শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

দীপক চ্যাটার্জি এবং আব্রামেলিন রহস্য অথবা কৃষ্ণগহরে একটি গোয়েন্দা গল্প

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

(১)

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল মুন্যির খুন হওয়া দিয়ে...যেদিন সকালবেলা বিল্টুর পুষ্যি বিড়াল মুন্যিকে পাওয়া গেল পাড়ার পেছনে পুকুরের পাশের মাঠটায়...মরা! অথবা ঘটনাটা শুরু হয়েছিল তার আগে, আগের রাতে যখন মুন্যিকে দু-তিনতলার কোনও ফ্ল্যাট থেকে কে বা কারা ছুঁড়ে ফেলে দেয়! অথবা ঘটনাটা শুরু হয়েছিল তারও আগে যখন সেই কে বা কারা মুন্যিকে বিল্টুদের বাড়ির বাগান থেকে তুলে নিয়ে যায়।
কিম্বা এরকম বললেও বিশেষ ভুল হবে না যে ঘটনাটা আসলে শুরু হয়েছিল যখন ওই কে বা কারার এই কাণ্ড ঘটানর ইচ্ছে জেগে উঠে মাথার ভেতর। এই ইচ্ছেটা কি একদিন এক মুহূর্তে হঠাৎই জেগেছিল নাকি অনেক দিন, অনেক মাস, অনেক বছর ধরে আস্তে আস্তে জেগেছিল? তাই ঘটনাটা ঠিক কবে শুরু হয়েছিল বলা মুশকিল! কিন্তু তা বলে এরকম বলা যাবে না যে কোনও ঘটনা শুরুই হয়নি আদৌ! দীপক চ্যাটার্জির হাতে যখন এসে পড়ল ব্যাপারটা, তখন আগের ওই ঘটনাটা বা পরে যা ঘটবে সেই ঘটনাগুলো আবার নতুন করে শুরু হল! দীপক শীতের সকালে সবে কফির কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়েছে, কলিং বেল। চাকর এসে জানাল এক ভদ্রলোক এসেছেন, সঙ্গে একটা ছোটো ছেলে। দীপক খবরের কাগজ টেবিলে রেখে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাইরের ঘরের দিকে এগোল। ঘরে ঢুকতে ভদ্রলোক নমস্কার করে বললেন "আমার নাম খগেন মিত্র, আপনিই কি গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জি?"

'গোয়েন্দা' শব্দটা নামের আগে অনেকদিন পর বসতে দেখে দীপকের বেশ আনন্দ হলো। এইসব প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরদের আর বাজার কই আজকাল? খুন জখম রাহাজানি সবই অতি-রাজনৈতিক তথা পাবলিক হয়ে গিয়ে তার মত লোকেদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাই রতনলালেরও ছুটি হয়েছে। দীপক আজ বছর দশেক হল রিটায়ারমেন্ট নিয়েছে; সেদিন সকালে দেখল কাগজের সাপ্লিমেন্টের কভার স্টোরি: 'দীপক চ্যাটার্জি অন্তর্ধান রহস্য'! দেখে তার বেশ মজা লেগেছিল। তাকে এখনও লোকেরা মনে রেখেছে ভেবে বুকের ছাতি দুদাগ বেড়ে গেছিল; দুঃখও হয়েছিল সেই সব জমকাল দিনের কথা ভেবে! তবে এমন কি খারাপ আছে? একটা ট্রাভেল মাগাজিনের হয়ে ফটোগ্রাফি করছে; মাঝে মাঝেই শহরের বাইরে যেতে হয়। গত পরশুদিন দার্জিলিং থেকে ফিরেছে। গতকাল থেকে ক্রিস্টির একটা নভেল নিয়ে পড়ে আছে। এক সময় গোয়েন্দা হিসেবে সফল হলেও তাকে কখনই মেধার ঘরে জায়গা দেওয়া হয়নি, বাংলা বাজারে সে জায়গাটা ব্যোমকেশ, ফেলুদা নিয়ে রেখেছিল, এমনকি কিরিটি যাকে তার বেশ সাধারণ মনে হয়েছে, সেও তার আগে জায়গা করে নিয়েছে আর দীপক চ্যাটার্জি রয়ে গেছে বটতলায়! আজ দশ বছর ধরে দীপক প্রায়ই ভেবেছে, যদি একটা সেই লেভেলের কেস পায় তবে দেখিয়ে দেবে সে আদৌ সেরম ক্রুড গোয়েন্দা নয়! আরে গোয়েন্দা তো as good as the case! সে কেসের উর্দ্ধে গিয়ে কী করতে পারে? এর জন্য স্বপনকুমারকে দোষ দিয়ে কি লাভ? সে কখনও তেমন জটিল কেস পায়নি, খালি ড্রাগন ড্রাগন করেই কেটেছে! তাতে পপুলার কালচার খেলেও আঁতেলরা পাত্তা দেয়নি! তাই এই দশ বছর ধরে প্রায়ই দাঁতে দাঁত চেপে বলেছে নিজেকে: "একটা ফাটাফাটি কেস দাও গুরুদেব, জাস্ট একটা ঘোড়েল কেস, ব্যস, তারপর গ্লোরিয়াস সন্ন্যাস।" এই মর্মে আজ এতগুলো বছর ধরে রীতিমতো কড়া পড়াশোনা করে গ্যাছে, পৃথিবীর তাবড় সব ক্রাইম ক্লাসিক, হুডানিট পড়েছে একের পর এক, পড়েছে ক্রিমিনাল সাইকোলজির কিছু বইও। পৃথিবীর কুখ্যাত ক্রাইম এবং ক্রিমিনালদের স্টাডি করেছে বই, ইন্টারনেট আর টেলিভিশন সর্বত্র। মাঝে মাঝে ইন্টারনেটে এত তথ্য পেয়েছে যে মনে হয়েছে, এই WWW এর কল্যানে সবাই গোয়েন্দা হতে পারে আজকাল, তার আর কি দরকার! তারপর হতাশা কাটিয়ে আবার অপেক্ষা শুরু করেছে। আজ প্রায় বছর পাঁচেক হল তার বাড়ি কেস নিয়ে আসে না কেউ। রিটায়ারমেন্টের খবর এখন বস্তাপচা। কফির কাপে বুদবুদগুলো ভাঙছে জুড়ছে, জুড়ছে আবার ভাঙছে, কাছে নিয়ে গেলে সেটাই একটা ব্রহ্মাণ্ড! ব্ল্যাক হোল আর মিল্কি ওয়ে! ওই সব তাবড় কুহরে ঢুকে গেলে কোথায় ক্রাইম আর কোথায় ক্রিমিনাল?

এরপর খগেন মিত্তির আর তার ছেলে সম্বিত ওরফে বিল্টুর কাছ থেকে দীপক মুন্যি খুনের ব্যপারটা শুনল। প্রথমে বেশ হতাশ হয়েছিল: কি না কি ভাবলো, আর শেষে কিনা বিড়াল খুনের মামলা কিন্তু তারপর মুন্যির অটপসি রিপোর্টের কথা শুনে তার মাথা ঘুরে গেল! কফির কাপে চামচ নেড়ে নতুন কয়েকটা শেপ গড়েপিটে নিল! মুন্যি বিল্টুর আদরের বিড়াল এবং তার এহেন ভয়ঙ্কর মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত এবং ক্ষুব্ধ মিত্র পরিবার পুলিশে খবর দেয় এবং নিয়মমাফিক মুন্যির একটা অটপসি হয়। তার থেকে যে ডিটেইলগুলো বেরিয়ে আসে সেগুলো প্রায় মানুষের কল্পনার অতীত! মুন্যির অমন ক্ষতবিক্ষত, আধা ভেজা, আধা পোড়া বডি দেখেই ওনাদের সন্দেহ হয়েছিল এবং পোস্টমর্টেমে প্রমাণ হয়ে যায় যে মুন্যিকে একবার দুবার নয়, বারবার নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। রিপোর্ট বলছে তার খাবারে আর্সেনিক দেওয়া হয়, অতিমাত্রায় ক্লোরোফর্ম করা হয়, গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, সম্ভবত গ্যাসের ওপর রেখে আগুনে পোড়ান হয়, পেটে ছুরি চালান হয়, গলার নলি কাটা হয়, মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয় কোনও ভারি রড জাতীয় জিনিস দিয়ে, জলে ডোবানো হয় এবং সবশেষে জানলা দিয়ে নিচে ছুঁড়ে ফেলা হয়। তার বডির অবস্থা দেখে এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে অনেক উঁচু থেকে ফেলা হয়নি, মানে হয়ত দোতলা, তিনতলা থেকে! পুলিশ এহেন অটপসির পর খানিক নড়ে চড়ে বসেছে। এমনকি সেদিনের খবরের কাগজটা যেটা দীপক তখন সবে পড়তে শুরু করেছিল, তাতে নাকি খবরটা বেরিয়েওছিল! যেখানে তার বডি পাওয়া গ্যাছে তার ঠিক আশেপাশে অন্তত ওরকম বাড়ি বিশেষ নেই, যেখান থেকে তাকে ছুঁড়ে ফেলা যায়। সব থেকে কাছের দোতলা বা তিনতলা বাড়িও স্পট থেকে যতটা দূরে তাতে সরাসরি সেখান থেকে ছোঁড়া আউট অফ কোয়েশ্চেন! তাই ধরে নেওয়া যায় মুন্যিকে ফেলে দেবার পর তুলে এনে ওই মাঠে ফেলে গেছে আততায়ী। এই ভয়ঙ্কর ঘটনা যে ঘটাতে পারে তার মানসিক স্থিতি কেমন তা তো বোঝাই যাচ্ছে এবং সে যে দু'দিন পর কোনও মানুষকে নিয়ে এমন করবে না তার কি গ্যারান্টি? মুন্যির সাথে এরকম শত্রুতা কারুর থাকতেই পারে না, তাই ব্যপারটা নিতান্তই বিকৃত মস্তিষ্কের পরিচয় দিচ্ছে। এহেন ভাবনাচিন্তা করতে করতে দীপক দেখল কফিকাপের নিকষ কালো তরলতায় একটা ঠোঁটের মতো তৈরি হয়েছে বুদবুদের যোগসাজশে কিন্তু সেটা আর খাওয়ার মত নেই! একেবারেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে!

দীপক অটপসি রিপোর্টের একটা কপি রেখে দিল নিজের কাছে। পার্টি চলে যাবার পর বসে বসে আবার পড়তে লাগল। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত,আট, নয়: নটা আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে খুন করা হয়েছে মুন্যিকে। সংখ্যাটা কাউন্ট করতেই দীপকের কানে কানে কে যেন একটা ইংরেজি প্রভার্ব বলে উঠলো: "A cat has nine lives!" সে শিউরে উঠল এই ভেবে যে আততায়ী কি তবে এই প্রভার্বটা টেস্ট করছিলো? বিড়ালটাকে পুরোপুরি মারার জন্যেই কি এমন বন্দোবস্ত? তাহলে হয়ত মুন্যি এখানে শুধুই একটা উপলক্ষ! নটা আলাদা আলাদা মৃত্যু একে অপরের ওপর বসিয়ে দিয়ে গেছে, একটা শরীরে নয়-নয়টা মৃত্যু! কফিকাপে বুদবুদেরা সদলবলে একটা কান তৈরি করে ফেলেছে! বিশ বাঁও জলের নিচে ভয়াবহ অসুস্থ এক মগজ লুকিয়ে রয়েছে কোথাও!!!


(২)

দেখতে দেখতে একটা সপ্তাহ কেটে গেল। দীপক একদিন স্পটটা ঘুরে এল, খগেন বাবুদের বাড়িতে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করল মুন্যির কিডন্যাপিংনিয়ে। বিড়ালের ন'টা জন্ম নিয়ে বেশ কিছু পড়াশোনাও করে ফেলল, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও পথ বেরোল না। ইতিমধ্যে আবার এক কাণ্ড! খগেন বাবুদের পাড়ার পেছনের ওই মাঠে এবার একটা ছাগলের মৃতদেহ। এই কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার প্রাঞ্জল ভৌমিক ফোন করে জানালেন। এবার অবশ্য সেরকম কোনও ভয়াবহতার পরিচয় নেই; শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে। একটা অন্য ব্যপার ঘটেছে: ছাগলটার গলায় একটা পাট্টা বাঁধা যাতে তিনটে নয় লেখা রয়েছে লাল স্কেচ পেন দিয়ে! একই জায়গায় দু'সপ্তাহে দুটি প্রাণী খুন এবং এক্ষেত্রে আবার নয় সংখ্যাটার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা, হাই চান্সেস একই লোকের কাজ। কিন্তু এই নয়ের রহস্যটা কী? লোকটা একটা খেলা খেলছে, আমাদের লিড্ দিতে চাইছে, কিন্তু সেটা মিসগাইড করার জন্যও হতে পারে।

খুনি একটা সেরিব্রাল প্যাটার্ন তৈরি করতে চাইছে, কয়েকটা ক্লু দিচ্ছে। এগুলো প্রতিস্ব নির্মাণপর্বের খেলাধুলো। সে নিশ্চই আরও বড় কোনও কাজের মহড়া দিচ্ছে। এ পথে চললে সেটা ভয়ানক কিছু হতে চলেছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই আর সেই জন্যই কলকাতা পুলিশ উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছে। এলাকায় সিভিল ড্রেসে পুলিশ পোস্টিং করা হয়েছে। বিড়াল, তার ন'টা জীবন, ছাগল, ৯৯৯--এই ক্লুগুলোর যোগাযোগ কোথায়? বুদ্ধির পরীক্ষায় সাধারণভাবে যা হয়ে থাকে তা হল জ্ঞানের লড়াই। এই ক্লুগুলোর মধ্যে একটা যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে এবং যেখানে রয়েছে, যোগাযোগের সেই গোপন পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে পারলে হয়ত খুনির উদ্দেশ্য বা পরবর্তী স্টেপ সম্পর্কে একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে! বিকৃত মস্তিষ্কের ব্যক্তিরা প্রায়শই কোনও এক ব্যক্তি বা তার কোনও এক অ্যাকশনকে আইকন বানিয়ে নিয়ে সেটা ফলো করতে চায়! একে ডিলিউশানাল আইডেন্টিফিকেশন বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের অ্যাকশনের কোনও ইতিহাস আছে কিনা সেটা খুঁজে দেখা যাক!

কফির কাপে জমাট বাঁধা আর ফাট ধরার খেলা চলতে থাকল আর কাপের বাইরে দীপক চাটুজ্জের অনুসন্ধান! বুদ্বুদগুলো উল্টে পাল্টে গেলো, ৯৯৯ থেকে ৬৬৬। এই হল ইংরেজির মজা, উল্টো-সোজা বোঝা কঠিন হয়ে আসে। কফিকাপ বুঝল কিনা জানা নেই কিন্তু একটা প্যাটার্ন মিলল। ছকটা যার দিকে আঙুল তুলে দেখাল সে হল আলেস্টার ক্রাউলি (১৮৭৫-১৯৪৭), এমন এক হেরেটিক ব্ল্যাক ম্যাজিসিয়ান যাকে পৃথিবীর উইকেডেস্ট ম্যান বলা হয়ে থেকে। তিনি তার কনফেশনসে নিজেই লিখেছেন বিড়ালের ন'টা জীবনকে পরীক্ষা করার জন্য কীভাবে ছোটবেলায় একটি বিড়ালকে মেরেছিলেন, হুবহু এইভাবে। ক্রাউলি নিজেকে beast 666 বলতেন কারণ 666 শয়তানের সংখ্যা। ছাগলের গলার পাট্টায় খুনি ইচ্ছে করেই বাংলায় ৬৬৬ লেখে খেলা জমানর জন্য! দীপক ক্রাউলির কথা আগেই পড়েছিল আর একটি বিড়ালকে ন'বার এভাবে মারার প্রিসিডেন্স ক্রাউলি ছাড়া অন্য কোথাও নেই! ছাগলের রেফারেন্সটাও বোঝা যাচ্ছে। ক্রাউলির কনফেশনস বলছে যে একবার ভারতে এসে একটি শিবমন্দিরে বলি দেবার জন্য টাকা দিয়ে তিনি একটি ছাগলকে মারিয়েছিলেন। আততায়ীর সিক্রেট টেক্সটটা বেরিয়ে এসেছে কিন্তু ক্রাউলির এই অ্যাকশনগুলো রিপিট করে লোকটা ঠিক কী প্রমাণ করতে চাইছে? সে কি ক্রাউলি কাল্টকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়? দীপক কফিতে চুমুক দিল। কাপের বাইরে কত কিছুই না ঘটে যাচ্ছে! কাপের ভেতরে কৃষ্ণগহ্বরের প্রশান্তি এবং শূন্যতা; যেন সব ঘটনাই বাইরে বাইরে ঘটছে! গোয়েন্দা গল্প মানে আদতে একটা ফেইথ, একটা বিশ্বাস, যে কোথাও না কোথাও দেয়ার ইজ আ সিক্রেট ন্যারেটিভ!


(৩)


৯.৯.২০০৯
সেদিন সকালে ক্যালিফোর্নিয়ার জেলে একটা লোক দেখা করতে এসেছিল চার্লস ম্যানশনের সাথে। তাকে হাতের গভীরে একটা মোবাইল ফোন চালান করেছিল। লোকটা চলে যাবার পরেই চার্লস ফোন করেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন অজানা নম্বরে। পুলিশ পরে ফোনটা কেড়ে নিলেও নম্বরগুলো আইডেন্টিফাই করতে পারেনি! তার মধ্যে একটা ফোন গিয়েছিল US এর বাইরে, আমার এখানে, এই মোবাইল নম্বরে: ৯৯৯৯৯৯৯৯৯।

দ্য গ্রেট চার্লস ম্যানশন! অপরাধের দুনিয়ায় অবিস্মরণীয় এক নাম, হেল্টার স্কেল্টার! আমরণ জাতি-যুদ্ধ! কালোর সঙ্গে শাদার। ভালর সঙ্গে মন্দর। পৃথিবীর শেষ অব্দি। Battle unto Death! সভ্যতাকে তার কাঙ্ক্ষিত বিনাশের দিকে নিয়ে যাবার মহান দায়িত্ব যারা নিয়েছিল সেই ম্যানশন ফ্যামিলির লিডার ৭৩ বছরের যুবক চার্লস ম্যানশন আমায় ফোন করে।


১২.৯.২০০৯
তাকিয়ে আছি শ্যারন টেটের মৃতদেহের ছবির দিকে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফ্লোর। গলায় ফাঁসির দড়ি বাঁধা। ফুলে ঠাস হওয়া পেটের ভেতর একটা মরা বাচ্চা। আম্বিলিকাল কর্ড কাটার আর দরকার নেই! কাম অন চার্লি! পুল ইট আউট আই সে! পুল ইট আউট!


১৬.৯.২০০৯
ইউটিউবে চার্লির ভয়েস রেকর্ডিং শুনছি।

Why are you crucifying Christ every day? Every day you're killing Christ's air. Every day you're taking Christ's life. Every day you're poisoning Christ's water. If you really truly love Christ, then get with ATWA. The ATWA is the righteous order of the planet. It started with George Washington, the Sons of Liberty. The Sons of Liberty gave their life. We cannot live without liberty. Liberty is the thing that makes our hearts beat. Liberty is the thing that gives us 'human'. There's no humans. All the humans now are brain-dead. 45 years' you're all that's helped, you and 'Everybody that's helped has always had a fuckin' ulterior motive for something other than ATWA. They don't give a fuck about ATWA, they use ATWA to get some money, or use ATWA to get some attention. You know, I mean, who really gives a fuck about ATWA? The bugs, birds, trees, they do, 'cause they have to, 'cause they're in the will of God. God knows.


আমার আনার্কিস্ট হিরো কি শেষে ভণ্ড ধার্মিক হয়ে গেল? যতই সিনিসিজম থাক, এত এক মানবতাবাদী পরিবেশবীদের বয়ান? এই পথে কি পৃথিবীর ধংস আসবে? চার্লির কাছেও পৃথিবীর মহান বিনাশ দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে গেল?


২০.৯.২০০৯
চার্লি আজ আমায় আবার ফোন করেছিল। ও আমায় বলেছে ওর নামে ওর ভক্তরা মিথ্যা প্রচার করছে, ওরা ওকে ভাল বানাতে চাইছে, কিন্তু ও আমার চার্লস ম্যানশন, হাউ ক্যান হি বি গুড? আজ ও আমায় আলেস্টার ক্রাউলির কথা বলেছে! বলেছে ক্রাউলির কনফেশনস পড়তে। লকনেস আইল্যান্ডের বল্স্কিন হাউস কিনে সব প্রস্তুতির পরও যে আব্রামেলিন অপারেশন ক্রাউলি করে যেতে পারেননি, তা আমায় করার হুকুম দিয়েছে চার্লি। আব্রামেলিন অপারেশনের মধ্যে দিয়ে শয়তানকে ডেকে আনতে হবে, সেই আমাদের এই পাপের পৃথিবী থেকে মুক্তি দেবে! চার্লি তার বিনাশের লক্ষে অটল!


২৫.১২.২০০৯
ক্রাউলির কনফেশনস পড়েছি, আবার পড়ছি। ওর সব বই যোগাড় করেছি, সাথে দ্য বুক অফ আব্রামেলিন। অপারেশনের ডিটেইলগুলো নোট করে রাখছি। এবার খালি দরকারমত একটা বাড়ি চাই. নিরিবিলি, একটা ঘর যার উত্তরে একটা দরজা থাকবে; সেই ঘরেই রিচুয়ালটা হবে, মন্ত্রপাঠও সেখানেই। দরজা খুললে বারান্দা। নদীর ধার থেকে আনা টাটকা বালিতে ঢাকা। বালির গন্ধে মোমো করবে হাওয়া! ওখানেই প্রেতেরা জমায়েত হবে: লুসিফার, সেটান, লেভায়াথান, বেলিয়ালসহ বারোজন আসবে। সবাই এক হয়ে যাবে ক্রমশ...জুড়ে যাবে একে অপরের সাথে...ব্যস, তারপর বুম!..সব শেষ...অবশেষে সব শেষ...একা নিকষ কালো মৃত্যুর হাত থেকে নিষ্কৃতি...আ গ্রেট কালেকটিভ ডেথ!


১৫.১.২০১০
যত দিন যাচ্ছে বুঝতে পারছি ক্রমশ: আমিই আলেস্টার ক্রাউলি! আমার মধ্যে সেধিয়ে গেছে সে। আব্রামেলিন আমার হাতের মুঠোয়। আজ ক্রাউলির মতই একটা বিড়ালকে ধরে এনে তার শেখান ৯টা পদ্ধতিতে মারলাম। আমি আমার অপারেশনের বাড়িতে শিফট করে গেছি। আর মাত্র ৬টা মাস, ব্যস তারপর আর কোনো তারপর নেই, সব শেষ...ঠিক যেমনটা আমি চাই!

বরফের চাঁই ভাঙার শব্দ পাচ্ছি! প্রতি রাতে চরাচর জুড়ে একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে আব্রামেলিনের বিষ মৃদুমন্দ ফ্লেক হয়ে! ক্রাউলির লায়লাও নেমে এসেছে আমার এই স্পেকটাকল দেখবে বলে! সে আমার! এই ধংসকাম নিয়ে প্রতিটা রাত তার নরম শরীর কুরে কুরে খাচ্ছি আমি! ক্ষত যত বড় হচ্ছে ততই সে উন্মত্ত হয়ে ভায়োলিন বাজাচ্ছে! তার রক্তাক্ত শরীরের প্রতিটি ক্ষতের ভেতর এসে পড়ছে আব্রামেলিনের বিষ-তুষার! সাদা হয়ে জমে যাচ্ছে লাল রক্তের দাগ! মিলিয়ে যাচ্ছে প্রতি রাতে আরো খানিক আবছা হয়ে যাওয়া মিলিয়ে আসা এই পৃথিবীর মত! লায়লার ভায়োলিন বেজেই চলছে, মেধার ভেতর! শ্রান্তির ভেতর!


২২.১.২০১০
আজ কনফেশনসের কথামতো একটা ছাগল মেরে ফিরলাম। না, না এটা আব্রামেলিনের অংশ নয় কিন্তু ক্রাউলি ভারতে থাকাকালীন একটা ছাগল মারিয়েছিল শিবমন্দিরে বলির জন্য! ক্রাউলির সাথে ভারতের এ এক গ্লোরিয়াস যোগ! এই গ্রেট অ্যাকশনের রেপিটিশন আমায় আব্রামেলিনের জন্য আরো প্রস্তুত করবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।


একটা বিরাট ব্ল্যাক হোল! হাঁ করে গিলতে আসছে আমাদের! লায়লা, হে আমার মিথ্যাময়ী প্রেমিকা! তুমি কি শুনছ ধংসের ওই সঙ্গীত?


৫.৪.২০১০
চার্লিকে ফোনে বললাম: গোলাপ। মৌমাছি। জাদুদণ্ড। জাদুপ্রদীপ। আব্রামেলিনের তেল সব তৈরি। আজ থেকে সূর্যোদয়ের আগে আর সূর্যাস্তের সময় প্রেয়ার শুরু। একটু দেরি হল বটে কিন্তু আর মাত্র ৬ মাস এই পৃথিবীর আয়ু! তারপর কিছু নেই কোথাও...কিচ্ছুটি চোখে পড়বে না আর! চোখও থাকবে না চোখে পড়ার!

ও লায়লা! বাজাও তোমার ভায়োলিন! যতক্ষণ না তোমার ভায়োলিনের তার ছিঁড়ে যায়! সঙ্গীত দিয়ে শেষ হোক সঙ্গীত দিয়ে শুরু হওয়া এই পৃথিবীর! বাজাও লায়লা! থেমো না! বাজিয়ে যাও!


২৫.৪.২০১০
আজকে ফোনে চার্লি আমায় আলেস্টার বলে ডেকেছে! ও-ও মেনে নিয়েছে আমিই ক্রাউলি। পৃথিবীর দিন ফুরিয়ে আসছে...হাওয়ার হয়ে ওঠার ভেতর আব্রামেলিনের গন্ধ পাচ্ছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি দিনশেষের ছায়ারা ছোটো হয়ে আসছে...অন্ধকার হলেই লায়লার শরীরে আব্রামেলিনের তেল মাখিয়ে দিচ্ছি...রোমকূপের ভেতরে সারা শরীর সাড়া দিচ্ছে...ওর শরীর জুড়ে বালির গন্ধ। নদী থেকে সদ্য আনা বালিতে ভরিয়ে দিয়েছি বারান্দা! বালির মত শরীর, ফাঁকে ফাঁকে মিথ্যে বসে আছে... মিথ্যে দিয়ে জোড়া হাড়মাস থেকে ভায়োলিন বেজে উঠছে অহরহ।


১৫.৫.২০১০
বারান্দায় বালির ঢিপিটা বড় হচ্ছে ক্রমে। ঢিপির ভেতর থেকে নিশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি। লায়লার পায়ু আর যোনিপথ জুড়ে দিয়েছি সুতো দিয়ে।

৩০.৫.২০১০
যোনি আর পায়ুপথে আব্রামেলিনের তেল ঢেলে দিই রোজ সূর্যাস্ত হলে...তেলে ভেজা সুতোর জোড় কেঁপে চিকিয়ে ওঠে অন্ধকারে...তাকিয়ে থাকি সেই অতল গহরের দিকে! সৃষ্টির পথ লয়ের দিকে ঝুঁকে যায় ক্রমশ। বারান্দায় বালির ঢিপি থেকে দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ বয়ে আনে হাওয়া।


২০.৬.২০১০
আজ লায়লা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছে: 'ধ্বংস মানে কি ইতিহাস মুছে দেওয়া?' পৃথিবীটা মুছে গেলেও তার অতীত, সে কি কোথাও লুকিয়ে থেকে যাবে?...চার্লিকে ফোনে এই প্রশ্নটা করেছি; ও আমায় আশ্বস্ত করেছে যে আব্রামেলিন শুধু বর্তমান আর ভবিষ্যতকেই নয়, অতীতকেও মুছে দেবে...কম্পিউটারের ভাষায় যাকে বলে ctrl+z!


১৮.০৭.২০১০
আজকাল সূর্যাস্তের প্রেয়ার সেরে লায়লার যোনির ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দিই আর ও বিরামবিহীন ভায়োলিন বাজিয়ে যায়! যোনিপথের পিচ্ছিল অন্তর্গাত্রে খনন বজায় রাখি। মন্ত্রপাঠ ছাড়া যোনিপথের ভেতরেই মুখ খুলি কেবল; কথা ছুঁড়ে দিই অনন্ত পথের দেওয়ালে...দেওয়াল আস্তে আস্তে মিহি হয়, জারণরসে ভিজে যায়...ইতিহাসের কাঙ্ক্ষিত বিয়োজন-পর্বে জারণরসের শেষ বিন্দু পর্যন্ত শুষে নেয় আমার জিভ...লকলকিয়ে ওঠে মিহি দেওয়াল বরাবর...বারান্দায় শ্বাস প্রশ্বাসের উতরোল শুরু হয়ে যায়।

আমায় ইচ্ছার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে এখানে! আমি সবাইকে নিয়ে যাব! সবকিছু নিয়ে যাব!


২০.৮.২০১০
পৃথিবী...সময়...ভাষা...ফেরার পথ নেই তেমন...


৩০.৮.২০১০
সবাইকে মরতে হবে...সবকিছুকে মরতে হবে...কারণ আমি একলা মরতে ভয় পাই! কারণ পৃথিবী টিকে থাকার অযোগ্য!


৯.৯.২০১০
বারান্দায় বালির ঢিপির আকার বদলাচ্ছে! একটা নিশ্বাস নয়, অনেকগুলো! দিনটাও এগিয়ে আসছে!

১৫.৯.২০১০
লায়লার যোনি বেয়ে তার পেটে ঢুকে গেছি। তার নাভির চারপাশে একটা গর্ত করে মাথাটা বার করে রেখেছি। এখান থেকে বেরই না! এভাবেই অপারেশনের শেষ কয়েকটা দিন কাটাচ্ছি। ভায়োলিন বন্ধ হয়েছে...যেন তারও প্রয়োজন ফুরিয়েছে এখন!

২৯.৯.২০১০
চার্লিকে শেষ ফোনে জানিয়ে দিলাম কারেন্ট স্কোর! আর কোনো যোগাযোগ নয়!


১.১০.২০১০
বারান্দায়...

২.১০.২০১০
বালির...

৩.১০.২০১০
ভেতর...


৪.১০.২০১০
ফিসফিস...


৫.১০.২০১০
ঘটনাটা শুরু হয়নি মুন্যির খুন হওয়া দিয়ে...যেদিন সকালবেলা বিল্টুর পুষ্যি বিড়াল মুন্যিকে পাড়ার পেছনে পুকুরের পাশের মাঠটায় পাওয়া গেল না অথবা ঘটনাটা শুরু হয়নি তার আগে, আগের রাতে যখন মুন্যিকে দু-তিনতলার কোনও ফ্ল্যাট থেকে কেউই ছুঁড়ে ফেলে দিল না তখন! অথবা ঘটনাটা শুরু হল না তারও আগে যখন সেই কে বা কারা মুন্যিকে বিল্টুদের বাড়ির বাগান থেকে তুলে নিয়ে গেল না। কিম্বা এরকম বললেও বিশেষ ভুল হবে না যে ঘটনাটা আসলে শুরু হয়নি যখন ওই কে বা কারার এই কাণ্ড ঘটানোর ইচ্ছে মাথার ভেতর জেগে ওঠেনি। এই ইচ্ছেটা কি একদিন এক মুহূর্তে হঠাৎই জাগেনি নাকি অনেক দিন, অনেক মাস, অনেক বছর ধরে আস্তে আস্তে জাগেনি? তাই ঘটনাটা ঠিক কবে শুরু হয়নি বলা মুশকিল! তা বলে এরকম বলা যাবে না যে কোনও ঘটনা শুরু হেয়েছে আদৌ! দীপক চ্যাটার্জির হাতে যখন এসে পড়ল না ব্যপারটা, তখন আগের ওই ঘটনাটা বা পরে যা ঘটবে না সেই ঘটনাগুলো আবার নতুন করে শুরু হল না! দীপক শীতের সকালে সবে কফির কাপে প্রথম চুমুকটা দেয়নি, এমন সময় কলিং বেল বাজল না। চাকর এসে জানাল এক ভদ্রলোক আসেননি, সঙ্গে একটা ছোটো ছেলে...আসেনি। দীপক খবরের কাগজ টেবিলে রেখে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাইরের ঘরের দিকে এগোল না। ঘরে ঢুকতে যে ভদ্রলোক আসননি তিনি তার না আসার ভেতর থেকে নমস্কার করে বললেন- 'আমার নাম খগেন মিত্র নয় আর আপনিও গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জি নন'।


লেখক পরিচিতি
অর্ক চট্টোপাধ্যায় 
 কলকাতা শহরের উপকন্ঠে উত্তরপাড়ায় বাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএএমএ এবং এম-ফিল। বর্তমানে সিডনিতে গবেষণারত। দশ বছর ধরে গল্প-গদ্য লেখালিখি। নবেন্দু বিকাশ রায়ের সাথে বিগত ৬ বছর ধরে অ্যাশট্রে নামক লিটল ম্যাগের সম্পাদনা। বর্তমানে অনুপম মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ওয়েবজিন বাক-এর 'গল্পনাবিভাগের সম্পাদক। শূন্য দশকের বিভিন্ন লিটল ম্যাগের সাথে যোগাযোগ এবং লেখালিখি। কয়েকটি বন্ধু পত্রিকা: বৈখরী ভাষ্যঅবসরডাঙাঅক্ষরযাত্রাপ্রতিষেধকজার্নি ৯০জকালিমাটিকৌরবনতুন কবিতাঅপর ইত্যাদি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন