বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

সরকার কবিরউদ্দিন এর গল্প নদী ভাঙ্গন

এক.

জুনায়েদের মা মারা গেছেন গতকাল।

আত্ম-কথনে ‘গতকাল আমার বোকা মা মারা গেছেন’, এইভাবে অনেকবার বলেছে জুনায়েদ এক অজানা অভিমানের বসে।


আজ জননীর ইচ্ছেমতে, তাঁকে কবর দেবার জন্য লালপুর নিয়ে যাচ্ছে জুনায়েদ আর ওর ভাই বোনেরা। লালপুর জুনায়েদদের গ্রামের বাড়ী। ঢাকা থেকে তেমনটা দূরে নয়। খুব বেশী হলে পয়তাল্লিশ কিলোমিটারের দূরত্ব। দাউদকান্দির মেঘনা-গোমতী ব্রীজ পার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে শহিদনগর থেকে একটা রাস্তা বায়ে চলে গেছে। এই পথটাই নিয়ে যায় লালপুরে।

জুনায়েদের আব্বা জন্মেছিলেন এই লালপুরে। ওর মা লালপুরের মেয়ে ছিলেন না। তবুও প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সাদা শাড়ী পরে কাটিয়ে দিয়ে গেছেন। পার্থিব ভালবাসায় অভ্যাস গড়ে উঠবার আগেই জুনায়েদের আব্বা চলে গেলেন।

জুনায়েদের আব্বার ছেলেবেলায় ওঁর একটা পোষা পানি-খাউরি (পানকৌড়ি) পাখি ছিলো। গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের পাঠ শেষ করার পর হাইস্কুল প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গৌরীপুরে, দূরত্বটা নদী পথে। জুনায়েদের দাদু ওর আব্বাকে একটা ছোট্ট কোষানৌকা কিনে দিলেন। গোমতীর উজান বেঁয়ে গৌরীপুর যেতেন স্কুলে। স্কুল শেষে, ঢলে পড়া বেলায় ভাটির সাথে বাড়ী ফিরে আসতেন। পোষা পানি-খাউরিটা উজান আর ভাটি, দু’পথেই জুনায়েদের আব্বার সঙ্গী হতো নৌকার বিপরীত গোলুইতে বসে। ওর আব্বার স্কুল করার সময়টাতে কোথায় যে ঘুরে বেড়াতো, উড়ে বেড়াতো তা আল্লাহ-মাবুদই জানতেন। আর হয়তো জানতো পানি-খাউরিটি নিজে। হঠাৎ করে একদিন স্কুল শেষে নদীর ঘাটে, নামায় নৌকাটা বাঁধা ছিলো, পাখীটা ছিলো না। জুনায়েদ দাদীর কাছে শুনেছে, তাঁর হাইস্কুলে পড়া ছেলে দীর্ঘ দিন লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে। গোয়ালঘরের ভেতরে, বড়ঘরের পেছনে, উত্তর-ঘরের কারে।

আর জুনায়েদের আব্বার মৃত্যুর পর, তার চেয়েও অনেক বেশী দীর্ঘ সময় ধরে কেঁদেছে জুনায়েদের মা। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সাদা শাড়ী পরে কাটিয়ে দিয়ে গেছেন। ওঁকে বোকা ছাড়া আর কী বা বলবে জুনায়েদ।

জুনায়েদ জানে না, এই যে মাকে বোকা বলছে, কেন বলছে। সম্ভবত এই জগৎ সংসারের ওপর ক্ষোভ। জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো; উত্তরাধিকারের ঋণগুলো গুছিয়ে শোধ করতে পারতো। মানুষের জীবনে, সংসারে কাজ ভাগ করা থাকে। দায় থাকে। দায়িত্ব থাকে। ক্ষোভ হয় নিজ গতিতে বইতে দেয়া জীবন যাপনের জন্য, সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো। নিজের এড়িয়ে যাওয়া অভ্যেসের ওপর রাগ হয়। জীবন এভাবেই চলে যায়, স্রোতধারার মতো।

জুনায়েদের আম্মা ফসল ঘরে ওঠার মরশুমে ওদের গ্রামের বাড়িতে যেতেন প্রায় প্রতি বছরই। ওর আব্বা তখন চলে গেছেন, দাদীও চলে তার কয়েক বছর পরে। যে বছরের কথা জুনায়েদের মনে পড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছে মাত্র, হাতে কাজ নেই, আম্মার সাথে গ্রামের বাড়িতে গেছে। এম.এ শেষ হয়েছে শুনে গ্রাম-সম্পর্কে এক দাদু জুনায়েদকে দেখতে এসেছেন। দাদু মেধাবী মানুষ ছিলেন। ৪৭-এর আগে পাঠশালার তৃতীয় শ্রেনী পর্যন্ত পড়ে ছিলেন। নদীর ঢেউ দেখে বলে দিতে পারতেন, জাল ফেললে মাছ পাওয়া যাবে কি না। তিনি কথায় কথায় জুনায়েদকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলতো ভাই, আকবর বাদশা কত সালে সিংহাসনে বসেছিলেন?’

জুনায়েদ উত্তরটা দিতে পারিনি।

চলে যাবার আগে দাদু বলে গিয়েছিলেন, ‘ভাই, রাজা-নবাবগো খোঁজ খবর রাখ না, তবুও দোয়া করি, আল্লাহ্ যেন তোমার মনের আশা পুরা করেন।’ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন জুনায়েদ যেন এম.এ পাশ করে।

ছোটকাল থেকেই জুনায়েদের কাল্পনিক কিছু বন্ধু ছিলো। লালপুরের নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া বাজারের বটগাছটা যেমন। পানি নীচে মাছ দেখতে পাওয়া সেই যাদুকর দাদু।


দুই.

সকাল গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঢাকা থেকে ভোরে রওনা হয়ে গ্রামের বাড়ীতে পৌঁছে সকালের নাস্তা খাবার বহু নজির আছে। জুনায়েদের মা’র এই বিষয়টা বড়ই প্রিয় ছিলো। বাড়ীর উঠোনে কাঁচা-রোদে বসে নাস্তা খেতে খেতে বছর-বাঁধা কাজের মানুষ খুরশিদকে ডেকে বলতেন, ‘যাও তো ভাই কোষাটা নিয়ে, নদী থেকে ক’টা ঝুরা পুটি-বজুরী ধরে আনো, দুপুরে ভেজে গরম ভাত দিয়ে খাবো।’ অথচ আজ সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ীর যানজটে মরা মাকে নিয়ে পাকা দুই ঘন্টা আটকে রইলো।

দু’টো মাইক্রোবাসে যাচ্ছে ওরা। পেছনের আন্জুমান-ই-মফিদুল ইসলামের এ্যামবুলেন্স-মাইক্রোতে কফিনে শুইয়ে রাখা জুনায়েদের মা, লিলির দুই ছেলে আর রাকায়েতের একমাত্র দাদু-ঘেষা ছেলেটা। সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ীর জ্যেমের একঘেয়েমী কাটানোর কারণে রাকায়েতের বউ হঠাৎ করেই জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাইয়া, ভাবী আর বাচ্চাদের আনলেন না এবার। আম্মাকে শেষ দেখাটা দেখতে পারতো।’

লিলি ঘুরে রাকায়েতের দিকে তাকায়, ভাবীকে থামাবার ইঙ্গিত করে হয়তো।

খুব দায়বদ্ধতায় না পড়লে জুনায়েদের স্ত্রী আর সন্তানরা এদেশে আসেন না। এলেও তাতে ছুটি কাটাতে আসার একটা আমেজ নিয়ে আসে। আর বাঙালীপনার জন্যই হয়তো জুনায়েদ সব সময় মনে হয়েছে, স্ত্রী ছেলেমেয়ের কাছে ও সবসময়ই আউট-সাইডার, সংসারের কেউ না।

‘ভাইজানকে বিরক্ত কোরো না তো। পারলে একটু দোয়া-দরুদ পড়ো।’ রাকায়েতের উষ্ণ কন্ঠটা জুনায়েদ বুঝতে পারে।

‘থাক না রুকু; সম্ভবত এতোক্ষণ দোয়া-দরুদই পড়ছিলো।’ শিউলীকে সবার সামনে করা রাকায়েতের অসম্মানের পরিস্থিতিটাকে সামাল দেবার একটা চেষ্টা করে জুনায়েদ।

শিউলী এমনই। বড়লোক বাবার একমাত্র আহ্লাদী মেয়ে। রাকায়েত রোডস্ এন্ড হাইওয়েজের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ আর উর্দ্ধতন প্রকৌশলী। প্রোমোশন, এই পদে বহাল থাকা, দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার বাইরে বদলি না হওয়া; এ সবই শিউলীর পরিবারের কল্যাণে। ওর বাবা-চাচারা সচিব পর্যায়ের আমলা, যথেষ্ট ক্ষমতাবান। একটু দেমাগ, তাচ্ছিল্যবোধ তো শিউলীর থাকবেই।

‘শিউলী, আম্মার জন্য ওদের সেই টানটা নেই, অযথা টানাটানি করে কীই বা এমন হতো। শুধু শুধু। আম্মার আত্মার অশান্তি হতো।’

শিউলী বলে, ‘তবুও শ্বাশুড়ী তো।’

‘থাক না শিউলী।’ রাকায়েত স্ত্রীকে থামাবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে। ‘তুমি কিছু মনে কোরো না ভাইজান।’

রাকায়েতের বাঁধায় শিউলী আরো জেদী হয়ে ওঠে, ‘ভাইয়া, একটা বাঙ্গালী মেয়েকে বিয়ে করলেই পারতেন।’

‘শিউলী, তুমি কিছু মনে কোরো না। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। আমার মনটা ভালো নেই। পারলে আমাকে মাফ করে দাও।’ রাকায়েতের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে, ‘বেশ গরম লাগছে। আমি আম্মার কাছে গিয়ে বসি।’

রাকায়েত ভীষণ অসহায় হয়ে জুনায়েদের মুখের দিকে তাকায়।

জুনায়েদ গাড়ী থেকে নেমে যায়। জুনায়েদের পেছন পেছন হেনাও নেমে আসে।



তিন.

‘ভাইজান, মনটা খারাপ?’ হেনা খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে।

জুনায়েদ ঘাড় ঘুরিয়ে হেনার দিকে তাকায়। ম্লান করে হাসে। চোখটা ফিরিয়ে নেয়। কিছু বলে না।

এই চরাচরে মানুষের মায়া জন্মায় কারণে অকারণে, বড় অদ্ভুতভাবে। ছুটিছাটায় দেশে গেলে, জুনায়েদের গ্রামের বাড়ী, নদী-গাছগাছালির মায়া, আসতে হয় ওকে। ফিরে ফিরে আসতে হয়।

জুনায়েদের এক বন্ধু আছে, শফিক। স্কুল-জীবনের বন্ধু। ওরা যখন কলেজে পড়ে, সেই সময় ঢাকার নিউ-মার্কেটের ভেতর একটা আইসক্রীম পার্লার ছিলো, ‘নভেলটি’। প্রেমিকাকে আইসক্রীম খাওয়াবে বলে ছয় বছর ধরে একটা একটা করে জমানো ‘বিচিত্রা’গুলো সের দরে বিক্রী করে দিয়েছিলো শফিক। জুনায়েদ তখন দেখেছিলো, কী ভাবে মানুষ কোন অভিযোগ ছাড়া নিজেকে মেরে ফেলে।

সেই শফিক এখন একটু কুঁজো হয়ে হাঁটে। একটি আধা-সরকারী অফিসে কেরানী। গরমে শীতে একটা ফুলহাতা সাদাশার্ট পরে, শার্টটা একসময় সাদা ছিলো। আর মেয়েটা গাইনীর স্পেশালিষ্ট, ইংলেন্ডের বারমিংহামে থাকে।

গতবার ঢাকায় এসে জুনায়েদ দেখেছিলো, শফিক ‘ইউ.বি-৪০’র গান শোনে। জুনায়েদ অবাকই হয়েছিলো, শফিক কেন এই ভিন্নধারার ব্রিটিশ গ্রুপটির গান শোনে। এদের গান জুনায়েদ আগে শুনেছে, অনেক শুনেছে। শফিকের কাছেই প্রথম জানলো গ্রুপটির জন্ম হয়েছিলো ইংলেন্ডের বারমিংহামে।

হেনার ডাকে জুনায়েদ ফিরে আসে শফিকের কাছ থেকে।

হেনা জিজ্ঞেস করে, ‘আব্বা-আম্মা যখন ঢাকায় গেলেন, তুমি কতটুকু ছিলে?’

‘আম্মা বলেছিলো আমি তিন, সাড়ে-তিন বছরের ছিলাম।’

জুনায়েদ বয়স যখন তিন অথবা সাড়ে-তিন বছর, ওদের আব্বা-আম্মা শহরমুখী হন। জুনায়েদ বাদে, ওর ভাইবোনেরা সবাই ঢাকাতে জন্মেছে, শহরে। ঈদে-পার্বণে, ছুটিছাটায় দেশে এসেছে কেবল। কারণে অকারণে তবুও মায়া জন্মে গেছে বাপ-দাদার এই ভিটা-মাটির জন্যে বড় অদ্ভুতভাবে। লালপুর বাজারে ইংরেজ আমলে তৈরী করা একটা কাচারী দালান ছিলো, তখন এই ইমারত ছিলো খাজনা আদায়ের কেন্দ্র এ তল্লাতে। পরে পাকিস্তান আমলে একটা পোষ্ট-অফিস হয়েছিলো। চওড়া দেয়াল, চুন-শুড়কী দিয়ে গাথা। জুনায়েদের তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে। গ্রামে এলে ওর কেবলই মনে হতো রবীন্দ্রনাথের রতন এর আশেপাশেই কোথাও থাকে। মনে মনে ও খুঁজতো রতনকে। ওই চুন-শুড়কী দালানটি নদী ভাঙ্গনে বিলীন এখন।

‘একটু চা দেই ভাইজান? আমি বাসা থেকে তোমার জন্য বানায় আনছি।’

‘নারে থাক। বাড়ী তো এসে গেছি।’

কী রকম যেন একটা মোচড় অনুভূত হয় ভেতরে। এই বোনটা শৈশব-কৈশরে বড্ড আদরের ছিলো। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে সিগারেট খেয়েছে, নিজের পয়সায় কিনে খায়নি। পাই পাই করে পয়সা জমিয়েছে। নিউমার্কেটের ভালো দোকান থেকে পন্ডস্ ক্রীমের কাঁচের বোতলটা কতবার কিনে এনেছে। জুনায়েদ এখনও জানে না, হেনা কার কাছ থেকে পেয়ে ছিলো এই অভ্যাসটা, কার কাছ থেকে শিখেছিলো এই পন্ডস্ ক্রীম মাখাটা। রোজ রাতে শুতে যাবার আগে অনেক যত্ন করে, অনেক সময় নিয়ে মাখতো। ও কি এখনও ক্রীমটা তেমন যত্ন নিয়ে মাখে?

‘দেখতো ভাইজান, আসবার আগে ভাঙ্গা মনটা নিয়ে চা বানাতে কষ্ট হইছে। তবুও করছি। আর এই সারাটা পথ একবারও তোমাকে চা দিবার কথাটা মনে হয় নাই। সব দোষ আম্মার।’ বোধহয় হেনার গলাটা ধরে এসেছে কান্নায়।

জুনায়েদ আবারও ম্লান করে হাসে। নিজের বাম হাতটা নীরবে হেনার ডান হাতের ওপর রাখে। ছোটবোনগুলো আসলে কখনও বড় হয় না।

নিজেকে সামলে নেয় হেনা। বলে, ‘ভাইজান, কদ্দিন পরে লালপুর আসতেছো?’

‘মনে নেই রে।’ এড়িয়ে যায়। কথা বলতে ইচ্ছে হয় না জুনায়েদের।

যে পথটা লালপুর বাজারের হয়ে নূরপুর, শহিদনগর হয়ে তারপর ঢাকা-চট্টগাম হাইওয়েতে পড়েছে, অন্যমুখী সেই পথটা জুনায়েদদের বাড়ী ঘেষে গেছে, গ্রামের মসজিদের পাশ দিয়ে। জুনায়েদদের গ্রামে মসজিদের সাথে, কোণায় একটা টিউবওয়েল ছিলো। টিউবওয়েলটা থেকে একশো হাত দূরে ওর আব্বার কবর। পুরোনো এই টিউবওয়েলটার পানির স্বাদ, বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া প্রাণের মতই, লোহা-মাটির স্বাদ মেশানো। বছর পনেরোর আগের কথা। গ্রামময় রোদে হেঁটে তৃষ্ণা পেয়েছে, জুনায়েদ উপুড় হয়ে আজলা পেতেছে কলের মুখে। অচেনা আট-দশ বছরের একটা ছেলে কলটা চেপে দিচ্ছিলো। একটা অত্যন্ত কোমল আর দূর্বল হাতের স্পর্শ জুনায়েদের পিঠে। আজলার পানিটা ছেড়ে দিয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখেছিলো, চোখে ছানি পড়া, কুঁজো এক বুড়ী বলছে, “কোন বাড়ীর আপনে বাবা?”

মানুষ মোহের ভেতর মাতাল থাকে। তাই এতো পিপাসা থাকে।

জুনায়েদকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে হেনা, ‘কী ভাবো ভাইজান?’

জুনায়েদ হেসে বলে, ‘তোর কথা।’

হেনা ভাইবোনদের মধ্যে সব থেকে ছোট। জুনায়েদরা তিন ভাই আর দুই বোন। জুনায়েদ সবার বড়। ওর পরেই লিলি। লিলির পর রাকায়েত আর এনায়েত।

এনায়েত পেশায় ডাক্তার। বার্ডেম হাসপাতালের সাথে আছে বহু বছর ধরে। ও ভালো আছে। বছরে দু’চারবার বিভিন্ন সেমিনার, কনফারেন্সে দেশের বাইরে যাওয়া পড়ে। এনায়েত দেশের বাইরে গেলে, সর্বদাই আম্মার মনটা কাঁচা হয়ে থাকতো। ছোট ছেলে তো। জুনায়েদ আম্মার এই মনের গোপন কুঠরির দূর্বল বৃত্তান্তটা জানতো। এনায়েত যে ক’টা দিন দেশের বাইরে থাকতো, জুনায়েদ প্রতিদিন ঢাকায় একবার করে আম্মাকে ফোন করতো। এখন থেকে এনায়েত দেশের বাইরে গেলে জুনায়েদকে এই কারণহীন দ্বায়িত্বটা পালন করতে হবে না। আরও একটা বাঁধনের সুতা ছিঁড়ে যাবে। এভাবেই অগনিত মানুষের মাঝে একজন স্বতন্ত্র মানুষ আস্তে আস্তে একা হয়ে যায়, পৃথিবীর সাথে তার দায় চুকিয়ে ফেলে। যেমনটা ফেললেন আম্মা।

জুনায়েদের দাদী যতদিন বেঁচে ছিলেন, ওদের গ্রামের বাড়ীর বিশাল এক উঠোন ছিলো। চারদিকে চারটা ঘর। চারকোণ জুড়ে গোয়াল-ঘর, খড়ের-পালা, রান্নাঘর, সুপারী-নারিকেলের গাছ, লাউয়ের মাচা। বাড়ীতে ধান উঠলে, সিদ্ধ করে সমস্ত উঠোন জুড়ে শুকাতে দিতো। জুতা-সেন্ডেল পরে হাঁটা যেতো না ধানের উপর। বড়ঘরের দাওয়ায় দাদী বসে থাকতেন মোড়ায়, দিনভর, পায়ের কাছে রাখা থাকতো ছিপ, কাক-পাখি তাড়াতেন। জুনায়েদদের বাড়ীর সেই উঠোন নেই, তার কিছুটা গেছে নদী ভাঙ্গনে, কিছুটা বন্টনে।


চার.

এখনও এমন, শৈশবেও তাই ছিলো। জুনায়েদের তো মনেই আছে, তখন নারায়ণগঞ্জ ঘাট থেকে একটা লঞ্চ ছেড়ে যেতো, দাউদকান্দি হয়ে কুমিল্লার মুরাদনগরের জাহাপুর পর্যন্ত। অপরদিক থেকেও একটা লঞ্চ ছেড়ে আসতো। লঞ্চ দু’টির নাম ছিলো ‘এম এল হেজাজ’ আর ‘এম এল ফিরোজা’। লঞ্চটা জুনায়েদদের গ্রামের বাজারের ঘাটে ভিড়তো। এই নদী পথের সার্ভিসটা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে, এখন আর নেই।

দেশ স্বাধীন হবার পরের কথা, ৭৩ সালের শুরুর দিকে। জুনায়েদ মেট্রিক পরীক্ষা দেবে। ওর আব্বা মারা গেছে বছর খানেক আগে। সেইবারই প্রথমবারের মতো আব্বা-আম্মাহীন যাচ্ছে গ্রামের বাড়ীতে, ওর আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো। নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ ছেড়েছে, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। উপরতলায় কেবিন একটা হিন্দু পরিবার যাচ্ছিলেন। সৌখিন পরিবার ছিলো, ক্যাসেট-প্লেয়ারে লতা মঙ্গেশকরের “নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায়” গানটা বাজছিলো। ঐ পরিবারে একটা জুনায়েদের বয়সী মেয়ে ছিলো। মেয়েটাকে মনে ধরেছিলো ভীষণ। ........ “কোন অপরূপ অরূপ রূপেরও রাগে .........” ওর মনে আছে ওইদিন মেয়েটা হলুদ রঙের ওপর গোলাপী রঙের ফুলপ্রিন্টের ফ্রক পরা ছিলো।

জুনায়েদ ভেতরে ভেতরে বিচলিত হতে থাকে। যতো দিন যাবে, ও জানে, ততোই ওকে স্নেহ করার মানুষ কমবে। আর ও একলা বাঁচবে পৃথিবীতে। একলা একলাই চলে যাবে ওর আম্মার মতো।

লালপুরের বাজারে জুনায়েদের বড়চাচার একটা বেশ বড়সড় মুদির দোকান ছিলো। বড়চাচা বেশী দিন দোকানটা ধরে রাখতে পারেননি। লাটে উঠেছিলো। অনেক পরে, বড় হয়ে বাড়ীর মানুষজনের কাছে জেনেছে, ওর দাদীর সন্তানদের মাঝে বড়চাচা ছিলেন অকর্মন্য, নিজের চেষ্টায় কিছু করতে না-পারা মানুষ। ওই ইংরেজীতে যাকে বলে ব্ল্যাক-সীপ অব দ্যা ফ্যামিলি। জুনায়েদের দাদী ওর বড়চাচাকে দোকানটা করে দিয়েছিলেন। জুনায়েদ যখন জন্মেছিলো, বেলা একটু বাড়লে বড়চাচা বাড়ীতে এসে জুনায়েদকে দোকানে নিয়ে যেতো। দোকানদারী করবে কী, ওকে কোলে নিয়ে বসে থাকতো। কাঁদলে বোতলে ভরা দুধ দিতো। ময়লা করা কাঁথা বদলে দিতেন নিজের হাতে। ফুপু-চাচীরা বলতেন জুনায়েদ নাকি বড়চাচার মতো হয়েছে। কি জানি হবে হয়তো। পুরোনো একটা বটগাছের ছায়ায় বড়চাচার দোকানটা ছিলো তো। সেই বটগাছের মায়াটা কি করে যেন জুনায়েদ পেয়েছে।


পাঁচ.

বিকেল প্রায়। আলো আছে আকাশে। ওদের আম্মাকে কবর দেয়া হয়েছে অনেকক্ষণ। সবাই ক্লান্ত, গা-হাত-পা ধুয়ে বিশ্রাম করছে ঘরে।

ঈদুল ফিতরে এক ধরনের সেমাই রান্না হতো, জুনায়েদের শৈশব-কৈশরে দেখেছে। সেই সেমাই সারা রোজার মাস ধরে তৈরী হতো। রোজার সময় দিনের বেলায় বাড়ীর মেয়েদের রান্নার ঝামেলা থাকতো না। মিহিন, ছোট ছোট হতো সেই সেমাই, একটা একটা করে বানাতেন। দেখতে ছিলো ঢেকী ছাটা চালের মতো। ময়দার তৈরী, বানানোর পর রোদে শুকোনো হতো। আম্মা সেমাইটার নাম বলতেন, ‘জয়দানা’। জুনায়েদদের বাড়ীতে ঈদের দিনের একটা নিত্য উপকরণ ছিলো ‘জয়দানা’।

বসার ঘর থেকে চুপে চুপে জুনায়েদ বেরিয়ে আসে। মসজিদের পেছনের পারিবারিক কবরস্থানের দেয়াল ধরে দাঁড়ায়। ওখানে ও একেবারেই একা। আব্বার কবরের পাশে আম্মা শুয়ে আছেন। দক্ষিণের বাতাস বইছে। ধানক্ষেতের ওপর সবুজ ঢেউ। আব্বা যেন জুনায়েদের কানে কানে বলছেন, এভাবেই থেকো। তাড়াহুড়োর দরকারটা কি? কিই বা প্রয়োজন? কাউকে কোথাও পৌঁছুতে হয় না। কেউ পৌঁছোয় না কোথাও। ভ্রমনটাই সব, ভ্রমনটাই সুন্দর। গন্তব্যে পৌঁছে কেউ কিছু পায় না। গন্তব্যে কিছু নেই।

জুনায়েদ বিড়বিড় করে বলে ‘আম্মা, আমি পরে এসে তোমার সাথে কথা বলে যাবো, কাউকে না জানিয়ে আসবো তখন। আম্মা, এখন আমি যাই।’


ছয়.

বাজারে এসে দেখে তিনটে অটোরিক্সা বসে আছে। একজনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে নামিয়ে দিতে পারবে?’

বাজারের মাঝখানের ছোট বটগাছটার ছায়ায় বসে এক বৃদ্ধ ভিক্ষা চাইছে গান গেয়ে গেয়ে। লোকটা সম্ভবত অন্ধ। সেজন্যই হয়তো বিকেল বেলায়, আলো আছে আকাশে, তবুও এমন নিঃচিন্তে গাইতে পারছে জোৎস্না রাতের গান,

“সে আমারে ঠারে ঠারে ইসারায় কয়

এই চান্দের রাইতে তোমার হইছে গো সময়।”

রচনাকাল ২০১৪, সিডনি।






লেখক পরিচিতি
সরকার কবিরউদ্দিন


জন্ম সাল: ১৯৬০
জন্মস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ

বর্তমান আবাসস্থল: সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

কোন কোন শাখায় লিখি: গল্প








কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন