বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

হুমায়ুন আহমেদের গল্প--পাপ


ভাই আপনাকে একটা ভয়ঙ্কর পাপের গল্প বলি। পাপটা আমি করেছিলাম। নিজের ইচ্ছায় করিনি। স্ত্রীর কারণে করেছিলাম। স্ত্রীর কারণে অনেক পাপ পৃথিবীতে হয়েছে। মানুষের আদি পাপও বিবি হাওয়ার কারণে হয়েছিল। আপনাকে এইসব কথা বলা অর্থহীন। আপনি জ্ঞানী মানুষ, আদি পাপের গল্প আপনি জানবেন না তো কে জানবে। যাই হোক, মূল গল্পটা বলি।


আমি তখন মাধবখালি ইউনিয়নে মাস্টারি করি। গ্রামের নাম ধলা। ধলা গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। নতুন বিবাহ করেছি। স্ত্রী সঙ্গে থাকেন। আমার বয়স তখন পঁচিশের মতো হবে। স্ত্রী নিতান্তই বালিকা। পনের-ষোল মতো বয়স। ধলা গ্রামে আমরা প্রথম সংসার পাতলাম। স্কুলের কাছেই অনেকখানি জায়গা নিয়ে আমার টিনের ঘর। আমরা সুখেই ছিলাম। ফুলির গাছগাছালির খুব শখ। সে গাছপালা দিয়ে বাড়ী ভরে ফেলল। ও আচ্ছা, বলতে ভুলে গেছি। ফুলি আমার স্ত্রীর ডাক নাম। ভালো নাম নাসিমা খাতুন।

বুঝলেন ভাই সাহেব, ধলা বড় সুন্দর গ্রাম। একেবারে নদীর তীরের গ্রাম। নদীর নাম কাঞ্চন। মাছ খুবই সস্তা। জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরে বাড়ীতে দিয়ে যায়। তার স্বাদই অন্যরকম। পনের বছর আগের কথা বলছি। এখনও সেখানকার পাবদা মাছের স্বাদ মুখে লেগে আছে। শীতের সময় বোয়াল মাছ থাকতো তেলে ভর্তি।

ধলা গ্রামের মানুষজনও খুব মিশুক। আজকাল গ্রাম বলতেই ভিলেজ পলিটিক্সের কথা মনে আসে। দলাদলি, কাটাকাটি, মারামারি। ধলা গ্রামে এসব কিছুই ছিল না। শিক্ষক হিসেবে আমার অন্যরকম মর্যাদা ছিল। যে-কোন বিয়ে শাদিতে আদর করে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যেত। গ্রাম্য সালিসিতে আমার বক্তব্য গুরুত্বের সাথে নেয়া হতো। দুই বছর খুব সুখে কটলো। তারপরই সংগ্রাম শুরু হলো। আপনারা বলেন স্বাধীনতা যুদ্ধ। গ্রামের লোকের কছে সংগ্রাম।

ধলা গ্রাম অনেক ভিতরের দিকে। পাক বাহিনী কোন দিন ধলা গ্রামে আসবে আমরা চিন্তাই করি নি। কিন্তু জুন মাসের দিকে পাক বাহিনীর গান বোট কাঞ্চন নদী দিয়ে চলাচল শুরু করলো। মাধবখালি ইউনিয়নে মিলিটারি ঘাঁটি করলো। শুরু করলো অত্যাচার। তIদের অত্যাচারের কথা আপনাকে নতুন করে বলার কিছু নেই। আপনি আমার চেয়ে হাজার গুণে বেশি জানেন। আমি শুধু একটা ঘটনা বলি। কাঞ্চন নদীর একপাড়ে ধলা গ্রাম, অন্য পাড়ে চর হাজরা। জুন মাসের ১৯ তারিখ চর হাজরা গ্রামে মিলিটারির গানবোট ভিড়ল। চর হাজরার বিশিষ্ট মাতবর ইয়াকুব আলী সাহের মিলিটারিদের খুব সমাদর করে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ভাই সাহেব, আপনি এর অন্য অর্থ করবেন না। তখন তাদের সমাদর করে নিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। সবারই হাত-পা ছিল বাঁধা। ইয়াকুব আলী সাহেব মিলিটারিদের খুব আদর-যত্ন করলেন। ডাব পেড়ে খাওয়ালেন। দুপুরে খানা-খাওয়ার জন্য খাসি যবেহ করলেন। মিলিটারিরা সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলো। খানা পিনা করলো। যাবার সময় ইয়াকুব আলী সাহেবের দুই মেয়ে আর ছেলের বউকে তুলে নিয়ে চলে গেল। আর তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায় নাই। এখন গল্পের মতো মনে হয়। কিন্তু এটা বাস্তব সত্য। আমার নিজের দেখা। সেই দিনের খানায় শরীক হওয়ার জন্য ইয়াকুব আলী সাহেব আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। নিয়ে যাওয়ার জন্য নৌকা পাঠিয়েছিলেন। আমি গিয়েছিলাম।

চরহাজরার ঘটনার পর আমরা ভয়ে অস্থির হয়ে পড়লাম। গজবের হাত থেকে বাঁচার জন্য মসজিদে কোরআন খতম দেয়া হলো। গ্রাম বন্ধ করা হলো। এক লাখ চব্বিশ হাজার বার সুরা এখলাস পাঠ করা হলো। কী যে অশান্তিতে আমাদের দিন গিয়েছে ভাই সাহেব। আপনাকে কী বলব। রাতে এক ফোঁটা ঘুম হতো না। আমার স্ত্রী তখন সন্তান সম্ভবা। সাত মাস চলছে। হাতে নাই একটা পয়সা। স্কুলের বেতন বন্ধ। গ্রামের বাড়ী থেকে যে টাকা পয়সা পাঠাবে সে উপায়ও নাই। দেশে যোগাযোগ বলতে তখন কিছুই নাই। কেউ কারো খোঁজ জানে না। কী যে বিপদে পড়লাম। সোবহানাল্লাহ।

বিপদের উপর বিপদ-জুলাই মাসের শেষের দিকে মুক্তিবাহিনী দেখা দিল। নৌকায় করে আসে, দুই একটা ফুটফাট করে উধাও হয়ে যায়। বিপদে পড়ি আমরা। মিলিটারি এসে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর তখন আর কোন নাড়াচাড়া পাওয়া যায় না। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে অবস্থার পরিবর্তন হলো। মুক্তিবাহিনী তখন আর শুধু ফুটফাট করে না। রীতিমতো যুদ্ধ করে। ভালো যুদ্ধ। বললে বিশ্বাস করবেন না, এরা কাঞ্চন নদীতে মিলিটারির একটা লঞ্চ ডুবিয়ে দিল। লঞ্চ ডুবার ঘটনা ঘটলো সেপ্টেম্বর মাসের ছাব্বিশ তারিখ। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এই সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল। ভাই সাহেব হয়তো শুনেছেন, বলা হয়েছিল শতাধিক মিলিটারির প্রাণ সংহার হয়েছে। এটা অবশ্য ঠিক না। মিলিটারি অল্পই ছিল। বেশির ভাগই ছিল রাজাকার। রাজাকারগুলো সাঁতরে পাড়ে উঠেছে, গ্রামের লোকরাই তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস ভাই সাহেব। যুদ্ধ অতো সাধারণ মানুষকেও হিংস্র করে ফেলে। এটা আমার নিজের চোখে দেখা।

এখন মূল গল্পটা আপনাকে বলি। সেপ্টেম্বর মাসের আটাশ তারিখের ঘটনা। মাগরেবের নামাজ পড়ে বারান্দায় বসে আছি। তুমুল বর্ষণ হচ্ছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যাটস এন্ড ডগস। একা একা বৃষ্টি দেখছি। আমার স্ত্রী শোবার ঘরে। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। তার শরীর খুব খারাপ। দুদিন ধরে কিছুই খেতে পারছে না। যা খায় তাই বমি করে দেয়। শরীর অত্যন্ত দুর্বল। কোন কিছু না ধরে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারে না। ডাক্তার যে দেখাব সে উপায় নাই। ডাক্তার পাবো কই? মাধব খালিতে একজন এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন। বাবু নলিনীকুমার রায়। ভালো ডাক্তার। মিলিটারি মাধবখালিতে এসে প্রথম দিনই তাকে মেরে ফেলেছে।

যে কথা বলছিলাম, আমি বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছি। মন অত্যন্ত খারাপ।

বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল। একসময় প্রায় ঝড়ের মতো শুরু হলো। বাড়ী-ঘড় কাঁপতে শুরু করলো। আমি একটু দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। পুরনো নড়বড়ে বাড়ী। ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেলে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বিপদে পড়বো। কাছেই মোক্তার সাহেবের পাকা দালান। স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে উঠবো কি-না ভাবছি। তখন ফুলি আমাকে ভেতর থেকে ডাকলো। আমি অন্ধকারে ঘরে ঢুকলাম। ফুলি ফিসফিস করে বলল, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।

আমি বললাম, কী কথা?

ফুলি বলল, আমার কাছে আগে বসো। আমি বসলাম। ফুলি বলল, আমি যদি তোমার কাছে কোন জিনিস চাই তুমি আমাকে দিবে?

আমি বললাম, ক্ষমতার ভিতরে থাকলে অবশ্যই দিবো। আকাশের চাদ চাইলে তো আর দিতে পারবো না। জিনিসটা কী?

তুমি আগে আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর।

আমি তার কপালে হাত রেখে বললাম, প্রতিজ্ঞা করলাম। এখন বলো ব্যাপার কী?

হ্যারিকেনটা জ্বালাও।

হ্যারিকেনটা জ্বালালাম। দেখি তার বালিশের কাছে একটা কোরআন শরীফ। আমাকে বলল, আল্লাহ পাকের কালাম ছুয়ে প্রতিজ্ঞা কর যে তুমি কথা রাখবে।

আমি ধাঁ ধাঁর মধ্যে পড়ে গেলাম। ব্যাপার কী? পোয়াতি অবস্থায় মেয়েদের মধ্যে অনেক পাগলামী ভর করে। আমি ভাবলাম এরকমই কিছু হবে। দেখা যাবে আসল ব্যাপার কিছু না। আমি কোরআন শরীফে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করলাম। তারপর বললাম, এখন বলো আমাকে করতে হবে কী?

একটা মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে।

তার মানে?

একটা মানুষ আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তার জীবন রক্ষা করতে হবে।

কিছুই বুঝতে পারছি না। কে তোমার কাছে আশ্রয় নিল?

ফুলি থেমে থেমে চাপা গলায় যা বললো তাতে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। দুদিন আগে মিলিটারির লঞ্চডুবি হয়েছে। একটা মিলিটারি নাকি সাঁতরে কুলে উঠেছে। আমাদের বাড়ীর পেছন দিকে কলাগাছের ঝোপের আড়ালে বসে ছিল। ফুলিকে দেখে বহেনজি বলে ডাক দিয়ে কেঁদে উঠেছে। ফুলি তাকে আশ্রয় দিয়েছে।

আমি হতভম্ব গলায় বললাম, দুদিন ধরে একটা মিলিটারি আমাদের বাড়ীতে আছে?

ফুলি বলল, হু!

সত্যি কথা বলছো।

হাঁ সত্যি, এখন তুমি তাকে মাধবখালি নিয়ে যাও। মাধবখালিতে মিলিটারি ক্যাম্প আছে। আজ ঝড়বৃষ্টির রIত আছে। অন্ধকারে অন্ধকারে চলে যাও। কেউ টের পাবে না।

তোমার কী মাথা খারাপ।

আমার মাথা খারাপ হোক আর যাই হোক, তুমি আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছ।

আমি মিলিটারি নিয়ে রওনা হব। পথে আমাকে ধরবে মুক্তিবাহিনী। দুজনকেই গুলি করে মারবে!

এইরকম ঝড়-বৃষ্টির রাতে কেউ বের হবে না। তুমি রওনা হয়ে যাও।

ব্যাটা আছে কোথায়?

আস তোমাকে দেখাই।

সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র কী আছে?

কিছুই নাই। খালি হাতে সাঁতরে পাড়ে উঠেছিল।

আমি মোটেই ভরসা পেলাম না। অস্ত্র থাকুক আর না থাকুক মিলিটারি বলে কথা। জেনেশুনে এরকম বিপজ্জনক শত্রু শুধুমাত্র মেয়েছেলেদের পক্ষেই ঘরে রাখা সম্ভব। আমর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি ক্ষীণ গলায় বললাম, হারামজাদা কই?

ফুলি আমাকে দেখাতে নিয়ে গেল। এমনিতে সে কোনকিছু না ধরে উঠে দাঁড়াতে পারে না। আজ দেখি হ্যারিকেন হাতে গটগট করে যাচ্ছে।

রান্না ঘরের পাশে ভাড়ার ঘর জাতীয় ছোট একটা ঘর আছে। সেখানে চাল ডাল পিয়া-টিয়াজ থাকে। ফুলি আমাকে সেই ঘরের কাছে নিয়ে গেল। দেখি ঘরটা তালাবদ্ধ। একটা মাস্টারলক তালা ঝুলছে। ফুলি তালা খুলল। হ্যারিকেন উঁচু করে ধরলো। দেখি ঘরের কোনায় কম্বল বিছানো। কম্বলের উপর নিতান্তই অল্প বয়সি একটা ছেলে বসে আছে। তার পরণে আমার লুঙ্গি, আমার পাঞ্জাবি। ঘরের এককোণায় পানির জগ-গ্লাস। পাকিস্তানি মিলিটারির সাহসের কত গল্প শুনেছি। এখন উল্টা জিনিস দেখলাম। ছেলেটা আমাকে দেখে ভয়ে শিউরে উঠল। গুটিশুটি মেরে গেল। ফুলি তাকে ইশারায় বলল, ভয় নাই।

আমি হারামজাদাকে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছি। এতো কাছে থেকে আগে কখনও মিলিটারি দেখিনি। এই প্রথম দেখছি। লুঙি পাঞ্জাবি পড়া বলেই বোধ হয় একে দেখাচ্ছে খুব সাধারণ বাঙালির মতো। শুধু রঙটা বেশি ফর্সা আর নাকমুখ কাটা কাটা।

আমি ফুলিকে বললাম --এর নাম কী?

ফুলি গড়গড় করে বলল, এর নাম দিলদার। লেফটেন্যান্ট। বাড়ী হলো বালাকোটে। রেশমি নামে ওদের গাঁয়ের একটি মেয়ের সঙ্গে ওর খুব ভাব। যুদ্ধের পর দেশে ফিরে গিয়ে সে মেয়েটাকে বিয়ে করবে। রেশমি যে কতো সুন্দর তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না। অবিকল ডানাকাটা পরী। রেশমির ছবি দেখবে? দিলদারের পকেটে সবসময় রেশমির ছবি। বালিশের নীচে এই ছবি না রাখলে সে ঘুমুতে পরে না।

কারো ছবি দেখারই আমার কোন শখ ছিল না। আমার মাথা তখন ঘুরছে। এক সমস্যায় পড়লাম। ফুলি তারপরও একটা ছবি দেখাল। ঘাগরা পড়া একটা মেয়ে। মুখ হাসি হাসি। ফুলি বলল, মেয়েটা সুন্দর কেমন দেখলে!

আমি বললাম, হু

এখন তুমি ওকে মাধবখালি পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা কর। আজ রাতেই কর।

দেখি।

দেখাদেখির কিছু না। তুমি রওনা হও।

মাধবখালি তো পায়ে হেঁটে যাওয়া যাবে না। নৌকা লাগবে।

নৌকার ব্যবস্থা কর। ওকে পার করার জন্য আজ রাতই সবচেয়ে ভালো। ভয়ে বেচারা অস্থির হয়ে গেছে। পানি ছাড়া কিছু খেতে পারছে না।

আমি শুকনা গলায় বললাম, দেখি কী করা যায়।

ফুলি মিলিটারির দিকে তাকিয়ে আনন্দিত গলায় বল, তোমার আর কোন ভয় নাই। আমার স্বামী তোমাকে নিরাপদে পৌঁছে দিবে। তুমি এখন চারটা ভাত খাও। মিলিটারি বাংলা ভাষার কী বুঝলো কে জানে। সে শুধু বললো, শুকরিয়া বহেনজি। লাখো শুকরিয়া।

ফুলি ভাত বেড়ে নিয়ে এলো। তাকে খাওয়াতে বসল। আমাকে বলল, তুমি দেরি করো না--চলে যাও।

আমি ছাতা হাতে বাড়ী থেকে বের হলাম। তখনও ঝুম বৃষ্টি চলছে। তবে বাতাস কমে গেছে। আমি দ্রুত চিন্তা করার চেষ্টা করছি। কী করা যায় কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। স্ত্রীকে কথা দিয়েছি, আল্লাহ পাকের কালাম ছুয়ে প্রতিঞ্জা করেছি। সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা দরকার। ছেলেটার জন্য মায়াও লাগছে। বাচ্চা ছেলে। এরা হুকুমের চাকর। উপরওয়ালার হুকুমে চলতে হয়। তাছাড়া বেচারা জীবনই শুরু করে নাই। দেশে ফিরে বিয়ে-সাদি করবে। সুন্দর সংসার হবে। আবার অন্যদিকও আছে। একে মাধবখালি পৌঁছে দিলে ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়বে। নৌকIর মাঝিই বলে দিবে। কোনকিছুই চাপা থাকে না। তারপর রাজাকার হিসাবে আমার বিচার হবে। দেশের মানুষ আমার গায়ে থু থু দিবে। পকিস্থানি মিলিটারি শুধু আমাদের পরম শত্রু তা না, এরা সাক্ষাৎ শয়তান। এদের কোন ক্ষমা নাই।

আমি নৌকার খোঁজে গেলাম না। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে খবর দিলাম। রাত দুটার সময় তারা এসে দিলদারকে ধরে নিয়ে গেল। দিলদার আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একবার শুধু বলল, বহেনজি। তারপই চুপ করে গেল। আমার স্ত্রী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। দিলদারকে সে রাতেই গুলি করে মারা হলো। মৃত্যুর আগেও সে কয়েকবর আমার স্ত্রীকে ডাকলো, বহেনজি, বহেনজি।

আমার স্ত্রী মারা গেল সন্তান হতে গিয়ে। একদিক দিয়ে ভালই হলো। বেঁচে থাকলে সারা জীবন স্বামীকে ঘৃণা করে বাঁচতো। সে বাঁচা তো মৃত্যুর চেয়ে খারাপ। বুঝলেন ভাই সহেব, যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস। যুদ্ধে শুধু পাপের চাষ হয়। আমার মতো সাধারণ একটা মানুষ কতগুলো পাপ করলো চিন্তা করে দেখেন। রোজ হাশরে আমার বিচার হবে। আল্লাহ পাক পাপ-পূণ্য কিভাবে বিচার করেন, আমাকে কী শাস্তি দেন, এটা আমার খুব দেখার ইচ্ছা।

৪টি মন্তব্য:

  1. এগল্প খুব চেনা। অনেক সময়ে অনেক মানুষের কাছে এমন কাহিনি শুনেছি, যা গল্প হয়ে উঠেছে। জীবনের এই দলিল আশ্চর্‍য সরলতায় পরিবেশন করার জন্যে কী অনন্য মুন্সিয়ানা লেখকের... স্যালুট!
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন
  2. মানুষ চাইলেও অনেক কিছুই করতে পারে না ।আসলে করার মতো উপায়ই থাকেনা ।দুনিয়ায় সেই অসহায় অবস্থায় যে পড়ে সেই বোঝে ।মনুষ্যত্ব ,বিবেক বর্জিত হয় ।পাপ না কি পুণ্য হলো ভাবার অবকাশ থাকে না ।এমনই গল্পটি ।ধন্যবাদ লেখক কে ॥

    উত্তরমুছুন
  3. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  4. অনিমেষ নন্দী২৩ জুন, ২০১৭ ১১:৩০ PM

    সত্যিি অপূর্ব..

    উত্তরমুছুন