বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

শ্রাবণী দাশগুপ্ত. সমান্তরাল



মানুষটির স্বর আর ক্ষয়ে যাওয়া বাড়িটার গায়ে লেগে-থাকা রোদ্দুরের তিনটে টুকরো ভরে নিয়ে ফিরছে মধুরিমা অভিজিৎ আর শিবেন্দ্র। জানালায় মাথা ঠেকিয়ে পা মুড়ে চোখ বুজে আছে মধুরিমা। সীটের নিচে ওর গোদা স্নিকার্সজোড়া। চোখ বুজে ‘ওটা জাস্ট সাধারণ ব্যাপার... অত নরম হলে চলে না... ঝামেলায় ফাঁসতে কে আর... তাছাড়া অল্টারনেটিভই বা কি ছিল?’
ভেবে যুক্তি খাড়া করে চলেছে, - ‘যা হয়েছে ঠিক একদম!’ কিন্তু পারল কোথায় তারা! আসলে চরম হেরে গেল না? ধ্বসে গেল না? অনবরত মগজ ঝেড়ে এগুলো বের করে দেবার চেষ্টা করছে, তাই চোখ খুলছে না। শিবেন নিঃশব্দে একধারে বসে মোবাইলে খুচখাচ। অভিজিৎ কয়েকবার সরে এসে “রিমি এদিকে একবার শোন্‌ প্লিজ...” বলে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিল, লাভ হয়নি। রিমা চশমার মধ্যে থেকে স্বভাবসিদ্ধ তাকিয়েছিল মিনিটখানেক। ওই তাকিয়ে থাকা দেখে চারবছর আগে উন্মত্ত প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিল অভি, ইদানিং খামোকা লাব-ডুব থেমে রক্ত জমাট বেঁধে যায়।

দুদিন আগে অফিস-ফেরৎ রাতের ট্রেনের মাঝের বার্থে ব্রাউন-পেপারের প্যাকেট খুলে, সাদা বিছানা পেতেছিল অভিজিৎ। বিরক্তি ওগড়াচ্ছিল, “দূর্‌, তোর পাল্লায় পড়ে – ধম্মোস্থান... তীত্থ... পুজোফুজো। চাপরামারি যেতাম... বা এ্যাট লিস্ট শঙ্করপুর...।” শিবেন চাদর টেনে আপার বার্থে শুয়ে পড়েছিল। শুনছিল, তর্ক করছিল না, আসলে পারেনা বলেই। যাওয়ার প্রস্তাবটা সে-ই উঠিয়েছিল। মায়ের একটা কী যেন মানত, বাকিটা উইক-এণ্ড কাটানো। অভিজিতের মুখোমুখি মিড্‌ল বার্থে মধুরিমা। ওর খারাপ লাগছিল শিবেনের জন্যে। নিমপাতা গলায় বলেছিল, “হ্যালো অভি, বোকাবোকা কথা না বলে পারো না, না? শিবদা’ কি আমাদের জোর করেছিল নাকি? তুমি রাজি না হলেই পারতে!” অভিজিৎ যুৎসই জবাব খুঁজছিল। শিবেন জানে, ক্ষেপলে অভির মুখ কী ভয়ানক বিচ্ছিরি। রাতও যথেষ্ট, ট্রেনের বাকি লোকজন মোটামুটি নিঃশব্দ। তাড়াতাড়ি বলল, “আরে ছাড়্‌ তো ঠিক আছে। দেড়দিনের মামলা, কেটে যাবে। ঘুম লাগা। ভোর চারটেয় নামা কিন্তু।”


কাকভোরে নেমে, সে সময়ে ভালো অন্ধকার তখন, কলকাতার তুলনায় ঠাণ্ডাও বেশি। সম্ভবত বৃষ্টি হয়েছিল রাত্তিরে, ঘন কুয়াশা হতে পারে। ভারী ভারী থমথমে ঝুলে-পড়া আকাশ। স্কার্ফটা ভালো করে কানে-মাথায় প্যাঁচাল রিমা - সর্দির ধাত। পুলওভারের কলার তুলে নিল। দুই হাতের পাতা রগড়ে ঢোকাল পকেটে, “ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে ওয়েদার, ঈস জঘন্য। সকাল হবে কখন?” ওদের বাতানুকূল জানালার বাইরে জলের কণা। অভিজিৎ নাকি কোন্‌ প্রাগৈতিহাসিক যুগে এসেছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে। কিচ্ছু না, স্মৃতি নেই একফোঁটা। স্টেশন থেকে অটো ধরে হোটেলের বিছানায় দুজনে দুপাশ ফিরে সটান ঘুম, ভাঙলো সাড়ে সাতটায়। দরজায় ঠুকঠুক টোকা মারছিল শিবেন। বাথরুম থেকে বেরিয়ে অভিজিৎ বলল, “কী ঠান্ডা জল রে শালা! হাগু করে... আরে গিজারটা মনে হয় ঠিক কাজ করছে না। রিসেপশনে ঝাড় দেব।” আরও আধঘন্টা পরে পায়ে পায়ে ঘড়ি-মিনারের কাছে। ঘড়ি মিনারের নিচে বিক্কিরি করতে বসেছে - আনাজপাতি, শেকড়বাকড়। ওটা তেমাথার মোড়। কফ-থুতু, খুচরো উড়ো, থিতু ময়লায় প্রচন্ড নোংরা আর গ্যাঞ্জাম। অটো-টাঙ্গা-রিক্সা স্ট্যান্ড। একদিকের রাস্তা ধরে এগোলে মন্দির। চলতে চলতে শিবেন আড়চোখে মাপছিল ওদের – বিরক্ত কতটা বুঝতে চাইছিল। রিমা আর অভিজিৎ বিয়ে করেছে বছরখানেক। একই অফিসে তিনজন। আইসক্রিম-রঙ বৃষ্টি-ধোয়া শিরশিরে রোদ নরম হয়ে ছড়িয়েছে। সুন্দর দেখাচ্ছে আকাশটা।

অবাক হল, চমকাল শিবেন, রিমা শাড়িতে – খাদির হাল্কা হলুদ সিল্ক, গাঢ় খয়েরি পাড়। খুব অন্যরকম দেখাচ্ছে। হাইলাইটেড এবড়োখেবড়ো ভিজে চুল লেপ্টে আছে কপালে ঘাড়ে গালে। মিষ্টি গন্ধ। শিবেন ওর মাকে কিনে দিয়েছিল এই ধরনের শাড়ি। সে বেশ বোঝে-টোঝে। অভিজিৎ খেয়াল করেনা, মাথা ঘামায় না। নাক-গলানো রিমা পছন্দ করে না, শিবেনকে বলেওছিল একবার। জায়গাটা চাই, নিজের ইচ্ছেটা খুব জরুরি ওর কাছে। মেয়েটা খেয়ালী। অফিসের বাইরে গ্রুপ থিয়েটারে স্ক্রিপ্ট লেখে। অভিনয়ও করেছে কয়েকবার।

“খেয়েদেয়ে মন্দিরে গেলে পাপ হবে নাকি রে শিবেন? পেটে কিন্তু মেঘ ডাকছে...” আপাতত তবে মেজাজ ভালো আছে বাদশার। শিবেন স্বস্তি নিয়ে হাসল। ফুটপাথে চালু ছোটো দোকান, কচুরি তরকারি জিলিপিভাজার তেল গন্ধ। অভিজিৎ ঢুকে পড়ে চেয়ার টেনেটুনে, ফুঁ দিয়ে ঝেড়ে, কাগজ দিয়ে মুছে গুছিয়ে ডাকছিল, “কিরে আয়!” শিবেন ঢুকবে কি ঢুকবে না দোনামনায় – কি আর হবে? মাকে না বললে ঝামেলি খতম। তাছাড়া খিদে চাগাড় দিয়ে উঠছে। তার নামে মায়ের মানত, সুতরাং দোষ বা পাপ যা, তারই হোক। “কি হলো আয় না -,” আবার ডাকল অভিজিৎ। শিবেন ঢুকে বসল। অর্ডার দিয়ে ফেলেছে অভিজিৎ আগেই। দোকানের বাইরে ময়লা বাঁচিয়ে ছোটো সিঁড়ির ধাপিতে পা রেখে মধুরিমা, শ্যামলা পাতলা মেয়েটা শাড়ির কুঁচি তুলে ধরে দাঁড়িয়েছিল। চৌকোণো ফ্রেমের কাঁচের মধ্যে চকচক করছিল কাঁচা কাজল-পরা চোখ।

“খেয়েদেয়ে মন্দিরে ঢুকব?” ঠোঁটের কোণ কুঁচকেছিল। অভিজিৎ গরম কচুরি ভাঙছিল, ফুঁ দিচ্ছিল। তাকিয়ে থমকে গেল। শিবেন নির্লিপ্ত ভান করে দেখছিল। নবদম্পতি হলেও একটা আপোষ আছে, একটা কষকষ বোঝাপড়া, নজর করলে বোঝা যায়। রিমা সহজ মেয়ে নয়, শানানো। অভিজিৎ আমল না দেওয়া গলায় বলল, “এই উঠে আয় তো। মাংস খাচ্ছি নাকি? এত ভক্তি বাড়িতে দেখিনা! শাড়িটা ঝাড়লি কোত্থেকে?”

“কেন, আমারই। মা দিয়েছিল।”

“অ, রিসেপশনের পরে এই প্রথমবার দেখছি।”

মধুরিমা জবাব দিতে গিয়ে শিবেনের দিকে তাকাল। শিবেন অন্যমনষ্কমুখে দাড়ি চুলকোচ্ছিল। তেত্রিশ পেরোলেও কিশোর-কিশোর মুখ। কূটকচালি তর্ক চলছিল মগজে। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল, “তোরা খা, বুঝলি? আমি পুজোটা দিয়েই আসি।” অভিজিৎ এঁটো হাতে হ্যাঁচকা টান মেরে বসিয়ে দিল, “ক্ষেপলি কেন? বোস তো।” বিনা বাক্যে শিবেন বসল, কচুরি ভাঙল, আলুর ঝোল তরকারি দিয়ে মেখে মুখে পুরল। রিমা পুরো এপিসোডখানা দেখল, আলগোছে জল খেল গেলাস থেকে। বলল, “পারও।” অভিজিৎ টপটপ রস ফেলে জিলিপিতে কামড় দিচ্ছিল। বাইরে বেরিয়ে নোংরার পাশে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পুঁচকি ভাঁড়ে মালাই চা।


বিশেষ তিথি-টিথি ছিল না বলে মন্দিরের রাস্তায় ভীড় তুলনামূলক কম। ডালা হাতে ভক্তিমুখে লাইনে দাঁড়াল, সঙ্গে দেহাতি পাণ্ডা। পুজোর পরে ওদের কপাল ভরে মেটেরঙের সিঁদুরের টিকা। মজা লাগছিল রিমার, হাসি পাচ্ছিল... মা বা অভির মা এখন দেখলে হত! অভিজিৎ এবারে ক্যামেরাটা আনেনি ইচ্ছে করে। ওর ক্যামেরা দামী জায়গায় ছবি তুলে অভ্যস্ত। ফিরতি রাস্তায় রিমা দোকান থেকে দুডজন হলুদ-খয়েরি মিলিয়ে কাঁচের চুড়ি হাতে ঢোকাল – রোগা হাত, ছোটোহাতা ব্লাউজে কাঠিকাঠি। দেহাত থেকে পুজো দিতে আসা লোকজন ড্যাবড্যাব করে দেখছিল। শিবেন ইয়ার্কি মারল, “কিরে, জিনস্‌গুলো ফিরে গিয়ে সোজা ওয়েলেক্স-এ?” রিমা শুনল, বা ইচ্ছে করে শুনল না। গিজগিজে দোকান সরু রাস্তার দুপাশে, ফুল-বেলপাতা, ভক্তির গন্ধে মাথাটাথা ভারী। হাতে প্যাঁড়ার বাক্স। রিমার শাড়ি উঠে প্রায় হাঁটুর কাছে, বলল, “কালীঘাটের মন্দিরের সামনেটাও এর’ম। তাওতো এখানে পা ফেলতে পারছি।” অভিজিৎ ব্যস্ত হয়ে বলল, “ওঃ এ্যাই শিবেন... এবার পা চালিয়ে বেরো এখান থেকে - হল তো।”

ঘড়িমিনারের সামনে টাংগা অনেকগুলো। শান্তশিষ্ট টাংগাওয়ালা খুঁজে বের করেছে শিবেন, নাম রসুল। নিজে লাফ দিয়ে উঠে বসল সামনে, পেছনে পাশাপাশি অভি আর রিমা। শাড়ি পরেছে বলে সত্যি অসুবিধে, একেবারে অভ্যেস নেই। তা সত্বেও ওর ম্যানেজ করাটা অবাক করছিল বাকি দুজনকে। শিবেন টাংগাওয়ালার সাথে হিংলায় অনবরত বকরবকর – অবশ্য রসুল নামে লোকটা পাল্লা দেওয়ার মতো বক্তিয়ার না। দুএকটা “হাঁ... নহীঁ’... ব্যাস। রিমা আচমকা এড্রিনালিনের প্রকোপে দুহাতে জাপটে ধরল অভিজিতকে, গলা নামিয়ে বলেছিল, “অ-সাম অভি... দারুণ ট্রিপ! এই ফার্স্ট এন লাস্ট টাইম টাংগা-রাইড। আর কি তুমি আসবে নাকি? হোটেলে যা সব বল্‌-” গিলে ফেলল সবটা, শুধু শিবেন কষ্ট পেতে পারে ভেবে। শিবেনের শুনতে পেল। ভাবছিল, রিমার ভেতরের মায়া আর সহানুভূতির লুকনো খোপটা, অসময়ে কর্ণিয়ায় ভেসে উঠে ধরা পড়ে যায় রুক্ষ মেয়েটা।

টুকটাক কথা বলছিল রিমা অভির সাথে। প্রেমালাপ না, তেমন কিছুই বিশেষ না। কানে আসছিল শিবেনের। ওদের সম্পর্কের মধ্যে প্রেমটা মাপামাপা, চৌখস, চাঁছাছোলা। প্রেমের মধ্যে খানিকটা ন্যাকামোর আঠা না থাকলে ওরকম আলগা ঝুরঝুরে হবেই– এগুলো শিবেনের একান্ত বিশ্লেষণ। তার সম্বন্ধ দেখা চলছে। রিমার মতো বৌ বাড়িতে অচল, শিবেনের নিজেরও চলবে না। বন্ধু বা সহকর্মী, বন্ধুপত্নী পর্‍যন্তই। অলিগলিচলি পথ বৌ বুঝে ফেলবে, মতামত দেবে – ইম্পসিব্‌ল্‌! শিবেন চুপ অতঃপর, মাথা এদিক ওদিকে – জায়গাটা আগে দেখা নেই, বেশ লাগছে। লাইব্রেরির দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহের বিভাগে ঢুকে পড়লে মাথা ঝিমঝিম করে ভালো লাগায়, সেরকম। তার প্রচুর বই-পড়া অভ্যেস। একবার বলল, “রসুলভাই, আচ্ছাসে ঘুমাকে সব দেখা দেনা হ্যায়।” অভিজিৎ মুখ ফিরিয়ে ভেঙাল, “দেখা দেনা হ্যায়... দেখাবেটা কি? আরে, ওই তো জঞ্জাল, ভাঙাবাড়ি, মন্দির, ধাম, আশ্রম! ছাল-ছাড়ানো জায়গা – ফালতু ভ্যাজাচ্ছিস কেন?” শিবেন কোনও জবাব দিল না।

বাতাসে রিমার শাড়ির আঁচল উড়ে উড়ে যাচ্ছে - একবার শিবেনকে, একবার অভিকে ছুঁয়ে। ঘুড়ীটার নাম সাহিবা। রসুলের গলা থেকে বিশেষ আওয়াজ, মাঝে মাঝে ছপটি তুলে দুএক ঘা লাগিয়ে দিচ্ছে। ভালোবাসে তো ঘোড়াটাকে? রিমা ভাবছিল। ঘোড়া পোষার খরচাও আছে যথেষ্ট। তার নিজের স্পেনিয়াল কুকুর আছে, গোলু। খুব আদুরে। রিমা আনমনা হয়ে পড়ছিল। শেষ দুপুরে টাংগাওয়ালা কি একটা মন্দির দেখাবে বলে নিয়ে চলেছে, হোটেলের সাইট-সীয়িং-এর কাগজে নাম লেখা। দেখে হোটেলে ফেরা, কাল আর বাকি যা থাকবে। ঘোড়ার চালে আর খুরের শব্দে চমৎকার দোলন আছে। দুলতে দুলতে দিব্যি ভাবা যায় অনেক হাবিজাবি। সড়ক পাকা, ভীড় নেই। একআধটা অটো বা স্কুটার অনেক পরে পরে। দুধারে পাঁচিল, জঙ্গলের মধ্যে উঁকি দেওয়া পরিত্যক্ত হাভেলি। অজানা জায়গা। কি দেখার আছে? ঠিকঠাক যাচ্ছে তো? কোনও বাজে মতলব কি লোকটার? ভাবছে তিন মহানগরের বাসিন্দা, ভয়ের মতো দুর্বল অনুভূতিতে মধুরিমা ঠাণ্ডা হাত বাড়িয়ে অভিজিতের কড়া হাতটা ধরল।


প্রায় জঙ্গলে-ঘেরা একটা খাঁখাঁ জায়গায় গেটের সামনে টাংগা থামাল রসুল, ঘাম মুছল গামছায়, “জাইয়ে, গেট কে অন্দর জাইয়ে।” চমৎকার বিকেল একখানা। রোদ্দুর চিকচিক করছে ডিজাইনার শাড়ির কুঁচিতে লাগান সিক্যুয়িনের মতো। অভিজিৎ আগে নেমেছিল, সাহায্য করল মধুরিমাকে। চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে মুখ ভেটকে বলল, “দ্র-ষ্ট-ব্য স্থান... নে শালা এই খাজা জায়গায় দ্যাখা কী দেখার আছে?” শিবেন থমকে গেছে, মিনমিন করল, “আচ্ছা, ভেতরে চল্‌ না – গেলে বোঝা যাবে... বেশ বড়ো মন্দির-টন্দির ভেবেছিলাম! মাহাত্ম্য আছে – হয়তো।” “মারব ঘাড়ে দুই রদ্দা... খুন হয়ে গেলে কেউ...” গরগর করছিল অভি। শিবেনের মুঠো শক্ত হচ্ছিল। দাঁত কষে বলল, “তুই কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছিস সেই থেকে।” মধুরিমা নীরবে দুজনকে দেখল, কোনও মন্তব্য না করে শাড়ির কুঁচি সামান্য তুলে নাচের মতো করে এগোতে লাগল। গেট খোলা। শুকনো ঘাস, ঝরা পাতা, সুড়কি, খোয়াভরা ছড়ানো জমির বিস্তার। অভিজাত বড়ো দোতলা বাড়িটার রঙ জ্বলে পোড়া পোড়া। ভেঙে পড়েছে রেলিং দুএকটা অংশ। প্লাস্টার চটে যাওয়া শেওলায়, কালো দেওয়ালে, খিলানে, বারান্দার রেলিং-এ উষ্কোখুষ্কো ঘাসের বনসজ্জা। রিমা হাঁ-করে দাঁড়িয়েছিল। সাইনবোর্ড - “শ্রীশ্রী ঠাকুর এখানে বসবাস করেছিলেন।” যে সাল লেখা আছে, হিসেবমতো দেড়শ বছর পেরিয়ে গেছে। সাবধানে পা ফেলে এগোল সে। সরু শিখরের ছোটো সাদা মন্দির। ছোটো ফুলবাগান। দর্শনীয় কিছু নয়। খাড়া সিঁড়ির কয়েক ধাপ উঠে দাঁড়াল, “কি, তোমাদের ফাইট সিকোয়েন্স শেষ হয় নি? আসবে কি আসবে না?” অভিজিৎ এগিয়ে এসে হাত ছুঁড়ে দেখাল, “ওই দ্যাখ্‌ আরও দুটো ধ্বসা মন্দির। কিসের মন্দির? এদেরই?” শিবেন পেছনে আসছিল, উত্তর দিল না। চাপা অসন্তোষ কুটকুট করছিল তখনও। ভাবছিল, রিমার মতো মেয়ে প্রেমে পড়ল কি করে? হয়তো রিমাও তার আর অভিজিতের সম্পর্কে একইরকম ভাবে! অভিজিৎ অত্যধিক উগ্র। তেড়িয়া হয়ে কথা বলে, তারপর ভুলেটুলে স্বাভাবিক হয়ে যায়। শিবেন এগোচ্ছিল, অভিজিৎ আটকাল, “আরে দ্যাখ্‌ ওধারটায় জমি কতোখানি... পেলে গুরু, সুইমিং-পুল, দুচারটে শপ্‌সমেত লাক্সুরিয়াস হাউজিং কম্‌প্লেক্স...। দেখেছিস অবস্থা? কোনও মেনটেনেন্স আছে?” শিবেন ঝগড়া ভুলে গিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে তাকাল। অভিজিতের চোখের তারাদুটো অদ্ভুতভাবে নাচছে। চোয়াল শক্ত, ঠোঁট বেঁকে ক্রমশঃ অচেনা হয়ে উঠছে চেহারা। আগে লক্ষ্য করেনি। নাগরিকতা কি আসলে এরকম, এই পরিবেশে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে সেটা? অস্বস্তি এড়াতে শিবেন আর না তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে হনহন করে এগোচ্ছিল। উলটোদিক থেকে মধ্যবয়সিনী, শুকনো চেহারা। খুব তাড়াহুড়োয়। বললেন, “খুঁজছেন না কি কাউকে? মন্দির দেখতে এসেছেন? যান না, জ্যাঠামোশাই বোধায় আছেন এখনও।”


ছোট সিংহাসনের ওপরে অষ্টধাতুর মাতৃমূর্তি। চন্দন ফুল ধূপের সম্মোহক গন্ধ ভাসছে। রিমা কেন আর কখন যে শাড়ি জড়িয়ে নিয়েছে গায়ে, ও নিজেও জানে না। কপালে চন্দনের টিপ দিচ্ছিলেন মানুষটি। লম্বা, ভারী চেহারা, কালো ছোপ-পড়া। হাফহাতা ফতুয়া, ধুতির খুঁট গলায়। ঠাকুমার পাল্লায় পড়ে সাদাকালো বাংলা সিনেমা দুএকটা দেখেছে রিমা, সেরকম। ফুলোফুলো হাতের পাতা, আঙুল। তার সতর্ক চোখ বলছিল মানুষটি অসুস্থ, বা শুধু বয়সের ভারেই হয়তো। অভিজিৎ আর শিবেন দরজায় দাঁড়িয়েছিল। বয়ষ্ক বলেই একেবারে অচেনা একজনকে অকারণে সম্ভ্রম দেখানো সম্ভব নয়। এমনকি কোনও সম্ভাষণও করল না। উনি একমুঠো নকুলদানা তিনজনকে ভাগ করে দিয়ে বললেন, “মায়ের প্রসাদ।” হঠাৎ বের হয়ে এসে দাঁড়ালেন সামনের ছোটো চাতালটুকুতে। দুটি লোক দৌড়ে চলে যাচ্ছিল গেটের দিকে। উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “আবার এসেছিল ওরা! এতবার বারণ করা সত্বেও, কিছুতেই শুনবে না।” রিমা অবাক হল, আস্তে করে বলল, “কে ওরা দাদু?” উনি কানের পাশের হাতের পাতাটা রেখে বললেন, “কিছু বলছেন মা?”

“ওরা কারা, ওই যারা দৌড়ে গেল?” শিবেন খেয়াল করছিল ওঁর ভয়মেশান অস্থিরতা। কানে যন্ত্রটন্ত্র নেই, - শুনতে পান না ভালো। চোখদুটিতে জ্যোতি কমে মরা আলো, তাকালেই বোঝা যায়। বললেন, “ওই যে গেল – রাতদিন – রাতদিন - যখন তখন বিরক্ত করে এসে। ভয় দেখায় - ভয় দেখায় খালি... আমি যতদিন... কতদিন আর? সাতাশি পেরিয়ে গেছে।” গলার মধ্যে ঘড়ঘড়ে কফ, একটু কেশে গলা পরিষ্কার করলেন, “হামলা করে। বলে, জমি বেচে দাও – মন্দির থাকুক একপাশে। ওরা একটা ছোট বাড়ি বানিয়ে দেবে আমার আর মানুর থাকার জন্যে।” অভিজিৎ আলগোছে বলে ফেলল, “মন্দ কি? যথেষ্ট ভালো প্রস্তাব। নিশ্চিন্ত...।” শিবেন ছোটো চিমটি কাটল ওর হাতে, “প্লি-জ”। ভাগ্যিস শুনতে পান নি। আপন মনে বলতে থাকেন, “লোভ বাবা, লোভ। লোকাল গুণ্ডা ধরে নিয়ে আসে দুই মাড়োয়ারি-ভাই। আমি কি করে, কতদিন আটকাব জানি না।”

“কিন্তু এত জমি রেখে আপনি কি করবেন দাদু? দেখাশোনা করতেও কষ্ট... কেউ নেই যখন এখানে...।” এমন করে কথাগুলো বলল রিমা, উনি শান্ত হয়ে হাসলেন। নিতান্ত অজ্ঞ কাউকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন, “তা কি হয়? এই সব দেবোত্তর সম্পত্তি – আমি খালি রক্ষণাবেক্ষণ করছি। যার তার কাছে বেচে দেওয়ার অধিকার নেই মা। আমি দেবসেবার অধিকারটুকু নিয়ে বেঁচে আছি।। অবশ্য যতদিন চোখ খোলা আছে, ততদিনই।” ওঁর হাতটা ধরে রেখেছে রিমা, অজান্তেই কখন। ছোঁওয়াতে সঞ্চারিত শীতল আরাম কান-ঘাড়-পিঠ বেয়ে মৃদু স্রোতে নামছে। পায়ের পাতা ফোলা। থুপথুপ করে নামছেন ধীরে ধীরে। শিবেন পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করছিল মন দিয়ে। রিমা জানতে চাইল, “দেবোত্তর কাকে বলে?” উনি খুব নরম স্নিগ্ধ চোখে হাসলেন, “জীবনে অন্যায় করিনি মা। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা – সে ভারী শক্ত, সাহস নেই, ছিলও না। শ্রীশ্রীঠাকুরের মাতুলবংশের আমি। পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ। আমি সামান্য সেবাইত। আর এই জমি দানের জমি – দেবতাকে দান করে পুণ্যি করেছিল এক ধনী মানুষ। দেবতার জমি আমি বেচে দেওয়ার কে? পরকালে কি জবাব দেব বলুন দেখি!” রিমার যাপনে এমন অভিজ্ঞতা নেই, শোনেও নি কখনও। কিছু বলার খুঁজে পায় না, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে যায়।


অভিজিৎ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দিনদশের ফরেন ট্রিপ হয়েছিল অফিসের দৌলতে। কাকার সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রমোটারি ব্যবসার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। শিবেনের কাছে পেড়েছিল কথাটা – পার্টনারশিপ। শিবেন কমার্সের, কমার্শিয়াল ল’ করেছে। অভিজিৎ ধারালো চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছিল রিমাকে। রিমাও চোখে চোখ ফেলে তাকিয়ে। ওকে কিছুতেই অতিক্রম করতে পারে না অভিজিৎ। খুব আলগোছে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। রোগা কালো হাতে ঢলঢলে কাঁচের চুড়ি, কালো নেইলপলিশ, সারাদিনের ঘোরাফেরায় দলামোচা শাড়িটা, কপালে ধ্যাবড়ানো টিপ, রঙ-লাগান ছাঁটা চুল। খামখেয়ালিপনার এপিটোম। চৌকোণ মুখে প্রত্যেকটা অংশ খুব স্পষ্ট। লিপস্টিক পরে না, শুকনো-হওয়া দুই ঠোঁট চেপে রেখেছে, প্রতিবাদ আটকে। অভিজিৎ চোখ নামিয়ে ফেলে। ভাবে, গণ্ডীটা ভালোভাবে টেনে দিয়েছে নিজেই সে, একবছর আগে।

বৃদ্ধ ছোটো মন্দিরদুটি দেখিয়ে দেন আঙুল দিয়ে, একটা নবগ্রহের, অন্যটা রাধাকৃষ্ণের। অদূরে মজা পুকুর, শুকিয়ে গেছে জল। পাশে ইঁদারা। রিমা দেখছে শুধুই পোড়ো বাড়িটা। কখনো অনেক লোকজন জমজমাট... মানুষ কত... পাঁচিলের গায়ে ছোটো দরজা। স্বপ্নের মতো – ব্যাখ্যা হয় না। কি যেন একটা বলে - খিড়কি না পাছদুয়ার? নিজেদের এগারোতলার ওপরে এককুচি আইসিইউ-এর আদলে ফ্ল্যাট ভেসে উঠল। দরজার ল্যাচ টেনে দিলে ‘তোরা আপনি আর কপনি’... ঠাকুমা মজা করত ছোটোবেলায়। মানে জানতে চাইলে, হাসত। এখানে খোলা, কত শান্তি... আড়ালহীন... বুকের ভেতরটা, চোখের মধ্যেটা পরিষ্কার দেখা যায়। তাই অভির দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না? রিমা সরে গিয়ে বেলগাছের নিচে দাঁড়িয়েছে। শিবেন মোবাইল বের করে চেঁচাল, “দাঁড়া ওখানেই, একটা ফোটো তুলে দিই, দারুন লাগছে।”


“লোকাল থানায় একটা এফ-আই-আর করে রেখে দেবেন। আর সাহস পাবেনা,” শিবেন বলল। বুঝতে পারছিল মানুষটির আশঙ্কা। উনি চশমা খুলে নিয়ে ধুতির খুঁটে মুছলেন, “ওসব করা আছে বাবা। কোনও লাভ হয়না। মামলা করার উদ্যোগ নিয়ে এগিয়েছিলাম একবার...।” রিমা হাত ছড়িয়ে পাঁচিলের কাছে দাঁড়িয়ে ডাকল, “শিবদা এই জঙ্গলের ব্যাকগ্রাউণ্ডে একটা তুলে দাও না-।” হেসে এগিয়ে গেল শিবেন, “তোকে ঝগড়ুটি শালিখের মতো দেখাচ্ছে রে।” রিমাও হাসল, একটু রাগের ভাণ করল। এসে মানুষটির কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। বলছিলেন, “বছর কয়েক আগে এসেছিল একজন... বেড়াতে। বলল, আমি ওকালতি করি। আপনার জমির কাগজপত্র আমায় দিলে হাইকোর্টে কেস ওঠাব। দেবত্র সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া এত সহজ নয়। ফাইল-টাইল গুছিয়ে দিলাম, আর খবরবার্তা নেই। অনেক মাস অপেক্ষা করে করে, তারপরে ফোন করলাম। বলল, কিচ্ছু করা গেল না। কদ্দিন পরে কাগজপত্র ফেরৎ পাঠাল – দেখি দরকারি কয়েকটা ওতে নেই। আবার ফোন করলাম, আর ধরেই না!”



মেঘ জমাট – প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এল। অপার্থিব সুন্দর দেখাচ্ছিল জায়গাটা। অভিজিৎ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বলল, “চলো এবারে, চল্‌ শিবেন।” “আসছি আমরা তাহলে,” শিবেন আন্তরিক নম্রতায় নত হয়ে পড়েছিল। রিমা সহসা নিচু হয়ে ঢিপ করে প্রণাম করে হাত মাথায় ছুঁল, “সাবধানে থাকবেন,” কোনও প্রচেষ্টা ছাড়াই বলে উঠল। “মঙ্গল হোক, শান্তিতে থাকুন,” বললেন মানুষটি। কাঁপা কাঁপা আঙুলে ওর মাথা ছুঁয়ে দিলেন। বললেন, “আচ্ছা বাবারা, আমাকে একটা সাহায্য করতে পারবেন?” শিবেনের দুঃখের মতো খারাপ লাগাটা চারিয়ে যাচ্ছিল, বলল, “বলুন না, যদি সম্ভব হয়...।”

“সি-বি-আই না কি আছে, তাকে খবর দেওয়া যাইয় কেস করার জন্যে? আর না হলে, আপনাদের শহরে জানাশোনা একজন সৎ উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিতে পারেন?” মরে আসা আলো, মায়াবী বিকেল, বেশ কয়েক কাঠা জমি, পাখিদের দল বেঁধে উড়ে যাওয়ার শব্দ, পাতাঝরার শব্দের সঙ্গে মিলে, করুণ বৃদ্ধের ক্লান্ত স্বর। কার সঙ্গে লড়বেন উনি? ওরা চুপ। রিমা কী বিশ্বাসে তাড়াতাড়ি বলল, “হ্যাঁ শিবদা’ হতে তো পারে, তোমার অনেক–” কথা শেষ হওয়ার আগে তার দিকে চোখ পাকাল অভিজিৎ। শিবেনের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতবাহী মাথা নাড়াল। মানুষটি ওসব কিছু লক্ষ্য করেন নি, বোঝেনও নি। শিবেন ইশারায় অভিজিতকে সমর্থন জানাল। নিয়ন্ত্রিত হয়ে বলল, “জানা কাউকে পেলে নিশ্চয়ই জানাব, যোগাযোগ করিয়ে দেব।” উনি আশ্বস্ত হয়ে বললেন, “তাহলে, আপনাদের একজনের ফোন নম্বর এক টুকরো কাগজে লিখে আমাকে দিয়ে দিন দেখি। কখনো দরকার পড়বে-।” রিমা নিজের সাইড ব্যাগের জিপ খুলতে যাচ্ছিল কাত হয়ে, অভিজিৎ কনুই দিয়ে পিঠে গোঁত্তা মারল। ব্যথা পেয়ে চমকে উঠেছিল। তাকিয়ে দেখল অভিজিৎ পকেট থেকে হোটেলের সাইট-সীয়িং-এর ছোটো কাগজ বের করছে। বলল, “হ্যাঁ, আমারটাই দিচ্ছি, কিন্তু পেন তো নেই!”। রিমা বেশ খুশি হল, - ওঃ, এজন্যে... গুড্‌... । মানুষটির ফতুয়ার পকেটে ডটপেন ছিল সবুজ কালির, এগিয়ে দিলেন। চেয়ে রইলেন আশা নিয়ে। অভিজিৎ সযত্ন উৎসাহে গোটা গোটা করে নম্বর লিখে কার্ডটা দিল তাঁর হাতে। শিবেন সবটা দেখল, পড়ল, চোখ বিস্ফার করে তাকিয়ে রইল, অথচ বাধা দিল না। রিমাও পড়ল, তক্ষুণি কানের ডগা শিসের মতো গরম হয়ে উঠল, পায়ের তলা ঘেমে উঠল চটির মধ্যে। শক্ত মুঠোয় ধরেছিল ব্যাগের হ্যাণ্ডেলটা। ভয় করছিল হয়তো, বুঝতে পারছিল না। অভিজিৎ তৃপ্তিতে হাসল, বলল, “আমরা তাহলে আসি?”


অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছিল না। ঘোড়ার খুর, ছপটির শব্দ, মাঝে মাঝে রসুলের গলার বিশেষ শব্দ। সন্ধ্যের পরে এখানে আর কাজ নেই, দেখার নেই, একটানা ঘন নৈঃশব্দ। রিমার বুকের ভেতরটা করাত দিয়ে কেটেছে কেউ, টসটস করে রক্তের ফোঁটায় গলা বুজে ছিল। শিবেন একটাও কথা বলছিল না। রসুল বলল, “উনকো আপলোগ জানতে হ্যাঁয় সাহাব? বহোৎ সচ্চা ইন্সান... আজকল নহীঁ মিলতা হ্যায়। লেকিন ও গুণ্ডালোগোঁ নে ইৎনা তংগ করকে রখা...।” শিবেনের হৃদপিণ্ডে ঘোড়ার পা-ঠোকার আওয়াজ। খুব জোরে একটা নিশ্বাস ফেলল, “বলতে বাধ্য হচ্ছি - ওইরকম একটা কাজ না করলেই পারতিস অভি। এর চেয়ে না দিতিস, পরিষ্কার বলতিস – অসুবিধে আছে, বলতিস, আমরা দূরে থাকি – যোগাযোগ করা যাবে না!” রিমা থামাল, “প্লিজ্‌ চুপ করবে শিবদা’?” অভিজিৎ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। অন্যায় হয়ে গেল কি কাজটা? কিন্তু আশাভঙ্গ হত না মানুষটির? যুক্তি দিতে সেও পারে, কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো মোটেও সে কিছু করেনি। কিন্তু মনে হচ্ছে, অন্ধকার ক্ষীণ একটা গলি, পথ কেটে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। অস্পষ্ট অস্বস্তিতে ভুগছিল অভিজিৎ। উত্তর দিল না। ওদের দমিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল না। রাত বেশি নয়, হোটেলের সামনে টাংগা থামল, অভিজিৎ নামল সকলের আগে। দুহাত ছুঁড়ে কোমর বেঁকিয়ে আর্চ করে আড়মোড়া ভাঙলো। ভাড়া মিটিয়ে দিল। খুব হাল্কা গলায় বলল, “রসুলভাই, কাল এসো – খুব সকালেই। কি যেন পাহাড়টাহাড় দেখার আছে, বাঁদর আছে বললে– কাল দেখিয়ে দিও। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, দুপুরে খাওয়ার পরে ট্রেন ধরবো।”রসুল ছোটো সেলাম ঠুকল, “ওটা অনেক দূরে সাহাব। আমি গেলে দের হয়ে যাবে। অটো লে লেনা।”

লেখক পরিচিতি
শ্রাবণী দাশগুপ্ত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।
এখন রাঁচিতে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন