাজে বেরোইনি । না খেয়েছি, না গোসল করেছি , না শুয়েছি। শুধু দেয়ালে কান পেতে শুনে গেছি ওদের কাহিনী । তারপর চতুর্থ দিন ভোরে এসে যখন অনুমতি চাইল চলে যাওয়ার, আমি ওদের রাস্তা রুখতে পারিনি । আর জিজ্ঞেসও করিনি, কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কখনও ফিরবে কি-না ?

হায় আল্লাহ তার পরের দিন ভোরে নদী ফের ফিরিয়ে দিল অদের ধর দুটো।

নন্দন বলল, বাবা আমার সেই মাতৃ-পিতৃদেবের প্রেমের কথা বলুন,এবার-

বলছি বলে বাবা লাহোরি চোখ বুজে গভীর শ্বাস টানলেন ,লম্বা সময় ধরে সে শ্বাস ধরে রাখলেন আর শেষে যখন মুখ খুললেন, মনে হল,ও তিরিশ বছরের যুবক। এক তরতাজা তরুণের কণ্ঠে বাবা গাইতে লাগলেন , কখনও যুবক কখনও যুবতীর কণ্ঠে...



---তিন---

জান কুঞ্জ পরপর তিনবছর যখন খরা চলল দেশে,আমি ভয়ে বাবার চোখের দিকে চাইতে পারতাম না। বকেয়া কর দূরে থাক। আমাদের খাওয়া পড়াও বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড়।

আমি তোমার চোখের দিকে চাইলে তখন বুঝতাম তোমার বুকের মধ্যে ঝড় বইছে। একবার তুমি বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলে ,আর আমি তোমার বুকে কান পেতে বাজ পড়ার আওয়াজ পেলাম।

--সত্যি কুঞ্জ?

--হ্যা,চয়ন দেব ।

---তাহলে আমি কেন তোমার পেটে কান পেতে টের পাইনি তুমি মা হতে চলেছ

-আমি তোমায় বুঝতে দিইনি প্রিয় । দিতে চাইনি

--কেন? কেন? কেন তুমি আমায় জানতে দাওনি কুঞ্জ। তাহলে আমি তোমায় নিয়ে যে দিকে দুচোখ যায় পালিয়ে যেতাম।

-আমি কিন্তু পালাতে চাইনি,চয়ন।

--ধিক কপাল আমার,শেষে তো সেটাই হল।

এইসময় বাবা লাহোরি একবার পুরুষ কণ্ঠে,একবার নারীকণ্ঠে চোখের জল বইয়ে রব করে কাঁদলেন। নন্দনের মনে পড়ে গেল চট্টগ্রামের সারারাতের কীর্তন-যাত্রার কথা। বৃন্দাবন ছেড়ে কৃষ্ণ কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিচ্ছেন। আর সমস্ত গোপীকুল শোকে মুহ্যমান।

হঠাৎ বাবা লাহোরি চোখ খুলে,চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, বুঝলি বেটা ,এই ছিল তোর জন্মরহস্য।

নন্দন মুগ্ধ সরে বলল,হ্যা বাবা।

বাবা লাহোরি ফের শুরু করলেন,-চট্টগ্রামে হুকুমনামা পৌঁছে গিয়েছিল ,মুঘল সালতানাত এভাবে বছর-বছর কর বাকি ফেলা পছন্দ করছেনা। দিল্লির আমিররা চান চট্টগ্রাম করের বদলে কিছু জোয়ান পুরুষ পাঠাক, হারেমে কাজ করার জন্যে। ভাল গাইয়ে জোয়ান হলে ভাল দর উঠবে। আর কিছু খুবসুরত লেড়কি হলেও বহুত বকেয়া কর মওকুব হবে।

চয়নের বাবা চরন দাসের ভয় হল তার ছেলের গানের গলাই তার কাল হবে । তার ওপর অপূর্ব বাশি বাজায় ছেলে। তার কাছে আরও খবর আছে, গ্রামের স্বর্ণকার পরিক্ষিত চন্দ্রের মেয়ে কুঞ্জরানির সাথে চয়নের ভাব-ভালবাসা জমেছে। এই সুযোগে ছেলের বিয়ে দিতে পারলে ছেলের হারেমে পাঠানোর আর ভয় থাকবেনা।

চরন দাস পরিক্ষিতকে গিয়ে শলা দিতেই আকাশ থেকে পড়ল বেনের বেটা। গেয়ো চাষি খোয়াব দেখছে জহুরীর বাড়িতে সমন্ধ করার। সেই রাতেই পরিক্ষিত খবর পাঠাল চাটগাঁর মুঘল সেনাপতি কাফি খাঁর কাছে চয়নের গানের কথা ,বাশির কথা আর চোখকাড়া চেহারার বর্ণনা দিয়ে। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে চাষের মাঠ থেকে ঘুমন্ত চয়নকে তুলে পাচার করে দেয়া হল দিল্লি । একমাত্র ছেলের শোকে চরন দাস ঝাপ দিল কুয়োয়।

---জানো কুঞ্জ ,ওরা হয়ত আমাকে আফিম কিংবা মদের নেশায় চুর করে রেখেছিল,অতদিন। কীভাবে কীভাবে যে দিল্লি এলাম কিছুই মনে পড়ছে না আমার। যে দিন সত্যি ঘোর কাটল দেখি চারধারে অচেনা মেয়েরা সব ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু কাউকে আমার এত্তটুকু ভাল লাগছে না।

--কিন্তু চয়ন দিল্লি আসার সব পথ,সব দিন ,সব রাত মনে আছে আমার। মনে আছে সেইসব পুরুষকেও যারা আমায় লুটেপুটে খেল শুধু তোমার কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা দিয়ে।

--কিন্তু কেন? কেন তুমি এই পথ ধরলে কুঞ্জ ? আমাদের গ্রামের ধাইমা চঞ্চরীকে দিয়েই তো বাচ্চাটা নষ্ট করে দিতে পারতে।

--তোমার সন্তানকে আমি মারব চয়ন,দেহে প্রাণ থাকতে।

ওকে জন্ম দেব বলেই তো ঠাকুরমার বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম।এমন কি ওর জন্মের পর সমাজে বেইজ্জতির কথা ভেবে,বিষ খেয়ে মারা গিয়েছিল বাবা। তারপরও কোনোকিছুই রুখতে পারেনি আমাকে।


--কুঞ্জ যদি তুমি এলেই, তাহলে এত দেরিতে কেন ?

--তোমার ছেলেকে একটু বড় করে রাস্তায় বেরিয়েছিলাম চয়ন।

--হায়রে, দিল্লির পথকে তুমি রাস্তা বলছ । এ তো নরকের সড়ক।

--কিন্তু আমার মনে হল আমি স্বর্গেও দিকে হাঁটছি।

চট্টগ্রাম থেকে দিল্লি সত্যিই বড় দূর। যত রাস্তা তত মানুষ আর তত শয়তান। যে-ই রাতে একটু শোবার জায়গা দিয়েছে,সেই আমার শরীর লুটেছে।

-কিন্তু জান চয়ন ,আমার কোনো কষ্ট নেই,দুঃখ নেই। লজ্জাও নেই। কারণ এই সবকিছুই আমি তোমাকে পাওয়ার মুল্য ভেবেছি। শঙ্করদেব শুনেছি, বলেছিলেন, যাকে খুব চাওয়া যায়,তার জন্যে অনেক দিতে হয়।

--কিন্তু কী পেলে শেষে কুঞ্জ ? একটা ক্ষত হয়ে যাওয়া শরীর

--কিন্তু একটা অক্ষত মন।


হারেমের জীবনে কত সুন্দরী দেখা হল চয়নের কিন্তু ওই পর্যন্তই। অথচ হঠাৎ কদিন ধরে হারেমের নতুন আমদানি এক মেয়ের দিক থেকে চোখ সরানো কঠিন হয়ে গেল। তা-ও অবশ্য মেয়েটির মুখ বা শরীরের দিকে নয়। সারা শরীর বোরখায় মোড়া মেয়েটার ছোট ছোট, ফরসা দুটি পায়ের পাতার দিকে। এরকম একজোড়া পায়ের পাতা ওর মগজে ভর করে আছে কতকাল। চট্টগ্রামের মেয়েদের এরকম নরম তুলতুলে পা হয়।

তারপর একদিন বোরখার জালের পেছনে একজোড়া নীল চোখও চোখে পড়ল চয়নের। বুকের মধ্যে ওর তখন পাহাড় ভাঙছে। হে কৃষ্ণ! হে শঙ্কর ! হে অবতার শঙ্করদেব! জীবনভর তোমার কীর্তন গেয়ে এই তার পুরস্কার। শেষে যে হারেমের প্রহরী হলাম সেই হারেমেই জব্ধ করলে কুঞ্জকে।

চয়ন শীতের রাতে বহুক্ষণ চেয়ে ছিল বোরখা-ওয়ালীর দিকে। সেই চাহনিতে কি পিপাসা ছিল? অন্তত কুঞ্জর তাই মনে হয়েছিল। কাজেই সেই রাতেরবেলায় সারা হারেম যখন বহুদিন পর ফের বাবা লাহোরির কিসসা শুনছে,কুঞ্জ পা টিপে টিপে সেই ফাঁকে চুপি চুপি চলে এল চয়নের ঘরে।

চয়নের ঘরে ঢুকে বোরখার পর্দা তুলে ডাকল যখন চয়ন... চয়ন বলে, শুয়ে থাকা মানুষটা চোখও মেলল না। অন্ধকারে চয়নের ঠোঁটে একটা চুমু দিতেই চমকে উঠল কুঞ্জ । পাথরের মত ঠাণ্ডা ঠোঁট লোকটার। অথচ গায়ে কোনো গরম চাদরও নেই।

কুঞ্জ মোমবাতিটা জ্বেলে দেখল উলঙ্গ হয়ে শুয়ে থাকা চয়নের শরীর থেকে প্রাণ যায় যায় । কুঞ্জর চোখ পড়ল স্বামীর খোজা করা পুরুষাঙ্গের দিকে। একটা প্রবল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে স্বামীর নিথর শরীরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল কুঞ্জ।

কুঞ্জ আমি তো মরেই ছিলাম । আমায় বাঁচাতে গেলে কেন ?

--একসঙ্গে মরব বলে।

--তুমি পারলে আমার মরা শরীরটা নিয়ে যমুনায় যেতে?

--হারেমের পাহারাদার বিল্লাহ সাহায্য করল।

--বিল্লাহ ! ওই কুৎসিত কদাকার জন্তুটা।

--ওকে কেউ কোনোদিন একটা মিষ্টি কথাও বলে না। আমি অন্ধকারে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিলাম।তারপর গদগদ সুরে বললাম,বিল্লাহ চয়নকে আমি আফিম খাওয়াইয়ে মেরে ফেলেছি । ভোর হলেই হইচই হবে। তুই আমার পিয়েরে বিল¬া,ওর মরাটা নিয়ে জলে ফেলে দে। তারপর তোকে আমি আরও আদর দেব।

--তারপর...

--বিল্লাহ তোমাকে জলে ছুড়ে ফেলে যেই পাশে চাইল,দেখল আমিও তোমার সাথে ভেসে যাচ্ছি যমুনায়।

তোর বাপ আর মাকে পরদিন সকালে খুজে পেলাম এই পাড়ে।মরবে বলে বহুত আফিম খেয়েছিল চয়ন, কিন্তু ঢেউয়ের চোটে বেচে গেল। বেচে গেল কুঞ্জও। কিন্তু তার পরেও ওরা বাচতে চাইল না ,এক সঙ্গে মরবে বলে। তবে অই তিন দিন আর তিন রাতে আমার ঝোলাতে রেখে গেল ওদেরই বুকের কিসসা যা শুনে জাহাঙ্গীর বাদশাহর চোখেও জল এসেছিল।

নন্দন উঠে গিয়ে ফের সালাম করল, বাবা লাহোরিকে। গল্পে গল্পে তখন সকালের সূর্যটা উঠতে শুরু করেছে। দুজনের কারো খেয়াল নেই। বাবা লাহোরি বললেন, বেটা চল আমার বস্তিতে । একটু গোসল করে কিছু পাক করে খেয়ে নিই।

নন্দন আমতা আমতা করে বলল, কিন্তু হুজুর, হারেমে আমার কিছু খাবার আছে। একবার ফিরে যেতেও তো হয়। সারারাত বাইরে বাইরে।

বাবা লাহোরি গম্ভীর গলায় হুকুম করলেন,তুই আর কখনও হারেমে ফিরবি না। আমি কিছু রুপেয়া জমিয়েছি। সেটা দিয়ে তোর মালিকের কাছ থেকে তোর মুক্তি আমি কিনে নেব। আর তোকে আমার একমাত্র শাগরেদ করে রেখে যাব। তু...ই হবি দুনিয়ার সেরা রাতের –কিসসা গাওয়াইয়া ।


--চার---

এর দশবছর পর বাবা লাহোরি মারা গেলে তার একমাত্র সাগরেদ নন্দন যিনি পরে নাম নিয়েছিলেন ফকির রাজা, তিনি রাতের গল্প শোনানো শুরু করেন। তিনি বাংলা ,উর্দু,আরবি, হিন্দি,বাংলা আর সংস্কৃতে পণ্ডিত ছিলেন। সারা জীবন ধরে তিনি তিনহাজার প্রেমের গল্প শুনিয়েছিলেন মানুষকে। তাদের মধ্যে অন্যতম একটি কাহিনী খুররম ও আরজুমান্দ বানুর প্রেমকাহিনী। ইতিহাসে যাদের খ্যতি শাহজাহান ও মুমতাজমহল নামে। বাদশাহ আলমগীর ১৬৮০ সাল থেকে গানের চর্চা নিষিদ্ধ করলে ফকির রাজার রাতের কাহিনীগায়ন বন্ধ হয়। তখন মনের দুখে তিনি যমুনায় ঝাপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।



লেখক পরিচিতি  
শাহনেওয়াজ বিপ্লব 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ,যে কজন তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল আর মেধাবী গল্পকার পেয়েছে,শাহনেওয়াজ বিপ্লব তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। সমসাময়িকতা,রাজনীতি,দেশভাগ এসবই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার গল্পের বিষয় বলে মনে হলেও বিশেষ করে তার জন্মস্থান সীতাকুণ্ড আর চট্টগ্রামের ইতিহাস,ঐতিহ্য এবং চাটগাঁর সাধারণ মানুষের অতি অসাধারণ কাহিনীই তার প্রতিটি গল্পের উপজীব্য। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,কলকাতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে । ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে আগামী বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উপনিবেশ’। বর্তমানে তিনি ভিয়েনা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন