শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

যুদ্ধে মেয়েরা

চিনুয়া আচেবে

অনুবাদ: মেহেদী হাসান


তাদের প্রথমবার রাস্তা ধরে চলার সময় উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটেনি। তখন ছিল যুদ্ধ প্রস্তুতির উন্মাদনাকালীন সময় যখন হাজার হাজার যুবককে (এবং মাঝে মাঝে যুবতী নারীদেরকেও) যুদ্ধে নাম লেখানোর কেন্দ্র থেকে প্রত্যেকদিন সরিয়ে নিয়ে আসা হত। কারণ এদের অনেকেই নতুন গড়ে-ওঠা জাতিকে রক্ষা করতে উত্তেজিত অবস্থায় সাথে সাথে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে দলে দলে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল।


দ্বিতীয়বার যাত্রার সময় তারা সম্মুখীন হয় আওকাতে অবস্থিত তল্লাশিকেন্দ্রের। তখন অবশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং ধীরে ধীরে দূরবর্তী উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র হতে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সে অনিস্থা থেকে এনুগুর দিকে গাড়ি চালিয়ে আসছিল এবং ঐ সময় তার বেশ তাড়া ছিল। যদিও তল্লাশি চালানোর কেন্দ্রগুলোর ভেতর দিয়ে বিনা বাঁধায় চলে যাওয়ার অনুমোদন তার ছিল, তারপরও তাদের কাছে অনুবর্তী হতে সে সর্বদা মানসিকভাবে অস্বস্তি বোধ করত। বিষয়টাকে সে খুব একটা পাত্তা দিত তা নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল এরকম: তোমাকে যদি তল্লাশির ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাহলে তুমি নিশ্চয় বড় মাপের মানুষদের মত কেউ নও। তার গুরুগম্ভীর, কর্তৃত্বময় গলায়ঃ “আইন ও বিচার মন্ত্রনালয়ের, র্যাগিনেল্ড নোয়ানকো,” বলে নিজেকে ঘোষণা করার ফলে সাধারণত কোন ধরনের তল্লাশি ছাড়াই সে পার হয়ে যেত। প্রায় সবসময় সে এরকমটাই করত। কিন্তু মাঝে মাঝে তাকে চিনতে না পারার কারণ অথবা গোয়ার্তুমির ফলে অদ্ভুত তল্লাশি কেন্দ্রের লোকগুলো তার কথা মেনে নিতে অস্বীকার করত। এখন যেমনটা ঘটল আওকাতে। এলাকার প্রহরীদের হাতে আসল তল্লাশির ভার ছেড়ে দিয়ে ভারী রাইফেল কাঁধে দুইজন সাধারণ সৈনিক রাস্তার পাশ থেকে বেশ দূরের কাণ্ড-কারখানা লক্ষ্য করছিল।

“আমার একটু তাড়া আছে''--একটি মেয়ে তার গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াতেই মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে সে বলল। ''আমি হচ্ছি আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের, র্যাগিনেল্ড নোয়ানকো।''

“শুভ সন্ধ্যা, স্যার। আমি আপনার গাড়ির পেছনের মাল রাখার জায়গাটা দেখতে চাই।''

“ও যিসাস! ওখানে কী আছে বলে তোমার মনে হয়?''

“তা তো বলতে পারব না, স্যার।''

সে অবদমিত ক্রোধে গজগজ করতে করতে গাড়ি থেকে নেমে এসে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল, মাল রাখার জায়গাটি খুলে ফেলে ঢাকনাটি তার বাম হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরে ডান হাত দিয়ে এমনভাবে নির্দেশ করল যেন বলতে চাইছে--এখন দেখ ভালো করে!

“এবার খুশি হয়েছ?'' সে জোর দিয়ে বলল।

“হ্যাঁ স্যার। আপনার কাগজ পত্র রাখার জায়গাটা দেখতে পারি একবার?''

“হে সর্বশক্তিমান যিসাস!''

“আপনার বিলম্ব ঘটানোর জন্য দুঃখিত, স্যার। কিন্তু আপনারাই তো আমাদেরকে এই কাজে নিযুক্ত করেছেন।''

“কিছু মনে করো না। তুমি খাঁটি কথাই বলেছ। আমার একটু তাড়া আছে, এই যা ব্যাপার। তবে কিছু মনে করো না। আরে ওটা একটা গ্লোব বক্স। তোমার দেখার মত তেমন কিছু ওখানে পাবে না।''

“ঠিক আছে স্যার, এখন এটা বন্ধ করে দিতে পারেন। তারপর সে পেছনের দরজাটা খুলে সিটের নিচের দিকটা খুঁটিয়ে দেখার জন্য উবু হল। একমাত্র তখনই সে প্রথমবারের মত পিছন দিক থেকে তাকে ভালো করে খেয়াল করল। আটসাঁটো নীল রঙের গেঞ্জি, খাকী জিন্স এবং ক্যানভাস কাপড়ের জুতা পরনে সুন্দরী একটি মেয়ে, চুল নতুন ধরনে বিনুনি করা যা একটি মেয়ের চেহারায় স্পর্ধিত ভাব এনে দেয় এবং যেটাকে তারা ডাকে- 'এয়ার ফোর্স বেস',এবং মেয়েটাকে তার কিছুটা পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছিল।

“আমিই সেই মেয়ে, স্যার।'' তার কাজের শেষ পর্যায়ে এসে বলে উঠল, ''নি আমাকে চিনতে পারেন নি?''

“না তো, তোমাকে কি আমার চিনতে পারার কথা?''

“যখন আমি স্কুল ছেড়ে মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগ দিতে এসেছিলাম তখন আপনিই তো আমাকে গাড়িতে করে এনুগুতে নামিয়ে দিয়েছিলেন।''

“ওহ হ্যাঁ, তুমিই তাহলে সেই মেয়ে। আমিই তো তোমাকে বলেছিলাম, বলিনি যে, স্কুলে ফিরে যেতে কারণ মিলিশিয়া বাহিনীতে মেয়েদের নেয়া হয়না। কি হল তারপর?''

“তারা আমাকে বলল স্কুলে ফিরে যেতে অথবা রেড ক্রসে যোগ দিতে।''

“দেখেছ, আমি ঠিক কথাই বলেছিলাম। তারপর এখন কি করছ তাহলে?''

“এইতো গণপ্রতিরক্ষা বাহিনীতে নাম লেখানোর চেষ্টা করছি।''

“আচ্ছা, ভালো থেকো। তুমি আসলেই অনেক ভাল একটি মেয়ে।''

সেদিনই সে অবশেষে বিশ্বাস করল বিপ্লব সংক্রান্ত আলোচনায় তাহলে হয়তো সত্য বলতে কোন কিছু আছে। এর পূর্বেও সে অনেক তরুণী ও যুবতীকে কুচকাওয়াজ করতে ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখেছে। তবে যে কারণেই হোক এ বিষয়ে খুব বেশী মনযোগ দিয়ে উঠতে পারেনি। তার আর কোন সন্দেহ রইল না যে তরুণী ও যুবতীরা এখন নিজেদেরকে অনেক অনেক গুরুত্ব সহকারে দেখছে; তারা অবশ্যই এরকমভাবে দেখছে। কিন্তু এমনটাতো বাচ্চা ছেলেগুলোও করে যারা, স্টীলের হ্যালমেটের বদলে তাদের মায়েদের স্যুপের বাটি মাথায় দিয়ে লাঠি হাতে কুচকাওয়াজ করে। সেই সময় তার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা কৌতুকটি ছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে আগত একদল মেয়ে 'মরা দুর্বার, আমরা দুর্জয়'- একটি ব্যানার সামনে রেখে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে।

তবে আওকা তল্লাশি কেন্দ্রে বাঁধার সম্মুখীন হওয়ার পর থেকে সে মেয়েদের ব্যাপারে এবং বিপ্লব সংক্রান্ত কথাবার্তার প্রতি আর কোনভাবেই নাক সিটকাতে পারেনা, একেবারে বাস্তব কাজের মধ্যে সেই মেয়েটির ভেতরে সে যা দেখেছে যার আত্মনিয়োজন খুব স্বাভাবিকভাবে হালকা বুদ্ধির জন্য তাকে দোষারোপ করতে থাকে। কি যেন সে বলেছিল? আপনারা আমাদেরকে যে কাজে নিযুক্ত করেছেন সেই কাজই তো আমরা করছি। একসময় তার উপকার করেছিল এমন একজনকেও সে ভিন্ন চোখে দেখতে রাজি নয়। সে মোটামুটি নিশ্চিত, মেয়েটি তার নিজের বাবার ক্ষেত্রেও ঠিক এরকম কঠোর ভাবেই তল্লাশি চালাবে।

অন্তত আঠার মাস পরে আবার যখন সে তৃতীয়বারের মত রাস্তা ধরে যাচ্ছিল তখন পরিস্থিতি অনেক শোচনীয় হয়ে উঠেছে। মৃত্যু এবং দুর্ভিক্ষ প্রথমদিকের উন্মাদনাকে পিছু ধাওয়া করে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে, আর এখন কিছু কিছু জায়গায় বিরাজ করছে খা-খা শূন্যতা, অন্য জায়গা গুলো ভয়ানক বিধ্বস্ত, সঠিকভাবে বলতে গেলে আত্মঘাতী অহমিকার পরিণতি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এখনও এমন অনেকে আছে যাদের এখনও চলতে থাকা ভালো জিনিসগুলোকে ধরে রাখা ব্যতীত অন্য কোন বাসনা নেই এবং তাদের সেই সীমারেখার মধ্যে তারা মজে আছে। এই ধরনের লোকগুলোর কারণেই অদ্ভুত একধরনের স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে পৃথিবীতে। বিধ্বস্ত খানাতল্লাশি কেন্দ্রগুলো সব উধাও হয়ে গেছে। মেয়েরা আরো বেশি করে মেয়েতে এবং ছেলেগুলো আরো বেশি করে ছেলেতে পরিণত হয়ে উঠেছে। এটা ছিল ঘনসন্নিবিষ্ট, অবরোধ আরোপিত, ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়া একটি অঞ্চল; কিন্তু কিছু ভাল, কিছু খারাপ, সবকিছু মিলে অন্য কোন অঞ্চলের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিল না। আরো ছিল অনেক বেশি বীরত্ব যা অধিকাংশ সময় ঘটেছিল দূরে, এই গল্পের মানুষগুলোর দৃষ্টিসীমানার বাইরে, উদ্বাস্তু শিবির থেকে অনেক দূরে, ছেঁড়া কাপড়-চোপড় পরে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় এবং প্রচণ্ড গোলাগুলিতে খালি হাতের সাহসের মধ্য দিয়ে।

রেগিন্যাল্ড নোয়ানকো তখন বাস করতো ওয়েরীতে। কিন্তু সেদিন সে নকোয়েরীতে গিয়েছিল ত্রাণসামগ্রীর খোঁজে। ওয়েরীতে অবস্থিত রোমান ক্যাথলিক ত্রান কেন্দ্র থেকে সে পেয়েছিল শুটঁকি মাছের কয়েকটি মাথা, কিছু টিনজাত মাংশ এবং ফর্মুলা টু নামের ভয়ানক আমেরিকান শুকনো খাবার যেগুলোকে তার কাছে মনে হয়েছিল যেন পশুপাখির খাদ্য। তবে সবসময় তার একটি অস্পষ্ট সন্দেহ ছিল যে ক্যাথলিক না হওয়ার কারনণ রোমান ক্যাথলিক ত্রাণ কেন্দ্র থেকে তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। সুতরাং সে এখন গেল তার একজন পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে, যে নকোয়েরীতে একটি খাদ্য গুদাম পরিচালনা করে। সেখান থেকে সে অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য যেমনঃ চাল, ডাল এবং সকলের কাছে গ্যাবন গারি বলে পরিচিত মজাদার যবের ছাতু নিয়ে আসত।

সে ওয়েরী থেকে সকাল ছয়টার সময় রওনা হল যাতে করে সে তার বন্ধুকে গুদামেই ধরতে পারে, কারণ সে জানে যে বিমান হামলার ভয়ে সাড়ে আটটার পর ওখানকার আশে-পাশে কেউ থাকে না। নোয়ানকোর ভাগ্য সেদিন ভাল ছিল বলতে হয়। কয়েক রাত পূর্বে অনেকগুলো ত্রাণসামগ্রী-ভর্তি প্লেন নামার ফলে গতকালই গুদামে খাদ্যের বিশাল এক সরবরাহ এসে পৌঁছেছে। তার ড্রাইভার যখন টিন, বস্তা এবং কার্টনভর্তি নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী গাড়িতে ভরছিল, তখন সবসময় ত্রাণ কেন্দ্রের চারপাশে ঘুর ঘুর করা অনাহারী জনতা 'এই যুদ্ধ চলবে!' র মত বিদ্রূপ মন্তব্য করে বসল। কেউ একজন চিৎকার করে উঠল 'ইরেভলু' বলে। তার আশেপাশের লোকজন শ্লোগান ধরল, 'শাম! ইরেভলু! শাম! ইসোফেলি? শাম! ইসোফেলি?'

নোয়ানকো গভীর অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল ছিন্নবস্ত্র পরনে ও পাঁজরার হাড় বের হয়ে যাওয়া কাকতাড়ুয়ার মত দেখতে জনতার উপহাসের কারণে নয়, বরঞ্চ তাদের শীর্ণ শরীর ও দেবে-যাওয়া চোখের ভেতর থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত ফুড়ে বের হওয়া নীরব আভিযোগের ফলে। যখন তার গাড়ির পিছনের মাল রাখার জায়গায় গুড়ো দুধ, ডিম, যবের ছাতু, টিনজাত মাংশ এবং শুটকিমাছ ভরা হচ্ছিল তখন অনাহারী জনতার নীরব ক্ষুধিত দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকাটাই আসলে তার কাছে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী খারাপ লেগেছিল। এরকম সার্বিক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাবলে একা একা এরকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা তাকে নিশ্চিতভাবেই লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু একজন মানুষ কী-ই বা করতে পারে? যখন তার বউ এবং চার চারটি ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ওগবু অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে সম্পূর্ণ নির্ভর করে বসে আছে কি ত্রাণসামগ্রী সে তাদের জন্য সংগ্রহ করে পাঠাতে পারে সেটার উপর। সে তাদেরকে নিশ্চয় ভয়ানক পুষ্টিশূন্যতার মাঝে ছেড়ে দিতে পারে না। সে সর্বোচ্চ যেটুকু করতে পারে- সত্যি বলতে তা সে করে ফেলেছে- এটা নিশ্চিত করা যে যখনই সে বেশ ভালো পরিমাণের কিছু ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবে, এখন যেমন করতে পেরেছে, তখন সেখান থেকে কিছু অংশ গাড়ির চালক জনসনের বউ ও ছয়জন বা সাতজন ছেলে-মেয়ের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া। মাসে দশ পাউন্ড বেতনের চাকরী, এর মধ্যে আবার বাচ্চা-কাচ্চার ভরণপোষণ করানো- বাজারে যখন গ্যাবন গাড়ির দাম উঠে যাচ্ছে প্রতি কাপ এক পাউন্ড করে। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একজনের পক্ষে এই জনতার দঙ্গলের জন্য কীইবা করার থাকতে পারে; সর্বোচ্চ যা করা যেতে পারে তাহল সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীটির কোন উপকারে আসতে পারা। এর বেশী কিছু সম্ভব নয়।

ওয়েরীতে ফেরার পথে রাস্তার পাশ থেকে অসাধারণ আবেদনময়ী একটি মেয়ে তাকে গাড়িতে উঠানোর জন্য হাত ইশারা করল। লোকটি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলল। সাথে সাথেই ধুলো-বালিতে মাখামাখি এবং ভয়ানক ক্লান্ত বিশ-বাইশজন পথচারী – এর মধ্যে কিছু সৈনিক ও কিছু সাধারণ মানুষ চতুর্দিক হতে গাড়িটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“না, না, কেউ উঠবে না, কেউ না' কঠোর স্বরে নানকোয়ো বলল। “শুধুমাত্র এই মেয়েটির জন্য আমি গাড়ি থামিয়েছি। গাড়ির টায়ারের অবস্থা খুব খারাপ, তবে একজনকেই কেবল নেয়া যেতে পারে। দুঃখিত।''

“বাবা গো, বাবা, আমাকে উঠাও দয়া করে''- দরজার হাতল শক্ত হাতে চেপে ধরে একজন বৃদ্ধা আর্তকন্ঠে বলে উঠল।

এই বুড়ি, মরবার শখ হয়েছে তোমার? ড্রাইভারটি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে চিৎকার করে উঠল। নানকোয়ো ইতিমধ্যে একটি বই মেলে ধরে তার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছে। মাইল খানেক রাস্তার মধ্যে সে মেয়েটির দিকে একবারও তাকায়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত না নীরবতা অনেক ভারী হয়ে উঠেছে বুঝতে পেরে মেয়েটি বলল--

“আপনি আজকে আমার জীবন বাঁচালেন। অনেক ধন্যবাদ।''

“মোটেই না। তুমি যাবে কোথায়?''

“ওয়েরীতে যাব। আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি?''

“ওহ হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি কি বোকা বলতো-- তুমি, তুমি, তুমি হচ্ছো--

“গ্লাডিস।''

“ও হ্যাঁ, সেই মিলিশিয়া মেয়েটি।''

“তুমি অনেক বদলে গেছো, গ্লাডিস। তুমি দেখতে সবসময়ই সুন্দর ছিলে, আর এখন তো একেবারে বিউটি কুইন হয়ে উঠেছো। তা কি করছো আজকাল?''

“আমি জ্বালানী ব্যাবস্থাপনার পরিচালকমণ্ডলীতে আছি।''

“তাই নাকি, তাহলে তো খুব ভালো।''

সে ভাবতে থাকে, এটা খুব ভালো কিন্তু তার চেয়েও বেশী বেদনাদায়ক। তার মাথায় উজ্জ্বল আভার পরচুলা এবং পরনে দামী ঘাগরা ও খাটো ব্লাউজ। তার জুতা জোড়া অবশ্যই গ্যাবন থেকে কেনা, অনেক দাম দিতে হয়েছে নিশ্চয়। খুব সহজেই নানকোয়োর কাছে মনে হল, সে খুব সম্ভব উঁচু সারির কারো হাতের মুঠোর মধ্যে আছে, যুদ্ধের ফলে অনেক টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে তাদের মধ্যে কোন একজনের হাতে।

“তোমাকে গাড়িতে উঠিয়ে আজকে আমার নিয়ম ভেঙ্গে ফেলেছি। আজকাল আমি আর কাউকেই গাড়িতে উঠাই না।''

“কেন, বলুন তো?''

“কত মানুষকে তুমি গাড়িতে উঠাতে পারবে? তার চেয়ে ভাল সেই চেষ্টাই একেবারে বাদ দিয়ে দেওয়া। ঐ বৃদ্ধাটার কথা একবার ভেবে দেখো তো।''

“আমার মনে হয় আপনি চাইলেই তাকে গাড়িতে উঠাতে পারতেন।''

এই ব্যাপারে সে কোন কথাই বলল না এবং তারপর আবার আরেকটি নীরবতা পার হয়ে যাওয়ার পর লোকটি তার কথায় কষ্ট পেয়েছে মনে করে গ্লাডিস বলল, 'আমার কারণে নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।' মেয়েটি একটু সরে বসে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে একটু মুচকি হেসে মেয়েটির দিকে ঘুরে তার কোলে হালকা করে চাপর মারল।

“তা তুমি কি কাজে যাচ্ছো ওয়েরীতে?''

“যাচ্ছি আমার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে।''

“আসলেই তোমার বান্ধবী?''

“অবশ্যই, কেন হবে না?''- আপনি যদি তার বাড়িতে গিয়ে আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসেন তাহলে নিজের চোখেই দেখতে পাবেন আশা করি। আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি যাতে সে আজকে সাপ্তাহিক ছুটিতে বাইরে চলে না যায়; তাহলে আমি খুব বিপদে পড়ে যাব।''

“বিপদে পড়ে যাবে কেন?''

“কারণ সে যদি বাড়িতে না থাকে তাহলে আজকে আমাকে রাস্তায় ঘুমাতে হবে।''

“আমি ঈশ্বরের কাছে পাল্টা প্রার্থনা করছি যাতে সে আজকে বাড়িতে না থাকে।''

“কেন এমন প্রার্থনা করছেন, জানতে পারি কি?''

“কারণ সে যদি আজকে বাড়িতে না থাকে তাহলে আমি তোমাকে রাত্রে আমার ওখানে ঘুমানোর ও সকালে নাস্তা করার আমন্ত্রন জানাবো।'' হঠাৎ কড়া ব্রেক কষে খুব দ্রুত গাড়ি থামিয়ে ফেললে সে চালকটিকে জিজ্ঞেস করল, ''কি হল আবার?'' উত্তর দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। সামনেই ছোট খাট একটা জনতা আকাশপানে তাকিয়ে আছে। তিনজনই ঝড়ের গতিতে গাড়ির কাছে থেকে দূরে সরে গেল এবং ঝোপঝাড়ের মধ্যে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল, কোন কিছু দেখা যায় কিনা এই আশায় ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। কিন্তু সংকেতটি ছিল ভুয়া। পুরো আকাশ ছিল নীরব-নিস্তব্ধ এবং অনেক উঁচুতে উড়তে থাকা দুইটি শকুন ছাড়া পুরোটাই ছিল ফাঁকা। তাদের মধ্যকার একজন রসিক লোক শকুনদুটির একটি ফাইটার ও আরেকটিকে বোম্বার বলায় সকলে স্বস্তির শ্বাস ফেলে হেসে উঠল। এই তিনজন তাদের গাড়িতে চেপে বসে আবার চলতে শুরু করল।

“বিমান হামলার এখনও অনেক দেরী আছে''-সে গ্লাডিসকে উদ্দেশ্য করে বলল, যার দুইটি হাতের তালু বুকের উপর এমনভাবে রাখা যেন বুকের ধড়ফড়ানি থামাচ্ছে। ''ওরা তো দশটার আগে খুব একটা আসে না।''

কিন্তু মেয়েটি ঠিক তেমনি আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় শক্ত হয়ে চুপচাপ বসে রইল। নানকোয়ো একটি সুযোগ হাতের মুঠোয় পেয়ে সাথে সাথে তা গ্রহন করে ফেলল।

“তোমার বান্ধবী যেন কোথায় থাকে?''

“২৫০, ডগলাস রোড।''

“আহ! ওটাতো শহরের একেবারে ভেতরে অবস্থিত, খুব ভয়ানক জায়গা। কোন বাঙ্কার নেই, ধরতে গেলে আত্মরক্ষার মত কিছুই সেখানে নেই। আমি তোমাকে সেখানে বিকাল ছয়টার আগে যেতে বলতে পারিনা; এটা কোনভাবেই নিরাপদ হবে না। তুমি যদি কিছু মনে না কর তবে আমি যেখানে থাকি সেখানে তোমাকে নিয়ে যেতে পারি, ওখানে ভালো বাঙ্কার আছে এবং সন্ধ্যা ছয়টার সময় ঐ এলাকাটা যখন বিপদমুক্ত হবে তখন তোমাকে গাড়িতে করে তোমার বান্ধবীর কাছে পৌঁছে দিয়ে আসব। কেমন হয় তাহলে, বলতো?”

“আচ্ছা ঠিক আছে''- সে নির্জীবের মত বলল। আমি এই জিনিসগুলোকে খুব ভয় পাই। এ কারণেই আমি ওয়েরীতে কাজ করতে অস্বীকার করেছিলাম। কে যে আমাকে আজকে বাইরে বের হতে বলেছিল।

“আমার ওখানে তোমার কোন সমস্যা হবে না। আমরা তো এরকমভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি।''

“কিন্তু আপনার পরিবারের লোকজন তো কেউ আপনার সাথে থাকে না।''

“থাকে না''- সে বলল, ''কারো পরিবারের লোকজনই সেখানে থাকে না। বিমান হামলার হাত থেকে রেহাই পেতেই তোমাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি, তবে আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি সেখানে আরো অনেক ভালো কিছু আছে। ওয়েরী হচ্ছে সত্যিকারের উপভোগ্য একটি শহর এবং আমরা সেখানে উচ্ছল ব্যাচেলরের জীবন যাপন করি।''

“আমিও এমনটাই শুনেছি।''

“আজকে, তুমি শুধু শুনবেই না; নিজের চোখেও দেখবে। প্রাণোচ্ছল একটি ভোজ উৎসবে তোমাকে নিয়ে যাব আজকে । আমার এক লেফটেন্যান্ট-কলোনেল বন্ধু জন্মদিন উপলক্ষ্যে ভোজ উৎসবের আয়োজন করছে। অত্যন্ত চমৎকার সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া করে এনেছে বাজানোর জন্য। আমি নিশ্চিত এটা তোমার ভালো লাগবে।''

সে সাথে সাথেই নিজের কাছে ভয়ানক লজ্জিত হয়ে পড়ল। এইধরনের ভোজ উৎসব এবং ছেবলামীপনাকে সে ঘৃণা করে, যা তার বন্ধুরা ডুবন্ত মানুষের মত আকড়ে ধরে আছে। তবে তাদের প্রতি সে এমন ধরনের সমর্থনসূচক কথাবার্তা বলছে, কারণ সে একটি মেয়েটিকে তার বাসায় নিয়ে যেতে চায়! এবং তার এই বিশেষ মেয়েটিও, সংগ্রামের প্রতি যার একসময় খাঁটি বিশ্বাস ছিল এবং তার মত কিছু মানুষের কাছ থেকে কিছু সুন্দর সময়ের প্রত্যাশা করে বিশ্বাসঘাতকতা পেয়েছে (এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই)। সে বিষণ্নভাবে তার মাথা দোলাতে থাকে।

“আপনার আবার কি হল? জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।''

“তেমন কিছু না। এই ভাবছি আর কি।''

ওয়েরীর পথে বাকী রাস্তাটুকু একধরনের নীরবতার মধ্য দিয়েই কেটে গেল।

মেয়েটি খুব দ্রুত বাসাটাকে নিজের করে নিল, যেন সে তার কাছে নিয়মিত যাতায়াত করা একজন গার্ল ফ্রেন্ড।

সে বাসায় পরার কাপড় বদলে নিল এবং বাদামী রঙের পরচুলাটি খুলে রাখল।

তোমার চুলগুলো এমনিতেই অনেক সুন্দর। কেন পরচুলা দিয়ে এগুলোকে ঢেকে রাখো?

“ধন্যবাদ''--তার প্রশ্নের কোনধরনের উত্তর না দিয়েই সে বলল। তারপর সে বলল, ''পুরুষরা বেশ মজার হয়।''

“এ কথা বলছো কেন?''

“তুমি তো এখন বিউটি কুইন হয়ে গেছো''-লোকটির পূর্বে বলা কথাকেই শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে অনুকরণ করে গ্লাডিস বলল।

“ওহ, ঐ কথা! আমি কিন্তু এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলিনি।''

সে তাকে কাছে টেনে নিয়ে এসে চুমু খেল। মেয়েটি বাঁধাও দিল না আবার নিজেকে পুরোপুরি সমর্পনও করলো না, শুরুর দিকে এরকমটাই লোকটি পছন্দ করে। অনেক মেয়েই এখন আজকাল এমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কেউ কেউ এটাকে যুদ্ধকালীন অসুস্থতা বলে থাকে।

কিছুক্ষণ পর সে অফিসে একটু ঢু মারার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেল এবং মেয়েটি নিজেকে ব্যস্ত রাখল রান্না ঘরে কাজের ছেলেটিকে জল খাবার তৈরীতে সাহায্যে করতে। এটা ছিল তার আক্ষরিক অর্থেই ঢু মারা, কারণ সে হাত ঘষতে ঘষতে এবং সে তার বিউটি কুইনের কাছ থেকে বেশীক্ষন দূরে থাকতে পারে না একথা বলতে বলতে আধ ঘন্টার মধ্যেই ফিরে আসল।

তারা একসাথে খেতে বসলে মেয়েটি বললঃ ''আপনার ফ্রিজের ভেতরে তো দেখি কিছুই নেই।''

“কিছুই নেই যেমন?'' কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে সে বলল।

“যেমন মাংস''- মেয়েটি নিঃশঙ্ক চিত্তে উত্তর দিল।

“তুমি এখনও মাংস খাও?'' সে জানতে চাইল।

“আমি আবার কে মাংস খাওয়ার? কিন্তু আপনার মত বড় লোকেরা তো খায়।''

“আমি জানি না কোন ধরনের বড় লোকের কথা তুমি বলতে চাইছো। কিন্তু তারা হয়তো আমার মত নয়। ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করে বা শত্রুপক্ষের সাথে ব্যবসা করে আমি কোন টাকা-পয়সা উপার্জন করি না অথবা...

“অগাস্টার প্রেমিকটিও এরকম কিছু করে না। সে শুধুমাত্র বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাবসা থেকে উপার্জন করে।''

“কিভাবে সে টাকাটা পায়? সে সরকারের সাথে প্রতারণা করে, -এভাবেই সে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবসা থেকে টাকা পায়, সে যে ব্যাক্তিই হোক না কেন। আচ্ছা, অগাস্টা কে?''

“আমার বান্ধবী।''

“আচ্ছা।''

“শেষ বার যখন দেখা হয়েছিল সে আমাকে দিয়েছিল তিন ডলার যা আমি পঁয়তাল্লিশ পাউন্ডে ভাঙিয়ে নিয়েছি। আর লোকটি তাকে দিয়েছিল পনের ডলার।''

“ঠিক আছে, সোনা, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবসার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই তাই আমার ফ্রীজে মাংসও নেই। আমরা একটি যুদ্ধ লড়ছি এবং আমার ভালো করেই জানা আছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে যুবক ছেলেরা তিনদিনে একবার হয়তো সামান্য একটু যবের ছাতু ও পানি খেতে পায়। ''

“সত্য কথাই বলেছেন''-সে স্বাভাবিকভাবে বলল, 'বানর সারাদিন খেটে মরে আর বেবুন বসে বসে চপ কাটলেট খায়।''

“শুধু এগুলোই নয়, পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ'- তার কণ্ঠস্বর কাঁপতে শুরু করে। 'প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। এই যে আমরা কথা বলছি এখনও হয়তো কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে।'

“সত্য কথাই বলছেন।'' সে পুনরায় উচ্চারণ করল।

“প্লেন!'' রান্না ঘর হতে চিৎকার করে উঠল কাজের ছেলেটি।

“ওরে মা!'' বলে চিৎকার করে উঠে গ্লাডিস। তারা যখন হাত দিয়ে মাথা ঢেকে এবং কিছুটা কুঁজো হয়ে পামগাছের কাঠ ও লালমাটি দিয়ে তৈরি বাঙ্কারের দিকে দ্রুত গতিতে ছুটে যাচ্ছিল তখন জঙ্গী বিমানের ভয়ানক শব্দ ও দেশে তৈরি বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্রের ঝনঝন শব্দে পুরো আকাশ যেন ফেটে পড়ছিল।

এমনকি যুদ্ধ বিমানগুলো চলে যাওয়ার পরও বাঙ্কারের ভেতরে মেয়েটি তাকে জাপটে ধরে আছে এবং গোলাগুলি শুরু হওয়ার পূর্বেই থেমে গেছে, পুনরায় নীরব হয়ে এসেছে সবকিছু।

“উপর দিয়ে যাচ্ছিল শুধু-- কাঁপাকাঁপা কন্ঠে সে মেয়েটিকে জানাল। 'কোন ধরনের হামলা করেনি। যেদিক থেকে আসছে তাতে বলা যায় এগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছিল। খুব সম্ভব আমাদের ছেলেপেলেগুলোই ওদেরকে ধাওয়া করেছে। এরকমটা তারা সবসময় করে। যখনই আমাদের ছেলেগুলো তাদেরকে ধাওয়া করে, তখন তারা রাশিয়ান এবং মিশরীয়দের কাছে বার্তা পাঠায় জঙ্গী বিমান পাঠানোর জন্য।' বলতে বলতে সে বুকের ভেতরে একটি দীর্ঘশ্বাস টেনে নিল।

মেয়েটি কোন কথা না বলে তাকে জাপটে ধরে রইল। তারা শুনতে পেল, তার কাজের ছেলেটি পাশের বাড়ির চাকরটিকে বলছে যে দুইটা প্লেন এসেছিল, একটা ঝাঁপ দিল এরকমভাবে আরেকটা ঝাঁপ দিল ঐরকমভাবে।

“আমিও ওগুলোকে ভালোভাবেই দেখেছি'' অন্য জন একই রকম উত্তেজিত হয়ে বলল। 'শুধুমাত্র দেখার খুশিতেই ওরা যখন তখন মানুষ মেরে ফেলতে পারে। হায় ঈশ্বর!''

“চিন্তা করা যায়!'' অবশেষে গ্লাডিস যেন তার নিজের কন্ঠস্বর শুনতে পেল। তার মনে হল, কয়েকটি শব্দ বা এমনকি একটি শব্দের মাধ্যমে সকল অর্থ বহন করে নিয়ে আসার রাস্তা তার জানা আছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতভম্ব হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অনিচ্ছাকৃত প্রশংসার সাথে তিরস্কার ছুঁড়ে দিল সেই সমস্ত লোকজনের প্রতি যারা মৃত্যু বয়ে নিয়ে আসতে পারে এমন কিছুর প্রতিও এমন চপলতা প্রকাশ করতে পারে।

“এত ভয় পায় না, সোনা'' সে বলল। মেয়েটি আরো কাছে সরে আসতেই লোকটি তার মুখে চুমু খেতে আরম্ভ করল এবং সাথে সাথে তার স্তন জোড়াও পিষতে শুরু করল। মেয়েটি আরো বেশী আরো বেশি এবং তারপর পুরোপুরিভাবেই নিজেকে সমর্পণ করে ফেলল। পুরো বাঙ্কারটি ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার, অপরিচ্ছন্ন এবং সম্ভবত একটি পোকামাকড়ের আস্তানা। মূল কামরা থেকে একটা মাদুর নিয়ে আসার কথা মাথায় এসেছিল কিন্তু এই কাজটা না করারটাই সে উপযুক্ত বিবেচনা করল। অন্য একটি বিমান চলে আসতে পারে এবং তাড়া খেয়ে আশেপাশের লোকজন ঢুকে পড়বে অথবা বলা যায় না, এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ হয়ত তাদের মাঝখানে হুমড়ি খেয়েও পড়তে পারে। এর পূর্বে একবার বিমান হামলার সময় প্রকাশ্য দিবালোকে একজন পুরোদস্তুর ভদ্রলোককে দেখা গিয়েছিল সম্পূর্ণ উদোম শরীরে ঠিক এরকম অবস্থার একটি মহিলার পেছনে পেছনে তার শোয়ার ঘর থেকে বাঙ্কারের দিকে ছুটে আসতে--এই ঘটনার চেয়ে তা নিশ্চয় এটা খুব বেশি ভাল দেখাবে না!

গ্লাডিসের মনে শুধু এই ভয় ছিল যে তার বন্ধুটি হয়ত শহরে নেই। এখন মনে হল তার ক্ষমতাবান প্রেমিকটি তাকে লিব্রিভাইল শহরে শপিং করতে যাওয়ার জন্য একটি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। যা হোক তার পাড়া-প্রতিবেশীরাও এরকমটাই ভাবছে।

“খুব ভাল!'' গাড়িতে চড়ে ফিরে আসার পথে নানকোয়ো বলল। 'সে একটি যুদ্ধবিমান ভর্তি করে জুতা, পরচুলা, প্যান্ট, বিকিনি, প্রসাধন সামগ্রী নিয়ে আসবে, এগুলো বিক্রি করে সে হাজার হাজার পাউন্ড উপার্জন করবে। তোমরা মেয়েরা আসলেই যুদ্ধে আছো, তাই না?''

মেয়েটি কিছুই বলল না এবং লোকটি ভাবলো সে অবশেষে মেয়েটিকে বুঝতে পেরেছে। তখন মেয়েটি হঠাৎ করে বলে উঠল, 'আমরা এগুলো করি তা-ই তো তোমরা পুরুষরা চাও।'

“আচ্ছা''-সে বলল, 'তবে এখানে এমন একজন পুরুষ আছে যে চায় না তুমি এরকম কিছু কর। তোমার কি মনে আছে খাকি জিন্সপরা সেই মেয়েটির কথা যে তল্লাশি কেন্দ্রে আমার উপর নির্মমভাবে তল্লাশি চালিয়েছিল।''

এ কথা শুনে সে হাসতে শুরু করে দিল।

“আমি মনে-প্রাণে চাই তুমি আবার সেই মেয়েটিতে পরিণত হয়ে যাও। তার কথা কি তোমার মনে পড়ে? কোন পরচুলা নেই, মনে হয় তার কানে কোন দুল ছিল না...

“আরে না, মিথ্যে কথা। আমি তখনও দুল পড়তাম।''

“আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু আমি কি বলতে চাচ্ছি তা তো তুমি বুঝতে পারছো।''

“সেই সময় চলে গেছে। এখন সবাই ভালভাবে বেঁচে থাকতে চায়। সকলে এটাকে ডাকে ছয় নাম্বার বলে। আপনি আপনার ছয় নাম্বারে আছেন; আমি আমার ছয় নাম্বারে আছি। সবকিছু ঠিকমতই চলছে।''

লেফটেন্যান্ট-কলোনেলের ভোজ উৎসবটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি দিকে মোড় নিল। তবে এর পূর্বে সবকিছু ভালই চলছিল। খাবারের জন্য ছিল খাসীর মাংসের রেজালা, মুরগীর রোস্ট, ভাত এবং অনেক পরিমাণ হাতে তৈরি মদ। ট্রেসার নামে কড়া ব্র্যান্ডিও সেখানে ছিল যা আসলেই আগুনের শিখার মত অন্ননালীর ভেতর দিয়ে নেমে আসত। সবচেয়ে মজার বিষয় হল তাকিয়ে দেখলে মনে হবে যেন একটি সাদামাটা অরেঞ্জ জুসের বোতল। কিন্তু যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল তা হল ব্রেড- সকলের জন্য একটি করে রোল। এটার আয়তন ছিল একটি গলফ বলের সমান এবং ঘনত্বও ঠিক একই রকম। কিন্তু এটা ছিল সত্যিকারের ব্রেড। বাদ্য বাজনা সঙ্গীত বেশ ভালই চলছিল এবং অনেক মেয়েও সেখানে জড়ো হয়েছিল। এবং ভোজ উৎসবকে আরো জাঁকালো করে তুলতে রেড ক্রসের দুইজন সাদা চামড়ার লোক এক বোতল কোরভিজিয়র এবং এক বোতল হুইস্কি সাথে নিয়ে শীঘ্রই এসে উপস্থিত হল। ভোজ উৎসবের সমস্ত লোকজন উঠে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাদের সম্ভাষণ জানালো এবং অনেকেই ছুটে গেল ওগুলোর একটুখানি স্বাদ গ্রহণ করতে। ভোজ উৎসবটি শীঘ্রই তার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য থেকে দূরে সরে এল, যাহোক, সাদা চামড়ার একটি লোক ইতিমধ্যেই অনেক বেশি পান করে ফেলেছিল। কারণ হিসেবে বোঝা গেল যে তার সাথে খুব ভালো চেনা-জানা আছে এমন একজন পাইলট গতরাত্রে প্রচণ্ড বাজে আবহাওয়ার মধ্যে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসার পথে বিমান বন্দরের কাছাকাছি এসে বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

ভোজ উৎসবের কিছু লোক বিমান দুর্ঘটনার খবরটি তখনই কেবল জানতে পারল। ফলে সাথে সাথেই বিমর্ষ হয়ে উঠল পুরো পরিবেশ । নৃত্যরত কিছু জুটি তাদের আসনে ফিরে এল এবং বাদ্যবাজনাও বন্ধ হয়ে গেল। তখন কিছু রহস্যময় কারনণ রেড ক্রসের সেই মাতাল লোকটি ক্রোধে ফেটে পড়ল।

“কেন একজন মানুষকে, একজন নিরপরাধ মানুষকে তার জীবন বিলিয়ে দিতে হবে। যেখানে কিছু পাওয়ার কোন আশা নেই! চার্লির মরতে যাওয়ার তো কোন দরকার ছিল না। এরকম অধঃপতিত একটি অঞ্চলের জন্য। হ্যাঁ, এখানে সবকিছুই অধঃপাতে যাচ্ছে। এমনকি এই সমস্ত মেয়েরাও যারা বাহারি পোশাকে সজ্জিত হয়ে হাসতে হাসতে এখানে এসেছে, এদের কি মূল্য আছে? আমি জানি না ভেবেছেন? কিছু শুটকি মাছের মাথা, আর কিছুর দরকার হবে না অথবা একটি আমেরিকান ডলার তাহলেই তারা যে কারো সাথে বিছানায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।''

ক্রোধে ফেটে পড়ার কারণ তৈরি হওয়ায় থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই একজন যুবক অফিসার হেঁটে লোকটির কাছে এসে তার দুই গালে বসিয়ে দিল বিরাশিসিক্কার তিন তিনটি চড় --ডান গালে! বাম গালে! ডান গালে!--আসন থেকে টেনে তুলে (তখন তার চোখ চিকচকি করছিল) ঘাড় ধাক্কা দিয়ে থেকে বের করে দিল। লোকটির বন্ধু যে তাকে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে আসছিল তার পেছনে পেছনেই বের হয়ে গেল এবং নীরব হয়ে যাওয়া ভোজ উৎসবটি শুনতে পেল তাদের গাড়িতে উঠে চলে যাওয়ার শব্দ। যে অফিসার কাজটি করেছে সে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে ফিরে এল।

“শালা বাঞ্চোত!'' কর্তৃত্বময় ঠাণ্ডা গলায় সে বলল। এবং সকল মেয়ে তাদের চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিল তারা তাকে একজন পুরুষের মত পুরুষ ও বীরের মর্যাদা দিচ্ছে।

“আপনি ঐ লোকটাকে চেনেন?'' গ্লাডিস জিজ্ঞেস করল নানকোয়োর কাছে।

সে তার কথার কোন উত্তর দিল না। তার বদলে সে ভোজ উৎসবটিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বেচারা লোকটি ছিল স্পষ্টতই পুরোপুরি একটা মাতাল।''

“তাতে আমার কিছু যায় আসে না''- বলল সেই অফিসারটি--মাতাল হলে লোকজন নিজের মনের কথাগুলোই বলতে থাকে।''

“মানে হল, তার মনে যা ছিল তার কারনে তুমি তাকে পেটালে? গৃহকর্তা বলল, তার মনে ছিল মদ, বুঝতে পেরেছো জো?''

“ধন্যবাদ স্যার''- স্যালুট জানিয়ে জো বলল।

“তার নাম জো''--গ্লাডিস এবং তার বামপাশের মেয়েটি একে অপরের দিকে ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সমস্বরে বলে উঠল।

ঠিক সেই সময়ে নানকোয়ো এবং তার পাশে দাঁড়ানো একজন বন্ধু নিচুস্বরে, ফিসফিস করে বলাবলি করছিল যে, যদিও লোকটি খুব রূঢ় এবং আগ্রাসী হয়ে উঠছিল তবে মেয়েদের সম্বন্ধে সে যা যা বলেছে দুর্ভাগ্যজনক হলেও তা নিদারুণভাবেই সত্য, শুধুমাত্র এই কথাগুলো বলার মত উপযুক্ত লোক সে নয়।

পুনরায় আবার যখন নাচ শুরু হল তখন ক্যাপ্টেন জো গ্লাডিসের কাছে এসে নাচের প্রস্তাব করল। এমনকি তার প্রস্তাবটি মুখ থেকে বের হওয়ার পূর্বেই গ্লাডিস আনন্দে লাফিয়ে উঠল। তখন সাথে সাথেই তার মনে পড়ল এবং নানকোয়োর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার জন্য তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে সময়েই ক্যাপ্টেনটিও নানকোয়োর দিকে সরে এসে বলল, ''এক্সকিউজ মি।''

দুইজনের মাঝখান দিয়ে অন্য কোন কিছুর দিকে তাকিয়ে নানকোয়ো বলল, ''আচ্ছা যাও।''

নাচটি চলছিল লম্বা সময় ধরে এবং সে কি করছে সেদিকে সচেতন না হয়েই চোখ দিয়ে তাদের অনুসরণ করে গেল। একটি ত্রাণসামগ্রী ভর্তি বিমান মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলে কয়েকজন তক্ষুনণ গিয়ে আলো বন্ধ করে দিল একথা বলে যে, এটা হয়তো হামলাকারীদের কেউ হবে। কিন্তু অন্ধকারে নাচতে এবং মেয়েদেরকে ফিকফিক করে হাসাতে এটা একটা অজুহাত ছিল মাত্র, হামলাকারী বিমানের শব্দ সকলের কাছে ভালো করেই পরিচিত।

গ্লাডিসের বিবেক বোধ সচেতন হয়ে উঠলে সে নানকোয়োকে তার সাথে নাচতে আহ্বান জানালো। কিন্তু সে গেল না। বলল, ''বিরক্ত করো না, আমি এখানে বসে তোমরা যারা নাচছো তাদেরকে দেখেই বেশ মজা পাচ্ছি।''

“তাহলে চলেন বাসায় ফিরে যাই, সে বলল। আপনি যদি না নাচতে চান তাহলে এখানে থেকে কি লাভ।''

“আমি কখনো নাচে অংশগ্রহণ করি না, বিশ্বাস কর বলছি। সুতরাং যাও, গিয়ে ফূর্তি করগে।''

গ্লাডিস তারপর লেফটেনেন্ট-কলোনেলের সাথে কিছুক্ষণ নাচল এবং আবার ক্যাপ্টেন জো-এর সাথে, তারপর নানকোয়ো রাজী হল তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে।

“তোমার সাথে নাচিনি বলে আমি দুঃখিত''--গাড়ি চালাতে চালাতে সে বলল। ''যতদিন পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ না হয় ততদিন না নাচার জন্য আমি শপথ করেছি।''

মেয়েটি চুপ করে বসে রইল।

“যখন আমি পাইলটটির মত কারো কথা চিন্তা করি যে গতকাল রাত্রে মারা গিয়েছে এবং এই যুদ্ধে যার কোন হাত ছিল না। সে শুধু আমাদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে চেয়েছিল...

“তার মাতাল বন্ধুটি নিশ্চয় তার মত নয়''--গ্লাডিস বলল।

“ঐ লোকটি তার বন্ধুর মৃত্যুর কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমার বলার কথা হল''--এরকম অবস্থায় যখন মানুষ এভাবে খুন হচ্ছে এবং আমাদের ছেলেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে, আমি বুঝতে পারি না আমরা কেন এভাবে বসে বসে ভোজ উৎসব করছি আর নেচে বেড়াচ্ছি।''

“আপনিই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন''- সে তেলেবেগুনণ জ্বলে উঠে বলল। এদের কাউকে আমি পূর্বে কখনো দেখিনি, ''এরা আপনারই বন্ধু।''

“দেখো, সোনা, আমি তোমাকে দোষারোপ করছি না। ব্যাক্তিগতভাবে কেন আমি নাচতে রাজী হইনি তাই শুধু তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। যাহোক, প্রসঙ্গ পাল্টানো যাক''-- তুমি কি এখনও চাও যে কালকেই ফিরে যাবে? আমার ড্রাইভার তোমাকে সোমবারে ভোর হওয়ার আগেই তোমার কাজের জায়গায় পৌঁছে দিতে পারবে। না? আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার যেমন খুশি। তুমি যা বলবে তাই হবে বিউটি কুইন।''

মেয়েটি যেরকম খোলামেলা ভাবে তার সাথে বিছানায় গেল এবং সে যে ভাষায় কথা বলল তা শুনে সে প্রচণ্ড একটি আঘাত পেল।

“আপনি কি গুলি ছুড়তে চান?'' সে জিজ্ঞেস করল। এবং উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই বলে ফেলল, ''আচ্ছা, ঠিক আছে, আসেন। কিন্তু সৈন্যবাহিনীর মাঝে ছুঁড়বেন না বলে দিচ্ছি!''

তাছাড়া সে সৈন্যবাহিনীর উপর গুলি ছুড়তে চায়নি ফলে সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু মেয়েটি সরাসরি নিশ্চয়তা চাইছিল এবং লোকটি তাকে তা দিল।

যুদ্ধের ফলে উদ্ভুত একটি অর্থনৈতিক সূত্র ছিল এরকম : একটি রাবার কনডম বার বার ব্যবহার করা যেতে পারে। তোমাকে যা করতে হবে তা হল ব্যাবহার করার পর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা, শুকানো এবং এটার পিচ্ছিলতা রক্ষাকল্পে অনেক পরিমাণ ট্যালকম পাউডার এটার উপর দিয়ে ঘষা; এর ফলে এটা একেবারে নতুনের মত হয়ে উঠবে। এটাকে হতে হবে সত্যিকারের ব্রিটিশ জিনিস, লিসবন থেকে নিয়ে আসা শুকনো কোকো পাতার মত শক্ত সস্তা কোন জিনিস হলে চলবে না।

যদিও সেই সময়টায় বেশ মজা পেয়েছিল তবুও মেয়েটিকে সে খরচের খাতায় লিখে ফেলেছিল। তার কাছে মনে হয়েছে সে শুধুমাত্র একজন পতিতার সাথে ঘুমিয়েছে। এটা এখন তার কাছে দিনের আলোর মত স্পষ্ট যে কিছু আর্মি অফিসারের সাথে সে রক্ষিতার মত থাকত। দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কি ভয়ানক রূপান্তর! এটা কি একটা অলৌকিক ঘটনা নয় যে, সেই জীবনের স্মৃতি তার এখনও মনে আছে, সে এখনও তার নাম মনে করতে পারে। রেড ক্রসের মাতাল লোকটির সেই ঘটনা যদি আবার এখন ঘটে, সে নিজেকেই বলে, তাহলে সে লোকটির পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং ভোজ উৎসবকে উদ্দেশ্য করে বলবে যে এই হচ্ছে সত্যের প্রতিমূর্তি। কি ভয়ানক দুর্ভাগ্য পরবর্তী প্রজন্মের উপর ঘটতে যাচ্ছে! এরাই হচ্ছে আগামী দিনের মা!

সকালের দিকে সে একটু ভালো বোধ করল এবং তার বিচার বিবেচনার ক্ষেত্রে আরো কিছুটা উদার হল। তার মনে হল, গ্লাডিস হচ্ছে আমাদের এই সমাজের প্রতিচ্ছবি ধারণ করে রাখা শুধু একটা আয়না মাত্র, যে সমাজের মূলকেন্দ্র পুরোপুরি পচে গিয়েছে এবং কীটে ধরেছে। আয়নাটি নিজে এখনও আনকোরা, বেশ কিছু দাগ পড়েছে অবশ্য, কিন্তু ও তেমন কিছু নয়। কেবল একটা জিনিসের দরকার, তা হল একটি পরিষ্কার বুরুশ। সে নিজেকেই বলল, ''তার প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে। সেই ছোট মেয়েটি যে একদিন পুরো পরিস্থিতি মেলে ধরেছিল আমার কাছে। সে এখন বিপদের মধ্যে আছে, ভয়ানক রাহুগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।''

সে এই রাহুগ্রস্ততার মূল জায়গাটা বোঝার চেষ্টা করল। এটা খুবই স্পষ্ট যে তার সুসময়ের বন্ধু, অগাষ্টা বা তার নাম যাই হোক সেই মেয়েটি শুধু নয়। এর মূলে অবশ্যই কিছু মানুষ আছে, সম্ভবত সেই সমস্ত পাষণ্ড যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের কেউ একজন হবে যারা বৈদেশিক মুদ্রার কারবার করে এবং যুবক ছেলেগুলোর জীবন বিপণ্ন করে শত্রু সীমানার কাছে লুটের মালের বিনিময়ে সিগারেট নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়ে শত শত হাজার টাকা উপার্জন করে, অথবা সেই সমস্ত ঠিকাদারদের একজন যারা সৈনিকদের কাছে পাঠানোর জন্য খাবার বিক্রি করে প্রতিদিন বস্তা বস্তা টাকা আয় করে। অথবা নোংরা কথাবার্তা এবং বানানো বীরত্বপূর্ণ কাহিনী বলতে উস্তাদ কিছু বেকুব এবং কাপুরুষ আর্মি অফিসারদের মধ্যকার কেউ। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, সবকিছু তাকে খুঁজে বের করতে হবে। ড্রাইভারের সাথে তাকে একা পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিল গতকাল রাত্রে। কিন্তু না, তাকে যেতেই হবে, নিজে গিয়ে দেখে আসবে সে কোথায় থাকে। সেখান থেকেই কিছু না কিছু বের আসবে। এমনকিছু যেখান থেকে সে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে পারবে। বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কেটে যেতে থাকা প্রত্যেকটা মুহূর্তে মেয়েটির প্রতি তার অনুভূতি নরম হতে থাকে। আগের দিন পাওয়া ত্রান সামগ্রীর অর্ধেক পরিমাণ সে মেয়েটির জন্য আলাদা করে রাখল। পরিস্থিতি যে পরিমাণ ভয়ানক, সে ভাবল, একটি মেয়ে যার কাছে খাওয়ার জন্য কিছু জিনিস আছে সে হয়তো কিছুটা নিরাপদে থাকবে, পুরো নিরাপদ নয়, কিন্তু কিছু প্রলোভনের হাত থেকে রেহাই পাবে অন্তত। খাদ্য গুদামের তার সেই বন্ধুটির সাথে কথা বলে তাকে পনের দিন অন্তর অন্তর কিছু দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে।

উপহার সামগ্রী দেখে গ্লাডিসের চোখে পানি চলে আসল। নানকোয়োর কাছে খুব বেশী নগদ টাকা ছিল না, কিন্তু সে কোনমতে বিশ পাউন্ডের মত একত্র করতে পেড়রছিল এবং এর পুরোটাই তার হাতে তুলে দিল।

‘বৈদেশিক মুদ্রার কারবার আমার নেই, এবং এই সামান্য কিছুতে মনে হয় তোমার খুব বেশীদিন চলবে না, কিন্তু...

মেয়েটি কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। লোকটি তার ঠোঁটে, চোখে চুমু খেল এবং মেয়েটির মাথার দিকে চোখ নামাতেই পরিস্থিতির শিকার হতভাগ্যদের জন্য তার হৃদয় গুঞ্জন করে উঠল। সে উল্লসিত হয়ে উঠল এটা দেখে যে, মেয়েটি তার উজ্জ্বল শোভিত পরচুলাটি খুলে ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়েছে।

“আমি তোমার কাছ থেকে একটা প্রতিজ্ঞা আদায় করে নিতে চাই''--সে বলল।

“কি প্রতিজ্ঞা?''

“গুলি ছোড়ার ব্যাপারে আর কখনো ওরকম ব্যবহার করবে না।''

সে অশ্রুসিক্ত নয়নে হেসে ফেলল--''আপনি পছন্দ করেন না বুঝি? সব মেয়েই তো ওরকমভাবেই বলে।''

“তা বুঝতে পেরেছি, আর সব মেয়ের থেকে তুমি আলাদা হবে, কথা দিচ্ছো তো?''

“আচ্ছা, কথা দিলাম।''

স্বাভাবিকভাবেই তাদের রওনা হতে কিছুটা দেরী হয়ে গেল? এবং যখন তারা গাড়িতে চড়ে বসেছে তখন তা আর স্টার্ট নিতে চায় না। ইঞ্জিন নাড়াচাড়া করে দেখে ড্রাইভার বুঝতে পারল যে ব্যাটারী খারাপ হয়ে গেছে। নানকোয়ো দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। গত সপ্তাহেই তাকে ব্যাটারির দুইটি কোষ পরিবর্তন করতে চৌত্রিশ পাউন্ড ব্যয় করতে হয়েছে, তবে যে মিস্ত্রী এটা লাগিয়ে দিয়েছে সে গ্যারান্টি দিয়েছিল যে এটা অন্তত ছয় মাস সার্ভিস দিবে। এ রকম একটি নতুন ব্যাটারি বিক্রি হচ্ছে দুইশ পনের পাউন্ড করে, যা কল্পনারও বাইরে। সে ভাবল ইঞ্জিনের ব্যাপারে ড্রাইভারটি নিশ্চয় অমনোযোগী হয়ে উঠছিল।

গতকাল রাত্রের কারণেই নিশ্চয় এমনটি হয়েছে, বলল ড্রাইভারটি।

“গতরাত্রে কি হয়েছিল?'' নিশ্চয় বোকার মত কোন কাজ করে ফেলেছিল এরকমটা ভেবে নানকোয়ো কঠোর ভাবে জিজ্ঞেস করল।

“কারণ গতকালরাতে হেডলাইট জ্বালাতে হয়েছিল।''

তার মানে আমার লাইট ব্যবহার করার অনুমতি নেই, তাই তো? আচ্ছা এখন গিয়ে কিছু লোকজন ডেকে নিয়ে এসে পিছন থেকে ঠেলতে চেষ্টা কর। চাকর বাকরদের সাহায্যের খোঁজে চালকটি যখন পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িতে বাড়িতে গেল তখন সে গ্লাডিসকে সাথে করে গাড়ি থেকে বের হয়ে তার বাড়িতে ফিরে এল।

“মারো ঠেলা হেইয়ো, জোর হচ্ছে না হেইয়ো, আরো জোরে হেইয়ো, এবার যাবে হেইয়ো''--এগুলো বলতে বলতে, রাস্তার মধ্যে অন্তত আধা ঘন্টা ঠেলাঠেলি করার পর সাইলেন্সারের মধ্য দিয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অবশেষে অনেক কষ্টে গাড়িটি যেন জীবন ফিরে পেল।

তার ঘড়িতে যখন সাড়ে আটটা বাজে তখন তারা রওনা দিল। কয়েক মাইল যাওয়ার পর হাঁটা-চলা করতে অক্ষম একজন সৈনিক তাকে গাড়িতে উঠানোর জন্য হাত ইশারা করল।

“গাড়ি থামাও!'' চেঁচিয়ে উঠল নানকোয়ো। চালকটি ব্রেকের উপর পা ঠেসে ধরে হতভম্বিত হয়ে তার মালিকের দিকে ঘুরে তাকাল।

“দেখতে পাচ্ছো না একজন সৈনিক হাত নাড়ছে? গাড়ি ঘুরিয়ে তাকে তুলে নিয়ে এসো।''

“দুঃখিত স্যার''--চালকটি বলল। 'আমি বুঝতে পারিনি যে আপনি তাকে গাড়িতে উঠাতে চান।''

“না বুঝতে পারলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতে। গাড়ি পিছনে নিয়ে যাও।''

সৈন্যটি, নিতান্তই একটি বালক, পরনের খাকি পোশাকটি ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে, ডান পা টি হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা। একটি গাড়ি যে তার জন্য থামতে পারে, এতে সে শুধু কৃতজ্ঞই নয় যারপরনাই বিস্মিতও হয়ে গেছে। প্রথমে সৈনিকটি তার কাঠের নড়বড়ে ক্রাচটি চালকটির হাতে দিল যা চালকটি সামনের সিটের মাঝখানে ঢুকিয়ে রাখল, তারপর সে অনেক কষ্টে কোনমতে নিজেকে গাড়ির ভেতরে ঢোকাতে সমর্থ হল।

“অনেক ধন্যবাদ, স্যার''--হাঁপাতে হাঁপাতে পিছনের দিকে তাকিয়ে সে বলল।

“আমি আপনাদের কাছে সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবো, ম্যাডাম আপনাকেও ধন্যবাদ।''

“ তুমি গাড়িতে উঠেছো, এতে আমরা অনেক খুশি হয়েছি''- নানকোয়ো বলল। ''তোমার পা কাটা পড়লো কোথায়?''

“আজুমিনিতে, স্যার। জানুয়ারীর দশ তারিখে।''

“মন খারাপ করোনা, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের মত ছেলেদের জন্য আমাদের গর্বের শেষ নেই। ভেবো না, যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তোমাদের উপযুক্ত পুরস্কার তোমরা পাবে''

'“ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তাই যেন হয়, স্যার।''

এর পরবর্তী আধঘন্টার মত সময় তারা নীরবেই চলল। তারপর যখন গাড়িটি একটি ব্রীজের দিকে ঢালু বেঁয়ে উঠতে গিয়ে গতি কমিয়ে আনল তখন কেউ একজন আর্ত চিৎকার করে উঠল- সম্ভবত চালকটি হবে- 'ঐ যে ওরা আসছে!' চিৎকার চেঁচামেচি ও মাথার উপরে আকাশে কানফাটানো শব্দের মাঝে তলিয়ে গেল ব্রেকের ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ। গাড়ি থেমে পড়ার আগেই দরজার পাল্লা খুলে গেল এবং তারা অন্ধের মত ঝোপ-ঝাড়ের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। ভয়ানক তুমুল শব্দের ভেতর যখন তারা সৈনিকটির আর্ত চিৎকার, 'দরজা খুলে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান' শুনতে পেল তখন গ্লাডিস নানকোয়োর একটু সামনে থেকে দৌড়াচ্ছে। সে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল গ্লাডিস থেমে পড়েছে; সে মেয়েটিকে পেছনদিক থেকে ধাক্কা দিল, একই সময়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চিৎকার করে ডাকতে থাকল। তখন একটি উচ্চ হুইসেলের শব্দ তীরের মত নিচের দিকে নেমে এল এবং বিকট শব্দ ও সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবে এমন একটি ঝাঁকুনির মধ্য দিয়ে বিস্ফোরিত হল। যে গাছটিকে সে জড়িয়ে ধরেছিল তা তাকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছিটকে ফেলে দিল। তখন আরেকটি ভয়ানক হুইসেল উচ্চ হতে শুরু করল এবং পুনরায় পৃথিবী ধ্বসে পড়ার মত শব্দে শেষ হল; তারপরে আরেকটা, এরপরে নানাকোয়ো আর কিছু শুনতে পেলনা।

মানুষের কোলাহল ও কান্নাকাটির শব্দে এবং বারুদের গন্ধ ও চতুর্দিক ভর্তি কালো ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে জেগে উঠল নানকোয়ো। সে নিজেকে টেনে তুলে শব্দের উৎসের দিকে টলতে টলতে চলতে লাগল।

বেশ কিছু দূর থেকে সে দেখতে পেল তার চালকটি রক্ত ও চোখের পানিতে মাখামাখি হয়ে তার দিকে দৌড়ে আসছে। সে আরও দেখতে পেল তার গাড়ির ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে এবং পাশেই জট পাকিয়ে আছে মেয়েটি ও সৈনিকটির দেহাবশেষ। তৎক্ষণাৎ সে ভয়ানক একটি চিৎকার দিয়ে উঠে পুনরায় মাটিতে পড়ে গেল ধপাস করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন