বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

আমায় লাবণ্য দাও

মৌসুমী কাদের

১.
সেই বাড়িটা কেমন যেন ঘোলাটে ঘোলাটে ছিল। ইস্কুল ঘরের মত লম্বা এক ফালি বারান্দা। মাটির মেঝে, চারটে চৌকাঠ, একটা ভাঙা বেঞ্চ, একটা শীতল পাটি, দাদার তালপাখা আর লাঠি, এই মিলিয়ে বারান্দা। মূল ঘরটি ছিল অনেকটা পৌরানিক বিলম্বিত লয়ের মত। তাকে যেভাবে খুশী ভাবা যায়, সেভাবেই সাজানো। তার মানে, দুটো রহস্যময় উঁচু উঁচু খাট, দুটো গম্ভীর ভারী চেয়ার আর দুটো লিকলিকে পাটের শিকে, যার ভেতরে পেট মোটা তিন তিনটে করে মাটির হাড়ি, মাটির সমতল মেঝে, আর রহস্যময় দুটো শরীর; দাদা আর বুবু।
কেন রহস্যময় বলছি, তার একটা ব্যাখ্যা দেয়া দরকার। দাদা আর বুবু যখন খড়ম পায়ে দিয়ে হাটতেন তখন একজনের খড়মে খুব জোরে খট খট শব্দ হোত, অন্য জনের হোতনা, আবার খালি পায়ে হাটলেও বোঝা যেত, কে হাটছে, দাদা, না বুবু!!!! একজন মহা শব্দ পছন্দ করতেন,অন্যজন চুপচাপ।

উঠোনের বাম পাশে পর পর রান্নাঘর আর কাচারী ঘর। রান্না ঘরে বুবু রান্না করতেন। কাচারী ঘরে পাখিরা প্রেম করত। পাখিরা টের পেত, এ এক মহা নিরাপদ জায়গা। গান বাজনা, ধর্ম-কর্ম কোন কিছুতেই কোন বাঁধা নেই। সারাদিন সারারাত ধরে চলত উৎসবের পর উৎসব। বৈশাখী মেলায় উৎসবের ঘ্রাণটা বেশী হোত, আমের মুকুলের ছড়াছড়ি ছিল যে!।

উঠোনের পরই পুকুর। সেই পুকুরেও রোজ ঘরোয়া উৎসব চলতো। পাখিদের উচচাঙ্গ, মাছেদের রবীন্দ্রসংগীত, বেল গাছ আর বড়ই গাছদের ভাটিয়ালি। দাদা আর বুবু পুকুর পাড়ে বসে এইসব জলখেলায় অংশ নিতেন। হাডুডু, ডাংগুলি....কত কি!!!। পৃথিবীর জাগতিক সারল্যে সময় কেটে যেত তাদের। কখনও মনে করতেন না, এক কন্যা-এক পুত্র সন্তানদ্বয় ক্রমশঃ শোক থেকে অশোক হয়ে উঠছে। একি প্রাপ্তি না অপ্রাপ্তি?


২.
ঘোলাটে সেই বাড়িটা আর নেই। রান্না ঘর, কাচারী ঘর, কিচছু নেই। পুকুরটা মজে গেছে অনেকদিন। চাপকলে চাপ দিলে পানি নেই। দাদা, বুবু, তুমি, কেউ নেই। তুমি যখন বেঁচে ছিলে, তখন দুনিয়ার সকল মানুষকে যেমনটি দেখতে চাইতাম, দেখতে পেতাম। এখন কি ঘুমহীন হয়ে উঠছি? সারারাত সিড়িঘরে, দরজার ওপারে, পায়ের শব্দ, ফিসফিস আওয়াজ। বিছানা ছেড়ে উঠবো কি? ভয়; চোখে, মুখে,নাকে... ভয়, আলাদা হয়ে যাবার ভয়, বন্ধুহীন হবার ভয়, একাকীত্বের যন্ত্রণার ভয়। নিজেকে নিয়ে ভীষন ভয় আমার। কোথাও কিছু ঘটে যাচেছ নিশ্চয়ই!!! ভ্রমরেরা জাল বুনতে শু্রু করেছে। নইলে এমন বিষন্নতা গ্রাস কোরত না। সত্যেরা আটকে পড়েছে দেয়ালে, খূঁজে পাচেছনা পথ। আবার চারপাশ ঘুড়ে টুড়ে বলছে, দরজাটা কোথায়? এপারে আমি দাঁড়িয়ে থাকি র্দীঘকাল-ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, অপেক্ষায় অপেক্ষায় আমার শরীরের ঘাম বেয়ে পড়ে। অন্তর্গত নিয়মগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায়, যেন গ্রামদেশে চলে যাই, সেই পুকুরপাড়, কলাপাতার নাক বরাবর মাটির পথ ধরে হেটে যাওয়া, যেখানে এখনও ‘সীমাবদ্ধ মানুষ’ ও ‘পোকামাকড়’ পথ খোঁজে। পুকুর বা নদীরা মজে গেলেও মনে পড়ে তাদেরই। দাদা, বুবুসহ মনে পড়ে তোমাকেই।

তুমি চলে যাবার পর একটা মৃত্যু উৎসব হোল। মানুষ মারা গেলেও রঙীন কাপড় টানিয়ে, গরু জবাই দিয়ে গ্রামবাসীদের খাওয়ানো হোল। শ্রাদ্ধ কুলখানি যাই বলি, তোমার বেলাতেও তাই হলো। তিন তিনটে কবর। দাদা, বুবু, আর তুমি- আর একফালি উঠোন, সেইটুকু জায়গা-তে সামিয়ানা টানানো। গ্রাম বাসীরা আর এখন মাটিতে বসে খেতে চায় না। শহরে সভ্যতা তাদের চোখে মুখে শরীরে লেগে গেছে। চেয়ার টেবিলে বসে মহা উৎসবে খাওয়া-দাওয়া হলো। এই দৃশ্য পাখীরা, যারা কাচারী ঘর খসে পড়ার পর বড় আম গাছটিতে বংশ বিস্তার করেছিল, তারাও দেখেছে। মজা পুকুর দেখেছে, যার ঘোলাটে পানির বুদবুদ শব্দ প্রতিদিন তোমাদের কানে পৌছোয়। এই দৃশ্য, সারি সারি সুপারি গাছ দেখেছে, যারা কবরগুলোকে ঘিরে ওপেনটু বায়োস্কপ খেলছে। এই দৃশ্য তোমরাও কি দেখেছ বাবা?

বাবা, তোমাকে ঠিকঠিক কথাগুলো বলা যাচেছনা। অথবা বলেই ভাবছি, ভাবনাটা এরকম ছিলনা। যতই যুক্তি-তর্ক, নিয়ন্ত্রন, কাঠামো, এইসব ভাবছি, ভেতরে ভেতরে ততটাই অপদার্থ, অর্থহীন আবিষ্কারকেরা ঘরবাড়ী, দরজা-জানালা তৈরী করছে। আকাশ বরাবর খোলা জানালায় আলোর প্রলোভনে প্রলোভিত হতে চাই আমি। অথচ মৃত্যু আমাকে ডাকছে। বলছে, আয়, আয়, কাছে আয়..এই অসীম আকাশের মেঘেরা ভেসে ভেসে গিয়ে যদি বলে তোমায় আমার অপেক্ষার কথা ! ভালোবাসা কত বিচিত্র দেখ! তুমি যখন ছিলে, কাছে ছিলে, বড় ‘দৈনন্দিন’ ভাবেই ভেবেছি তোমায়। ইংরেজীর দূর্বলতা কাটানো, পড়াশোনার যত সংশোধন, ভাত খাওয়া, টেলিভিশন দেখা, বেলের সরবত, ডিকশনারী ‘মুখস্থ ও অনুবাদ, বইমেলার প্রাপ্য ১২০০ টাকা, এইসব দৈনন্দিনতা এখন বড় মধুর ও বিশেষ হয়ে উঠছে। তুমি কতটা ‘বিশেষ’ এবং মুক্তির জায়গায় আছো, চারপাশের অস্থিরতা দেখলে তা টের পাই।

এই নির্লিপ্ত সভ্য শহরে একটা ডুব সাতার কতটা যে জরুরী, তা আমরা কেউ বুঝিনা। সকাল-সন্ধ্যা অবিরাম এই চলায় সকলেই সুখী। আমি কি সুখী বাবা? আমি কি সুখী? তুমি কি জানো, বাবা? একটা আশ্চর্য, বাধঁন কোনদিন কখনও নম্রতায়িত করে ফেলবে সে আমি ভাবিনি। যত দূরেই যাই, সমুদ্র বা বিশাল আকাশ, ততই যেন ফিরে ফিরে আসি, কোথায় এই দায়ভার কে জানে? এসব কথা বলছি বলে কি ভাবছো,‘সভ্য‘ হয়ে গেছি? মৃত্যুমূখী ভাবনা‘র ভূত ঘাড় থেকে নেমে গেছে? না তা নয়, তা নয়।


৩.
 মেঘবালিকা বন্ধু আমার,

মেঘবালিকা বলছি, আসলে সে বালিকা নয়, না বয়সে-না স্বভাবে। কেবল তার বিশেষনগুলোই বলা যায় একটু করে । গভীর কালো চোখ, আটপৌড়ে চেহারা, বড় একটা গোল টিপ, টুকটাক গয়না, আটপৌড়ে শাড়ী। একজন পরিনত নারীকে মেঘবালিকা বলছি কেন? মেঘের সংগে তার ছিল চির ভাব। শৈশবে সে ঘাসফড়িং এর ডানায় ভর করে হেটে বেড়াত; একটুও মাটিতে পা পড়তনা তার। মফস্বলের মাটি, আধপাকা ঘর, প্রতিবেশী আর পলাতক মেঘ ভেতরে, তার সঙ্গী হোল। তার বাহ্যিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করবেই এটি সে জানতো। এক ধরনের অহংকার তার চুলে, ঠোটে, শরীরে শিহরন তৈরী করেছিল। তাই তার নাম দিলাম মেঘবালিকা, আর সেই সঙ্গে বন্ধু হতে চাইলাম। সেই মেয়েটি নবীন ঘাসফুলের মতন তার ফুলদানিতে জায়গা দিল। সে যে ছলনাময়ী, তাই প্রলোভিত করলোও নানাভাবে; শব্দ করে, রং করে.. ছবি এঁকে, ঘরবাড়ী-জানালা, সর্ষে ফুল, সমুদ্র, ঝাউবন। নানান মাধ্যমে সেই রংজল খেলা; ডিজিটাল, তেল রং, স্কেচ, কতকি! হঠাৎ হঠাৎ পাগলের মত দৌড়ে আসে সে; বলে চল, চলনা যাই! বাইরে যাই.. আমরা হুড ফেলে রিকশায় চড়ে বসি। ঘন্টার পর ঘন্টা রিকশা চলতে থাকে, চলতে চলতে বুড়িগঙ্গার ধারে গিয়ে থামে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা কি তার জৈবিক প্রয়োজন? ক্ষুধা নিবৃত্তি? জীবন বাঁচানোর খেলা? নাকি নৈর্ব্যত্তিক চিন্তার খোরাক? এইসব যাবতীয় বিনিময় কি পরাবাস্তববাদী কোন পেইন্টিং? ঠিক বুঝিনা, জানিনা।

যদি বলি,‘সুন্দর লাগছে’; সে বলবে, ‘লাগতেই হবে; আমিতো সুন্দর’। যদি বলি, ‘তুমি কালো, একটু খাটো, আবার তুমি অর্পূব সুন্দরী নও, ভেবোনা তুমি জীবনানন্দের বনলতা সেন!!! সে বলবে, আমি জানি ‘তুমি আমাকে ভালোবাসো’। ‘তুমি আমার ছবি ভালোবাসো’। অভিনয় ভালোবাসো। আমারতো নাক, কান, গলার ডাক্তার প্রয়োজন নেই, যে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষনা করে বলবে, ‘সাইনাস’ নাকি এলাজীর্র সমস্যা আছে? ‘ডোপেক’, ‘সিনারন’, নাকি ‘ডেনজিট’ খাবো! তারপর তিনমাস পর আমার রূপ সৌন্দর্য ফিরে পাবো? এই আমার মেঘবালিকা। আমার বন্ধু।

মেঘবালিকার পুরুষ বন্ধু’র অগুনতি কাহিনী রয়েছে। সম্প্রতি এক জনের সাথে তার বাসষ্ট্যান্ডে পরিচয়। সামান্য কথাবার্তা, টেলিফোন নাম্বার বিনিময়, তার ২/১ দিন পরই তার মহা প্রেম, হাবুডুব’। যতই বোঝাই ততই সে অনঢ়। ছেলেটি প্রেম নিবেদনের আগ পর্যন্ত বিষয়টি গ্রহনযোগ্য ছিল, ব্যাঘাতটা ঘটলো তারপরই। ছেলেটা ভাব গতি বুঝে যখনই তাকে প্রপোজ করল, ওমনি সে খ্যাত, গাইয়া এবং ছাগল গোএের অতি সামান্য একজন পুরুষ হয়ে উঠল। দ্বিতীয় পুরুষটিও প্রাথমিক দর্শনে সুপুরুষ। কিন্তু দীর্ঘ দর্শনে ‘সংস্কৃতিহীন’, ‘অ-সভ্য’। কাজেই চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই। ৩য় পুরুষটি মেধাবী, সংস্কৃতিমনা; মেঘবালিকার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ও যত্নবান। কিন্তু তার বয়সটা উদ্ধেগজনকভাবে বেশী। সামাজিক পরিচয়ে পরিচিত করা তাকে কঠিন। চতুর্থ পুরূষটির বিশেষন, বর্ণনার অপেক্ষা রাখেনা, কারন সে অসম-ধর্মী। ৫ম পুরুষটি-কে হয়েছেন বা হবেন; তা আমি জানিনা। তবে নিঃসন্দেহে বাতিলকৃত চার জনের মততো নয়ই। মেঘবালিকা বন্ধু তুমি কি রাগ করবে? যদি আমি পঞ্চম পুরুষের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করাই? জানি তোমার অভিমান হবে। তাই বললাম না। আমাকে পৃথিবীর সব অন্তরঙ্গ গোপন কথা বলা যায়, আর আমি তার এইটুকুন ‘গোপন‘ রাখবো না!!! তাই মেঘবালিকার বাকি কথা গোপন রাখলাম। শুধু এইটুকুন বলি, মেঘবালিকা ৫ম পুরুষটিকে হঠাৎ একদিন হুট করে বিয়ে করে ফেললো। এই রহস্য কেউ জানলোনা,কেউ বুঝলোনা। ক্যানভাসে ছাইরঙে ধূসর আকাশ আঁকা একটা সবুজ তামাটে দীঘল আলোর জানালা যদি বেয়ে এসে কাপড়ে পড়ে, আকাশটা ক্রমশ প্রসারিত হয়। হঠাৎ আকাশের এককোনায় জমে থাকা কালো মেঘ ক্যানভাস চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত আকশে। ঐ কালো রং আকাশ নগ্নতা ঢেকে দিতে চেয়েছিল! হে ঈশ্বরী নারী ! হে মানবী ! আকাশে যেওনা, যেওনা তুমি, পাতালে ফিরে আসো বালিকা!!! ফিরে এসো পাতালে।

শহরটা ক্রমশ গোলকধাঁধা হয়ে উঠছে। ডানের রাস্তা বায়ে, বায়ের রাস্তা ডানে, এই রকম ভুল হচেছ। রাত বাড়লেই কুকুরের চিৎকার, একগুয়ে ল্যাম্পপোস্ট...ইত্যাদি ইত্যাদি। যতই শহর ছেড়ে দূরে যাই, মনে হয় সব ছেড়ে চলে যাই। মেঘনা নদীর জল বয়ে আনি মেঘবালিকার জন্য। তার চোখে জল দেখেছিলাম, আর ভেবেছিলাম, কোন এক পূর্নিমার রাতে আলো দিয়ে সেই জল শুকিয়ে দেবো। মরতে মরতে ওর মধ্যে আমি বেঁচে থাকবো। বেঁচে যাওয়া আর বোধ হয় হলোনা আমার। স্বপ্নের শরীর খসে পড়লে মানুষ বড় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সময়কে তখন অদৃশ্য মনে হয়, যতই কাজ-কাজ-কাজের ভেতরে ডুবি, স্বপ্নকে ভূলে থাকবো বলে, ততই অসহায় নিঃস্বরন চলে। মনে পড়ে, কেন মেঘবালিকা মৃত্যুমুখী হোল, কেন সে সবাইকে ছেড়ে চলে গেল? কিসের অহংকারে, কোন অভিমানে।

একটা অপরিচিত দ্বীপে একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম; মনে পড়ে মেঘবালিকা তোমার? কিছুতেই খূঁজে পাচিছলামনা নিজেকে, কোথায় আমি, কেনই বা????? হঠাৎ একদিন মনে হলো, বেঁচে থাকাটা নির্মম কোন অপরাধ নয়, বরং অবলম্বন। চূড়ান্ত প্রগতি ও সভ্যতার পেছনে ছোটা... হাজার বছর বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম, তোমার মনে পড়ে? চুলে, চোখে, নখে, আবিষ্কারের যাবতীয় পরিনত শব্দাবলী তখন ! চাইলেই লেখা যায় সুদীর্ঘ একটা উপন্যাস যার প্রতিটি শব্দের ক্ষরণ ধীরে ধীরে আমার বুকে, শ্বাস-প্রশ্বাসে ভার হয়ে নেমে আসে, আর আমি হৃদয়ে ক্যান্সার বহন করতে শুরু করি। একটা যুদ্ধ চলে, আর সেটা হলো, মরা না মরার যুদ্ধ। বন্ধুর সঙ্গে যেমন শক্র শব্দটি ভয়ংকর, তেমনি ‘মৃত্যু’ ও ‘মৃত্যুহীন’। এই যুদ্ধটা কি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ? নাকি কোন ব্যাভিচার মিলন দৃশ্য?



চার পরিনত বন্ধু,

‘রোদ’, চেতন’, ‘সন্ধ্যা’ এবং ‘রাএি’, এই চারজন ‘পরিনত বন্ধু’। ‘পরিনত‘ শব্দটির অর্থ কেবলমাএ ‘প্রাপ্ত বয়স্ক’ নয়, একই সংগে অনেকটাই ‘অপ্রাপ্ত’। প্রাপ্তির পাশাপাশি অপ্রাপ্তি কি করে কুঁড়ে খায় তাই নিয়েই এইসব বান্ধব কাহিনী।

‘রোদ’ একজন নারী লেখক। ভীষন ঝলমলে, ছটফটে। সারাক্ষন কথা বলে, শোনাতেও চায়। কেউ তাকে ভালোবাসলো কি বাসলো না কি যায় আসে? রোদ ভালোবাসে সবাইকে। আজিজ সুপার মার্কেটে তার ভারী নাম ডাক। ওর পাশে যখন হাটি, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়; মনে হয়, পৃথিবীতে এমন একটি কাজ এখনও করতে পারিনি, যার জন্যে লোকে আমায় চিনবে! ভারী চোখে তাকাবে; ভেতরে পুলক ও গর্ব বোধ হবে আমার। আজিজ মার্কেটের এক তলা, দোতলার প্রতিটি দোকানের সামনে আমি দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকবো। অনেক নামী-দামী লেখক বন্ধু হবে আমার। ‘রোদ’ কে দেখে আমার এরকম অনুভূতি হয়। ওর কবিতা, প্রেমের উপন্যাস, প্রবন্ধ, শব্দকোষ সবধরনের লেখায় দক্ষতা আছে। একজন মানুষ একসঙ্গে এত দক্ষ কেমন করে হয় ? অবাক হই। অবাকেরা আমার কপাল বেয়ে মাটিতে নামে। টিকটিকির মত নিঃশব্দে হাটে। তারপর কোথায় যায় কে জানে?

বছর কয়েক আগে রোদের একটা পৌরানিক কল্পকাহিনী বেড়িয়েছে। কোন এক ভীনদেশী রাজকুমারীর গল্প। বইটার শুরুতে তসলিমা নাসরীনের ‘মামদো ভূতের‘ ছবি। আহমদ ছফার সম্পর্কে উনি দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন। সুন্দর সুন্দর কথা। কি করে র্সূযাস্তের ঘোরে রোদেলার জন্ম হোল, কি করে প্রবল রশ্মি ওকে আরো গাঢ় রং দিল, এইসব কথা। আমি ভাবলাম; নিশ্চয়ই একদিন এরকম একটি বই ছাপা হবে আমার। সেই মুখবন্ধ লিখবেন এমন কি কেউ আছেন? জানিনা। সাহস করে একটি দুটি ‘কবিতা’ লিখতে শুরু করলাম। এখন আমি. কবিতা লিখছি আর ভাবছি-দিগন্ত শেষে এক মহাসূর্য্যের প্রতিক্ষার প্রহর গুনছি আমি। ঢং ঢং ঢং, ঘন্টা বেজে যাচ্ছে, প্রহর পেরিয়ে যাচ্ছে, কোথায় আমি ? কবিতাগুলো আদৌ কবিতা হচ্ছে কি?

খুব সাহস করে রোদকে আমার কয়েকটা কবিতা মেইল করে পাঠালাম। তারপর অপেক্ষা করছি...ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড, এ যেন সেই গ্রামের বাড়ীর পুকুর ধারের নাগান মরিচ গাছ। এক, দুই, তিন, চার, একশ, একশ এক, তারপর ক্লান্তি,গোনা শেষ হয়না, শেষ পর্যন্ত উত্তর আসে; ‘রোদ,’খুব ভাল হচ্ছে, আই, এম, প্রাউড অফ ইয়ু”। কবিতা ভাল হলো কি হলোনা, তার চেয়ে বেশী-আমি পুলকিত, শিহরিত, লেখক-কবি বন্ধুর প্রশংসা শুনে। সারাটা বিকেল আমার আনন্দে কাটে। পৃথিবীর তাবৎ জীব-জন্তু, পশু-পাখী সুন্দর মনে হয়। শাহবাগে যাই, আজিজ মার্কেটের সবগুলো দোকান ঘুড়ি, ক্যাসেট কিনি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাই, বন্ধুদের সিগরেট কিনে দিই। চেতন সাজেশন দেয় ‘আদিসভা’ বলে একটা ইয়াহু গ্রপস আছে, ওখানে ‘কবিতা’ পোষ্ট করলে নাকি ভাল মতামত পাওয়া যায়। আমি সাইবার ক্যাফেতে ঢুকি। আদিসভার কিশানকে কবিতা পাঠাই। একদিন, দুদিন এভাবে চলতে থাকে আবার অপেক্ষা। আদিসভার সদস্যরা বিশ্রীভাবে গালিগালাজ দিয়ে মেইল করতে থাকে। এইসব কবিতা’ কোন কবিতাই হয়নি, শব্দ ব্যবহারে যৌনতার গন্ধ, ছন্দ, বাক্য, সবকিছুতেই ঝামেলা । নিজেকে তখন মহা বোকা মনে হয়, মহা ‘গরু’ মহা ‘ছাগল’...। ঝাঁ ঝাঁ রোদ রশ্মি মাথা থেকে পায়ে নেমে আসে। ঢাকা শহরের দালান বাড়িতে ফিরে যাবার কথা ভুলে যাই; হাটতে থাকি গ্রামদেশ বরাবর, মাইলকে মাইল হাটতে থাকি, খুঁজে বেড়াই ধানক্ষেত, কাঁদার মাঠ, কচি পাটগাছ, বাঁশের সেতু, কালীগঞ্জ বাজার, ভেঙে পড়া মন্দির, ভুলে যাই, কবি বন্ধু, আদিসভা, আজিজ মার্কেট আর ‘অন্তরা’র লুচি-সবজি।


৫. চেতন হংসরাজ..
‘চেতন’ নামে নাকি হিন্দি সিরিয়ালের একজন নায়ক আছে। সেই নায়ক দেখতে অসাধারন সুন্দর। আমাদের চেতনও নিজেকে পৃথিবীর একজন অসম্ভব সুন্দর পুরূষ বলেই দাবী করে। সকাল বেলায় সে খুবই উত্তেজিত হয়ে এসে বলল, দেখ ব্রিটেনের যুবরাজ চার্লস তিন দশক ধরে প্রেম করে প্রেমিকা ক্যামিলাকে বিয়ে করেছে। খুব ইন্টারেষ্টিং না? পেইনফুলও বটে, তাইনা! এতদিন র্ধৈয্য ধরল!!! আহারে!!! আমি বললাম, যুবরাজদের আবার বিয়ে করা আর না করা! সুখী মানুষদের আবারও সুখ? দাড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যায়না! চেতন প্রবল আপত্তি জানালো; সুখের আবার শেষ কিরে? ওর নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুখ, হাটতে হাটতে সুখ, বাসে চড়ে সুখ, চুমু খেয়ে সুখ.. সবকিছুতেই সুখ সুখ লাগে? ‘অ-সুখ’ বলে ওর জীবনে কিছু নেই। আমার ‘কবিতা’ নাকি কিসব ‘অখাদ্য-কুখাদ্য‘ হচ্ছে এবং এইযে ভালো হচ্ছেনা এইটি নিয়েও তার সুখ। আমি খুবই মর্মাহত, পীড়িত, বন্ধুর এহেন আচরনে, চিন্তায়। পৃথিবীর সব পুরুষ কি এইরকম? না, না, এইরকম না। খোকনদা ওইরকম ছিলনা। খোকনদা যখন ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি লিখতো, সমস্ত প্রান জুড়িয়ে যেত; প্রতিটি দিন ডাকপিয়নের প্রতীক্ষায় কাটতো... তিনটি শালিক খূঁজে খূঁজে বের করতাম আর বলতাম; ‘থ্রি ফর লেটারস,’ ---‘ থ্রি ফর লেটারস’----

চেতনের সাথে দেখা নাই কয়েকদিন। ওর সংঙ্গে দেখা না হলে, বিষন্নতা বাড়তে থাকে। নিজেকে দূদর্শাগ্রস্ত মনে হয়, পরিত্যাক্ত হবার ‘সম্ভাবনায়’ ভুগি। দূরত্বের আড়ালে লুকিয়ে রাখি নিজেকে, ভয় হয়,ভয় হয়, আবারও ভয় হয়। দুদিন পরপর চেতন এরকম হারিয়ে যায়। এই ভয় ওকে ছুঁয়ে যায়না; ও দিব্যি হাসতে হাসতে বলে, ‘শোন, এবার না সীতাকুন্ডে জাহাজ কাটা দেখতে গিয়েছিলাম। অথবা শেরপুরের হাতির পাল কবে ওকে তাড়া করেছিল, সেই গল্প। কোন না কোন পৃথিবীর সরল ছবি ওর আঁকা চাই । বাহ্যত মনে হতে পারে সব সত্য। হয়তোবা পুরোটাই মিথ্যা। এই যেমন গত সপ্তাহে চার্লস-ক্যামিলার বিয়ে নিয়ে সে উত্তেজিত। আমায় এসে বললো, ‘রাএি, চলনা আমরা বিয়ে করি। আমি তোকে ভালোবাসি, বিশ্বাস কর, ভীষন ভালোবাসি।’ আমি বললাম, ভালোবাসিস, ভালো কথা, তো বিয়ে করতে হবে কেন?’ ও বললো, প্রেম এখন ওর তীব্র স্বাদ হয়ে উঠেছে। আপেলের মত কচকচ করে সে প্রেম খাবে। আমি অবাক হই, ছি: একি কথা!! এরকম একটা রোমান্টিক বিষয় নিয়ে ‘ফান’? তখন ও খুব সিরিয়াস হয়ে আমার হাত ধরে বললো, ‘রাএি, আমি এত সভ্য, ভব্য নই। তোর মত রবি ঠাকুরের আবেশ ধরানো গান আমি গাইতে পারিনা। আমি বরং ওই গানটা গাইতে পারি----আমিতো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে।.. .. .. .. গানটার মানে কিরে? দ্যাখ, আমার শরীরটা কেমন গাছ হয়ে উঠবে, আর আমি তা দিনের পর দিন মেনে নেবো? চল আমরা সংসারের সবুজ গেলাসে সুরা পান করি।’

আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে। কেউ এসে চেটেপুটে লুট করে নিলেও আমি টের পাবোনা। মগ্নতা এমনই শরীরে বয়ে যায় আমার। ভেঙে পড়ে কোমল মাটির শরীর। আমি ভাবতে পারিনা, একি ভোগ ভাঙার চাওয়া? নাকি প্রেম? প্রেম কি ভোগ মানে? আনন্দও তো প্রেমে পড়েছিল হেরম্বের ‘দিবারাএির কাব্যে’। সেই প্রেম তার শরীরের সঞ্চয় ছিল, তার নৃত্যভঙি, তাল, তেহাইয়ে ফেটে পড়েছিল সেই সঞ্চয়। আমার ভেতরেও কেমন কল্পনার ফানুস বাসা বাঁধছে। চেতনকে নিয়ে আগুনে ঝাপ দিতে ইচ্ছে করছে। আগুনের উত্তাপ পোড়াচ্ছে আমায়। ‘হে সূর্য, আলোর নাট্যে একাঙ্কিকা যদিবা মহৎ, তবুও তোমার দৃশ্যে মেঘের বাসর রচে দিও।’ হাসানের মত আমিও কি র্সূযকে বলবো, ‘মেঘের বাসর রচে দিও’,.. .. .. ‘মেঘের বাসর রচে দিও’।


সন্ধ্যা
সন্ধ্যাকে গোধূলির মত নরম, কোমল, বেহাগ ভাবতে পারিনা। যদিও গড়নে কোমল, পড়নে নমনীয় সবুজ, অথচ তুখোড় বুদ্ধিমতী, যুক্তিবাদী, নিরাশের আশ্রয়। মনে হয় পৃথিবীর সবটাই ও জানে। একা নারীর যুদ্ধ পলে পলে ওর কথায়, চিন্তায় বাসা বেঁধেছে। এর বাইরে নিজেকে ভাবতে পারেনা সে। এক ক্ষিপ্র, যন্ত্রনাহত রহস্যজাল তার জীবনে আঘাত হানছে। ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ ও ‘স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠার জন্যে যুক্তি-তর্ক ও কলাকৌশলে নিজেকে অংকের কঠিন সূত্রাবলীতে বেঁধে ফেলেছে সে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন হয়, কি চাই তার ? নিশ্চিত নিরাপদ জীবন? নাকিসে প্রশ্নহীন সমাধানের দিকে ফিরেও তাকায়না; কেবলি চলা, চলা আর চলা।

ও সেই নারী, বাড়ী ভাড়া নিতে গেলে যার পদে পদে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়; ‘স্বামী নাই’ তাহলে ‘বাবা-মা’, অথবা নিদেনপক্ষে ছোট ভাই বা বোন নিশ্চয়ই থাকবে। ‘অবিবাহিত’ এবং ‘একা’ এইটি বাড়ীওয়ালারা মেনে নেয়না, যেন ছোটভাই ওর রক্ষাকর্তা! বহুকষ্টে নবোদয় হাউজিং সোসাইটিতে সাততলার মাচায় একখানা ঘর পাওয়া গেল, তাইতেই তার বাস। সাততলার বহুজাতীয় সম্ভাবনা ও বিড়ম্বনা একইসঙ্গে উপভোগ এবং অস্বস্থি দুটোকেই মেনে নিতে হয়। প্রতিদিন একবিরাট আকাশ; কাক সাম্রাজ্য, আর মহাসূর্য্য ওর পৃথিবী ঘিরে রাখে। পচাঁত্তর ধাপের সিড়ি বেয়ে ওঠা ও নামা। মাঝে মাঝে থামা। প্রতিদিন একটি করে কবিতা রচনা করা যায়, কখনও বিশাল ---- কখনও জটিল। একবার কবিতার সংগে ব্যান্ড পার্টির ---- একক এ্যালবাম রচনা করল সে। সারারাত ধরে ব্যান্ড পার্টি বাজনা বাজাল আর সন্ধ্যা তার অসুস্থ ভাইয়ের পরিনতির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল। নিজস্ব সুখ, স্বাচ্ছন্দে ডুবে গেল সে। দৈহিক সম্পর্কে নীতি মানা না মানা, এইসব তাকে আর দ্বিধায় ফেললোনা। সন্ধ্যা ডুবে গেল, ডুবে গেল।

ওকে আমার ‘বৃক্ষ’ মনে হয়, বিশাল বৃক্ষ। যার ছায়ায় একটা সকাল, একটা দুপুর, একটা গোধূলি পার করে আমি লাউডগার মত নম্রতায়িত হই। কখনও কখনও উষ্ণতা ধার করে, শরীরে বিলাই, হাপুস-হুপুস করে খাই। ভয় কাটাবার এ এক মজার খেলা। ধার যখন বেশী চাই, তখন বৃক্ষটা ঢলে পড়ে, মর্মাহত হয়, যেন ‘কচ্ছপ’ হয়ে মাটিতে ঢুকে পড়ে। একদিন, দুদিন, তিনদিন.. অনেকদিন ওর কোন খোঁজ থাকেনা। যদি কোন গভীর অরন্য হতে পারতাম? তাহলে বৃক্ষটি নিশ্চয়ই ছেড়ে যেতে পারতোনা। যদি কোন গভীর সমুদ্র হতে পারতাম ! তাহলে কচ্ছপটি নিশ্চয়ই সাগরে ভেসে উঠত! কিন্তু আমি গভীর অরন্য বা গভীর সমুদ্র কোনটাই হতে পারলামনা। সর্ষে ক্ষেতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকলাম দীর্ঘকাল। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলোনা, ভেতরে গভীর বাজন বাজতে থাকল; ‘সন্ধ্যা মালতী যবে... ফুলবনে ঝুড়ে......।’

আমার অনুভূতির জায়গায় প্রবল সৎ হতে চাই, আর বলতে চাই..., যে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস আর আস্থার ছায়া গায়ে মেখেছি, তার কোনটা মিথ্যে ভান নয়। তুমি বিশ্বাস করো, অনুভূতিগুলোকে ধূলোয় মিশে যেতে দিওনা। সন্ধ্যা আমায় বিশ্বাস করে কিনা জানিনা, তবে ভালোবাসা দেয়। অনেক জখম আর পঁচে যাওয়া ক্ষতে, আর্য়ূবেদ লাগায়। আমি পুটিমাছ ভাজা আর ঘি দিয়ে, দু’বেলা পেট ভরে ভাত খাই। এ আমার ভীষন শখের খাওয়া। গ্রামদেশে গেলে বুবু আমায় পেট ভরে খেতে দিতেন। পাখীরা, মাছেরা চোখ ভরে এই দৃশ্য উপভোগ করত। দাদা তার শীতল পাটি বারান্দায় বিছিয়ে মাটিতে শুয়ে থাকতেন। আর বুবু তালপাখায় বাতাস নাড়তেন। পাশের ঘরের সফু কাকা প্রায় সময়ই দাদা আর বুবুর অন্তরঙ্গ সময়ে গান শোনাতেন; তার একটা হোলঃ ‘কইনসান দেহি, কইনসান দেহি আমার প্যাটের খাওন কি? আল্লাহতালায় দিসে খাওন, গরম ভাত আর পুটি-ঘি’। প্রিয় খাওয়া নিয়ে এসব রসিকতা রৌদ্রজয়ী হয়ে উঠেছে আজ। সন্ধ্যা একে বলে, ‘স্মৃতির অপরন্তহীন ঢেউ’, আর আমি বলি ‘ঘুমহারা বিষাদ’। ডুবিয়ে মারে, আবার উঠায়, আবার উঠায়, কি মানে? কি মানে জীবনের? সন্ধ্যা বলে, ‘পথ যতদূর যায় তারচে ঢের দূর আমাদের জীবনের মানে’। এই মানে বুঝিনা। সন্ধ্যা কি সব বুঝে? সব জানে? সন্ধ্যা কি ক্রমশ ঈশ্বর হয়ে উঠছে?



পরিশেষ ও প্রিয় কবি

নামটা এমন হলে ভাল হোত জয়গো-স্বামী। দুহাত জড়ো করে প্রনাম করতাম। কিন্তু নামটা ‘জয় গোস্বামী ! প্রনাম করিনা, মাথার নিচে তার বইগুলো নিয়ে ঘুমাই। মনে হয় মাথার উপর স্বপ্নেরা খাড়া ঝুলতে থাকে। ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’, ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল,’ হাতড়ে বেড়াই। প্রতিরাতে বালিশের পাশে বেডসাইড টেবিলে তাকিয়ে দেখি থরে থরে সাজানো কবিতারাশি। ‘পাঁচিলে দাঁড়িয়েছি, বৃষ্টি এসে কথা বলতে চায়। কথা বলেওছিলাম, প্রেরনাদোলায়। অথবা গুনগুন করি, ‘সকলেই টুপি, লম্বাপানা, সকলেই বলো ভালোবাসি। সকলেই যদি কবিকে বলে ‘ভালোবাসি‘, কবি কি তা মেনে নেবে? লম্বা চুল, লম্বা দাঁড়ি, ঘন মোছ, তীক্ষ চেহারা; এই কবিকে আমি ভালোবাসি। কবি কি তা মেনে নেবেন? হয়ত তিনি মানা-না মানা নিয়ে আরেকটি কবিতা লিখবেন; কিন্তু সত্যিই কি তিনি মেনে নেবেন? হয়ত প্রশ্ন করবেন, কি ভালোবাসি, কবিতা? কবিতার অনুভূতি? স্টাইল? মানুষ কবিকে তো চিনিনা, ভালোবাসিনা। আর সব মানুষকে কি চিনি? বন্ধুদের কি চিনি? গভীর বোধে আচছন্ন হয়ে আছি। সারা শরীরে অযত্ন কাটাছেরা, বাধনহীন, নির্মম। একটা গুরুত্বহীন পাখী, একটা গুরুত্বহীন কবিতার মত, একটা গুরুত্বহীন মানুষ। ঘুমিয়ে থাকে, আড়ালে..নি:শব্দে, আর ভাবে, প্রিয় কবি, অসহায় কবিতা আর নিষ্ঠুর পাঠক। সকাল নেই, দুপুর নেই, বিকেল নেই, বিষন্নতারা চোখ, মুখ, উজাড় করে খায়। কেবল কয়েকটি কবিতাই অসহায়ত্বের সঙ্গী, নিরব সংসার। একথা বান্ধবেরা কি জানে? জানে না। চেতন একটা অলৌকিক স্বপ্নের কথা বলেঃ

‘মাটির তলে বাড়ী-তার উপরে গাড়ী,
তার উপরে বাঁশ-সেই বাঁশেরই অন্ধকারে আমার লম্বা লাশ
লাশের গায়ে চুন-কেউ দেখেনি
শোকের মুখে শোক পোহাতে আমার হোল খুন।’

এই অলৌকিক স্বপ্নটা রূপকথার মত চোখে ভাসে, ভাসে আর হাসে; মনে হয় শুয়ে পড়ি ধানিজমির নিচে; বাবাকে ডাকি, দাদুকে ডাকি, বুবুকে ডাকি, বলি; ‘বান্ধবেরা বুকে জড়িয়ে ধরেছিল বাবা; বান্ধবেরা রোদ্দুরে ছায়া দিয়েছিল; তবুও দেখো, শাঁখাগুলো কেমন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, চাঁদ ফসকে ডুবে গেল কুয়োয়। ... এখন তাই কেবলই অন্ধকার, গাঢ় অমাবস্যা; আয়নায় দেখি পশুর মত মুখ আমার, অতৃপ্ত বান্ধবে।


প্রিয় কবি, লিখেছেন,

‘আজ নয় অন্ধকার, আজ নয় দূরত্ব পাথর
আজ নয় দ্বগ্ধ লেখা, নয় মাথা ঠোকার দেওয়াল
নয় পাপ, স্বীকারোক্তি, কান্না অনুশোচনার ঘর. .
আজ শুধু খোলা চাঁদ, আজ শুধু তারা চোখে পড়া
একা উদযাপন আজ,
একাকী দ্বিশত পূর্ণ করা ।’

আমি তাই পূর্ন দিগন্তে লাবন্য ধার চাইলাম; হে বন্ধুরা, আমায় লাবন্য দাও,লাবন্য দাও, কেবলি লাবন্য দাও।




লেখক পরিচিতি
মৌসুমী কাদের
জন্ম : ময়মনসিং। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।

কবি। গল্পকার। সুরকার। সঙ্গীত শিল্পী

৩টি মন্তব্য:

  1. আমার জন্ম ময়মনসিং নয়। তবে আমার পূর্বপুরুষের জন্ম সেখানেই। আমি কবি নই, কবিতা লিখিনা, শুধুই গল্প লিখি। বাকি পরিচয় গুলোতে নিজেকে একটু একাকার এবং বিব্রত লাগছে। -মৌসুমী

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ছোটখাটো ব্যাপারে নজর দেবেন না। গল্প ভালো হচ্ছে এটাই বড় ব্যাপার একজন গল্পকারের। আসলেই ভালো হয়েছে।

      মুছুন
    2. ছোটখাটো ব্যাপারে নজর না দিলে গল্প লিখবো কি করে? মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, শাহীদ।

      মুছুন