সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

ফারুক মঈনউদ্দীন. এর গল্প- কোথায় শরণ

রোকন দাদাদের বাড়ি থেকে অনেকটা গা-ঢাকা দিয়ে বের হয়ে পুকুর পাড়ে উঠে এলে ওদের বাড়ির কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে ছুটে আসে, কুকুরকে ভয় না পেলেও এই চোর তাড়ানো ডাকে কেউ আবার ছুটে আসে কি-না সেটাই ভয়। আমার পেছনে রোকন দাদা, তার পেছনে নিরাপদ দূরত্বে নুরী। কুকুরটা ছুটে নুরীর কাছে এসে চুপ করে গেলেও নাক দিয়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করে তাকে অনুসরণ করতে থাকে। তারপর এক ছুটে ওকে পেরিয়ে রোকন দাদার পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে আবার পিছিয়ে পড়ে। আমি একটু মজা করার জন্য বলি, মনিব চিনতি না পারলি আইজ মরিসিলাম আমি। এই ঠাট্টার কোনো জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা নেই রোকন দাদার।

ঝোপঝাড়ের ঘন অন্ধকারে প্রায় আন্দাজের ওপর চললেও আমার হাতের তিন ব্যাটারির টর্চটা জ্বালাই না, রাস্তায় ওঠার আগে জ্বালানো ঠিক হবে না, এ রকম অজায়গায় রাতের এই প্রহরে টর্চের আলো অনেকদূর থেকেও চোখে পড়বে যে কারও। অনেক রাত হয়নি যদিও, তবুও শীতের রাত বলে মনে হচ্ছে মধ্যরাত।

বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে এলজিইডির পাকা রাস্তায় উঠে আসার মুখে লাল বিন্দুর মতো বিড়ির আগুন মাঝে মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠলে ডাঁই করে ফেলে রাখা মাটির ঢিবির মতো উবু হয়ে বসা একটা মানুষের আবছা মূর্তি চোখে পড়ে। ওখানে পৌঁছে সরাসরি টর্চ না মেরে লোকটার পাশের মাটিতে আলো ফেললে লোকটার খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি, এবড়ো-থেবড়ো ভাঙাচোরা মুখ আর মরা মাছের মতো চোখ স্পষ্ট হয়। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ানোর সময় চিতায় মড়া পোড়ানোর সময় হাড় ফাটার মতো লোকটার হাঁটুর হাড়ের কোথাও মট মট শব্দ করে ওঠে। আমাদের কিছুটা পেছনে চাদরে মুখ ঢাকা নতমুখী নুরীর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে লোকটা, তারপর রোকন দা'র দিকে তাকিয়ে বলে— চলেন, ম্যালা রাত অয়ে গেল।
রোকন দা বিড়বিড় করে, একটা বেবিট্যাক্সি পাওয়া গেলি ভালো অতো, বলে আমার দিকে তাকালে আমি হাঁটতে শুরু করে বলি, হাঁইটে যাতি যাতি খালি পালে উইঠে পড়বানে।
আমরা একটা ছোট শোক মিছিলের মতো শব্দহীন হাঁটতে থাকি, আমার ঠিক পেছনে রোকন দা, তার পেছনে লোকটা, সবার শেষে নুরী। রাস্তার অবস্থা দেখে নেওয়ার জন্য কখনও আমার হাতের টর্চ জ্বালালে রাস্তার পাশের সটিবনের ভেতর থেকে কুনো ব্যাঙের লাফিয়ে যাওয়া চোখে পড়ে। বড় রাস্তায় বাস থেকে নামা দু-একজন পায়ে হাঁটা যাত্রী আমাদের নিঃশব্দ মিছিল পেরিয়ে যাওয়ার সময় সাময়িক কৌতূহলে একঝলক তাকায়।

শীত তেমন কড়া কামড় বসায়নি এখনও, মাঝে মধ্যে দু-একটা ইজিবাইক গুড় গুড় করে চলে যাচ্ছে, রোকন দা প্রত্যেকবার পেছন থেকে শব্দ শুনে ভিক্ষুকের মতো হাত তুলছিল, কিন্তু কোনোটাই খালি নেই।

রাস্তার গা ঘেঁষে তোলা দু-একটা ঘরের ভেতর থেকে কথাবার্তার গুনগুন, বাসনকোসন নাড়াচাড়ার গৃহস্থালি শব্দে জনহীন পথের পাশে জেগে আছে মানুষের প্রাণের স্পন্দন। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মাঝখানে দূরে কোথাও ডিপ টিউবওয়েলের শব্দ আর তার মাথার ওপর একচক্ষু বাতি অন্ধকারের মাঝখানে বিনিদ্র প্রহরীর মতো জেগে আছে। আমরা যখন বড় রাস্তার কাছে আসি, ততক্ষণে দোকানপাটের ঝাপ বন্ধ, ওগুলোর সামনে হেটো কুকুরগুলোর দু-একটা বিড়ে পাকিয়ে ঘুমে, তবে কুকুরের ঘুম ভীষণ পাতলা বলে আমি নিজের অলক্ষে পায়ের শব্দ না করার চেষ্টা করি। মোড়ের চা দোকানটা এখনও চালু আছে, তবে ভেতরের লোকজনের চোখ টেলিভিশনের পর্দার ওপর নিবদ্ধ, তাই আমাদের নিঃশব্দ মিছিলটি কেউ লক্ষ্য করে না। আমার বুকের ভেতর থেকে স্বস্তির একটা অস্পষ্ট নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে আপনাআপনি।

বড় রাস্তায় গোঁ গোঁ করে চলা ট্রাকবহরের ফাঁকফোকরে দু-একটা ইজিবাইক নতুন হাঁটতে শেখা বাচ্চাদের মতো টলোমলো করে চলে যাচ্ছিল যাত্রীবোঝাই করে। বেশ কিছুক্ষণ পর খালি একটা আমাদের দেখে থামে, আমরা উঠতে চাইলে ড্রাইভার নুরীর দিকে একটু সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। আমি পাত্তা না দিয়ে সবাইকে নিয়ে উঠে বসে বলি, কলেজ রোড চলো, রিজার্ভ, আর কোনো প্যাসেঞ্জার তুলবিনে।

কলেজ রোডের বেশিরভাগ দোকানপাট ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে, সেই রাস্তা থেকে একটা ছোট গলি বামে ঢুকে গেছে, মোড়ের ওপর স্টুডিও পারিজাতের সাইনবোর্ডের মাথায় একটা ফকফকে সাদা বাল্ব যে আলো ছড়ায় তার অনুজ্জ্বল আভা ছড়ানো গলির শেষ মাথায় কাঠের গেটটা আধা ভেজানো। ভেতরের দু'পাশ থেকে একটা জবা আর একটা করবী গাছের ডালপালা জেগে আছে আধো অন্ধকারে। গেটের মাথায় ঢাকনাহীন বাল্ব ঝুলছে একাকী, তার পাশে একটা মলিন সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা, নিউ লাইফ ক্লিনিক, ডা. মিনতি মণ্ডল, এমবিবিএস, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, এখানে অভিজ্ঞ হস্তে যত্ন সহকারে ডিএনসি ও এমআর করা হয়।

আমরা গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে ওয়েটিং রুমে বসি। এ সময় আয়া কি নার্স গোছের একজন ঢোকে। আমাদের খুব একটা আমলে না নিয়ে নুরীকে ডেকে নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে যায়। বুঝতে পারি, আগে থেকে বলে গিয়েছিলাম বলে আমাদের আসার খবর জানা ছিল ওর।
ভেতরের ঘর থেকে নার্স মতন মহিলাটির গলা শোনা গেলেও ঠিক কী বলছে বোঝা যায় না, তার কথার জবাবে গুনগুন করে যে শব্দ শোনা যায় সেটি নুরীর বলে বুঝতে পারি। আমাদের সাথের লোকটা একবার রোকন দা'র দিকে তাকিয়ে বলে, ওরে কোয়ানে নে গেল? রোকন দা কিছু বলার আগে আমি বলি, ডাক্তারের ধারে।

এবার ভেতর থেকে আরেকটা নারীকণ্ঠ শোনা যায়, ওটা সম্ভবত মিনতি মণ্ডলের। আমরা কান খাড়া করেও কোনো কথা ধরতে পারি না। ভেতরের অন্য ঘর থেকে টেলিভিশনের শব্দ শোনা যায়, আচমকা বিজ্ঞাপন শুরু হলে শব্দটা গমগম করে ওঠে ভেতর থেকে, একটা পুরুষকণ্ঠে ধমক শোনা যায়, এই সাউন্ড কমা, কানে কম শুনিস নিকি? তখন কেউ হয়তো রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম চেপে শব্দটা কমিয়ে দেয়। এসব নিত্য পরিচিত শব্দরাজির ভেতর ডুবে গেলে কিছুক্ষণ পর মিনতি মণ্ডল বেরিয়ে আসে, তার হাতে লাগানো সার্জিক্যাল গ্গ্নাভস দেখে আচমকা মনে হয় রুটি বানানোর জন্য ময়দা মাখাতে মাখাতে মাঝপথে উঠে এসেছেন। আমিই আগে একদিন এখানে এসে ওর সাথে কথাবার্তা বলে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে গিয়েছিলাম বলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, পেশেন্ট যা বলতিসে যদি ওর দিনের হিসাব ঠিক থাকে তাহলে এখন রিস্ক কম, এমআর করালি চলবে, ডিএনসি করা লাগবে নানে, টাকা আনিসেন তো? আমি এ কথার সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে রোকন দার দিকে তাকিয়ে বলি, টাহাডা আগেই দিতি অবে রোকন দা, দিদি আমারে আগেই বলিসিলেন।

রোকন দা প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে একটা খাম বের করে ঘরের এক পাশে চলে যায়, তারপর জিহ্বা থেকে আঙুলে থুথু লাগিয়ে টাকা গুনতে থাকে। তারপর টাকা গোনা শেষ করে এক গোছা নোট ডাক্তার মিনতির হাতে ধরিয়ে দেয়। তিনি টাকাটা আমাদের সামনে গোনেন না দেখে রোকন দা বলে, গুইনে নেন দিদি।

মিনতি মণ্ডল এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে বলেন, এডা কে পেশেন্টের বাবা? খুব ভালো করিসেন, একটা বন্ড দেওয়া লাগবি, লিগাল গার্ডিয়ান বন্ড দিলি আমাগের আর কোনো চিন্তা থাকে না। তারপর ভেতর থেকে নার্সটাকে ডেকে বলেন, অ মালতী, একটা বন্ড ফরম রেডি কইরে আন দিনি। মালতী প্রায় সাথে সাথে একটা কাগজ নিয়ে বেরিয়ে এসে বলে, কিডা সাইন করবে? আমি লোকটার দিকে ইশারায় দেখিয়ে দিলে মালতী প্রায় ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করে, সই করতি পারবা তো, নাকি টিপছাপ দেবা? তারপর ঘরের এক পাশে যে টেবিল আছে সেখানে ডেকে নিয়ে ব্লাউজের সাথে আটকানো কলম বের করে নামধাম, বাবার নাম এসব জিজ্ঞেস করে লিখতে থাকে।

এ সময় রোকন দা ডাক্তারের কাছে এগিয়ে নিচু কণ্ঠে বলে, আচ্ছা একসাথে লাইগেশন করায়ে দেওয়া যায় না দিদি?

মিনতি মণ্ডলের দুই চোখে একসাথে ঘৃণা আর ভর্ৎসনা ফুটে ওঠে, মৃদু কণ্ঠে হিস হিস করে বলে, না যায় না, একটা গরিবের মাইয়ের এতবড় সর্বনাশ কইরে আরেকটা পার্মানেন্ট ক্ষতি করতি চান? আপনারে পুলিশি দেওয়া উচিত, মনু হাজির ছাওয়াল বলে বাঁইচে গেলেন।
রোকন দা নির্লজ্জের মতো হাসে।

মিনতি মণ্ডল আমাদের সাথে আর কোনো কথা না বলে ভেতরের দিকে চলে যান, ভেতরে গিয়ে নিশ্চয়ই টাকাটা আগে গুনবেন। মালতী তখন লোকটার আঙুলের ছাপ নিচ্ছিল। তারপর ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিলে আমি বের হয়ে গেট ছাড়িয়ে রাস্তায় নেমে আসি। আমার পেছন পেছন রোকন দা বেরিয়ে এসে বলে, এ ভাইডি, বন্ড নিল যে, কোনো বিপদ নেই তো? মইরে টইরে যাবে না তো?

আমার মেজাজটা খিঁচড়ে ছিল, বলি আকাম করার সোমায় খেয়াল ছিল না? রোকন দা আমার এ রকম আচমকা আক্রমণে কিছুটা থতমত খেয়ে চুপ করে যায়।

নুরীর বাবা একটা বিড়ি ধরিয়ে বাইরে গেটের পাশেই উবু হয়ে বসে। এ রকম রাতের বেলায় গেটের কাছে বসে থাকাটা সন্দেহজনক মনে হতে পারে অনেকের কাছে, তাই আমি লোকটাকে ডেকে গেট থেকে দূরে নিয়ে যাই। ইচ্ছে করেই রোকন দা'র কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছিলাম সে মুহূর্তে। কিছু দূরে একটা ঝাঁকড়া কড়ই গাছের হলদেটে কাণ্ড আধো অন্ধকারের ভেতর হালকা আভায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি লোকটাকে নিয়ে তার গোড়ায় বসে বলি, মাইয়েডারে পরের বাড়িতি ফেলায়ে না রাইখে গার্মেন্টসে পাঠালি ভালো অতো না? স্বাধীন চাকরি কইরে তোমার জন্যি মাস মাস কিছু টাহা পাঠাতি পারত।

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, হয়তো কথা হাতড়ায় সে, সাময়িক সেই নৈঃশব্দ্যটা যেন নিশুতি রাতে দেয়াল ঘড়ির কান ফাটানো টিক টিক শব্দ হয়ে দু'জনের মাঝখানে ঝুলতে থাকে। নুরীর বাবা ঘড়ঘড়ে গলায় শুরু করে, মা মরা মাইয়ে আমার, ছাওয়ালও রয়েছে দুইডে। বড় ছাওয়াল বিয়ে কইরে শউর বাড়িতি ঘরজামাই হয়েছে। মাইয়েডা মাইঝো, তার ছোট ভাই রয়েছে একজন। সে আমার সাথে ইদিক-সেদিক কাজ করতি গেলি পর মাইয়েডা বাড়িতি একলা থাকে। গিরামে কি বদলোকের অভাব আছে? ওরে দেখবি কিডা? ভাইবে দেখলাম মনু হাজির বাড়িতি বড় সংসার, বিস্তর জমিজিরেত, ম্যালা কাজের মানুষ, তাগের মধ্যি পেট ভইরে খায়ে দায়ে হেফাজতে থাকবি। আর ঢাকায় গার্মেন্টস ফ্যাকটিরিতি পাঠালিও কি বাবা নিশ্চিন্দি থাকতাম? ঠিকমতো বেতন দেয় না শুনিসি, কিছু কতি গেলি পর পুলিশে মারে, তা বাদে আগুনে পুইড়ে মরতিসে, বিল্ডিং ভাইঙে চাপা পইড়ে মরিসে নাকি হাজার হাজার। ঢাকা শহরে আমাগের চেনা-জানা কেউ নেই, আর থাকলিও ভাইজান এহান থেইকে এত দূরে মাইয়েডারে পাঠায়ে শান্তিতে থাকতি পারব নানে আমি।

দীর্ঘ এই বয়ানের পর লোকটার কণ্ঠ ভেঙে আসে। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে, এ্যাহন বুঝতি পারলাম ভাইজান, আল্লার দুনিয়ায় গরিবির জন্যি নিরাপদ কুনো জায়গা নেই।
আমি লোকটার এমন কথার পিঠে কোনো কথা খুঁজে পাই না। আসলেই মনু হাজির বাড়ির প্রাচুর্যের ভেতর মেয়েটাকে কাজ করতে পাঠিয়েও তার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা যে নিশ্চিত করতে পারেনি লোকটা, সেটা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝতে পারবে! দিন দশেক আগে রোকন দা আমাকে ডেকে ওদের বাড়ির বাইরের ছোট কালভার্টটার নিচু রেলিংয়ের ওপর বসে বলে, এ ভাইডি, বড় বিপদে পড়িসি, ইট্টু হেল্প করা লাগবি।

আমি ধারণা করতে পারি না মনু হাজির একমাত্র ছেলেটির কী এমন বিপদ হতে পারে যে, আমার সাহায্য দরকার।

আমাদের ত্রিসীমানায় কেউ নেই, তবুও রোকন দা গলা নামিয়ে বলে, আমাগের বাড়িতে কাজ করে একটা মাইয়ে, নুরী, দেহিছিস না?

আমি বলি, তোমাগের বাড়িতি ম্যালা মানুষ কাজ করে, ও আচ্ছা— ইবার মনে পড়িসে, আমাগের চা-নাশতা আইনে দেয় মাঝে মাঝে। তা কী হয়েছে ওর।

রোকন দা খুব বিষণ্ন গলায় ইতস্তত করে বলে, ইট্টু সমস্যা অয়ে গেসে, মনে অয় পেট বাধায়ে ফেলাইছে।

আমি রোকন দা সম্পর্কে যা জানি তাতে খুব অবাক হই না, কিন্তু অবাক হই ওদের বাড়িতে এত লোকজনের মধ্যে কীভাবে ঘটল ঘটনাটা। কথাটা রোকন দাকে বললে ও বলে, অত হিস্টরি কতি পারব নানে, ঘইটে গেসে, বাস। আর তুমি শালা খুব সাধু মারায়ো না। ভালো কইরে দেহিছিস মাইয়েডারে? দক্ষিণির মাল, ভাইটেল চাউলের ভাত খায়ে বড় হয়েছে না? পুষ্ট ধানের গোছার মতো ওরহম হাতভর্তি এইরে ধরার মতন।

সে মুহূর্তে রোকন দার চিন্তিত চেহারা কিছুক্ষণের জন্য অশ্লীল হাসিতে ভরে যায়। আমি বলি, আসলেই একটা বি কিলাশ মানুষ তুমি। কিন্তু আজকাল এত জিনিসপত্র বাজারে থাকতি ইরহম কাণ্ড কেউ করে?

খ্যা খ্যা করে হেসে লোকটা বলে, আরে কলাম না, ঘইটে গেছে, মানুষরে ভূতে পালি ওরহম অয়। হঠাৎ কইরে কহনো মাথায় শয়তান ভর করে, তহন আর বিপদ-আপদের কথা মনে থাহে না নে। তারপর বলে, শোন, বিপদে পড়িসি বইলে খুব ভাব নিচ্ছিস? তোরে কলাম ক্যান জানিস? তোর মাথাডা খুব পরিষ্কার, আর ভাবলাম তোরে বিশ্বেস করা যায়। আরও আছে না কতজন আমারে তেল মাইরে চলে, এক খানকির ছাওয়ালরেও বিশ্বেস করি না আমি।

আমি বলি, আচ্ছা আমারে অত বাটার দিতি অবে না নে। আমি কি হেল্প করতি পারি এহানে, কইয়ে ফেলাও।

রোকন দা যা বলে তাতে বুঝতে পারি, উপজেলা সদরে ডাক্তার মিনতি মণ্ডল আছে, সে এসব কাজটাজ করে বলে সুনাম-দুর্নাম দুটোই আছে। তার কাছে গিয়ে সমস্যাটার কথা বলে একটা তারিখ নিয়ে আসতে হবে।

আমি খানিকটা চিন্তায় পড়ে যাই, জীবনে এ জাতীয় কাজ কখনও করিনি। রোকন দা আমার হাতের ওপর হাত রেখে বলে, এ ভাইডি, অত চিন্তা করতিছিস কী? আমি নিজিই যাতাম, কিন্তু বুঝতিছিস তো নিজি যায়ে বলতি কিরাম লাগে না?

আমার মাথার ভেতর মুহূর্তের ভেতর একগাদা ভাবনা এসে জড়ো হয়, এ জাতীয় ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় মাঝে মাঝে যেসব খবর ছাপা হয় সেগুলো ঝিলিক দিয়ে যায়। রোকন দা ঘ্যান ঘ্যান করে বলতে থাকে, দেরি করলি বিপদ, আর কিছু করার থাকবে না নে। মাইয়েডা রাজি হয়েছে পেট খসায়ে ফেলাতি। মাইয়ে মানষির মন, আবার কহন বইদলে যায় কিডা কবে?

নুরীর বাবা একসময় আচমকা উঠে দাঁড়ালে তার হাঁটুর মট মট শব্দে আমি প্রায় চমকে উঠি। তারপর অস্থির কণ্ঠে বলে, ম্যালা টাইম অয়ে গেল, ইট্টু খবর নিলি অয় না? রোকন দা হয়তো লোকটার সামনে আসতে সংকোচ করেই এতক্ষণ ওদিকে পায়চারী করছিল। লোকটাকে উঠতে দেখে পেছনের বাল্বের আলোয় ওর দীর্ঘ ছায়া দিয়ে আমাদের ঢেকে ফেলে এগিয়ে আসে। রোকন দাকে বলি, আধা ঘণ্টার বেশি অয়ে গেল, ভেতরে যায়ে দেখ শেষ অলো না কি।

রোকন দা নড়ে না, বলে, তুই দেইখে আয় না ভাইডি, ওর বাবারে সাথে নে যা।

আমি গেট পেরিয়ে ভেতরে গেলে লোকটা পেছন পেছন আসে, তার ক্লান্ত পদক্ষেপের ভেতর একধরনের নিঃশব্দ উৎকণ্ঠা আমার শরীরের সাথে প্রায় সেঁটে থাকে যেন।

শূন্য ঘরটিতে হেঁটে হেঁটে আমি দেয়ালে ঝোলানো পোস্টারগুলো দেখি, এ সময় ভেতরের দরজা খোলার খুট শব্দও আমাদের কানে বিস্টেম্ফারণের মতো শোনায়। সেই নার্স বা আয়াটি বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে, তার পেছনে নুরী। ওর চোখের নিচে জলের দাগ, আধা ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে যেন ওর চেহারার ওপর একপরত কালি বুলিয়ে দিয়েছে কেউ। আড়ষ্টভাবে হেঁটে বাইরের দিকে চলে যাচ্ছিল ও। নার্স মহিলাটি নুরীকে ডেকে থামিয়ে বলে, ওষুধগুলা বুইঝে নাও। ওকে ক্যাপসুল আর ট্যাবলেট কোনটা কখন ক'বার খেতে হবে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে বলে, সোমায় মতো না খালি কিন্তু সমস্যা অবে। এহানে সাত দিনির ওষুধ আছে, সব শেষ করা লাগবি।

আমি ওদের রেখে বেরিয়ে আসি, পেছনে নুরী আর ওর বাবা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে মেয়েটা ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলে আমি লোকটার ফোঁপানোর শব্দ পাই, নাক টানার শব্দের সাথে নাকের জল চোখের জল আর ভাঙা গলার অস্পষ্ট ধ্বনি মিলেমিশে অন্ধকার শূন্যে মিলিয়ে যেতে থাকে। আমি গেটের বাইরে বেরিয়ে আলো থেকে অনেক দূরে রোকন দাকে শেয়ালের মতো ওত পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ওর ভারী গর্দান এবং স্থূল শরীরের আবছা কাঠামো সেই আলো-আঁধারিতে জান্তব বলে মনে হয়। আমাকে একা বের হতে দেখে কিছুটা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে কিছু না বলে উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকায় ও। আমি ওর উপস্থিতি এবং উৎকণ্ঠাকে গ্রাহ্য না করে কান পেতে শোনার চেষ্টা করি, তারপর গেটের ভেতর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি বাপ-মেয়ের বেরিয়ে আসতে অত সময় লাগছে কেন। এখনও কাঁদছে ওরা দু'জন, ওদের কান্নায় অন্ধকার ধুয়ে ফিকে হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে থাকে ওদের ঘিরে। আধখোলা গেটের ভেতর এত কাছে থেকেও আমি বা রোকন দা কিংবা অন্য কেউ ওদের মিলিত কান্নার অনুচ্চ ধ্বনি শুনতে পাই না। মেয়েটির পা চলে না বলেই বোধহয় ভেতরের গাছপালার জমাট বাঁধা অতটুকু অন্ধকার জায়গা পেরিয়ে আসতে যেন যুগ যুগ লেগে যায় ওদের, আমি ওদের আলোতে বেরিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।


লেখক পরিচিতিঃ
ফারুক মঈনউদ্দীন
লেখক ও ব্যাংকার। অর্থনীতি শাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন। সত্তরের দশকের শেষ প্রান্তে সক্রিয়ভাবে লেখালেখি শুরু করেন। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় ১৯৭৯ সালে এবং প্রথম গল্পগ্রস্থ ১৯৯০ সালে। তারপর দীর্ঘদিন ধরে মনোনিবেশ করেন অর্থনীতি ও ব্যাংকিংবিষয়ক লেখায়। অনুবাদ সাহিত্যেও তার অবাধ পদচারণা। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈরী স্রোত, অত্মহনননের প্ররোচনা, প্যারিসের স্মৃতিকথা, অপরিচয়ের কালবেলা, মোহিনী মুম্বাই, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের দেড় দশক ইত্যাদি। আমেরিকান গবেষক ক্লিনটন বি সিলির জীবনানন্দের ওপর লেখা বইটি ‘অনন্য জীবনানন্দ’র বাংলা অনুবাদ করে তিনি আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কারে ভূষিত হন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন