সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

ইতালো কালভিনো'র গল্প : বলির পাঁঠা

অনুবাদ : বিকাশ গণ চৌধুরী


একটা দেশ ছিল যেখানে সবাই ছিল চোর।

রাত্রিবেলা সবাই সবখোল-চাবি আর ঢাকা-লন্ঠন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোত আর প্রতিবেশীদের বাড়িতে চুরি করত। আর ভোরবেলা মালপত্র নিয়ে ফিরে এসে দেখত তাদের বাড়িতেও চুরি হয়ে গেছে।

তাই সবাই একসাথে আনন্দেই দিন কাটাচ্ছিল, কারোরই কোন ক্ষতি হচ্ছিল না, একজন আরেকজনেরটা চুরি করছিল, আর সেই আরেকজন অন্য আরেকজনেরটা, আর এভাবেই সেই শেষ লোকটাকে পাওয়া যাবে যে প্রথম লোকটার জিনিস চুরি করেছিল। অপরিহার্যভাবেই সেই দেশের ব্যাবসা-বাণিজ্যে ক্রেতা আর বিক্রেতা দুজনেই দুজনকে ঠাকাত। সেই দেশের সরকার ছিল একটা অপরাধীদের প্রতিষ্ঠান, যা তার প্রজাদের কাছ থেকে চুরি করত আর প্রজারাও উলতে সরকারের ওপর বাটপাড়ি করায় উৎসাহী ছিল, তাই খুব মসৃণভাবেই সবার দিন কাটত, কেউ বড়লোকও ছিল না, গরীবও না।


একদিন কীভাবে জানি না,একজন সৎলোক সেখানে থাকতে এল। রাত্রিবেলা থলে আর লন্ঠন নিয়ে বেরোবার বদলে ও বাড়িতে বসে তামাক খেতে খেতে উপন্যাস পড়তে লাগল।

চোরেরা এল, আলো জ্বালা দেখে আর ঘরের ভেতর ঢুকল না।

কিছুদিন এভাবে গেল : তারপর তারা তাকে বোঝাতে বাধ্য হল যে যদি ও কিছু না করেই জীবন কাটাতে চায় তো কাটাক, কিন্তু অন্যদের কাজ করতে না দেবার তার কোন হক নেই। প্রত্যেক রাতে ওর বাড়িতে কাটানোর মানে পরদিন অন্য একটি পরিবারের না খেয়ে থাকা।

সৎমানুষটা এরকম যুক্তি খন্ডাতে পারলো না। ও সন্ধেবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তো আর পরদিন সকালে অন্যদের মতোই ফিরে আসত, কিন্তু চুরি করত না। ও ছিল সৎ, ওকে ওর সততা থেকে নড়ানো সম্ভব ছিল না। ও ব্রিজের ধার অবধি চলে যেত আর নীচে নদীর বয়ে যাওয়া দেখত। তারপর যখন ও বাড়ি ফিরে আসত, দেখত ওর ঘরে চুরি হয়ে গেছে।

এক সপ্তাহের কম সময়ে লোকটা কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ল, খাবার জন্যও ওর কিছু রইল না, ঘর একেবারে খালি হয়ে গেল। তবে এটা কোন সমস্যাই হল না কারণ ব্যাপারটা ওর দোষেই ঘটেছিল; না, সমস্যা যেটা হল, ওর এই আচরণে সব কিছু ওলট-পালট হয়ে গেল; কারণ সবাইকে চুরি করতে দিলেও ও কারোর কাছ থেকে কিছু চুরি করত না, তাই সব সময়ই এমন একজন থাকতো যে বাড়ি ফিরে দেখতো তার বাড়ির সবকিছু ঠিকঠাক আছে, যদিও সেখানে সৎমানুষটার চুরি করার কথা। এইভাবে কিছুদিন চলার পর যাদের বাড়িতে চুরি হত না তারা অন্যদের থেকে বড়লোক হয়ে গেল, আর চুরি করতে চাইল না। ব্যাপারটা আরো খারাপ হল যখন ঐ সৎমানুষটার বাড়িতে কেউ চুরি করতে আসত সে কিছুই পেত না, আর এর ফলে তারা গরীব হয়ে যেতে লাগল।

ইতিমধ্যে যারা বড়লোক হয়েছিল তারা সৎলোকটার মতো রাতে ব্রিজে উঠে নীচে নদীর বয়ে যাওয়া দেখতে আরম্ভ করল। এতে ঝামেলা আরও বেড়ে গেল, কারণ এতে অন্য আরও কিছু লোক বড়লোক আর অন্য আরও কিছু লোক গরীব হতে লাগল।


তখন বড়লোকরা দেখল যে যদি রোজ রাতে তারা ব্রিজে বেড়াতে যায় তবে তারা অল্পদিনের মধ্যেই গরীব হয়ে পড়বে। তারা ভাবল : ‘কয়েকজন গরীবকে তাদের হয়ে চুরি করতে পাঠান যাক’। তারা তখন চুক্তি করল, মাইনে ঠিক করল, হিস্‌সা ঠিক করল। তারা চোরই রইল আর প্রত্যেকে প্রত্যেককে ঠকাবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ঘটনাটা ঘটল এরকম – বড়লোকরা আরও বড়লোক হতে লাগল আর গরীবরা আরও গরীব।

কিছু বড়লোক এত বড়লোক হয়ে গেল যে তাদের আর চুরি করবার বা অন্যদের দিয়ে চুরি করাবার প্রয়োজনই রইল না; কিন্তু ওরা যদি চুরি করা বন্ধ করে তবে তারা গরিব হয়ে পড়বে কারণ গরীবরা তাদের বাড়িতে চুরি করবে, তাই তারা গরিবদের মধ্যেও যারা খুব গরীব তাদের নিজেদের সম্পত্তি অন্য গরিবদের থেকে রক্ষা করার জন্য পয়সা দিল, এর ফলে তৈরি হল পুলশ আর জেলখানা।

সে কারণে সেই সৎলোকটার আবির্ভাবের কয়েক বছর পর লোকে চুরি করার আর চুরি যাবার কথা বলত না, শুধু বড়লোক আর গরীবলোকের কথা বলত; কিন্তু তারা তখনও সবাই চোরই ছিল।


সেই শুরুর সৎলোকটাই একমাত্র সৎলোক রইল আর অল্পদিনের মধ্যেই খিদের জ্বালায় মরে গেল।

পরিচিতি












অনুবাদক পরিচিতি
বিকাশ গণ চৌধুরী

আদি নিবাস কুমিল্লা জেলার বুড়িচং গ্রাম হলেও, পাহাড় ঘেরা একটা ছোট্ট শহর দেরাদুনে ১৯৬১ সালে জন্ম, ছোটবেলার অনেকটা সেখানে কাটিয়ে বড় হওয়া কলকাতায়, চাকরিসূত্রে অনেকটা সময় কেটেছে এলাহাবাদ আর মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে। বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা... লেখেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ; ফরাসি, হিস্পানি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন মন্‌পসন্দ নানান লেখা, সম্প্রতি শেষ করেছেন পাবলো নেরুদার শেষ কবিতার বই ‘El libro de las preguntas’ –এর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ‘প্রশ্ন-পুঁথি’। দীর্ঘদিন যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সবুজপত্র ‘বিষয়মুখ’।

1 টি মন্তব্য: