বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

নিতাই বৈরাগীর সঙ্গীতকথা

শিমুল মাহমুদ


একটা কালো মহিষ। রমজান মুন্সির একমাত্র পুত্র রমিজ মহিষটার পিঠে বসে আছে। মাঝে মাঝেই বাতাসের শরীরে ওর শরীর সাঁতরে উঠছে। মাথায় গামছা বাঁধা। রমিজ গামছাটা খুলে মহিষটার পিঠে রাখলো। বাবলা গাছের কচি চিকন পাতাগুলোর ফাঁক গলে বাতাস বইছে। রমিজের খানিকটা ঘুম পায়। শিশুবেলার মতো কখন হিসি লেগেছে বুঝতে পারে নি। তারপরও মহিষের পিঠ থেকে নামতে ইচ্ছে করে না। গরুর দল বিলের কাছে পৌঁছে গেছে। রমিজ পিছিয়ে পড়ছে ক্রমাগত। সারিসারি মাঝ বয়সের খেজুরের আইলের কাছে আসতেই মনে পড়ে গত রাতের স্বপ্নের কথা। খেজুর গাছের লম্বা সরু কাঁটার ডগা থেকে ফোটায় ফোটায় সাদা দুধ ঝরছে। রমিজ আরও কাছে এসে মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেজুরের কাঁটাগুলো পরখ করতে থাকে। এমন একটি আজগুবি স্বপ্ন দেখার কোনো কারণ খুঁজে পায় না।

একটা সাদা বকপাখি ক্রমাগত উড়তে থাকে; তারপর বিলকুমারি পাড়ি দেয়। এখনি ঝুপ ঝুপ সন্ধ্যার বাতাস ডাক ছেড়ে কাঁদবে; তারপর অন্ধকারের শরীরে সেঁধিয়ে গিয়ে ক্রমাগত ভারি হবে; তারপর যখন চাঁদ উঠবে আকাশে তখন চাঁদের আলোর সাথে বাতাসেরা গড়িয়ে নামবে মাঠে। মাঠে মাঠে ঝুলে থাকবে রাত। রাতে মাঠের ফসলেরা নিঃসঙ্গ কাঁদে। ওদের শরীরে ভূতের আছর হলে ওরা চাঁদজোছনা গিলতে থাকে। তখন ভয় থাকে না। শুধু কবরের ভেতর ভয়। একমাঠ ভর্তি রাতের ভয়গুলো নতুন কবরের ভেতর গিয়ে জেঁকে বসে। কবরবাসীরা অনেকদিন পর ঘুমের আয়োজনে একা হয়ে গেলেও ভয় ওদেরকে পাহারা দেয়। লাশকে কেউ পাহারা দেয় না। শুধু ভয়েরাই পাহারা দেয়। মৃতদেহের একমাত্র সঙ্গি কবর ভর্তি ভয়।

রমিজ হঠাৎই নেমে আসে উঁচু মহিষটার পিঠ থেকে। তারপর ছোটছোট খেজুর ঝোঁপের কাছে গিয়ে প্রস্রাব করে। একজোড়া বাবলা গাছের সাথে একটা বয়েসি অর্জুন গাছ। গাছগুলোর ছায়া ক্রমাগত লম্বা হতে থাকে। রমিজ আজ কেনো যেনো দীর্ঘ সময় তাকিয়ে তাকিয়ে ছায়াগুলোকে দেখে। ছায়াগুলো ক্রমেই গাঢ় হয়, যেন বা আকার বদলাতে থাকে খুব সন্তর্পণে। তারপরও রমিজ দেখতে পায় সেই ছায়া পাল্টানোর দৃশ্য। ছায়ার ভেতর একটা নিঃসঙ্গ পাখির শরীর। বাতাস খুব গোপনে কাঁদতে থাকে। রমিজ ছায়ার দিকে হাঁটছে; তারপর ছায়ার শরীরে ঢুকে যেতেই গামছাটা বিছিয়ে খানিকটা বসে; তারপর শুয়ে পড়ে। রমিজের যেন বা ঘুম পায়। উনিশ বছরের রমিজের এবার সত্যি সত্যি ঘুম পায়। ঘুমোবার আগে পানি খেতে ইচ্ছে করে। উঠতে ইচ্ছে করে না। রমিজ ক্রমান্বয়ে শূন্যে এসে যায়। পায়ের কাছে একজোড়া শালিক গল্প করতে থাকে। ঘাস পোকারা তখনো লুকিয়ে ছিল। সন্ধ্যার পর ওরা বাইরে আসবে। মানুষ অন্ধকারে বাইরে আসতে চায় না। কবরস্থানে তিনটি বেজি মনে মনে বুদ্ধি আঁটে। ওরা আজ সন্ধ্যার পর নতুন কবরের মাটি উপড়ে ফেলে কবরের ভেতর ঢুকে যাবে। লাশের সওয়াল জবাব শুনবে। লাশের শরীর জুড়ে কর্পুরের গন্ধ। লোবানের গন্ধ ভেসে আসছে মৃতবাড়ি থেকে। শিশুরা মৃত্যুর মহিমা বোঝে না। মৃত্যুর কোনো মহিমা নেই। রমিজ ঘুমোচ্ছে; কিছুটা মৃত্যুর কাছাকাছি। একজোড়া পরী সন্ধ্যাকাশে উড়ে যেতে যেতে অর্জুন গাছের ছায়ায় রমিজকে ঘুমোতে দেখে প্রথমে বিষণ্ন হয়; তারপর ওকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে মাথার কাছে এসে দাঁড়ায়। পরীরা দুই বোন। পরিবেশটা ঘিরে একঝাঁক মায়া ছড়িয়ে পড়ে। পরীরা দুই বোন রমিজের চুলে আঙুল বুলায়। এবারে রমিজ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

লাশখেঁকো শিয়ালেরা কবরস্থানের মাটি খুঁড়ছে। লাশটা একা কবরের নীচে শুয়ে কাঁদে। শেয়ালেরা সেই কান্না শুনতে পায়। একটা শেয়ালের ভীষণ কান্না পায়। তারপর শেয়ালেরা খুব করুণ একটানা একটা সুর তুলে কেবল কাঁদতেই থাকে। গেরস্থের গোয়াল ঘরের গরু সেই কান্না শুনতে পেয়ে আরও জড়সড়ো হয়। একটা দুধগোখরা গাই গরুর পা পেঁচিয়ে দুধের বাটে মুখ রাখে। গাভির ওলান ক্রমাগত শিথিল হয়ে আসে। বাছুরগুলোর ঘুম আসে না। ড্যাবড্যাবে চোখে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে সাপের হিশহিশ আওয়াজ শুনতে থাকে।

তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। নিতাই বৈরাগী রমিজকে অর্জুন গাছের তলা থেকে ডেকে তোলে, ক্যারে বা মুন্সির ব্যাটা, সাইজা আন্ধারে ঘুম যাও ক্যানে, পরীতে ভর করলে কাইন্দা কুল পাইবা না, ওঠ বাজান, একখান গাহান বানছি।

বৈরাগীর আঙুল নড়ে ওঠে। একতারার তারে টান পড়ে। বৈরাগীর গলা কাঁপতে থাকে। সেই কাঁপনে বৈরাগীর গান বাতাসে মেশে। তারপর গাছের পাতায় গিয়ে সুরেরা বিষণ্নতা ছড়িয়ে দেয়। পাতাগুলো যন্ত্রণায় যন্ত্রণায় ঝরে পড়ে। সেই পাতা ঝরার দৃশ্য কেউ দেখতে পায় না। রমিজ দেখতে পায় ঝরে পড়া পাতাদের দেহ বিবর্ণ বাতাসে ভাসছে।

ও মন না কান্দিও আর
জনম ভর মানুষ দেখলা, মন দেখলা না
এই শরীরের কী যে মায়া, ক্যামনে যাই ছাড়িয়া
ও মন না কান্দিও আর...

রমিজের ঘুম জাগা মন কেবলি উথাল-পাথাল হয়। আর তখন পরীরা দুই বোন রমিজের বুকে একটা চকমকি পাথর ছোঁয়ায়। রমিজ আলাভোলা হয়। ঝাঁকঝাঁক জোছনার সাথে রমিজের চোক্ষের পানি কেবলি উথলে ওঠে। রমিজ নিতাই বৈরাগীর পায়ে মাথা রেখে চিক্কুর পাইড়া কান্দে। একতারার তারে আঙুলের টোকা ঘন হয়, তীক্ষ্ণ হয়। বৈরাগীর গলার রগ ছিঁড়ে যেতে চায়। আর তখন পরীরা দুই বোন একতারার তীক্ষ্ণ লম্বা শব্দের সাথে কেবলি গলে যেতে থাকে; তারপর জোছনার সাথে মিশে যায়।

মসজিদের ভেতর নীরবতা। রমজান মুন্সি ইমামতি করছেন। তেনার পেছনে দুই কাতার মানুষ। নিয়ত বেঁধে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে সবাই। করমালির মাথায় কেদারগঞ্জ হাটের দৃশ্য কেবলই ঘুরপাক খায়। তিনটা লুঙ্গি বাকিতে বেঁচতে হয়েছে। একটা গামছার অর্ধেক দাম আদায় করতে পেরেছে। বাদবাকি টাকা কীভাবে উদ্ধার করা যায়; চিন্তাটা ক্রমশ ঘন হয়। রুকুতে গিয়ে করমালি চুপ করে থাকে; তারপর সেজদায় গিয়ে আল্লার কাছে নালিশ জানায়। রমজান মুন্সি সুর করে সুরা ইয়াছিন পাঠ করছেন। অনেক সময় ধরে বদ বাতাসটা আটকাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। রমজান মুন্সির পা জোড়া বাতের ব্যথায় টাটাতে থাকে। অজু নষ্ট হলেও তিনি নামাজ পড়াবার দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যান না। সেজদাতে গিয়ে পাকদরবারে আর্জি জানায়, হে পরওয়ারদেগার মাফ কর। দ্বিতীয়বারের বদগন্ধের সাথে যেন অমাশয়ের বেগ আসে। আশে পাশের কেউ বদগন্ধ পেলো কিনা সে চিন্তায় রমজান মুন্সির সুরাপাঠ বিকৃত হয়। নামাজ শেষে নফল আদায় না করেই মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। শরীরে কুলায় না, লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরেন। পেটের পীড়ায় ঠিকমত নামাজ আদায় করার উপায় নেই। কিন্তু ইমামতির দায়িত্বটা ছাড়লে গায়ে ইজ্জত ধরে রাখা মুশকিল হবে। বাবলা গাছের কাছে এসে রমজান মুন্সি থামে। বসতে ইচ্ছে করে। অথচ হাঁটু ভেঙে বসতে গেলে বাতের ব্যথা আরও তীব্র হবে। বসার সাহস হয় না। রমজান মুন্সি বাবলা গাছটাকে ধরে। তারপর নাপাক শরীরে নামাজ পড়াবার অনুশোচনায় খোদাকে বার দুয়েক ডাকে। সন্ধ্যার বাতাস মুন্সিকে সান্ত্বনা জানায়। মুন্সি বাতাসের ভাষা বুঝতে পারে না।




লাঠিবাবা নিতাই বৈরাগীর শ্যামাসঙ্গীতে বিভোর। লাঠিবাবার নাম কেউ জানে না। হিন্দু না মুসলমান তাও না। জলপাইগুড়ি না কোথাকার লোক যেন। গেরুয়া বসন। ঘাড় পর্যন্ত চুল। ঘন ঘন তামাক খান। ঠোঁটজোড়াতে তামাকের কালচে খয়েরি দাগ লেপটে আছে। শরীর থেকে একটা ভয় ভয় বদগন্ধ ভেসে আসে। ইউনিয়নবোর্ডের রাস্তা যেখানে এসে শেষ হয়েছে সেই রাস্তার পুবে একটা পাকুড় গাছ। তারপর নদীর কাছ ঘেঁষে শ্মশান। এই শ্মশানেই লাঠিবাবা আস্তানা পেতেছেন। লাঠিবাবার হাতে আছে একটা আকাবাঁকা লাঠি। লাঠির শরীরে রুপো দিয়ে বাঁধানো সব বিচিত্র আকৃতির সাপ। মন্ত্রপড়া লাঠি। লাঠির আঘাতে রোগব্যাধি নিরাময় হয়। একবার অনেক দিন আগে কোনো এক মুসলমান পল্লীতে লাঠিবাবা বাস করতেন। একদিন একজন মৃতপ্রায় মুসলমানকে ভক্তরা লাঠিবাবার কাছে নিয়ে এলো। লাঠির আঘাতের জন্য সবাই আর্জি জানালো। অথচ কিছুতেই লাঠিবাবা রাজি হন না। অবশেষে ভক্তদের কান্নাকাটিতে লাঠি দিয়ে মুমূর্ষু লোকটার শরীরে আঘাত করতেই জান বের হয়ে গেলো। আর যায় কোথায়। থানা থেকে পুলিশ এলো। লাঠিবাবাকে আটকিয়ে রাখলো গরাদে। কিন্তু সকালে উঠে সবাই দেখতে পেলো লাঠিবাবা গরাদের বাইরে এসে বসে আছেন। এরপর প্রতিদিনই তাকে গরাদে আটকানো হলো আর প্রতিদিনই কীভাবে যেন তিনি বাইরে এসে বসে থাকেন। ব্যারিস্টার সাহেব এসে হাতজোড় করে কেঁদে ফেললেন, বাবা তোমার বিচার করার ক্ষমতা মানুষের নেই, তোমার বিচার করবে উপরওয়ালা। তারপর বাবা একটা হুঙ্কার ছাড়তেই বজ্রপাতের সাথে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। সেই বৃষ্টির মধ্যে লাঠিবাবা হাঁটতে হাঁটতে এক সময় মিলিয়ে গেলেন।

নিতাই বৈরাগীর মনে লাঠিবাবার জন্য মায়া জাগলেও সে তার শিষ্যত্ব নেয় না। তন্ত্রমন্ত্রে বৈরাগীর ভয়। আবার ঠিক বিশ্বাসও পায় না। অমাবস্যার রাত। নিতাই বৈরাগী লাঠিবাবার কাছ থেকে বেশ কিছুটা দূর চলে আসার পর ঘুরে দাঁড়ায়। ঘরে ফিরতে মন চায় না। কে-ই বা আছে ঘরে। একমাত্র মেয়ে মায়ারাণী। শ্বশুড়বাড়িতে পাঁচদিন থাকার পর পালিয়ে এলো। তারপর আর ফিরে যায় নি। নিতাই এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। দু দুটো বর্ষা চলে গেছে, এর মধ্যে মায়ার শ্বশুড়বাড়ি থেকে কেউ খোঁজ নেয় নি। বৈরাগীর মনটা তেঁতো হয়ে ওঠে। শ্মশানের দিকে হাঁটতে থাকে বৈরাগী। লাঠিবাবাকে কোথাও দেখা গেল না। হঠাৎই দূরে একটা ছায়াকে হেঁটে যেতে দেখে নিতাই পিছু নেয়। লাঠিবাবার শরীরটাকে চিনতে পারে। আর তখনই লাঠিবাবা উধাও। নিতাই অবাক হয়। থমকে দাঁড়ায়। মাথার ওপর মেঘের গর্জন। নদীর জল ঝলসে গিয়ে আকাশ থেকে বিদ্যুৎ নামে। সেই বিদ্যুতের সাথে মেঘের কোল থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসেন লাঠিবাবা। তারপর জলে নেমে মুখ দিয়ে নিজের নাড়িভুড়িগুলো উগলে এনে গঙ্গার জলে খলখলিয়ে ধুয়ে নিলেন। একসময় জলে ধোয়া নাড়িভুড়িগুলো গিলে ফেলে লাঠিবাবা তীরে উঠে এলেন।

নিতাই বৈরাগী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। থরথর করে কাঁপতে থাকে। বুকটা শুকিয়ে চিরচির করে ওঠে। দূর অন্ধকার থেকে শ্যামাসুর ভেসে আসে। নিতাই বৈরাগীর গলার সমস্ত সুর কেবলই বুকের গভীরে সেঁধিয়ে যায়। লাঠিবাবা হঠাৎই বৈরাগীর সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বৈরাগীর গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে হনহন করে শ্মশানের দিকে হেঁটে যায়। নিতাই বৈরাগী অন্ধকার নদীর দিকে তাকায়। চোখে কিছুই দেখতে পায় না। বুকটা ডাক ছাড়ে। উথাল পাথাল হয়। ভূতগ্রস্থের মতো হাঁটতে থাকে গাঁয়ের দিকে। মসজিদের পাশ ঘেঁষে যেতে যেতে মনে মনে নিজেকে বোঝাতে থাকে যা দেখলাম তার সবটুকুই মিথ্যে, সব মিথ্যে। লাঠিবাবার ভেলকিবাজি কিছুতেই মেনে নিতে পারে না বৈরাগী। মসজিদের সামনে চাতাল ঘেরা আঙিনা থেকে জিকিরের ধ্বনি ভেসে আসছে। খানকা শরীফে সিন্নি হচ্ছে। নিতাই বৈরাগী জিকিররত অন্ধকার মানুষগুলোর পেছনে গিয়ে ছায়ার মতো বসে পড়ে। তারপর ঝিমোতে ঝিমোতে ভোররাতের দিকে ঘুমের ভেতর একটা গান বেঁধে ফেলে।

ভবের খেলা মিছা রে ভাই মিছা ধর্মভেদ
আল্লারসুল রামশ্যাম এক নৌকায় বসা
গোঁসাই পার হবো ক্যামনে বলো আন্ধার দইরা
যে ভগবান সেই আল্লা নিতাই কহে কান্দিয়া

গলা বেয়ে উগলে আসতে চায় গান। একতারাটা গলা থেকে নামায়। তারপর তারে আঙুল ছোঁয়াতেই জলসার আধা ঘুমন্ত মানুষগুলো স্বপ্ন দেখতে থাকে। স্বপ্নে মায়া ছড়াতে শুরু করলে সুরের কান্নায় যেন সবাই খোদার নিরাকার শরীরকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। রমজান মুন্সি এতক্ষণ মারেফতি ধ্যানে ডুবে থাকলেও চোখ তুলে কান দুটো সজাগ করে। শুনতে পায় বৈরাগীর মায়াকাতর করুণ কণ্ঠ। নিতাই বৈরাগীর চোখ দুটো ছলছল করতে থাকে। সুবেহ সাদেকের বাতাস সেই চোখে চুমু খায়। বৈরাগীর চোখজোড়া পরিতৃপ্তিতে বুজে আসতে চায়। কাশেম মোল্লার ছেলে সানকিতে সিন্নি এগিয়ে দেয় বৈরাগীর দিকে। বৈরাগী তখন দেহক্ষুধার ঊর্ধ্বে পৌঁছে গিয়ে দেখতে পায় লাঠিবাবার লাল চোখ। বৈরাগী থমকে যায়। রমজান মুন্সি রাতজাগা গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, এই বেতমিজ বেধর্মীডা এইহানে কেমতে আইলো, ওরে যাইতে কও, এহন নমাজ অইব।

নিতাই বৈরাগীর বুকে তখন লাঠিবাবার ওপর, রমজান মুন্সির ওপর আর অন্ধকার রাত্রির ওপর অভিমান বলক তোলে। গলা চিরে বেরিয়ে আসে,

রাখো তোমার নমাজ রোজা মিছা ধর্মলীলা
এই দুইনা মিছা গোঁসাই মিছা কেরামতি...

রমজান মুন্সির চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। এখনই চোখ থেকে কবরের সাপের মতো আগুন ছিটকে বেরুবে। তারপর রাতজাগা বাতের ব্যথায় দুর্বোধ্য গলায় বলে, নাউজুবিল্লা।



লোকে বলে নিতাই বৈরাগীর কন্যা মায়ারাণীর চরিত্রে দোষ আছে। পাঁচ গ্রামের মুরব্বিরা ওদের একঘরে করেছে। বাপবেটিতে সাতগ্রাম ঘুরে গান বাঁধে। কলতলায় জল খেয়ে প্রাণ জুড়ালে কৃষ্ণদীঘির পাড়ে বসে দীঘির জল দেখে, সন্ধ্যা দেখে। মায়ার মনটা উদাস হয়। চোখে মায়া ছড়ায়। বাড়ি ফিরে ঝোলা থেকে চালডাল বেগুন পটল বের করে নিরামিষ রাঁধে। শ্মশান ঘাট থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসে। ক্রমেই সেই সুর কাছে আসতে থাকে। কবর স্থানটা পার হবার সময় রমিজের বাঁশির শব্দ আরও তীব্র হয়। রাস্তা ছেড়ে এবারে রমিজ মাঠে নামে। ধানের আঁটিগুলো জাগায় জাগায় পাজা করে রাখা। ধান গাছের গোড়াগুলো রমিজ খালি পায়ে মাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে যায়। ডান পাশে কিসের যেন শব্দ হয়। তারপর শব্দটা ক্রমাগত দীর্ঘ হয়। রমিজ বাঁশি থামায় না। কবর স্থান থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসে। পরমুহূর্তেই রমিজদের পাড়া থেকে শোনা যায় কুকুরের ডাক। রমিজ নিতাই বৈরাগীর ছোট উঠোনের দক্ষিণ পাশে এসে নিম গাছের নীচে বিচালির ওপর বসে পড়ে। তারপর বাঁশিটা রেখে বৈরাগীর হাত থেকে হুকোটা নেয়। অনেক সময় ধরে গুরগুর করে ধুঁয়া টানতে টানতে চারিপাশে একটা মিষ্টি তামাক গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। এক সময় ঢোলকটা নিয়ে আসার জন্য মায়াকে ডাকতে থাকে।

মায়ারাণীর দুহাতে দুখানা কাসার থালা। থালা থেকে ধুঁয়া উড়ছে। নিমগাছটার শাখাগুলো দোল খায়। একঝাঁক বাতাস দ্রুত ছুটে যেতে থাকে। মায়া খানিকটা দাঁড়ায় তারপর থালা দুটো বাবার সামনে রেখে ফিরে যায় জল আনতে। রমিজ নিমগাছের পাতায় চোখ রাখতেই দেখতে পায় একটা বিশাল গোলাকার চাঁদ কেবলি জ্বলজ্বলে শরীরে হাসছে। সেই হাসিতে নিতাই বৈরাগীর দেহ কেবলি চমকে উঠতে থাকে। থালার ভেতর ভাপ ওঠা ভাত চাঁদের আলোয় থইথই আবেগে কাঁপছে। জোছনার আবেগে বৈরাগীকন্যার শরীর ক্রমেই অচেনা হয়। হলুদ শাড়ির রঙ চাঁদের রঙের সাথে বদলে গিয়ে অশরীরী আলোয় মায়া ছড়াতে শুরু করেছে। একটা মা বেড়াল দুটো বাচ্চা সাথে করে থালার সামনে এসে বসে থাকে। চাঁদের আলোয় ওদের চোখগুলোর রঙ বদলে গিয়ে কথা বলে ওঠে। রমিজ সেই কথা শোনার জন্য ওদের চাঁদআলোয় থইথই শুভ্র শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। রমিজের মনটা ভারি হতে থাকে। চাঁদের আলো যখন আরও গভীর হয়ে তরল হতে শুরু করে রমিজ তখন বৈরাগীর হাত ছুঁয়ে দেয়। বৈরাগী থালা থেকে থইথই জোছনা মুঠো মুঠো তুলে মুখে পুরে দিচ্ছে। মায়ার পাশে বৈরাগীর কুকুর তিনটে বসে কেবলি লেজ নাড়তে থাকে। ওরা আজ সারারাত জোছনা খাবে। ওদের চোখে মুখে যেন অপার্থিব সুর ফুটে উঠতে চায়। কুমারি কুকুরটা মায়ার বা হাতের কনুইতে জিভ দিয়ে চাটতে থাকে। মায়া বিরক্ত হয় না। ভূতগ্রস্থ পরীর মতো মায়া বৈরাগীর দিকে জল এগিয়ে দেয়; তারপর রমিজের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, গোঁসাই ভাত খাবি না?

থালাটা তুলে নিয়ে খাওয়া শুরু করে রমিজ। জোছনায় থইথই নিরামিষ খেতে খেতে আবারো গোলাকার চাঁদটার দিকে তাকায়। চাঁদটা আরও বড় আরও পরিষ্কার হয়ে ক্রমেই মাথার ওপর উঠে আসতে শুরু করেছে। রমিজ অর্ধেক নিরামিষসহ থালাটা বিড়ালগুলোর দিকে এগিয়ে দিয়ে কাসার মগটা তুলে নেয়। বুক ভর্তি করে জল খায়। তারপর বাঁশিটা তুলে নিয়ে বলে, বৈরাগী কাকা, আইজ ঢোলক না বাজাই।

: হ বাজান সুর তোল, বাঁশিটার ফুটায় বুক ভইরা ফুঁ দে, দেখ মুনিষ্যি শইলে কত দম আছে, বাজান দম রাখ বুকে, তোক আমি মুনিষ্যি দমের সক্কল কেরামতি শিখাইয়া যামু।

আরও ঘন হয়ে বসে রমিজ। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে, কাকা একখান গাহান বানছি, শুনবা?

রমিজ আকাশের বিশাল আলোঝলমল চাঁদকে সাক্ষি রেখে মনে মনে বৈরাগীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। গলা চিরে গান প্রকাশ করতে চায়। মায়ার দিকে বাড়িয়ে দেয় বাঁশিটা। সেই বাঁশিতে মায়া ঠোঁট ছোঁয়ায়। তারপর চাঁদের আলোর সাথে যখন রাতের গন্ধ ভেসে আসতে থাকে তখন ওরা সুর তোলে গলায়। তখন সেই নির্বোধ পল্লীতে ঘুম নেমে আসে। বক পাখিরা ঘুমায়, ঘুঘু পাখিরা ঘুমায়, খোয়াড়ের হাঁসমুরগিগুলো ঘুমায়, শ্মশান ঘাটের ঝাকড়া পাকুড় গাছের শাখায় শকুনেরা ঘুমায়, মানুষ ঘুমায়; শুধু ঘুমায় না কবর স্থানের বেজি। ওরা নতুন কবরের মাটিতে গর্ত খুড়ে লাশের কাছে পৌঁছে যায়; তারপর লাশের সওয়াল জবাব শোনে।

মায়ারাণীর চারিধার অশরীরী শরীরেরা চাঁদের আলোর সাথে ফিসফিসিয়ে কথা বলতে থাকে। মায়া বাঁশি থামিয়ে কান পেতে সেই কথা শুনতে চায়। তারপর রমিজের দিকে তাকিয়ে বলে, গোসাই ঘুমাইবা না, রাইত ভারি হইছে, বাড়িত যাও এহন।



অনেকদিন পরে ভবা পাগলা ফিরে আসে গাঁয়ে। তার কবিরাজির এখন খুব নামডাক। ডাক পড়ে রমজান মুন্সির বাড়ি। চকিতে হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে বসে আছে রমজান মুন্সি। ভবা পাগলা পায়ের কাছে বসে রমজান মুন্সির দুপায়ের হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ঝেড়ে দিচ্ছে। কুমিরের কাঁটা দিয়ে হাঁটুর ওপর তিনবার বাড়ি মারলো। তারপর কাঁটার আঁচড়ে খানিকটা রক্ত বের করতেই রমজান মুন্সি মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো, হারামজাদা খুন বাইর করছস ক্যান?

ভবা পাগলা দাঁত বের করে মুন্সির পায়ের দিকে অধিক মনোযোগ দিয়ে বিরবিরিয়ে ওঠে, কুছ পরওয়া নেহি মুন্সিজি, বদখুন বাইর হউক।

এরপর ভবা পাগলা বেজির চর্বি দিয়ে তৈরি তীব্র ঝাঁঝের গন্ধয়ালা গরম তেল মালিশ করতে শুরু করলো। মালিশের সাথে সাথে ক্রমাগত সুর করে মন্ত্র পড়তে থাকে,


বিসমিল্লা ইল্লা যেখানের রসা সেখানে গিয়া মিল্লা
আইট রসা পাইট রসা টাইট রসা চুঙ্গা রসা
যা নিয়া যে না কয় সর্বাঙ্গে রসাক্ষয়
তার শ্বাশুড়ি সুলতানে কয়
তিরিশ অঙ্গের রসাক্ষয়
বিসমিল্লা ইল্লা যেখানের রসা সেখানে গিয়া মিল্লা
রসা যদি না যাইস
দোহাই আলীর মাথা খাইস

রমজান মুন্সি ক্রমেই আরাম বোধ করতে থাকে। এশার আজানের আগ দিয়ে ঝাড়া শেষ হলে রমজান মুন্সি সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মনে মনে খোদাকে ডাকে। মুখমণ্ডল ক্রমশ প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। মনে মনে ঠিক করে সাত দিন বাদে বাদে ভবা পাগলার ঝাড়া নিতে হবে আর এখন থেকে সে লাঠি ছাড়াই মসজিদে যাবে। ভাবতেই মসজিদের আঙিনা থেকে ভেসে আসে নিতাই বৈরাগীর গান, ও মন আল্লা রসুল বুঝবি কবে, বুঝবি গোর আজাব...

রমজান মুন্সি ঘুরে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতরে চৌকি থেকে হাতের লাঠিটা তুলে নেয়। তারপর হনহন করে মসজিদের দিকে হেঁটে যায়।

: বৈরাগী, তোমারে না মসজিদ ঘরের সীমানায় আসবার না করছি?

কথা বলতে বলতেই রমজান মুন্সি লাঠি তোলে। তারপর বৈরাগীর মাথায় একটা আঘাত করে। বৈরাগী রমজান মুন্সির দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎই এগিয়ে এসে মুন্সির পায়ের কাছে ধপ করে বসে পড়ে। পরমুহূর্তেই চিৎকার করে ওঠে, মুন্সিজি আমি মানুষ না, আমার কুনো ধর্ম নাই, ভগবানের কিরা আমারে মাইরা ফ্যালান...

বৈরাগী চিক্কুর পাইরা কান্দে। রমজান মুন্সি পিছিয়ে যায়, নাউজুবিল্লাহ, শয়তানডায় কয় কি!

তারপর অন্ধকারের মধ্যে পুকুরঘাটের দিকে হাঁটতে থাকে। ওজু বানাতে হবে। বেধর্মীটা ছুঁয়ে দিয়েছে তাকে।

সেইরাতে নিতাই বৈরাগীর রক্তবমি হয়। আকাশে তখন শুক্লপক্ষের চাঁদ। থইথই জোছনা। দূর থেকে ভেসে আসছে নদীর গান। নদীর জল গান গাইছে। করুণ চিকন আর দীর্ঘ সেই গান। গাব গাছে লক্ষ্মী পেঁচা দু’বার ডেকে অন্ধকার চিরে উড়ে গেলো। বৈরাগী রমিজকে খুঁজতে থাকে। এখনো এলো না বাজান। মায়াকে যেতে বলে। মায়া বাবার কাছ ছাড়া হতে চায় না।

: বাবা ও বাবা, দম লইতে কষ্ট হয়? ভগবানের নাম লও। বাবা, ও বাবা এত কষ্ট হয় ক্যান তোমার?

: মায়া, যা মা যা রমিজরে ডাইকা আন, ভগবান আইব না আমার কাছে, একটা মানুষ ধইরা আন মা।

মায়া বাবার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। তারপর ছুটে বাইরে চলে যায়। কুকুর তিনটা পিছে পিছে ছুটতে থাকে। নিতাই বৈরাগীর মাথার কাছে মা বেড়ালটা বাচ্চা দুটো নিয়ে ক্রমাগত চেঁচাতে থাকে। অর্জুন গাছের কাছে আসতেই মায়া রমিজকে দেখতে পায়। ওরা দ্রুত বৈরাগীর বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে। মায়া কিছুই বলে না। রমিজ উতলা হয়। বারবার জানতে চায়, বৈরাগীর কী অইছে, কস না ক্যান, এই মায়া হুনছস...

মায়া দ্রুত পা চালায়। বাঁশ ঝাড়ের তলা দিয়ে হেঁটে যেতেই কুমারি কুত্তাটা করুণ গলায় ডেকে ওঠে। বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক গলে উঁচুতে একটা আলোর কুণ্ডুলি ক্রমাগত জঙ্গলের দিকে ছুটে যেতে থাকে। পাশের কবর স্থানের ভেতর একটা ভীষণ রকমের শব্দ তীব্র হতে গিয়েও মিলিয়ে গেল। নদীর ধার ঘেঁষে দ্রুতপায়ে লাঠিবাবা হেঁটে আসছে। সহসা মায়ার পথ আগলে বলে ওঠে, বল হরি হরিবোল, আয় মা আমার সাথে আয়।

মায়া থমকে দাঁড়ায়। লাঠিবাবার প্রতি ভয় আরও ঘন হয়। লাঠিবাবার শরীর থেকে ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। লাঠিবাবার পেছন পেছন রমিজ, মায়া আর বৈরাগীর কুকুর তিনটে দৌড়াতে থাকে। ওদের পেছন পেছন ওদের ছায়াগুলোও দৌড়াচ্ছে। ছায়াগুলো বৈরাগীর ঘরের মধ্যে এসে হুড়মুড়িয়ে থেমে যায়।

নিতাই বৈরাগীর মাথার কাছে মা বেড়ালটা তার দুটো বাচ্চা নিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে। রমিজের দিকে বেড়ালগুলো চোখ তুলে চাইলো। ওদের চোখ ভেজা। আলো আঁধারিতে থইথই করছে সেই চোখের জল। বৈরাগীর উঠোন জুড়ে কুকুর তিনটে মাথা নীচু করে বসে আছে। চারিধার ঝাঁকঝাঁক জোনাকিরা আলো ছড়াচ্ছে। মায়া ঘরের দরজার কাছে বসেই থাকলো। তারপর কুকুর তিনটে কেঁদে উঠতেই মাটি থাপড়ে চিৎকার করে উঠলো মায়া। বৈরাগীর নিথর আঙুল থেকে রমিজ একতারাটা ছাড়িয়ে নিয়ে বিছানার ওপর রাখে। ঘরের চালায় বাতাসেরা একতারার সুর তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। লাঠিবাবা ঘরের বাইরে গিয়ে রামহরি হরিনাম রবে চিৎকার করে উঠতেই শ্মশান ঘাটের পাকুড় গাছের মাথায় ঘুমিয়ে থাকা শকুনগুলোর ঘুম ভেঙে যায়। থইথই চাঁদের আলোতে ওরা শকুনি চোখ তুলে তাকায়, তারপর কান পেতে থাকে।




শ্মশান থেকে ফেরার পথে রমিজ অর্জুন গাছটার নীচে এসে বসে। তখন সুবেহ সাদেক। রমিজের দেহ মাটির ছোঁয়া পেতে কাতর হয়। উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলো রমিজ। অর্জুন গাছের পাতায় পাতায় তখন কেবলি আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। পরীরা দু'বোন অর্জুনের শাখা হতে নেমে এসে রমিজের মাথার কাছে বসে থাকে। রমিজ ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। স্বপ্নের দেশ থেকে নিতাই বৈরাগীর গান ভেসে আসে,


ভবের খেলা সাঙ্গ হলো ও মন শক্ত কইরা বান্ধো
পইড়া রইব প্রেম পিরিতি ফিরতে হবে এবার
ও চান্দ ক্ষয় হইয়া যায় রে মন
ও চান্দ ক্ষয় হইয়া যায়...

রমিজের চোখে পরীরা দু'বোন চুমু খায়। ঘুমের মধ্যেই বৈরাগীর গানে রমিজের বুক শীতল হয়, ভারি হয়, তারপর বুকের ভেতর বলক ওঠে। দিনের প্রথম অর্জুনপাতা একটি দুটি করে ঝরতে থাকে রমিজের শরীরে।

রমজান মুন্সি ফজরের নামাজ পড়াবার জন্য মসজিদের দিকে যেতে যেতে অর্জুন গাছের নীচে এসে ঘুমিয়ে থাকা রমিজকে দেখতে পায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে লাঠির খোঁচায় জাগিয়ে দেয় ওকে। তারপর বুকের ভেতর যন্ত্রণা অনুভব করে। ছোয়ালডার দিকে চাইয়া বুকটা হু হু করে ওঠে, বাজান এই বিহানে এইহানে ঘুম যাও ক্যান, ওঠ বাজান ওজু বানাও গিয়া।

রমিজ ধীরে ধীরে উঠে বসে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ পর বাপজিকে নিতাই বৈরাগীর মৃত্যু সংবাদ দেয়। প্রথমে রমজান মুন্সির বুকটা ধ্বক্ করে উঠলেও মুখে একটা প্রসন্নের রেখা ভেসে ওঠে, যাক দুইনা থাইকা একডা কাফের বিদায় নিছে।

রমিজ ফ্যাল ফ্যাল চোখে ওর বাপজির দিকে তাকায়। তারপর বোকার মতো বলে, বাজান বৈরাগীর লাইগা দোওয়া করবা না, বৈরাগী বেহেস্ত পাইব না?

রমজান মুন্সি এবার বিরক্ত চোখে তাকায়, কস কি মুকখো, কাফেরের জন্য দোয়া কিয়ের, এক মুসলমান ছাড়া দুইনার আর কেউ বেহস্ত পাইব না, বেহস্ত কিনতে হলি নমাজ রোজা লাগব না?

রমিজ যেন আরও খানিকটা বোকা হয়ে যায়। তারপর বাপজিকে তার কাছে অনেক দূরের বাসিন্দা আর ভয়ানক অচেনা মনে হয়। রমিজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়; তারপর বিলকুমারির দিকে হাঁটা ধরে। কবরস্থানে একটা বেজি একটা নতুন কবর থেকে দিনের আলোয় বের হয়ে আসে; তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে, হাসতেই থাকে। কবরবাসী শুনতে পায় বৈরাগীর গান, কিবা বসত কিবা ভিটা কিবা ছোয়াল মাইয়া... এই দুইনা মায়ার খেলা মিছা পুতুলখেলা...

জুম্মা বাদে গাঁয়ের মুরুব্বিদের মধ্যে শলাপরামর্শ হয়। রমজান মুন্সির একমাত্র পুত্র রমিজ গতকাল রাতে নিতাই বৈরাগীর বাড়িতে বৈরাগীর মেয়ের জন্য ভাত নিয়ে গিয়েছিলো। নাউজুবিল্লা। গাঁয়ে গজব নামব। মুন্সি মাইনসের পুত, কোথায় হাফেজ সাব হইব, মুন্সির মুখখান বড় করব, তা না বৈরাগী হইছে, গাহান বান্ধে। এখনও সময় আছে, দ্বীনের পথে আইতে হইব ওকে। অতঃপর সিদ্ধান্ত হয় গাঁয়ের ইজ্জত বাঁচাতে হলে বৈরাগীর বেটির গাঁয়ে থাকা চলবে না। তারপর যখন রমিজ মসজিদ ঘরের শলাপরামর্শের কথা জানতে পারে তখন কালো মহিষটার পিঠে উঠে ধীরে ধীরে গাঁয়ের বাইরে চলে যায়। বিলকুমারি ছেড়ে, কৃষ্ণদীঘির ধার ঘেঁষে আরও অনেকটা দূরে, যেখানে নিতাই বৈরাগী আর তার মেয়ে গান গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়ায়। রমিজ বাতাসের শরীরে কান পেতে মনে মনে সেই গান শুনতে চেষ্টা করে। তারপর সত্যি সত্যিই যেন সেই সুর শুনতে পায়।

তখন সন্ধ্যা। সন্ধ্যার পর মায়া মাঠে নামে। দূর থেকে দেখতে পায় রমিজকে। বুকটা হা হা করে ওঠে। রমিজের ওপর রাগ হয়। একবার মনে হয় রমিজের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। অথচ মনের ভেতর বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না। না পেলেও শুধু একটু সময় দাঁড়িয়ে থাকবে। বাবা রমিজকে খুব ভালোবাসতো। মায়া হাঁটতে থাকে নদীর তীর ধরে। শ্মশানের কাছে চলে আসতেই দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর চিতার দিকে তাকিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলে। চোখ মুছে নিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। অনেক দূরে দুটো বাবলা গাছের নীচে ওদের ছাপড়া ঘরটা ঝাপসা দেখা যায়। উঠোনের সামনে নিম গাছটার শরীর যেন বিষের ছোবলে আরও তেঁতো হয়ে উঠেছে। মায়া নিজেকে শক্ত করে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে ইউনিয়নবোর্ডের রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। আর ঘণ্টা দুয়েক হাঁটলেই রেলইস্টিশন।

মায়া অন্ধকার খোঁজে। শুক্লপক্ষের চাঁদ চারিধার মায়া ছড়াতে শুরু করেছে। মায়া চাঁদের আলোয় ভয় পায়। পেছন পেছন যেন নিতাই বৈরাগীর গান হাওয়ায় হাওয়ায় ভাসতে থাকে। বৈরাগী মেয়েকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মায়া শিহরিত হয়। একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে বলে ওঠে, বাবা। তারপর একতারাটা বুকের সাথে ঠেঁসে ধরে আবার হাঁটতে থাকে। পথের দুধারে খেজুর গাছের সারিসারি ঝোঁপ ঘিরে ঝাঁকঝাঁক জোনাকপোকা আলো ছড়াতে থাকে। মায়া মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটে। তারপর হঠাৎই বসে পড়ে পথের পেছন দিকে চাঁদের আলোয় যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে থাকে; তারপর তাকিয়েই থাকে। জোনাকিরা ওর আঁচলে আসে, তারপর চুলে, মায়ার সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকির আলো অশরীরী মায়ার জগৎ তৈরি করে। সেই মায়াময় আলোর মধ্যে বসে মায়ারাণী কেবলি ফোঁপাতে থাকে। তারপর মনের ভেতর বাবার মুখের পাশাপাশি রমিজের মুখটা পরিষ্কার হয়ে আসতেই মনে মনে বলতে থাকে, গোসাইকে একবার বলে আসলে ভালো হতো।



কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুনিয়া জোড়া আলোয় ভরে উঠলো। পরপরই প্রচণ্ড বাজের শব্দে তালগাছজোড়ার মাথা ন্যাড়া হয়ে যায়। গাছজোড়ার নীচে রমজান মুন্সি দাঁড়িয়েই থাকে। পায়ের কাছে পড়ে থাকে বর্ষার মৃত ইলিশ আর ব্যাগ ভর্তি বাজার। আরেকটা পোটলাতে রমিজের জন্য নতুন লুঙ্গি, একটা সাদা টুপি আর চিকন কাপড়ের পাঞ্জাবি। রমজান মুন্সির প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাঁট করার বাতিক ছিলো। বাতিকটা এই শেষ বয়সে এসে যেন আরও বেশি করে পেয়ে বসেছিলো। সেদিন ফজরের নামাজ শেষে রমজান মুন্সি মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, যে করেই হোক তার একমাত্র পুত্রকে বৈরাগ্যের পথ থেকে দ্বীনের পথে ফেরাবে, নামাজি বানাবে, তারপর বিয়ে দিয়ে সংসারি বানাবে। রমজান মুন্সির জীবনের শেষ ইচ্ছেটা পুরণ হলো না। কেয়ামত নেমে এসেছে; সেই কেয়ামত যেন দুনিয়ার মাটি উপড়ে ফেলতে চাইছে। কবরস্থানের বেজিগুলো থরথর করে কাঁপতে থাকে। শেয়ালেরা প্রথমে খিকখিক করে হাসতে থাকলেও এক সময় ভয় পেয়ে কাঁদার কথা ভুলে যায়। রমজান মুন্সি তার জীবনের এই শেষ ঝড়টিকে দেখতে পায় না। মুন্সির ঠাডা পড়া শরীরটা তাল গাছজোড়ার নীচে অর্থহীন শুধু দাঁড়িয়েই থাকে। মুন্সির পা জোড়ায় এখন আর বাতের বেদনা নেই। অন্ধকার ঝাপিয়ে বৃষ্টি নামে, তারপর এক সময় সেই বাজপড়া বৃষ্টি থেমেও যায়। হঠাৎই খানিকটা সময়ের জন্য হলেও দুনিয়ার গতি থমকে দাঁড়ায়।

পরদিন জহরের নামাজ শেষে রমজান মুন্সির জানাজা হয়। রমিজ বাপজানের পক্ষ থেকে সবার কাছে মাফ চায়। বাপজানের কোনো ঋণ থাকলে পরিশোধ করার ওয়াদা করে। তারপর খাটিয়াটা কাঁধে উঠিয়ে নেবার পরও রমিজের চোখ দিয়ে পানি বের হয় না। কবর স্থানের ভেতর এসে রমিজ যেন খানিকটা ভয় পায়। সরু কবরের মধ্যে নেমে পড়ার পর পা দুটো কাঁপতে থাকে। বুকের ভেতরের ভয়টা এবারে গলার কাছে এসে আটকে থাকে। কাফন পরানো রমজান মুন্সির মাথার দিকটা রমিজের দু’হাতে, মাজার দিকটা ধরে আছে নিয়ামত চাচা আর পায়ের দিকে চিকু মোল্লা। ওরা তিনজন লাশটাকে কবরের মাটিতে শোয়ায়। রমিজের হাত ফসকে যেতে চায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলের হাত থেকে রমজান মুন্সির লাশ ফসকে যায়। কবরের ওপর থেকে সবাই আহ্ শব্দে শিহরিত হয়। কে যেন বলতে থাকে, বাজান ভয় পাইছ, কব্বরের মধ্যে ভয় পাইতে নাই, আল্লার নাম লও, মনডা শক্ত কর।

কথা শেষ না হতেই চিকু মোল্লা রমিজের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, বাজান বাপজানের মুখের কাপড় আলগা কইরা দাও।

রমিজ নিচু হয়, দু’হাত দিয়ে মুর্দার মাথার গিট খুলে ওর বাপজানের মুখের কাপড় সরিয়ে মুখটা আলগা করে দেয়। রমিজ তাকিয়ে থাকে। কবরের ওপর থেকে কে যেন বলতে থাকে, আহা বাজান কব্বরের ভিতর কানতে নাই, দেইখো লাশের মুখে যেন চোক্ষের পানি না পড়ে।

রমিজের এবার মনে হয়, চিৎকার করে কেঁদে উঠবে। বাপজানের দাড়ির ওপরে ঠোঁটজোড়া দাঁতের সাথে সেঁটে আছে। চোখ জোড়া বন্ধ। চোখের চারধারে সুরমা মাখানো। কবরের ভেতরে কর্পুরের গন্ধ।

: বাজান, মুর্দার মুখখানা পশ্চিমে হেলাইয়া দেও।

রমিজ ওর বাপজানের মুখ ধরতে ভয় পায়। সরু কবরের মধ্যে জায়গা নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখনি রমিজ হাঁটু ভেঙে বসে পড়বে। রমিজ নিজেকে শক্ত করে। তারপর আবার নিচু হয়। বাপজানের মুখটা ধরতে গিয়ে কেঁপে ওঠে। তারপর চেষ্টা করে মৃত রমজান মুন্সির মাথাটাকে পশ্চিম দিকে কাত করে দিতে। শক্ত হয়ে গেছে। মাথাটা নড়ানো যাচ্ছে না। আর তখনই রমিজের মনে হলো ওর চোখ থেকে মাত্র এক হাত নীচে মৃত রমজান মুন্সি যেন চোখের পাতা আলগা করে রমিজের দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে আছে। রমিজ চিক্কুর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। গোরের ওপরকার মানুষগুলো ওকে টেনে হিঁচড়ে ওপরে ওঠায়। পাশ থেকে কে যেন বলতে থাকে, দেলে ধম্ম না থাকলে তো বাবা কব্বরের ভিতর ভয় পাইবাই, হায় রে বদনছিব, মুন্সি মাইনসের ব্যাডা...

রমিজ গোরখোড়া মাটির ওপর উবু হয়ে বসে থাকে। তারপর দেখতে পায় একটা কালো লম্বা কেঁচো মাটি খুড়ে ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। পাশেই পড়ে আছে একটা অপরিচিত পুরোনো মৃতদেহের ডান অথবা বা হাতের লম্বা হাড়। হাড়টার দিকে কারো কোনো নজর নেই।

পরদিন লিয়াকত চাচার সাথে রমিজ ওর বাপজানের কবর জিয়ারত শেষে কবরের ওপরে সরিষার দানা ছিটাতে গিয়ে দেখতে পায় একটা গর্ত কবরের ভেতরের দিকে চলে গেছে। রমিজ বেজির গর্তটাকে বন্ধ করতে থাকে। হঠাৎই মনে হলো গর্ত দিয়ে রমজান মুন্সির একটা হাত উঠে এসে রমিজকে ঠেঁসে ধরে গোরের ভেতর নিয়ে যাবে। রমিজ দ্রুত কবরের কাছ থেকে দূরে চলে আসে।

লিয়াকত চাচা রমিজের কাছে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে, বাজান, কি অইছে, খোয়াব দেখছ, কও কী দেখলা? দেখলা তোমার বাপজান বেহেস্তের বিছানায় ঘুমাইয়া আছে?

রমিজ চুপ করে থাকে, কিছুই বলে না। হঠাৎই মনে পড়ে নিতাই বৈরাগীর কথা। বৈরাগী বেহস্ত পাইব না, বেহেস্ত শুধু ওর বাপজানের লাহান ইমানদার মানুষগুলার জন্য। রমিজ বাড়ি ফিরে আসে। বিশাল বৈঠকখানা জুড়ে তখনও কোরান খতম চলছে। ভেতর বাড়িতে দাদিজান, সাহিদা ফুপুসহ গণ্ডায় গণ্ডায় মেয়েমানুষদের কেউ নাকি সুরে কথা বলছে; কেউ এখনো মাঝে মাঝে সুর করে কাঁদছে; কেউ কেউ পাকএকোরান পাঠ করছে। রমিজের কাছে পুরো পরিবেশটা দুর্বোধ্য লাগে। হঠাৎই কালো মহিষটার কথা মনে হয়। মহিষটার পিঠে উঠে বিলের ওপারে চলে যাবে সে। এ সময় হাফিজ মুন্সি এগিয়ে আসে, তারপর নিচু স্বরে বলতে থাকে, বাজান, মুরদার আত্মা চল্লিশ দিন আপনাজনার পেছন ছাড়ব না, এই কয়ডা দিন তুমি বাড়ির বাইর হইও না; বাজান তোমার বাপজানের বেহস্ত নসীব অইব; তিনি খুব ভালা আছেন; পয়লা রাইতেই তিনি আমারে দেখা দেছেন; খোয়াবে দেখলাম তেনার জানাজায় হাজার হাজার লক্ষু লক্ষু ফেরেশতা সাদা কাপড় পিন্দা শরিক অইছে; সোবহানআল্লা, বাজান এখন যাও মসজিদে গিয়া বসো গিয়া।

রমিজ মসজিদের দিকে না গিয়ে মাঠের দিকে হাঁটতে থাকে। একসময় অর্জুন গাছটার নীচে গিয়ে বসে। গাছটার পেছনে ঝোঁপের মধ্যে একটা প্রাচীন সাপ খুব সন্তর্পণে কবর স্থানের দিকে চলে যাচ্ছে। রমিজের ঘুম পায়। তাজা রোদ ওর চোখের আলোকে ম্লান করে দেয়। রমিজ চোখ বন্ধ করে। ওর বুকের ভেতর উথাল পাথাল হয়। পরীরা দুইবোন রোদের ফাঁক গলে চোখের ওপর এসে চুমু খায়। অনেক অনেক দূর থেকে অনেক দিন আগের একটা বাউল গান ভেসে আসতে থাকে। রমিজ নিতাই বৈরাগীর সুর চিনতে পেরে নড়ে ওঠে। বাতাসের ছোঁয়ায় রমিজের কী যেন মনে পড়তে চায়। তারপর আর কিছুই মনে থাকে না। নিতাই বৈরাগী ফিরে আসে। এসে বলে, ওঠো বাজান, চলো কেষ্টপুরের মেলায় যাই, একডা নব্য গাহান বানছি।

রমিজ কেষ্টপুরের মেলায় বকুল গাছ তলায় দাঁড়িয়ে নিতাই বৈরাগী আর কিশোরী মায়ার গান শুনতে থাকে। কখন যে মেলা ভেঙে গেছে মনে করতে পারে না। মায়া এসে ওর হাত ধরে, গোসাই চলো আন্ধার অইছে, ঠাকুরের প্রসাদ লইবা চলো।

রমিজ একটা বকুল ফুলের মালা কিনেছিলো মায়ার জন্য। মালাটা খুঁজে পাচ্ছে না। আজকেও স্বপ্নের ভেতর রমিজ সেই হারিয়ে ফেলা মালাটা খুঁজতে থাকে। নিতাই বৈরাগী কেষ্টপুরের মেলা থেকে একটা ঢোলক কিনে রমিজের হাতে দিয়ে বলে, বাজা তো দেখি গোসাই, বাজা আরও জোরে তাল দে, হ্যাঁ তোর কলিজায় সুর আছে গোসাই, তুই ভালোবাসা জানিস, তোকে দিয়ে হবে রে গোসাই, তুই পারবি।

রমিজের বুকের ভেতরটা তরতরিয়ে ওঠে। রমিজ রাতদুপুরে মাঠে মাঠে একা পাগলের মতো ঢোলক বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরে আসে। তারপর বাড়িতে ঢোলকটা লুকোবার জায়গা খুঁজে না পেয়ে আবার সেই রাতেই মায়ার কাছে ওটা জমা রেখে ফিরে আসে। আজও ফেরৎ নেওয়া হয়নি সেই নিতাই বৈরাগীর দেওয়া ঢোলক।



পরীরা দুইবোন রমিজকে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। বাতাসের শরীরে ভর রেখে ওরা হাঁটতে থাকে। এক সময় পৌঁছে যায় নিতাই বৈরাগীর পরিত্যক্ত ভিটায়। একটা নেড়িকুত্তা গোল পাকিয়ে ছোট উঠোনটার দক্ষিণ পাশে শুয়ে আছে। উঠোন ভর্তি আগাছা। ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভেতর থেকে তাড়ির গন্ধ ভেসে আসছে। ঘরের মেঝেতে মাটির বাসনপত্র টুকরো টুকরো ছড়ানো ছিটানো। মাচানের ওপর যেখানে নিতাই বৈরাগী ঘুমাতো সেখানে একটা তেল চিটচিটে জরাজীর্ণ কাঁথা পড়ে আছে। রমিজ ঘরের মধ্যে বসে পড়ে। ঘরের কোণায় একটা মাটির কলসি। কলসির শরীর থেকে তালরসের পচা গন্ধ ভেসে আসছে। রমিজের তেষ্টা পায়। উঠতে ইচ্ছে করে না। ঠায় বসে থাকে। তারপর এক সময় পরীরা দুবোন ওকে নিতাই বৈরাগীর চাতালের ওপর নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

তখন কেবলই সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। রমিজের দুর্বল দেহ ক্রমেই স্বপ্নের গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে। স্বপ্নে ওর বাপজান চিৎকার করে রমিজের নাম ধরে ডাকছে। রমিজ কবরস্থানে দৌড়ে যায়। অর্জুন গাছের গোড়ায় লুকানো সেই প্রাচীন সাপটা গোর পাহারায় আছে। আর হাজারটা অজগর আজদাহা জিহ্বা দিয়ে আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছে। আগুনগুলো দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত কবর জুড়ে। রমজান মুন্সি ঝলসে যায়। এরপর এক সময় তাজা দেহ ফিরে পায়। এবারে জিন্দা রমজান মুন্সি উঠে বসে। ভয়ার্ত চোখে রমিজকে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। খেজুর পাতার ডগা থেকে দুধের পরিবর্তে আগুন ঝরছে। হঠাৎই ফিরে আসে নিতাই বৈরাগী। গলায় তার ফুটে ওঠে গান। আর সাথে সাথে খেজুর পাতার ডগা থেকে আগুনের ফুলকি নিভে গিয়ে কেবলি দুধ ঝরতে থাকে। নিতাই বৈরাগীর গানের জোয়ারে গোরের ভেতরকার সাপগুলো সব পাল্টে গিয়ে গানের পাখি হয়ে হেসে ওঠে। নিতাই বৈরাগী গোরের ভেতরে রমজান মুন্সির দিকে একতারাটা এগিয়ে দিয়ে বলে, মুন্সি একখান গাহান বান্ধো এবার।

কবরের ভেতরে রমজান মুন্সি চমকে ওঠে। নিজেকে মনে মনে সাবধান করে দিয়ে বলে ওঠে, নাউজুবিল্লা।

রমিজের ঘুম ভাঙে। ঘরের মাচার ওপর চোখ যায়। মাচার সাথে বাঁধা আছে নিতাই বৈরাগীর দেওয়া সেই কেষ্টপুরের মেলা থেকে কেনা ঢোলক। রমিজ ঢোলকটা নামিয়ে এনে সন্ধ্যার বাতাসে হাঁটতে থাকে। কতদূর যেতে হবে জানা নেই। শুধু হাঁটতেই থাকে। তারপর যখন চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো তখন রেলইস্টিশনের আলো দেখতে পায়। রেল কলোনির বস্তির দিকে বাঁক নিল রমিজ। গলি ঘুপচি। নর্দমার দুর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারে। রমিজ অনেকগুলো ছাপড়া ঘর পেরিয়ে মায়ার দরজায় এসে সরাসরি ভেতরে ঢুকে যায়।

এই কয়েকমাসে মায়ার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার ওর খোঁজ নিতে এসেছে। তখন এতকিছু চোখে পড়েনি। মায়ার পরনের শাড়ির রঙটাও যেন আজ চোখে ধাক্কা দিচ্ছে। চওড়া পাড় মায়ার শরীর পেঁচিয়ে যেন কথা বলে উঠতে চায়। রমিজ মায়ার শাড়ির ভাষা আজ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। এর আগে কি সে মায়ার হাতে চুড়ি দেখেছে? মনে করতে পারে না। ঠোট জোড়াও কেমন অচেনা। ঠোঁটের লাল রঙেরা তাকিয়ে আছে রমিজের দিকে। মায়াকে সেই রঙের ভেতর থেকে চিনে নিতে রমিজের অস্বস্তি লাগে। মায়া কি পান চিবুচ্ছে! শেষ পর্যন্ত মায়া যখন সেই পরিচিত ভেসে ওঠা চোখজোড়া দিয়ে রমিজের হাতের ঢোলকটার দিকে তাকালো তখন রমিজ মায়ার আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো। রমিজ কিছুই বলে না। শুধুই তাকিয়ে থাকে মায়ার মেঘগভীর চোখজোড়ার দিকে। মায়া মুহূর্তেই শব্দ করে হেসে ওঠে, কি গো মুন্সি, এতদিনে মনে পড়লো?

রমিজ চুপ করে থাকে। হাতের ঢোলকটা সামনে এগিয়ে ধরে। তারপর আস্তে আস্তে বসে পড়ে মাটিতে। মায়া ময়লা পরা ঢোলকটার শরীরে হাত রাখে, গোসাই এহনও কি গাহান বানতে পারো? শুনাইবা একখান?

রমিজের প্রচণ্ড অভিমান হয়। হঠাৎই মনে হলো, কার কাছে এসেছে সে! ফিরে যাবার জন্য দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো নিতাই বৈরাগীর সেই কুকুর তিনটির একটি দরজার পথ আগলে ওদের দিকে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছে। বেড়ালগুলোর কথা মনে হলো। আশে পাশে তাকায় রমিজ। না নেই। শুধু চকির ওপর বালিশের পাশে শুয়ে আছে নিতাই বৈরাগীর একতারাটা। রমিজের কেন যেনো ভালো লাগে। উঠে গিয়ে চকির ওপরে রাখা একতারাটার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। মায়া এগিয়ে আসে, ইস গোসাইয়ের মুখটা এমন চিমসে দেখাচ্ছে ক্যান, এসো মুখটা মুছিয়ে দেই।

মায়া রমিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। বুকের ভেতর কেমন যেন সেই চিরধরা ব্যথাটা ছড়াতে থাকে। এরপর সত্যি সত্যি আঁচল দিয়ে রমিজের মুখটা মুছিয়ে দেয়। ফিসফিসিয়ে ওঠে, গোসাই জল খাইবা।

রমিজের এবারে জবান খোলে। খুব আস্তে আস্তে বলতে থাকে, যেন নিজেই নিজেকে বলছে, বৈরাগী কাকা আমারে দেখা দেছে, বাপজানরে গাহান বানবার কইছে।

মায়া এবারে হেসে ওঠে, গোসাই, তোমার কি অইছে, হাছা কইরা কও দেহি।

এরপর কানের কাছে মুখ এনে আস্তে করে বলে, গোসাই আমারে মনে ধরছে, তুমি না কইছিলা তোমার কোনো ধর্ম নাই, তুমি জাত মানো না, হাছা কইছিলা?

রমিজ মায়ার আরও কাছে আসে। তারপর মায়াকে জড়িয়ে ধরে কেঁপে কেঁপে ওঠে। মায়া রমিজের মুখটা দেখতে চায়। দেখতে পায় না। রমিজের মুখ তখন মায়ার কাধে কেবলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। মায়া রমিজের গালের সাথে ওর মুখটা ঘষতে থাকে। মায়া রমিজের ভাব জগতের কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। মায়া জানে না, একদিনও হয়নি রমিজ ওর বাবাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। মায়া রমিজের একেবারে বুকের ভেতরের শব্দগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তারপর পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য অনেক দিনের জমানো গোপন কথাটা রমিজের কানের ভেতর ফিসফিসিয়ে ঢুকিয়ে দেয়, গোসাই বিয়া করবা আমারে?

রমিজ প্রথমে বুঝতে পারে না। তারপর যখন বুঝতে পারে তখন তার চোখে ভেসে ওঠে কবরের দৃশ্য। কবরের ভেতর বাপজান চক্ষু খুইলা ভয়ার্ত চোখে যেন সাবধান করছে ওকে। রমিজ ভয় পায়। আরও জোরে আঁকড়িয়ে ধরে মায়াকে। তারপর হঠাৎই ছেড়ে দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে। চিক্কুর পাইড়া কান্দে। আর তখন কান্নার শব্দকে আড়াল করে দিয়ে যেন দূর আরও বহু দূর থেকে ভেসে আসতে থাকে নিতাই বৈরাগীর গলা,

স্বর্গ বেহেস্ত মিছা আশা ও গোসাই বুঝ মানে না মন
ও আমার মনের ভিতর গোপন আছে একখান রোশনাই দুইনা
গোসাই কেমনে ভুলিব আমি সেই রোশনাই দুইনা...
ও মন না কান্দিস আর...ও আমার রোশনাই দুইনা...
ও মন না কান্দিও আর...


লেখক পরিচিতি
শিমুল মাহমুদ
কবি। গল্পকার। প্রবন্ধকার

জন্ম ৩ মে ১৯৬৭। নাড়িমাটি যমুনাপারে, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর। বাংলাদেশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পৌরাণিক বিষয়াদি নিয়ে উচ্চতর গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে লাভ করেছেন পিএইচ-ডি. ডিগ্রি। কবি হিসেবে আবির্ভাব গত শতকের আশির দশকে। স্বৈরশাসনের দুঃসহকালে কবিতার সাথে তাঁর সখ্য; সমান্তরালে কথাসাহিত্যে রেখেছেন নির্মোহ ছাপ; অধ্যাপনা পেশার সাথে মিলিয়ে নেন সমসাময়িক পাঠ; ফলে সমালোচনাতেও সিদ্ধহস্ত। এখন থিতু রংপুরে; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করছেন সাহিত্যের কাগজ ‘কারুজ’। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা পুরস্কার ২০০০’। সেইসাথে সাহিত্যকর্মের জন্য ২০১২ তে ‘বগুড়া লেখকচক্র’ এবং ২০১৫ তে পশ্চিমবঙ্গের ‘অচেনা যাত্রী ও দ্বৈপায়ন’ কর্তৃক সন্মাননা প্রাপ্ত হন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন