শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

মনি হায়দারে গল্প- সোনার খাঁচায় আবিদ হাসান

আবিদ হাসান বাসের মধ্যে গন্ধটা পেলেন। না, ঠিক বাসের মধ্যে থেকে আসছে না। সামনের সিটে দুই রমনী এসে বসার পরই তিনি গন্ধটা পাচ্ছেন। আবিদ হাসান তার পাশের যাত্রীর দিকে তাকালেন, পাশের যাত্রীরা নির্বিকার। কারো মুখ হা, ঘুমুচ্ছে । কেউ সিরিয়াস ভংগিতে পত্রিকা পাঠ করছে। পাশের সিটের লোকটা সম্ভবত গুলিস্তান থেকে উঠেছে। সচিবালয়ের সামনে থেকে বাসে উঠেছেন আবিদ।
কাউন্টারের বাস। যারা এই বাসে যাতায়াত করে, গণবাস থেকে তাদের রুচির একটু পার্থক্য থাকে। আমজনতার ভিড়ে তারা নিজেদের কেউকেটা মনে করে। অফিস ছুটির আধঘন্টা আগে এলে সহজে সিট পাওয়া যায়। যেতেও আরাম লাগে। এই সুবিধার জন্য আবিদ নিয়মিত এই কাউন্টার বাসে অফিসে আসা যাওয়া করেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি নারী শরীরের এই গন্ধ পেয়ে আসছেন। সদ্য আবিস্কৃত অলৌকিক গন্ধটা নিয়ে আলাপ করতেও পারছেন না কারো কাছে। বিষয়টা আকর্ষণীয় কিন্তু নিষিদ্ধ। এটা কি তার মনোরোগ?

অনেকবার ভেবেছেন তিনি মোহিত কামালের কাছে যাবেন। মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামালের কাছে নিশ্চয়ই কোনো ব্যাখা আছে। কিন্তু আলস্য আর সময় স্বল্পতার কারণে যাওয়া হয়ে ওঠে না। আবিদ হাসান ভীষণ অসস্থি বোধ করছেন। তিনি এই সিটে বসতে চাইছেন না। তার শরীর ঝিম ঝিম করছে। গন্ধটা মারাত্মক কটু। বমি বমি ভাব আসছে গলার ভেতর থেকে। সামনের সিটে বসা দুই মহিলার কাছে থাকলেই তিনি নিষিদ্ধ অশরীরী গন্ধটা পাবেন, আর শরীরের ভেতরে এক ধরনের থ্যাতলানো যন্ত্রনা ভোগ করবেনই। মহিলা দুজন ভাড়া খাটে। এবং দিন দুপুরেই ভাড়া খেটে বাসে উঠেছে। ঢাকা শহরটার মানুষ দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। আবিদ হাসানের অসস্থি এখানেই। বাসের শেষের দিকে এখনও তিন চারটে সিট খালি আছে। আবিদ হাসান উঠে পেছনের সিটে বসলেন। দুই একজন যাত্রী তার ঘাড় বাঁকা করে দিকে তাকায়। আবিদ গ্রাহ্য করলেন না। মনে মনে বললেন তোমরা আমার যন্ত্রণা বুঝবে না, ভাইসকল।

শাহবাগ থেকে বাস আবার ছুটতে শুরু করেছে। তিনি শেরাটনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তখন হঠাৎই তার মনে ভাবনা এলো তিনি গন্ধটা কবে থেকে পাওয়া শুরু করেছেন? নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতে চাইলেন, স্মৃতির গহীনে ডুব দিতে চাইলেন, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না। বিরক্তবোধ করলেন নিজের উপর। তার জীবনে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা ঘটছে অথচ মনে নেই কবে কিভাবে তার করায়াত্ত হয়েছিল? নিজের প্রতি বিষিয়ে উঠলেন তিনি, আবিদ হাসান। কেনো মনে পড়ছে না?

হঠাৎ বছর তিনেক আগের এক রাতের স্মৃতি হাসতে হাসতে তার সামনে এলে কোমড় দুলিয়ে হাসতে লাগলো বাসের মধ্যে। আবিদ হাসান বাসের যাত্রীদের দিকে তাকালেন, সবাই সামনের দিকে তাকিয়ে আছে নির্বিকার চোখে। কেউ অর্ধ ঘুম চোখে ধ্যান করছে, কেউ পত্রিকা পড়ছে, কেউ হাই তুলছে, হাসি পেলো আবিদের। বাসে উঠলেই মানুষ ঘুমায় কেনো? তার ভাবনার মধ্যে স্মৃতির হাসি মুখে তাকাতেই স্মৃতিও চোখ মটকে পাল্টা হাসে। স্মৃতি এমন করে পাল্টা হাসতে পারে, আবিদ হাসান অবাক হন।

মনে আছে আবিদ হাসান, আপনার উত্তরার বাসায়

কি উত্তরার বাসায়?

আপনি প্রথম এক রাতে অমৃত সমান এই নিষিদ্ধ গন্ধ পেয়েছিলেন।

তাই?

হ্যাঁ। আপনার স্ত্রী কুমকুম হাসান বাপের বাড়ি গিয়েছিল, প্রায় মাস খানেকের জন্য। স্ত্রীর অভাবে আপনি শারীরিক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ছিলেন। 

তারপর?

এখনও মনে পড়ছে না? 

মাথা নাড়েন আবিদ হাসান- না, এখনও মনে পড়ছে না। 

আপনার শরীরের কাম তাড়নায় আপনি প্রায় দিশেহারা তখন এক বন্ধুর শরণ নিলেন। যে বন্ধু এই লাইনে একজন তুখোড় ওস্তাদ। তাকে বলতেই সে বললে চিন্তা করিস না দোস্ত! তোর বাসায় রাত দশটায় একটা টকটকে মেয়ে পৌঁছে যাবে।

ভেরি গুড। 

কিন্তু একটা সমস্যা হচ্ছে

আপনি কাতর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি সমস্যা?

মেয়েটার রেট একটু বেশি। কারণ মেয়েটি হাই সোসাইটির। বলতে পারিস শখে এই লাইনে কাজ করে মাঝে মধ্যে। অথবা বলতে পারিস শরীরের টেস্ট বদল করে আর কি!

আবিদ প্রাণ খুলে হাসলেন এবং বললেন আমিতো এমন কিছুই চাই। নতুন, একেবারে অন্যরকম, রোমাঞ্চকর উত্তেজনায় ঠাসা। আর টাকা পয়সা নিয়ে ভাবিস না। আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আমিও ওকে সন্তুষ্ট করে দেবো।

ওকে দোস্ত, পৌঁছে যাবে ঠিক রাত দশটায়। 

রাতে মেয়েটি বাসায় এসে কলিংবেল টিপলে আপনি দরজা খুলে দিলেন। অবাক হলেন আপনি, কল্পনার চেয়েও সুন্দর ঝলমলে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আপনার দরজায়। মেয়েটিকে দেখে কথা বলতে ভুলে গেলেন আপনি। নির্নিমেষ কেবল দেখছেন আপনি। 

এটা আবিদ হাসানের বাসা? শেষে মেয়েটিই মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করে আপনাকে।

হ্যাঁ, আসুন। আমিই আবিদ হাসান। 

মেয়েটি ভেতরে ঢোকে, আপনি দরজা বন্ধ করে ফিরে তাকাতেই আপনাকে জড়িযে ধরে মেয়েটি। তারপর আপনাকে নিয়ে বিছানায় যায়, মেয়েটি এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চায় নি। আপনি প্রায় চল্লিশ মিনিট পর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বিছানায় যখন আড়মোড়া ভাঙ্গছিলেন, ঠিক তখনই এই গন্ধটি আপনি আবিস্কার করনে। মনে পড়ছে এখন?

মাথা নাড়েন আবিদ হাসান, হ্যাঁ মনে পড়ছে। আবিদ হাসান নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে শুরু করলেন মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী ছিল। অবাক সুন্দরী। কিন্তু যতোবারই মেয়েটির দিকে হাত বাড়াতে যেতাম সেই নিঃশব্দ, কটু গন্ধ এসে আমাকে ঝাপটে ধরতো। মেয়েটি, যে আমার কাছে তার নাম বলেছিল, বেদানা, সেও কম অবক হয়নি আমার হঠাৎ অদ্ভুত আত্মপীড়নে। কিন্তু সে দমে যাবার পাত্রী ছিল না। অদ্ভুত ছলা আর কলায় তাতিয়ে তাতিয়ে উপভোগের শেষ সীমায় নিয়ে গিয়েছিল বেদানা।

আবিদ হাসান চক্ষু মুদ্রিত করলেন। চলন্ত বাসে বিকেলের প্রখর রোদের মধ্যে তিনি ফিরে গেলেন বছর তিনেক আগের সেই রাতের কাছে। সত্যি সুখের অসাধারণ একটি রাত এসেছিল তার জীবনে। মেয়েটি নিংড়ে নিংড়ে তাকে সুখ দিয়েছিল সারা রাত। মেয়েটি জানতো শরীর সুখের অবাক কলা। যা আমাদের অধিকাংশ বিবাহিত রমনীরা জানে না। তারা কেবল সংসার করে যায়, তারা কেবল সন্তান ধারণ করে যায়, তারা কেবল সন্তান লালন ও পালন করে যায়। একটা রুটিং ওয়ার্কের মতো। এমন কাম সুখ তার স্ত্রী কুমকুম হাসানের কাছ থেকে কোনোদিন পান নি তিনি। কুমকুম হাসানও দেখতে সুন্দরী। চমৎকার ফিগার। শিক্ষিতও বটে। কিন্তু স্ত্রী মাত্র, সংসার যাপন করে যায় দিন রাত্রির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। 

সকালে মেয়েটি উঠে তার পেমেন্ট নিয়ে চলে যায়। পরের সন্ধ্যায় আবিদ হাসান আবার ফোন করেন বন্ধুটিকে দোস্ত, মেয়েটিকে আজকেও চাই। 

বন্ধু হাসে, আর পাবি না।

কেনো? টাকা বেশি লাগলে দেবো কিন্তু ওকে আমি আজ রাতেও চাই।

লাভ নেই বন্ধু। 

কেনো?

ও কোনো পুরুষের কাছে একবার, মাত্র একবারই যায়।

বুঝতে পারলাম না তোর কথা। 

প্রথমে কেউই বুঝতে পারে না, হাসে বন্ধু মেয়েটি আর কোনোদিন তোর কাছে যাবে না। যে কোনো পুরুষের কাছে একবারই যায়, সে যতোবড় প্রতাপশালীই হোক না কেনো! 

হতাশায় ডুবে যায় আবিদ হাসান। সারারাত বাসার মধ্যে আবিদ হাসান গত রাতে মেয়েটির গন্ধ নিয়ে কাটিযে দেন। তারপর থেকেই আবিদ হাসান সদ্য সঙ্গম করা যে কোনো নারীর কাছে এলে সেই গন্ধটি পান। যেমন বাসে ওঠা দুই নারীর শরীর থেকে সেই গন্ধ পাচ্ছ্নে। কেনো পাচ্ছেন এই গন্ধ! মেয়েটি, বেদানা কি যাদুকর? কোনো ম্যাজিক নিয়ে এসেছিল? বেদানার পর আর কারো এমন রঙিন শারীরিক উৎসবে মেতে উঠতে পারেনি আবিদ হাসান। অথচ শরীরের রক্তপাতের মতো আবিদের খুব ইচ্ছে...। কিন্তু ইচ্ছেটা খেই হারিয়ে গেছে, মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো।

আবিদ হাসান গত মাসে মিরপুরে গিয়েছিলেন খালার বাসায়। শনিবার ছুটির দিন। খালা মিতালী ও আবিদ হাসান একই বয়সের। দুজনার মাঝে তুই তুই সর্ম্পক। মনে পড়ে দু’জনে তুই তুই করে কথা বললে মা খালারা খুব বকতেন। মিতালী মাস তিনেকের বড় আবিদের চেয়ে। তাই তারা চাইতেন আবিদ যেন মিতালীকে আপু ডাকে। তাতে আবিদের সায় ছিল না, ছিল না মিতালীর। তবে আরও ছোট বয়সে তারা নাকি বৌ বৌ খেলেছে। অবশ্য এসব শোনা কথা মা-খালা-নানীর কাছে। 

সেই মিতালীর বিয়ে হয়েছে এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। মেলা টাকা পয়সার মালিক এখন মিতালী। খালুর সঙ্গে বেশ কয়েকবার আলাপ হয়েছে। বেশ আলাপী মানুষ। তাকে দেখলে মহানায়ক উত্তমকুমারকে মনে পড়ে। তার চেহারা সঙ্গে খালু আজহার আহমেদের মিল আছে। বিশেষ করে চওড়া কপালটা উত্তমকুমারের সঙ্গে পাল্টে নেয়া যায়। ভালোই আছে মিতালী। আবিদ হাসান মিরপুরে গিয়েছিলেন একটা জমি দেখতে। জমি-টমি দেখে ভাবলো মিতালীর বাসায় একটা ঢু মেরে যাই। হাতে সময় আছে। অনেক দিন যাওয়া হয় না। রিকশায় যেতে যেতে পুরোনো একটা চিত্রকল্প আঁকেন তিনি। দরজা খুলে তাকে দেখে মিতালী জিজ্ঞেস করবে, কাকে চান?

নিজেই উত্তর দেবে মিতালীকে চাচ্ছ্নে? উনি এ বাসায় এখন থাকেন না। এইতো গত মাসে বাসা চেঞ্জ করেছে। ঠিকানা, না ঠিকানা রেখে যান নি। 

তারপর দুজনে হো হো করে হাসবেন। আজহার আহমেদ থাকলে ওদের কাণ্ড দেখবেন আর হাসিতে যোগ দেবেন। হাসি আড্ডায় কিছুটা সময় কাটবে।

রিকশা থেকে নেমে তিন তলায় ওঠেন আবিদ হাসান। বেলা একটার মতো বাজে। মিতালী আইসক্রীম খুব পছন্দ করে। বাসার সামনের দোকান থেকে এক লিটারের আইসক্রিম কিনেছেন তিনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টেপেন। মনে মনে ভাবেন, মিতালী দেখে অবাক হবে নিশ্চয়ই। প্রস্তুতি নিচ্ছেন মিতালীর সেই নাটকীয় সংলাপ শোনার জন্য। কিন্তু দরজাতো কেউ খুলছে না। এতো দেরী হবারতো কথা নয়। ভালো করে দরজা দেখেন না কোনা তালা নেই। ভেতরেই আছে। তিনি আবার কলিংবেল টেপেন। পর পর তিনবার। ভেতরে খুটখাট শব্দ পান আবিদ। ছুটির দিন বাইরে যেতে পারে ওরা। তাহলে শব্দ কিসের? আবার হাত তোলেন কলিংবেল টেপার জন্য। দরজা খোলার শব্দ পান আবিদ হাসান। এবং বেশ সময় নিয়ে দরজা খুলে যায়, সামনে দাঁড়ানো মিতালী, প্রথমে অবাক সে, কিছুটা বিমূঢ়ও। শাড়ি, শরীর খানিকটা বিধস্থ, এলোমেলো। তবুও নিজেকে সামলে নেন মিতালী। আগের চিত্রকল্প ভুল প্রমাণ করে মিতালী অন্যক্ষরে বলে আবিদ, এই অসময়ে তুই? 

এদিকে আসছিলাম একটা কাজে। যাবার সময়ে ভাবলাম তোকে দেখে যাই

বেশ করেছিস। আয়, ভেতরে আয়।

কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আবিদ হাসান সেই গন্ধটি পান। মিতালী এতক্ষণ সঙ্গমে ছিল, কিন্তু খালুর সঙ্গে নয়। গন্ধটা কটু। 

অন্যদিকে তাকায় আবিদ হাসান। মুখটা হঠাৎ তেতো লাগছে। চারদিকের বাতাসে কটু গন্ধটা ছড়িযে পড়ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আবিদ হাসানের খালু কই?

তোর খালু বাসায় নাই। অফিসের কাজে দিনাজপুর গেছে। আসবে দুদিন পর। আয়, ভেতরে আয়। 

না যাই। আইসক্রিমের প্যাকেটসহ হাত বাড়ায় মিতালীর দিকে- তুই পছন্দ করিস, তাই এনেছি। 

বেশ তো, ভেতরে আয়।

কি অবাক কাণ্ড আবিদ, তুই দরজা থেকে চলে যাবি কেনো? হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নেয়, বাসায় আমি একা না, মিহির আছে। ওর সঙ্গেই কথা বলছিলাম। আয়, আমি রান্না চড়াই, তুই শর্ষে ইলিশ পছন্দ করিস। ফ্রিজে ইলিশ আছে। রান্না করি।

নারে, আমার কাজ আছে। যাই প্রায় ছুটতে ছুটতে চলে এসেছিলেন আবিদ হাসান। তাহলে তার পাওয়া গন্ধটা ঠিক। খালুর ছোটভাই মিহিরের সঙ্গে মিতালী খালা...।

জীবনে দেখা না-দেখা কতো নাট-বল্টু আছে, আছে প্রেম বিরহ, না পাওয়ার কষ্ট, দ্বন্দ্ব মনে, অন্তরিক্ষে, আছে প্রতিশোধের ধিকি ধিকি প্রতিজ্ঞা। মিতালী কি সুখী নয় সংসারে? তাই সিঁদ কাঁটছে? বিয়ের বয়স তো কম হলো না পাঁচ ছয় বছর তো হবেই। এখনও কোনো বাচ্চা কাচ্চার দেখা পাওয়া যায় নি। নিচে এসে একটা সিগারেট ধরায়। টানে, ধোয়া চাড়ে আকাশে। ট্যাক্সি ক্যাব ছুটছে উত্তরার দিকে। মিতালী খালা থাকুক তার মতো। আপন মনে গায়, ক্লান্ত শেফালিরা ঘুমিয়ে গেছে...প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের এই গানটা খুব মনে পড়ে আবিদ হাসানের।

মাস চারেক আগে ছোটবেলার বন্ধু আজগরের বাসায় গিয়েছিলেন আবিদ হাসান। স্কুলে কলেজে এক সঙ্গে পড়েছেন। আজগরের বাসা ধানমন্ডি। একই গ্রামের মানুষ। আজগর ব্যবসা করে এখন অনেক টাকা পয়সার মালিক। ফ্লাট কিনেছে কয়েকটা। ধানমন্ডি নিজের ফ্লাটেই থাকে। শৈশবের স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে একটা সমিতি করেছেন আবিদ হাসানেরা। আবিদ সাধারণ সম্পাদক, আজগর হোসেন সভাপতি। আগামী মাসে একটা মিটিং আছে, গ্রাম থেকে বেশ কয়েকজন লোক আসবে। আসবে স্কুলের শিক্ষক, কয়েকজন ছাত্রও। তাদের পুরস্কার দেয়া হবে। টাকা পয়সার একটা ব্যাপার আছে। তাদের ঢাকায় রাখা, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা অনেক ঝক্কি, তারপরও কাজটা করতে চায় ওরা। মাটির কাছে একটা দায় অনুভব করছেন তারা। সেই দায় থেকে এই আয়োজন। আগের দিনের শিডিউল অনুসারে আবিদ চলে এসেছে বাসায়। ড্রয়িংরুমে ঢুকে বসেছে সোফায়। দিনের পত্রিকা দেখছে । হেড লাইন দেখে মন খারাপ হলো সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ-এর গুলিতে তিন কৃষক নিহত। বাংলাদেশের কৃষক আর কতোকাল নিহত হবে নিজ ভূমে? আট-নয় বছরের একটি ছেলে ভেতর থেকে এসে বললো বসেন, স্যারে গোসল করতেছে।

ঠিক আছে, আবিদ পত্রিকা দেখতে দেখতে বলে। ছেলেটি বাইরে চলে যায়, ওর হাতে ব্যাগ। বাজার করতে যাচ্ছে। আবিদ পত্রিকার মধ্যে ডুবে গেলেন। সেই গন্ধটা নাকে এসে ধাক্কা মারলে বাস্তবে ফিরে আসেন, পত্রিকা থেকে চোখ তুলে তাকান তিনি। সামনের টি টেবিলে নাস্তার ট্রে সাজিয়ে রাখছে একটি মেয়ে। শ্যামলা গড়ন, মায়া ভরা মুখ। স্বাস্থ্যটা মাঝারী মানের। পড়নে ভালো একটা শাড়ি।

আপনে চা খান, দুলাভাই আইতেছে মেয়েটি চলে যায়। কিন্তু আবিদ হাসানের জন্য রেখে যায় কটু গন্ধ। নাস্তা খেতে আর ইচ্ছে করছে না। তিনি আনমনে পত্রিকায় চোখ রাখেন। আজগরের বৌ কোথায়? বাসায় থাকলে এতক্ষণে সামনে আসতেন। ভাবী দেখতে দারুন সুন্দরী। আর মেয়েটি আজগরকে দুলাভাই বললো কেনো? ভাবীর দিকের কোনো আত্মীয় হবে হয়তো। ভাবনার মধ্যে কেতাদুরস্ত হয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেন আজগর। 

রাগ করেছিস? 

নারে। কতক্ষণ হয় এলাম, ভাবী কোথায় রে?

ও বাচ্চা নিয়ে স্কুলে গেছে।

নাস্তা দিল মেয়েটা কে? তোকে দুলাভাই বললো?

মৃদু হাসে আজগর তোর ভাবীর দিকের আত্মীয়। মেয়েটার নাম রোশনারা। দেখতে শুনতে ভালো। ইন্টারমিডিয়েড পর্যন্ত পড়েছে। এসেছে একটা চাকরির জন্য। যতোদিন চাকরির ব্যবস্থা না হয়, ততদিন...গল্পটা আর শেষ করে না আজগর। কিন্তু গন্ধটা লেগে থাকে আবিদ হাসানের নাকে।

সকালে উত্তরার পার্কে জগিং করেন আবিদ হাসান। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। নারী পুরুষ হরেক মানুষের আনাগোনা এই পার্কে। জগিং করে যেতে যেতে নারীদের শরীরের গন্ধ আসে আবিদ হাসানের নাকে। তিনি গন্ধ নিয়েই বলতে পারেন পাশ দিয়ে যাওয়া এই নারী গত রাতে সঙ্গম করেছিল, কি করে নাই। নিজের মানুষের সঙ্গে সঙ্গম করলে আবিদ পায় হাস্নাহেনার একটা গন্ধ। বিকল্প কারো সঙ্গে সঙ্গম করলে পায় সেই কটু গন্ধ। এমন আশ্চার্য একটা ক্ষমতাটার মালিক তিনি কিন্তু এই অবাক ক্ষমতা কেবল নিজের ভেতরেই লালন করতে হচ্ছে তাকে। তিনি যদি এই গন্ধের ব্যবসা খুলে বসেন, খুব দ্রত তার ব্যবসা পসার বাড়বে। দিকে দিকে ছড়িযে পড়বে তার দোকানের খ্যাতি। কিন্তু অনেক নারীর সংসার ভাঙ্গবে। অনেক পুরুষ হারাবে পুস্পকানন। মনে মনে হাসেন তিনি, শালা দেখো জগতের কারবার, গর্তের মধ্যে সাপ রেখেই সব ব্যাটাকে দিনরাত কাটাতে হচ্ছে!

জগিং করতে করতেই আবিদের দেখা মিসেস সামাদের সঙ্গে। মিসেস সামাদের স্বামী আবদুস সামাদ অফিসে আবিদ হাসানের সিনিয়র কলিগ। দু-একবার তার বাসায় যেতে হয়েছিল দাপ্তরিক কাজে। তখন দেখা পরিচয় হয়েছিল মিসেস সামাদের সঙ্গে। মহিলা বেশ রাশভারী। কথা বলেন ও হাসেন মেপে মেপে। তবে হাসলে গালে ঢোল পড়ে। দেখতে দারুণ লাগে। পার্কে জগিং করতে এসে পর পর কয়েকদিন দেখা হওয়ায় দুজনে এখন একসঙ্গেই জগিং করেন। টুকটাক কথা বা গল্প হয়। 

জগিং করতে করতে আবিদ জানতে চান আপনি একা কেনো আসেন? স্যার আসলে তো আরও একজন সঙ্গি হতো আমাদের।

মিসেস সামাদ ঢোলপড়া হাসি দিয়ে বলেন আপনার স্যার সারা রাত দেশ-বিদেশের টিভি দেখেন। শেষ রাতে ঘুমান। আর সকালে উঠে অফিসে যান।

তাই নাকি?

হ্যাঁ এক অদ্ভুত লোকের সঙ্গে সংসার করছি আর কি!

মিসেস সামাদের কন্ঠে কি অনুযোগ? রাগ? ক্রোধ? একটা কিছু আছে, কি সেটা বুঝতে পারেন না আবিদ হাসান। পরের দিন সকালে জগিংয়ে এসে মিসেস সামাদকে দেখতে না পেয়ে মন খারাপ হয় আবিদ হাসোনের। ভাবি কি অসুস্থ হয়েছেন? ফোন করবো? এতো সকালে ফোন করা কি ঠিক হবে? আবিদের ভাবনার মধ্যেই মিসেস সামাদ এসে উপস্থিত। মিসেস সামাদ গাড়ি থেকে নামতেই আবিদ হাসান সেই গন্ধটি পেলেন, কিন্তু কটু গন্ধ। সকালের সুন্দর সময়টা কেমন বিষাক্ত হয়ে উঠলো আবিদ হাসানের জন্য। কার সঙ্গে... শয্যা রচনা করেছিলেন মিসেস সামাদ? করোটির ভেতর শোল মাছ ঘাই মারে । সুযোগ পেলেই সবাই ঘরের ভেতর ঘর বানায়।

চলুন, হাঁটি, বলেন মিসেস সামাদ। 

হ্যাঁ, চলুন গন্ধটা সহ্য করতে করতে বলেন আবিদ হাসান।

দু’জনে হাঁটতে শুরু করেন। শীতের হালকা আমেজ সকালের গায়ে। প্রকৃতিতে ভালো লাগার সুখ থৈ থৈ করছে। কিন্তু আবিদ হাসানের আজ মিসেস সামাদের সঙ্গে জগিং করতে ভালো লাগছে না। কয়েক দিনে গড়ে ওঠা নিটোল সর্ম্পকের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে একটি গন্ধ। এই নি:শব্দ কটু গন্ধকে অতিক্রম করে আবিদ হাসান আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারছেন না।

বাসায় মেহমান এসেছে নাকি? হাঁটতে হাঁটতে অলসভঙ্গিতে প্রশ্নটা ছুড়ে দেন আবিদ।

এক মুহূর্ত মাত্র, তাকান মিসেস সামাদ কি করে বুঝলেন?

দেরী হলো যে আসতে আপনার?

ঠিকই বলেছেন। কাল দুপরে গ্রাম থেকে আমার চাচাতো ভাই, ইমরান এসেছে। একটু উড়নচন্ডি টাইপের মানুষ। বিয়ে থা করেনি এখনও। ও মাঝে মাঝে আসে। গ্রামের সব খবরাদি ওর কাছ থেকে পাই। তাছাড়া... কথা শেষ করেন না মিসেস সামাদ। একটা চকচকে সুখ তার মুখের উপর খেলা করছে সকালের মিহি রোদের মতো। যা এর আগে আবিদ হাসান কখনও দেখেন নি।

হঠাৎ একদিন আবিদ হাসান নিজের দেয়ালে নিজেই ধাক্কা খান। তিনি উপলদ্ধি করেন ন্যাড়া একটি বৃক্ষের মতো তিনি একটি বিরান মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। তার শরীরে কোনো কাপড় নেই। তিনি উদোম। তিনি নগ্ন। তার... অন্য নারীর শরীরের সঙ্গমের গন্ধ আবিস্কার করার অবাক ক্ষমতার অধিশ্বর, এমন কি সেই সঙ্গম- বৈধ, না অবৈধ সঙ্গীর সঙ্গে, তাও অনুভব করতে পারেন গন্ধের প্রকারেভেদে। কিন্তু নিজের স্ত্রী কুমকুম হাসানের শরীরের কোনো গন্ধ তিনি কোনোভাবেই পান না। তিনি স্ত্রীর শরীরের গন্ধ পাবার জন্য কুকুরের মতো কুমকুম হাসানের শরীর শুকেন তারপরও কোনো গন্ধ পান না। এমন কি কুমকুম হাসানের সঙ্গে তিনি সঙ্গম করলেও কোনো গন্ধ পান না। অথচ তিনি কুমকুম হাসানের শরীরের গন্ধের জন্য আকুল হয়ে থাকেন। তার অস্থির মনে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তার সঙ্গে জীবন যাপনকারী এই সুন্দরী নারী আসলে কে? অনেক সময়ে এই প্রশ্ন তার করোটির ভেতর তীব্র বলক দেয়, তিনি কোনো উত্তর পান না। 

কুমকুম যদি অন্য কারো সঙ্গে... সে গন্ধ তিনি কোনোদিনই পাবেন না! তাহলে অন্য নারীর গন্ধ খুঁজে কি লাভ? আবিদ হাসান নিজের ভেতরে একটি বর্ণাঢ্য সোনার খাঁচা দেখতে পাচ্ছেন, সেই খাঁচার একমাত্র পাখিটি হচ্ছেন আবিদ হাসান নিজেই। তিনি খাঁচার ভেতর ডানা ঝাপটাচ্ছেন, তার শরীরের পালক উপড়ে যাচ্ছে, এবং শেষে পালকহীন একটি মোরগে পরিণত হচ্ছেন। ০

1 টি মন্তব্য: