বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

রুথ পার্ক'এর গল্প : নিজেদের বাড়ি

অনুবাদ  : সুদর্শনা রহমান


মেয়ে দুটি বারান্দায় ঝুঁকে দেখছিল, মিসেস পার্সন চওড়া পেছনটা ঢালু পাহাড়ের পথের বাঁকে কুইন্স গাছের ঘন ঝোপের আড়ালে আস্তে, আস্তে মিলিয়ে গেল । মিসেস পার্সন চলে যাবার সাথে, সাথে যেন বাড়িটায় অন্য রকম একটা মাত্রা যোগ হোলো, পড়ন্ত দুপুরের নরম রোঁদ পড়ে দরজার পিতলের হাতলটাকে পর্যন্ত মনে হয় আগের চেয়ে বেশী ঝক ঝকে, সব তুচ্ছ তুচ্ছ জিনিসেও যেন মনে হয় নূতন, ঘরে ভেতরে সদ্য সেঁকা গরম রুটির লোভনীয় মিষ্টি মন্দ সুবাস হওয়া ঘুর পাক খাচ্ছিল ।



মার্গারেট ওর বন্ধু ডোজীকে লক্ষ্য করে বলে উঠলো, "মা না থাকলেই আমার বেশী ভাল লাগে, বাড়িটাকে শুধু নিজের বলে মনে হয় তখন" । বলে পায়ের গোড়ালির উপর ভর করে এক চক্কর নেচে নিলো ও । মার্গারেটের বন্ধু ডোজী, পাণ্ডুর মুখ রোগা শরীর মাথায় পাতলা চুল, মেয়েটি আজ বিকেল বেলাটা ওর সাথে কাটাবে বলে এসেছে ওদের বাড়িতে।গ

ডোজী কৌতূহলী গলায় হই হই করে বলল, '' চলনা দেখি আসি তোর বাচ্চা ভাইটা কি করছে এখন''?


"একটু দাঁড়া" বলে, মার্গারেট বারাণ্ডার অন্য কোনে গিয়ে জানালা দিয়ে ভেতর দিকে মুখ গলিয়ে তাদের শেকলে বাঁধা কুকুরটাকে উদ্দেশ্য করে ঠিক বড়দের মতো ভঙ্গী নকল করে বিকট গলায় চেঁচিয়ে বলে, " অ্যাঙ্গাস চুপচাপ লক্ষ্মী ছেলের মতো ওখানেই বসে থাক, দুষ্টুমি করলে কিন্তু সাজা পেতে হবে কঠিন" । তারপর বন্ধুর দিকে ফিরে বলে, "আয়"।
দুজনে বসবার ঘর পেরিয়ে বাড়ির কোনের দিকের ঘরে উপস্থিত হোলো । ছোট্ট এক ফালি ঘর নবজাত শিশুর উপযোগী করে সাজানো, হাল্কা নীল রঙের দেয়াল আর পর্দা বেবি কটে নীল নরম কম্বল মোড়ানো ঘুমন্ত শিশুর শুধু ফুলো ফুলো গালের তুলতুলে গোলাপি নরম মুখটা দেখা যাচ্ছে । ঘুমের ঘোরে তার ঠোটের কোনায় এক চিলতে স্বর্গীয় হাসি গোলাপ কুঁড়ির মতো ঝুলে আছে । শিশুটি বোধহয় পরীদের সাথে খেলা করছিল স্বপনে ভ্রু দুটো ঈষৎ কুঁচকানো, বাদামী রঙা ঘন পল্লব থির থির করে কাঁপছে, ডোজী ঝুঁকে পড়ে মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগলো ।


"আমি ওকে একবার দেখব রে ছুঁয়ে ?'', বন্ধুর দিকে চেয়ে ডোজী অনুমতি চায় ।


''দাঁড়া তোকে একটা মজার জিনিস দেখছি,'' বলেই বাচ্চাটার মাথায় আলতো চাঁটি মারে মার্গারেট হঠাৎ করে এমন আঘাত পেয়ে জোরে কেঁপে ওঠে বাচ্চাটা । আরমোড়া ভেঙে অবাক চোখে পিট পিট করে তাকায় দুবন্ধুর দিকে । মার্গারেট এবার বেশ জোরে জোরে চাঁটি মারে আর তারস্বরে ভ্যা করে কেঁদে ওঠে বাচ্চাটা, মার্গারেটের মুখে কুটিল একটা ছবি ফুটে ওঠে ও যেন কেমন হিংস্র দৃষ্টিতে বাচ্চাটার কান্নার গমকে ওঠা নামা করা গলাটার দিকে তাকিয়ে থাকে।


ডোজীর হাতটা নিশপিশ করতে থাকে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, "আমি ও কি ওকে মারতে পারি রে ম্যাগী ?" উত্তেজনায় জুল জুল করে তার চোখ যেন এটা মজার কোনো খেলা ।


তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে হাতের পাতা উল্টিয়ে উত্তর দেয় মার্গারেট, " তা মার না যতো খুশী ওতো আমারই ভাই, কে নিষেধ করছে", হিংস্রতা স্পষ্ট তার গলায় বেজে ওঠে ।


ডোজী অন্তর বন্ধুর অনুমতি পেয়ে মনে মনে নেচে ওঠে, কক্ষনো কোনো ছোট্ট বাচ্চাকে মারবার সুযোগ পায়নি তার, শুধু মার জুটেছে ওর কপালেই জন্মাবধি । শিশুরা ক্রূরতায় কোনো অংশেই কম নয় বড়দের চাইতে বরং অনেক সময় তাদের সীমাহীন নিষ্ঠুরতা অত্যন্ত কদর্য হতে পারে । যারা মনে করেন যে, সকল শিশুতেই ভগবান বাস করেন তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করেন । শিশু মাত্রই ভগবানের রুপ নয় সকল সময়ে তারা ভূতের ও রুপ হয়, তাই যদি ভগবান মানেন কেউ, ভূতেও তাঁর বিশ্বাস থাকা একান্ত প্রয়োজন !


ডোজী জোরে একটা আঘাত দিতে চাচ্ছিল বাচ্চাটাকে হাত উঁচিয়ে যেই মারতে যাবে অমনি, মার্গারেটদের বাড়ির সামনের গেটে ক্যাঁচকোঁচ করে একটা গাড়ী থামবার শব্দ শোনা গেল । মার্গারেট এই শব্দটার সাথে খুব সম্ভবত পরিচিত তাই শব্দ শুনেই ভয়ানক রকম চমকে উঠলো সে । "এইরে, এ যে নোংরা বিলির ট্রাকের শব্দ, ও কেন এলো এই অবেলায় মা যে বাড়িতে নেই, কি হবে এখন ?" গলায় তার রীতিমতো ভয়ের সুর ।


দুজনে একসাথে দৌড়ে বারাণ্ডায় এসে পৌঁছে দেখে যা ভেবেছে তাই, 'নোংরা বিলি'র দশাসই শরীরটা মূর্তিমান শয়তানের মতো একেবারে সিঁড়ির শেষ ধাপের সামনে দাঁড়ানো । ডোজী তাকে আগে দেখেনি তার তো 'নোংরা বিলিকে' দেখে ভঁয়ে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার যোগাড় ! ছ'ফুটের বেশ ওর উপরে বিশাল ভারী দেহ রোঁদে পুড়ে পুড়ে কালচে তামাটে রং, মাথার জটা পাকানো এলো মেলো চুল কাঁধ অব্দি নেমে এসেছে, ঘোলাটে লাল লাল চোখ ভাঁটার মতো, পরনে অপরিচ্ছন্ন একটা রং জ্বলে যাওয়া চামড়ার কোট ঝুল ঝুল করছে, প্যান্টের আসল রং বোঝবার কোনো উপায় নেই, পায়ে শত ছিন্ন একজোড়া জুতা, কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়েও মেয়ে দুটি ওর শরীর থেকে ভেসে আসা উৎকট ঘ্রাণ পাচ্ছিল । ওর এই অপরূপ সাজ পোশাক আর নোংরা স্বভাবের জন্য ওর নামই হয়ে গেছে 'নোংরা বিলি', বিলির বোধহয় নিজেই মনে নেই শেষ করে সে স্নান করেছিল । বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওর লঝঝড়ে ট্রাকটা নিয়ে বাতিল জিনিস পত্র কেনে, সুযোগ পেলে হাত সাফাইও করে টুকি টাকি জিনিস, কেউ ওকে পছন্দ করে না এই এলাকায়, এমন নোংরা মানুষ কেউ কক্ষনো দেখেনি । মা, মার্গারেটকে পই পই করে বারণ করে দিয়েছেন তিনি বাড়ি না থাকলে যেন, কোনো উটকো মানুষকে চৌহদ্দির ভেতর ঢুকতে না দেয়া হয় । ভয়ে মেয়ে দুটির চোখ ছানা বড়া, ডোজীর পা দুটো যেন কেউ পেরেক মেরে গেঁথে দিয়েছে বারাণ্ডার কাঠের পাটাতনে জমে সে পাথর । বাক্যবাগীশ মার্গারেট ও খেই হারিয়েছে কি বলে ওকে বিদেয় দেবে মনে মনে কথা হাতড়ে বেড়াচ্ছে সে । 'নোংরা বিলি' বারাণ্ডার প্রথম সিঁড়ি ডিঙিয়ে দ্বিতীয় ধাপে পা রেখেছে ততক্ষণে, কাঠের রেলিঙয়ে রাখা ওর হাতের অপরিচ্ছন্ন বড় বড় নখের কোনায় ময়লা জমে আছে, ভক ভক করে ওর মুখ থেকে বেরোনো সস্তা মদের গন্ধে ওদের দুজনের অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসবার যোগাড় পেট থেকে ।



ডোজী মনে মনে মতলব ভাঁজে ঘরের ভেতর ঢুকে মিসেস পার্সনের সাথে মিছেমিছি কথা বলার অভিনয় করবে '' মিসেস পার্সন জী, কি বলছেন আপানাদের কোনো বাতিল জিনিস নেই আপাতত । বিলি যেন এখন বিদেয় হয় অন্য কোনো দিন আসে, জী ঠিক আছে বলছি তাকে'' ।


মার্গরেট একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দূরত্বটা মেপে নেয় ভাবে, ডোজীর হাতটা ধরে এক হ্যাঁচকা টান মেরে ঘরে ছুটে গিয়ে ভেতর থেকে খিল এঁটে দেবে । মা যদি জানে যে, ওরা খালি বাড়িতে 'নোংরা বিলি'কে ঢুকতে দিয়েছিল তাহলে, মেরে আধমরা করে ছাড়বে আজ । ওঃ কি কুক্ষণেই যে, ভাইয়ের ঘরে ঢুকেছিল ও তাই তো 'নোংরা বিলি'টা দরজা অব্দি পৌঁছে গেছে তা নইলে, জানালা দিয়ে কথা বলেই ওকে হাঁকিয়ে দেয়া যেতো । এক পা, এক পা করে পিছু হটবার মতলব করে ও, যদি আংগাসকে শিকল থেকে খুলে দেয়া যায় কোনো রকমে তাহলে একটা হিল্লে করা যায় বিলি রাক্ষসটার । 'নোংরা বিলি' যেন পরিষ্কার বুঝতে পারে মেয়ে দুটির করুন দশা, বাড়িতে বড় কেউ নেই, শিকলের ঝন ঝন আওয়াজ, কুকুরের গলার ঘড় ঘড় শব্দে মুহূর্তে বুঝে যায় ওটা বাঁধা রয়েছে তাই, নির্ভয়ে আরও একধাপ সামনে এগিয়ে আসে সে । মার্গারেট আর ডোজীর প্রায় মরণ দশা, ভয়ে দুজনের হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাবার অবস্থা, গলা শুকিয়ে কাঠ, বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ নিজেদের কানেই জোরে বাজছে, হাতের তালু রীতিমতো ঘেমে উঠেছে । নাক মুখ কুঁচকে নোংরা বিলি ওদের দুজনের তাকিয়ে থাকে ।


কোনো মতে একটু সাহস জুটিয়ে মার্গারেট মুখ খোলে খনখনে গলায় বলে, 'মিঃ বিলি। বিক্রি করবার মতো কোনো পুরনো বাতিল জিনিস তো নেই, আপনি বরং অন্য দিন আসুন, আমি মাকে বলে রাখবো আপনি এসে ফিরে গেছেন, আজ আপনি যান দয়া করে'' ।


সাত ঘাটে জল খওয়া বিলি নাছোড় বান্দা এতো সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয় সে আর, বাড়িতে বড় কেউ নেই এটা তার জন্য মোক্ষম সুযোগ, সেটা সে হেলায় হারাতে রাজী নয় । '' যাও না ঘরে গিয়ে দেখ না তোমার বাবার কোনো পুরনো ঘড়ি বা যন্ত্রপাতি রয়েছে কিনা ভাল দাম দেব আমি'' ঈষৎ জরানো গলা তার ।

''ঈশ ভাল দেবো, মিথ্যুক কোথাকার ছিঁচকে চোর একটা, লোক ঠকাতে ওস্তাদ যে 'নোংরা বিলি' তা বুঝি ওর জানতে বাকী, মায়ের কাছে বুঝি সে আর শোনেনি,'' মনে মনে ভেংচে ওঠে মার্গারেট । জোর করে হাসি টেনে এনে বলে, ''সত্যিই বিশ্বাস করুন আজ আর কিছু নেই'' ।


তবুও বিলির নড়বার চরবার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, "একটা ভাল রকম দাও না মেরে বাপু এখান থেকে হটছি না'', ঘাড় লম্বা করে ঘরের ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে সে ।


ডোজী বুঝি বা অজ্ঞানই হয়ে যাবে তার স্নায়ু আর যুঝতে পারছিল না মাথাটা ও যেন ভোঁ ভোঁ করছে, সাত পাঁচ না ভেবে ও বারাণ্ডার শেষ প্রান্তে ছুটে যায় । মিসেস পার্সনের লণ্ড্রীরুম, একটা ঝুড়িতে রাখা গুচ্ছের ধোয়া কাপড় দেখতে পেয়ে ছোঁ মেরে ওটাই উঠিয়ে আনে সে । এগিয়ে দেয় 'নোংরা বিলি'র সামনে ''এই নিন আপাতত এই নিয়ে বিদেয় হোন'', যাক বাবা কিছু একটা তো পাওয়া গেছে ভয়ংকর লোকটাকে বিদায় করবার জন্য ভেবে হাঁফ ছাড়ে ও ।


লোভে চক চক করে ওঠে 'নোংরা বিলি'র চোখ তবুও মুখে অবজ্ঞার ভাব দেখিয়ে বলে, ''এ হে, যত্ত সব ছেঁড়া ন্যতাকানি এসব কোন কাজে আসবে শুনি ? আচ্ছা থাক নিচ্ছি এখনকার মতো তবে এক ডলারের বেশী কিন্তু দিতে পারবো না, এসব রদ্দিমাল কেউ পুঁছবে ও না ।'' একটা ডলার সে বের করে ডোজীর হাতে গুজে দেয়, হুর মুড় করে কাপড়ের ঝুড়িটা নিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পরে ।


মার্গারেট রাগে দিশেহারা হয়ে একটা থ্যাবড়া বসিয়ে দেয় বন্ধুর মুখে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ''হাঁদা গঙ্গা রাম এটা তুই কি করলি, এক ঝুড়ি ধোয়া কাপড় দিয়ে দিলি কোন আক্কেলে বল তো শুনি, এখন আমি মায়ের কাছে কি জবাব দেব, অতো গুলো কাপড়ের দাম কক্ষনো এক ডলার হয়'' ? বলে, প্রায় ওর হাত থেকে ডলারটা ছিনিয়ে নেয় "আমি কিচ্ছু জানি না আজ মা আসুক আমি নালিশ করবো তোর নামে'', প্রায় হিসহিস করে ওঠে সে ।


অচমকা বন্ধুর হাতে থ্যাবড়া খেয়ে কেমন ভেবলু বনে যায় ডোজী, ভ্যাবাচ্যাঁকা মুখে কতো ক্ষন থম মেরে থাকে, বারে ওই 'নোংরা বিলি' টার হাত থেকে রক্ষা পেতেই না সে কাপড়ের ঝুড়িটা দিয়ে ছিল এর জন্য তাকে মারবে । রাগে পিত্তি জ্বলে যায় তার ঠিক আছে ম্যাগী যদি মায়ের কাছে তার নামে নালিশ করে তাহলে, ডোজী ও বলে দেবে মিসেস পার্সনকে যে, কি ভাবে ও ছোট্ট বাচ্চাটাকে মেরেছিল এতো সহজে ছেড়ে দেবে না সে ও !

রুথ পার্ক
১৯৮৮
অস্ট্রেলিয়া

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন