শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

নীহারুল ইসলামের গল্প : চোর

কোনো অন্যায় তো করেনি! চুপিসারে তাজকেরাকে শাড়িটা দিতে গেছিল। কাল বকরীদ। তাজকেরা শাড়িটা পরবে। কিছুদিন থেকেই দেখছে তাজকেরা একটা তেলচিটে ছেঁড়া শাড়ি পরে বেড়াচ্ছে। খুব খারাপ লাগছিল। সেজন্য শাড়িটা মেহনত করে কিনে এনেছে। কিন্তু তাজকেরা শাড়ি কিছুতেই নেবে না। তার সাফ কথাঃ তুমার চুরি করে আনা জিনিস হামি লিবো না খো। তুমি এখ্যান থেকে গ্যালা, না চিল্লে লোক ডাকবো? তবু তাজকেরাকে বোঝাতে গেছিল সে, না না- চুরির জিনিস লয় খো। হামার রক্ত ঘাম করা পয়সায় কিনা জিনিস। তু লে এটো। হামি চুরি করা ছেড়ে দিয়াছি। হামি জিন্দেগীতে কুনুদিন আর চুরি করবো না। এইদ্যা তোর কসম খেঁই বুলছি। বলে যেই তাজকেরার মাথায় হাত দিতে গেছে অমনি তাজকেরা চিল্লে উঠেছে, চোর! চোর! চোর! ...

তখন আর কী করবে, শাড়ি ফেলে পড়িমরি দে ছুট!

কতক্ষণ ছুটেছে কে জানে, ঘুম ভেঙে সাকিল দেখে তার শরীর ঘামে জবজব করছে। আচ্ছা মুসিবৎ তো! সারাদিন একশোদিনের কাজের কোটায় মাটি কেটে কোথায় একটু ঘুমোবে, তাতেও আপত্তি! ঘরের দরজায় লোক ডাকছে।

গুনাহ! গুনাহ! গুনাহ!

সাকিল বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বিছানা থেকে গামছাটা তুলে শরীরের ঘাম পোছে। আর ভাবে, চুরি করা ছেড়েও নিস্তার নেই। একদিকে দুঃস্বপ্ন! অন্যদিকে গাঁয়ের মানুষ! কার কী হল আবার?

সাকিল দরজা খোলে, কোনো মানুষকে দেখতে পায় না সে, খালি প্রশ্ন দেখেঃ

- হামার মুরগী কইবে শালা চোর?

- হামি কী জানি!

- হামার পিতলের বধনাটো কই বে?

- হামি কী জানি!

- হামার জামা-লুঙি বারান্দায় টাঙা ছিল, কে চুরি করলে বে সাকিল?

- হামি জানি না। হামি চুরি করা ছেড়ে দিয়াছি। হামি এখুন ভালোমানুষ। তুমাদের মুতোন মানুষ। কার কী চুরি হয়্যাছে হামি তার কিচ্ছু জানি না।

- জানি ন্যা বুল্লে হলো রে শালা। মারবো এক থাপ্পড়! বলে রগচটা নৌসাদ তেড়ে গেল সাকিলের দিকে। তাকে আটকালো খুরসেদ। খুরসেদ নিজের পিতলের বধনাটা কাল থেকে পাচ্ছে না। এষার নামাজের আগে ওজু করেছিল ওই বধনার পানিতেই। সেটার জন্য মন খারাপ করছে ঠিকই, সেবলে শুধু সন্দেহের বশে কাউকে চোর বলে মারাটা তার চোখে ঠিক কাম নয়।

- মারবা মারো, হামি কিছু বুলবো না। তবে এখুন হামাকে চোর বুল্লে হামার আপত্তি আছে।

যার মুরগি চুরি হয়েছে, সেই রহিম বলল, শালাকে মেরেটেরে লাভ নাই। মোরেটোরে গেলে আবার পুলিশ-টুলিশ আসবে! কেস-কাবাড়ি হবে! তার চেহে চলো শালাকে মুড়োলের কাছে লিয়ে যাই। মুড়োল যা বিচার করার করবে।

রহিমের কথা মনে ধরে সকলের। সকলে হই হই করে উঠল। বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ- তাই চলো। শালাকে লিয়ে চলো মুড়োলের কাছে।


দুই

মোড়োল আলি হোসেন সাহেব বাহির-বাড়ির বারান্দায় বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। তার মাথার সাদা চুল ধান দিয়ে তুলে দিচ্ছিল কাসিমের বিটি কাজলরেখা। কাসিম তার বাড়ির খাস লোক। বাপের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে ছুঁড়ি সবার অজান্তে মোড়লের খুব কাছ-লাগা হয়েছে। সাগরেদ মটরসেখও বসে ছিল পাশে। গাঁয়ের আরো দু\চারজন তাদের অভাব-অভিযোগ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মাঝে সাকিল চোরকে নিয়ে হাজির হয় রহিম, খুরসেদরা। তাদের দেখে মুড়োল আলি হোসেন সাহেব জিঞ্জেস করেন, কী হোলো রে? তোরা আবার এই পোহাঁতে সাকিল চোরকে লিয়ে কেনে? কার কী চুরি করলে আবার শালা চোর? - চোর বুলবেন না মুড়োলসাহেব। হামি কারু কিচ্ছু চুরি করিনি। হামি এখুন ভালোমানুষ। হামি চুরি করা ছেড়ে দিয়াছি।

- চুরি করা ছেড়ে দিয়াছিস তো হামার মুরগী কইরে শালা চোর?

হামি কী জানি!

- হামার পিতলের বধনাটো কই বে?

- হামি কী জানি!

- হামার জামা-লুঙি বারান্দায় টাঙা ছিল, কে চুরি করলে রে?

- হামি কিচ্ছু জানি না। হামি চুরি করা ছেড়ে দিয়াছি। হামি এখুন ভালোমানুষ। তুমাদের মুতোন ভালোমানুষ। কার কী চুরি হোয়্যাছে হামি কিচ্ছু জানি না।

শীতের সকালে বাহির-বাড়ির বারান্দায় মিষ্টি রোদের সঙ্গে সাকিল চোরকে পেয়ে মোড়ল আলি হোসেনের পোয়াবারো! কে কার বিটিকে ভাত দিচ্ছে না! কে কার কাছে টাকা ধার নিয়ে শোধ দিচ্ছে না! কার শসার বাহান ভেঙ্গেছে কার গরুতে! রোজ এইসব বিচার করতে করতে সকালটা কাটে তার। কিন্তু আজ অন্যভাবে কাটবে! মনটা খুশিতে ভরে উঠে আলি হোসেন সাহেবের। কাজলরেখাকে সরে যেতে বলে চেয়ারে সাট হয়ে বসেন তিনি। সাকিলকে কাছে ডাকেন, সাকিল হেরায় এদিকে।

জড়সড় সাকিল মোড়লসাহেবের সামনে এসে দাঁড়ায়, বুলেন- কী বুলছেন?

- সত্যি তুই চুরি করিসনি?

- বুলছি তো করিনি।

- প্রমাণ দে যে তুই চুরি করিসনি।

- হামি যে চুরি কোরাছি তার প্রমাণ দেক আগে য়্যারা।

তাইতো! সাকিল যে চুরি করেছে তার কী প্রমাণ আছে?

- প্রমাণ!

- প্রমাণ!

- প্রমাণ!

নৌসাদ, খুরসেদ, রহিমরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। কী প্রমাণ আছে তাদের কাছে? কোনো প্রমাণ-ই নেই। তাহলে?

যা হয়েছে, হয়েছে। এক কাজ কর তোরা! আলি হোসেন সাহেব বলেন, সাকিল যে চুরি করেছে তার প্রমাণ নাই যখন তোদের কাছে, এবারকার মতোন ছেড়ে দে। আর একটা কাজ কর না তোরা, সাকিলকেই চোর-পাহারার কাজে লাগিয়ে দে। তাহলে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না।

- আপনি কী কথা কোহিছেন মুড়োলসাহেব? হামি ওই কাম করতে পারি নাকি? কেউ কিছু বলার আগে সাকিল নিজেই বলে উঠে। সে তার অক্ষমতার কথা জানায়। কিন্তু মোড়ল আলি হোসেন সাহেব ধমক মারেন তাকে, চুপ কর হারামজাদা! এটায় তোর শাস্তি। না হোলে গাঁ ছেড়ে চলে যা তুই!

- গাঁ ছেড়ে চলে যাবো? বাপ-দাদোর ডিহি ছেড়ে হামি কুন্ঠে যাবো? কুন্ঠে যেয়ে কি শান্তি পাবো?

- তাহলে চোর পাহারা দিতে হবে তোকে। মোড়লসাহেব হুকুম করেন।

- রাতে চোর পাহারা দিবো তো দিনে খাটবো কী করে? নিঁদ পাবে না? গাঁইগুই করতে করতে বলে সাকিল।

- দিনে খাটতে হবে না তোকে। চোর পাহারার জন্য গাঁয়ের লোক তোকে মজুরি দিবে।

মজুরি দিবে! তাহলে তো কুনু কথায় নাই। হামি চোর পাহারা দিবো। হামি যে চুরি করা ছেড়ে দিয়াছি-ভালো হয়ে গেলছি, তার প্রমাণ দিবো। মনে মনে খুশি হয় সাকিল।


তিন

একটা তিনব্যাটারি টর্চ আর একটা লম্বা লাঠি নিয়ে সাকিলচোর চোর-পাহারায় লেগে পড়ে। এষার আজান পড়তে না পড়তে তার হাঁক শোনা যায়, হুঁশিয়ার! সাবধান! জাগে রাহো! খালি এই তিনটে কথা। আর কোনও কথা নেই। মোজিলপুরের আকাশ-বাতাস মুখোরিত হয় সারারাত তার হাঁকে। গ্রামে চুরি বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামবাসীরা স্বস্তি পায়। কিন্তু মুশকিলে পড়ে সাকিল নিজেই। রাত জেগে একা একা কাঁহাতক আর চিল্লে বেড়ানো যায়? না খালি খালি চিল্লে বেড়াতে ভালো লাগে?

কিন্তু আর কোনও উপায়ও নেই। এটা তার শাস্তি যেমন, চাকরিও তেমন। শাস্তি এই কারণে যে এই চাকরি তাকে একা একা করতে হয়। এই কাজে তার কেউ সঙ্গী নেই। অবশ্য যখন চুরি করত, একা একাই করতে হতো। সঙ্গী নিয়ে চুরি করা যায় না। ধরা পড়ার ভয় থাকে। চোর-পাহারার চাকরিতে সেই ভয় নেই যদিও।

গ্রামের নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কত কথা মনে আসে সাকিলের। কত ভাবনা আসে। যার জন্য মাঝে মাঝেই হাঁক ছাড়তে ভুলে যায় সে। নির্জন রাস্তায় নিশব্দ রাতে সে তখন দার্শনিক হয়ে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়। কিন্তু ব্যথার কথা মনে থাকে না, বদলে তার মনে পড়ে তাজকেরাকে। কতদিন তাজকেরার সঙ্গে দেখা হয়নি তার!

যাবে নাকি এখন দেখা করতে? রাত এমন কিছু বেশী হয়নি। কালিম বিশ্বাস বেঁচে নেই। তাহলে তাজকেরাদের বাড়ি এখন যেতেই পারে। তাছাড়া এখন সে ভালো হয়ে গেছে। এখন সে আর চোর নয়। এখন সে চোর-পাহারাদার। তাহলে ভয় কীসের?

খুব সাহস করে সাকিল তাজকেরাদের বাড়ির উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করে।


চার

গ্রামের মধ্যে একটা বহু পুরণো তেঁতুল গাছ আছে। রাতেরবেলা মানুষ সেখানে যেতে ভয় পায়। সাকিল ভয় পায় না। কতদিন চুরি করে এসে এই গাছতলাতে বিশ্রাম নিয়েছে!

চোর-জীবনের স্মৃতি জেগে উঠে সাকিলের মনে। সে গাছতলায় দাঁড়িয়ে পড়ে। ওপরের দিকে তাকায়। ওপরটা খুব আধাঁর লাগে। হাতে ধরা তিন ব্যাটারি টর্চটা জ্বেলে ফোকাস মারে ডাল-পালার ঘন অন্ধকারে, আর তার চোখে পড়ে কী যেন একটা!

মানুষ না? গাছের তিন ফাংড়ি ডালে ঘাপটি মেরে বসে আছে!

- কে বে তুই? সাকিল প্রশ্ন করে।

কোনো উত্তর আসে না। সাকিল ফের প্রশ্ন করে, বোল না বে- কে তুই? কী করছিস ওখানে?

এবারেও কোনো উত্তর নেই। সাকিলের রাগ হয়। সে আবার বলে, ভালোই ভালো উত্তর করছিস না লাঠির গুতা খাবি?

লোকটা এবারে নড়েচড়ে বসে। বলে, গুতা-টুতা মারিও না জ়ী সাকিল ভাই! হামি এক্রাল।

- আরে শালা এক্রাল! রাতের আধাঁরে গাছের ওপরে কী করছিস তুই?

- এমনি বস্যা আছি।

- মারবো শালাকে লাঠির বাড়ি। সত্যি কথা বোল এখুনো! না হলে চিল্লে লোক জড়ো করবো।

- দাঁড়াও ভাই, দাঁড়াও। গাছ থেকে নেমে হামি সব কোহিছি তুমাকে। বলতে বলতে এক্রাল গাছ থেকে নেমে আসে সাকিলের কাছে। সাকিল লক্ষ্য করে এক্রালের বুকটা কামারের কামার-শালের হাঁপরের মতো ওঠা-নামা করছে। তার মানে শালা কারও তাড়া খেয়ে এসে চড়েছে এই গাছে। আন্দাজ করে সাকিল। এমন তাড়া জীবনে সেও খেয়েছে কতবার। কিন্তু সে তাড়া খেয়েছে চুরি করতে গিয়ে। এক্রাল তবে কী করতে গিয়ে তাড়া খেল? এক্রাল তো চোর নয়!

সাকিল ধন্দে পড়ে যায়। সেই ফাঁকে দম নিয়ে নেয় এক্রাল। বলতে শুরু করে, কাহুকে কিছু কোহিবা না বোলো ভাই?

- কী বুলবো না?

- এই জ়ী হামাকে এই অবস্থায় দেখছো!

সু্যোগ পেয়ে যায় সাকিল। বলে, ঠিক আছে। কাহুকে বুলবো না। তবে তার আগে তোকে কোহিতে হবে তুই এই রাতের ওপর কী করছিস?

- উকথা শুধাও না। শরমের কথা! বুলতে পারবো না।

- না বুল্লে তোকে মুড়োলসাহেবের কাছে ধরে লিয়ে যাবো কিন্তুক।

- তোমার পায়ে পড়ি ভাই। উ-কাম করিও না। বলে এক্রাল সত্যি সত্যি সাকিলের পা জড়িয়ে ধরে।

আর সাকিল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। এরকম দাঁড়িয়ে ছিল জীবনে একবার-ই, ধরা পড়েছিল যেদিন। অনেকদিন আগে। কালিম সেখের বাড়িতে। শুনশান বাড়ি। সেই বাড়িতে যে-ঘরে তাজকেরা থাকে সেই ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। দরজা খোলার আগে ঘরের ভিতর তার জানের তাজকেরা তার ইন্তেজারে কী করছে, জানবে বলে দরজায় আড়ি পেতেছিল সে। তারপর শুনেছিলঃ

- তুমি হামাকে লিকা করব্যা কি করব্যা না আগে বুলো?

- করবো।

- কবে করব্যা? হামি মরে গেলে?

- এমুন কথা কোহিছিস কেনে তুই?

- ঠিক কথা কোহিছি হামি। আজ লয় কাইল বুলে খালি ঠেলে লিয়ে বেড়াইছো!

কে এমুন কথা কোহিছে? তাজকেরা? কাকে কোহিছে? দেখতে বাসনা জেগেছিল তার। সেই মতো দরজার ফাঁকে চোখ রেখে দেখতে যাবে, তার আগে পেছন থেকে এসে কালিম সেখ শক্ত হাতে তার গর্দান চেপে ধরেছিল। আর হুঙ্কার ছেড়ে বলেছিল, এই শালা চোর! কুনুদিন তোকে হাতে পাই না, আজ পেয়াছি। আজ তুই হামার হাত ছাড়িয়ে যাবি কুন্ঠে? দাঁড়া আইজ দেখছি তোকে।

কোনও উপায় নেই দেখে কালিম সেখের পা জড়িয়ে ধরেছিল সে, এবারকার মুতোন মাফ করে দ্যান সেখচাছা। জিন্দেগীতে আর কুনুদিন হামি চুরি করবো না। এই আপনার পা ধরে কোহিছি। বিশ্বাস করেন!

কালিম বিশ্বাস তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল বোধহয়! না হলে তার হাতটা হঠাৎ করে আলগা হয়ে যাবে কেন?

অবশ্য আলগা হয়েছিল বলেই সেদিন পালাতে পেরেছিল। পালিয়েও ছিল। কিন্তু সেদিন তাজকেরা কার সঙ্গে কথা বলছিল, আজও বুঝতে পারেনি। ছুঁড়াটা কে? কার এত সাহস যে, কালিম বিশ্বাসের বিটির সঙ্গে লটঘট করে!

তাহলে কি সেদিন এই এক্রালই ছিল তাজকেরার ঘরে? তাজকেরার সঙ্গে! কেমন সন্দেহ দানা বাঁধে সাকিলের মনে। ইল্লত যায় না ধুলে স্বভাব যায় না মলে! কথাটাও মনে পড়ে তার। এক্রালের নামে বদনাম আছে শালা নাকি চামড়াচোর!

তাহলে কি শালা আজও চামড়া চুরি করতে বেরিয়ে তাড়া খেয়ে এসে এই গাছে উঠেছে নাকি?

ধৈর্য্য ধরতে পারে না সাকিল, ধমক মারে এক্রালকে, আসল কথা বুলবি না ধরে লিয়ে যাবো?

- না ভাই, ধরে লিয়ে যেও না! বুলছি। বুলছি। সব বুলছি তুমাকে।

- বোল।

- হামি গেলছিনু ল্যাংড়া ফারমুজের বাড়ি।

- কিসকে?

- কোহিতে শরম লাগে।

- শরম! তোর শরমের কিছু ---, বলে হাতের লাঠি উচিঁয়ে ধরে সাকিল।

সেই ভয়ে এক্রাল বলে উঠে, মারিও না ভাই, বুলছি। সত্য কথা বুলছি। ফারমুজের বহু আলতাবিবির সুথে হামার ভাব-ভালবাসার সম্পর্ক। বুঝতেই পারছো। মাঝে-সাঝে যাই। আইজ তেমনই গেলছিনু। তা যেই দেখি শালা ল্যাংড়া ঘরে ওত পেতে বসে আছে। আলতাবিবি পইখরের ঘাটে হামাকে কুনু সাবধানি-ইশারাও করে নি। হামি যেমুন যাই তেমুন গেলছি। ঝাঁপ খুলে ঘরে ঢুকবো, অমনি মাথায় লাঠির এক বাড়ি আর মুখে “চোর! চোর! চোর!” আওয়াজ। মাথা ফাটল কি না ফাটল না ভেবে হামি পড়ি-মরি করে দে ছুট! শালা ল্যাংড়া কি হামাকে ছুটে পারে? কিন্তু ওই যে শালার মুখে “চোর! চোর! চোর!” আওয়াজ! ছুটছে হামার আগে আগে। আর তাতেই ম্যালা মানুষ! হামার আগে মানুষ, পিছে মানুষ। তা তুমিও কি ভাই সেই আওয়াজ শুনে হামার পিছু লিয়াছিলা নাকি?

সাকিল কারও আওয়াজ শুনে এদিকে আসেনি। সে ডিউটি দিয়ে বেড়াচ্ছিল। আর কোনওকিছু ভেবে গাছের ওপরদিকে তাকায় নি। এমনি খেয়াল বশে তাকিয়েছিল। একথা বললে কি শালা এক্রাল বুঝবে যে, সে সত্যি বলছে, মিথ্যা বলছে না।

হঠাৎ গ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে “চোর! চোর! চোর!” আওয়াজ ভেসে আসে। এক্রাল বলে উঠে, হামাকে বাঁচাও জী সাকিলভাই। ওদ্দ্যাখো অরা আসছে। এবারকার মুতোন হামাকে বাঁচাও। তোমার এই এহেসান হামি জিন্দেগীতে কুনুদিন ভুলবো না। বলে এক্রাল আর সেখানে দাঁড়ায় না। সুট করে কেটে পড়ে।


সাকিল ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এখন যেন কালিম বিশ্বাসের হাতে ধরা তার নিজেরই গর্দান! তার কোনো হুঁশ থাকে না। আর দক্ষিণ-উত্তরদিক,পশ্চিম-পূর্বদিক থেকে ছুটে আসা “চোর! চোর! চোর!” আওয়াজ শেষপর্যন্ত তাকেই ঘিরে ধরে। সে কোথাও পালাতে পারে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন