বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

মনি হায়দার এর গল্প- গ্লানির দায়

দরজায় টোকা দেয়ার প্রায় পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড পর গৌরব কারো পায়ের শব্দ শুনছে। পায়ের শব্দ যত কাছে আসছে, গৌরবের বুক তত কাঁপছে। হৃদপিণ্ড বাড়ি খাচ্ছে। শব্দ সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বাম হাতে একটা ট্রাভেলব্যাগ। ডানহাতের তালু ঘামছে। এ রকম পরিস্থিতিতে কী করবে, কী বলবে সব গুলিয়ে ফেলে গৌরব। চূড়ান্ত নার্ভাসনেসের শেষ সীমান্তে যখন গৌরব ঠিক তখন দরজা খুলে গেল।


দরজার ওপাশে মাথায় অর্ধ ঘোমটা দেয়া একজন প্রৌঢ়া। এক পলক মাত্র দেখেছে গৌরব তাকে। সাধারণ মুখ কিন্তু আপন মনে হলো। কপালে বেশ কয়েকটি ভাঁজ পরেছে।
আপনি কাকে চান? প্রৌঢ়া মহিলার কণ্ঠস্বরে স্নিগ্ধতার কারুকাজ টের পায় গৌরব।
এটা কি শহীদ অধ্যাপক আতাহার আলি সাহেবের বাড়ি? গৌরব পাল্টা প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ।
কিছুটা সময় চুপচাপ থাকে দু’জনেই। কে কাকে কী বলবে বোধহয় এটা ভাবতেই সময় পার হয়েছে।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছি। আমার নাম গৌরব।
প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা সহজ হলেন– আমি অধ্যাপক সাহেবের স্ত্রী। আপনি ভেতরে আসুন।

গৌরব ভেতরে ঢোকে। অধ্যাপক পরিবারটির ডিটেলস এখনও পুরোপুরি জানে না ও। ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর কামাল আহমেদ ঠিকানা দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটা বিভাগ খুলেছে কর্তৃপক্ষ- মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা অনুষদ। এই অনুষদের প্রধান কামাল আহমেদ এবং নতুন ভর্তি হয়েছে গৌরব। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা করতে গিয়ে গৌরবের অনেক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা হচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের এত বছর পরও অনেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে মুক্তিযুদ্ধের কি প্রয়োজন ছিল?
আশ্চর্য!
হঠাৎ গৌরব শোনে– মা সেই ভদ্রলোক কি এসেছেন?
একটি মেয়ে প্রশ্ন করছে। শহীদ অধ্যাপকের স্ত্রী জবাব দিলেন– হ্যাঁ।
কোথায়?
ওর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।
কী এক উটকো ঝামেলা ঘাড়ে নিয়েছো মা। মেয়েটির কণ্ঠে দারুণ বিরক্তি।
আস্তে আস্তে। মেয়েটির মা চাপা স্বরে মেয়েটিকে ধমকায়– ছেলেটি শুনতে পাবে তো।
পাক। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবা জীবন দিলেন। তাঁর মৃতদেহটা পর্যন্ত পেলাম না। কবরে ফুল পর্যন্ত দিতে পারি না। তাঁর মৃত্যুদিনে কেবল কেঁদে বুক ভাসাতে হয়। এতদিন কোনো খবর নিলো না কেউ। আমরা কেমন আছি কি করছি, বেঁচে আছি না মরে আছি কেউ জানতে চাইলো না। আর আজ উনি হঠাৎ এসেছেন বাবার ওপর গবেষণা করতে। কী হবে গবেষণা করে? বলো কী হবে? আমার বাবা কি ফিরে আসবেন?
চুপ। আয় আমার সঙ্গে। মেয়েটির মা মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে অন্যকক্ষে চলে যান। হয়তো মেয়েটির পাঁজর ভাঙা ব্যথার উপশম করাবার চেষ্টা করতে।

গৌরব চুপচাপ চা-টা শেষ করে। না, ওর ভেতরে কোনো ভাবান্তর বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। কামাল স্যার এ রকম পরিস্থিতির কথা ব্যাখ্যা করেছেন। একটি জাতির জন্ম, অভ্যুদয়ের কালে ঘটে বিচিত্র সব ঘটনা। পথের খাঁজে খাঁজে থাকে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট এবং পুঞ্জিভূত বেদনার ফল্গুধারা। এসব হয়তো এতদিন কোনো আঘাত না পেয়ে বরফ-শীতল জমাট বেঁধে আছে। কোনো হঠাৎ আঘাতে সেইসব বেদনার অবিনাশী স্রোত তীব্র বেগে ছুটতে পারে। তাতে ভয় পেতে নেই। অপেক্ষা কর। শান্ত হতে দাও দ্রোহ-অনল-দুঃখ নদীর পালাগান। শান্ত হলেই ডুবুরী হয়ে ডুব দেবে হৃদয়ের গোপন পাথারে। তুলে আনবে আত্মত্যাগের অজস্র মর্মর পাথর। কয়েক জায়গায় গৌরবকে তো রীতিমতো অপমান করেছে। তবুও দমে যায় নি। সেখান থেকেই খুঁজে এনেছে ইতিহাসের ধূসর পাণ্ডুলিপি। রক্তে বলাৎকারের পাঁচালী। বেয়নটের নির্মম খোঁচা। মৃতের নিপীড়িতের চিৎকার ইত্যাদি সে ইতিহাসের পাতায় এনে জমা রাখছে। সেখানে শহীদ অধ্যাপক আতাহার আলির পরিবারে এ প্রশ্ন উঠতে পারে।

কামাল স্যারের কাছে দারুণ কৃতজ্ঞ গৌরব। কামাল স্যারের সান্নিধ্য পাওয়াটাই একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখযুদ্ধে মারা যান। কামাল স্যার সঙ্গে ছিলেন। অর্থাৎ পিতা ও পুত্র এক সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য পাশাপাশি লড়াই করেছেন।
স্যার বলেন, বাঙালি জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধ এক মহান অভিজ্ঞতা। আমার এতটুকু দুঃখ নেই আমার বাবার মৃত্যুতে। বরং আমি গর্বিত। ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তে পিতা ও পুত্র পাশাপাশি বাংকারে থেকে পাকিস্তানি হায়েনা হারামজাদাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমার বয়স তখন মাত্র সতেরো। বাবা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে এলেন। দু’জনে একত্রে প্রশিক্ষণ নিলাম। তিন মাস একনাগাড়ে যুদ্ধ করলাম। বাবার সঙ্গে শেষ যুদ্ধ, সে-দিন হানাদারবাহিনী আমাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেললো। আমরাও প্রাণপণ লড়াই করতে লাগলাম। সারাদিন গেল, সন্ধ্যার সময় রাইফেলের একটা গুলি ঠিক বাবার বুকে লাগে। গুলি লাগার পর বাবা মাত্র কয়েক মিনিট বেঁচেছিলেন। তাঁর শেষ মুহূর্তটা আমার কোলে মাথা রেখে শহীদ হলেন। পিতার তাজা রক্তে আমি পুত্র, আমার শরীরের কাপড় এমনকি রাইফেলটা পর্যন্ত ভিজে গেল। এখনো আমার সেই রক্তে ভেজা কাপড় সযত্নে রেখে দিয়েছি। যখনই বাবাকে মনে পড়ে বা দেখতে ইচ্ছে হয় বাবার রক্তে আমার জামা কাপড় দেখি। আমি আমার পুত্রকে তার দাদুর বীরত্বের গল্প করি। এমনি করে এক প্রজন্মের অর্জিত গৌরব অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে। সুতরাং যার যেখানে যেটুকু আত্মত্যাগ সেটুকুকে সংরক্ষণ করতে হবে গৌরব। কামাল স্যারের অর্জিত গৌরবকে ধার করতে চায় গৌরব নিজেও। যেভাবেই হোক সে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত শহীদ পরিবারের আত্মত্যাগ একা একা জমা করতে চায়।


হঠাৎ অধ্যাপকের স্ত্রীর গলা শুনতে পায় গৌরব- খারাপ লাগছে না তো?
না। বরং আমার ভালোই লাগছে।
রুমের সোফায় বসেন ভদ্রমহিলা। পাশের চেয়ারে গৌরব। কিছুটা সময় কাটে। ভদ্রমহিলা হঠাৎ ডেকে ওঠেন মন্দিরা? ও মন্দিরা?
আসছি মা। ঘরের ভেতর থেকে মেয়েটি মায়ের ডাকে সাড়া দেয়। মন্দিরা আমার কনিষ্ঠ সন্তান। আমার তিনটি মেয়ে, একটি ছেলে। ছেলেটির নাম জাহাঙ্গীর মামুন।
কোথায় সে? গৌরব প্রশ্ন করে।
সৌদি আরবে।
কী করে?
সবাই যা করে– চাকরি। জাহাঙ্গীর ইলেকট্রনিক্সে ডিপ্লোমা করে বছর তিনেক বেকার থেকে মামাদের সহায়তায় সৌদি আরবে চাকরি নিয়ে গেছে বছর খানেক হলো।
অন্য মেয়েরা?
মেয়ে দু’টো বড়। ওদের পর জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীরের পর মন্দিরা। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। ওরা জামাই-ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোই আছে। এখন বাকি জাহাঙ্গীর আর মন্দিরার বিয়ে। ওদের একটা ব্যবস্থা হলেই আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত হতে পারি।
মন্দিরা চায়ের ট্রে হাতে ঢোকে। টেবিলের উপর ট্রে রাখে। মন্দিরার দিকে তাকায় গৌরব। মন্দিরাও তাকায়। মন্দিরার মাঝারী স্বাস্থ্য। শরীরের রং উজ্জ্বল ফর্সা। লম্বা নাক। গোল একজোড়া ঠোঁট। কমনীয় রং মুখের। ভালো লাগে গৌরবের। মন্দিরা মায়ের পাশে সোফায় বসে।
নিন, চা খান। বলে মন্দিরার মা।
গৌরব তাঁর দিকে চেয়ে বলে আপনাকে আমি খালাম্মা বলে ডাকব। আমি সম্ভবত জাহাঙ্গীর ভাইয়েরও ছোট। সুতরাং আপনি আমাকে গৌরব বলে ডাকবেন।
আচ্ছা। মন্দিরার মা আরজুমান্দ বানু সহজেই গৌরবের প্রস্তাব মেনে নিলেন। নাও–চা খাও।
আপনারাও নিন– গৌরব নিজের চায়ের কাপ হাতে নেয়। মন্দিরা আপনি কি কলেজে পড়েন?
গৌরবের জিজ্ঞাসায় মন্দিরা খিল খিল হাসিতে পালক ঝরার মতো ঝরতে থাকে।
আরজুমান্দ বানু জিজ্ঞেস করেন আহা, হাসছিস কেন?
উনি আমাকে ওনার সিনিয়র ভেবেছেন–হাসছে মন্দিরা।


এবার হাসলেন আরজুমান্দ বানু। গৌরব, ওকে তোমার আপনি বলার কোনো প্রয়োজন নেই। ও তোমার অনেক ছোট। মাত্র বিএ পড়ে স্থানীয় কলেজে। ওর কথায় তুমি কিছু মনে করো না। একটু আহ্লাদী টাইপের মেয়ে। ওর বয়স যখন মাত্র তিন মাস তখন ওর আব্বা মারা যান।
মারা যান না। বলো বাবা শহীদ হলেন। মন্দিরা মাকে মনে করিয়ে দেয়।
আরজুমান্দ বানু চুপ করে যান। মুহূর্তে আনন্দ উচ্ছ্বল পরিবেশটায় শোকের কালো নিস্তব্ধতা নেমে এল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। চুপচাপ থাকাটাই এখন নিয়তি। চা খেয়ে টেবিলে চায়ের কাপ রেখে সামনে তাকায় গৌরব। দেয়ালে বড় একটা ছবি। গৌরব বুঝতে পারে এই ছবিটাই শহীদ অধ্যাপক আতাহার আলির। চমৎকার সুপুরুষ ছিলেন অধ্যাপক সাহেব, ছবি দেখে অনুমান করা যায়। পরিবেশটাকে পাল্টে দেয়ার জন্য গৌরব বলে আমি কিন্তু দারুণ ভয়ে ভয়ে এসেছি খালাম্মা।
কেন?
কামাল স্যারের চিঠি যদি আপনারা না পান তাহলে আমার অবস্থাটা কেমন হতো? হঠাৎ এসে আমি আপনাদের কাছে কী বলতাম?
সেটা অবশ্য ঠিক বলেছো। তবে কামাল সাহেব গত এক বছর থেকে আমাদের কাছে চিঠি লিখে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তাঁকে আমি বেড়াতে আসতে বলেছি। লিখে জানিয়েছেন আসবেন।


আরজুমান্দ বানুর কথা শেষ হলে গৌরব বলে– স্যার সময় পেলেই আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হতে আসবেন।
আসলে খুশি হব। উনি শহীদ হবার পর আমার সংসারের উপর দিয়ে কী যে ভয়ংকর দুর্যোগ বয়ে গেছে বাবা বলে শেষ করা যাবে না।। চাকরি নেই। আয় নেই। উনি যেখানে চাকরি করতেন সেখান থেকে চলে এলাম নিজেদের ভিটায়। ছেলেমেয়েগুলো নিয়ে অকুল পাথারে ভাসলাম। গয়নাগাটি যা ছিল, জমাজমি সব শেষ এদের লেখাপড়ার পিছনে। স্বাধীনতার এত বছর পরও কেউ আমাদের খবর নেয় নি। এই সময়ে হঠাৎ কামাল সাহেবের চিঠি পেলাম। পাওয়ার পর অনেক কাঁদলাম। তিনি লিখলেন অধ্যাপক সাহেবের ব্যবহৃত কোনোকিছুই নাকি ফেলনা নয়, জাতির সম্পদ। তাঁর লেখা ভবিষ্যৎ জাতির নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয়। মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় এসব মূল্যবান উপাদান। জাতির সম্পদ কিনা জানি না, কিন্তু তাঁর সবকিছুই আমার কাছে পরম সম্পদ। আমি তাঁর সবকিছু সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছি।
চলুন, আমি দেখতে চাই, বলে গৌরব।
এখন রাত তো। রাতে আমরা কেউ বাবার ঘরে ঢুকি না। কাল সকালে সব দেখাবো। অবশ্য আপনি এসব দেখতেই তো এসেছেন। বলে মন্দিরা।
আরজুমান্দ বানু উঠে দাঁড়ান– চলো খাবে। কাল কথা হবে। অনেক রাত হয়েছে।


পর দিন সকাল থেকে গৌরব কাজে নামে। বিরাট একটা রুম অধ্যাপক সাহেবের জন্য নির্ধারিত। বাড়িতে আসলে তিনি এ ঘরে থাকতেন। পড়াশুনা করতেন। অনেক বই তাঁর সংগ্রহে। সবকিছু সেই আগের মতো যথাস্থানে সাজানো। তাঁর ভারী লেন্সের চশমা এখনো টেবিলে রাখা। এ্যাশট্রেতে কত বছরের পুরনো ছাই এখনও বর্তমান। লেখার কলমটি দোয়াতে ডুবানো। টেবিলে একটা পুরনো এ্যালবাম। জামা কাপড় বিছানা চাদর একই রকম সাজানো। মনে হচ্ছে এখানে এই রুমে তিনি এখনো আছেন। না থাকলেও বাইরে আছেন এসে পড়বেন যে-কোনো সময়।।
রুমের মাঝখানে দাঁড়ানো গৌরব। এইসব কক্ষে প্রবেশ করলে নাকে কেমন যেন একটা গন্ধ পায় ও। এ রকম বেশ কয়েকটি অভিজ্ঞতা হয়েছে এর আগে। দূরের কোনো অচেনা জায়গায় এসেছে আবার আবছা আবছা চেনা লাগছে এ রকম একটা আলুথালু স্মৃতি অবচেতনে বাসা বাধার চেষ্টা করছে।
কি ভাবছেন আপনি?
চমকে পিছনে তাকায় গৌরব। মন্দিরা দরজায় দাঁড়ানো, দরজার তালা খুলে আরজুমান্দ বানু অন্যত্র চলে গেছেন। আরজুমান্দ বানু এই কক্ষে কারো সঙ্গে নয়, একা একা ঢোকেন। নিজের হাতে ঝাড়েন, মোছেন। পরম যাতনায় প্রিয় স্বামীর স্মৃতিগুলো রক্ষা করে চলেছেন নিজস্ব যাদুঘরে।
ভাবছি, এই কক্ষে তিনি ছিলেন। আজ কেবলই স্মৃতি। আর কোনোদিন আসবেন না।
মন্দিরা দরজা থেকে সামনে এসে দাঁড়ায়। কাল ছিল সালোয়ার কামিজ পরনে। আজকে পরেছে শাড়ি। দেখতে চমৎকার লাগছে। গৌরব ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়। মন্দিরা খেয়াল করে না।


যেদিন বাবাকে ওরা ধরে নিয়ে গেল সে-দিন থেকে আমার মা বাবার প্রতীক্ষায়ই আছেন। মৃত্যুর আগে বোধহয় সে প্রতীক্ষার অবসান হবে না। এখনও মাঝেমাঝে মা কাজ করতে করতে আনমনে মাথায় ঘোমটা তুলে সামনের দিকে তাকান। জিজ্ঞেস করলে বলেন তোর বাবার মতো যেন কাকে আসতে দেখলাম। জানেন তখন আর কান্না সামলাতে পারি না। বলতে বলতে মন্দিরার চোখের কোণে পানি জমে।
গৌরবের চোখের পাতাও ভিঁজে যায়। অজস্র মৃত্যুর বিল পার হয়ে তবে পাওয়া গেল স্বাধীনতা। এভাবে চোখের জলে সময় গড়িয়ে গেলে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কাজ কারা যাবে না। সাতদিনের মধ্যে সমস্ত ডকুমেন্টস, স্ত্রী, মেয়ের সাক্ষাৎকার নিয়ে কামাল স্যারের কাছে ফিরে যেতে হবে।
মন্দিরা?
বলুন। গৌরবের ডাকে চোখ মুছে তাকায়।
তুমি আমাকে একটু সাহায্য কর।
কী সাহায্য?
তোমার বাবার লেখালেখির ব্যাপার সম্পর্কে আমাকে বলো। তাতে আমার ধারণা নিতে সুবিধা হবে।
বাবা ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র এবং কলেজে পড়াতেনও ইতিহাস। তাঁর ধারণা ছিল যে জাতি ইতিহাস, তার নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতি ও সভ্যতার ইতিহাস জানে না, ইতিহাস সে জাতিকে কখনো মুক্তি দেয় না। বাবা আরও বলতেন দুইশত বছরের ইংরেজ শাসনে বাঙালি জাতির প্রকৃত ইতিহাস অনেকটা চাপা পরে গেছে। অথবা ইংরেজরা তাদের শাসনের সুবিধার্থে আমাদের ইতিহাসকে অন্যরকম করে লিখেছে বা লিখতে বাধ্য করেছে। তিনি তাই ইতিহাসকে মনে করতেন প্রত্নতাত্ত্বিক সত্য অন্বেষার অনুষঙ্গ। এ কারণে ইতিহাসের ধারাবাহিক মিথ্যাচারকে অস্বীকার করে সত্য ইতিহাসকে সামনে আনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কত?
প্রায় পনেরোটি বই হবে।
অপ্রকাশিত কোনো পাণ্ডুলিপি–
মাথা ঝাকায় মন্দিরা– আছে।
কোথায়?
মা সব স্টিলের ঐ আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছেন। অবশ্য কয়েকটা পাণ্ডুলিপি হারিয়েও গেছে।
কেমন করে? আহত হয় গৌরব।
বাবা যে কলেজে পড়াতেন সেই কলেজ পাকিস্তানি হায়েনাবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়।
ওহ, ওনার ছবি আছে কেমন?
আছে কিছু।
ঐ পাণ্ডুলিপিগুলো যা স্টিলের আলমারিতে আছে, দেখতে চাই আমি। প্রয়োজন মনে করলে নিয়ে যেতে চাই। অবশ্য ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে।
এ ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে কথা বলুন।
ঠিক আছে, বলব। তার আগে তোমার বাবার এখানে যেসব জিনিস আছে, তার একটা লিস্ট তৈরি করি। তুমি একে একে বলে যাও, আমি লিখি।


এভাবে প্রায় চার পাঁচ দিন এক নাগাড়ে কাজ করে গৌরব। ওকে সাধ্যমতো সাহায্য করেছে মন্দিরা। ওর কাজের জন্য মন্দিরা কলেজে যায় নি। আর সত্যি কথা বলতে কী মন্দিরা আপন মন প্রাণ ঢেলে কাজ করেছে। এক ধরনের অল্প অল্প ভালোবাসায় কেমন করে জানি জড়িয়ে যাচ্ছিলো ওরা। দু’জনার মাঝে টুপটাপ বৃষ্টির মতো নিজস্ব কথাবার্তাও হতো। ভালো লাগা, মন্দ লাগা ইত্যাদি নিয়ে কথার মেলা বসতো। অন্যান্য কাজ শেষ করে রাতে গৌরব বসলো আজুমান্দ বানুর মুখোমুখি। পাশে মন্দিরা। গৌরব জানতে চায় অধ্যাপক আতাহার আলি কীভাবে শহীদ হলেন, কারা তাঁর মৃত্যুতে জড়িত ছিল সব লিখে নেবে।
উনি সংসারী মানুষ মোটেই ছিলেন না– আরজুমান্দ বানু বলছেন– সব সময় পড়ালেখা-কলেজ-ছাত্রছাত্রী নিয়েই থাকতেন। মাস শেষে বেতনটা এনে আমার হাতে দিতেন, আমিই সব চালিয়ে নিতাম। কখনো প্রশ্ন করতেন না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া সব কিছুই আমাকে দেখতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় তো উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আন্দোলনের বলিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানেও তিনি ছাত্রদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। আস্তে আস্তে নানা চড়াই উৎরাই পার হয়ে এল ছাব্বিশে মার্চ। পরদিন সকালে কলেজের শত শত ছাত্রছাত্রী এল অধ্যাপক সাহেবের কাছে। তিনি ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বললেন। কলেজের সামনে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ চলছে। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মচারীরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। মহকুমা শহরে একটা চাঞ্চল্য পড়ে গেছে। সবাই যেভাবে পারছে সাহায্য করছে। পরামর্শ করছে। কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেশকে স্বাধীন করা যায়। মুষ্টিমেয় কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী এবং জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে লাগলো।


এটা হলো এপ্রিলের প্রথম দিকের কথা। এপ্রিলের শেষের দিকে পাকিস্তানি হায়েনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে ছোট মহকুমা শহর পিরোজপুরে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণে বাঁধা দিয়েছিল, কিন্তু শীঘ্রই তারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। পুরো মহকুমা শহরটা যেন বধ্যভূমি। যেসব এলাকায় হিন্দুবাড়ি ছিল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তা ছারখার করে দেয়। পাকিস্তানি পশুদের এসব দেখিয়ে মহকুমা পুলিশের কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বড় সুখ পেতো। কয়েকদিন নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিকর্তা একজন কর্নেল স্থানীয় গণমান্য লোকদের সঙ্গে শান্তি বৈঠকে বসতে চাইলেন। যারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল তারা প্রথমেই কর্নেলের দরবারে চলে যায়। যারা স্বাধীনতার পক্ষে তারা যেতে না চাইলেও উপায় ছিল না। কামরুজ্জামান সে-সব বাসায় পুলিশ পাঠিয়ে স্পেশাল খবর দেয়। যথারীতি আমাদের বাসায়ও পুলিশ এসেছিল। অধ্যাপক সাহেবের না গিয়ে উপায় ছিল না। তবুও যেতে চান নি। আমিই জোর করে পাঠিয়েছি। কিন্তু সেই যাওয়া তাঁর শেষ যাওয়া। বিশ্বাস করো গৌরব, আমি বুঝতে পারি নি।


আরজুমান্দ বানু যেন গৌরবকে কৈফিয়ৎ দিচ্ছেন। আত্মীয়-স্বজন, ছেলেমেয়েরা বলে, সবাই আমাকে দোষ দেয়, নিন্দে করে, আমার কারণে নাকি সে হায়েনাদের হাতে নিহত হয়েছে। আমি নাকি তাঁকে ঠেলে পুলিশ কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের কাছে পাঠিয়েছি। না পাঠালে নাকি সে বেঁচে থাকত। কিন্তু কামরুজ্জামান হারামজাদা যাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা যায় নি, তাদেরকে কি ধরে পরে মেরে ফেলে নি? হুলারহাট কচা নদীর পাড়ে কী তাদের লাশ ভাসে নি?
ভেসেছে মা। মন্দিরা মাকে সমর্থন জানায়।
অথচ তোরা কী অমানুসিকভাবে এতগুলো বছর আমাকে দোষ দিয়ে আসছিস- আরজুমান্দ বানু এবার কেঁদে ফেললেন। তার সঙ্গে যোগ দিলো মন্দিরা। গৌরব চুপচাপ। ভাবলেশহীন। রাতটা গৌরবের কাছে নিরেট পাথরের চাইয়ের মতো শক্ত লাগে। কী করবে গৌরব–বুঝে উঠতে পারে না।
মন্দিরা নিজেকে সামলে নিয়ে মাকে বলে– মা গৌরব ভাই কী মনে করবে? চুপ করো।
দীর্ঘ চব্বিশটি বছর চুপ করেই তো আছি। আজকে না হয় একটু প্রকাশ্যে কাঁদলাম– তোর বাপকে মনে করে।
মায়ের কথায় মন্দিরা নিজেই চুপ হয়ে যায়।


পরদিন সকালে গৌরবকে খুঁজে পাওয়া গেল না। রাস্তা, নদীপাড়, কাছের বাজারে সব জায়গায় এবং অন্যান্য লোক দ্বারা খোঁজ নেয়া হলো–কিন্তু কোথাও গৌরবকে পাওয়া গেল না। মা-মেয়ে মিলে অনেক জল্পনা কল্পনা করলেন কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট মীমাংসায় পৌঁছুতে পারলেন না আরজুমান্দ বানু। স্থানীয় থানায় ব্যাপারটা জানানো হলো। মন্দিরা একা একা অনেক ভাবলো, কিন্তু কূল কিনারা পেল না। আশ্চর্য মানুষ গৌরব। এই কয়দিন এত কাছাকাছি ওরা থেকেছে, নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করেছে, বিকেলে নদীর পাড়ে বেড়িয়েছে, সন্ধ্যার লগ্নে পথে হাঁটতে হাঁটতে, নারকেলের ডগার পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে অনেক কথা বলাবলি করেছে। অথচ গৌরব একটিবারও মুখ ফুটে কিংবা ইশারায় ইঙ্গিতে বলে নি...। মন্দিরা ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। ভীষণ কষ্ট। শ্যাওলা মাখা পিচ্ছিল কষ্ট মন্দিরাকে মাদারী কাঁটার শাসালো যন্ত্রণা দেয়। কাউকে বলে না। বলতে পারে না। কেউ বুঝতেও চায় না।
মন্দিরার এই কষ্ট প্রহর পার হওয়ার সাত দিনের মাথায় আসে গৌরবের একটি চিঠি।


‘মন্দিরা–
জানি না, কখন তোমাদের হাতে এই চিঠি পৌঁছুবে। আর তখন আমি কোথায় থাকব। হয়তো এমনও হতে পারে যখন তোমরা আমার চিঠি পড়ছো তখন অন্য আরেকজন শহীদ পরিবারের দীর্ঘদিনের জমাট বাধা বেদনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। আমার পালিয়ে আসায় অবাক হয়েছো নিশ্চয়ই। স্বাভাবিক। কিন্তু এ ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। কারণ রাতে খালাম্মার কাছে তোমার বাবার শহীদ হওয়ার পুরো ঘটনা পাথর হয়ে শুনেছি। বুকের মাঝখানে কলজেটা গলে গলে তরল রক্ত হয়েছে। অজস্র বিষাক্ত তীর আমাকে দহন করেছে। তোমার, তোমার মায়ের যে কষ্ট তার চেয়েও ভয়ংকর কষ্ট আমাকে শেয়াল কুকুরের মতো খাবলে খাবলে খাচ্ছে। আমি আমার জন্মকে অভিশাপ দেই। আমি আমাকে ঘৃণা করি। আমি আমার বিনাশ চাই। বিনাশ চাইলেও জীবনটাকে, পৃথিবীর অপার্থিব সৌন্দর্য, তোমার সুষমাকে ভালোবাসি। যে কারণে বিনাশ হতে পারি না। আমি যখন ছোট, তখন বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জন্ম। যখন বড় হলাম, বুকের মায়াবি খাটালে যখন জন্ম নিলো গভীর দেশপ্রেম, যখন জানলাম মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা, ঠিক তখন জানলাম আমার জন্মদাতা ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী। মানুষ এবং মানবতা নয়, সে ভালোবাসতো ধর্মকে। সত্যি বলতে কি– ধর্মকে নয়; ধর্মের মুখোশধারী, ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী এক দল লোভী-হিংস্র মানুষের সঙ্গে তার ছিল গভীর সখ্য। স্বাভাবিক কারণে সে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছে। খোঁজখবর নিয়েছি তার কারণে অনেক মানুষ মারা গেছে একাত্তরে। যা গেছে তা তো ফিরে পাবো না। সিদ্ধান্ত নিলাম, জন্মদাতার বিশ্বাসঘাতকতার প্রায়শ্চিত্ত করব। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে জাতির সামনে তুলে ধরব। সমস্ত রাজাকার আলবদর, আলশামসদের তালিকা তৈরি করব। সবার আগে রেখেছি জন্মদাতার নামটি। জানো তার কি নাম? তার নাম, কামরুজ্জামান।
হ্যাঁ, অধ্যাপক আতাহার আলির হত্যাকারী আমার জন্মদাতা পুলিশ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান।
মন্দিরা, এরপরও কী আমার এই মুখ ভোরের পবিত্র আলোয় তোমাদের দেখাতে পারি? তোমরাও কী দেখতে চাইবে? পারলে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘৃণা পাঠিও। বহন করব আমৃত্যুকাল কারণ জন্মই যে আমার আজন্ম পাপ।


ভালো থেকো।
গৌরব, একজন প্রকৃত রাজাকারের সন্তান।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন