বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

নকশাবন্দি

শামিম আহমেদ


আলজিহ্বাতে আলেক শহর আল্লা বসে রয়েছে।

বাপজি, ধরেন আপনি দোকানে গিয়্যাছেন বউবিবির লেগ্যা একটো হার কিনব্যান। তা বেশ জম্পেশ নকশাঅলা একটা হার আপনার পসন্দ হইল। স্যাকরা তার দাম হাঁকলো পঞ্চাশ হাজার। নকশার গুণকীর্তন কইরলো খুব। আপনি কিন্যা লইয়্যা আসলেন। যাকে বলে বউবিবির দিলখুশ। খুদা না করুক, আপনি একটো বড় ফ্যাসাদে পড়্যা ওই হার বিক্রয়ের লেগ্যা সেই স্যাকরার কাছে আবার গেল্যান। সে ব্যাটা সুনার দামে মালটো কিনব্যা, নকশার দাম সে দিবে না। বুজল্যান কিনা, বিক্রয়ের টাইম স্যাকরা ব্যাটা নকশার সমজদার, কিনব্যার টাইম সে সুনা ছাড়া কিসস্যু বোজে না। এই দুনিয়াদারিও তাই বাপজি। ওই নকশার মুতুন। ব্যাচার টাইম ছ্যাঁচা, কিনবার টাইম পুরা মিছা। সুনাটোই শুধু ছ্যাঁচা বাপজি!


নকশার কথা যখন কইছি বাপজি, তকন আপনারে বলি, আমি হইলাম গিয়ে ওই নকশাবন্দি দরবেশ। ভীষণ গরিবিয়ানায় থাকি, বিশ্বাস করব্যান কিনা জানি না। ভাবত্যাছেন কুনো ধান্দায় গরিবির কতা কইছি। আমরা সে ঘরাণার লোক লই জি! মুল্লাদের মুতুন আমাদের টাকার উপর লোভ নাই। গরিবি লইয়া বড্ড সুখে আছি। পরের জন্য ভিক্ষা মাঙ্গি, নিজের জন্য কিসস্যু চাহি না। এই দুনিয়ায় আল্লা যা পয়দা করেছেন, এই আকাশ-বাতাস-মাটি আর পানি, তার উপরেই ভেস্যা থেকা বড্ড সুখ পাই। আল্লার মতো দেনেঅলা আর কেহই নাই। তার অঢেল ঐশ্বর্য, তার উপরেই আমার জীবন নৌকা চলে। সেই একটো গান ছিল না! আলজিহ্বাতে আলেক শহর, ওরে আল্লা বসে রয়েছে। আর অ্যাকটো গান, নৌকা চলে আর চলে না, ওরে সুনার চান্দ, দিনদুনিয়ায় আইলো তুফান কে দিবে আসান। মানে কী জানেন বাপ! মানে হইল, নৌকার ভিতর পানি ঢুকল্যা বিপদ, অথচ সেই নৌকার নীচে পানি মানে আপনি বেশ আরামে ভেস্যা আছেন। একই পানি, ভিতরে ঢুকল্যা আপদ, বাহিরে না থাকিলে বিপদ।

আমাদের ঘরাণার নাম হইল গিয়ে চিস্তি ঘরাণা। আফগানিস্তানে হেরাট শহরের কতা শুন্যাছেন নিশ্চয়। ওই যেখানে আমেরিকা বুমা ফেল্যা কোটি কোটি লোক মের‍্যা ফেলল। ওই শহরের পাশে আর একটো ছোটো শহর আছে, যার খবর কেউ রাখে না। নাম হইল গিয়ে চিস্ত। ওখানেই আমাদের ঘরাণা তৈয়ার হয়। আবু ইশাক নামের এক মস্ত লোক, তিনিই আমাদের আদি গুরু। খাজা গরিব নওয়াজের নাম তো আপনারা জানেন সক্কলে। তিনিও আমাদের ঘরাণার।

তা কতাটা চলছিল নকশা নিয়া। জিকরের কতা না বল্যা নকশার কতা বলা যাবে না। বেশি কতা বলব না। শুধু দু-একটো কতা বললেই চলবে। আমরা চুপচাপ জিকর করি, চ্যাঁচাই না। আমাদের গুরুর গুরু হজরত আবু বকর। তাঁর গুরু দ্বিন-দুনিয়ায় প্রিয় মুহাম্মদ।

যদি আমাদের নকশা জানতে চান বাপজি, শ্বাসে ব্যাম করতে হবে আপনাকে। এক নম্বরে। দু নম্বরে আপনাকে পা ফেলত্যা হবে খুব সাবধানে। আপনার পা, যে পা দিয়্যা আপনি হাঁটেন বাপজান। আরও আছে। এগারোটার মধ্যে দুই খান কইলাম। জানি না, সবটা শুনানো যাবে কিনা আজ। হাতে মেলা টাইম নাই।

আপনাদের সঙ্গে যে কয় দিন আমার দ্যাখা হইল, সেই কয় দিন আমি অন্য ঘোরে ছিলাম বাপজানেরা। আমি বুঝি নাই, আপনাদের আমি দাগা দিয়াছি। আসলে আপনাদের কপালের ভাঁজে অদ্ভুত নকশা দেখছিলাম তো, তাই ঘোরের মধ্যে সব কতা বল্যা দিয়াছি। আপনারা আমাকে খাতিরযত্ন করব্যান বলে করি নাই।

ওই যে আপনার ছোটো দাদো, যেনার চালের গুদাম ছিল, তেনাকে আমি কিছুই বলতে চাইনি, কিন্তু তেনার কপালের নকশা দেখ্যা আমি পেত্থমে থ। তার পর মুখ দিয়া বাহির হইয়া গেল। আপনার ছোটো দাদো আমারে কইলো, আমি নাকি খুদার খালাতো ভাই অ্যালাম। কী বেশরা কতা! আল্লা তেনাকে ক্ষমা করনেওলা। কিন্তু বিশ্বাস কর‍্যান বাপজান, আপনার ছোটো দাদো খুন হইবেন, তেনার গলার নলি গরু জবাইয়ের ছুরি দিয়া কাটাইয়া ফেলব্যা এ কতা আমি আগে জানতাম না। সব ওই নকশায় ল্যাখা ছিল। আমার বলার চব্বিশ ঘন্টাও কাটে নাই, তার মধ্যেই ওই কাণ্ড। নকশার খেল।

আজ বহু বৎসর কেট্যা গেল। আপনার বড় ভাইটোর লেগ্যা কী কয়েছিলাম আমার সব মুনে আছে। তার আগে বাপজি, এগারো খানের তিন নম্বরটা বলি। নিজের শরীলের মধ্যে ঢুক্যা নিজেরে চিনা খুব জরুলি। ইখান থিকা উখানে যান গাড়ি-ঘুইড়া চইড়্যা, তা বেশ কর‍্যান; কিন্তু নিজের মধ্যে একটি বার যান, ঢুইক্যা দেখেন ভিতরে দ্যাশটায় কী আছে! চার নম্বরটায় ঢুকি, তার পর অন্য কতা বলব। এত আওয়াজ, এত ঢাকঢোল, কুনটো বাপজান আসলি আর কুনটো নকলি, বুজা দায়। এইটা আপনারে বুজতে হবে। আপনার বড় ভাইজানের কতায় ফিরি। আখের ভুঁইয়ে গুলি খাইয়া মরল সে আপনার দোষে, না পুলিশের দোষে সে কতা আমি জানি কি জানি না তা বলব না। শুদু একটা কতা বাপ, উয়ার নকশা কাটা ছিল সরকারের ঘরে। আর তাইতে উয়ার লাশ আপনারা পাইলেন না। জানাজা হইল না, না হইল গোর। তবে উয়ার লাশের দাফন হইল কী প্রকারে? সে আর এক কঠিন নকশা। উয়ারে পুড়ায়্যা দিছে। যাতে উয়ার কবরে আজাব না হয়। উয়ার বারজাখ নাই, শবেবরাতে উয়ার কবরে লুবান কাঠি নাই। উয়াকে পুড়ায়্যা দিয়া যে দু বার খুন কইরলো, সে কতা বলতে গেলেই আমাকে ধর‍্যা নিয়া যাবে গারদে। তবে উয়ারা আমাকে আটকাইতে পারবে না, সে ক্ষ্যামতা আল্লা দ্যায় নাই উয়াদের। আপনার ভাইটার ডেড বডিকে খুন কইর‍্যা উয়ারা কুন নকশা মুছ্যা ফেলতে চাইল, তা আমি জানি বাপজান। উয়ার শরীলে ছিল নকশার উপর নকশা। আহা, কী তার কপালের গড়ন! গুলি খাইয়্যা যখন পইড়া ছিল তখনও মুনে হইল, এই লাশের কবর হইলে সে আবার বেঁইচে উঠবে। আর এইটা জানত সরকার আর তার পুলিশ, তাই তাকে আবার গুম কইর‍্যা খুন করল।

কিসু ভুলা যাইবে না। সব মুনে করতে হবে আপনাদের। আপনার দাদো আর ভাইজানের কতা আর ভুইলা থাকবেন না। আমিও ভুলি নাই। মুনে রাখা আর তার ব্যামটো হইল পাঁচ নম্বর আমল। ছয় নম্বর আমল হইল নিজেরে ঠিক রাখত্যা হবে, আপন গণ্ডি টেন্যা তার বাহিরে আর হাঁটাচলা করা চলবে না। আর যদি বেশি কেরামতি দেখাতে যান আপনার কপালে বহুত খারাবি। তা আমি ক্যানে কেরামতি দেখাইছি এত! উপায় নাই! জানি, কেরামতি দেখান হইল গিয়ে পাপ। আর তার লেগ্যা আমার কেরামতি আমাকে আজ অনেক নীচুনে নামাইয়া দিছে। আমি তো তেনাদের পায়ের নখুনের সুমন লই বাপজান, তেনারা অনেক বড় বুজুর্গ। তো তেনাদের কেরামতি আল্লাহ-পাক সহ্য করেননি, আর আমি তো কুন ছার! মানা আছে, তাও কত বুজুর্গ-ওলি দেয়ালের ভিতর দিয়া ঢুক্যা পড়্যান। কুনো কুনো চার দেয়ালের মধ্যিখানে যে সব কাণ্ড কারখানা চলে বাপজান, তা সহ্য করা খুব কঠিন। উয়ারা যদি জানে, দেয়াল ভেদ কইর‍্যা কেউ ঢুইকা পড়তে পারে, তাহা হইলে একটুকুন সাবধান হইবে। রয়েসয়ে কাম-কারবার করবে। আকাশের মইধ্যে উড়তে পারে আর শত্তুরের উপর নজর রাখত্যা পারে এমন বুজুর্গের অভাব নাই বাপজান। আগুনের মইধ্যে হেঁটে যেতে পারে এমন কেরামতি বহুত লোকে দেখায়। কিন্তু বাপজান রাস্তায় বুমা পড়ল্যা তারা আবার বাড়ির বাহির হয় না। বুজুর্গ-ওলি শস্তা কেরামতি দেখায় না। বুমা গুলিকেও তেনারা ডরান না। বুমা-গুলি চালানেওলাদের ঘেঁটি ধইরা বাহিরে ফেল্যা দিতে পারে। খুদার সম্পত্তি লইয়া উয়ারা ফুটানি মারে। সব মাটি উয়ারা বেচ্যা দিছে, কবর দিবার জায়গা নাই। সব পানি উয়ারা শুষ্যা লইছে, খাবার কিম্বা ওজু করবার পানি মিলে না। আগুন উয়াদের খ্যালবার জিনিস, ভাত রাঁধার কিম্বা নাদান বাচ্চা স্যাঁকার আগুন নাই। বাতাসকে উয়ারা এমনি খারাব কইরা দিছে যে শ্বাস লইবার জো নাই। বাকি রইল আকাশ। তাকেও উয়ারা শ্যাষ করার জইন্য উঁচা উঁচা টাওয়ার বানাইসে। আমার-আপনার কতাতে উয়ারা আড়ি পাতবে। তাই সাত নম্বরে বলি কি বাপজান, ভাল কইরা চোখ-কান খুইলা রাখেন। আমাদের অনেক গুলান চোখ, উয়াদের চাইতে কয়েক কোটি গুণ বেশি। সজাগ থাকেন। রাতে ঘুমাইবার টাইমে সব ভুইলা যান। আমলনামার সময় নিজেকে দেহের বাহিরে নিয়া যান। এইটা হইল আট নম্বর নকশা।

বুজুর্গদের কেরামতির কতা কইসিলাম। এক দেশে বহু কাল পানি নাই। খরার চোটে কুনো ফসল হয় না মাঠে। দেশের মানুষ পিল পিল কর‍্যা মরছ্যা। বাচ্চা-বুঢঢা কেউ বাদ নাই। এক বুজুর্গ কইলেন, সারা দেশে কি একটুকুনও গম নাই? এক বড়লোকের বাড়িতে চাট্টি গম মিললো। গম ভাঙ্গার কলে সেই গম লইয়া গেলেন বুজুর্গ। গরুতে টানে সেই কল। বিশ্বাস হইবে না আপনার, এক খাবলা গম থেক্যা রাশি রাশি আটা বাহির হতে লাগল। আর সেই আটা দিয়্যা ঘর ভরতে লাগলো গরিব-বড়লোক সক্কলে।

এই গল্পটা শুনল্যা আপনাদের মুতুন শিক্ষিত লোক হাসব্যান। তা হাসুন। সে তো আপনার দাদোর লেগে যখন কয়েছিলাম, তখন আপনার দাদোও হেস্যাছিলেন। বড়লোকের অল্প গম থেক্যা কত আটা হয় তা আপনাদের ধারণা নাই। মজুতদারি কারে বলে জানেন তো! আর কী কইবো শিক্ষিত মানুষের সামনে। বরং আমি আমলনামার নয় ধারাটো কই।

টাইম নাই, আমার হাতে টাইম নাই—এই কতা বলার লোক মেলা পাইবেন। টাইমের থামা নাই, থাবা আছে। টাইমকে থামাইয়া দিত্যা পারেন না কেহই। আপনার জ্ঞান-বুদ্ধি-হুঁশকে থামাইয়া রাখেন কিছুক্ষণ। আপনার মাথায় ঢুকনো চিন্তা কিছু সময় বাতায় তুল্যা রাখেন। অনেক দিন অনেক কথা বলল্যান, খানিক টাইম এবার চুপ কর‍্যান। বোজবার চেষ্টা করেন বাপজান, অন্যের টাইম কীভাবে কাটে। এইটা নয় নম্বর। দশ নম্বরটা হইল নম্বরের খেলা। কেমন খেলা বুজাবার লেগে আরও একটো কাহিনি শুনতে হবে আপনাদের।

ফরিদ নামের এক পুলাপানকে তার বাপে মরণের কালে কইল, ফরিদ রে! এই আমার সতেরো খানা ঘোড়া আর তুরা তিন ভাই। তুই বড়, রোজগেরে পুলা। তাই ভাগ-বাঁটোয়ারার ভার তুকে দিলাম। হাফ ঘোড়া তুই লিবি। বাকি ঘোড়ার তিন ভাগের দুই ভাগ দিবি মেজ ভাইকে। আর মোট ন ভাগের এক ভাগ পাবে কোলের ভাই।

আপনারা সকলে ভাগের কথা চিন্তা কর‍্যা কর‍্যা মইরা যাবেন। সতেরোকে হাফ করব্যান কী কইরা! তাও আবার ঘোড়া! গরু হইলে না হয় জবাই কর‍্যা গোস্ত ভাগ হইত। বাকি ভাগগুলান সুমান কঠিন বাপজান। ফরিদ নকশাবন্দির আমল জাননেঅলা লোক। সে খুব সহজেই বাপের হিসাব মুতুন ভাগ কর‍্যা দিল। নম্বর থামাইয়া দিয়া।

ফরিদের নিজের একখান চড়বার ঘোড়া ছিল। সে ওই সতেরোখান ঘোড়ার সঙ্গে সেটাকে মিশাইয়া দিল। হিসাবের কারচুপি হইবে না। শ্যাষে বিচার কর‍্যা দেখব্যান। এ বার ওই আঠারোখান ঘোড়ার নয় খান নিল ফরিদ নিজে। বাকি রইল আর নয় খান ঘোড়া। তার তিন ভাগের দু ভাগ, মানে ছয় খান ঘোড়া পাইলো মেজ। এবার হাতে আছে আরও তিন খান ঘোড়া। ছোটো পাইলো দুই খান—মোট ঘোড়ার নয় ভাগের এক ভাগ। এখনও এক খান ঘোড়া আছে, ওইটা হইল গিয়ে ফরিদের নিজের ঘোড়া, যাতে চেপ্যা সে এসেছিল। আবার সেটাতে চেপ্যা সে চলে গেল। আপনি কইবেন, এ তো গোঁজামিলের অঙ্ক। আমি কইব, না। একটু মুন দিয়্যা ভাল কইরা দ্যাখেন, কারও কুনও ক্ষতি হই নাই। সক্কলে লাভবান হইছে।

এগারো নম্বর আমলনামা কইয়া আমার টাইম খতম। অন্যের দিল চিনা খুব সুজা কাজ লয়। নিজের দিলের কারবার না থামাইলে সে রহস্য বুজা যাইবে না বাপজান। এইটুকুনই বললাম। ভাল কথা ফ্যানাইতে নাই, উয়ার ধার কইমা যায়। শ্যাষে একটো কতা কইয়া বিদায় লইব। বাপজানেরা নকশা না বুজল্যা কিসস্যু হইবে না, নকশার ভিতরেও নকশা আছে। আপনার দাদোকে যারা খুন করল, তারাই আবার আপনার বড় ভাইয়ের ডেডবডিটাকে শ্যাষ করল। আপনাকে, আমাকে অরা যে বন্দি কইরা রাখছে, সে কথা শুনল্যা আপনি হাসবেন। আপনার চার পাশে যে তালা অরা ঝুলাইয়া দিছে, আপনি তাহার নকশা জানেন না বইলা চাবি বানাইতে পারছেন না। আমার এক গুরুর গুরু কী করে তালা খুলে, আপন বন্দিদশা ঘুচাইয়া বাহিরে আইলো, সেই কতা শুন্যান।

তেনাকে আমাদের মুতুন অন্যায় ভাবে বন্দি করা হইছিল এক কারাগারে। তিনি ছিল্যান মিস্ত্রি মানুষ। একখান জায়নামাজ তেনার বিবি তেনাকে পাঠাইল। জেলের লোকেদের দয়া হইল, বেচারা নামাজ পড়ার জন্য জায়নামাজ পেয়্যাছে, উয়াকে তা দেওয়া হইল। তিনি পেতিদিন পাঁচ টাইম নামাজ আদায় করত্যা লাগলেন। কয়েক দিন বাদে তিনি জেলকর্তাকে কইলেন, “আমি গরিব, দুর্ভাগা মানুষ আর আপনাকেও সরকার কম মাহিনা দেয়। আমি মিস্ত্রি লোক, আমার যন্ত্রপাতি আর মাল বাড়ি থিকা আনাইয়া দিলে আমি কিছু খেলনা বানাইতে পারি আর সেই গুলান বাজারে বিক্রি করলে কিছু টাকা আসে; আর তা থেকে আমাদের দু জনের দুর্দশা কিছুটা ঘুচবে।’’ কারাগারের কর্তা রাজি হইলেন। আর তাতে দুজনের বেশ লাভ হইল। ভাল খাবার আর আরামের জিনিস কিন্যা তারা বেশ সুখ পাইল। একদিন কারাগারের লোকরা নিজেদের ঘরে, সেই সময় বন্দি লোকটা পালাইয়া গেল।

বহু বৎসর কাইট্যা গেছে। লোকটা যে দোষী নয়, তাও জেনে গেছে সব্বাই। এমন সময় লোকটার সঙ্গে জেলের সেই কর্তার দেখা। লোকটাকে শুধানো হল, সে কী কইর‍্যা জেল থেকে পালাইয়া গেসিল! ঘরে তো তালা মারা ছিল। ওই তালা খুলা খুব সুজা কাজ লয়। কুন ম্যাজিকে সে ওই তালা খুইলা বাহিরে গেল! লোকটা কইল, সবই নকশার মইধ্যে নকশা! আমার বিবি হল তাঁতি। সে অনেক কষ্ট কর‍্যা খুঁজেপেতে বাহির কর‍্যা জেলের তালা বানানোর কারিগরকে। তার পর তার কাছ থেক্যা জেনে লয় তালার নকশা। এর পর সে একটা জায়নামাজ বোনে আর সেই জায়নামাজের এমন জায়গায় নকশা বুনে দেয় যেখানে আমাকে রোজ সেজদা দিত্যা হয়। আমি নিজে মিস্ত্রি মানুষ, তাই নকশা দেখ্যাই ভাবলাম, আরে এ তো তালার ভিতরের নকশা, আমার বাহির হইবার মন্ত্র! আমি জিনিস বানাইবার অজুহাতে আমার হাতিয়ার আনালাম আর গোপনে বানাইয়া ফেললাম ওই তালার চাবি। ও ভাবেই আমি বাঁচলাম অত্যাচার থেক্যা, বন্দিদশা থেক্যা।

তাই আপনাদের কইছি বাপজানেরা, আকাশে উইড়া, বা দেয়াল ভেদ কইরা কিম্বা আগুনের মধ্য দিয়া সক্কলে নকশাটা জেন্যা ল্যান, তার পর সেই নকশা দিয়া ঘুচান আপনার বন্দিদশা। তবে বাপজানেরা, মুনে রাখব্যান ওই স্যাকরার কতা। ব্যাচবার সুমুয় নকশা ছ্যাঁচা, কিনবার সুমুয় লয়।

আলজিহ্বাতে আলেক শহর আল্লা বসে রয়েছে।

আল্লা আলেক শহরে থাকেন গো!



লেখক পরিচিতি
শামিম আহমেদ

জন্ম ১৯৭৩। মুর্শিদাবাদের সালারে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র।
পেশা বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০ টি।
বর্তমানে কলকাতায় বসবাস।



৩টি মন্তব্য:

  1. শামিম আহমেদ, আপনের গল্পে অনেক নক্সা। নক্সায় অনেক হিসেব। ভক্ত হইতে গিয়াও খাড়াইলাম। আর দুই একহান পাঠ আপনের লই, তয়ে আপনে নক্সালদার বটে।

    উত্তরমুছুন
  2. শামিম আহমেদ, আপনের গল্পে অনেক নক্সা। নক্সায় অনেক হিসেব। ভক্ত হইতে গিয়াও খাড়াইলাম। আর দুই একহান পাঠ আপনের লই, তয়ে আপনে এলেমদার বটে।

    উত্তরমুছুন
  3. শামিম আহমেদের লেখা খুব ভালো লাগে। জয় হোক। ঈশ্বর এঁর মঙ্গল করুন।

    উত্তরমুছুন