শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

মোমিনুল আজম এর গল্প- কুদ্দুস সাহেবের কুকুর

শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সড়কের পশ্চিম দিকে নাবিস্কোর পাশ দিয়ে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় ঢুকে একেবারে রেল লাইনের কোল ঘেষে তেঁজগা পোষ্টাল কোয়ার্টারের নীচতলার কুদ্দুস সাহেবের সরকারি বাসার ভিতর দুটি বিশাল সাইজের কুকুর যখন ঘেউ ঘেউ শুরু করলো তখন কলোনীর লোকজন তো বটেই, আশেপাশের দুচার বাসার লোক প্রাচীরের উপর ও গেটের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে তা দেখার চেষ্টা করলো। এলাকা এবং বাসার পরিবেশ এমন দুটি অভিজাত কুকুরের জন্য মানানসই নয়, সে কারনেই লোকজনের ঔৎসুক্য একটু বেশি।

লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুদ্দুস সাহেব দুটি বিশাল সাইজের কুকুর নিয়ে কোয়ার্টারের অপ্রসারিত মাঠে সবাইকে ডাকলেন। বলা যায় এ উপলক্ষ্যে তিনি একটি প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করলেন। উভয় পাশের বিল্ডিংয়ের বারান্দায় শুকোতে দেয়া কাপড় চোপড় সরিয়ে বৌ-ঝি আর বাচ্চারা কুকুর দুটি দেখার জন্য এসে দাড়িয়েছে। সেখানে তিনি কুকুরের বার্থ সার্টিফিকেট, হেলথ কার্ডসহ যাবতীয় তথ্য প্রদর্শন করে বললেন-কুকুর দুটি নববর্ষের উপহার হিসেবে রাশিয়া থেকে তার ছেলে পাঠিয়েছে। এটি কোন ক্ষতিকারক প্রানী নয়, ফুল ভ্যাকসিনেশন করা এবং রাশিয়ার ডগ ট্রেনিং সেন্টারে বিহেভিয়ারের ওপর প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত। এটি কাউকে কামড় দিবে না আর সারাক্ষন থাকবে প্রাচীরের ভিতর তাই কুকুর নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার কোন কারন নেই। কুদ্দুস সাহেব চেয়ারে বসে যখন এসব কথা বলছিল কুকুর দুটি তখন তার দুপাশে ব্রিটিশ রয়াল ফোর্সের মতো স্থির হয়ে দাড়িয়েছিল। সবকিছু শুনে প্রবীন কর্মচারি মুন্সি আব্দুল আউয়াল বললেন- যে বাড়িতে কুকুর থাকে সে বাড়িতে ফেরেসতা প্রবেশ করে না, আপনি তো স্যার বিদেশী কুকুর এনে পুরা কলোনীরে ফেরেসতাবিহীন করে ফেললেন। একথা শুনে উপস্থিত আর সকলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। এর শরিয়তসম্মত কোন সদুত্তর কুদ্দুস সাহেবের জানা ছিল না। 'আরে না-' এমন একটা হেয়ালিপূর্ণ কথা বলে তিনি সেখান থেকে উঠে যান।

আমরা যারা প্রতিদিন এ রাস্তা দিয়ে মাইক্রোবাসে সরকারি অফিসের ড্রাইভারের আপত্তি সত্বেও যাতায়াত করি তাদের কাছে বিষয়টি কৌতুহলের ছিল না। গত একমাস কুদ্দুস সাহেব মাইক্রোবাসে উঠেই শুরু করতেন তার জন্যে পাঠানো কুকুরের বর্ণনা। প্লেনে আনা নেয়া বাবদ কত খরচ হচ্ছে, কত ডলারের ইন্সুরেন্স করা হয়েছে, সাথে কিকি কাগজপত্র এবং কি পরিমান পেটফুড আসছে তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতেন। কুকুর এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর আগেই তার চেহারা, স্বভাব-চরিত্র আমাদের সবার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। দীর্ঘ সময়ের যাত্রায় আমরা যখন মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে মাইক্রোবাসে বসে থাকি, তখন কুদ্দুস সাহেবের কুকুর সম্পর্কিত অতি উৎসাহ আমাদের মাঝে সাময়িক বিনোদনের সৃষ্টি করে। তেঁজগাতে তিনি ওঠার পর বাকী পথটুকু রসালো আলাপে ভালোভাবেই কেটে যায়।

নীচতলায় থাকার কারনে কুদ্দুস সাহেব কুকুর রাখার জন্য বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলেন। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ডি-টাইপ কোয়ার্টারে অনেকটা ফাঁকা জায়গা ছিল। কুকুরের আগমন উপলক্ষ্যে সেখানে কাঠ ও টিন দিয়ে কুকুরের জন্য মানানসই অস্থায়ী একটা ঘর তৈরি করা হয়। তিনি অবশ্য ঘরেই রাখতে চেয়েছিলেন কুকুরদুটিকে। ইংরেজি সিনেমায় তিনি দেখেছেন এজাতীয় কুকুর মালিকের সাথে ড্রয়িংরুম, সোফা, বেডরুম শেয়ার করে এমনকি একসাথে ঘুমায়। পরিবারের সদস্যদের মতোই তাদের চালচলন। তার অসুস্থ্য স্ত্রীর প্রবল আপত্তিতে সেটা আর সম্ভব হয়নি।

কুকুর এয়ারপোর্টে আসার আগেই তিনি সরকারি নিয়মনীতি মেনে একটি মাইক্রোবাস চেয়ে উর্দ্ধতণ কর্তপক্ষের কাছে আবেদন করেছিলেন এবং উর্দ্ধতণ কর্তপক্ষ তা অনুমোদনও করেছিলো - 'সরকারি অফিসের মাইক্রোবাস কর্মকর্তাদের আনা নেয়ার জন্য, কুত্তা পরিবহনের জন্য নয়' এ যুক্তি তুলে ড্রাইভাররা সে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকে। অগত্যা কুদ্দুস সাহেবকে এয়ারপোর্ট থেকে কুকুর আনতে হয় তিন টনের একটি মিনি ট্রাক ভাড়া করে।

উত্তরা রুটের মাইক্রোবাসে একটি রেওয়াজ আছে। মাইক্রোবাসে যাতায়াতকারি কর্মকর্তাদের কোন সুসংবাদে আপ্যায়নের বিষয়টি বাধ্যতামুলক ছিল। এ আপ্যায়নপর্ব সাধারণত সেরে ফেলা হতো অফিস থেকে ফেরার পথে কোন রেষ্টুরেন্টে। মাঝে মাঝে তা ইচ্ছাকৃত না হয়ে জোরপূর্বক হয়ে যেত। এটি সমাধা করতে গিয়ে অনেক সময় বিরম্বনার সৃষ্টি হতো।

শামসুল আলম স্যার আমাদের মাইক্রোবাসের উত্তরা রুটের নিয়মিত যাত্রী। তার প্রমোশন হয়েছে সম্প্রতি, তিনি গণ মাইক্রোবাস ছেড়ে প্রাইভেট কারের যাত্রী হবেন। মাইক্রোবাসের রেওয়াজ অনুযায়ী খাওয়াবেন-খাওয়াবেন করেও খাওয়াচ্ছেন না। কৃপণ হিসেবে তার একটা পরিচিতি আছে। এর মাঝে একদিন গুজব ছড়িয়ে পড়ে অফিসের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর পদটিতে তার পোষ্টিং হয়েছে। একটির পর আর একটি সুসংবাদ। অফিস থেকে ফেরার পথে স্যারকে আপ্যায়নের বিষয়টি স্মরণ করালে সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি রাজী হয়ে যান। রাজী হওয়ার আগে স্যার অবশ্য মুচকি হেসে বলেছিলেন- এ পদটির জন্য তিনি সামান্য তদবির করেছিলেন। যা হোক অফিস শেষে অভিজাত একটি রেষ্টুরেন্টে একটি ভাল আপ্যায়নপর্ব সারা হয়। পরেরদিন সকালবেলা অফিসে জানাজানি হয়ে যায়, দ্বিতীয় ক্ষমতাধর পদটিতে শামসুল আলম স্যারের পোষ্টিং হয়েছে। সুযোগ সন্ধানী কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারি স্যারকে আগাম অভিনন্দন জানান, স্যারও কৃতজ্ঞচিত্তে সে সকল অভিনন্দন গ্রহণ করেন। শেষ বিকেলে মন্ত্রণালয় থেকে অফিস আদেশ আসলে দেখা যায় সবচেয়ে কম ক্ষমতাধর পদটিতে তার পোষ্টিং হয়েছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে অফিস শেষে স্যার মন খারাপ করে মাইক্রোবাসে বসে অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন কিন্তু মাইক্রোবাসে যাতায়াতকারি অন্যসব কর্মকর্তা এই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অফিস থেকে বাসায় ফেরে। সেদিন অফিস ফেরত মাইক্রোবাসের একক যাত্রী ছিলেন শামসুল আলম স্যার।

যে কথা বলছিলাম, কুদ্দুস সাহেবের কুকুরের আগমন উপলক্ষ্যে আপ্যায়নপর্ব কোথায় সমাধা করা হবে তার জন্য রেষ্টুরেন্ট বাছাইয়ের কাজ চলছিল। এর মাঝে কুদ্দুস সাহেব ঘোষণা দিলেন, প্রচলিত রীতি ভেঙ্গে এটির আয়োজন করা হবে তার বাড়ীতে। বাড়ীতে আপ্যায়নের মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে তা আমাদের বললেন না, তবে নির্ধারিত দিনে অফিস শেষে তার বাসায় গিয়ে রহস্যের কিছু নমুনা পাওয়া গেল। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তার পুত্র ও বিদেশী পুত্রবধুর সাথে, গতকালই তারা এসেছে রাশিয়া থেকে। বউ নিয়ে এই প্রথম তার ছেলের আগমন।

কুদ্দুস সাহেবের পুত্রের সাথে তার গায়ের রঙয়ের সামঞ্জস্য থাকলেও পুত্র তার মতো দীর্ঘদেহী নয়। চেহারায় একটা খসখসে ভাব আছে। 'বিদেশে থাকি, আমিই সেরা' এমন একটা নাক উঁচু ভাব লক্ষ্য করা যায় তার চালচলনে, কথাবার্তায় অমিসভ পাভোলভ জাতীয় শব্দ ইচ্ছাকৃতভাবে আনতে চায়। পুত্রবধু তার ছেলের চেয়ে ইঞ্চি ছয়েক লম্বা। দীর্ঘদেহের কারনে তার মাঝে নারীসুলভ কমনীয়তার কিছুটা অভাব আছে। বিদেশী একটি মেয়েকে সনাতন বাঙ্গালী নারীর রুপ দিতে গিয়ে তার হাতে পড়ানো হয়েছে একগাছা চুড়ি, কানে দুল আর গলায় ঝোলানো হয়েছে সোনার হাড়। এ অলঙ্কারগুলি দিয়েছে কুদ্দুস সাহেব তার নতুন ছেলের বউকে। সবুজ রঙয়ের একটি শাড়ী পড়ানো হয়েছে। সে শাড়ী পড়ে তিনি যখন আমাদের সামনে আসলেন তখন বোঝা যাচ্ছিল শাড়ী পরণে রাখতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ দেহ এবং তা হাত দিয়ে কষ্ট করে ধরে রাখার কারনে শাড়ীর নীচের পাড় মেয়েটির হাঁটু আর গোড়ালির মাঝেখানে অবস্থান নিয়েছে। নীচের পা দেখে ক্ষেতের ধবধবে সাদা মুলার কথা মনে হচ্ছে। রাশিয়ান ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানেন না তাই কুদ্দুস সাহেবের ছেলের বৌয়ের সাথে আমাদের আলাপ জমানো সম্ভব হয় নি।

কুদ্দুস সাহেব তার পুত্রবধুর গুণের প্রশংসায় যখন ব্যস্ত, আমাদের অনেকের চোখ তখন দরজার ফাঁক গলে বাইরে উঁকি ঝুঁকি দিতে থাকে কুকুরের খোঁজে। কুদ্দুস সাহেবকে তা বলতেই তিনি বাইরে গেলেন। কিছুক্ষন পর দুটি কুকুর নিয়ে ড্রইং রুমে আসেন। ভয়াল দর্শন কুকুর দুটি তার পা ঘেষে হেলে দুলে ভিতরে প্রবেশ করে। কুদ্দুস সাহেব আমাদের দিকে তাকিয়ে 'সিট' বলার সাথে সাথে কুকুর দুটি মেঝের মাঝখানে পাশাপাশি বসে আমাদের মুখের দিকে জিহ্বা বের করে তাকিয়ে থাকে। কুকুরের বিরাটত্ব আর তার মুখের হিংস্র ভাব দেখে আমাদের অনেকে সোফার উপর পা তুলে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। দুজন মেয়ে কলিগ ড্রইং রুমে রাখা বিছানার উপর উঠে এককোনায় জড়োসড়ো হয়ে দাড়িয়ে থাকে আর কুকুরের নড়াচড়ায় ভয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ওমা! ওমা! করতে থাকে।

অফিসে যাওয়ার পথে কিংবা অফিসে কুদ্দুস সাহের মুখে সারাক্ষন থাকে তার কুকুরের কথা। প্রতিদিন ভোরে এখন তিনি বের হয়ে যান কুকুর নিয়ে। কুকুরের লেশ থাকে তার হাতে। ওদের পিছনে হাটতে, দৌড়াতে গিয়ে তারও উপকার কম হচ্ছে না। তার ডায়াবেটিস লেবেল ছুইছুই করছিল, গত সপ্তাহের পরীক্ষায় দেখে তা অনেকটা নেমে গেছে। এটি যে কুকুর নিয়ে সকাল সন্ধ্যা হাঁটার কারনে হয়েছে তা ভেবে তিনি তৃপ্ত। রাতে গাছ থেকে খড়কুটো পড়লেও তারা ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। আগে মাঝে মাঝে প্রাচীর টপকে ছিঁচকে চোর বারান্দা থেকে শাড়ী পেটিকোট কিংবা সার্ট প্যান্ট নিয়ে যেত এখন আর সে ভয় নেই। তিনি মনে করেন কুকুর দুটি এখন তার সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব পালন করছে।

কুকুর নিয়ে তিনি এখন এমনই ব্যস্ত যে তার সহকর্মী কিংবা অফিসের লোকজন এ নিয়ে তার সাথে মাঝে মাঝেই ঠাট্টা মশকরা করে। সেদিন অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ীতে জাকির বলছিল-

; কুদ্দুস সাহেব ঢাকা শহরে কিন্তু নাম বদলের একটা সংস্কৃতি চালু আছে। এই যেমন ধরেন ঘোড়া মজিদ, মুরগী মিলন, বিলাই তারেক, কালা জাহাঙ্গীর। সেক্ষেত্রে কুকুরপ্রীতি দেখে কউ যদি আপনার নাম পরিবর্তন করে ফেলে তাহলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

অফিসে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষ কাজের জন্য তাকে রুমে সালাম দিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে-

; কুদ্দুস সাহেব আপনার কুকুরের শরীর ভালো?

উর্দ্ধতন কতৃপক্ষের এমন কুশল বিনিময়ে তিনি বেশ খুশি হন এবং মহা উৎসাহ নিয়ে তিনি তাদের শারীরিক অবস্থা বর্ণনা করেন।

; স্যার আসার পর থেকে ডেভিডের অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। কোনকিছুতে উৎসাহ নেই, খাওয়া দাওয়ার রুচিও কম। গত সপ্তাহে নিয়ে গিয়েছিলাম পশু হাসপাতালে। তারা সবকিছু দেখেশুনে একটা ঔষধ দিলেন। গতকাল থেকে আল্লাহর রহমতে একটু ভাল কিন্তু শেলী স্যার একদম ফিট। মনেই হয় না এক পরিবেশ থেকে আর একটা নতুন পরিবেশে এসেছে।

কুদ্দুস সাহেবের এমন বর্ণনা শুনে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষ কৌতুক বোধ করেন। তিনি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করেন-

; এই ডেভিড আর শেলীটা কে?

কুদ্দুস সাহেব আশ্চর্য হওয়ার ভঙ্গিতে বলেন-

; কেন স্যার, আমার দুই কুকুরের নাম। বার্থ সার্টিফিকেটে ওদের তো এ নামই আছে।

কুকুরের আবার বার্থ সার্টিফিকেটও আছে? এমন কথা জিজ্ঞেস করে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষ পাশে বসা তার ষ্টেনোর দিকে তাকিয়ে থাকে।

;স্যার বলেন কি? ওদের যে হেলথ সার্টিফিকেট আছে তাতে কবে কোন ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে তার সবকিছু লেখা আছে। সেদিন পশু হাসপাতালে হেলথ কার্ডটি নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তাররা তো দেখে অবাক। আর ওদের রাশিয়াতে যে ইন্সুরেন্স ছিল তাতো স্যার একেকজনের জন্য ডলারে পাঁচ হাজার কিন্তু ইন্সুরেন্সটি এখানে কাজ করছে না। গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম ডেলটা লাইফ ইন্সুরেন্সে। ওরা সবকিছু শুনে বললো- এই মুহুর্তে তারা ডেভিড আর শেলীর জন্য ইন্সুরেন্স দিতে পারছে না তবে আমার আগ্রহের কথা শুনে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট বললেন-দুএক মাসের মধ্যে তারা এনিমেল হেলথ ইন্সুরেন্স চালু করার চিন্তাভাবনা করবে এবং সেটি চালু করলে প্রথম কাষ্টমার হিসেবে তারা আমাকেই নিবে, ওরা আমার ফোন নম্বর রেখে দিয়েছে। স্যার, আমাদের পোষ্টাল লাইফ ইন্সুরেন্সে একটা এনিমেল হেলথ ইন্সুরেন্স চালু করা দরকার- এই বলে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। স্যার একবার কুদ্দুস সাহেবের দিকে আর একবার ষ্টেনোর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন।

কুকুর নিয়ে কুদ্দুস সাহেব বেশ আনন্দেই আছেন। তাদের গোসল করানো, দুবেলা নিয়ম করে হাঁটানো, ঠিক সময়ে বিদেশ থেকে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ানো পাশাপাশি দেশীয় কিছু খাবারের প্রতি তাদের অভ্যস্থ করে তোলা এ নিয়েই তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন। কুকুর দুটিও তাকে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। বারান্দায় বসে সে যখন টেনিস বলটি প্রাচীরের কাছে ছুড়ে মারে তখন কুকুর দুটির মাঝে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কে আগে বলটি নিয়ে এসে প্রভুর হাতে দিবে। ঘরে তার অসুস্থ্য স্ত্রী, আগে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় বসতেন। কুকুরের ভয়ে এখন তিনি আর বের হন না। অন্ধকার রুমে বসে ছেলের মুন্ডপাত করেন-

; হারামজাদা আর জিনিস পায়নি, বিদেশ থেকে পাঠিয়েছে দুটা কুত্তা। সেই কুত্তার পিছনে বুড়াটা এখন সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে। আগে একটু সেবাযত্ন করতো, খাওয়াটা এগিয়ে দিতো। এখন ওসবের বালাই নেই। আমি মরে গেলে কুত্তা নিয়েই থাকতে হবে।

চাকুরির প্রতিও কুদ্দুস সাহেবে মায়া অনেকটা কমে গেছে। কিছুদিন পর অবসর তাই শেষ সময়টা কোনমতে কাটিয়ে দিতে পারলেই হয়।

ইতোমধ্যে কুদ্দুস সাহেব সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। আমাদের মাইক্রবাসকে আর তেঁজগা এসে নাবিস্কোর পাশ দিয়ে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় পশ্চিম দিকে যেতে হয়না। ড্রাইভার মিরাজ একারনে বেজায় খুশি। রাস্তার মাঝখানে তাকে আর গাড়ীর চাকা বদলানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় না। আমরাও খুশি, মাঝে মাঝে গাড়ী গাঁতার মধ্যে পড়ে যেত। তা তুলতে আমাদের এখন গাড়ী ঠেলতে হয় না। তেঁজগার এ মোড়টা পার হওয়ার সময় তার গাড়ীর বেগ একটু বেড়েই যায়। আমরাও এ জায়গা অতিক্রম করার সময় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে কুদ্দুস সাহেবের সাথে দেখা হয় অফিসের কড়িডোরে। তিনি ব্যস্ত পেনশনের কাগজপত্র তৈরি করার কাজে। আমরাও ভুলে গেছি কুদ্দুস সাহেবের কথা।

এর মাঝে হঠাৎ একদিন কুদ্দুস সাহেবের দেখা উত্তরার হাউস বিল্ডিং মোড়ে। তিনি বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, অফিসে যাবেন পেনশনের টাকা ওঠাতে। আমরা তাকে দেখে থামলাম, উঠিয়ে নিলাম মাইক্রোবাসে। কিন্তু একি অবস্থা, ছয় ফুট উচ্চতার কাছাকাছি কুদ্দুস সাহেবকে পাঁচ ফুট উচ্চতার বাঁকানো বাশের মতো মনে হচ্ছে। ভরাট মুখমন্ডল ভেঙ্গে পাপড় ভাঁজার মতো অসমতল মুখায়বব তৈরি হয়েছে।

গাড়ীতে ওঠার পর সবাই উদগ্রীব তার কুকুরের খবর শোনার জন্য। কুদ্দুস সাহেব ফোঁপানো গলায় বললেন-তার দুটি কুকুরই মারা গিয়েছে। আমরা প্রায় সমস্বরে বললাম- কারন কি? কিভাবে?

গাড়ীতে যেতে যেতে বললেন সেই করুন কাহিনী। অবসর গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে তাকে সরকারি বাসা ছেড়ে দিতে হবে। সে অনুযায়ী তিনি বাসা খোঁজা শুরু করেন। তিনি খুঁজছিলেন দুরুমের একটি বাসা তার সামর্থের মধ্যে। তিনি পেয়েছিলেন সে বাসা কিন্তু কুকুরের কথা শোনার পর কেউ তাকে বাসা ভাড়া দেয়নি। তিনি বাড়ীওয়ালাদের অনেক অনুরোধ করেছিলেন, বাসা পরিস্কার রাখবেন সে বিষয়ে লিখিত গ্যারান্টি দিতে চেয়েছিলেন, ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু কোন অনুরোধে কাজ হয়নি। বাংলো বাড়ী পাওয়া যায় কিন্তু সে বাড়ীর ভাড়া দেয়ার মতো সামর্থ তার নেই। তার এমন সামর্থও নেই যে একেবারে বাড়ী কিনে উঠে যাবেন।

সমস্ত খোঁজাখুঁজি যখন বিফলে গেল তখন তিনি তার অবসরের টাকা দিয়ে আশুলিয়ার একদম ভিতরে দুকাঠা জায়গা কেনেন। নীচে ইট উপরে টিনের দুরুমের একটি দোচালা ঘর করেন। জমি কেনা, ঘর তৈরি করতে তার পেনশনের প্রায় সবটাকা শেষ হয়ে যায়। অসমাপ্ত এ বাড়ীতে তিনি উঠেছিলেন অসুস্থ্য স্ত্রী আর দুটি কুকুর নিয়ে। ধুলোবালি আর স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে তার কুকুর দুটি প্রায় অসুস্থ্য হয়ে পড়তো। বিদেশ থেকে ছেলে কুকুরের খাওয়া পাঠাতো, অজানা কারনে তা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি তার সাধ্যমতো বাজার থেকে কিনে কুকুরদের খাওয়াতেন। মাসের শেষে এমনও দিন গেছে পেনশনের টাকা শেষ, ঘরে বাজার করার টাকা নেই তবুও তিনি কুকুরের খাওয়া কিনে আনতেন। অপরিশোধিত খাওয়া, ধুলোবালি আর স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে তার কুকুর দিনে দিনে নিস্তেজ হতে থাকে। প্রথমদিকে সাধ্যমতো চিকিৎসা করিয়েছেন, পরে অর্থের অভাবে তাও আর করাতে পারেননি।

একদিন রাতের বেলা তার দুটো কুকুর মারা গেল, মারা যাওয়ার আগে তারা বেশ অসুস্থ্যই ছিল- এই বলে কুদ্দুস সাহের বাচ্চা ছেলের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। তার কষ্টে আমাদের মুখ থেকে কোন সান্তনার বাণী বের হলো না। ড্রাইভার মিরাজও তার কষ্টে এতোটাই ব্যথিত যে তাকে দুতিনবার হার্ড ব্রেক করতে হলো।

সপ্তাহ দুয়েক পরে অফিস থেকে ফেরার পর আমরা কয়েকজন মিরাজের মাইক্রোবাসে করে গেলাম কুদ্দুস সাহেবের আশুলিয়ার বাড়ীতে, দীর্ঘদিনের অফিস যাওয়ার সাথী ও এক সময়ের সহকর্মীকে সান্তনা দিতে। ঠিকানা দেখে কুদ্দুস সাহেবের বাড়ী খুঁজে পেতে বেশ কষ্টই হলো। ঠিকানা মিলিয়ে, পথের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে একটা রাস্তার মোড়ে পৌঁছলাম আমরা। এখান থেকে রাস্তাটা চলে গিয়েছে অন্যদিকে। মোড়ে পান বিড়ি সিগারেটের দুটি টঙ দোকান, চা সিঙ্গারা পাওয়া যায় এমন একটা রেষ্টুরেন্ট আছে। রেষ্টুরেন্টের দরজা রাস্তার মোড়ের দিকে এবং পিছনের প্রান্ত জমির মধ্যে খুটির উপর ঝুলে আছে।

আমরা যখন মাইক্রোবাস থেকে রাস্তার মোড়ে নামি তখন রেষ্টুরেন্ট থেকে উচ্চস্বরে হিন্দিগান ভেসে আসছিল। এখান থেকে প্রায় তিনশ গজ হেঁটে কুদ্দুস সাহেবের বাড়ী যেতে হবে মাথার সিঁথির মতো সরু রাস্তা দিয়ে যার দুপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত।

একজনের দেখিয়ে দেয়া বাড়ীর কাছাকাছি যেতেই অজস্র কুকুরের আনাগোনা আর ঘেউ ঘেউ শব্দে আমরা একটু ভয় পেয়ে গেলাম। তাছাড়া কুকুরের বিষ্ঠার একটা কটু গন্ধ নাকে এসে লাগল। দুর থেকে কুদ্দুস সাহেবের নাম ধরে কয়েকবার ডাকাডাকি করতেই তিনি একটি টিনের গেট খুলে বের হয়ে আসলেন। তার পিছনে পিছনে বের হলো আট দশটি বিভিন্ন সাইজের নেড়ি কুকুর। আমাদের দেখে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিলো। তিনি কুকুরগুলোকে ধমক লাগালেন। সবগুলো কুকুর পিছনের দুপায়ের ভিতর লেজ ঢুকিয়ে সুরসুর করে বাড়ীর ভিতর ঢুকে গেল।

আমাদের দেখে কুদ্দুস সাহেব খুশিই হলেন। বিষন্ন চেহারায় কিছুটা হলেও আনন্দের রেখা ফুটে উঠলো। এক সময়ের প্রানোচ্ছল কুদ্দুস সাহেব আমাদের নিয়ে ঢুকলেন তার নতুন বাড়ীতে। বাড়ীর চতুর্দিকে ইটের প্রাচীর দেয়া, তার গাঁয়ে এখনও বালি সিমেন্টের প্রলেপ লাগানো হয়নি।

বাড়ীর ভিতর ঢুকে আমরা থ হয়ে গেলাম। অজস্র দেশী কুকুরে বাড়ীটা ভর্তি। তারা একে অপরকে কামড়া কামড়ি করছে, কামড় খেয়ে আরেকদল ক্যাউ ক্যাউ শব্দ করছে। কয়েকটি ধুলোবালির মধ্যে গড়াগড়ি দিয়ে আ-উ-উ শব্দ করে আনন্দ প্রকাশ করছে। উঠোনের পশ্চিম কোনায় কবরের মতো দুটো ঢিবি। তার উপর তিনচারটি কুকুর সামনের দুপায়ের মাঝে মাথা রেখে শেষ বিকেলের রোদের ওম নিচ্ছে আর মাঝে মাঝে পিটপিট চোখ খুলে আমাদের মতো আগন্তককে দেখছে। একটা কুকুরকে দেখলাম ঘরের কোনায় লাগানো একটা সুপারি গাছের গোড়ায় এক পা তুলে প্রাকৃতিক কর্ম সারছে।

বাড়ীর আঙ্গীনায় কবরের আদলে দুটো সিমেন্টের ঢিবির কথা কুদ্দুস সাহেবকে জিজ্ঞেস করাতে তিনি জানালেন এদুটি তার ডেভিড আর শেলীর কবর। অনেক যত্ন করে বাঁধিয়ে দিয়েছেন তিনি। কুকুর দুটি মারা যাওয়ার পর তিনি দুএকটা কুকুরকে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করতেন, এরাই আশেপাশের বাকী সব কুকুরকে ডেকে নিয়ে আসে। ওদের নিয়েই এখন তার সারাদিন কাটে, ওদের জন্য দুবেলা খাবার সরবরাহ করতে তার পেনশনের প্রায় পুরো টাকাটা চলে যায়।

কুকুরের জন্য কুদ্দুস সাহেবের শোক, দয়ার্ত মনের কথা চিন্তা করতে করতে বিদায় নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে আসি। সূর্য তখন পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। তার ম্লান আলো আমাদের মনটাও বিষন্ন করে রাখে। হেঁটে হেঁটে মোড়ে এসে রাস্তার পাশে সেই রেষ্টুরেন্টে ঢুকে চায়ের কথা বলে নিজেরা চুপচাপ কুদ্দুস সাহেবের কথা আলাপ করতে থাকি। চায়ের দোকানে আরও দুতিনজন লোক চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আমাদের মতো আগন্তককে লক্ষ্য করছিল। কিছুক্ষন পর একজন ঔৎসুক্য নিয়ে বললেন-

;ভাই এদিকে কোথায় গিয়েছিলেন?

আমরা বললাম-কুদ্দুস সাহেবের বাড়ীতে।

তিনি প্রায় সাথে সাথেই বললেন- কোন কুদ্দুস? এখানে তো তিন কুদ্দুস থাকেন। এই আইলের পশ্চিম দিকে সৌদি কুদ্দুস, শেষ মাথায় কুত্তা কুদ্দুস আর দক্ষিন-পুব দিকে ডলার কুদ্দুস।

আমাদের আর বুঝতে বাকী রইলো না আমরা আসলে কোন কুদ্দুসের বাড়ীতে গিয়েছিলাম।


লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম

জন্মেছেন - ১৯৬৫ সালে, গাইবান্ধায়
পড়াশুনা করেছেন- শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কাজ করেন- বাংলাদেশ ডাক বিভাগে
বর্তমানে- কানাডায় থাকেন
ফিলাটেলি- ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ নামে একটি প্রকাশনা আছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন