বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

রূপের কাছে হলুদ পাখি হার মাইনা যায়

মাসুদ পারভেজ


‘তার করার কিছুই ছিল না’-- এই কথাটি যখন আমাদের কানে আসে, তখন আমরা এটাকে প্রথম দিকে উড়াই দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু যখন আরেকটা কথা শুনি, ‘ওর যা খুশি করুক আমি কি কইছিলাম মারতে।’ তখন আমরা যারা ভাদাইম্যার দল তারা কিছুটা ধন্ধের মধ্যে পড়ি। তখন আসল ঘটনা জানার জন্য আমাদের আগ্রহ বাড়ে। গা ঝাড়া দিয়া কিংবা গাঁজার ধোঁয়া থাকি বের হয়া আমরা আলাপজুড়ি, তর্কজমাই। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, আমরা যারা সকাল-বিকাল মাটিত আঁকিবুকি করি বাঘ-বকরি খেলাই, খড়ের পুঞ্জে পাছা ঠেকাই ওম কুড়াই কি ঝিমাই, আর না হয় দাঁতের গোড়ায় গুলমাখি কিটকিটি মিটাই তারা অনেকদিন পরে এমন একটা খবরে আবার চাঙা হয়া উঠি।


অনেকদিন পরে গ্রামে থানা পুলিশের কারবারে সবার মধ্যে একটা ডিপডিপানি শুরু হয়া যায়। তখন আমরা থানা পুলিশের পিছে পিছে ঘুরি। আসল কাহিনি নিয়া কাহিনি ফান্দি। আমরা যারা বাদিয়ার দল হিসেবে পরিচিত কি কালেভদ্রে হাতটানের কাম সারি নেশাটেশার খরচা চালাই, তারা ‘তার করার কিছুই ছিল না’ কথাটা বিশ্বাস করি ফেলাই। তো আমরা ছোটোকাল থাকি শুনি আসিছি লেডিস ফার্স্ট। তখন আমরা লেডিসের কাহিনিটা আগে ফান্দি।

‘তার করার কিছুই ছিল না’-- বউকথন :

‘রূপে আমার আগুন জ্বলে যৌবন ভরা অঙ্গে’ গানটা দিয়া আমরা কাহিনির শুরুটা করতে চাই। কিন্তু আমাদের মধ্য থাকি এক ভাদাইম্যা কয়া ওঠে, ভীমরুলের চাক ভাঙি দিয়া দূরে থাকলে কেমনে কি হয়। আমরা আহা! আহা! করি। তখন নিজেদের আরও ভাদাইম্যা ভাবি এইটা মনে করি যে, কানের পাশ দিয়া গুলি যায় তাও টের পাই না। আরও কইতে থাকি, আমাদের ঘাড়ে বন্দুক থুয়া পাখি মারে, তাও টের পাই না। আহা! আহা! করে বলি, গাঁয়ের খাজনা আরেকজনে খায়। আমাদের মধ্য থাকি দু-একজন হয়ত-বা ক্রেডিট নেওয়ার জন্য বলে, তারা বউটার নেকনজরে পড়ার জন্য বেশ চেষ্টা চরিত্র করে, আর কয় দিন গেলে একটা কিছু হয়া গেলি হয়। আমরা আবার হো হো করে বলি, যার হয় না নয়ে, তার হয় না নব্বইয়ে। তখন বউটার স্বামী-- যে আমাদের দুয়েক বছরের বড়ো হতে পারে, ছোটো হতে পারে, কিংবা সমান হতে পারে তার জন্য কয়েকটা কড়া কড়া গালি বাছাই করি। সমস্বরে বলি, শালা তুমি বিদেশ গিয়া মাল কামাও আর তোমার ঘরের মাল খায় আরেকজনে। তখন আবার আমরা গান ধরি, ‘প্রেমের সুধা পান করে নাও ওরে আমার দিওয়ানা’।

আমাদের মধ্যে একমাত্রজন, যে মেট্রিক পাশের মোটা আইল পার হয় হায়ার সেকেন্ড ডিভিশন নম্বর নিয়া তারপর আইএ--তে ফেল-এক্সপেল মিলি তিনবার পার করি আবার আমাদের দলে আসি ভীড়ে, সে তখন বলা শুরু করে, অনেক দিন ধরি সেই ছেলেটা আর বউটার একটা দহরম-মহরম শুরু হয়। সেই ছেলেটা বলতে আমরা বুঝি কোনো এক এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তি তোলার জন্য চাকরি করা ছেলেটা। তখন আমরা আবার আহা! আহা! করি, কোন গাঁয়ের পোলা জীবন দিল এটে আসি। তার পরিবার, কি বাপ-মায়ের কথা আমাদের মনে আসে। আমরা জানতে পারি, তার কোনো বউ সংসার আছিল না। সে প্রতি সপ্তায় কিস্তির টাকা উঠাইতে আসত আর বউটার বাড়ির আঙিনায় বসতো তার অফিস। মানে সবায় যারা কিস্তির টাকা জমা দিবার আসে তারা বউটার বাড়িত হাজির হয়। এমনে যাইতে থাকে দিন। তারপর একদিন বউটার আর কিস্তি-ওঠা পোলাডার চোখাচোখি হয়, হাসাহাসি হয়, হাত ধরাধরি হয়। তাতে তাদের কারও মন ভেজে না। তখন তারা দিনের আলোতে আর ধরা দিতে চায় না। তারা রাত বেছে নেয়। আমরা তখন বলি,

আহা! তার স্বামী ঘরে নাই

আহা! তার মনে সুখ নাই

আহা! তার যৈবতি বয়েস

আহা! তার জাগিল খায়েশ...

রাতের আন্ধারে তারা মিলিয়ামিশিয়া মিলাইয়া যায়। কিন্তু তাদের এই মেলামেশা থাকে না গোপন। তখন আমরা আরেকজনের কাহিনি ফান্দি যার মুখ থাকি আমরা শুনছিলাম, ‘তার করার কিছুই ছিল না।’ সে ছিল বউটার শ্বশুর।

‘তার করার কিছুই ছিল না’-- শ্বশুর/বৃদ্ধকথন :

বয়সের খোঁজ করিলে দেখা যায় তার দুই পা-ই কবরে। আমরা সে হিসাব করি না। আমরা শুধু জানিতে চাই, এই বয়সে সে এই কাজ করে কেমন করি। তখন আবার আমাদের মধ্য থাকি মেট্রিক পাশ বলা শুরু করে, ঘরের বউয়ের নিশি রাইতের কাজ কাম তার চোখ এড়ায় না। আমরা তখন চোখ কান খাড়া করি তার দিকে দেখি, আর সে বলতে থাকে, বয়স হইলে এমনিতে মানুষের রাইতের ঘুম কমি যায়। তখন সে হয়ত-বা মরণের কথা ভাবে কি নানান রোগে ভুগে। হয়ত-বা তার ঘনঘন পেশাব পায় কি কাশতে কাশতে দমকাশি লাগি গলা ঘড়ঘড় করে। যাই হোক, বুড়ার তেমন একটা কিছু হয়ত-বা ছিল আর তাতে রাইতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। তখন বুড়ার চোখ কান খাড়া থাকে আর সে দেখে কি শুনে বেটার বউ আন্ধারে মিলিয়ামিশিয়া যায়। প্রথমদিকে বুড়া হয়ত-বা নিজের চোখকে বিশ্বাস করিতে চায় নাই। কিন্তু পরে বুড়ার আর বিশ্বাস না করিয়া কোনো উপায় ছিল না। তখন আমরা বলি আহা! বুড়ার বড়ো জ্বালা। রাতবিরাইতে তার নিন্দ্ ভাঙে আর জিল্লতি বাড়তে থাকে। বুড়া না পারে কইতে না পারে সইতে। তার মনের কথা মনে রয়। ঘরের ইজ্জত মাঝরাইতে মিলিয়া যায়, ভাঙা ঘুমে সে ভাবে আর ভাবে। এরপর রাইতে বুড়ার আর ঘুম ধরে না। রাতজাগা শরীল দুর্বল হইলে আমরা আহা! আহা! করে উঠি। তখন আমরা গোপাল কামারের খবর পাই। গোপাল কামার বুড়ার বয়েসি কিংবা ইয়ার-দোস্ত মানুষ। বুড়া গোপালের কাছে যায়, কী যেন বলিতে চায়, আবার ফিরি আসে। এইভাবে এক দিন গোপাল নিজেই বুড়ারে জিগায়। বুড়া কিছু বলে, আবার বলে না। এমনি করি যখন আমতা আমতা করে, তখন গোপাল কামার বুড়ারে চা গিলাইলে বুড়ার ভেতর দম আসে। শরীল গরম হয়। তখন সে গোপাল কামারের কাছে মিলিয়ামিশিয়া যাওয়ার বিত্তান্ত কয়। গোপাল কী বুঝে তা সে-ই জানে। তখন কেবল আমরা ফান্দি যে, গোপাল বুড়ারে দুই দিন পর আবার আসতে বলে। এই দুই দিনে বুড়া আরও বুড়া হয়। তারপর হাঁটিহাঁটি পা-পা করে বুড়া গোপাল কামারের কাছে আসে। গোপাল কিছু না কয়া বুড়াক আবার চা গিলায়। তারপর চারপাশে আন্ধার নামিলে বুড়ার হাতে একটা ছুরি ধরি দেয়। ন্যাকড়াপ্যাঁচানো সেই ছুরিকে আমরা কোরবানির গরু জবাইয়ের ছুরির সাথে মিলাতে থাকি। আমরা বুঝি না সেই ছুরি গোপাল তাহারে এমনি দেয় নাকি টাকা নেয়। তখন আমরা আদালতের কথা ভাবি আর কয়া থাকি, গোপাল যদি এমনি দেয় আর উস্কানি দেয় তাইলে তারও বিচার হবি। একটা বড়ো ছুরি হাতে নিয়া চাঁদডোবা আন্ধারে বুড়া পা টিপি টিপি হাঁটে। ছুরি হাতে নিয়া বুড়ার আর নিন্দ্ আসে না। বুড়ার যখন নিন্দ্ আসে না, তখন সেইরাতে আসে এনজিওর কিস্তি তোলা ব্যাটায়। বুড়া এপাশ-ওপাশ করি করি একসময় টের পায়, তার ব্যাটার বউ মিলিয়ামিশিয়া যায়। তখন আমরা গল্প ফান্দি, বুড়া ছুরিটা নিয়া কিছু চিন্তা করছিল কি না। আর বুড়ার বুকে সাহস ক্যামনে জমাট বাঁধে কিংবা বুড়ার মাথায় তখন মাল উঠছিল। যাই হোক, আমরা বুড়ার বিত্তান্ত ইতি টানি।

তখন আমরা বিড়ি ধরাই, ঘাসের উপর পিঠ ঠেকাই, আর বুড়ার ব্যাটার বউরে নিয়া খিস্তি খেউড় করি। আমাদের মধ্যে যারা ক্রেডিট নিতে চায় এই বলে যে, আর কয়টা দিন গেলে তাদের সাথেও বুড়ার ব্যাটার বউয়ের একটা কিছু হয়া যাইত, তারা বুড়ারে কষে কষে কয়টা গাইল দেয়। আমরা হো হো করি হাসি উঠি। সমস্বরে গান ধরি, ফুলের মধু খাইল না। আমাদের মধ্য থাকি মেট্রিক পাশ আবার বলে, কাহিনি ফান্দা তো শেষ হয় নাই। আমরা চোখছানাবড়া করে ভাবি, আর কী ঘটনা। সে বলে, ‘ওর যা খুশি করুক আমি কি কইছিলাম মারতে।’ তখন আবার আমাদের মাথাচুলকানি শুরু হয়। অনেকদিন আগের দাউদ কি একজিমা কিংবা আকাম উকামের রোগ বালাইয়ের স্থানও কারো চুলকায়। আমরা খেয়াল করি, কোনখান থাকি শুরু করা যায়। তখন মেট্রিক পাশ আবার ধরে, বুড়ার ব্যাটা তো বিয়ার ডিমেন্ডের টাকা নিয়া বিদেশ যায়। তখন আবার আমরা বুড়ার ব্যাটার কাহিনি ফান্দি।

‘ওর যা খুশি করুক, আমি কি কইছিলাম মারতে’-- বুড়ার ব্যাটাকথন/মাউগের ভাতারকথন :

বুড়ার ব্যাটা শ্বশুরের টাকায় বিদেশ যায়। তখন আমরা বিদেশ মানে বুঝি-- মিডল ইস্ট, উট, উটের জকি, খেজুর, হজের মৌসুমে আসা দুম্বার গোশত, দুবাই কি সৌদি আরব। সেই বিদেশ যাওয়ার হাউশ এক কালে আমাদেরও ছিল। কিন্তু যাইতে না পারি আমরা এখন বুড়ার ব্যাটাক ইচ্ছামতন গাইল দেই, কাউয়ায় কমলা খায় আর তুই ব্যাটা বিদেশত দুম্বা চরা। তখন আমরা কিছুটা অতীতচারী হয়া পড়ি আর খেয়াল করি যে, আমাদের পাড়ার একজন সৌদি যাওয়ার পর তার কাম হয় সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় বস্তা নিয়া ঘুরি বিড়ি সিগারেটের পুটকি কুড়া আর সন্ধ্যাবেলা সেই বিড়ির পুটকির হিসাব দেওয়া। কয় দিন করি আর রোইদে ঘুরি যখন দেখে জান আর চলে না, তখন জানের মায়াত সৌদি ছাড়ি ফির গ্রামত আসি হাল গিরস্তির কাম ধরি, মানুষের বাড়িত কামলা খাটে। আর মাঝে মাঝে সৌদির গল্প শোনায়। আহা! কি দারুণ, কি নিদারুণ সে গল্প। আমরাও শুনছিলাম মন দিয়া। তেলের চেয়ে পানির দাম বেশি। তখন গ্রামের বুড়ারা পাকা পাকা দাড়ি নিয়া যখন বলে, কি রহমতের দেশ গো পানির চেয়ে তেলের দাম কম, সোনা-দানায় ভরা। তখন কে যেন বলেছিল, আহাম্মক নাকি! পানি যদি কিনি খাবার হয় তাইলে আর জীবনে থাকে কি? পানির চেয়ে বড়ো নিয়ামত আর রহমত আছে নাকি? আমরা সেই পানির দেশের মানুষ পানি পাই মাগনা। তখন সে, দাড়িপাকা বুড়াদের দিকে তাকিয়ে বলে, মাগনা জিনিসের কদর বুজলা না গো, ট্যাকা দিয়া পানি কিনি খাবার লাগলে টের পাইতা, তেলের দর বেশি না পাানির কদর বেশি। তো তেলের দেশে থাকে বুড়ার ব্যাটা। বুড়ার খুন করার খবর দিয়া যখন বুড়ার ব্যাটাক মোবাইল করা হয়, তখন বুড়ার ব্যাটা খবর পায়া কেমন করে তা আমরা জানি না। তবে আমরা গল্প ফান্দি, বুড়ার ব্যাটা বাপের উপর ক্ষ্যাপি যায়। তারপর যখন বুড়ার ব্যাটাক কওয়া হয়, তোর বাপক পুলিশে ধরিছে, এখন কোর্টকাচারি করার জন্যি টাকা লাগে। তো বুড়ার ব্যাটা কয়, ওর বউ যা খুশি তাই করি বেড়াক তাতে বুড়ার কি সমস্যা। তখন সে আরও বলে, ওর যা খুশি করুক, আমি কি কইছিলাম মারতে। আমরা তখন বুড়ার ব্যাটাক হারামজাদা কয়া গাইল দেই। তারপর আমরা আহা! আহা! করে বলি, হারামজাদা কয় ট্যাকা বা কামায় আর কয় ট্যাকা বা পাঠাবি। সারাদিন রোইদের মধ্যে ঘুরি দুম্বা চরা ট্যাকা কি আর কোর্ট কাচারিত খরচ করবার মন চায়। তখন আমরা বুড়ার উপর গরম হই। আসলেই তো, যার বউ তার যদি আপত্তি না থাকে তাইলে শালার বুড়া তুই ক্যান এত মাথা ঘামাইস? এখন বুজ ঠ্যালা, জেলের ঘানি টান আর না হয় ফাঁসিত ঝুলি মর। বুড়ার ব্যাটার টাকা পাঠানোর কোনো খবর আমরা পাই নাই।

আমরা তখন আরেকটা খবর পেয়ে টাসকি খাই। সেটা হলো, বুড়ার কোর্টের খবর। বুড়া নাকি আদালতের ভরা মজলিসে কয়া ওঠে, ব্যাটার বউ তার ঘরের ইজ্জত। আর ঘরের ইজ্জত রক্ষার জন্যি সে ঠিক কাজ করিছে। তার কোনো আফসোস নাই। আদালতের সবাই নাকি তখন থ মারে এই কথা শুনি। আমরা তখন বুড়ার জন্য আহা! আহা! করে উঠি।

তখন আমাদের সেই কিস্তি ওঠার চাকরি করা ছেলেটার কথা মনে পড়ে। যে বুড়ার ছুরিতে জীবন হারাইল। এর বেশি কিছু আমরা আর ফান্দিতে চাই না। তখন আমরা দলবান্ধি আর ছেলেটার জীবন হারানোর শোকে গান ধরি, রূপের কাছে হলুদ পাখি হার মাইনা যায় বন্ধু হে...


লেখক পরিচিতি

নাম: মাসুদ পারভেজ
জন্ম: ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫
জন্মস্থান: দিনাজপুর
শিক্ষালাভ: বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
পেশা: শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: ঘটন অঘটনের গল্প, বটতলা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, ঢাকা
















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন