সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

মুরাকামি’র সঙ্গে আলাপ

সাক্ষাৎকার
মুরাকামি’র সঙ্গে আলাপ
জন ফ্রিম্যান
অনুবাদ : এমদাদ রহমান


[‘বাতাস যেখানে গান গেয়েছিল’ নামে মুরাকামি তাঁর প্রথম উপন্যাসটি লিখেছিলেন ১৯৭৯ সালে, তারপর এক নাগাড়ে তিন দশক তিনি মানুষের কল্পনাজগতের ‘অন্ধকার আর আশ্চর্য দিকগুলি’কে পর্যবেক্ষণ করেছেন। জাপানের কিয়োটো’য়, ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি ১২ তাঁর জন্ম। তিনি উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, সাংবাদিক। এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ, নরওয়েজিয়ান উড, দি উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল, কাফকা অন দি শোর, স্পুটনিক সুইটহার্ট, ওয়ানকিউএইটফোর তাঁর অন্যতম সৃষ্টি। ২০০৮ সালে বের হয় তাঁর স্মৃতিকথা ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’, মূলত এই বইকে কেন্দ্রে রেখেই লেখক, সমালোচক জন ফ্রিম্যান কথা বলেন মুরাকামির সঙ্গে, ২০০৮ সালেই। ফ্রিম্যানের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই ‘হাউ টু রিড অ্যা নভেলিস্ট’ বই থেকে এই আলাপচারীতা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।]


কিছু মানুষ চার্চে গিয়ে জীবনের তাৎপর্যকে উপলব্ধি করে গভীরভাবে আর কিছু মানুষের থাকে পর্বতের শিখর থেকে শিখরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। পয়লা এপ্রিল ১৯৭৮, হারুকি মুরাকামি আসলেন জিংগু বেসবল মাঠের পেছনের ঘাসে ঢাকা ছোট পাহাড়ে, টোকিও’য়। মুরাকামি কি একটি উপন্যাস লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন?

তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখি আর প্রায় তিন ডজন বই প্রকাশ হবার পর, এটা পরিষ্কার যে, মুরাকামি উপযুক্ত সময়েই সাড়া দিয়েছেন। তার অদ্ভুত, স্বতন্ত্র, সৌন্দর্যময়, মর্মভেদী উপন্যাসগুলি, ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ থেকে ‘আফটার ডার্ক’ বিশ্বব্যাপী পেয়েছে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা, আর অনুবাদ হয়েছে আটচল্লিশেরও বেশি ভাষায়।

তবে, তিনি যেমন করে তাঁর স্মৃতিকথায় – হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং-এ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, এই বিপুল পরিমাণ সৃষ্টি হয়ত অসম্ভব হয়ে যেত যদি না— বহু বছর আগে যেমনটি শুরু হয়েছিল— তা পর্যায়ক্রমিকরূপে চলে না আসত— এক বিশেষ উপলব্ধি, ঠিক যেন দৈনিক তিন প্যাকেট সিগারেটে আসক্ত কোনও ব্যক্তির কাছে এ এক অভাবনীয় ব্যাপার— যদি সে প্রাতঃভ্রমণে বের হয়, তাহলে কী ঘটবে?

শহরের মধ্যস্থিত ম্যানহাটান হোটেলের লবিতে, অল্প-আলোয়, ইতোমধ্যে শরীরের ঘুম-ভাঙা-সব-চিহ্ন মুছে ফেলে, খানিকটা দৌড়ে এসে, কিছুক্ষণ লিখে আর আরেকটি সাক্ষাৎকারের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে, ঊনষাট বছর বয়সী দীপ্তিমান উপন্যাসিক ব্যাখ্যা করছিলেন কবে, কীভাবে শুরু করেছিলেন, মনে হচ্ছিল এ যেন এক বিপুল বিস্তৃত জীবন; তিনি বলছিলেন কীভাবে জীবন-সংগঠনের নীতিগুলিকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। আমার একটা থিওরি আছে— তিনি কথা বলছিলেন গভীর মন্দ্র এক স্বরে— আপনি যদি খুব তীব্রভাবে পুনরায়-আবর্তনমূলক জীবন যাপন করেন, তাহলে আপনার ইমাজিনেশন খুব ভাল কাজ করবে। ইমাজিনেশনের শক্তিটুকু তখন খুবই কার্যকর থাকবে। তাই, প্রতিটি দিনেই আমি খুব ভোরে জেগে উঠি, প্রতিটি দিন; আর আমি আমার টেবিলে বসে পড়ি আর লেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই।

লেখালেখি নিয়ে বলছিলেন যখন, মুরাকামির বলা প্রতিটি শব্দকেই মনে হচ্ছিল যেন এক নিঃসঙ্গ অস্তিত্ববাদীর কথা। মনে হচ্ছিল তিনি যেন এক পেশাদার খেলোয়াড়, তাকে মনে হচ্ছিল এক উদ্বুদ্ধকারী বক্তা। ‘এটাকে মনে করুন এক অন্ধকার ঘরে যাওয়ার মত ব্যাপার’— তিনি বলছিলেন, তার বলার ভঙ্গি কিছুটা ধীর, শান্ত— ‘আমি সেই অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলাম, ঘরের সেই দরোজা খুলে ফেললাম, এবং, দেখলাম অন্ধকার, পুরাপুরি অন্ধকার। তবে, আমি অবশ্যই কিছু দেখলাম, এবং আমি কোনও কিছু স্পর্শ করলাম, তারপর ফিরে এলাম এই চেনা পৃথিবীতে, এখানে, এই দিকে, তারপর তার সবকিছুই লিখে ফেললাম।’

কথাগুলি বলার পর মুরাকামি হঠাৎ এমনভাবে দীর্ঘ বিরতি নিলেন যেন চার্চে প্রার্থনারত মানুষরা এক দীর্ঘ নীরবতায় মগ্ন, এবং তারপর, তিনি যেন কিছু দরকারি শর্তের কথা বললেন, কিছু আবশ্যকীয় শর্ত—‘আপনার নিজেকে খুব শক্তিমান হতে হবে, আপনাকে নাছোড়বান্দা হতে হবে, বেপরোয়া হতে হবে, কী করতে চাইছেন তার পক্ষে আপনাকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে— যদি আপনার সেই অন্ধকার কক্ষে ঢুকবার ইচ্ছে থাকে।’

এমনকি, মুরাকামি যখন জাপানেও থাকেন না, তখনও তিনি কিছু কঠোর বিধি মেনে চলেন। খুব ভোরে জাগেন, কয়েক ঘণ্টা লেখালেখি করেন, দৌড়ান আর বিকালগুলি কাটতে থাকে সাহিত্যের অনুবাদে। এর মধ্যে তিনি অনুবাদও করে ফেলেছেন দ্য গ্রেট গেটসবি, কেচার ইন দ্য রে, এবং অধুনা রেমন্ড চান্ডলারের ফেয়ারওয়েল, মাই লাভলি।

তার দিনযাপনের সঙ্গে এইরকম নির্দিষ্ট করা নিয়মগুলি তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর সঙ্গে তেমন একটা পার্থক্য তইরি করে না, অবশ্যই। মুরাকামি মানুষের সেইসব কথাই লেখেন, যারা জীবনভর পার্শ্ববর্তী পথ দিয়ে দৈবক্রমে হেঁটে চলে কিংবা অস্বাভাবিক, উদ্ভট পারিপার্শ্বিক অবস্থার দ্বারা তাড়িত হয়। তার ‘কাফকা অন দ্য শোর’ হল কথা বলতে পারে এমন বেড়ালদের নিয়ে, ‘আফটার দ্য কোয়েক’-এ আছে এমন এক মানুষের গল্প যে কিনা বিশ্বাস করে বসে আছে যে এক অতিকায় ব্যাঙ টোকিও’র ওপর থেকে কথা বলছে।

যদিও তিনি কোঠর নিয়মানুবর্তী জীবন যাপন করেন, অভ্যাসগুলিকে খুব মেনে চলেন, তবুও, মুরাকামি জানেন যে কীভাবে নিয়তি মানুষের জীবনকে বদলে দেয়। দুটি ঘটনা তার নিজের ভিতর বিশাল বদল এনেছিল, আশির শেষের দিকে ঘটেছিল প্রথম ঘটনাটি। তিনি যেন কিছুটা ক্লান্ত কিংবা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, কথাটা এমনভাবে বলেন-- ‘পিঠ চুলকাতে চুলকাতে পান করে যাওয়া’। কথাটা বলেন টোকিও’র সাহিত্যিক সমাজকে উদ্দেশ্য করে, যে-সমাজে নিজেকে তিনি বিবেচনা করেন একজন আউটসাইডার হিসেবে। তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান আর লেখেন একখানা উপন্যাস, নরওয়েজিয়ান উড।

বইটি বিক্রি হল, দেদারসে বিক্রি হল আশারও অতীত সংখ্যক কপি, মুরাকামি বলেন, হাসতে হাসতে— ‘দুই বছরে বিশ লাখ কপি। তাই কিছু মানুষ আমাকে আগের চেয়েও বেশি ঘৃণা করতে শুরু করলেন। ইন্টেলেকচুয়াল লোকজন বেস্ট সেলার অপছন্দ করেন।’ মুরাকামি তখন আরও দূরে সরে গিয়েছিলেন। আমেরিকায় এবং তারপরই এসেছিল ১৯৯৫ সাল। এই বছর জাপানের অর্থনীতিতে দেখা দেয় ভয়ানক বিপর্যয়। সাবওয়েগুলোয় সন্ত্রাসীরা গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটায়। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তইরি করে। অর্থাৎ, মানবিক বিপর্যয়। মুরাকামি তখন দেশে ফেরেন। পুরো একটি বছর ধরে মন দিয়ে শুনেন ক্ষতিগ্রস্তদের কথা। মুখে মুখে শুনা এই ইতিহাসকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি তাঁর ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ গ্রন্থে তুলে ধরেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে বদলে দেয় অনেকখানি। তিনি সেইসব মানুষদের কাছ থেকে শিখে নেন কীভাবে চরিত্রদের নিয়ে লিখতে হয়। ‘জানেন, আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা অন্যদের কোনও কথাই মন দিয়ে শুনেন না।’ মুরাকামি বলতে থাকেন, ‘আমাদের চিন্তাটা এরকম যে অন্যদের সব কথাই বিরক্তিকর। কিন্তু দেখুন, আমরা যদি অন্যদের কথাগুলি গুরুত্ব দিয়ে শুনি, তো মনে হবে যে তাদের গল্পগুলি কতটা মুগ্ধ করার মত আকর্ষণীয়।’

তার নিজের এই উপলব্ধির পরেই, মুরাকামি শুধু তার চরিত্রগুলিকেই ভিন্নরকমভাবে লিখেছেন, তা-ই নয়, তিনি কতগুলি বন্ধ জানালা খুলে দিয়েছেন। চরিত্রগুলিকে সেই খোলা জানালা দিয়ে কিছু না কিছু দেখাচ্ছেন, বারবা। বছরের দুই মাস তিনি তার পাঠকের ইমেইলের উত্তর দেন। ‘আমি শুধু আমার পাঠকদের সঙ্গেই কথা বলতে চাই’, তিনি বলেন- ‘আমি তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে চাই’।

আর তারপর, তিনি জানালা বন্ধ করে দেন। তার লেখার স্থির পদ্ধতিগুলি, পুনর্বার যেন শব্দের ঢেউয়ের ভিতর কম্পন জাগায় না, তার কারণ, তিনি চান যে পরবর্তী বইখানা আগের চেয়ে আলাদা হয়, সম্পূর্ণরূপে। আগে যা লিখেছেন তারচেয়েও যেন আরও ভাল হয়। আর এখনও তার ভিতর এই সন্দেহটি দানা বেঁধে আছে যে আরেকটি বিশেষ মুহূর্ত আসবে হঠাৎ করেই, এক মহান উপলব্ধির জন্ম হবে। ‘আমি হয়ত মনে করতে পারব যে কী সেই তাৎপর্যময় উপলব্ধি, যা আমি অনুভব করেছিলাম। তিনি তার প্রথম বইটি লেখবার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘এটা আসলেই এক বিশেষ অনুভূতি। তবে একটি বই লেখার জন্য এমন একটি অনুভবই যথেষ্ট। আমি মনে করি, মানুষ তার জীবনকালে এরকম অনুভূতি কেবল একবারই লাভ করে। আমি হতাশাগ্রস্ত এই ভেবে যে অধিকাংশ মানুষই ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন