বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

গল্পকারের সাক্ষাৎকার : রাশেদ রহমান

‘গল্প আমাকে ‘ভর’ করে—নিজেও সৃজিত হয়।’

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অলাত এহ্সান

রাশেদ রহমান মূলত গল্পকার। কবিতা ও উপন্যাস লেখেন। আড়াই দশকের লেখালেখিতে এবারের বই মেলায় বেরিয়ে তার দশম গল্পগ্রন্থ ‘গণিকাপ্রণাম’। যান্ত্রিকতা যথেষ্ট এড়িয়ে চলেন। থাকেন নিভৃতে, টাঙ্গাইলের রসুলপুরে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রকাশিত তার ‘দেশে আর্মি নামলে যে গল্পের জন্ম হয়’ গল্পগ্রন্থটি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। লেখার আনকোড়া বিষয় নির্বাচন ও শক্তিশালী উপস্থাপন শৈলিতে তার গল্প আলাদা করে চেনা যায়। তিনি মাটির কাছাকাছি মানুষের কথা লেখেন।
লিখেন উত্তম পুরুষে, ভাষা সরল ও গভীর। কালোত্তীর্ণ গল্প লিখার আকাঙ্ক্ষাই তাকে গল্পকার হিসেবে বাঁচিযে রাখে। তাই তার কাছে গল্পের জন্য অপেক্ষা করা যায়। তার সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এসেছে তার গল্প ভাবনার নানাদিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গল্পকার অলাত এহ্সান।



অলাত এহ্সান: ‘গণিকাপ্রণাম’ আপনার ১০ম গল্পগ্রন্থ। গল্প লেখা শুরু করেছেন আরো অনেক আগে, তা কতদিন ধরে লেখা গল্পগুলো এবার বই আকারে প্রকাশ করলেন?

রাশেদ রহমান: গণিকাপ্রণামে ৮টি গল্প আছে। এগুলো গত দু’বছরে (২০১৩-২০১৪) লেখা।


অলাত এহ্সান: এই সময় ধরে লেখা গল্পগুলোর মধ্যে আপনার গল্পে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন কি?

রাশেদ রহমান: আমি তো সব সময় ‘নতুন’ গল্পই লিখতে চাই; আমার গল্পে পরিবর্তন এসেছে কিনা—এটা পাঠক-সমালোচকরা বলতে পারবেন।


এহ্সান: এ বইতে ৮টি গল্প আছে। গল্পগুলো কি কি বিষয় নিয়ে লেখা?

রাশেদ রহমান: গণিকাপ্রণাম গল্পসংকলনের ৮টি গল্পের শিরোনাম—এক অন্ধ যুবতী ও তিনটি কুকুর, জয় বাংলা, গণিকাপ্রণাম, পাতায় পাতায় শালপাতায়, ইঁদুর-বিড়ালের দিন, রক্ত ও আগুন, পাপ ও পুণ্যস্নান এবং পবিত্রমাটির খুনপ্লাবিত গল্প। এক কথায় বলে দেয়া মুশকিল—কোন গল্প কী বিষয় নিয়ে লেখা। শুরুতে বলেছি—আমার প্রায় প্রতিটি গল্পের ভেতরেই থাকে মূল গল্পের সাথে অন্য আরো গল্প। তারপরও বলব—এক অন্ধ যুবতী ও তিনটি কুকুর গল্পটি এক অন্ধ যুবতী ও তিন বিকারগ্রস্ত প্রতিবন্ধী মানুষের গল্প। ওরা চারজনই ভিক্ষুক। ঐ বিকারগ্রস্ত প্রতিবন্ধী তিন ভিক্ষুক কীভাবে অন্ধ যুবতীটিকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খেতে চায় (মানুষ এত অমানুষও হতে পারে!), তারই আখ্যান। ‘জয় বাংলা’ রাজনৈতিক গল্প, স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কীভাবে বাঙালিকে আলোড়িত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিল, আছে সেই কাহিনী; ‘গণিকাপ্রণাম’ এক কবি ও এক গণিকার ভালোবাসা, যন্ত্রণা, বিদ্রোহ ও বেঁচে থাকার গল্প; ‘পাতায় পাতায় শালপাতায়’ ওয়ান ইলেভেনের সময় আর্মির হাতে নিহত মধুপুরের আদিবাসী নেতা চলেশ রিচিলের গল্প; ‘ইঁদুর-বিড়ালের দিন’ গল্পটি স্বাধীনতা উত্তর গণবাহিনীর নৃশংস রাজনীতির গল্প; ‘রক্ত ও আগুন’ গল্পটি ইতিহাসের উপাদান নিয়ে লেখা, এই গল্পে আছেন সম্রাট আকবর, শাহবাজ খাঁ, সাঈদ খাঁ, আরো যে কত বানানো চরিত্র; ‘পাপ ও পুণ্যস্নান’ আখ্যানটি গড়ে উঠেছে প্রেম ও পাপের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে এবং ‘পবিত্রমাটির খুনপ্লাবিত গল্প’ মূলত যৌনকর্মীদের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা ও বঞ্চনার গল্প।


এহ্সান: আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বস্তু নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন?

রাশেদ রহমান: না, ঠিক নির্দিষ্ট কোনো বিষয়বস্তু—আগে থেকে চিন্তা করে লিখতে বসি না। আমার একটি গল্প লিখতে ৮-১২ ঘণ্টা সময় লাগে, কিন্তু গল্পটি আমার করোটির ভেতরে সৃজিত হয় ৩ মাস, ৬ মাস বা ১ বছর ধরে। ঐ সৃজনকালেই গল্পের বিষয়বস্তু ঠিক হয়ে যায়।


এহ্সান: গল্পগুলোর উপস্থাপনেও বৈচিত্র্য আছে কি?

রাশেদ রহমান: আমার যারা পাঠক (আমার কোনো পাঠক আছে কিনা, আমি ঠিক জানি না) তারা নিশ্চয়ই বুঝবেন—আমি কীভাবে গল্প বলার চেষ্টা করি। আমি বলতে চাই, আমি আসলে গল্প লিখি না, গল্প বলি, গল্প শোনাতে চাই।


এহ্সান: কোনো বিশেষ স্টাইলের প্রতি আপনা দুর্বলতা আছে কি, মানে আপনি স্বাচ্ছন্দ করেন?

রাশেদ রহমান: আমার বেশিরভাগ গল্পই উত্তমপুরুষে লেখা। আমি নিজেই পাঠকদের গল্প শোনাই। উত্তমপুরুষে লিখতেই আমি পছন্দ করি।


এহ্সান: আপনার গল্পগুলো কি আন্তঃসম্পর্কিত?

রাশেদ রহমান: হ্যাঁ, কিছুটা আন্তঃসম্পর্ক তো আছেই। আমার অনেক গল্পের মুখ্য চরিত্রগুলোর একই নাম—কোনো কোনো পাঠক মনে করতে পারেন যে তিনি একই গল্প পড়ছেন, কিন্তু আসলে একই গল্প না।


এহ্সান: গল্পগুলোতে আপনি কি বলতে চেয়েছেন, কোনো বিশেষ বিষয়কে উপস্থান বা ম্যাসেজ দিতে চেয়েছেন কি?

রাশেদ রহমান: গল্পে জোরপূর্বক কোনো ম্যাসেজ দেয়ার ইচ্ছে থেকে আমি কোনো গল্প লিখি না। আমি মনে করি, গল্প ‘নিছক গল্পই’; পাঠককে আনন্দ-বেদনায় ডুবিয়ে দেয়া, ভাসিয়ে দেয়াই গল্পকারের মূল কাজ।


এহ্সান: গল্পের বিষয়বস্তু আপনি কি ভাবে নির্ধারণ করেন?

রাশেদ রহমান: গল্পের বিষয়বস্তু সচেতনভাবে নির্ধারণ করে গল্প লেখা শুরু করি—সব সময় তা হয় না। গল্প আমাকে ‘ভর’ করে—নিজেও সৃজিত হয়।


এহ্সান: একটি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা কি করে আপনি গল্পে রূপান্তর করেন?

রাশেদ রহমান: চারপাশে নানা ঘটনা ঘটে। দেশের পত্র-পত্রিকায়ও মানুষের দুঃখ-কষ্টের নানা কাহিনী ছাপা হয়। আমি দেখি, কোনো ঘটনার মধ্যে আমি নিজেই আছি। কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত কোনো বন্ধুবান্ধব বা পাড়া প্রতিবেশী কিংবা চেনাজানা কোনো মানুষ। পত্রিকায় যেসব কাহিনী পড়ি, সেখানেও দেখি—আমার মতোই আছে কেউ না কেউ। অর্থাৎ আমি নিজেই গল্প-ঘটনার মধ্যে থাকি। কিংবা ঘটনার সূত্রটা জানি—তখন সেই ঘটনাকে ‘গল্প’ বানাতে রবীন্দ্রনাথের সাহায্য নিই, মানিক-বিভূতির সাহায্য নিই, সাহায্য নিই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কিংবা সৈয়দ হকের।


এহ্সান: গল্পে আপনার ব্যক্তিগত ছাপ আছে কি?

রাশেদ রহমান: আমি মনে করি না যে, কোনো গল্পকার নিজেকে গল্পের বাইরে রেখে গল্প লিখতে পারেন। আমার গল্পে আমি অবশ্যই থাকি।


এহ্সান: গল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আপনি মেটাফোর, নিজস্ব শব্দ তৈরি করেন কি না?

রাশেদ রহমান: মেটাফোর! বাংলা গল্পে মেটাফোর কিংবা রূপকশব্দ কিংবা রূপক শব্দবাক্য—এইসব আমার আগেও অনেক গল্পকার ব্যবহার করেছেন, বিষয়টি আমারও খুব প্রিয়, এই রূপকের ব্যবহার আমার কাছে খুবই ভাল লাগে, আমিও ব্যবহার করি। আমার গল্প যারা পড়েছেন, নিশ্চয়ই তাদের নজর এড়ানোর কথা না—নতুন শব্দ তৈরির একটা চেষ্টা তো আমি করেই যাই।


এহ্সান: প্রত্যেক লেখকই চায় তার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে, তো বর্তমান গল্পকারদের সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য করেন কী ভাবে?

রাশেদ রহমান: পার্থক্য তো করবেন আসলে পাঠক-সমালোচকরা। তবুও বলি, আমার গল্প বুননের যে কৌশল, পাঠকদের গল্পের আসরে বসিয়ে গল্প শোনানো—বোধকরি এটাই মূল পার্থক্য। তাছাড়া আমি নিজের একটি গল্পভাষা তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছি যা অন্যদের থেকে আলাদা।



এহ্সান: শুধু উস্থাপনের স্টাইল দ্বারা তো আর একজন গল্পকার মহৎ হয়ে ওঠেন না। চিন্তার ও দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা দরকার হয়। আপনার গল্পগুলোতে জীবনের তেমন কোনো সত্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন কি?

রাশেদ রহমান: গল্প বলার মধ্যদিয়ে জীবনকে খুঁড়ে দেখার চেষ্টাই তো করে যাচ্ছি।


এহ্সান: প্রায় সব গল্পেই তো কোনো না কোনো অনুসন্ধান থাকে। যেমন- আত্ম, নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, গ্রামীণ, মেট্রপলিটন ইত্যাদি। আপনি কোন ধরনের অনুসন্ধানে গল্প রচনা করেন?

রাশেদ রহমান: আমার গল্পে কোনো নির্দিষ্ট কোনো অনুসন্ধান আছে কিনা, তা বলতে পারছি না। আমার চারপাশে আমি মূলত যা দেখি, যে ঘটনা বা বিষয় আমাকে আলোড়িত করে—সেইসব বিষয় নিয়েই আমি গল্প সৃজনে মগ্ন হই।


এহ্সান: গল্পের বিষয় বস্তুর নির্বাচনের সঙ্গে দর্শনের একটা যোগাযোগ আছে। আপনি গল্পে তেমন কি কোনো দর্শনের প্রতিফল বা প্রভাব দেখাতে চেষ্টা করেছেন?

রাশেদ রহমান: গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনের সঙ্গে দর্শনের যোগাযোগ আছে—এ ব্যাপারে পুরোপুরি ঐকমত্য প্রকাশ করতে পারছি না। কোনো দর্শন মাথায় রেখে আমি গল্প লিখতেও বসি না। কোনো গল্প লেখার সময় দেখা যায়—সৃজনধারাটিতে আমার নিজের আর নিয়ন্ত্রণ নেই। গল্প নিজেই সৃজিত হচ্ছে। তখন ঘটতে পারে কোনো দর্শনের প্রতিফলন।


এহ্সান: আপনা গল্পগুলোকে কি কোনো বিশেষ ধারা বা ঘরাণার—যেমন মার্কসবাদী, জীবনবাদী, নারীবাদী, ফ্রয়েডিয় ইত্যাদি বলে মনে করেন?

রাশেদ রহমান: আমার গল্পের বেশিরভাগ চরিত্রই প্রান্তিক জনপদের প্রান্তিক মানুষ। আমি তাদের গল্পই শোনাতে চাই। তারা কি মার্কসবাদ, নারীবাদ কিংবা ফ্রয়েডিয় তত্ত্ব বোঝেন? আমার মনে হয়—তারা এসবের কিছুই বোঝেন না। সুতরাং আমার গল্পে এ জাতীয় কোনো মতবাদের প্রতিফলন ঘটে না। আমি শুধু মানুষের জীবনের গল্পই শোনাতে চাই।


এহ্সান: এর আগে প্রকাশিত গ্রন্থের সঙ্গে এই বইয়ের গল্পগুলোর বিশেষ পার্থক্য আছে?

রাশেদ রহমান: আমি সবসময়—একটা মানুষের ভেতরে যে আরেকটা মানুষ বাস করে সেই মানুষের গল্পই শোনাতে চাই। সেই প্রবণতাটা ‘গণিকাপ্রণাম’ গ্রন্থের গল্পগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে আমি মনে করি।


এহ্সান: এই সময়ের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলোর সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য কি?

রাশেদ রহমান: এটা পাঠকরা বিচার করলেই ভাল হবে।


এহ্সান: বইটির ‘গণিকাপ্রণাম’ নামের কারণ কি?

রাশেদ রহমান: বইয়ে ৮টি গল্প আছে— তার একটি ‘গণিকাপ্রণাম।’ একজন কবির (অরুণেষ ঘোষ, যার শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের জাঙ্গালিয়া গ্রামে, বসবাস ও মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার শহরে) জীবনের কিছু অংশ নিয়ে এই গল্পটি রচিত। অরুণেষ ঘোষ তার কবিতায় ও জীবনে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন—গণিকা অর্থাৎ বেশ্যা বা পতিতারাও মানুষ। তাদের অবহেলা করা কিংবা ঘৃণা করার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়টিই আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। এছাড়া এই গল্পগ্রন্থে আরেকটি গল্প আছে—নাম ‘পবিত্রমাটির খুনপ্লাবিত গল্প’—এটিও পতিতাদের দুঃখ-যন্ত্রণা-বঞ্চণা নিয়েই লেখা। বিশেষ করে, কোনো একটি প্রাচীন পতিতালয় যখন কোনো একটি মহলের স্বার্থ সিদ্ধি কিংবা ঐ পতিতালয়ের জমি দখলের জন্য তাদের উচ্ছেদ করা হয়, তখন তারা কী যে কষ্টে পড়ে; মানুষ হিসেবে তাদের যখন বেঁচে থাকার অবলম্বনই থাকে না, এ বিষয়টিও আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। এই দু’টো গল্পের কারণেই আমার বর্তমান গল্পগ্রন্থের নাম নির্বাচন—গণিকাপ্রণাম।


এহ্সান: উত্তরাধিকারীধারায় অনেক সাহিত্যিক অগ্রজ সাহিত্যিকের কাছে ঋণ স্বীকার করেন। আপনি কি তেমন কোনো সাহিত্যিকের নাম বলবেন কি, যার প্রভার আপনি অনুভব করেন?

রাশেদ রহমান: উত্তরাধিকার কি অস্বীকার করা যায়? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে সৈয়দ শামসুল হক—মাঝখানে আরোও অনেকে আছেন, যাঁদের কাছে আমরা ঋণী।


এহ্সান: আপনার সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে কার কার সাহিত্য আপনার ভাল লাগে, ভাল করছে?

রাশেদ রহমান: সমসাময়িক তো, নাম বললাম না...!


এহ্সান: বাংলা সাহিত্যে এখন উত্তরাধুনিক সাহিত্যের নামে একধরনের সাহিত্য চর্চা হচ্ছে, এতে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাই প্রত্যেক গল্পকার তার স্বাতন্ত্র নিয়ে ভাবেন, এটা অবাঞ্চিত কিছু নয়। এই ব্যক্তি সাতন্ত্র আমাদের সাহিত্যের কি রূপ দিচ্ছে?

রাশেদ রহমান: আমার তো মনে হয়—আমরা পুরোপুরি আধুনিক সাহিত্যের চর্চাই শুরু করতে পারিনি— উত্তরাধুনিক সাহিত্য নিয়ে কী বলবো?


এহ্সান: সাহিত্যের দশক বিচার প্রচলিত আছে। আপনি আপনার দশককে কি ভাবে উপস্থান বা চিহ্নিত করছেন?

রাশেদ রহমান: সব দশকেই কিছু ভাল লেখকের আবির্ভাব ঘটে। নব্বই দশকেও কেউ কেউ খুব ভাল গল্প লিখেছে।


এহ্সান: একটা বই প্রকাশ করা আর একটা ভাল গল্প লেখা, কোনটা আপনাকে বেশি তৃপ্তি দিবে?

রাশেদ রহমান:একটা ‘কালজয়ী’ গল্প লিখতে পারলেই আমি বেশি তৃপ্তি পাবো।


এহ্সান: পরবর্তী বই নিয়ে আপনার কি কোনো চিন্তা আছে?

রাশেদ রহমান: আমি মূলত গল্পই লিখি। পরবর্তী এক বছরে একটি বই করার মতো গল্প লিখতে পারবো কিনা জানি না। গণিকাপ্রণামের ৮টি গল্পই লিখেছি গত দু’বছরে। সুতরাং পরবর্তী বইয়ের চিন্তা এখনো মাথায় নেই।

এহ্সান: আপনার না লেখা কোনো গল্প আছে, যা আপনি লিখতে চান?

রাশেদ রহমান: না, লেখা অনেক গল্প আছে, ভবিষ্যতে সেগুলো লিখতে চাই।


এহ্সান: এক বসায় গল্প লেখেন না ধীরে ধীরে, কেঁটে-ছিড়ে লিখে থাকেন?

রাশেদ রহমান: শুরুতে বলেছি—একটা গল্প লিখতে ৮-১২ ঘণ্টা সময় লাগে। ৩-৪ দিনে এই সময় ব্যয় হয়। আস্তে-ধীরেই লিখি, খুব একটা কাঁটাছেঁড়া করতে হয় না। তবে কম্পিউটার কম্পোজ করার সময়, প্রুফ দেখার সময়, কিংবা কোনো পত্র-পত্রিকায় গল্প পাঠানোর আগে যখন আবারো গল্পটি পড়ি, তখন কিছুটা কাঁটাছেঁড়া করতে হয়, শব্দ-বাক্যের পরিবর্তন ঘটে।


এহ্সান: গল্প লেখায় কোনো অতৃপ্তি আছে কি?

রাশেদ রহমান: অতৃপ্ততা তো আছেই। মনে হয়, এখনো কালোত্তীর্ণ কোনো গল্প লিখতে পারিনি—যে গল্পটি একজন গল্পকার হিসেবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।


এহ্সান: আজকের দিনে সবাই যখন উপন্যাসের দিকে ঝুঁকছে, আপনি সেখানে ছোটগল্পকে কিভাবে দেখছেন?

রাশেদ রহমান: ছোটগল্প লিখতেই আমি স্বাচ্ছন্দবোধ করি। ছোটগল্প তো যেন—‘বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু’ আবিষ্কার।


এহ্সান: গল্প উপস্থাপনে আপনি ন্যারেটিভ টাইপ লিখেন, নাকি মূল গল্পটিকে আপনার গল্পের সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করেন?

রাশেদ রহমান: আমি গল্পের ডিটেইলস-এ যেতেই পছন্দ করি। আমার গল্পে মূল গল্পের বাইরেও আরো অন্য গল্প থাকে।


এহ্সান: লেখক প্রস্তুতি হিসেবে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, বিশেষত দেশিয় সাহিত্যপাঠ ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে অনেক অবশ্য এতো গভীরে যেতে চান না। আপনার কাছে এগুলো কি মনে হয়?

রাশেদ রহমান: লেখালেখি শুরুর আগে নিজের প্রস্তুতি নেয়াটা খুব জরুরি। প্রস্তুতি নিয়েও শুরু করা যায়, আবার লিখতে লিখতেও চলতে পারে প্রস্তুতি নেয়া। অর্থাৎ লেখালেখি করতে চাইলে পঠন-পাঠনের কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না।


এহ্সান: ভাল গল্প বলতে আপনি কোনগুলোকে বোঝেন, মানে আপনার চোখে কোন গল্পগুলো ভাল?

রাশেদ রহমান:যে গল্পটি পড়ে আমি আলোড়িত হবো, আমার ভেতরে আনন্দ-বেদনা সংক্রমিত হবে, যে গল্পটি আমাকে ভাবিত করবে, যে গল্পটি পড়ে আমি নিজে একটি গল্প লেখার অনুপ্রেরণা পাবো, যে গল্পটি পড়ে আমার মনে হবে—এই গল্পটি আমিও লিখতে পারতাম—ঐ গল্পটিকেই আমি ভাল গল্প বলবো।


এহ্সান: আপনি কি বাংলাদেশের বর্তমানে রচিত গল্পগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট? একটু বিস্তারিত যদি বলেন।

রাশেদ রহমান: উত্তর চাইলেন বিস্তারিত। আমি বলতে চাই খুবই সংক্ষেপে। আমি বর্তমানে রচিত গল্পগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট কি সন্তুষ্ট না—তা বলার আগে বলবো—আমি হতাশ নই। প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একবার কিন্তু প্রশ্ন তুলেছিলেন—ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে? আমি মনে করি, ছোট গল্প মারা যায়নি, মারা যাচ্ছে না। প্রচুর সফল ছোটগল্প এখনও রচিত হচ্ছে।


এহসান : আপনাকে ধন্যবাদ।
রাশেদ রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।





সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান 

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা কলেজে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন