সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক : পর্ব - ১

ধারাবাহিক
অনুবাদ :  এমদাদ রহমান।

[আলবেয়ার কামু জন্ম নিয়েছেন ১৯১৩ সালে, আলজেরিয়ায়। দি আউটসাইডার, দ্য প্লেগ, দ্য ফল তাঁর উপন্যাস। লিখেছেন সিসিফাসের মিথ। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। জীবন আসলেই কী, এই ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। নিরর্থকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকৃতির অনন্য দলিল ‘নোটবুকস’। কামু’র নোটবুকের ১ম খণ্ডে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২, ২য় খণ্ডে ১৯৪২ থেকে ১৯৫১ এবং ৩য় খণ্ডে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন চিন্তা ও উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেছেন। এই সময়কালের মধ্যেই তিনি লেখন ‘দি আউটসাইডার’, ‘দ্য প্লেগ’, ‘দ্য ফল’ —এই উপন্যাসগুলি; ভাবনাবিস্তারি প্রবন্ধ ‘দ্য রিবেল’, ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’; ‘ক্যালিগুলা’, ‘ক্রস পারপাস’, ‘দ্য পজেজসড’ এই তিনখানি নাটক। ১৯৫৭ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ১৯৬০-এ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। গল্পপাঠের পাঠকদের জন্য, কামু’র নোটবুকের ধারাবাহিক প্রকাশের অংশ হিসেবে আজ প্রথম কিস্তি ছাপা হল। অনুবাদ করেছেন এমদাদ রহমান।]


‘সবকিছু, যেসব আমাকে হত্যা করে না, তা-ই আমাকে শক্তিমান করে তোলে।’ হ্যাঁ, কিন্তু... কতই না কঠিন সুখি হওয়ার চিন্তা। এইসব হল বিবমিষা জাগানো ব্যাপার। সবচেয়ে উত্তম হল নীরব হয়ে থাকা, সবসময়, এবং আর কী ঘটবার বাকি আছে, তার জন্য অপেক্ষা করা।

এখানেই সেই অবস্থা তৈরি হয় যখন দুটি সমান অগ্রহণযোগ্য বিকল্পের একটিকে বেছে নিতে হয়, জিদ বলছেন, নৈতিক হওয়া আর আন্তরিক হওয়ার মধ্যকার জতিলতা। তিনি এও বলছেন, একমাত্র সুন্দর বিষয় হল সেইসব উন্মাদনা, কাউকে দিয়ে লেখানোর জন্য শব্দ করে বলা এবং কারণগুলোকে লিপিবদ্ধ করে ফেলা।

নিজেকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এখানে যদি মরুভূমি নাও থাকে, তবে আছে প্লেগ, অথবা তলস্তয়ের সেই ছোট্ট স্টেশন।

গ্যেতে—আমি নিজেকে খুব বেশি অনুভব করি তখন-ই, যখন আমি মানুষের কন্যাদের দিকে অগ্রসর হই।

এফ. অ্যালেকজান্ডার এবং এইচ. স্ত্যাব। দ্য ক্রিমিনাল। কয়েকশতাব্দী আগে স্নায়ুবিকারগ্রস্থদের জেলখানায় রাখা হতো। সেই সময়ও এগিয়ে আসছে, যখন অপরাধীদের হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

‘জীবন আর মৃত্যু —একটি আয়নার সামনে’, বোদলেয়ার বলেছেন। ‘মৃত্যু’কে কতই না গুরুত্বহীনভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রত্যেকেই যেন মৃতের মত বেঁচে থাকে। কিন্তু নিজের মৃত্যুর নিয়ন্ত্রক হতে পারা কতটুকু কঠিন?

কেউ একজন, যিনি পৌঁছে গেছেন নিরর্থকতায়, এবং ক্রমাগত বেঁচে থাকবার চেষ্টা করছেন, তার দৃষ্টিভঙ্গিটুকুকে আঁকড়ে ধরে রাখবার জন্য, আর এইসব, তাকে সবসময় জানান দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজটি হল— প্রতিটি পদক্ষেপে আত্মসচেতন থাকা। পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব সময় তার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকবে। মানুষটা পৃথিবীতে খুব সহজভাবে বাস করতে চাইবে, যেখানে আলোকবিকিরণই হল নিয়ম। আর তখনই মানুষটি অনুধাবন করবে প্রকৃত সমস্যাটি, এমনকি ঈশ্বরকে ছাড়াই, তা হল মনস্তাত্ত্বিক একতার সঙ্কট আর নিজের ভিতরকার প্রশান্তি। মানুষটি আরও উপলব্ধি করবে যে নিজের ভিতরের এই প্রশান্তি, শৃঙ্খলা ছাড়া সম্ভব নয়, যা একই সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও কঠিন। পৃথিবীতে, কর্তৃত্ব দ্বারা শাসিত হয়ে মানুষের অর্জনটা কী?

প্রতিবন্ধকতা ঘুমিয়ে আছে জীবনের খণ্ড খণ্ড অংশে, যা ইতোমধ্যে যাপিত হয়ে গেছে (পেশা, বিবাহ, পূর্ববর্তী মতামতসমূহ); ইতোপূর্বে ঘটে গেছে। সমস্যার উপাদানগুলো খুব কৌশলে থেকে যায়, জীবন থেকে পালিয়ে যেতে পারে না।

লেখক, যিনি পর্যালোচনা করেন এবং দারুণভাবে লেখার কাজটাও শেষ করেন, যা আগে তার অভিজ্ঞতায় ছিল না, তা, সম্পূর্ণই বর্জনীয়; ঘৃণ্য। তবে সাবধান, একজন খুনি কখনোই যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি নন, যিনি অপরাধ বিষয়ে কথা বলবেন। (তবে তার নিজের কৃত অপরাধ সম্পর্কে বর্ণনা দেবার পক্ষেও কি তিনি যথেষ্ট যোগ্যতা রাখেন না? এমনকি যা নির্দিষ্টও নয়।) আমরা অবশ্যই সৃষ্টি আর কর্ম—এই দুটি ব্যাপারের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবধান কল্পনা করে নেব। একজন প্রকৃত শিল্পি কী তিনি ভাবলেন আর কী করলেন— এই দুইয়ের মাঝামাঝিতেই অবস্থান করেন।


আমার অভিজ্ঞতালোকের বিশ্ব : মানুষের অমরত্ব ব্যতিরেকে ঈশ্বরের কল্পনা।


প্রথম দর্শনেই, মানুষের জীবনই তার কাজের চেয়েও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। জীবন খুব দৃঢ়ভাবে সক্রিয় থেকেছে আর সমগ্রটাকে খুব একগুঁয়েভাবে শাসন করেছে। শাসন করেছে তার নিজের মানসিক আচরণের ভঙ্গি। একটিমাত্র নিঃশ্বাস বয়ে গেছে তার অনেকগুলো বছরের ওপর দিয়ে। তার উপন্যাস আসলে সে নিজেই। আবার তার দিকে তাকাবেন, অবশ্যই।


অস্তিত্বজনিত ভয়, প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের কাছে পৌঁছানোর ভয়। চিত্রকলার ভাষায় কথা বলবার চেষ্টা করা দরকার, যে-কথা আসলে হয়ে উঠবে সাহিত্যবিষয়ক। আমরা অবশ্যই বোদলেয়ারের কাছে ফিরে যাব। ‘মানব’—এই ধারণায় পরিভ্রমণ, তবে বিষয়মুখ হবে বস্তুনিষ্ঠ।


সমালোচনা প্রসঙ্গেঃ

তিন বছর লাগল একটি বই লিখে শেষ করতে, মাত্র পাঁচটি বাক্যে তাকে হাস্যকর করে ফেলা হল— এবং ভুল উদ্ধৃতিতে।


আমার দিন আর রাতের সঙ্গে চলমান জলপ্রবাহের শব্দ। আমার চারপাশে, আমাকে ঘিরেই তা প্রবহমান। সূর্যকরোজ্জল চারণভূমির ভিতর দিয়ে এই প্রবাহ আমার আত্মার নিকটবর্তী হয় আর শীঘ্রই আমি আমার ভিতরেই সেই শব্দকে শুনতে পাই। জলপ্রবাহ আমার হৃদয়ের ভিতরে ঢুকে পড়ে, বয়ে চলে, আর জলধারার বিশৃঙ্খল-চলন আমার সবকিছুর সহগামী হবে। এটাই হল বিস্মরণপ্রবণতা।

এম প্রসঙ্গে। আমি অস্তিত্বের অভিঘাতের দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করি না, কিন্তু আমি এমন কোনও যাত্রাপথও আকাঙ্ক্ষা করি না যা মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে। আমরা কি আমাদের তীব্রতম অনুভূতিগুলোর শেষে ঈশ্বরকে খুঁজে পাব?

প্লেগ। কিছুতেই যেন লিখতে পারছিলাম না। আটকে যাচ্ছিলাম। এটা লেখবার সময় নানাভাবে উলটে-পালটে ভেবেছি। অনুমিত ধারণার সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে সংযুক্ত করেছি। ‘দ্য আউটসাইডার’ বর্ণনা করেছে মানুষের নগ্নতা যখন নিরর্থকতা বা অযৌক্তিকতার সঙ্গে পরস্পর মুখোমুখি হয়। ‘দ্য প্লেগ’ হল সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সমান মূল্যবোধের উদ্ভাসন, যেখানে একই ব্যাপার অর্থাৎ মানুষের নগ্নতার সঙ্গে নিরর্থকতা বা অযৌক্তিকতার মোকাবেলা। তবে এখানে আমি আরেকটু বলতে চাই, ‘দ্য প্লেগ’ এখানে আমাদের দেখাচ্ছে যে অযৌক্তিকতা কিংবা নিরর্থকতা আসলে কিছুই শেখায় না। এটা এক ধরণের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি।

দীর্ঘ দিন ধরে ফ্রান্সকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখছিলাম, কিন্তু এখনও কোনভাবেই লিখে শেষ করতে পারছি না বর্তমান সময়ের বিশস্ত কিছু তথ্যসূত্র ছাড়া। এটা লেখবার প্রাথমিক ধারণা আমার কাছে এসেছিল একটি ছোট্ট লোকাল ট্রেনে, যেন আমি দেখছিলাম ট্রেনটি আমাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, ছোট স্টেশনগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে আর ট্রেনযাত্রী ফরাসি মানুষগুলোর শরীর আর মুখগুলোকে আমি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম নাঃ বৃদ্ধ চাষি পরিবার। মহিলার মুখখানা যেন দলা পাকানো, ঠিক যেন মানুষের মুখের উপযোগী করে বানানো পশুর চামড়া। পুরুষটির মুখ, কোমল আর আলোকিত করে আছে দুটি চোখ আর শাদা গোঁফ— তাদের শরীর এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে দলা পাকিয়ে আছে যে মনে হচ্ছে যেন দুই দুইটি শীতকালের অভাব আর বঞ্চনা, শরীরে জড়িয়ে আছে উজ্জ্বল আর কারুকার্যখচিত পোশাক, তবুও বোঝা যায়, যেখানে দারিদ্রতা থাকে, সেখানে মানুষের কাছ থেকে অভিজাত কেতা বিদায় নেয়। ট্রেনে যাত্রীদের সুটকেসগুলোকে দেখাচ্ছে অতি ব্যাবহারে জীর্ণ। ক্ষয়ে যাওয়া। রশি দিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা বাঁধা আর কার্ডবোর্ড দিয়ে তালি মারা। ফরাসিদেরকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা সবাই দেশত্যাগকারী।

কোনও এক শহরের শিল্প-এলাকায়, এক বয়স্ক শ্রমিক যাকে আমি তার ঘরের জানালায় দেখতে পাচ্ছিলাম— সূর্যাস্তের শেষ আলোয়, কোনও কিছু পড়বার জন্য চোখে দিচ্ছে তার চশমাজোড়া আর খুব প্রাজ্ঞের মত দুটি প্রসারিত হাতে খুলে রেখেছে একখানা বই।

স্টেশনে স্টেশনে ব্যস্ত মানুষগুলো বিনা প্রতিবাদে, অনেকটা হার মেনে নিয়েছে এমন ভঙ্গিতে, খেয়ে নিচ্ছে জঘন্য সব খাবার আর তারপর একে একে পৌঁছে যাচ্ছে অন্ধকারে-ডুবে-থাকা শহরগুলোয়, যার সঙ্গে দেখা করবে তার সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ না করায় একা একা মালিশ করছে নিজেদের কাঁধ, তারপর ফিরে যাচ্ছে হোটেলে, ফিরে যাচ্ছে নিজেদের ঘরে, ইত্যাদি। নৈরাশ্য আর নীরবতার এক জীবন যেন যাপন করছে সবাই, পুরো ফ্রান্স জুড়ে। কী ঘটতে যাচ্ছে—এমন কিছু একটার জন্য তারা এখন একযোগে অপেক্ষা করছে।

নস্টালজিয়া, অন্য মানুষের জীবনকে ঘিরে। তার কারণ, বাইরে থেকে দেখা হচ্ছে বলেই, সব কিছুকেই বাইরে থেকে দেখা হচ্ছে, তারপর তারা এই দেখা থেকেই এক উপসংহারে, সমগ্রে পৌঁছাচ্ছে। যখন আমাদের জীবন, ভিতর থেকে দেখলে, দেখে নিলে তার প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ, প্রতিটি অন্ধকার কোণ, আরও একবার, ভিতর থেকে দেখতে লাগলে, একাত্মতার এক বিভ্রমের পেছনে আমরা দৌড়াতে শুরু করব।

বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে কী তার কাজ এবং এটা কী নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেন ফুলের এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি আর শুধুমাত্র একটাই নয় কেন?

উপন্যাস। ‘দ্য প্লেগ’ নাম রাখা যাবে না। তবে অনেকটাই ‘দ্য প্রিজনার্স’-এর মত।

প্রুস্তের মতে, এটা কখনোই প্রকৃতি নয় যা থেকে শিল্পকে অনুকৃতি করা হয়। তিনিই প্রকৃত শিল্পি যিনি আমাদের এই শিক্ষা দেন যে প্রকৃতির ভিতর দিয়ে তাকিয়েই তার কাজগুলোকে দেখতে হবে, কীভাবে প্রকৃতির অকৃত্তিম আচরণের ভিতর বসে থেকে সম্ভব করেছে তার অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা। সব নারী রেনোয়ার শিল্পকর্ম হয়ে গেছে।

দ্য আউটসাইডার এবং সমালোচকগণঃ তারা বলছেন —অসম্ভব পরিস্থিতি, অসম্ভব। ভুল শব্দ। তার চেয়ে বরং ‘মুক্তি’ শব্দটাকেই যথার্থরূপে প্রয়োগ করা যেত।

ঈশ্বর আর এই ব্রহ্মাণ্ড কখনোই বদলাবে না আর এর কারণগুলোও তাদের ঐকতানের ভিতর পতিত হয়েছে। এখানে সবকিছুকেই একবারের জন্য দেয়া হয়েছে আর সবার জন্যই একই নিয়ম। এটা হল আমাদের কাজ, যদি আমরা খুবই আনন্দিত হই, তাহলে আমরা খুঁজে বের করব সেই কারণগুলোকে আর খুঁজে বের করব তার পরিণতিকে (জ্যামিতিক অস্তিত্ত্বের কারণে), কিন্তু ইতোমধ্যেই তা সম্পূর্ণতা পেয়ে গেছে এবং তা অনাদিকাল থেকেই বিরাজমান। এখানে, এই ব্রহ্মাণ্ডের অগ্রযাত্রার আর কিছুই বাকি নেই। তবে, এর কোনও ট্র্যাজেডি নেই, কারণ তার কোনও ইতিহাস নেই। সব কিছুই এখানে নির্মম, নির্দয়। যে-কেউ ইচ্ছা করলেই ঘটিয়ে ফেলতে পারে। এটা হল সাহসীদের দুনিয়া।

এখানে, সব কিছুকেই একবারের জন্য দেয়া হয়েছে, সবার ক্ষেত্রেই এক নিয়ম। সুতরাং, পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে যাওয়া জরুরি প্রয়োজন। প্রয়োজন এখানে অসীম। মৌলিকতা আর সুযোগ সব সময় কাজ করে না। সব কিছুই এখানে একঘেয়ে।

মানুষকে ‘যৌনজীবন’ দেয়া হয়েছে সম্ভবত তাকে তার উপযুক্ত পথ থেকে বিচ্যুত করতেই। যৌনসঙ্গমের ব্যাপারটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যৌনতাই মানুষের কাছে সবচেয়ে আদিম। সবকিছুর ভিতর, তার সমস্ত ঘুমের ভিতর। এর থেকে চোখ ফিরিয়ে বাইরে তাকালে, আবার সবকিছু জীবনে ফিরে আসে। ঠিক একই সঙ্গে আমাদের প্রজাতির কাছে কৌমার্যের বা কুমারীত্বের অবসান হয়।

একজন লেখক কখনোই তার সৃষ্টির বিষয়ে তার সংশয় নিয়ে কিছুই প্রকাশ করবেন না। তাতে, খুব সহজেই লেখককে বলা হবেঃ ‘কে আপনাকে সৃষ্টি করতে বাধ্য করেছে? যদি এই সংশয়ের ভার নিদারুণ হয়, অবিরাম চলতে থাকে, তবে কেন লেখক তাকে বহন করে চলবেন?’ হ্যাঁ, আমাদের সংশয়গুলো আমাদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, যা লেখক বলেই আমাদের মাঝে বিদ্যমান। কক্ষনোই তার সংশয় নিয়ে কথা বলা যাবে না —তা যা-ই হোক না কেন?

‘উইদারিং হাইটস’ হল অন্যতম একটি মহৎ প্রেমের উপন্যাস কারণ এর সমাপ্তি হয়েছে ব্যর্থতা আর বিদ্রোহে —আমি আসলে আশাহীন মৃত্যুকেই বোঝাচ্ছি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হচ্ছে এক অশুভ আত্মা। এমনও প্রেম আছে যা প্রবহমান থাকে কেবলই ব্যর্থতায়, আর এই ব্যর্থতা হল মৃত্যু। একমাত্র নরকেই তা নিরবিচ্ছিন্ন থাকে।

উঁচু বৃক্ষের জঙ্গল অবিরাম বৃষ্টিতে লাল দেখাচ্ছে, চারণভূমি হলদে পাতার চাদরে যেন ঢাকা পড়ে গেছে। শুকন মাশরুমের গন্ধ, কাঠের আগুন (জ্বলতে থাকা দেবদারু গাছের কয়লা এমন নিভু নিভু, যেন তারা নরকের হীরা।), মত্ত বাতাস ঘরের চারপাশে, বেদনা ও অনুতাপে যেন চাপা আর্তনাদ করছে। এখন, এখানে কেউ কি চিরচেনা সেই শরৎকাল খুঁজে পাবে? চাষিরা এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে, যেমন করে তারা সব সময় হাঁটে—ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির বাধা অতিক্রম করে!

‘দ্য প্লেগ’-এর আছে এক সামাজিক এবং অধিবিদ্যামূলক অর্থ। সত্তার প্রকৃতি ও জ্ঞান সংক্রান্ত দর্শনের এক বিশেষ অর্থ কিংবা উদ্দেশ্য। একেবারে যথার্থরূপে এই কথাই বলা যায়। আউটসাইডারে, এই অর্থ বা অভিপ্রায়ের অস্পষ্টতা কিংবা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান।

কাফকা’র সমস্ত শিল্প তাঁকে পুনর্বার পড়বার জন্য আমাদের প্রস্তুত হবার ভিতর ঘুমিয়ে থাকে।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন