বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

মৌসুমী কাদের এর গল্প- স্যুটকেস




মোহাম্মদপুর বাজারে সবজির দাম আগুন। পেয়াজ-রসুন, মাছ, মাংস সবকিছুরই দাম বেশী। রুমু একটা পাতলা জংলী জর্জেট শাড়ি পড়ে আছে আজ। বাম হাত দিয়ে কুচিটা জড়িয়ে উঁচুতে শাড়িটা তুলে ধরে কাদা বাঁচানোর চেষ্টা করে রুমু। দূর থেকে জব্বার মাছওয়ালা চিৎকার করে ডাকতে থাকে,

: ও আফা, মাছ লইবেননা আইজক্যা? ও আফা, দুলাভাই আহেনাই?


বাজারের লোকজন হা করে রুমুকে দেখতে থাকে। রুমু ভীষন বিরক্ত হয় কিন্তু মুখে কিছু বলে না। জব্বার মিয়ার ঢাউস এলুমিনিয়াম থালাতে বিশাল বড় রুই, কাতলা আর পাঙাস মাছ; মাথার উপর হাজার পাওয়ারের বাল্বের আলোতে চকচক করছে সেগুলো।

: ইলিশ নাই? রুমু জিজ্ঞেস করে।

জব্বার মিয়া পানখাওয়া দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, ‘আপামনির দেহি ইলিশ খাওয়া কমে নাই!!’ বলেই জোড়ে হাক দিয়ে ডাকে, ‘মানিক্যা, দুই জোড়া ঘোড়া দে’ ।

১০-১২ বছর বয়সী মানিক বরফের ভেতর থেকে ৪টা বড় বড় ইলিশ বের করে দেয়। জব্বার মিয়া এক হ্যাচকা টানে সেগুলো নিয়ে কাটতে লেগে যায়। রুমু হা হা করে উঠে!!

‘কি ব্যাপার দর দাম করলেন না যে?’

জব্বার মিয়া আবার লালচে দাঁতগুলো বের করে হাসতে হাসতে বলে;

‘আপনে দাম না দিলেও মাইন্ড করুম না আফা, হে, হে হে.----।’

রুমু মনে মনে ভাবতে থাকে, না জানি কত দাম নেবে। ভীষন রাগ হয় নিজের উপর, কোন কুক্ষনে যে এই বাজারে এসেছিলো?

মাছ কাটা শেষ হলে জব্বার মিয়া সেগুলোকে সুন্দর করে ব্যাগে ভরে রুমুকে দেয়। রূমু জিজ্ঞেস করে;

‘কত দেবো?’

জব্বার মিয়া জিভ কেটে বলে, ‘সর্বনাশ!! আপনের কাছ থিকা টাকা নিলে আমার ব্যবসা শেষ, আফা।’

রুমু জিগ্গেস করে, ‘কেন ? টাকা নেবেন না কেন? এতো অদ্ভুত সমস্যা? টাকা না নিলে আপনার মাছ রেখে দেন।’

জব্বার মিয়া লম্বা দাঁড়ি হাতের তালুতে ধরে হে হে করে হাসতে থাকে ---বলে,

‘টাকার জন্য এতো চিন্তা করেন ক্যান? স্যার আপনের কাছ থিকা টাকা নিতে মানা করছে।’

মুহর্তেই রুমূর ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠে। একটা কথাও বলার আর ইচ্ছা হয় না। হাতে ব্যাগটা নিয়ে ধীর পায়ে হাটতে শুরু করে সে । সবুজ জংলী শাড়িটা কাদায় লুটোপুটি খায়, টের পায় না রুমু ।

বাজার থেকে বেড়িয়ে একটা রিকশায় ওঠে বসে সে। আকাশ মেঘলা, বাতাস বইছে। মনে হয় ঝড় হবে। হোক, ঝড় হোক, উল্টে পাল্টে দিক সবকিছু-রাস্তাঘাট, গাছপালা, বাড়িঘর, দোকানপাট, কিচছু যায় আসেনা। একটা কোমল শরীর, একটা কোমল মন, এই পৃথিবীতে এসব ভীষন মূল্যহীন। বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি আসতেই রূমূ লক্ষ্য করে নূরজাহান রোডের মাথায় প্যান্ডেল টানিয়ে পুরো রাস্তা বন্ধ করে ফেলেছে মৌলবী সাহেবরা, ওরশ হবে। রিকশা ঘুরিয়ে আবার সলিমুল্লাহ রোড বরাবর যেতে থাকে সে। গন্তব্য তাজমহল রোড। তিন বেডরূমের ভাড়া বাড়ি। বাড়ি ভর্তি সুদৃশ্য আসবাব, অথচ তার কোনটিই রূমুর নয়। একটা শ্যাওলা রঙের পুরনো চামড়ার স্যুটকেস, কেবল এই স্যুটকেসটিই রুমুর একার। ভেতরে গোপন পলিথিনে মোড়ানো একটা ডায়রী। একটা পুরনো এ্যালবাম, শৈশবের ছবি, পল্লব, মা-বাবা, কামরাঙা তলায় মায়ের তৈরী করা অসংখ্য মাটির পটের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা ভুরূ কুঁচকে আছেন আর পল্লব ছোট সাইকেলে চড়ে হাসছে, ডাকছে রূমুকে, ‘আপা, আপা-----------------’.


২.

জামালপুর রেলস্টেশনের পেছনেই ছিল রূমুদের বাড়ি। একটা দোতলা দালান। বিশাল বড় উঠোন, বাড়ির চারপাশ ঘিরে নানা জাতের গাছ। লেবু, কামরাঙা, জাম্বুরা, বেদানা, পেয়ারা। মা শখ করে একটা লাউগাছ লাগিয়েছিলেন। বারান্দার বাম কোনায় অতিথিদের জন্য যে ঘর ছিল, ঠিক তার সামনেই। ওই লতানো লাউগাছটা বেড়ে উঠছিল ছাদের উপর। মা তার যাবতীয় ভালোবাসা উজার করে ওই গাছে জল দিতেন। লতানো নরম সবুজ গাছটা পুরোটা ছাদ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। বারান্দার অন্যদিকের ছোট ঘরটিতে পল্লব গান করতো। চব্বিশ ঘন্টা বিছানার উপর হারমোনিয়াম খোলা থাকতো আর পল্লব গাইতো, ‘তানা দেরে দিম তা দিম তা দেরে না..জাগিছে আঁখি, প্রেয়সী বিনা,-----বীনার ওই সুরে সুরে বিরহ পাপিয়া কাঁদে----এমন রাতি কেন জোছনা…?’ সকাল, বিকাল, রাত্রি ওই একই গান, বাড়ির সকলের মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির পেছনটা ছিল অদ্ভুত রহস্যময়। একটা গভীর জলের কুয়া, দড়ি দিয়ে একটা বালতি বাঁধা, ওটা হূ হূ করে জল আনতে নেমে যেত তলদেশে, পাশেই জল ধরে রাখবার চৌবাচচা, বড় বড় কচু পাতা উপুড় হয়ে ঢেকে রেখেছে জল, তারপাশেই চারদিক টিনে ঘেরা আকাশছোঁয়া গোসলখানা। রোজ ভোরে পেছন দরজা দিয়ে গোয়াল পাড়ার রমেশ বাবার জন্য মাঠা নিয়ে আসতেন। চৌবাচচার ধারে বসে মা প্রতিদিন রমেশকে একই কথা জিজ্ঞেস করতেন;

‘কিরে আজ মাঠা এত পাতলা হোল কেন? জল মিশিয়েছিস নাকি?’

রমেশ চিৎকার করে উঠতো, ‘রাম রাম, বলেন কি মাইজি, মা ঠাকুরনের দিব্বি করে বলছি, কিচ্ছু মিশাইনি।‘

রমেশই মার জন্য গোবর সার এনে দিতেন, লাউগাছের গোড়ায় দেবার জন্য। বাড়ির সামনের গলির মোড়ে যে চায়ের দোকান ওইখানে পাড়ার ছেলেরা আড্ডা দিত। সারাদিন ক্যাসেটে গান বাজতো আর চায়ের আড্ডা চলতো। মমতাজের গান দোকানদার র্নিমলের খুব পছন্দ ছিল। এই নিয়ে শুদ্ধ সংগীত গায়ক পল্লব সারাক্ষন খ্যাচখ্যাচ করতো। পাড়ার ডিসিপ্লিনারী কমিটিতে অভিযোগ করেও কিছু হোল না। উল্টো পল্লব যখন গান গাইত, পাড়ার ছেলেরা বাড়ির সামনে গলিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে মুখ ভ্যাঙাতো।

পাড়ার ডাক্তার বিশ্বম্বরবাবু রূমুর বাবা স্টেশন মাস্টার আলতাফ হোসেনকে এসে বললেন;

‘মাস্টারসাহেব, শহরের অবস্থাতো ভালো দেখি না, ঘরে আপনার যুবতি কন্যা, একটা কিছু করুন মশাই।’

আলতাফ হোসেন বিম্ময়ে বলেছিলেন, কেন? কি হয়েছে, ডাক্তারবাবু?’

ডাক্তার বললেন, ‘গতরাতে কে বা কারা হাসপাতালের সামনে এক যুবতীর লাশ রেখে গেছে। এ্যাকচুয়েলী, ইট ওয়াজ নট এ নরমাল ডেথ, শি ওয়াজ রেপড এন্‌ড মারডারড।’

‘বলেন কি?’ আলতাফ হোসেন আঁতকে উঠেন! তিনিও লক্ষ্য করেছেন স্টেশনের পরিবেশ রাতারাতি অনেক বদলে গ্যাছে। এক অন্ধ গায়ক তার কিশোরী কন্যাকে নিয়ে প্ল্যাটর্ফমে বসে গান গাইতো। বাবা হারমোনিয়াম বাজাতেন আর মেয়ে গান গাইতো। ‘এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি রবে, সু্‌ন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে।’ কত লোকজন জড় হয়ে বাবা-মেয়ের গান শুনতো আর পয়সা দিত। কত সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় মেয়েটি গেয়ে উঠেছিল, ‘শিশুকাল ছিল ভাল যৌবন কেন আসিল, বাগিচায় ফুল ফুটিল কোকিল কেন ডাকিল?’ …………হঠাৎ কদিন ধরে মেয়েটি উধাও। বাবাটা পাগল প্রায়, ছুটে বেড়াচেছ এর ওর কাছে। আলতাফ হোসেনের কাছে এসে ডুকরে কেঁদে উঠে বললো, ‘মাস্টারসাব, এ কেমন বিচার আল্লার, গরীবের কি এইটুকু বাঁচনের অধিকার নাই?’

আলতাফ হোসেন বুঝে পান না কি করবেন; কাজের চাপও এখন অনেক বেশী। আগের দিন আর নাই। জামালপুর এক্সপ্রেস, একতা, ইসা খাঁ, ইন্টারসিটি, লোকাল, সব মিলিয়ে দশ পনেরটা ট্রেন। স্টেশনে হাজার হাজার মানুষ। পান-চা-সিগারেট, পত্রিকা, খাবারের হোটেল, নানা রকম দোকানপাট…… সারাদিন জমজমাট জামালপুর স্টেশন। এর মধ্যে যদি কেউ হারিয়ে যায়, কেউ জানবে না। কেউ বুঝবে না বুকের মধ্যে কষ্ট নিয়ে অন্ধবাবা কি করে গান গাইছে। আলতাফ হোসেন সাহসী মানুষ। তিনি সাদা জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে প্ল্যাটর্ফমে এসে দাঁড়ান। চোখে ভারী কাঁচের চশমা। এক্সপ্রেস আসার সময় হয়ে গেছে। লাইনম্যান পতাকা উড়াচেছ। ‘এই কিশোরীটিই কি যুবতীর লাশ হয়ে গেছে?’ আলতাফ হোসেন গভীরভাবে ভাবতে থাকেন। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষের ভীড়ে হাটতে থাকেন তিনি। ভাসমান দরিদ্র মানুষ… উলঙ্গ, অন্ধ, বিকলাঙ্গ। মাটিতে গড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচেছ তারা।

এক্সপ্রেস এসে থামলো দুপুরে। কুলিরা ছুটোছুটি করছে। হকারদের চিৎকার ঘুন পোকার মত গমগম করছে চারদিক। দূরে একটা পচিশ ছাব্বিশ বছর বয়সী স্মার্টছেলে একহাতে একটা কাগজ আর অন্যহাতে শ্যাওলা রঙের একটা স্যূটকেস নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে। আলতাফ হোসেনের সামনে এসেই স্যূটকেসটা মাটিতে রেখে দাঁড়ালো। দরদর করে ঘামছিল ছেলেটা। কাগজটা আলতাফ হোসেনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই ঠিকানাটা কোথায় বলতে পারেন চাচা?’

আলতাফ হোসেন ভুরূ কুঁচকায়, কাগজটার দিকে তাকিয়ে দ্যাখে, বলে, ‘এতো আমার ঠিকানা?’ ছেলেটা ধুম করে বসে পড়ে আলতাফ হোসেনের পা ছুঁয়ে সালাম করে। আলতাফ হোসেন বলে, ‘তোমাকেতো বাবা চিনতে পারলাম না?’

লম্বা সূর্দশন জিন্সের প্যান্ট আর বাদামী টি-শার্ট পরা ছেলেটা বললো, ‘আমি আবিদ, রশিদ সাহেবের ছেলে।

‘ও হো হো, তুমি রশিদের ছেলে? তো, এখানে কেন?’

‘চাচা একটা কাজে এসেছি, কদিন থাকবো।’

‘কি এমন জরূরী কাজ এই মফস্বল শহরে?’

আলতাফ হোসেন সেদিন আবিদকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। গলির মোড়ে রিকশা থামলেই লোকে চেয়ে থাকে, উৎসাহের আর শেষ নাই। চায়ের দোকানদার নির্মলেরও কথা বলা চাই ই চাই-------‘কাকা, লগে ক্যাডা? ভিনদেশী নাকি? ও কাকা, দোকানে লয়া আইয়েন, আমরার দ্যাশের খাঁটি দুধের চা খাওয়ায়া দিমু।’

৩.

বেলা পড়ে গেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। আবিদকে বারান্দার অতিথি ঘরে থাকতে দেয়া হোল। আমকাঠের একটা লম্বা চৌকি আর কেরোসিন কাঠের একটা টেবিল ছাড়া ওঘরে আসবাব আর কিছু নেই। একটা ছোট্ট জানালা, সরু রড দিয়ে আটকে দেয়া। একটা ফিনফিনে নীলর্পদা জানালাটাকে আঁকড়ে ধরে আছে | জায়গার অভাবে স্যূটেকসটা বিছানার নিচে ঠেলে দিল আবিদ। সাবধানে রাখতে হবে। বারবার ওটাকে সরানো যাবেনা। এদিক সেদিক ছুটোছুটি করবার জন্য কাঁধের ব্যাগটাই যথেষ্ট। কাল খুব ভোরে দেওয়ানগঞ্জ রওনা দেবে সে। সময়টা ভীষণ দুর্যোগপূর্ণ মনে হয় তার। চারদিকে এত দুঃশাসন, দুরাচার, নষ্টামী, ভন্ডামী… চোখের সামনে যা কিছু দেখছে, তাতে এতটুকু ভয় নেই ওর। কতটা দুঃসময়ে পতিত সে… তবুও একদমই নির্বিকার।
- ‘মা আপনাকে খেতে ডাকছে, আসুন……।

আবিদ চমকে উঠে! শাড়ি পরা বাইশ-তেইশ বছর বয়সী যুবতী, একেবারে ঘরে ঢুকে পরেছে। আবিদ ঘুরে তাকিয়ে দেখে কৌতুহলী চোখে রুমু তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মেয়েটির লম্বা চুলগুলো ঢেউয়ের মতন ছলকে পড়ছে পিঠের দিকে। হলদেটে ফরসা গায়ের রঙ, একেবারে বাঙালী চেহারা। চোখগুলো বড় বড়, চোখের মনিটা অস্ম্ভব কালো। লম্বাটে শরীর। আজকাল মেয়েরাতো শাড়ী পড়ে-ই না তেমন একটা, কিন্তু রুমু পড়েছে।

-‘শুন্‌তে পাচছেন? মা ডাকছে।’

আবিদ এ মুখ কখনো কোনদিন দেখেনি, অথচ মনে হচ্ছে কতকালের চেনা। প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে অন্ধকারে... রাতের চেয়েও অনেক ঘন সেই অন্ধকার; প্রগাঢ়, অথচ এই মুখটি কি অসম্ভব আলো জ্বালাতে পারে, পারে কি? পারেনা??? আবিদ তা-ই ভাবছিল। যেন কতকাল এই মুখটিই সে খুঁজছিল। চেহারাটা কঠিন এবং কোমল এর মাঝামাঝি, যেন এক আলো-আঁধারি খেলা, যেন এক অজানা বিস্ময়।

- ‘জি, আসছি।’ বলে নিজেকে সামলে নেয় আবিদ। কানে বেজে উঠে রামকুমারের বিখ্যাত সেই টপ্পা... ‘প্রভাত হইল ভূবন গাহিল, টাকা, টাকা টাকা, বুলি... এ জগতে ভাই টাকাই শ্রেষ্ঠ, টাকারে পাইতে সবে সচেষ্ট; ধনীরা খুলেছে আয়রন চেষ্ঠ, ভিখারী খুলেছে ঝুলি...’

-----------------------------------------------------------

চোখ মুখ তুলে আলসেমী ঝেড়ে ভাল করে তাকিয়ে দেখে আবিদ। যুগ যুগ পেরিয়ে শ্যাওলা জমে জমে আজ এটি একটি বয়স্ক বাড়ি। বাড়ির সব গাছগুলো যেন উপুড় হয়ে ছাদের উপরে হেলে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে তখন মফস্বল শহর । চুপচাপ চারদিক, একাকী, নিঃস্বঙ্গ বেদনাময়। মাঝে মাঝে জোনাকি পোকারা পাতার ফাঁকে ফাঁকে গান গেয়ে উঠছে। সমস্বরে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা পালন করছে মাতাল উৎসব। রাতের খাবারের পর গোপন অন্ধকারে একাকী ছাদে বসে সিগারেট টানছিলো আবিদ। নারকেল গাছের পাতাগুলো এলোমেলো দুলছিল। যেন কোন এক অজানা বাতাস ওদের ধাওয়া করেছে। হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে পেছন দিকে পাতার আড়ালে দেখতে পায় সে রুমুকে। এই ঘন অন্ধকারে কি করছে মেয়েটি? কখনই বা এলো সে? চমকে ওঠে আবিদ। রেলিংএর উপর বসে আছে রুমু। ধীর পায়ে কাছে যায় সে। লক্ষ্য করে মেয়েটি অঝোর ধারায় কাঁদছে। হতবাক হয়ে আবিদ রুমুর সামনে বসে পড়ে। তাকিয়ে তাকিয়ে নারীর কান্না দৃশ্য দেখতে থাকে। রুমু তক্ষনি সব চোখের জল মুছে ফেলে শাড়ির আঁচল দিয়ে।

- কি করছেন এখানে এত রাতে? ভারী সাহস দেখছি আপনার? আবিদ বলে।

- কিছু না। খুব দম বন্ধ লাগছিল ঘরে, তাই ছাদে এলাম।

- ও, মন খারাপ আপনার?

- না।

- তাহলে কাঁদছিলেন কেন?

- সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাইনা?

- আজতো পূণির্মা না, দেখুন কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার! এমন অন্ধকার আপনার ভালোলাগে?

- মাঝে মাঝে লাগে। মনে হয় অন্ধকারে মিশে যাই। কেউ আর কোনদিন খুঁজে পাবে না আমায়। আপনার জিন্সের প্যান্টেতো শ্যাওলা লেগে গেছে, উঠে বসুন।

- লেগেছেতো কাপড়ে, মুছে ফেলা যাবে, আর গায়ে যে শ্যাওলা তা মুছবো কি করে বলুনতো?

- তার মানে? আমি আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।

- না, এমনি বলছিলাম। এত রাতে এখানে আসতে ভয় করল না?

- না। এতো আমারই বাড়ির ছাঁদ, খুব পরিচিত...নয়কি?

- এইযে আমি একজন অপরিচিত পুরুষ আপনার সাথে বসে আছি, আপনার একটুও ভয় করছে না?

- না।

- কেন?

- কিজানি, জানি না। আপনাকে অনেক চেনা লাগছে। কেনযে এমন লাগছে জানি না। আজ যখন প্রথম আপনাকে দেখলাম, তখনও এমন লাগলো।

- অদ্ভুত! আমারও এমনই লেগেছে জানেন? মনে হয়েছে অনেকদিন ধরে চিনি আপনাকে।অথচ আপনাকেতো কোনদিন কখনও দেখিনি আমি, তাইনা!!!

- দেখেছেন, খুব ছোটবেলায় একবার আপনাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম।মা বলেছে।

- ও তাই, কিজানি, মনে নেই।

- আচ্ছা, আপনি কি জানেন? আপনি অনেক সুন্দর! মেয়েরা এত সুন্দর হলে আমার ভাল লাগে না।

- হ্যা, জানি, জানবোনা কেন? কিন্তু ছেলেদের সুন্দর মেয়ে পছন্দ না, এটা এ জীবনে প্রথম শুনলাম।

- না, আমার কাছে সুন্দর এর সংগা আলাদা। আমি সবকিছু খুব ন্যাচারাল পছন্দ করি। মেয়েরা বেশি সাজগোজ করলে আমার ভালো লাগেনা। এইযে আপনি তাঁতের শাড়ি পড়েছেন, আপনাকে ভারী সুন্দর লাগছে। তারপর ধরুন, আপনি যদি ফর্সা না হয়ে কালো হতেন তাহলেও আপনাকে সুন্দর লাগত।

-থ্যাঙ্কস। আচ্ছা, আপনি এরকম লম্বা লম্বা চুল রেখেছেন কেন? ঢাকায় কি এখন এই স্টাইল চলছে?

- আবিদ একটু লজ্জ্বা পেয়ে যায়। বলে, ‘না, না স্টাইল না। আমি চুল কাটার সময় পাই না।’

- তাই? কি করেন আপনি?

- না তেমন কিছু করি না। বলে মাথা চুলকোতে থাকে আবিদ। আবিদ নিজেকেই আবার প্রশ্ন করে, ও আসলে কি করে? কি করে আবিদ?

রুমু আলো আধাঁরী ছায়ায় তাকিয়ে তাকিয়ে আবিদকে দেখতে থাকে। মনে হয় এই পুরুষটি ঠিক যেন আর দশটা সাধারন পুরুষের মত নয়। শ্যামলা গায়ের রঙ, তীক্ষ্ণ চোখ, নাকটা অপেক্ষাকৃত লম্বা। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কালো একটা টি-শার্ট আর জিন্স পরা। গলায় কাঠ, পাথর, রুদ্রাক্ষ, আরও নানা ধরনের তিন চারটা মালা। হাতেও তামা, রুপা আর কত কিসের বালা। ছেলেরা আজকাল এত কিছু পরে? রুমু অবাক হয়।

- কি ব্যাপার, কি দেখছেন?

- না, না, কিছু না……বলে রুমু লজ্জ্বা পায়।

সহসাই কিছু না বলে রুমুর হাতটা ধরে ফেলে আবিদ। মুহুর্তেই রুমু অপ্রস্তুত হয়ে উঠে কিনতু কিছুই বলে না, বাঁধাও দেয় না। মফস্বলের ঝিমধরা ধোঁয়াটে কোমল অন্ধকার ক্রমশ আরো প্রগাঢ় ও ব্যক্তিগত হতে থাকে।

------------------------------ ---------------------------

সারারাত নির্ঘুম রাত্রি যাপন। তবু খুব ভোরে বেড়িয়ে পড়ে আবিদ। জামালপুর সদর স্টেশন থেকে প্রায় তিন ঘন্টার পথ। ভোর তখনও কাটেনি । নিকষকালো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে আছে সবুজ সোনার বাংলা। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার মত এক চিলতে জমি কোথাও নেই। শুধু মানুষ আর মানুষ। বাড়ি থেকে বেড়িয়েই ফুটপাথে মানুষ, ল্যাম্পপোস্টের নিচে মানুষ, স্টেশনে মানুষ্‌……এত মানুষের ভীড়ে দেশ গড়ার স্বপ্ন কটা মানুষ ধারন করতে পারে? যেখানে বেঁচে থাকার এত সংগ্রাম? হতাশ আবিদ তবু স্বপ্ন দেখতে চায়, প্রশ্ন করে নিজেকে, যা গেছে তা গেছে…কিছুই কি আর নেই বাকি? এদেশ বাঁচাতে আমরা কি কিছুই করতে পারি না? মনে পড়ে যায় সেই সময়ের কথা, বাবার চরম কষ্টের দিনগুলো, শরনার্থী শিবিরে মা, বোন, গুলিবিদ্ধ ভাই, একাত্তুরের সেই ভয়াবহ দিনগুলি……………নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বন্ধু……বাবার কাছে শোনা ওই সময়ের ভয়াবহ স্মৃতি সামলে উঠতে পারে না যেন মাঝে মাঝে। মনে হয়, ভবিষ্যত বলে যেন কিছু নেই আর জীবনে। হাত দিয়ে পেটের মধ্যে গুঁজে রাখা অস্ত্রের শব্দ শুনতে পায় আবিদ। সন্ত্রাস, দুর্নীতি এগুলো এখন খুব অর্থহীন শব্দ। রাষ্ট্র পরির্বতন, সমাজসেবা, উৎপাদক শ্রেনীর স্বার্থ সংরক্ষণ……এসব কোন কিছুই ওকে স্পর্শ করে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, একি মানুষের জীবন নাকি অন্যকিছু? আবিদ হাটতে থাকে স্টেশন বরাবর। এক্সপ্রেস মেইল ভোর পাঁচটায়। চোখের ভেতর অদৃশ্য এক মায়া ভাসে। যে নারীটির সাথে কাল সারাটা রাত কেটেছে, সেই মায়া বুকে নিয়ে হেটে চলছে সে। রুমুর চোখে, নাকে, কপালে টান টান আত্মবিশ্বাস, ঠোট গুলোতে বাদামী আলোর ছায়া। নরম কালো চুল। মনে হয় এ বড় আপন, বড় কাছের।

ঝন ঝন করে মোবাইল বেজে ওঠে আবিদের। বড়ভাইয়ের ফোন।

- কিরে রওনা হইসিশ?

- জ্বী বড় ভাই।

- জিনিস সাথে নিসশতো ঠিক মতো?

- জ্বী বড়ভাই, কোনো চিন্তা কইরনা।

- শোন, কামডা সাইরাই আমারে ফোন দিবি।

- জ্বী, আচ্ছা।

বাতাসটা বেশ ঠান্ডা। লাল ট্রেনটা ঝুমঝুম করে মনের আনন্দে স্টেশনে এসে থামলো। আজ প্রথমবারের মত আবিদের ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছা করছে। বারবার মনে পড়ছে কাল রাতের কথা। রুমু যদি জানতো ও কাউকে খুন করতে যাচ্ছে আজ, তবে নিশ্চ্য়ই সারাটা রাত এভাবে লতার মতন জড়িয়ে থাকতো না ওকে। কেন মেয়েটা এভাবে ওকে মায়ার জড়ালো আবিদ ভাবতে পারছে না। হাত থেকে চাদরটা খুলে গায়ে মেলে দিলো সে। দ্বিতীয় শ্রেনীর কামরা। ভোরবেলায় যাত্রী কম। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় প্রায় এক লক্ষ তিরানব্বই হাজার মানুষের বাস। তারা কি সবাই ঘুমিয়ে আছে? নাকি তারা টের পেয়ে গেছে গভীর ষড়যন্ত্রের কথা। জামালপুর সদর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মালেন্দাহা এবং সরিষাবাড়ী, সবগুলো উপজেলা থেকে এক এক জন আজ পৌছে যাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। ট্রেন এখন একটানা দুলতে দুলতে ছুটছে। পল্লীবানী পত্রিকা নিয়ে একটা দশ বারো বছর বয়সী ছেলে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো।

- স্যার, পত্রিকা নিবেন?

- না, যা।

- স্যা………র, ছেলেটা ফিসফিস করে ওকে ডাকতে থাকে। পত্রিকাটা নেন।

আবিদ চারপাশের লোকজনের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে পত্রিকাটা নেয়। ছেলেটা টাকা না নিয়েই তাড়াহুরো করে নেমে পরে স্টেশনে। পত্রিকাটার দ্বিতীয় পাতায় একটা সাদা কাগজে লেখা, ‘পরের স্টেশনে নাইমা পর’। সারারাত না ঘুমিয়ে আবিদের মাথাটা একটু টলছে। কি করবে হঠাত যেন ঠিক করতে পারছে না। চারদিকে ভ্রমরেরা শব্দহীন চলাফেরা করছে। একদম স্পষ্ট টের পাচ্ছে আবিদ। কি করবে সে? নেমে যাবে? নাকি ঝুঁকি নেবে? লম্বা লম্বা মাথার চুলগুলো টানতে থাকে অবিরাম।

-------------------------------------------------------------

আবিদ চলে যাবার পর নিজের ঘরে ফিরে এসে ভাবতে থাকে রুমু। কি হয়েছিলো ওর গতরাতে। কি চেয়েছিলো ও আবিদের কাছে? আবিদকে কেনো ওর এতো ভাল লাগলো!!! ছেলেটার প্রতিবাদী চোখ, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, লম্বা লম্বা চুল, আর আধুনিক পোশাক ওকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে নিজেকে মেলে ধরতে এতটুকু সংকোচ হোলনা রুমুর? মধ্যরাত যখন তীব্র গতিতে ছুটে চলছে, নিঃশ্বাস-পতন যখন ভারী হয়ে এসেছে, তখনও কি ও জানতো এই গতিকাল ওর আয়ত্বের বাইরে?...নাকি আবিদের মধ্যে অসীমের আবিষ্কার করতে চেয়েছিল সে। কিছুই ভাবতে পারছে না আর। মা বাজারে বেরিয়ে গেলে ধীর পায়ে বারান্দার ঘরে পৌছায় সে। যে ঘরে আবিদের জিনিষগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চোখ যায় বিছানার নিচে শ্যাওলা রঙের উপর। স্যূটেকসটার লক ঘুরাতে থাকে সে। ০০০০, ৩৩৩৩, ১৯৪৫, ১৯৬৫, ১৯৭১….........ঘট করে খুলে গেল স্যূটেকস। হিম হয়ে আসে রুমুর শরীর। একদৌড়ে ঘরের দরজা, জানালা দুটোই বন্ধ করে দেয় সে। স্যূটেকসটাকে টেনে এনে মেলে ধরে রুমু।

প্রথমেই চোখে পড়ে একটা কালো ডাইরী। প্রথম পাতাটা উল্টায় সে । ‘দেশপ্রেম এখন একটা অর্থহীন বিষয়।একটা বিলীয়মান ধারনা। স্বার্থপর মানুষ আজ যাবতীয় বায়বীয় বিষয় নিয়েই সন্তুষ্ট। ‘নিজের সুখ ও অর্জন ছাড়া সবকিছুই অপচয়’ এই হিসাব মানুষকে অমানুষ করে তুলেছে। আমার কোন সুখ বা স্বপ্নবিলাস নেই। আমার আছে শুধুই অস্ত্র। তবু, কোন বায়বীয় বিষয় নিয়ে আমি ভাবতে পারি না। যদি কোনদিন এই পৃথিবী আমায় ঠাই না দেয় তাতে কোন দুঃখ থাকবে না। অন্তত এটা জানবো, নিজের কাছে নিজের আমার যথেষ্ট ঠাঁই ছিল,’

রুমু পাতা উল্টায়।

‘আমাকে যদি কেউ সন্ত্রাসী বলে, আতংকিত হয়, আমি হাসি। এই কারণে হাসি যে, যারা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিচ্ছে বারবার সাধারন মানুষের কাছ থেকে, খেয়ে নিচ্ছে তেল, গম, নুন, বছরের পর বছর, তাদের সন্ত্রাস, তাদের রাহাজানি নিয়ে টু শব্দটি করে না কেউ। সমাজ পরিবর্তনের জন্য বায়বীয় আকাঙ্ক্ষার ত্যাগ কজন মানুষ করতে চায়? আজকাল কেউ করে না ।’

রুমু পা ছড়িয়ে বসে পরে মাটিতে। ডাইরীটা রেখে দেয়। থরে থরে গোছানো কাপড়। একটা সাদা কালো বাঁধানো ছবি। বাবা মা আর আবিদ। কিছু কাপড় সরাতেই হাত পা শীতল হয়ে আশে রুমুর। একটা বেশ ওজনদার পিস্তল। কাপড়ের মধ্যে প্যাঁচানো। ঝপ করে স্যূটেকসটার মুখটা বন্ধ করে উঠে পড়ে রুমু। বুকের ভেতর ধক ধক করতে থাকে। সোজা বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সারাটা দিন ভীষন বিষন্ন এলোমেলো এবং নিজস্বতায় কাটে রুমুর। সে কি ভুল মানুষের কাছে মেলে ধরেছে নিজেকে! নাকি যা ভুল ভাবছে সে ভুল নয়, চোরাবালি। আদতে কোন মানুষ ওখানে ছিলই না। সবটাই ছিল একটা ধোঁয়াশা।

আকাশ মেঘলা। গুমোট চারপাশ। কোথায় তার জন্ম, কোথায় তার ব্যাপ্তি, কোথায় বিকাশ… সব ভুলে যায় রুমু। এই শহরে কত মানুষ!! শিক্ষক, দোকানদার, ফেরিওয়ালা ……তারা কি সবাই শুদ্ধ? রুমু ভাবতে থাকে ভাল মানুষের সংজ্ঞা কি? পুরো দিন চলে যায়, তারপর পুরোটা রাত। একটি রাত পাহাড় হয়ে ঢেকে দিয়েছে যেন আরেকটি রাতকে। পৃথিবী থেকে আজ কতজন মানুষ্ গত হবে, সে হিসাব রুমুর কাছে এখন অর্থহীন ও অযৌক্তিক।

রুমুর সাথে আবিদের আর দেখা হয়নি। আবিদ আর কোনদিন ফিরে আসেনি। কিন্ত ঐ স্যূটেকসটা ভরে গেছে আরও অনেক অসংখ্য ধারালো অস্ত্রে। আবিদের পর ওই বাড়ীতে এসেছে…পলাশ, শান্ত, গৌতম, বিভাস আরো কত শত মানুষ। কিন্ত একবারও আর ফেরেনি আবিদ। প্রতিদিন রুমুর মনে হোত এই হয়ত এসে পড়বে। ঘন্টার পর ঘন্টা, ডাকপিয়নের অপেক্ষায় চেয়ে থেকেছে। ওর সাথে অপেক্ষা করেছে কত চড়ুই, কত শালিক, কত দাঁড়কাক । ওরা একসাথে ডাঙ্গুলি খেলেছে। এক্ সময় ডাকপিয়ন এসেছে কিন্তূ কোন চিঠি আসেনি। পাখিরা রেখে গেছে খরকুটো লতাপাতা আর রুমু সেগুলো যত্ন করে জড় করে রেখেছে স্যূটেকসে।

মোহাম্মদপুরের স্নিগ্ধা স্টুডিওটা পার হয়ে কামাল হাতের ডানের হোটেলটায় ঢুকে পরে। হোটেল মালিক বিহারী চিনু এক লাফে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পলাশ কামালের জন্য অপেক্ষা করছিল।

চিনু জিজ্ঞেস করে,

-‘বড়ভাই, কিছু খাইবেন না?’

-না, বলে পলাশকে উঠে আশার জন্য ইশারা করে কামাল।

তারপর ওরা হাটতে থাকে উলটো দিকে মোহাম্মদপুর ঢাল বরাবর। পলাশ খুব সাবধানে পকেট থেকে পিস্তল্টা বের করে কামালের হাতে দেয়। কামাল নির্দিধায় ওটাকে নিয়ে নিজের পকেটে ঢোকায়। পুরো রাস্তা জুড়ে জানজট। রিং রোডটা কোনও কারনে বন্ধ, তাই এই রোডের উপর চাপ বেশী। তাতে ওদের কোন মাথা ব্যথা নেই। যেন পুরো শহরটাই ওদের। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, উঁচু উঁচু দালান, গাড়ি, রিকশা সবই ওদের। খেতে চাইলে ঢুকে পরো হোটেলে, কেউ টাকা চাইবে না, বাড়ি ভাড়া একসঙ্গে তিন চারটা, পার্টির লোকজন আসে-যায়, তাছাড়া মিটিং সিটিং তো আছেই। কামালকে এসব কিছু সামলাতে হয়। এতদিন আবিদ ছিল, এত কিছু কামালকে ভাবতে হয়নি। আবিদ একটা ছোট্ট অপারেশনের সময় উধাও হয়েছে, এখনও ফেরেনি। আদৌ ফিরবেনা কিনা এ রহস্য কেউ জানে না। কেউ ভাবতে পারেনা আবিদের মত একজন মেধাবী ছেলের এভাবে চলে যেতে হবে। শুধু কামাল জানে, এ মৃত্যু কোন রহস্য নয়। জীবনের একটি উপহাস মাত্র।

আবিদকে খুঁজতে গিয়েই একদিন জামালপুর শহরে আটকে গিয়েছিল কামাল স্টেশন মাস্টার আলতাফ হোসেনের বাড়িতে। রুমুকে দেখে এই প্রথম নিজেকে মনে হয়েছে ভীষন একা নিঃসঙ্গ মানুষ সে। ভনিতা না করে সরাসরি এই ভাল লাগার কথাটা জানিয়েছিল সে রুমুকে। রুমু ওকে অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আলতাফ হোসেনের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েও রাজি করাতে পারেনি রুমুকে। এ কোন জৈবিক টান সে অনুভব করে রুমুর জন্য? অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে কামাল। এদেশের কত মানুষ ওকে ভয় পায়, শুধু একটি মেয়েমানুষকে এখনও বশ করতে পারেনি সে । কিসের এত দাপট? কিসের এত তেজ মেয়েটির? কোথায় পায় এত শক্তি? কামালের সব চাওয়া পাওয়া তুচ্ছ হয়ে যায় যার কাছে।

- বড়ভাই, কিছু ভাবতাছেন?

- হু, ও হ্যা তোর ভাবীর কথা ভাবছি।

- উনারে তো ভাবী কইলে উনি মাইন্ড করে বড়ভাই।

- হুম, কিছুদিন সহ্য কর, তখন ভাবী, খালা সবই ডাকতে পারবি।

- আমার ডাকা দিয়া কি কাম? আপনারে বিয়া করলেই আমরা খুশি। বলেই খুক খুক করে হাসতে থাকে পলাশ।

- চু……প শালা!একদম চুপ থাক। বলে নিজের মনেই গজগজ করতে থাকে কামাল।

মাথা গরম নিয়ে বাড়ি ফিরে আজ কামাল। মনে মনে ভাবে যে করেই হোক আজ রুমুকে বিয়ের জন্য রাজি করিয়েই ছাড়বে।

- তুমি আমাকে বিয়ে করবেনা কেন?

- কারণ তুমি একটা অসভ্য ইতর, জানোয়ার।

- তাই নাকি? তোমার প্রেমিকও তো আমারই শিষ্য ছিল। ওকে তোমার অসভ্য মনে হোত না?

- না……ওকে তুমি ব্যবহার করেছো।

- ওকি থালা বাসন? নাকি লিকুইড সাবান, যে ঘসা দিলেই ব্যবহৃত হবে?

- তুমি বুঝতে পারো? তোমাকে সবাই ভয় পায়। কেউ তোমাকে ভালবাসে না।

- না বাসুক………আমি সবার ভালোবাসা চাই কে বললো তোমাকে? এই পৃথিবীতে টাকা থাকলে ভালোবাসা এক তুড়ি দিয়ে কিনে ফেলা যায়। তোমাকে কিনতে আমার কত টাকা লেগেছে তুমি জানো?

- না, জানতেও চাই না। ছিঃ……। আমার ভাবতে অবাক লাগে! কোন রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে এত মানুষ তোমাকে বড়ভাই মানে। মানুষ জেনে শুনে কি করে এই ভুল করে? তুমি কি জানো……বাড়ীওয়ালা, মাছওয়ালা, এমন কি যাদের গর্ভে তুমি জন্মেছো তারাও তোমাকে ভয় পায়? এ তোমার কত বড় ব্যর্থতা বুঝতে পারো? এইযে তুমি আমার বাবা-মাকে ভয় দেখিয়ে আমাকে জোড় করে ধরে এনেছো, তোমার কি মনে হয় এটা তোমার জয়? আমি তোমার পিস্তল নইযে যখন তখন মানুষ খুন করবার মত আমাকে ব্যবহার করবে। কোন কিছু নিজের করে পেতে চাইলে তা অর্জন করতে হয়… জ়োড় করে কিছু পাওয়া যায়না। কাক পাখি কখনও কি চাইলেও চিল হতে পারে? উড়তে পারে সাত আসমানের উপর? তুমি কাক…চিল হতে চেয়েছিলে, তাই তোমার ডানাগুলো সব ভেঙ্গে পড়েছে।

- স্টপ স্টপ…………স্টপ ইট। আমাকে জ্ঞান দিচ্ছো তুমি? তোমার এত বড় সাহস?

- হ্যা, আমার সাহস দেখবে তুমি, দেখতে চাও? চাইলে আমি তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারি, আমার একটুও ভয় করবেনা। একটুও অপরাধবোধ হবেনা। রুমুর সারা শরীর ঘৃণায় রি রি করতে থাকে। চোখের মনিগুলো যেন ঠিকরে বেরিয়ে পড়বে।

দরজায় কেউ শব্দ করছে। ঠক ঠক ঠক…… পিস্তল্টা বেল্টের মধ্যে গুঁজে হন্ত দন্ত করে লাফিয়ে উঠে দরজা খুলতে যায় কামাল। নিয়াজ আর রাখাল এসেছে। ঘরে ঢুকেই নিয়াজ চিৎকার করতে থাকে……’ভাবী…ভাবী……চা খাওয়ান……’

আজ রুমুর শান্ত, সৌম্য প্রতিমা রূপটি যেন আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। রুমু চিৎকার করতে থাকে………

- কে? কে?......কে তোমাদের ভাবী? ঐ বিচ্ছিরী শব্দটা আমার সামনে উচ্চারন করবার সাহস হয় কি করে তোমাদের? বেরিয়ে যাও, এক্ষুনি বেরিয়ে যাও এখানে থেকে…………

কামাল রুমুর মুখ একহাত দিয়ে চেপে ধরে আরেক হাত দিয়ে ওকে টানতে টানতে বেডরুমের দিকে নিয়ে যায়।

একটি চিনহিত এলাকা বরাবর রুমুর চলাফেরা। এর বাইরে সে পুরোটাই পরাধীন। তাজমহল রোড, বাবর রোড, হুমায়ুন রোড, সব রাজ রাজাদের পথে পথে ততটাই শুন্য একটি মানুষ, রুমু। মোহাম্মদপুর বাজারে সবাই ওকে চেনে সন্ত্রাসী কামালের বউ হিসেবে। জব্বার মাছওয়ালা, মুদি দোকানী শ্যামল, মাংসের দোকানের রস্তম কসাই… সবাই ওকে বিশেষ সম্মান করে। রুমু চায় না এসব সম্মান, ও চায় না ওর দিকে কেউ তাকিয়ে হাসুক, সালাম দিক। ও একটু শান্তিতে তাজমহল রোড বরাবর হেঁটে যেতে চায়…সেই কৃষ্ণচূড়ার আঁচলে ঘেরা সবুজ ছায়াপথ, যেখানে কোন মানুষ ওকে প্রশ্ন করবেনা… শাড়ির আঁচল যদি বাতাসে লুটোপুটি খায়…খাক, ফর্সা পা দুটো যদি পথের ধূলোয় আর কাঁদামাটিতে নোংরা হয়ে যায়…যাক......। তবু রুমু হাটবে হাটবে আর হাটবে। একরাতের সেই পৃথিবী ভ্রমন যতই তাকে দূর্বল করে তুলুক, রুমু জানে সেই ভাসমান জ্যোতি কোন না কোন একদিন তাকে পৌঁছে দেবে মাটি থেকে স্বর্গে।


লেখক পরিচিতি
মৌসুমী কাদের

জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায়। পৈতৃক ও মাতৃক আদি নিবাস ময়মনসিংহে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স । পরবর্তীতে কানাডায় ‘ব্যবসা ব্যবস্থাপনা’ ও ‘মেন্টাল হেলথ’ এ উচ্চতর পড়াশুনা।

বাংলাদেশে ইউ, এন, ডি, পি, তে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে টরন্টোতে ‘উডগ্রীণ কমিউনিটি সার্ভিসেস’ এ ‘এমপ্লয়মেন্ট এডভাইজর’ হিসেবে কর্মরত আছেন।

সাহিত্য, সংগীত, সমাজ ও রাজনীতি তার আগ্রহের মূল বিষয়। গান আর লেখালেখির সাথে যূথবদ্ধতা দীর্ঘকাল। ছায়ানট থেকে সংগীতে ডিপ্লোমা। ‘ইতিহাস কন্যা’ ও ‘শিলালিপি’ - চলচিত্র দুটিতে সংগীত পরিচালনা ও সুর সংযোজন করেছেন। প্রকাশিত এলবাম ‘পথের ধারের ভাঙা মানুষ’ ও ‘স্বপ্নখোর’। সুরারোপিত গানের সংখ্যা প্রায় ২৫। প্রবাসে বাংলা ভাষা, সুর ও চেতনাকে জিইয়ে রেখেছেন নিজের মত করে, ভূপালী সংগীত বিদ্যায়তনের পরিচালক-সংগীত শিক্ষক হিসেবে । অবসরে লেখেন । বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত ছোটগল্পের সংখ্যা ১৫ টি । দীর্ঘদিন কানাডা প্রবাসী।
































কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন