বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

চীনের গল্প: খোলা মাঠ মূলঃ ওয়ান জি অনুবাদঃ ফজল হাসান

লেখক পরিচিতিঃ সমকালীন চীনা সাহিত্যের অন্যতম ছোটগল্প লেখক, কবি এবং অনুবাদক ওয়ান জি ১৯৪৯ সালের ৪ নভেম্বর জিয়ানসু প্রদেশর চাংসুতে জন্মগ্রহণ করেন । ওয়ান জি তার সাহিত্যিক ছদ্মনাম, পোশাকী নাম চেন মাইপিং । তিনি ১৯৭৮ সালে ‘জিনতিয়ান’ (‘টুডে’) ম্যাগাজিন প্রকাশনার মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন  তিনি গল্পকার হিসেবেই অধিক পরিচিত । তার গল্পের মূল বিষয় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানসিক যন্ত্রণা এবং নির্যাতনের করুণ কাহিনী । তিনি ১৯৮৬ সাল থেকে নির্বাসিত এবং ১৯৯০ সাল থেকে সুইডেনের নাগরিক । তিনি ইংরেজি ও সুইডিশ ভাষার নির্বাচিত সাহিত্যকর্ম চীন ভাষায় এবং নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক মো ইয়ানের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সুইডিশ ভাষায় অনুবা করেন । বর্তমানে তিনি সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়নীজ স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপ ।
গল্পসূত্র:খোলা মাঠ’ ওয়ান জির ইংরেজিতে ‘ওপেন গ্রাউন্ড’ গল্পের অনুবাদ । চীনা ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে বনী ম্যাকডুগাল । ইংরেজিতে গল্পটি ১৯৮৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সংখ্যা ‘বুলেটিন অফ কনসার্নড্ এশিয়ান স্কলার’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় । চীনা ভাষায় মূল গল্পটি  প্রকাশিত হয় ‘জিনতিয়ান’ম্যগাজিনে, ১৯৭৯ সালে । এই গল্পটিতে লেখক চীনের সাস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সংঘটিত অন্যতম জঘন্য হত্যাকান্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মানসিক টানাপোড়ের করুণ কাহিনীর মর্মস্পর্শী স্মৃতি তুলে ধরেছেন 
সামনে খোলা মাঠ শুয়ে আছে । নিঝুম রাত । আকাশের গায়ে চাঁদ নেই । তবে অসংখ্য তারার রূপালি আলোয় আকাশ সামান্য উজ্জ্বল দেখাচ্ছে । কিন্তু চারপাশের বিশাল জমিন অন্ধকারে ঢেকে আছে ।
লোকটি হাঁটতে থাকে । নির্দিষ্ট কোনো রাস্তা নেই । তবুও সে সারিবদ্ধ ভাবে গড়ে উঠা সৈনিকদের আস্তানার দিকে সোজা হেঁটে যায় । মাঝে মাঝে পাথরের উপর তার পা ফসকে যাচ্ছিল । একবার সে তো প্রায় পড়েই যাচ্ছিল । কিন্তু সামনের দিকে ঝুকে সে কোনোরকমে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে ।
লোকটি আদৌ সেখানে যেতে চায়নি । তার ভয় হচ্ছিল  সে যে হাতে লোহার শাবল ধরেছিল, সেই হাত রীতিমত কাঁপছিল । মনে হচ্ছিল কেউ যেন পেছন থেকে তাকে অনুসরণ করছে । সাবধানী হয়ে সে মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়ায় এবং সতর্ক দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকায় । কিন্তু ষ্টেশনের বাতি ছাড়া কোথাও কোনো প্রাণীর চিহ্ন নেই । নদী পাড়িদেওয়ার সময় সে এক জোড়া যুবক-যুবতীকে দেখে ভয়ে চমকে উঠেছিল । সেই সময় যুবক-যুবতী পুল পেরিয়েসামান্য ঢালু বেয়ে পাইন বনের ভেতর দিয়ে মেমোরিয়ালের দিকে যাচ্ছিল ।
সামনে কি আছে ? এ প্রশ্নের উত্তর লোকটি জানে না । মনে হয় কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকছে । ডাকার সেই শব্দটা একই সঙ্গে বাইরে থেকে এবং তার বুকের ভেতর থেকে আসছে । অস্পষ্ট কন্ঠস্বর । গলার আওয়াজ একবার উপরে উঠছে, পুনরায় নিচে নামছে । ফলে সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না । তবে শব্দটা তালে তালে একবার তার কানের ফুটো গলিয়ে মস্তিস্কে প্রবেশ করছে, আবার পরমুহূর্তে অন্য কানের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে । তার বুকের ভেতর ধুকপুকানির শব্দ গাঢ় হয় এবং ধমনীর ভেতর রক্ত চলাচল দ্রুত হয় । কন্ঠস্বর শুনে মনে হয় অদৃশ বাতাসের মধ্যে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ । যাহোক, সেই শব্দের জন্যই অবশেষে সে গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছে । 
একসময় লোকটি সৈনিকদের আস্তানার সামনে এসে দাঁড়ায় । কংক্রিটের বাড়িগুলো তিরিশ বছর আগের তৈরি এবং এখন ক্ষয়িষ্ণু বাড়িগুলোর ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে আগাছা জন্মেছে । সৈনিকদের আস্তানার পাশে ফাঁকা জায়গায় একটা করস্থান আছে । সেখানে যুদ্ধে নিহত, সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী  সাধারণ মানুষের কবর রয়েছে । সে কবরস্থানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে । কবরগুলো অতীত, অতীত এখন মৃত এবং মৃত হচ্ছে এই মুহূর্তে তার মনে যা আসে,তাই।  
হ্যাঁ, অতীতে একসময় লোকটি এখানে যুদ্ধ করেছিল  সৈনিকদের আস্তানায় সে পাহাড়াদার ছিল । সেই সময় তার কাছে ছিল আমেরিকার তৈরি বন্দুক এবং মেশিন গান । আসলে তখন তার মস্তিস্ক ছিল আমেরিকার দ্বারা প্রভাবিত । যতক্ষণ না পর্য্যন্ত সৈনিকদের শেষ দল দক্ষিণে সরে যাওয়ার জন্য স্টেশন ছেড়েছে, ততক্ষণ সে খোলা জায়গার সুবাদে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে । কিন্তু অবশষে সে এখানেই বন্দি হয়েছিল ।
অনেকদিন ধরে লোকটির মস্তিস্কের যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে । এখন সেখানে ধূলোবালির আস্তরণ জমে পুরোটাই ঢাকা পড়ে গেছে । সে তার অতীত ভুলে গেছে, এমনকি তার স্মৃতিও মুছে গেছে । এখন তার কাছে আছে শুধু এক জোড়া খসখসে হাত, কাঠের মতো শক্ত মুখ, দুটি নিষ্প্রভ চোখ, সাতটা কৃত্রিম দাঁত এবং একটা হৃদয়, যা কম্পনপ্রতি মিনিটে ষাট বার ।
লোকটির মস্তিস্কের এই যন্ত্রপাতি হয়তো আচমকা একসময় আবার কাজ করতে পারবে । সে ভাবে, কেউ যদি বতামে চাপ দেয়, তাহলে তার মস্তিস্কের ইঞ্জিন পুনরায় চালু হবে । তবে সে জানে না, বোতামে কে চাপ দিয়েছে । সে বুঝতে পেরেছে, তার মস্তিস্ক কাজ করতে শুরু করেছে এবং অতীতের সমস্ত ঘটনাবলী তার দৃষ্টির সীমানায় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছে । ফেলে আসা জীবন তার কাছে জীবন্ত হয়ে দেখা দেয় । এ মুহূর্তে সে তার ছেলেবেলা, স্কুলের জীবন, সৈনিক একাডেমীর দিনগুলো, তার স্ত্রীর কথা, এমনকি মধুচন্দ্রিমার উচ্ছ্বল মুহূর্ত এবং পুরোনো বাড়ির সামনের সুগন্ধি ওক বৃক্ষ স্পষ্ট স্মরণ করতে পারছে । এছাড়া তর মনে পড়ছে, কয়েদীখানার ভেতরের অন্ধকার প্রকোষ্ট এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য সাজা ভোগ করার পর কয়েদীখানা থেকে বেরোনোর সার্টিফিকেটের কথা ।
এটা কোনো স্বপ্ন নয়, কিংবা কোনো অলীক গল্প নয় । লোকটির স্মৃতি অত্যন্ত বিভ্রান্তকর এবং সে যরপরনাই দ্বিধান্বিত।   
তবে লোকটির ভাগ্যই হয়তো তার দ্বিধাগ্রস্ত মস্তিস্কের বোতামে চাপ দিয়ে বন্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে এবং ভাগ্যই তাকে অনবরত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে । জীবন হলো গোলাকৃতি বস্তুর মতো । একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে ভাগ্যের চাকা পথ চলতে শুরু করে এবং একসময় আবার সেই একই জায়গায় ফিরে আসে । যদিও এবার সে আমেরিকার তৈরি ট্রাকে চেপে আসেনি, বরং সৈনিকদের আস্তানা ভেঙে আমেরিকার যন্ত্রপাতি দিয়ে এখানে কারখানা তৈরি করতে এসেছে। 
সৈনিকদের আস্তানার দেয়ালের ছিদ্রগুলো যেন লোকটির দিকে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । রাতের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা । শীতে সে রীতিমত কাঁপছে । নিস্তব্ধ খোলা মাঠ । চারপাশে যেন মৃত্যুর কালো ছায়া ছড়িয়ে আছে । দূর থেকে হুইশেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে আসে । সে স্টেশনের দিকে তাকায় । স্টেশনে একটা ট্রেন এসে ভিড়ে । ট্রেনের হেডলাইটের তীব্র আলো চরপাশের অন্ধকার মুছে দেয় । সে তাকিয়ে দেখে মাঠের উপর শুয়ে আছে তার নিজের দীর্ঘ ছায়া ।
লোকটি সন্তর্পণে সৈনিকদের আস্তানার আড়ালে ছায়ার মধ্যে ফিরে যায় । কংক্রিটের দেয়ালে শাবলের আঘাতের প্রচন্ড শব্দ হয় । সেই বিকট শব্দে সে ভয় পয় এবং তার হাত-পা পুনরায় কাঁপতে থাকে । এত বেশি ভয় পাওয়ার কারণ সে জানে না । হয়তো এটাই স্বাভাবিক । গত কয়েক দশক ধরে সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত । এ জন্যই তার ইচ্ছা শক্তির উপর মরচে পড়েছে । 
যাহোক, লোকটি আবার কাজ শুরু করে । এবার সে নরম মাটিতে শাবল দিয়ে আঘাত করে । শব্দ শুনে সে থমকে দাঁড়ায় এবং চারপাশে ইতিউতি তাকায় । সবকিছু সুনসান, নিস্তব্ধ । এই নিস্তব্ধতাই তাকে ভীত করে তুলেছে । তার মনে হচ্ছে, সৈনিকদের আস্তানার ভেতর থেকে চুপিচুপি কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে । লোকটি অন্ধকার দেয়ালের ছিদ্রগুলোর দিকে পলকহী তাকিয়ে থাকে । একধরনের ভয়ে ক্রমশ সে গুটিসুটি হয়ে বসে পড়ে । তখন সে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে ।
লোকটি আপন মনে সিদ্ধান্ত নেয়, শাবল দিয়ে মাটি খুড়বে না । তাই সে হাত দিয়ে মাটি খোঁড়া শুরু করে । একসময় সে দু’হাতে স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা মাটি তুলে নেয় এবং তখন সে হাতের মুঠোয় একধরনের শীতল স্পর্শ অনুভব করে । এই সেই মাটি, যা রক্তের সঙ্গে মিশে আছে । হয়তো এখনো মাটির কণার সঙ্গে রক্ত লেগে আছে, নাকি রক্তের চিহ্ন মুছে গেছে ? সূর্য্যের প্রচন্ড তাপে হয়তো রক্ত বাস্প হয়ে উবে গিয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে দূরে কোথাও ভেসে গেছে । জীবন আসে এবং যায় । কিন্তু বস্তু জগত পেছনে থেকে যায় । 
লোকটি অন্ধকারে নরম মাটি খুঁড়তে থাকে এবং সেই মাটির মধ্যে অন্ধের মতো খুঁজতে থাকে । একসময় সে লম্বা একটা কিছুর স্পর্শ অনুভব করে এবং সে-টা মাটির ভেতর থেকে সাবধানে বের করে । পরবর্তীতে এক এক করে বিভিন্ন আকারের কয়েকটা বস্তু তুলে আনে । তারপর সে সেগুলো সৈনিকদের আস্তানার দেয়ালের পাশে সারিবদ্ধ ভাবে স্তুপ করে সাজিয়ে রাখে ।
অন্ধকারে লোকটির ুঝতে বাকি নেই, ওগুলো মানুষের হাড় । হাড়গুলো কোনটা উরুর, কোনটা মেরুদন্ডের, কোনটা আবার হাত-পা এবং পাঁজরে । আকৃতির দিক থেকে হাড়গুলো কোনটা লম্বা, কোনটা খাঁটো, কোনটা মোটা, কোনটা সরু । তার মনে হলো, হাড়গুলো হয়তো একজনেরই হবে । কিন্ত পরমুহূর্তেই সে ভাবলো, একাধিক লোকেরও হতে পারে ।
লোকটি এবং তার সঙ্গীরা মিলে সারাদিন গর্ত খুঁড়েছে । এখানে একটা কারখানা তৈরি হবে । তাই মাটির ভেতর থেকে হাড়গোড় বের করেছে । শুরুতে যখন একটা হাড় পেয়েছে, তখন তারা কেউ আমলে নেয়নি । কেননা মাটির ভেতর থেকে বিভিন্ন জিনিস খুঁড়ে বের করা যায় । কম বয়সী ছেলেগুলো হাড়গোড় একবার শূণ্যে ছুঁড়ে দিচ্ছে, আবার পরক্ষণেই হাত বাড়িয়ে তা লুফে নিচ্ছে । হাড় নিয়ে এই ছোড়াছুড়ি খেলার সময় তারা তাকে, অর্থাৎ একজন বৃদ্ধ কুওমিনটাং অফিসারকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরার ভঙ্গিতে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য কর । অথচ তারা সবাই তার মতো অপরাধী । 
এই যুবকগুলো নানা ধরনের অপরাধ করেছে । তাদের মধ্যে কেউ চুরি-ডাকাতি বা খুন করেছে, আবার কেউ ধর্ষণ করেছে । কিন্তু লোকটির অপরাধ, সে একজন পরাজিত সৈনিক । তবুও যুবকগুলো তাকে নিয়ে তামাশা করছে এবং ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করতে কোনো কসুর করছে না । একসময় সৈনিক জীবনের সমস্ত স্মৃতি তার মনের সরোবরে ভেসে উঠ।
লোকটি যুবকদের বলেনি, এখানে একদিন সে যুদ্ধ করেছিল । কেননা ফেলে আসা সেই সময় আজ চিরদিনের জন্য অতীতের কৃষ্ণ গহ্বরে হারিয়ে গেছে । সাদা হাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে সে দুপাশে মাথা দোলায় । তারা মাটির ভেতর থেকে যতই হাড় বের করছিল, ততই যেন তাদের সামনে মৃত মানুষের ছবি ভেসে উঠছিল । মাথার খুলি এবং দাঁত, যা একদিন বিভিন্ন খাারের স্বাদ গ্রহণ করেছিল, এখন সেই চোখেমুখে মৃত্যুর রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে রেখেছে । 
লোকটি পুনরায় হাড়গুলো সাজিয়ে রাখে। তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, মৃত লোকগুলো একদিন তার সঙ্গে এখানেই ছিল । এগুলো তাদেরই হাড়গোড় । যুদ্ধের সময় যখন কমানের গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়েছিল, তখন শহীদদের মৃতদেহ সরিয়ে এনে মর্যাদার সঙ্গে স্মৃতিস্তম্ভের নিচে কবর দেওয়া হয়েছে । তাদের কবরের উপর সগর্বে শোভা পাচ্ছে বিজয় কেতন । কিন্তু যারা যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হয়েছিল, তাদের মৃতদেহ এই আস্তানার পাশে গর্ত করে চাপা মাটি দিয়েছিল । তাদের কবর ঘিরে আছে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপবাদ এবং পরাজয়ের গ্লানি ।
লোকটি ভাগ্যক্রমে এখনো বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে । অন্যদের মতো তাকে হত্যা করে এখানে দাফন করা হয়নি । সুতরাং হাড়গুলোর একটাও তার নয় । যেহেতু সে ছিল যুদ্ধবন্দি, তাই সে আজো জীবিত । তারপরেও সে হাড়গুলো এমনভাবে নাড়াচড়া করছে যেন মনে হয় ওগুলোও তাকে স্পর্শ করে দেখছে । অন্যদের মতো এখানে তার নশ্বর দেহ অনায়াসে মিশে যেতে পারতো ।
মৃত্যর পর মানুষের দেহ পচে গেলে তা কখনই আসল রূপে ফিরে আসে না । অথচ এই হাড়গুলো একদিন কারোর দেহের সঙ্গে মিশে ছিল । লোকটি তার ধোঁয়াশে স্মৃতির পাতা খুলে এই হাড়গুলোর মালিকের নাম বলে দিতে পারে । এই বড় দুটি হাড় মেশিনগান চালানো সৈনিকের এবং এই দাঁত দিয়ে সে খাবার চিবিয়ে খেত । উরুর এই বড় হাড়টির মালিক সম্পর্কেও সে বলে দিতে পারে । লোকটি অধিক পরিমানে সুরা পান করতে পছন্দ করতো এবং রাতের বেলা বেসামাল হয়ে স্ত্রীর জন্য শুধু কাঁদতো । এদের কাউকেই আর এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যাবে না । ওরা কেন মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করেছিল ? না, এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই । সে তাদের নির্দেশ দিয়েছিল । কিন্তু কেন ? আজো কি সে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে পেরেছে ?
লোকটি ভাবে, সে একটা জঘণ্য অপরাধ করেছে । কিন্তু কেন সে করেছে, কদের জন্য করেছে ? সে সরল মনে আমেরিকানদের বিশ্বাস করেছিল । এটাই কি তার ভাগ্য, নাকি ভুলের মাশুল ? 
একসময় লোকটি প্রার্থনার ভঙ্গিতে খোলা মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে । কিন্তু তার এলেমেলো মনের ভেতর প্রার্থনার কোনো চিহ্ন নেই, এমনকি ভবিষ্যতের কোনো আশা-ভরসাও নেই । শুধু আশেপাশের অলৌকিক শব্দ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ।
লোকটির সঙ্গে একট চটের ব্যাগ । সে হাড়গুলো তুলে ব্যাগের ভেতর রাখে । তারপর কাঁধের উপর ব্যাগ ঝুলিয়ে গন্তব্যের দিকে হাঁটতে শুরু করে । ব্যাগটা যদিও খুব বেশি ভারি নয়, তবে তার কাছে পা দুটি ভীষণ ভারি মনে হচ্ছে । ছোট নদীর উপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে । ঠান্ডা বাতাস, শরতের মৃদুমন্দ বাতাস । বিশাল আকাশের অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে গোল চাঁদ উঠতে শুরু করেছে । নদীর পানির উপর চাদের স্নিগ্ধ আলো চিকমিক করছে । বলা নেই, কওয়া নেই, আচমকা সে নদীর পাড়ে থমকে দাঁড়ায় । কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে সে একটা কিছু ভাবে । একসময় সে কাঁধের উপর থেকে ব্যা নামায় । তারপর ব্যাগের ভেতর থেকে আলতো হাতে হাড়গুলো বের করে নদীর পানিতে ছুঁড়ে ফেলে ।  
নদীর পানিতে শব্দ হয় । সেই শব্দ শুনে ভীত-সন্ত্রস্ত এক জোড়া পাখি ত্বড়িৎ গতিতে লোকটির মাথার উপর দিয়ে খোলা মাঠ পেরিয়ে উড়ে যায় । একসময় পাখি দুটি সৈনিকদের আস্তানার আড়ালে আবছা অন্ধকারে হারিয়ে যায় । 
চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে ঠিকরে পড়েছে স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে এবং তার ছায়া গিয়ে পড়েছে উল্টোদিকের পাহাড়ের গায়ে। ছায়াটা দেখে মনে হয়, কেউ যেন উঁচু স্তম্ভ থেকে পাহারা দিচ্ছে । যাহোক, খুব শীঘ্রই এ খোলা জায়গায় একটা আধুনিক কারখানা গড়ে উঠবে ।


ফজল হাসান
গল্পলেখক, অনুবাদক এবং ছড়াকার
ফজল হাসান সাহিত্যিক ছদ্মনাম । পোশাকী নাম ডঃ আফজল হোসেন । জন্মঃ মুন্সিগঞ্জ, বাংলাদেশ । শিক্ষাঃ বিএসসি অনার্স এবং এমএসসি (ঢাবি), পিএইচডি (অষ্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) । বর্তমান আবাসস্থলঃ ক্যানবেরা, অষ্ট্রেলিয়া । পেশাঃ অষ্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ।
লেখালেখিঃ বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক ম্যাগাজিন এবং দেশ-বিদেশের অনলাইন ম্যাগাজিন ।
প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলনঃ ‘চন্দ্রপুকুর’ ও ‘কতোটা পথ পেরোলে তবে’ (মৌলিক); ‘আফগানিস্তানের
শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘নির্বাচিত নোবেল বিজয়ীদের সেরা গল্প’ এবং ‘ইরানের শ্রেষ্ঠ গল্প’ (অনুবাদ) ।
প্রাপ্ত পুরস্কারঃ ‘প্রিয় লেখক পুরস্কার’ (২০০৬) (‘প্রিয় অষ্ট্রেলিয়া’ অনলাইন ম্যাগাজিন) এবং ‘বাসভূমি, পুরস্কার’ (অধুনালুপ্ত ‘বাসভূমি’ অনলাইন ম্যাগাজিন) ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন