বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

বেফাস হৃদয়

এডগার অ্যালান পো

সত্যি! অনেক বেশি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম; খুব ভয়ঙ্করভাবে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু কেন, তোমার কি ধারণা আমার মাথা ঠিক নেই। রোগটি আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে আরো তীক্ষè করেছে; ধ্বংস করেনি-- ভোঁতাও করেনি। মোটের ওপর আমার শ্রবণ শক্তি ছিল অসাধারণ। আমি স্বর্গ এবং পৃথিবীর সব কিছুই শুনতে পেতাম। নরকের অনেক কিছুই শুনেছি আমি। কিভাবে, তাহলে, আমি কি উন্মাদ?


মনোযোগ সহকারে শোন এবং দেখ কত গুছিয়ে, কত শান্তভাবে আমি তোমাকে সমস্ত ঘটনাবলীর বিবরণ দিই।

আসলে এটা বলা কঠিন কত তাড়াতাড়ি উদ্দেশ্যটা আমার মাথায় বাসা বেঁধেছিল; তবে এটুকু বলতে পারি আসা মাত্রই আমার মধ্যে সেঁটে গিয়েছিল এবং সেই থেকে দিন--রাত আমাকে তাড়া করে বেড়াতো। বলবার মত কোনো বিষয় সেখানে ছিল না, ছিল না কোনো আবেগ।

আমি বৃদ্ধ লোকটিকে ভালোবাসতাম। সে কখনোই আমার ওপর কোনো অবিচার করেনি, অপমানও করেনি। তার সহায়-সম্পত্তির ওপর আমার যে কোনো লোভ ছিল তাও নয়। আমার মনে হয় তার চোখটিই সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী ছিল! হ্যাঁ, আমি হলফ্ করে বলতে পারি এ কথা! তার এক চোখ ছিল শকুনের মতন তীক্ষè, পর্দাটি ছিল ফ্যাকাশে নীলাভ। যখনই চোখে চোখ পড়ত, আমার গা ঘিন ঘিন করতো, রক্ত যেত জমে; ফলে আস্তে আস্তে-- অনেক ভেবে চিন্তে-- আমি ঠিক করেছিলাম বৃদ্ধ লোকটিকে মেরে এই বিভৎস চোখটির হাত

থেকে নিজেকে রক্ষা করবো।

এখন তোমরা আমাকে পাগল বললে বলতে পারো। উন্মাদগ্রস্থ ব্যাক্তিরা কিছুই জানে না। কিন্তু তোমরা দেখে থাকবে আমাকে, তোমরা দেখে থাকবে কত গুছিয়ে আমি কাজটি করেছিলাম-- কত সতর্কতার সাথে-- কতটা দূরদৃষ্টি নিয়ে-- কতটা ছলনার সাহায্যে! আমি বৃদ্ধ লোকটির ওপর এতটা দয়া কখনো প্রদর্শন করিনি যতটা আমি তার ওপর করেছি যে সপ্তাহে তাকে আমি মারার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। প্রতিদিন রাতে-- ঠিক মধ্যরাতে, আমি ছিটকিনি টেনে তার দরজা খুলতাম, তুমি ভাবতেই পারবে না কতটা সাবধানে! এবং যখন আমার মাথা ঢুকানোর মত যথেষ্ট ফাঁক হয়ে যেত আমি অন্ধকার কক্ষে লণ্ঠন প্রবেশ করাতাম। সব বন্ধ-- একেবারে বন্ধ, যাতে করে

বাইরে থেকে কোনো আলো দেখা না যায়। এবং তারপর চট করে আমি আমার মাথাটা ভেতর ঢুকিয়ে দিতাম। তুমি শুনে হাসবে কতটা চতুরতার সাথে আমি ভিতরে ঢুকতাম! খুব সাবধানে পা ফেলতাম-- খুবই সাবধানে যাতে করে বৃদ্ধ লোকটির ঘুমের ব্যঘাত না ঘটে। আমার এক ঘণ্টা লেগে যেত সব কিছু স্বাভাবিক করতে, ব্যস! একটা পাগল কি এই মুহূর্তে এতটা বিচক্ষণ হতে পারে, হুম? এবং তারপর যখন আমি পুরো স্বাভাবিক হয়ে উঠতাম, খুব সতর্কতার সাথে লণ্ঠনটা বন্ধনমুক্ত করে ফেলতাম-- খুবই সতর্কতার সাথে-- যাতে করে একটা হালকা আলোকচ্ছটা শকুনরূপী চোখটির ওপর গিয়ে পড়ে। সাতরাত ধরে আমি একই কাজ করেছিলাম-- প্রতি মধ্যরাতে। কিন্তু সবসময় চোখটিকে বন্ধ অবস্থায় দেখতে পেতাম; ফলে আমার পক্ষে তাকে খুন করা সম্ভব হত না, কারণ বৃদ্ধ লোকটি আমাকে বিক্ষুব্ধ করত না, বিক্ষুব্ধ করত তার ঐ জ্বালাতনময়ী চোখ। প্রতিদিন সকালে, সবকিছু স্বাভাবিক হলে, আমি বেশ সাহস সঞ্চার করে বেহায়ার মত তার চেম্বারে যেতাম, আন্তরিকতার সাথে তার নাম ধরে তার সাথে কথা বলতাম, এবং বুঝতে চেষ্টা করতাম গত রাতটি সে কেমন কাটিয়েছে। এখন তোমরা বুঝতে পারছো, সে খুবই বয়স্ক একজন মানুষ। আমি যে প্রতি রাতে ঠিক ১২টার সময় তার রুমে যাই এ

ব্যাপারে তার সন্দেহ করার কোন কারণ ছিল না।

অষ্টম রাতে আমি দরজা খোলার ব্যাপারে অন্যান্য রাতের থেকে অনেক বেশি সতর্ক ছিলাম। ঘড়ির কাটাও আমার থেকে বেশি জোরে নড়াচড়া করছিল। ঐ রাতের পূর্বে কখনো আমার নিজের শক্তি এবং বিচক্ষণতাকে এতটা তীব্রভাবে অনুভব করিনি। আমি খুব কমই আমার বিজয়োল্লাসকে চেপে রাখতে পারতাম। আমি যে কুমতলব এঁটে রাতের অন্ধকারে চুপিসারে দরজা খুলে তার কাছে গিয়েছিলাম, তা সে স্বপেড়বও কল্পনা করেনি; -- এসব ভেবেই আমি মুরগীর ছানার মতন ডেকে উঠেছিলাম, এবং খুব সম্ভবত সে তা শুনতে পেয়েছিল; যার জন্য সে বিছানা থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছিল, যেন সে চমকে গেছে। এখন তুমি ভেবে থাকবে, আমি পিছিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু না। তার কক্ষটি ছিল পিচের মতন কালো, নিবিড় অন্ধকারে ঢাকা (কারণ ডাকাতের ভয়ে স্যাটারগুলো টানা ছিল)। আমি জানতাম সে দরজা খোলা দেখতে পাবে না। তাছাড়া আমি দরজার পাল্লাটা ভিড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমার মাথা ভেতরেই ছিল, লণ্ঠন জ্বালাতে যাবো এমন সময় লণ্ঠনের গায়ে আঙুল পিছলিয়ে যাবার শব্দে বুড়ো বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে

বলে উঠল-- “কে ওখানে?”

এতকিছুর পরেও আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম। এক ঘণ্টার মত আমি এক চুলও নড়িনি এবং বৃদ্ধের ঘুমানোর শব্দ শুনতে পাইনি। সে তখনো বিছানায় কান পেতে বসে দেয়ালে গুবরে-পোকার কাঠ কাটার শব্দ শুনছিল;-- যেমনটি আমি করেছি রাতের পর রাত। কিছুক্ষণ পরে আমি হালকা গোঙানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, বুঝতে পারলাম এটা তার মরণ ভয়ের আতঙ্ক। এটা কোনো অসুখের গোঙানি নয়, নয় কোনো কষ্টের; এটা ছিল অধিক ভয় পাওয়ার ফলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার শব্দ। এ শব্দটি আমার বেশ ভালো করেই চেনা। বহুরাতে-- ঠিক মধ্যরাতে, যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে তখন এটা আমার বুক চিরে বেরিয়ে আসে। বুঝতে পারছিলাম বৃদ্ধ মানুষটি

কেমন অনুভব করছিল। আমার তার জন্য করুণা হচ্ছিল, যদিও ভেতরে ভেতরে বেশ তৃপ্তি অনুভব করছিলাম। আমি জানতাম সে প্রথম থেকেই ঘুমানোর ভান করে জেগে ছিল। তার ভয়গুলো ক্রইমেই তার ওপর চড়াও হচ্ছিল। সে যারপরনায় চেষ্টা করছিল সবকিছু স্বভাবিক করতে, কিন্তু কিছুতেই পারছিল না। সে নিজেকেই নিজে বলল--“চিমনি দিয়ে বাতাস ঢুকছে, এছাড়া আর এটা তেমন কিছু না; এটা একটা ইঁদুরের মেঝের এপাশ থেকে ওপাশ যাওয়ার শব্দ,”-- কিম্বা “এটা শুধুমাত্র একটা ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ।” এগুলো বলে সে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিল মাত্র কিন্তু কোনটাই কাজে আসছিল না। কেননা মৃত্যু অন্ধকারকে ভর করে তার সনিড়বকটে এসে তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছিল। কিছু একটার উপস্থিতি তার ভেতরকে বিষিয়ে দিচ্ছিল যদিও সে ঘরের ভেতর আমার অবস্থানকে টের পাওয়ার মতন তেমন কিছু দেখেওনি--শোনেওনি।

তারপর আমি অনেক্ষণ ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করি। সে তখনো ঘুমায়নি। সিদ্ধান্ত নিলাম লণ্ঠনের আলোটা হালকাভাবে বের করার--

খুবই হালকাভাবে। তাই করলাম যতক্ষণ না মাকড়সার সুতার মত হালকা আলোকরশ্মি তার শকুনের মতন চোখটিতে গিয়ে পড়ল—তুমি ভাবতেই পারবে না কতটা চুপিসারে আমি কাজটি সেরেছিলাম। সে তাকিয়ে ছিল-- প্রসন্থভাবে। তার চোখের দিকে তাকাতেই ক্রোধোন্মত্ত হয়ে পড়লাম। আমি পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম, বিরক্তিকর নীলাভ চোখের ওপর খুব জঘন্য একটি পর্দা যা দেখে আমার হাড়ের মজ্জাগুলো ঠান্ডায় কাঁপতে শুরু করেছিল। আমি কিন্তু বৃদ্ধ লোকটির চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার ঐ জঘন্য জায়গাটি যেন আমার সমস্ত চেতনাকে গুম করে রেখেছিল। এখনো কি আমি তোমাদের বলিনি যে, পাগলামীর জন্য যে ভুলগুলো হয় তা হলো ইন্দ্রিয়গুলো খুব বেশি তীব্র হওয়া? এখন আমি একটি চাপা-বিরক্তিকর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, এ ধরনের শব্দ সাধারণত ঘড়ি সোলার প্যাকেটে থাকলে শোনা যায়। এ শব্দটিকেও আমার বেশ ভালো করেই চেনা। এটা ছিল বৃদ্ধ লোকটির হার্টবিটের শব্দ। এটা আামার ক্রোধকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল বহুগুণে, ড্রামের শব্দ যেমন করে সৈনিকদের সাহসকে বাড়িয়ে দেয়। এত কিছুর পরেও আমি সংযত ছিলাম এবং যতটা সম্ভব চুপচাপ থাকার চেষ্টা করছিলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস যেন থেমে আসছিল। আমি লণ্ঠনটি খুব শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম এবং

চেষ্টা করছিলাম আলোকরশ্মিটাকে যতটা সম্ভব তার চোখের ওপরে রাখার। ইতোমধ্যে হার্টবিটের নরকতুল্য শব্দটা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। এটার শব্দ এবং গতি বেড়েই চলেছিল। বুৃদ্ধ লোকটির ভয় হয়ত চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠে পড়েছিল! আমি তোমাকে বলেছি যে আমি নার্ভাস, আসলেই আমি নার্ভাস। এই নিশুতি রাতে, পোড়ো বাড়ির ভয়ঙ্কর নীরবতাকে ভেদ করে আসা এই শব্দটি আমার ক্রোধকে করে তুলেছিল নিয়ন্ত্রণহীন। কিছুক্ষণ পূর্বেও আমি যথেষ্ট সংযত ছিলাম। কিন্তু এখন হার্টবিটটা যে গতিতে বেড়ে চলেছে তাতে আমার মনে হচ্ছে খুব শ্রীঘ্রই তার বিস্ফোরণ ঘটবে। এখন আরো একটা উদ্বেগ কাজ করছে-- আশপাশের কেউ যেন শব্দটি শুনে না ফেলে! আমি

তীব্র চিৎকার দিয়ে লণ্ঠনটা উন্মুক্ত করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলাম। সে একবার চেঁচিয়ে উঠল-- শুধুমাত্র একবার। নিমিষে আমি তাকে মেঝেতে টেনে হিঁচড়ে নামালাম এবং ভারী চৌকিটা তার শরীরের ওপর ফেলে দিলাম। আমার কাজের নিষ্পত্তি ঘটার আনন্দ আমার চোখে মুখে ফুটে উঠল। তারপর অনেক সময় ধরে আমি আমার হার্টবিটের চাপা শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। এটা আমাকে বিন্দুমাত্র ভাবিয়ে তোলেনি; জানতাম দেয়ালের বাইরের কেউ এটা শুনতে পাবে না। অবশেষে শব্দটা কমে আসলো। বৃদ্ধ মরে পড়ে ছিল। আমি চৌকিটা তার ওপর থেকে সরালাম এবং বৃদ্ধের মৃত দেহটি পরীক্ষা করলাম। সে পাথরের মতন জমে গিয়েছিল আমি আমার হাতটা তার বুকের ওপর রেখে তার হার্টবিটকে অনুধাবন করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম। সে ততক্ষণে মরে ভূত বনে গিয়েছিল। তার চোখটি আর আমাকে জ্বালাতে পারবে না। এখনো যদি তুমি আমাকে পাগল মনে করো তবে আমার মৃত দেহ সরানোর বুদ্ধি ও কৌশলের বর্ণনা শুনে নিজের ভুল বুঝতে পারবে।

রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছিল বিধায় আমি নীরবে কিন্তু বেশ দ্রুততার সাথে কাজ সারছিলাম। প্রথমে আমি মৃত দেহের প্রতিটা অঙ্গকে পৃথক করলাম। মাথা কাটলাম, হাত কাটলাম, পা দুটো কাটলাম। তারপর মেঝে থেকে তিনটা তক্তা ছাড়ালাম এবং দেহের প্রতিটি অঙ্গকে তক্তাগুলোর ওপরে সাজালাম। অতঃপর তক্তাগুলোকে তাদের পূর্বের স্থানে এমন নিখুঁতভাবে সেঁটে দিলাম যে কারও সন্দেহ করার বিন্দুমাত্র অবকাশ রইল না। মেঝেতে ধুয়ে ফেলার মত রক্ত, নোংরা কিংবা এ জাতীয় কিছুই লেগে ছিল না। আমি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিলাম। একটা টবেই সব এঁটে গিয়েছিল-- হা! হা! ভোর চারটার দিকে আমার সকল পরিশ্রমের সমাপ্তি ঘটল। তখনো মধ্যরাতের

মত গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা ছিল চারপাশ। ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে সম্মুখ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল। আমি বেশ হালকা মেজাজে দরজা খুলবার জন্য এগিয়ে গেলাম-- এখন আর আমার ভয় পাবার কি আছে? তিনজন লোক প্রবেশ করল যারা বেশ ভদ্রভাবে নিজেদেরকে পুলিশের অফিসার হিসাবে পরিচয় দিল। রাতের বেলায় প্রতিবেশিদের কয়েকজন একটা চিৎকারের শব্দ শুনতে পেয়ে তাদের খবর পাঠিয়েছে এবং সেই চিৎকারের তদন্ত করার জন্যই তাদের এখানে আসা। আমি হাসলাম; আমার ভয় পাবার কি আছে? আমি ভদ্রলোকদের ওয়েলকাম জানালাম। আমিই রাতে স্বপেড়বর মধ্যে চিৎকারটি করেছিলাম, তাদেরকে বললাম। আরো বললাম যে, বৃদ্ধ লোকটি দেশের বাইরে গেছে। আমি তাদেরকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে সার্চ করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বললাম, ভালো করে খুঁজে দেখুন। আমি শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ঐ কক্ষেও নিয়ে গেলাম। তার ধন-সম্পত্তি দেখালাম। আমার অধীক আত্মবিশ্বাস দেখাতে তাদের অবসাদ ঘুঁচানোর জন্য কক্ষের ভেতর চেয়ার এনে দিলাম; এবং আমি নিজের চেয়ারটা বেশ সাহস নিয়ে যেখানে মৃতের দেহ শুইয়ে রাখা হয়েছে তার ওপর পেতে বসলাম। অফিসাররা আমার ব্যবহারে বেশ মুগ্ধ হলো। আমি ভীষণ উৎসাহ সহকারে তাদের প্রতিটা প্রশেড়বর উত্তর দিচ্ছিলাম এবং মাঝে মধ্যে তারা চলতি সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিনড়ব বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছিল। কিন্তু অনতিবিলম্বে, সবকিছু আমার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল এবং তাদের চলে যাবার জন্য আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম। আমার মাথা ব্যথা করছিল এবং অদ্ভুত একটা শব্দ এসে আমার কানে বাড়ি মারছিল। তাদের ওঠার কোনো লক্ষণ দেখছিলাম না। এদিকে সেই অদ্ভুত শব্দটা বেড়েই চলেছিল

এবং এটা ক্রমেই আরো অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। আমি এটা থেকে মুক্তি পাবার জন্য আরো সহজভাবে কথা বলছিলাম কিন্তু এটা বেড়েই চলেছিল এবং ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। একসময় অনুভব করলাম, শব্দটির উৎস আমার কান না। কোনো সন্দেহ নেই আমি আরো বেশি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, এবং উঁচু গলায় ঝড়ের বেগে কথা বলছিলাম। শব্দটির গতি আরো বেড়ে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল কানের ভেতর কে যেন ঢোল পেটাচ্ছে। আমি কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি হাঁপাতে শুরু করেছিলাম। এতকিছুর পরেও অফিসাররা কিছুই টের পাচ্ছিল না। আরো দ্রুত, আরো আগ্রহ নিয়ে কথা বলছিলাম; কিন্তু শব্দটা বেড়েই চলেছিল। উঠে দাঁড়ালাম, এবং খুবই তুচ্ছ বিষয়ে বিশ্রি অঙ্গভঙ্গি করে তর্কাতর্কি শুরু করে দিলাম, শব্দটা কিন্তু বেড়েই চলেছিল। তারা যে কেন চলে যাচ্ছে না! আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে মেঝের এদিক ওদিক পায়চারি করছিলাম; বোঝাতে চাচ্ছিলাম তাদের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট হয়েছে। শব্দটা বেড়েই চলেছে। হায় খোদা! আমি এখন কি করবো? আমি এতটাই খেপে গিয়েছিলাম যে মুখ দিয়ে ফেনা উঠছিল এবং বার বার দিব্যি কাটছিলাম। আমি যে চেয়ারটিতে বসে ছিলাম সেটা মেঝের সাথে টানা হিঁচড়া করে একধরনের বিরক্তিকর শব্দ করছিলাম কিন্ত সেই শব্দটা এই শব্দটাকে ছাড়িয়ে আমার কানে এসে গুঁতা মারছিল। শব্দটা বেড়েই চলেছিল। এতকিছুর পরেও তারা বেশ আয়েশ করে গল্প করছিল। তারা কি তবে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না? এটা কি করে সম্ভব? হায় খোদা! তারা বোধহয় শুনতে পাচ্ছে, বুঝতে পেরেছে সবই, তারা আমার ভয়টাকে নিয়ে উপহাস করছে!-- এসব সাত পাঁচ ভাবনা আমার মাথায় ভর করছিল। আমি যেকোনো ভাবে এই নিদারুণ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি কামনা করছিলাম। তাদের উপহাস এবং ভ-ামি মার্কা হাসি আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। ইচ্ছে করছিল মরে যেতে অথবা চিৎকার দিয়ে সব বলে দিতে। ওহ্, আর পারছিলাম না, শব্দটা আমার কান ভেদ করে যেন মাথার ভেতর ঢুকে পড়েছিল!



“শয়তানেরা,” আমি চেঁচিয়ে বললাম, “আমার সাথে আর ছলচাতুরি করিস না! আমি খুনের কথা স্বীকার করছি!-- এইখানটা খোড়, ঠিক এইখানে! এটাই তার ভয়ঙ্কর হৃদয়ের ধুক ধুক শব্দ!”



গল্পপাঠ : বেফাস হৃদয়

আলোচক : মোজাফফর হোসেন

এডগার অ্যালান পোর সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পগুলোর একটি ‘অ্যা টেল টেল হার্ট’ বা যা যার বাংলা আমি করেছি, বেফাস হৃদয়। গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪৩ সালে। জনপ্রিয় এই গল্পকার তাঁর জীবদ্দশায় গল্পকার হিসেবে সমালোকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হননি। ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত হয় পোর দিখ্যাত কবিতা ‘দ্য র‌্যাভেন’। ফলে সমসাময়িক সমালোচকরা কবি হিসেবেই পোকে গ্রহণ করতে চেয়েছেন।  বর্তমানে পোকে মনে করা হয় সাইন্সফিকশন, গোয়েন্দা ও গোথিক গল্পের জনক। একটা সময় রূপালি পর্দায় তাঁর গল্পের চিত্রায়নে হিড়িক  পড়ে যায়।

আলোচ্য গল্পে একজন পাগল চরিত্রের, যে আপাত কোনো কারণ ছাড়ায় একজনকে হত্যা করে, তার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকৃতি তৈরি করা  হয়েছে। এটি একই সাথে হরর-সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার স্টোরি।  বেনামি গল্পকথক পাঠকদের সরাসরি তুমি বলে সম্বোধন করে গল্পটি বলা শুরু করে। তার উদ্দেশ্য নিজেকে সৎ এবং সুস্থ্য বলে প্রমাণ  করা। কারণ, খানিক আগে সে একজনকে খুন করেছে। সে বলছে যে সে কিছুটা ভড়কে গেছে তবে সে পাগল না। তার খুন করার কারণ  কোনো অর্থসম্পদের লোভ বা প্রতিহিংসা নয়। সে খুন করেছে বৃদ্ধ লোকটির ধূসর-নীল চোখটির কারণে। তারপরও সে দাবি করছে যে,  সে পাগল নয়। কারণ সে অনেক সময় নিয়ে, অনেক পরিকল্পনা করে খুনটি করেছে। তার দাবি, পাগলরা এত ঠাণ্ডা মাথার খুনি হতে পারে  না। সে ক্রিমিনালও নয়, কারণ তার খুনের পেছনে কোনো লোভ বা গোপন অভিসন্ধি জড়িয়ে নেয়। এরপর সে সমস্ত ঘটনা তুলে  ধরেছে। তাকে কিভাবে পুলিশরা খুনি হিসেবে সনাক্ত করেছে তারও বর্ণনা সে দিয়েছে।  পো খুব কৌশলে একজন সাইকোকে উপস্থাপন করেছেন তাঁর এই গল্পে। সে যে পাগল নয় এটি প্রতিষ্ঠিত করার ভেতর দিয়ে গল্পটি  এগিয়ে গেছে। কিন্তু আইরনিক্যালি তার নিজেকে পাগল হিসেবে দাবি না করার আর্গুমেন্ট যত এগিয়েছে ততই সে পাগল বলে প্রমাণিত  হয়েছে।

ড্রামাট্রিক মনোলোগ
বেফাস হৃদয় গল্পটি শুরুই হয়েছে ড্রামাটিক মনোলগের ভেতর দিয়ে। গল্পকথক গল্পের প্র ম লাইনে পাঠককে তুমি বলে সম্বোধন করে  তার খুনী হওয়ার কারণ ব্যাখা করা শুরু করে। পাঠকদের গল্পে সরাসরি যুক্ত করে নেওয়ার জন্যে থেকে থেকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে  পাঠকদের কাছে ফিরে গেছে। এখানে পো গল্প লেখার নয় বরং বলার শিল্পটা অ্যাপ্লাই করেছেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার এই  স্টাইলটা চালু থাকে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ গল্পটা ড্রামাটিক মনোলগের ছলে লেখা।


রূপক বা এলিগরি
গল্পটিতে মোরাল এবং সাইকোলজিক্যাল এলিগরি বা নৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক রূপক গল্প হিসেবে দেখা যেতে পারে। এলিগরি হল কোনও আর্টফর্মের ইনার মিনিং বা অন্তর্নিহিত অর্থ। আপাত বিষয়বস্তুর ভেতরে লুকানো অর্থকে এলিগরি বলা যেতে পারে। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি উপন্যাস বা গল্পের প্রতিটা চরিত্র এবং ঘটনা একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক অথবা নৈতিক কোনো পরিস্থিতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হওয়াকে এলিগরি বলে।

এই গল্পে প্রতিটা ঘটনা এবং চরিত্র একটা নৈতিক ভিত্তি থেকে দেখা যেতে পারে। নীতিগতভাবে গল্পকথক অবশ্যই ঠিক কাজ করেননি। তিনি খুনী। খুন করেছেন একজন অসহায় নিরাপরাধী বৃদ্ধকে। বলা চলে কোনো কারণ ছাড়ায়। এই ধরনের খুন একটি সমাজকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। উচ্চারিত বা ভার্বাল আয়রনি গল্পকথক খুনী খুনের কথা স্বীকার করে গল্পটি শুরু করেছেন, কিন্তু তার বলার স্বর স্বীকারোক্তিমূলক নয়। তিনি স্বীকার করছেন বৃদ্ধ ভাল

লোক, তার কোনো ক্ষতি তিনি করেননি। আবার বলছেন বৃদ্ধকে তিনি পছন্দও করতেন। অথচ তাকে তিনি খুন করেছেন। খুনের কোনো উপযুক্ত কারণ তিনি দেখাতে পারছেন না। অথচ এই খুনের ঘটনায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে চলেছেন।
ন্যারেটর বলছেন, ‘আমি স্বর্গ মর্ত্যরে সবকিছুই শুনতে পেতাম। তবে কি আমি পাগল?’ অথচ আমরা জানি, কোনো পাগল ছাড়া স্বর্গের কোনোকিছু শুনতে পাওয়ার দাবি তুলতে পারে না।

মুখে নিজেকে তিনি শান্ত, ধীরবুদ্ধির বলে দাবী করছেন কিন্তু কথায় বোঝা যায় তিনি যথেষ্ট বদমেজাজী মানুষ। ধৈর্যশক্তি নেই বললেই চলে। বলছেন সুস্থ মস্তিস্কে কাজ করেছেন। কিন্তু তার কাজটা অসুস্থ।


অবস্থানগত বা সিসুয়েশনাল আয়রনি
গল্পে ন্যারেটর বলছে যে, বৃদ্ধ ডাকাতের ভয়ে দরজাটা শক্ত করে লাগিয়ে রাখতো। এখানে সিসুয়েশনাল আইরনি হল, বৃদ্ধ ডাকাতের বড়

ডাকার অর্থাৎ নিজের খুনির সঙ্গে এক বাসাতেই থাকতো-- এটা তার সম্পূর্ন অজানা ছিল।


ড্রামাটিক আয়রনি
ন্যারেটর গল্পের শুরু থেকে বলে যাচ্ছেন তিনি সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কিন্তু তার ভাষ্যেই প্রমাণিত হয় যে তিনি পাগল।


অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি বা টুইস্ট
টুইস্ট হল অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি। পো এই গল্পের সমাপ্তিতে এসে খানিকটা মোচড় দিয়েছেন। গল্পের শেষদৃশ্যে গল্পকথক নিজেই নিজেকে

পুলিশের হাতে সপে দিয়েছে। নিজের হৃদযন্ত্রের শব্দকে সে মৃত বৃদ্ধের হার্টবিটের শব্দ ভেবে, এবং এই শব্দের আঘাত থেকে নিজেকে  মুক্তি দিতে সে পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছে যে খুনটা সে নিজেই করেছে। এই ধরনের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় যে গল্পকথক দেবে সেটা আগে

বোঝা যায়নি।



লেখক পরিচিতি
এডগার এডগার এলান পো
জন্ম : ১৮০৯ সালের ১৯শে জানুয়ারী। তিনি একজন স্বার্থক আমেরিকান লেখক, কবি, সম্পাদক, সাহিত্য সমালোচক এবং তাকে বলা হয় আমেরিকান রোমান্টিক মোভমেন্টের অংশীদার।
তিনি দ্য পেন নামে তার একটি নিজস্ব পত্রিকাও ছিল যার পরবর্তীতে নতুন নাম করণ হয়েছিল দ্য স্টাইলাস নামে। ১৮৪৯ সালের ৭ই অক্টোবর মাত্র চলি্লশ বছর বয়সে এই মহান লেখকের মৃত্যু ঘটে।

অবশ্য এলান পো'র খ্যাতি সবচেয়ে বেশি তার রহস্য ও রোমাঞ্চ গল্পের জন্য। তিনি নিজস্ব লেখনীর বৈচিত্রের জন্য অতি অল্প সময়েই পাঠক হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। গবেষণামূলকভাবেই তিনিই প্রথম রচনা করেছিলেন বহু ডিটেকটিভ ফিকশন যা পরবর্তী সায়েন্স ফিকশনের প্রচলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
এলান পো-ই প্রথম আমেরিকান লেখন যিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যদিও এর কারণে তাকে প্রথম দিকে কিছুটা আর্থিক অনটনে দিন কাটাতে হয়েছিল। তথাপি তিনি লেখনীকেই তার মূল লক্ষ্য হিসেবেই বেছে নিয়েছিলেন।
প্রথম দিকে অবশ্য তিনি কবি হিসেবেই আত্ম প্রকাশ করেছিলেন। ১৮২৭ সালে রচনা করেছিলেন তার কবিতার বই _ আ বোস্টনিয়ান।
১৮৩৫ সালে তিনি তার কাজিন ভার্জিনিয়া ক্লেমকে বিয়ে করেন। ১৮৪৫ সালে বের হয় তার কবিতার বই_ 'দ্য র‌্যভন' যা অল্প সময়েই বেশ সাড়া ফেলে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার দুই বছর পরই তার স্ত্রী টিউবার কোলোসিস এ মারা যান।
টেল টেল অব হার্টস, হাউজ অব উশার, পেন্ডুলাম এসব গল্পগুলো তার রচিত ভীষণ পাঠক নন্দিত গল্প। এর মধ্যে টেল টেল অব হার্টস গল্পটি বিশ্ব সাহিত্যের সেরা ক্লাসিক গল্প হিসেবে নিজ স্থান দখল করে আছে।
এলান পো'র জন্মের সময় পিতাকে হারিয়েছিলেন। কিছুদিন পর মাকেও। অনাথ অবস্খয় তাকে দত্তক নিয়েছিলেন এলান দম্পতি। তারপর থেকেই তার নাম হলো-- এডগার এলান পো।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন