সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্প : চিঠি

প্রীতিভাজনেষু অর্ধেন্দু,

ইংরাজিতে নষ্টালজিয়া বলে যে একটা কথা আছে, বাংলায় স্মৃতি-বিলাস বললে বোধ করি কাছাকাছি যায়-আজকাল সেটা আমার মাঝে মাঝে পেয়ে বসে। এটা এদিকে একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে নব্বই বছর পেরিয়ে আসার পর থেকে। স্বাভাবিক ভাবেই। কাজ যা ছিল সব ফুরিয়ে এসেছে, ইন্দ্রিয়গুলো শিথিল, অথচ গীতায় ভগবান নাকি কর্মযোগে বলে দিয়েছেন, হাত-পা, চোখ-কান যতই গররাজি হোক, মস্তিস্কের পরিচালনায় সূক্ষ্ণভাবে কাজ তোমায় করে যেতেই হবে। দুর্জ্ঞেয় তত্ব কথাই, তবে তোমাদের আধুনিক সূত্র ধরে এককথায় স্পষ্টও হয়ে যায়। অর্থাৎ আর সবকিছুর ধর্মঘটের অধিকার বা স্বাধীনতা থাকলেও মস্তিস্ক বেচারির নাই। অফিসে যেমন পিয়ন অর্ডালি থেকে সবার স্বাধীনতা থাকলেও- অর্থাৎ যারা আন্ডার-ষ্টাফের মধ্যে পড়ে- বড় কর্তাদের চেম্বার আগলে বসে থাকতেই হবে।


স্মৃতিরোমন্থনের কথায় আসা যাক। খুঁজে হাতড়ে বের করে অনেক জিনিসই পুরনো করে ফেলেছি। সেদিন শীতের মধ্যাহ্নে বাগানের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে চোখ বুজে আসছে। হঠাৎ তন্দ্রার গোলাপি স্তুপের মতো একেবারে জীবনের ও-প্রান্তে একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। সবটুকু যে একটানা মিষ্টি, এমন নয়, তবুও তোমাকে বলি-

১৯১২ সাল। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ করে এসে . . . থাক। আগে কিন্তু আমার সহপাঠী বীরেশ এবং তার ভাইদের কিছু পরিচয় দিতে হয়, কেননা এই কাহিনীতে তাদের কিছু ভূমিকা আছে। বীরেশ এবং তার তৃতীয় জ্যেষ্ঠ দীনেশের একটু বেশি করেই। ওরা ছিল সাত ভাই। যে-সময়ের কথা সে সময় দুজন নেপথ্যে। আমি যখন থার্ড ক্লাসে, অর্থাৎ সে সময়ে ম্যাট্রিক থেকে দু ক্লাস নীচে পড়ি, ওদের পিতা শ্যামাকান্ত সপরিবারে দ্বারভাঙ্গায় আমাদের পাড়ায় বাড়ী ভাড়া করে বসবাস আরম্ভ করে। দ্বারভাঙ্গার কাছে বাইরের একটি চাকলায় তহশীলদারের কাজ করতেন। সন্মানের পোষ্ট। অবসর নিয়ে এসে বসে রয়েছেন। বাংলায় বাড়ী ছিল হালি শহরে।

তুমি লক্ষ্য করে থাকবে সব পরিবারের নিজের নিজের পরিবারগত বিভিন্নতা থাকলেও এক একটা পরিবারের মধ্যে এমন একটা বিশিষ্টতা থেকে যায় যেটা ইংরাজিতে ফ্যামিলি ট্রেট বলা হয়। বীরেশদের ছিল একটা নীরিহ দোষ, হামবড়াই ভাব। দম্ভ বা ঔদ্ধত্য জাতীয় কিছু নয়। একটা সবজান্তা ভাব, আমি জানি, সুতরাং আমার কাছে বুজরকি চলবে না। মেনে নিতে হবে আমার কথা। ছোট কথা , হালকা কথা, যা বেশ গালভরা নয়- এমন কোন কথার দিকে যাওয়া কারুর অভ্যাস ছিল না। একটা উদাহারণ দিলে আমার বক্তব্যটা পরিস্কার হবে।

যখনকার কথা তখন আমাদের দুবাড়ি মিলিয়ে রোজ বেশ জমাট আড্ডা চলছে। ওঁরা এসে আরও জমিয়ে দিলেন। এই সবজান্তাপনার সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন ধনেশ। ভাইদের মধ্যে উনি ছিলেন দ্বিতীয়। রংটা কালো। বয়স তখন ত্রিশের কাছাকাছি। মাথায় কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল। কোচা দুলিয়ে একটু মুরুব্বিয়ানা-চালে চলাফেরা করতেন। স্বল্পভাষী। স্বল্পভাষী হলেও কিন্তু যা বলতেন, আর যেমনভাবে বলতেন তাতে তাঁর ওপর আর কোন কথা চলতো না। তাঁর জ্ঞানের কোন সীমা বাঁধা ছিল না। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা-এইসব বিষয়ে তিনি ছিলেন অথরিটি। তখন মোহনবাগান সদ্য আই.এফ.এ শিল্ড জিতেছে। আমাদের এসব বিষয়ে জ্ঞান তখন অপ্রত্যক্ষই। সুতরাং অবস্থাটা বুঝতেই পারো।
সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেদিনই ওর কাছে শুনলাম-রবীন্দ্রনাথ কালো ছিলেন। একটু রসিকতা করে হেসে বললেন, আমার মতো মিশমিশে নন অবশ্য, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ীর কেউ নয় তা, তবু রবিবাবুকে কালোই বলতে হবে বৈকি।

আমার খুব একটা আঘাত লাগলো। বয়সের অনেক প্রভেদ, সমীহই করতাম, একটু কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, কিন্তু আমার তো ধারণা ছিল. . .

তুমি নিজে দেখেছো? বা হাতের আঙ্গুলে গোঁফের ডগাটা ঘোরাতে ঘোরাতে, ঠোঁটের ঐ কোণে একটু ব্যাঙ্গের হাসি হেসে, এমন ভাবে বললেন যে ওঁরও দেখা আছে কিনা প্রশ্ন করার সাহস হল না। সাহিত্য নিয়ে আমিই তখন যা একটু নাড়াচাড়া করতে শুরু করেছি। অবস্থা দেখে আর কেউ এগুলো না।

উনি বিপক্ষকে একেবারে পিটিয়ে ঠান্ডা করে দিতেন। ঐটুকু বলেই নিরস্ত না হয়ে হয়ে প্রশ্ন করলেন, মাইকেলের ছবি দেখেছো? . . ফর্সা না কালো?
তখন বসুমতি গ্রন্থাবলীগুলো বেরুত। বোধহয় আরও দু-একটা ওইরকম গ্রন্থাবলীতে মাইকেল মধুসুদন দত্ত প্রভৃতি বড়বড় অনেক লেখকের ছবি দেওয়া হতো। মোটা গোঁফে গালপাট্টায় মাইকেলকে কালোই মনে হতো। অবশ্য মনেই হওয়া । কালো বলবো ভাবছি, উনি মুখের ওপর সেইরকম দৃষ্টি ফেলে চেয়েই ছিলেন, বললেন, রবি বাবু ছিলেন মাইকেলের কনটেম্পরারি।

তখন ও বিষয়ে অতটা তথ্যগত জ্ঞান ছিল কিনা মনে পড়ছে না। থাকলেও গালভরা কনটেম্পরারি কথাটার অভিধান ঘেটে মানে বের করার সময় নেই। ফলে, ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কলকাতায় পড়বার জন্য গিয়ে না ওঠা পর্যন্ত, রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে মাইকেলের সঙ্গে ব্রাকেটে কালো হয়েই রইলেন।

তুমি স্যাবাথ নাম দিয়ে বিখ্যাত সেই ছবিটা দেখেছো। একজন খুব বিখ্যাত ইউরোপীয় চিত্রকরের নামটা এখন ঠিক কলমের ডগায় আসছে না। স্যাবাথ হচ্ছে রবিবার। জানোইতো ওদিনটায় ক্রিশ্চানরা একেবারেই কাজকর্ম করে না। ছবিটা হচ্ছে- একটা খোলা মাঠ, তার মাঝখানে একটা ঘোড়া চার-পা তুলে ছোটাছুটি করছে. . . মুক্তো বন্ধণ. . . সমস্ত দেহমনে ছুটির উল্লাস।
ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ করে আমারও ওই অবস্থা। রাগ করো না, তোমাদের এ কালের সস্তা পরীক্ষা না। টেষ্টের আগে থেকেই যে ধকলটা গেছে-রাত জাগা পর্যন্ত। এবার ছুটি! ছুটি ! ছুটি !

আমি চিরকালই বারমুখো; অজানা নয় তোমার। এবার লম্বা একটা দৌড় দিয়ে না আসতে পারলে নিস্কৃতি নেই। একজন সঙ্গী দরকার। উত্তরবর্তী জীবনে এ ধরনের নিরুদ্দেশ যাত্রায় কোনও সঙ্গী আমি নিতাম না। তখন কিন্তু এই প্রথম, বাড়ীর লোকেই বা ছাড়বেন কেন? সহপাঠী বীরেশকে নাচিয়ে তুললাম। পরের অভিজ্ঞতায় অবশ্য দেখা গেল, নাচাবার দড়িটা তার হাতেই ছিল, কিন্তু সে কথা এখন থাক। বীরেশ আমার সঙ্গে পরীক্ষাও শেষ করেছে। সহপাঠী হলেও বীরেশ আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড় ছিল। ওর বাবার চাকুরি থাকতে ওদের পড়াশুনো বেশ নিয়মিতভাবে হয়নি। লম্বা ডম্বল-ভাঁজা শরীরে ওকে বয়সের চেয়ে একটু বড়ই দেখাতো। ভাইয়েদের মধ্যে চতুর্থ, ছোট তিনজনের সঙ্গে আমিও ন’দা বলেই ডাকতাম।হুজুগপ্রিয় সব ভাই- কথাটা তুলতে রাজি হয়ে গেল। পরের প্রশ্ন, তাহলে কোথায় যাওয়া যায়? কলকাতা-দিল্লী তো নয়। কাছে পিঠে কোথাও।। আমার অনেকদিন থেকেই রাজনগরের দিকে নজর ছিল। একটু গোড়া থেকেই পরিচয় দেই, নইলে বুঝবে না।
মহারাজ রামেশ্বর সিং, অর্থাৎ দ্বারভাঙ্গার শেষ মহারাজার পিতা ছিলেন অতি ধুরন্ধর ব্যক্তি। যখন গদীতে বসলেন তখন এষ্টেটের আয় পঞ্চাশ লক্ষ। তীক্ষ্ণ বিষয়বুদ্ধি। তিনি এটাকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করে তুললেন, এককোটির কাছাকাছি। বম্বের দু একটা কাপড়ের মিল কিনে নিয়ে , নিজেও কয়েকটা দাড় করিয়ে, দায়গ্রস্থ নেটিভ এষ্টেটদের ঋন দিয়ে , ওই উপায়ে বাঙলা বিহারের অনেক জমিদারি হস্তগত করেন, আরও নানা কৌশলে। জান, আমি দিন কতক ওর একান্ত সচিবের কাজ করি। বৈষয়িক বুদ্ধিসম্পন্ন অসাধারণ পুরুষ। শিরস্ত্রাণ ওদের পগ্গের মধ্যে মা লক্ষীকে বন্দিনী করে রেখেছিলেন বলত সবাই। কিন্তু তিনিতো কোন কালেই চিরকাল আটকা থাকার মেয়ে নন। একটা ছিদ্রপথ রাখেনই খুলে। মহারাজ রামেশ্বর সিংয়ের অ্যামবিশান বা উচ্চাভিলাস ছিল জয়পুর-যোধপুর আদি নেটিভ এষ্টেটের মর্যাদালাভ।এজন্য ভাইসরয় থেকে আঞ্চলিক গবর্নর পর্যন্ত কতজনকে তোয়াজ করতে কত অর্থ সম্পত্তি যে বেরিয়ে গেছে- পার্টি দিতে, ভেট দিতে, যার মধ্যে অন্তঃপূরবাসিনীদের মনিমুক্তার দামি দামি কন্ঠহারও ছিল-তার হিসাব হয় না। সে কাহিনির শেষও নেই, সুতরাং রাজনগরের কথায় ফিরে আসা যাক।

নেটিভ প্রিন্স হলে দ্বারভাঙ্গার মতো একটা জেলা শহরে প্রভিন্সিয়াল গবর্নমেন্টের আওতায় বসবাস করার কোন মানে হয় না। তাই নিজের আসল রাজধানী, রাজনগর , নিজের এষ্টেটের মাঝখানে। রাজনগর- নামটা অবশ্য আগে থাকতেই ছিল, একটা চাকলা, বা জমিদারির তহশীল হিসাবে।

তখনকার টাকার মুল্যে প্রায় দুকোটি টাকা খরচ করে শহরের পত্তন হয়। মহারাজ কখনও থাকেন দ্বারভাঙ্গায়, কখনও কখনও সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে এখানে উঠে যান। বেশি দুর নয়, রেলে তিনটে ষ্টেশন; ত্রিশ বত্রিশ মাইল উত্তর-পূর্বে।

দেখা হয়নি, ওইটেই আগে দেখে আসতে হবে।

কিন্তু উঠবো কোথায়? একেবারেই নতুন জায়গা। মেজভাই দীনেশের শরণাপন্ন হলাম। সবার মতো আমিও মেজদা বলতাম। বললাম-এই এক ব্যাপার, উঠি কোথায় বুঝতে পারছি না। এক কথাতেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।
বললেন, তোমরা গিয়ে বিশ্বাস মশায়ের বাসায় ওঠো।

একটা চিঠি দিবেন?
দরকার হবে না। বাবার নাম করে বলবে, তার কাছ থেকে আসছি। উনি বাবার আন্ডারে কাজ করতেন। আর বীরু তো রইলোই সঙ্গে। চাকলার নামও করেছিলেন। এখন মনে পড়ছে না।
সিগারেট প্রায় থাকতোই হাতে। একটা টোকা মেরে বললেন, ওর নিজের প্রথায় একটু হেসে , তা বলে তুমি যেন বোকার মতন আন্ডারে কাজ করার কথাটা বলে ফেল না-ওঁর প্যালেটেবল নাও হতে পারে। ইংরাজিটা ভাল জানতেন। প্রায় বেরিয়ে পড়তো মুখ দিয়ে। একটু অর্থপূর্ণ হাসিও দেখা দিতো ঠোঁটে।

তা কখনও বলি? একটু কৃতজ্ঞ হাসি হাসলাম আমি।

পরদিন একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে দুজনের জামা কাপড় আর টুকিটাকি ভরে সকালেই বেরিয়ে পড়ে প্রায় সাড়ে আটটার সময় রাজনগর ষ্টেশনে নামলাম। শহর লাগোয়াই, জিজ্ঞেস করে করে অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে গলাম বাসায়। ষ্টেশনের একটু পরেই কমলা নদী। পাকা পুল আছে।
বিশ্বাস মশাই অফিসের পোষাকেই বেরুচ্ছিলেন। বারান্দা থেকেই প্রশ্ন করলেন, কে? কোথা থেকে আসছো?
বেস সুপুরুষ। টানা-টানা চোখ, প্রশান্ত দৃষ্টি। আমি বললাম, দ্বারভাঙ্গা থেকে আসছি আমরা। প্যালেস দেখবার জন্য। শ্যামবাবু বললেন-আপনাকে বলতেই হবে-তিনি. .
মেজদার কথা মনে পড়ে যেতে থেমে গেলাম।

কে শ্যামবাবু? একটু চোখ তুলে মনে করে নিয়ে বললেন, ও মনে পড়েছে- আমার সেরেস্তায় কিছুদিন হেড ক্লার্ক ছিলেন। . .প্যালেস দেখতে এসেছো, তা দেখবে।. .

ভেতর থেকে একটি কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে এসে দাড়ালো। ওই রকমই মুখের আদল। এষ্টেটের পালকি গাড়ী অপেক্ষাই করছিল। আমাদের একটু পরিচয়, আসার উদ্দেশ্য দু কথায় বলে উনি চলে গেলে সেই ছেলেটি যার নাম রণেন এগিয়ে এসে বললেন আসুন, উঠে আসুন, বাঁচালেন মশাই। মাসখানেক ধরে এসে বসে আছি, একটা বাঙ্গালীর মুখ চোখে পড়লো না। রাজধানী অথচ বাঙ্গালী নেই, ভাবতে পারেন? আসুন ভেতরে আসুন।
চেয়ার সোফা দেয়া বৈঠকখানাতে গিয়ে বসলাম আমরা। বেশ আলাপি একটা ছোকরা। চাকরকে ডেকে চায়ের কথা বলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেশ জমিয়েও তুললেন।

বুঝেছি, আর বলতে হবে না। দড়ি ছেড়া বলদ. . আর বলতে হবে না. . . ফ্রিডম নেওয়ার জন্য মাপ করবেন। আমারও ওই দশা, অবস্থাটা বুঝি..বিএর টেষ্ট দিয়ে -ওই যেমন বললাম ভাবছি দড়ি ছেঁড়া দামড়ার মতোন কার বাগানে গিয়ে ঢুঁকি. . মনে হলো বাবা বদলী হয়ে এসে রয়েছেন-দিন কতক কাটিয়ে

আসি , অন্তরাত্মা ঠান্ডা হবেন ...ওমা, এ চর্ব্যচুষ্যের চেয়ে হোটেলের পাচক ঠাকুর মিশিরজির নেনুয়ার ঘ্যাট আর দোতলা অড়হরের ডাল ঢের ভালো... একটা কথা কইবার লোক নেই।. .
খুব আমুদে, রসিক।
এরই মধ্যে আমাদের দুজনের চা-জলখাবার সারাও হয়ে গেল। আলাপ প্রায় একতরফাই। এক-একজন লোক থাকে, যখন ঠিক হাসছে না, তখনও চোখে যেন হাসি লেগে থাকে; সেইভাবে বলে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে কোন একটা কথায় তিনজনের মুখেই হাসি ছলকে উঠছে। আমরা অনভিজ্ঞ, বাইরে এই প্রথম বেরুনো, উনি বয়সে-বিদ্যেও বেশ খানিকটা এগিয়ে; কোথা দিয়ে সময়টা যে কেটে গেল, যেন বোঝাই গেল না।

কর্তার অফিসের জন্য রান্নার পাট বোধ হয় ওঁদের সকাল সকাল সেরে নিতে হয়। আমাদের হঠাৎ এসে পড়ার জন্য কিছু অতিরিক্ত আয়োজন হয়ে থাকবে। দেয়াল ঘড়িতে তখন এগারটা, চাকর এসে জানাল-ভেতরে আহারের জায়গা হয়েছে।

এসব অঞ্চলে, বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত পরিবারে সে সময় পর্দার খুব কড়াকড়ি। আমাদের জন্য নয়, তবে অফিসের কোন লোকতো এসে পড়তে পারে। সেই অভ্যাসেই রণেনের মা এতক্ষন বাইরে এসে আমাদের খোঁজ নেয়নি। খাবার সময় এসে একটা চেয়ারে বসলেন।
বয়সও হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে। সুন্দরী; রণেন ওর রংটা ওঁর কাছেই পেয়েছে। স্বল্প এবং মৃদুভাষিনী। রণেন এটাও যে ওঁর কাছ থেকে পাননি, এটা বেশ বোঝা যায়। কথার মধ্যে সংসারভার-নির্জিতা বাঙ্গালী গৃহিণীর-বিশেষ নির্জিতা না হলেও যে একটা ক্লান্ত অনুক্ষেপের ভাব থাকে, অপরিচিত, বা স্বল্প পরিচিতের কানে তুলে দেবার যে একটা প্রবণতা- সেটা বেশ আছেই, পাচক ঠাকুর থাকে না-ওদের মতোন করে অখাদ্য রাঁধতে দাও তো তুমি খুব ভাল মনিব-পছন্দ না হয়, শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে চাও, তাহলে অন্য লোক দ্যাখো।. .কেমন রেধেঁছে বাবা?

ন’দা বাইরে গেলে একটু লাজুক।

দুঃখের কথায় মানুষকে যেমন কাছাকাছি এনে ফেলে আর কিছুতে তেমন পারে না। কেমন যেন একটা আত্নীয়তা বোধ করে। কতকটা ওঁর সুরটা বজায় রাখার জন্য বললাম, ঠিক করেই এনেছেন আপনি, তবে ডালে নুন কম দিয়ে বসেছে মনে হয়। না ন’দা?

ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মনে হল নিজের কথার সার্থকতায় খুশিও হয়ে উঠেছেন একটু। চকিত হয়ে উঠে বলছেন, দেখেছ? করবেই একটা না একটা ভুল; আমি জানি।

এবার যা করলেন সেটা ওর দিক দিয়েও যেন সদ্য আত্নীয়ভাবের জন্যেই। ঠাকুরকে একটা ডাক দিয়েই, তখনই সামলে নিয়ে বলে উঠলেন, না তুমি থাক। . . . রমলা তুই একটু নুন নিয়ে আয়তো মা শিগগির।

আমি আর একটু মুক্ত-জিহ্বা হয়ে উঠলাম। বললাম, তাহলে আর একটু মাছের কোর্মাটা আনতে বলে দিন।
রণেনও মাঝে মাঝে দখল নিয়ে যাচ্ছিলেন, বললেন, বাঃ ভাল হয়েছে তো বন্ধুর কথাও বলে দিন, উনি তো হেট করেই রয়েছেন।
একটি মেয়ে বা হাতে নুনের টিপ আর ডান হাতে একটা ডিবেয় চারটে মাছের দাগা দিয়ে গেল। ওই বাপ-মার মেয়ে, ওই ভায়ের বোন, খুবই সুন্দরী।
বাতাসটা যেন একটু স্তব্দ হয়ে গেল।
গৃহিণী একটু সময় নিলেন, তারপর আবার সেই সংসারভার-নির্জিতা বাঙ্গালী গৃহিণী।
বললেন ক্লন্ত এবং মৃদু কন্ঠেই, দেখলে তো? একটিকে পার করেছি-এটি এখনও ঘাড়ে রয়েছেন-বলে রেখেছি চারদিকে, কিন্তু লাগছে কই কোথাও? এখানে এসে খোঁজ খবর নেয়া আরও মুসকিল হয়েছ-বাঙ্গালী ছেলেই বা কোথায়? তোমাদের দ্বারভাঙ্গায় শুনেছি অনেক বাঙ্গালীর বাস-তেমন ভাল ছেলে যদি থাকে-মেয়ে তো দেখেই যাচ্ছ তোমরা বাবা- রণুকেও বলি-তা একটু চড় আছে এদিকে?
আহার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই আলোচনাই চলল। বেরিয়ে এসে আঁচাচ্ছি, রণেন চাপা গলায় হাসতে হাসতে বললো, 'আর রণু বেচারি যে দুটো পাশ দিয়ে তিনটে দিতে চলেছে, তার কথা ভাবছে কে? সে নিজের ভাবনা ভাববে, না বোনের ভাবনা ভাববে?--বলুন তো?. . . আছে আপনাদের দ্বারভাঙ্গায় তেমন?'
আমাদেরও হাসির মধ্যে টেনে নিয়েছেন।
তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে শুরু করেছি, 'আগে ঘটক বিদায়ের কথা. . . '

অফিসের পিয়ন এসে রণেনের হাতে একটা চিঠি দিল। পড়ে, প্রথমে একটু গম্ভীরই হয়ে গিয়ে তখনই আবার হাসি হাসি মুখ করে বললেন, 'আমার পক্ষে তো ভালই হলো। . . এই দেখুন।' হাত বাড়িয়ে চিঠিটা আমার হাতে দিলেন।

লেখা আছে-মহারাজের আজ যাবার কথা ছিল কিন্তু গেলেন না। প্যালেস দেখা হবে না।
ওঁর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে একটু চেয়ে থেকে প্রশ্ন করলাম, 'কবে যাবেন তা হলে?'

'তা কি খোদ মহারাজাই জানেন? তা হলে আর মহারাজ কিসের?' একটু হাসবারই চেষ্টা। আমায় বিহ্বলভাবে মুখের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে আবার গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, 'অত ভাববার কি আছে? . . এ পিয়ন ফিরে যেতে না যেতে এখনই হয়তো অন্য পিয়ন এসে অন্য চিঠি দেবে। রাজার মতও উল্টে গেছে, ঘন্টা খানেকের মধ্যেই বেরিয়ে যাবেন।'

এবার আমার মুখে একটু হাসি দেখা দিয়ে থাকে, বললেন, ' মিথ্যে বলছি? অন্তঃপুরে রানি বলেও একজন আছেন. . .তিনি আবার দ্বিতীয় পক্ষের; শোনা যায় মন মেজাজে কৈকেয়ীর সহোদরা, আবদার ধরলেই হলো. . . ।'

বলবার ভঙ্গিতে হাসিটা আমার একটু স্পষ্ট হয়ে এসেছে। কী একটা বলতে যাব, উনিই গম্ভীর হয়ে বললেন, 'না না, মস্করা থাক। দুটো দিন না হয় থেকেই গেলেন? এই পান্ডব বর্জিত দেশে পড়ে রয়েছি. . .'

উৎসাহের মুখেই বাধা, তায় অনিশ্চিতই, রাজার খেয়ালের ওপর-আমি টেনে বললাম, 'আশা নিয়ে বেকার বসে থাকা. . .'
কথা পড়বার জো নেই, লুফে নিয়ে ভ্রু কপালে তুলে বললেন, 'বেকার !. . কিন্তু বেকার আপনাকে থাকতে দিচ্ছে কে? এতো কাজ পড়ে আছে চারদিকে যে!'

একটু বিস্মিতভাবে চারদিকে নজর ফেরাতে যাব, বললেন -'এতো কাছে চারদিকে নয়-দ্বারভাঙ্গা, মজঃফরপুর, পাটনা, মোতিহারি-যেখানে যেখানে ভাল মেয়ে জানা আছে-বসে বসে চিঠি ঝারতে থাকুন না-এই রকম পাত্র-রুপে কার্তিক, গুণে. '

আর গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারলেন না। হেসে আবার কি বলতে যাবেন- ন’দা সমস্যাটা মিটিয়ে দিল। এতক্ষন চুপ থেকেই মনে মনে কি যেন ভাবছিল, একটু দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠে বলল, 'একটা কাজ করলে কিরকম হয়? দুটো দিন পাটিয়ারি থেকে যদি ঘুরে আসি?'

পাটিয়ারি জায়গাটা কোথায় জিজ্ঞেস করতে পরিচয় যা দিল তা বেশ লোভনীয়ই, বিশেষ করে ভ্রমনের মুডে বাধা পেয়ে যখন দোটানায় পড়ে গেছি। পাটিয়ারি এখান থেকে মাইল সাতেক দুরে একটি গ্রাম। উত্তর - পশ্চিমে অর্থাৎ হিমালয়ের তরাইয়ের আরও খানিকটা কাছাকাছি। একেবারে গ্রামের মধ্যে নয়, মাইল খানেক আরও উত্তরে ওদের পঞাশ ষাট বিঘা জি আছে। নীল চাষ হতো। ওর বাবা যখন রাজের তহশীলদার তখন সাহেবের বাংলোসুদ্ধু বেনামিতে কিনে নেয়। ওর সেজদাদা ধীরেশ সেখান থেকে দেখাশুনা করেন।

'একাই ?' আমি প্রশ্ন করতে একটু হেসে বলল, 'একা ছাড়া দোকা কোথায় পাবেন? তুমি তো জানই মেঝদারই এখনও বিয়ে হয় নি. . . তবে একাতেই ফুরসত নেই-শিকার, আরও মাইলখানেক উত্তরে গিয়ে কমলা নদীর ওপারে বিরাট জঙ্গল-হরিণ, বুনোশুয়ার. . না পাখি নেই তবে চিতল মাঝে মাঝে দেখা যায়- আর নদীতে কুমির- সে কুমিরেরঘটা বলে বোঝানো যাবে না।'

কথাগুলো যেন কি করে আটকে দিল ন দার বুকে-বলতে বলতে, ওদের ভাইদের যে স্বভাব, - মুখর হয়ে উঠলো। শুনতে শুনতে রণেনের মুখের ভাবভঙ্গী বদলে গেছে-উৎসাহের সঙ্গে বলল, 'এতো কাছে এমন জায়গা আছে, জানতাম না তো! আর , শিকার? আমার ভয়ানক শখ. . . বাবার বন্দুকও রয়েছে। তাহলে বাবাকে বলে কালই একটা রাজের টমটমের ব্যবস্থা করি?'
টমটম? কালই? নদার সুরটা হঠাৎ একটু যেন নেমে গেল।
ন’দা বলেই একটু খটকা লাগায় আমি বললাম, আমরা না হয় ঘুরেই আসি। ওদিকেও বলে কয়ে আসতে পারবো।
তা হলে-টমটম?
আবার টমটম? . . . এটুকু তো পথ। এখুনই বেরিয়ে পড়লে-ঘন্টায় দু মাইল। পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।
তুমি কি বলো হে? আমায় প্রশ্ন করলো।

বেশ পরিস্কার মনে হচ্ছে, কোথায় যেন কি একটা থেকে যাচ্ছে। একে এখানেই অনিশ্চিতের মধ্যে পড়েথাকতে মন চাইছে না। টমটমের ফ্যাসাদ তুলতে গেলে আরও অনিশ্চয়তা। আমি বললাম, তা বৈকি , সাতটা মাইল আর কি? গল্প করতে করতে কেটে যাবে। ওই ঠিক। আর দেরি করা নয়। ঘর থেকে ব্যাগটা নিয়ে এসে, তা হলে আসি। বলে ওঁর দিকে চেয়ে, একটু বিদায়ের হাসি হেসে বেরিয়ে পড়লাম। উনি গেট পর্যন্ত এসে বললেন, ফিরে আসছেন কিন্তু নিশ্চয়। আমি বন্দুক পরিস্কার করে রাখি।

তাহলে কোন সাহসে আসবো?
তিনজনই হেসে উঠলাম।
প্যালেস এরিয়ার পরও প্রায় মাইল দুয়েক রাস্তা ভালই, তারপর খারাপ হতে হতে কমলার একটা সুঁতির সামনে এত জঘন্য হয়ে পড়েছে যে , দুজনের মুখ শুকিয়ে গেল।সুঁতিটা শুকনো। একটা আম বাগানের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু গাছ শুইয়ে দিয়ে ওদিকটা বেশ দেখা যায় না। গরুরগাড়ীর চাকার দাগ দেখে দেখে আমরা বাগানটা পেরিয়ে গিয়ে যা দেখলাম তাতে বুক পর্যন্ত শুকিয়ে গেল।

প্রায় দুই-তিন মাইল পর্যন্ত যতটা দেখা যায়, এই রকম রাস্তা। এই রকম ভাঙ্গাচোরা, উঁচু নীচু, যতটা আন্দাজ করা যায় শেষ পর্যন্ত। একটু আধটু যে কথা চলছিল আমাদের, সুঁতি পেরুতে বাগানের পর শেষ হয়ে গেছে। দাড়িয়েও পড়েছি, ন’দা একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়েছে। কতকটা মুখ রক্ষার জন্যই বলল এই জন্যই আমি টমটমের কথা বলতে বারণ করেছিলাম। ঠিক করিনি?

তুমি জানতে? প্রশ্ন করলাম, যেটা সভাবতই এসে পড়ল মুখে। অপ্রতিভই হয়ে পড়েছে, ইচ্ছা ছিল না ঠোকবার।

বলল কী করে জানব বল ভাই? সেই কবে-বাবা যখন কিনলেন নিলেমে, একবার দেখতে এসেছিলেম সবাইয়ের সঙ্গে। তখন আমার বয়স কতই বা? নতু জন্মায় নি, পাতু বছর চারেকের। মনে পড়ে, তুমি বলো?

খুবই অপ্রতিভ হয়ে পড়েছে। একটার পর একটা অদ্ভুত যুক্তিবিন্যাস দেখে , আমার যা স্বভাব-একটা হাসি গুড়গুড়িয়ে উঠে মনটাকে তরল করে আনল। আর একটা দিকে চলে গেছে মনটা। সেই কথা তোমায় বলি এবার-যে ধরণের বেড়ানোকে আনন্দ বলা যায় না-তাতেও যে আনন্দ পেয়েছি আমি-যার কথা আমার লেখাতে কিছু কিছু পেয়ে গেছ-তার কারন পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকুল, অভিনব হলে তো কথাই নেই-অবিশেষ বা প্রতিকুল হলেও একটা বিস্ময়, আনন্দ তাকে অভিনব করে তুলে আমায় চালিয়ে নিয়ে যায়। মাথার উপর নিঃসীম, নীলাকাশ, দু ধারে কমলার পলি-ফেলা স্রোতে গাঢ় সবুজ ফাল্গুন-চৈত্রের ফসল-সামনের উঁচু নীচু রাস্তাটা সব গ্লানি ভুলিয়ে যেন সামনের দিকেই টানছে আরও।

অন্য মনস্ক হয়ে পড়েছি, ন’দার প্রশ্নে চটক ভাঙল।
তাহলে কি করবে? ফিরেই যাবে?
বললাম, ফিরে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
বলল, তা তো হবেই না। . . . অত বারফাটকা দেখিয়ে বেরিয়ে এসে। বলো?

মুখে হাসিও ফুটলো এতোক্ষণে।
চলেছি দুজনে। মন তাজা হয়ে সেই পথই রাজপথ হয়ে উঠেছে। আমার অন্যমনস্কতা ভেদ করে মাঝে মাঝে ন'দার কথা এসে পড়ছে কানে। আর সব চাপা দিয়ে কমলার ওপর এবার সব দোষ চাপাবর পালা, তার জন্যই . . . 'এই এক নদী কোন বছর কোনদিকে যে ভাঙবে, কোনদিকে গড়াবে. . . '

কমলার আর একটা সুঁতির ধারে এসে পড়েছি। কালো পলিমাটির ক্ষেতে খেসারি আর মটরের গাছগুলো লকলক করছে। ছেলে বেলায় পান্ডুতে থাকতে আমাদের বাল্য-রসনার প্রিয় খাদ্য। ন'দার বাক্যস্রোত চলছেই, 'মহারাজার কি যে দুর্মতি হলো. . . এমন জায়গায়. . জেনেশুনে রাজধানীটা. . . '

বললাম, ' উনি থাকুননা ওঁর দুর্মতি-সুমতি নিয়ে। একটা জিনিস খাবে? ছেলেবেলায় পান্ডুতে থাকতে খেতাম আমরা। একবার দেখলে হত এখন কী রকম লাগে?'
'কী? তুমি আবার কী আবিষ্কার করলে এই তেপান্তর মাঠের মধ্যে?'
বললাম, 'দাড়াও নিয়ে আসি । খেয়ে দেখো।'
নেমে গিয়ে কচি কচি ফলের সঙ্গে বেশ একমুঠো ডগা তুলে নিয়ে এসে , বেশিটা নিজে রেখে গোটা কতক ওর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, 'দ্যাখো খেয়ে, দেহাতি মেওয়া।'

একটা দলা পাকিয়ে নিজের মুখে ফেলে দিলাম। ন'দা কী ভেবে একটু শুকে নিয়ে আমারই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বার দুই চিবিয়ে নিয়ে চোখ দুটো বড়বড় করে বলে উঠলো- 'চমৎকার হে! আর ফুল অফ ভিটামিন-আজকাল যা নতুন ধুঁয়ো উঠেছে!. . তুনি সবটা খেও না।'
জানিনা মন থেক, নাকি আমার মন রাখা। আরও খানিকটা ওর হাতে দিয়ে বললাম, 'দাড়াও, আরও একমুঠো তুলে আনি তাহলে।'
একটা কথা বলা হয়নি তোমায়। এই রাস্তা-ভাঙ্গাচোরা, উঁচুনীচু, বালি, পাঁক, মাঝে ক’ জায়গায় পুকুর করে দিয়ে গেছে কমলা, ঘুরে আসতে হল-ফলে, পাঁচটার মধ্যে বাসায় পৌঁছানো দুরে থাক এখানেই প্রায় সন্ধা হয়ে এলো আমাদের। ক্লান্তও হয়ে পড়েছি। পরিবেশের সঙ্গে ন’দার ভিটামিন মিলে মনের সহনশক্তিটা বাড়িয়ে দিলেও পা দু টোর সহনশক্তি আর নেই বললেই হয়।
ন'দাকে অবশ্য সে কথা বলা যায় না। ওর মনও একভাবে সাড়া দিয়ে নাও থাকতে পারে। সবল ব্যায়াম করা শরীর, মনের স্ফুর্তিও এসে গেছে, ওর পা দুটো চঞ্চল হয়ে ওঠারই কথা। তবুও নেমে গিয়ে আবারও একমুঠো ভিটামিন তুলে এনে , এবারে ওকে খানিকটা বেশি করে দিয়ে বললাম, 'এগুলো একটু এখানে শেষ করে নিলে কেমন হয়? বেশ জায়গা নয়?'
বলল, 'আমরা আদ্দেকের বেশি এসে গেছি মনে হয়। এটুকুর জন্যে আবার বসবে?'
বললাম,' শুক্লপক্ষ, ক্ষতি কী?'
বলল, 'বেশ তাহলে একটু তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া যাক বসে। খিদেও পেয়েছে।'
এখানে নদীর পাড়টা একটু উঁচু। সুঁতিটা আগের গুলোর চেয়ে একটু চওড়া। জলের ধারা ছেড়ে ছেড়ে গোটা পাঁচ-ছয়। অগভীরই, তবে মাঝখানেরটায় মনে হয় কোথাও কোথাও হাঁটু পর্যন্ত জল আছে। বসে পড়ে টাটকা শস্যের শীষ দুটো-একটা করে টেনে আস্তে আস্তে চিবুচ্ছি। ন’দা-ও। ওর গুলো ফুরিয়ে গেলে বলল, এবার না হয় উঠবে? তখনই আবার কী ভেবে বলল, তা হলে না হয় তোমার থেকে আরও গোটাকতক দাও। একটু নুন থাকলে চমৎকার হতো হে।
নিঃশব্দে একটা ছোট গুচ্ছ ওর হাতে তুলে দিলাম। আমাদের নীরব চর্বিত-চর্বণের মাঝেই সর্যাস্ত হয়ে সন্ধা একটু গাঢ় হয়ে এলো। দু দিন আগে পূর্ণিমা গেছে, চাদ উঠতে একটু দেরি হবে। আকাশে দুরে দুরে গোটাকতক নক্ষত্র উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আমারগুলোও শেষ হয়ে গেলে ন’দা, এবার. . . বলে আরম্ভ করতে আমিই উঠে পড়তে পড়তে পুরণ করে দিয়ে বললাম, হাঁ, এবার উঠতে হয়। ঘাসেই পেট ভরিয়ে ফেললাম, সেজদা আবার কী বলবেন; একটু হাসলাম!

ন'দা যে কি একটু ভেবে উত্তর করল, 'সেখানেই বা কী জোটে দ্যাখ। বিনা নোটীশে গিয়ে পড়া তো,. . . আচমকা।'

এই কাহিনীর গোড়াতেই তোমায় আমি বলছি আমি বরাবরই একটু নস্টালজিক, অর্থাৎ স্মৃতিবিলাসী; আজকাল বয়সের সঙ্গে নতুন কিছু সঞ্চয়ের শক্তি-সুযোগ দু-ই কমে এসে যেন আরও বেশি করেই হয়ে পড়েছি। স্মৃতিগুলো কখনও কখনও অলস মুহূর্তে উত্তর-জীবনে অনুরূপ যা কিছু আহরণ হয়েছে---উপন্যাস-কাব্য-অলঙ্কারে—তার সঙ্গে মিশে গিয়ে কল্পনায় আরও মোহনীয় হয়ে ফুটে ওঠে।

সেদিন নিথর সন্ধ্যায় সেই নদীতীর। মনে হয় উদ্দাম বর্ষার শেষে কমলা যেন কাব্যের এক ক্লহান্তরিতা নায়িকা, দয়িত-বিরহের পর ক্লান্ত, বিষণ্ণ, কিছু অনুতপ্ত, উপবাস-ক্লিষ্ট তনু বালুশয্যায় গা ঢেলে দিয়ে আছে পড়ে। সেদিন সুঁতির জলে তারার যে প্রতিবিম্বটি খণ্ডিত বীচিভঙ্গে চিকচিক করছিল—মনে হয় সে কমলার আলুলায়িত কেশের ফাঁকে তার কর্ণভূষণের হীরকখণ্ডটি।



এবার নদীতীরের কাব্য সেখানেই রেখে পথে ওঠা যাক। পথে লোক চলাচল বরাবর কিছু কিছু আছেই। আমরা নেমে সুঁতির যখন মাঝামাঝি, দুটি লোকের সঙ্গে দেখা, ওদিক থেকেই আসছে। একজনের কাঁধে একটি বছর চার-পাঁচেকের ছেলে, রংচঙে একটা ধুতি পরা। তেল চুকচুকে কালো রঙ আর হলদে কাপড়ের ওপর দৃষ্টি না-আটকে গিয়েই পারে না। প্রশ্ন করলাম, ‘পাটিয়ারি আর কতটা দূর হবে ভাইয়া?’

দাঁড়িয়ে পরে একজন ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘পাটিয়ারি? আপনারা এসেই গেছেন। এই গাছিটুকু পেরলেই পাটিয়ারি।’

‘গাছি’ হচ্ছে এখানকার ভাষায় আমবাগান। নদীর তীর থেকেই আরম্ভ হয়েছে। নিতান্ত ‘টুকু’ নয়। প্রায় পো’টাক পথ হাল্কা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পেরিয়েও গ্রামের চিহ্ন একটু-আধটু যা চোখে পড়ল, তাও মনে হল অন্তত আধ মেইল হবে। আবার পথশ্রান্তি! আমার মুখ দিয়ে আপনিই বেরিয়ে গেল, ‘দেখেছ! মিছিমিছি ঠকাবার কি স্বার্থ ছিল ওর?’

ন’দা বলল, ‘ঠকায়নি। আমি কিছু জনি তো। বাবা যখন চাকরিতে...মাঝে মাঝে যেতাম তো। ...ওদের কোশ হল ডালভাঙ্গা কোশ—একটা গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে চলতে থাকলে শুরু করলে যখন পাতাগুলো শুকিয়ে আসে তখন এক কোশ পূর্ব হয়।’

ক্লান্তিটা কেটে গিয়ে দু’জনেই বেশ হাল্কা মেজাজে এসে পড়েছি। ন’দার কথায় আমিও একটু হেসে বললাম, ‘তাহলে শোন, সেদিন কি কথায় মা আমাদের আধবুড়ি ঝি-টিকে বয়সের কথা জিজ্ঞেস করতে বলল, ‘ঠাকুরমারা যেবার দলের সঙ্গে গঙ্গাসাগরে চান করতে যাওয়ার সব ঠিক করে আর যাওয়া হল না—আমি কোথা থেকে দশ মাসে জন্মাব, হঠাৎ আট মাসে হয়ে পড়লাম কিনা। নাও, উলটে তোমার ঘাড়ে হিসেবের চাপ।’

দু’জনেই একটু হেসে উঠলাম।

ন’দা বলল, ‘তা যদি বললে তো কোনও হিসেবের বখেরা না করে হেসে খেলে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলেই ভাল। এই দ্যাখো না—সাত-আট মাইল মনে করে আমরা তো প্রায় মাইল দশেক মেরে দিলাম।’

‘ন’দা! তোমার পেটে এই ছিল?’ বলে একটু হাসি হাসি চোখে ওর দিকে ঘুরে চাইতে, ন’দা একটু অপ্রতিভ হয়ে ঘুরে আমার কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে বলল—‘নাহে... তা নয়, পাঁচটার জায়গায় যে রাত্তিরই হয়ে গেল... দূর বলেই তো...’

‘নইলে বুড়ির মতন আমাদের এতো বয়স হয়ে যেত না, তাই না!’ আমি হাসতে হাসতে বললাম। হালকা রসিকতায় কখন যে পথটা শেষ হয়ে গেছে, আমরা গ্রামের প্রান্তে এসে পড়লাম। পথটা এখানে দু’ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে গেছে। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়েই পড়েছি, এবার আমাদের পেছন থেকে একজন ভদ্রলোক এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাবেন আপনারা?’

এর পরই, আমরা কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ করে দিলেন—‘ও, বুঝেছি! আপনারা তো বাঙালি দেখছি—আর বলতে হবে না—স্বতঃ প্রণামসু—চ্যাটার্জিবাবুর বাড়ি খুঁজছেন? চ্যাটার্জিবাবুর বাড়ি—বাঁদিকের রাস্তাটা ধরে বরাবর...!

জ্যোৎস্না উঠে গেছে। কিছু দূরে একটা সাদা বাড়ি লি- লি করছে, ‘নমস্কার’ বলে পা বাড়িয়েছি, বাধা দিয়ে বললে, ‘ একটু দাঁড়ান—আর তো এসেই পড়েছেন—তাড়াতাড়ি কিসের?’

ট্যাক থেকে একটা ছোট কতবেলের নস্যের ডিবা বের করে একটি টিপ নাকে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘আপানারা তাহলে বাঙ্গালি!—বাঃ, বেশ হল—কত দিন যে বাঙালির মুখ দেখিনি—এক ওই চ্যাটার্জিবাবু ছাড়া—অতি সজ্জন পুরুষ—তাহলে, আপনারা বাঙালি? কোথা থেকে আসছেন উপস্থিত?... থাক সে কথা এখন—কাল সেসব হবেখন—আমি প্রায়ই তো যাই ওখানে—জিজ্ঞেস করছিলাম—নবদ্বীপের কামাখ্যা তর্কাবাগীশের নাম শুনেছেন? ... দাঁড়ান বলছি...’

ডিবেটা হাতেই রয়েছে। বাঙালির দুর্লভ দর্শন পাওয়ার উল্লাসে বোধ হয় ভাল করে নেওয়া হয়নি। এবার একটু নিচে হয়ে মুখটা উলটো দিকে ঘুরিয়ে বেশ মোটা এক টিপ দু’নাকে গুঁজছেন, একটু ভাল করে দেখার সুযোগ হল। পণ্ডিত মানুষ, মাথায় সুপুষ্ট শিখা, পরণে হলদে রঙের কাপড়, গায়ে হলদে রঙের কাপড়, গায়ে গোলাপি রঙের পাতলা উড়নি ভেদ করে গোলাপি রঙের পৈতা দেখা যাচ্ছে। এবার কৌটাটি আবার ট্যাঁকে গুঁজে দিয়ে হাত ঝেড়ে বললেন, ‘ জিজ্ঞেস করছিলাম, নবদ্বীপের কামাখ্যা তর্কবাগীশকে জানেন?... আপনাদের জানার কথা নয়—অনেকদিন স্বর্গত হয়েছেন (যুক্ত কর কপালে ঠেকিয়ে) আপনারা তখন জন্মাননিও হয়তো। তবে, নাম নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন... তাও শোনেননি? সে কি! দেশ বিখ্যাত নৈয়ায়িক—তখন সারা ভারতবর্ষেও তাঁর জুড়ি নেই!—আমি ছিলাম তাঁর শিষ্য।।.. হ্যাঁ, তাঁর নিজের শিষ্য—সাত বছর ধরে তাঁর পায়ের কাছে বসে ন্যায় অধ্যায় করেছি—একাদিক্রমে সাতটা বছর!—তপস্যাই বলতে পারেন!’

‘শুনে আনন্দ হল। প্রণাম’—অব্যাহতি পাওয়ার জন্য ফাঁক খুঁজছিলামই, ঘুরে পা বাড়াব, এই সময় সামনের দিক থেকে আর একজন পণ্ডিত গোছেরই মানুষ এসে পড়তে উনি ন’দার জামার খুঁটটা ধরে আটকে রেখে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘শোনো শোনো, এঁরা হচ্ছেন বাঙালি—আমার গুরুদেবের কথা জিজ্ঞেস করছিলাম...’

‘তাঁরাই শিষ্য-প্রশিষ্য নাকি?’ উনি আমাদের দিকে চেয়েই প্রশ্ন করলেন, ‘ ন্যায়ের ছাত্র নাকি?’

‘না, আমরা ন্যায়ের ‘ন’-ও জানি না, ইস্কুলে পড়ি, এবার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে একটু বেড়াতে বেরিয়েছি, তা...’ ন’দার কণ্ঠস্বরটি ভীত কাতর হয়ে উঠেছে, যেন ঘাটের কাছে এসে কোনও পাগলের পাল্লায় পড়ে ভরাডুবি হতে চলেছে!

উনি বললেন, ‘ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছেন? বেশ, বেশ। আমার জামাইও মধুবনী থেকে দিলে... কবে রিজাল্ট বেরুবে জানেন?’

একটু আতঙ্কিতই হয়ে পড়েছি। পণ্ডিতজি বললেন, ‘তাহলে আপনারা ওর সঙ্গে কথা কন। আমার আবার শিষ্যবাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো আছে। কাল আমরা টোলের অধ্যাপনা সেরে আসছি চ্যাটার্জিবাবুর বাড়ি। গল্প হবে নবদ্বীপের।’

ন’দা বলল, ‘ তাড়াতাড়ি করতে হবে না আপনার। আমরা আরও সপ্তাহখানেক আছি।‘

‘যান। ওই বাড়ি দেখা যায়।’—একটু হন্তদন্ত হয়ে চলে গেলেন তিনি।

ইনি একটু হেসে বললেন, ‘ বড় বাঙালি ভক্ত ন্যায়চঞ্চু মশাই। আর, হওয়াই উচিত; অত বড় গুরুর শিষ্য! আচ্ছা, আসুন, রাত হয়ে যাচ্ছে।‘

ন’দা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন হে! সব বিপদ কাটিয়ে বাড়ির কাছে এসে...’

বললাম, ‘ন’দা, তেমন কিছু নয় নিশ্চয়ই। শুনেছি—ক্রমাগত নিজের মনে ন্যায়ের সূত্র ভাঁজতে ভাঁজতে ওঁরা একটু মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।’

এবার তোমায় যা বলতে যাচ্ছি তাতে মনে হতে পারে ধান ভানতে বুঝি শিবের গীত এনে ফেললাম। কতকটা অবশ্য তাই। তবে বেশি গলা ভাঁজতে না গিয়ে অল্প কথাতেই শেষ করব।

বলছিলাম, আমাদের ভারতীয় সংবিধান ভালোয়-মন্দয় যাই হোক, (ক’বার তো কাটাকাটিই হয়ে গেল), বহুবিবাহটা বন্ধ করে একটা কাজের মতো কাজ করেছে, মেয়েদের মুখ চেয়ে। আর নিশ্চয় দেহপণ্যের বৃত্তি বন্ধে।

বহুবিবাহের কথা।

কৌলিন্য প্রথা, যাতে একটা আকাট মূর্খ শুধু কুলের দাবিতে গণ্ডার পর গণ্ডা বিবাহ করে শ্বশুরের অন্নেই বছর কাটিয়ে দিতে পারত—সে পাপ বোধ হয় একেবারেই গেছে নিজের ভারে নিচে চাপা পড়ে, আমাদের দেখতে হয়নি। কিন্তু তেমন গুরুতর কিছু প্রয়োজন না ঘটলেও, এক পত্নী বর্তমানে, বা অবর্তমানেও অন্য একটি গ্রহণ—বা দুটি বা ততোধিক—এর কুফল আমি আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অনেক প্রত্যক্ষ করেছি। বিশেষ করে যদি কিছু সন্তান-সন্ততি দিয়ে যান। এতে পত্নী-ভারাক্রান্ত (পত্নী অভ্যাসগ্রস্ত বলব)—দিকভ্রান্ত হয়ে কিম্ভুতকিমাকার হয়ে পড়েন—কার কী হল, কে কোথায় আছে, তার হিসেব রাখতে পারেন কি? ফলে সংসারটি ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। শ্রীহীন, কারুর সঙ্গে কারুর যোগ নেই।

জীর্ণ চৌহদ্দি দেয়াল পেরিয়ে আমরা একটা ঘরের মধ্যে গিয়ে উঠলাম। ঘরটা বড়ই, কিন্তু প্রায় অন্ধকারই। অন্তত বাইরের জ্যোৎস্না থেকে এসে প্রথমটা তাই মনে হল। কিন্তু কোনও সাড়া শব্দ নেই। তখুনি চোখ একটু আসতে দেখি, ঘরটার ও-প্রান্তে একটা কালি-পড়া লণ্ঠনের পাশে একটা খাট পাতা। একজন শুয়ে আর একজন মাথার কাছে লোক বসে তার সঙ্গে যেন গল্প করছে। আমরা দু’জনেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। আমি মৃদকণ্ঠে প্রশ্ন করলাম, ‘এই বাড়ি?’

ন’দা সেইভাবেই বলল, ‘মনে তো হচ্ছে। ওঁরাও তো বললেন।‘

ততক্ষণে বোধ হয়, মাথার কাছে যে লোকটা বসে ছিল, সে কিছু বলতে, খাটের লোকটা উঠে পড়ে ঘুরে দেখে বলল, ‘কে?’

দু’জনে এগিয়ে গেলাম। ন’দা বলল, ‘আমরা সেজদা।‘ এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল। আমিও করলাম।

‘হঠাৎ কোথা থেকে আসছিস? একটা চিঠি দিয়ে আসতে হয়...বাড়ির খবর কী? অনেক দিন চিঠি পাইনি...আমরা চিঠি না পেলে, চিঠি দিতে নেই? আমি তো দেখছিস একা...’

ওদের প্রশ্নোত্তরের মধ্যে আমি ঘরটা একনজর দেখে নিলাম। আমার জন্মস্থান পাণ্ডুতে থাকতে নীলকুঠির সাহেবদের বাড়ির একটা আইডিয়া ছিল। প্রকাণ্ড একটা হলের চারিপাশে ছোট বড় মাঝারি আকারের দু’তিনটে ঘর। সবটাই একটা চালের মধ্যে, ঠাণ্ডা রাখবার জন্যে মোটা খড়ের ছাপরের ওপর খাপড়া।

এই মধ্যিখানের হলটার মধ্যে ন’দা সেজদাদা রয়েছেন একেবারে কোণের দিকে একধারে। সেই ক্ষীণ আলোয় এইটুকু মোটামুটি দেখা হয়েছে।

ওঁর যেন হঠাৎ চৈতন্য হল, ‘দ্যাখো তো এভাবে আসে?’ বলেই ‘বাহাদুর!’ বলে হাঁক দিলেন।

একজন নেপালি পাশের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বললেন, ‘ দেখো সুনরাকে দোকানমে কেয়া মিঠাই মিলতা হ্যায়। জলদি লাও।‘

ন’দার কাছে শুনে আসা, কী দেখা—বেরিয়ে পড়ি পথের যত ধকল, তারপর ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য—সব একসঙ্গে মিলে গিয়ে একটা যেন পাষাণ ভারের মতো আমায় চেপে ধরল। চোখের পাতাদুটো খুলে রাখতে পারছি না। আগেই ওঁর আদেশে লোকটা একটা খাটিয়া এনে দিতে আমরা দু’জনে পাশাপাশি বসে পড়েছি—আমার কানে ওঁদের কথাগুলো মৃদু হতে হতে কখন ঢুলে শুয়ে পড়েছি, কখন একটা ছোট বালিশ এনে মাথার নীচে দেওয়া হয়েছে, এসব কিছুই জানি না। ন’দা, ‘ওঠ হে ওঠ’ বলে একটু ঠেলে তুলতে উনি বললেন, ‘দুটি খেয়ে নিয়ে আবার শোবে।।.. খাড়া আট মাইল পথ, অব্যেস নেই—কী ভুল যে করেছ বীরু!’

গলা ভাত, আলুভাতে, শেষে ঘন করে জ্বাল দেওয়া খানিকটা মোষের দুধ। আমার পাতে, তখন-না-খাওয়া, দুটো করে লাড্ডু আর শুকনো পান্তুয়া, এখানে বলে গুলজামুন।

যে লোকটা পরিবেশন করল তিনজনকে, সেই রেঁধেছে। নেপালিটা সতরঞ্জির ওপর একটা কাঁথা পেতে দুটো বালিশ দিয়ে রেখেছিল। আমি আঁচাবার পরেই শুয়ে পড়লাম।

একটি ঘুমেই রাত কাবার বয়ে গেছে। শেষের দিকে কি একটা এলোমেলো স্বপ্ন দেখে যখন ঘুম ভাঙল, তখনও পাতলা কুয়াশার সঙ্গে একটু অন্ধকার লেগে রয়েছে। ওঁরা দু’জনে অকাতরে ঘুমুচ্ছেন। সেজদার আবার নাক ডাকে। কোথায় আছি সম্বিত হতে একটু দেরিই হল। তারপর আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে পড়লাম আমি।

প্রথমেই যে অনুভূতিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার মনে, অভিভূতও করে তুলল, তা এই যে, আমি যেন হঠাৎ কী করে সভ্য জগতের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথায় এসে পড়েছি। ... হলঘরটা রাতের অস্পষ্ট আলোয় যতটা মনে হয়েছিল, তার চেয়ে অনেকখানি বড়। বাইরের দিকের দুটো দেওয়ালে দুটো বড় বড় জানালা, শার্সির। একটার একটা পাল্লা রয়েছে, তবে তার চারটে কাচের তিনটে নেই; একটা আধখানা আটকে আছে। অন্যটাতে একেবারেই কিছু নেই। বাঁশের বাতা দিয়ে বন্ধ করা। ঘরে ঢুকতে একটি দরজা। বেশ ফাঁদালো, উঁচু। মোটা সেগুন কাঠের পাল্লা। তবে একটাই আছে মাত্র। ডানদিকের ফাঁকটা বাঁশের ঢ্যাঁড়া দিয়ে বন্ধ করা। বন্ধ পাল্লাটা খুলে বাইরের বারান্দায় এলাম। টানা বারান্দায় প্রায় অর্ধেকটা ভেঙে পড়ে ঝুলে আছে। একরাশ খড় খাপড়া নিচে পড়ে রয়েছে, সরানো হয়নি।

কুঠিটার চারদিকে চৌহদ্দি দেয়াল দেওয়া। মাঝে মাঝে ভেঙে গিয়ে অল্পই আছে তার। চৌহদ্দির মধ্যে একটা বাগান ছিল কোনও এক সময়। এখন গরু-ছাগলে-খাওয়া গোটাকতক কী ফুলের গাছ এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকেই কেমন যেন একটা দৈন্য-পবহেলা-বিশৃঙ্খলার ভাব। কোথায়, কবে যেন এই ধরনের একটা কিছু দেখেছি—চিত্রে কী বাস্তব অভিজ্ঞতায়—মনে করতে পারছি না। অথচ বিভীষিকার যে দুর্নিবার আকর্ষণ থাকে, তার জন্যে মনটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতেও পারছি না।

‘কে এখানে?’ পেছন থেকে ভারী গলার প্রশ্নটা কানে যেতে চমকে উঠে দেখি—একটা যেন প্রেতমূর্তি; বাঁ-হাতে একটা বন্দুক ঝোলানো, আমার মুখের ওপর চোখ ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। একটা খণ্ড মুহূর্ত। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলেন, ‘ও বিভূতি?’ আমারও বিভ্রমটা সঙ্গে সঙ্গে গেছে কেটে, উত্তর দেব, উনিই আবার প্রশ্ন করলেন—‘উঠে পড়েছ? ঘুম হয়েছিল?’

উত্তর করলাম, ‘এইমাত্র উঠলাম। আপনি এত সকালে? বন্দুক নিয়ে জঙ্গলে শিকারে যাচ্ছেন?’

‘জঙ্গল অনেকদিন কমলা চেটে নিয়েছে। দেখি, এদিকে-ওদিকে যদি দুটো হরিয়াল কি ঘুঘু পাই। যাবে?’

‘না, আপনি যান। আমি ততক্ষণ এদিকে...’

ততক্ষণ কী করব ভেবে বলবার আগে উনি দেওয়ালের ওদিকে শিশুগাছটায় একটা কিছু দেখে একটু তাড়াতাড়িই নেমে এগিয়ে গেলেন।

আমি সেইরকম নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। স্মৃতির দ্বারে টোকা দিয়ে দিয়ে যেটা খুঁজছিলাম সেটা পেয়ে গেছি। একটা চিত্রই, তবে সম্প্রতি আকার গ্রহণ করে বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে স্পষ্টও হয়ে উঠেছে।



তুমি ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুসো বইখানা পড়েছ? একটা কুখ্যাত অ্যাডভেঞ্চার অর্থাৎ রোমাঞ্চ-কাহিনী। ঝড়ে সেকালের পালতোলা জাহাজ-ডুবি হয়ে একা কয়েক বৎসর তাকে একটা নির্জন দ্বীপে কাটাতে হয়। প্রথমাংশে সঙ্গী একটা বন্দুক আর একটি কুকুর।

বইটা আমাদের পাঠ্যপুস্তক ছিল। চিত্রিতই। হঠাৎ ডালপালা-খড়-খড়ি দিয়ে তৈরি শক্ত খুঁটি পুঁতে পুঁতে ঘেরা তার বাসার সামনে বন্দুক-হাতে তার চিত্রটা মনে পড়ে গেল-চামড়ার জামা, তারই প্যান্টুলুন, তারই টুপি।

অবশ্য চিত্রের সঙ্গে যে হুবহু মিল থাকবেই এমন হতে পারে না। তবে ঝলমলে ময়লা জামা, বোতাম আছে কি নেই, ঢিলেঢালা ময়লা কাপড়, মাথায় একমাথা বড় বড় অবিন্যস্ত কেশ, হাতে বন্দুক—চিত্র আর বাস্তব আমার অভিভূত কল্পনার এত কাছাকাছি এসে পড়তে লাগল যে আমি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। তারপর দূরে একটা বন্দুকের আওয়াজ একটু চকিত হয়ে উঠে ভেতরে চলে এলাম।
আমাদের পাটিয়ারির অভিযানের আর বিশেষ কিছু বলার নেই। আর ঘটনাও এমন কিছু নয়। সেই কথাই বলি এবার তোমায়।
সেজদা বেশ অপ্রতিভ হয়ে পড়েছেন। এইরকম পরিস্থিতির মধ্যে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকলে লোকে না হয়েই পারে না। ন’দাও স্বভাবতই। চা আর সুনরার দোকানের শুকনো পান্তুয়া আর লাড্ডু দিয়ে জলযোগ শেষ করছি তিনজনে, নীরবেই, উনি একবার একটু গলা খাকরি দিয়ে বললেন, ‘তাহলে বিভূতি..ইয়ে... কী ঠিক করেছ? সেই জঙ্গলও নেই—কমলা-কুশীর পেটে এখন—বাড়িটাও ঠিক করব বলে এখনও হয়ে ওঠেনি—তবে আমি বলব, যখন পড়েছই এসে, দুটো দিন, কি যে বলে, না হয় থেকেই যেতে...’

এসে আর একদণ্ড মন টিকছে না, তার ওপর সেই গল্পের বেহাইয়ের নৌকো ঠেলে দিয়ে দুটো দিন থেকে যেতে বলার এত কাছাকাছি ওঁর কথাগুলো যে, একটা দিন গায়ের ব্যাথা মেরে নেওয়ার জন্যএ ইচ্ছেটুকুও ছিল, সেটাও পরিহার করে একটু মিনতির স্বরেই বললাম, ‘না সেজদা, মহারাজের খাম-খেয়ালির দশা কেটে গেলে যদি প্যালেসটা দেখে যেতে পারি...কী বলো ন’দা?’

ন’দাও যেন দম বন্ধ করে শুনছিল, বলল, ‘তা বইকি। বাড়িটি হয়ে গেলে আবার এলেই হবে। দেখা তো রইল।।..’

‘তাহলে সেই কথাই থাক।‘—বেশ প্রফুল্লই হয়ে উঠলেন সেজদা। এসেছি পর্যন্ত অবাঞ্ছিত অতিথি সমাগমের যে একটা অপ্রসন্ন ভাব লেগেছিল সেটা দমকা হাওয়ায় মেঘের মধ্যে সরে গিয়ে হঠাৎ রহস্যপ্রবণও হয়ে উঠল, ‘বাড়িতে তোরা নাকি একটা বউদি আনার প্লান করছিস ভেতরে ভেতরে?... বলে দিস সেজদা ও-পাঠ পড়বার নয়। অউর গুলজামুন হ্যায় তো লে আও দোঠো করকে বাহাদুর।।.. তাহলে বলি শোনো বিভূতি। প্যালেস প্যালেস করছ... তার চেয়ে এত কাছে এসেছ তোমরা, জনকপুরে গিয়ে রাম-সীতার মন্দিরটা দেখে এসো না। লোকে দেশবিদেশ থেকে...’

‘জনকপুর!’ আমি একটু চকিত হয়েই চাইলাম তাঁর দিকে। অসাম্ভাব্যতার জন্যে মনে স্থান দিইনি তাঁর কথা। বললাম, ‘সে তো অনেক দূর...আর...’

‘দূর তো আমেরিকাও ছিল, জনকপুরের চেয়েও, অজানা; কলম্বস কি...?’

একটু হাসলেন। বললেন, ‘বীরু বলেনি সে কথা তোমায়? আমি যে সেখানে একটা এস্টেটে ম্যানেজার ছিলাম। একটা চিঠি দিচ্ছি। রাজার হালে থাকবে। যত দিন ইচ্ছা। দেখেশুনে চলে আসবে। কাছে ধনুখা—রামচন্দ্রের যে হরধনু ভঙ্গ করেন সেটা পড়ে আছে।‘

বেশ মুখর হয়ে উঠেছেন। বেশ প্রফুল্ল।

‘তাহলে কিন্তু তোমাদের খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। না, না, আবার হেঁটে? কী বলে যে ওঁরা ছেড়ে দিলেন তোমাদের...’

‘টমটম দিতে চেয়েছিলেন,’ আমি বললাম।

‘তবু ভাল। গরীব দাদা তোমাদের, টমটম কোথায় পাবে? তবে, ট্রে-দেওয়া বলদগাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমার হালের বলদ।।..এখান থেকে সোজা পথ খজৌলি স্টেশন—সেখান থেকে জয়নগর—নেপাল বর্ডার—ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার শেষ স্টেশন—আমার এস্টেটের গোমস্তাকে চিঠি দিচ্ছি, রাত্রের ব্যবস্থা করে রাখবে। ভোরে উঠেই বেরিয়ে পড়লে দিন থাকতে থাকতেই পৌঁছে যাবে জনকপুরে।‘

নেপালি বাহাদুর হরিয়ালের মাংস আর পরোটা যা রেঁধেছিল তার লোভে আর একটা দিন থেকে যেতেই ইচ্ছে করছিল। কিন্তু চা-জলযোগ শেষ করেই উনি আমাদের যাত্রার ব্যবস্থায় এত তৎপর হয়ে উঠলেন যে সে কথা তোলবার অবসরই পাওয়া গেল না।

আমাদের দিক থেকে প্রস্তুত হওয়ার কিছু ছিল না। খেয়ে ওঁর কাছ থেকে চিঠি দু’খানা নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম।

আমাদের আসার যাত্রাটা যেমন সব বিষয়ে প্রতিকূল ছিল, ফিরে যাওয়াটা তেমনি সব বিষয়ে অনুকূল হয়ে উঠল। এতই অনুকূল যে, শেষের দিকে যা একটা প্রতিকূলতা করল, তাও পরিণামে আনুকূল্যে—সবচেয়ে বেশি আনুকূল্যে দাঁড়িয়ে গেল। মোটা তোষকের গদি, তার ওপর কম্বল, সতরঞ্জি আর চাদর পেতে পরিষ্কার বিছানা, দু’জনের জন্যে দুটো তাকিয়া—হরিয়ালের মাংস, পরোটা, গাঢ় দধি আর মিষ্টান্ন দিয়ে পরিতৃপ্ত আহার, প্রথম সুঁতিটা পেরোবার পর গাড়ির দোলা লেগে লেগে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। উঠলাম যখন দেখি আমরা সেই সুঁতিটার ধারে যেখানে আমাদের ‘ভিটামিন’ সেবা শেষ করি। জায়গাটা বড় চমৎকার। শান্ত, নিস্তব্ধ। গাড়ির ছইয়ের ভেতর দিয়ে একটা ঝিরঝিরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। সচল লোকের ঘুমটা বোধ হয় বেশি; ন’দা একটু এপাশ-ওপাশ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। আমি উঠে চুপ করে বসে রইলাম।

অনন্ত নীল আকাশের নিচে দিকলুন্ঠিত হরিৎ-শষ্যের সমারোহ—সেই সবুজ—সমুদ্রকে দোল খাইয়ে একটা বাতাস—চেয়ে চেয়ে কী একটা অনির্বনীয় আনন্দের যেন কূল পাচ্ছি না। পাটিয়ারিতে থাকতে যে গ্লানিটা মনে জমে উঠেছিল, কখন মিলিয়ে গিয়ে একটা করুণা মিশ্রিত শ্রদ্ধার ভাবই ধীরে ধীরে মনটাকে আপ্লুত করে দিচ্ছে—আমরাই কি তাঁকে হঠাৎ আক্রমণ করে বিপর্যস্ত করে তুললাম না? ... আর আসার সময় সেই প্রসন্ন দৃষ্টি—সেটাই তাঁর মূল সত্তার পরিচয় নয় কি?
একটা তেমাথার সামনে এসে গাড়োয়ান জানাল—খজৌলি, কি রাজনগর—বাবু জিজ্ঞেস করে নিতে বলেছেন। প্রশ্নটা একটু অদ্ভুত ঠেকল যেন—তিনিই তো বলে দিয়েছেন জয়নগর যেতে হলে সোজা খজৌলি স্টেশনে যেতে হবে।

ন’দা একটু যেন ধিড়মড়িয়ে উঠে পড়ল। বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিক কথা—জনকপুরে আগে যাওয়াই ঠিক করলে?

বললাম, ‘সেইরকম বলেই তো চিঠি দিলেন। তাই না?’

‘তাহলে চলো। ‘কেমন যেন খাপছাড়া কথা, আর উৎসাহের অভাব। সদ্য ঘুম থেকে ওঠার জন্যও হতে পারে। অতটা খেয়াল না করে আমি আবার দু’দিকের অবারিত মাঠের ওপর মনটাকে ছড়িয়ে দিলাম। ন’দা, আর কিছু না বলে চুপ করে বসে রইল। একটু যেন চিন্তিত।

এ রাস্তাটুকু বেশ ভাল, কমলার কৃপাদৃষ্টি এদিকে কোথাও পড়েনি। রাজনগর বাদ দিলে এ রাস্তাটা জ্যামিতির ত্রিভুজের একটা ভুজ, সুতরাং ছোট। দু’জনে দু’রকম চিন্তা নিয়ে বসে আছি, অর্ধেকেরও বেশিটা চলে এলে ন’দা আবার প্রশ্ন করল, ‘তাহলে জনকপুরে যাওয়াই ঠিক করলে?’

এবার একটু বিরক্তিই বোধ হল। সে ভাবটা মুখে প্রকাশ হতে না দিয়ে, বরং একটু হাসির ভাবই টেনে এনে বললাম—‘তাই ঠিক করেই তো বেরুনো গেল।।..কেন বার বার এ কথা বলছ বলো তো?’

‘বলছি..বলছি’, ন’দাও একটু হাসবার চেষ্টা করল, ‘বলছি...হল গুরুজন, বড় ভাই, তবে সেজদার কথা আমরা আদ্দেক বাদ দিয়ে থাকি।‘

বিরক্তিটা চেপে রাখা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। অন্য কেউ হলে বোধ হয় মুখ থেকে বেরিয়ে যেত, ‘ তোমার কথা পুরোপুরি নিয়েই বা কী ফল হল?’ হেঁইয়ালির মাঝখানে পড়ে একটা জিদও এসে গেছে। মিনতির সঙ্গেই, তবে একটু জোর দিয়েই বললাম, ‘না ন’দা, চলোই; অমন চিঠি দুটো রয়েছে। আর, সবকিছু বাদ দিলেও জনকপুর তো থাকবে। কোথাও উড়ে যাবে না।‘

‘তাহলে চলো’। ন’দা চুপ করে আবার কী ভাবতে লাগল।

সামনে একটা আমবাগান পড়ে ছিল, বেরিয়ে আসতে দেখি আমরা প্রায় এসেই পড়েছি। প্রায় আধ মাইল দূরে পরিষ্কার মাঠের ওদিকে রেলের সিগনাল, নিশ্চয়ই খজৌলি স্টেশনের ডিস্ট্যান্ট সিগনালটা। মনটা যেন লাফিয়ে উঠেছে। গাড়োয়ানকে বললাম—‘জোরসে হাঁকো।‘

বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছি। শেষ বাধা কমলার সেই ধারাটা, সেটা রাজনগর স্টেশনের কাছ দিয়ে বয়ে গেছে। ছেড়ে ছেড়ে অগভীর জল আর ভিজে বালি। জোরে হাঁকিয়ে গাড়ি নেমে পড়ল। গাড়োয়ান গরু দুটোর ল্যাজ মলে মলে এগিয়ে চলেছে। আমার চোখ সিগন্যালের দিকে। যখন প্রায় পেরিয়ে এসেছি আর একটি ছোট জলস্রোত, অগভীর—সিগন্যাল মাথা নিচু করল—অর্থাৎ দূরে গাড়ি ছেড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এদিকে কমলা আমাদের রথনেমী গ্রাস করল। সারথির একক চেষ্টায় কিছু হল না। কুরুক্ষেত্রে যুযুধান কর্ণের অবস্থা। আমরাও নেমে পড়ে যোগ দিলাম। যতই চেষ্টা করি, কমলা ততই যেন গ্রাস করে যায় রথনেমী...। ইঞ্জিনের বাঁশি কানে যেতে আমরা ব্যাগটা নিয়ে দৌঁড়ালাম। ট্রেনটা আমাদের সামনে দিয়েই স্টেশনেই গিয়ে ঢুকল। বেশি নয়, আর শ’চারেক গজ পেরুলেই হয়। কিন্তু বাঁশি বাজিয়ে ছেড়ে দিল গাড়িটা।



দাঁড়াও একটু। লিখতে গিয়েও সেদিনের কথা সব এসে পড়ে যেন হাঁফ ধরে যাচ্ছে।

সমস্ত দিনে মাত্র গোটাদুয়েক গাড়ি আসে যায়। এইটেই ছিল সব শেষ। স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেল এটা জয়নগরে পৌঁছলেই সেখান থেকে রাজনগরের গাড়ি ছেড়ে দেবে। সব মিলিয়ে আর ঘণ্টাখানেক। স্টেশনে পায়চারি করতে করতে বেশ একটু কাঁচুমাচু হয়ে ন’দা বলল, ‘কমলাই আমাদের শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে দিলে গাড়ির চাকা বালির মধ্যে বসিয়ে দিয়ে।’

‘তার মানে?’ চকিত হয়েই প্রশ্ন করলাম আমি।

ন’দা বলল, ‘জয়নগরের গোমস্তাকে সেজদা লিখেছে—জনকপুরে ভাল করে খবর নিয়ে, তবে আমাদের যাত্রার ব্যবস্থা করতে। নেপালে রাজনৈতিক অবস্থা নিত্যই পালটায়, এখন বোধ হয় একটা গোলমালই চলছে।’

‘তাই নাকি? কই, বললেন না তো আমাদের সেকথা সেজদা!’

‘হ্যাঁ, তাই। স্পষ্ট বলা তো অব্যেস নয় ওঁর, বললাম না তখন তোমায়?’



তোমায় এই একটু আগে বললাম না, ফেরার যাত্রাটা আমাদের ভালই হয়েছিল?

বেলা শেষ হয়ে এসেছে, সূর্য অস্তপ্রায়। দূরে, উত্তরে—তা এখান থেকে প্রায় শ’খানেক মেইল দূরে বইকি—পূর্ব থেকে পশ্চিমে যত দূর দৃষ্টি যায়, হিমালয়ের শিখরশ্রেণী সূর্যের শেষ রশ্মী পড়ে ঝলমল করছে, পরিষ্কার আকাশের নিচে রেখায় রেখায় স্পষ্ট। মহিমময়, অপার্থিব, যেন স্বর্গের প্রান্ত থেকে খসে-পড়া! চেয়ে আছি। ভাবছি—সুযাত্রাই বইকি। আর কাল থেকে নিয়ে সবটুকুই বা নয় কিসে? কাল, নদীতীরের সেই সন্ধ্যাটি।।..তারপর পাটিয়ারির অভ্যর্থনা অমন না হলে তো পড়েই থাকার কথা এখনও। আজকের সমস্ত পথটুকুই ছিল মনোরম। সব শেষে কমলার রথনেমী গ্রাস। সে তো অভিশাপ রূপেই আশীর্বাদি, নয়তো (ন’দা যেমন বলল)—সীমান্তের একটা গণ্ডগ্রামে ছয়-সাত দিন আটকেই থাকতে হত অনিশ্চিতের মধ্যে। তারপর জনকপুর-সে আরও অনিশ্চিত! হয়তো বিপদসঙ্কুলই।

এখনও শুভাযাত্রার চরম শুভটুকু নেপথ্যেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।

রেলগাড়ি থেকে নেমে বাসায় পৌঁছতেই রণেনের সঙ্গে দেখা। সামনের ছোট বাগানটিতে ঘোরাফেরা করছিল—আমাদের দেখেই উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, ‘বাঃ! ফিরে এসেছেন!? কাল আপনাদের যাওয়ার ঘণ্টা তিনেক পরেই বাবা এসে উপস্থিত। হঠাৎ কি কাজে সন্ধের আগেই দেউড়ি-সুদ্ধ সবাইকে দ্বারভাঙ্গায় যেতে হবে। ওঁকেও সঙ্গে যেতে হবে। মাত্র একটা দিনের জন্য। তারপরেই বাসন্তী দুর্গা পুজোর ষষ্ঠী। বোধন পড়ে যাচ্ছে, আর এখন দিনদশেক কোথাও নয়। আপনাদের কথা শুনে আপসোস করতে লাগলেন।’

আশা-নিরাশার জোট পাকিয়ে যাচ্ছে। জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে প্রশ্ন করতে যাব, উনি বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ...সেসব বাবা বলে দিয়ে গেছেন। দেউড়ি খালি, আপনারা অন্দরমহল পর্যন্ত ভাল করে সব দেখে নিতে পারবেন। তবে একটি দিনের মধ্যে।‘


সেই একটি দিনই আমার জীবনের অনন্যই হয়ে রয়েছে।
অন্দরমহল, সে তো রাজমহলই। তবে, দুর্গামন্দির—গঙ্গার উত্তরে এদিকে আর কোথাও এমনটি আছে বলে জানা নেই।



লেখক পরিচিত
বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৮৯৪। মিথিলার এক গ্রামে। দ্বারভাঙ্গায় পিতাম্বর মিডল স্কুলে তার শিক্ষা শুরু। ১৯৪২ থেকে পুরো সময়ের জন্য লেখক। প্রায় ছয় শত গল্প লিখেছেন। উপন্যাসের সংখ্যাও ৩০। ১৯৫৮ সালে পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার এবং ১৯৭২ সালে পেয়েছেন রবীন্দ্র পুরস্কার। ১৯৮৭ সালের ৩০ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন