সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

আগাছা ও অপরাজিতা

মৌসুমী কাদের

শরীরটা এখনও ডানপিটে আর অলৌকিক ক্ষমতায় ভরা। মাঝারী গড়ন, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, গোলগাল চেহারা। চোখদুটো মুখের তুলনায় একটু বড়, ঢেউ খেলানো চুল। অপেক্ষাকৃত ভারী শরীর। হোগলতলা বাজারের দক্ষ দরজী নিতাইয়ের গড়া ব্লাউজ গায়ে সবসময় আটসাট লেগে থাকে। এই নিয়ে প্রতিবারই নিতাইকে ধমক ধামক দিচ্ছে সে, কিন্তু তাতে অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি ।
শাড়ীর আঁচল সরে গেলে গ্রামদেশে এই এক বিড়ম্বনা;পাড়ার লোকজন তিরস্কার করতে ছাড়েনা,‘পর্দা মানেনা,বোরকা পড়েনা, অসভ্য মেয়েমানুষ’,তার উপর যখন তখন পোলাপান আর দল বল নিয়ে দূর দুরান্তে যাত্রা করে। গ্রাম জুড়ে ভীষন পরিচিত এই মানুষটির নাম মমতাজ বেগম। অবিরাম যে ছুটে চলে গ্রাম পর গ্রাম…হোগলতলা, রাজাপুর, বেলতলা…… সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তারপর অযথাই সরল অংকে জ্যমিতি বোনে আর রাতভর অসহায় সঙ্গমে মিলিত হয়ে ভাবে, ‘যা কিছু চারপাশ, সবকিছু আগাছা আর চারাগাছ, এ জীবন থেকে মুক্তিই তার কাম্য। এই মুক্তির পূর্ব শর্ত হতে পারে সমাজ ও সংসারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা অথবা বিনা বাক্য ব্যয়ে নদীতে ঝাপ দেয়া। এই বেহাল অবস্থা দিনের পর দিন আর সওয়া যাচ্ছিলনা। স্বামী রইসুদ্দিন যখন তাকে বিয়ে করেছিল তখন সে বড় বড় কয়েকটি ঘেরের মালিক। বিষয় সম্পত্তির কোন অভাব ছিলনা। রামপাল আর ফকিরহাট উপজেলায় তখন সবচেয়ে বেশি চিংড়ি উৎপাদন হোত । রইসুদ্দিন অনেক টাকা লগ্নি করেছিলো সেইসব ঘের চাষে ।কিন্ত একটা সময়ে শুরু হোল ঘের দখলের লড়াই। স্থানীয় গ্রামবাসীরা আর মংলা থেকে বন্দুকধারীরা মিলে মিশে নিঃস্ব করে দিল রইসুদ্দিনকে। হারিয়ে গেল তার সমস্ত বিষয়-আশয়। আর সেই থেকে শুরু হলো মমতাজের জীবন যুদ্ধ ।

পোনার আরেক নাম ঘনা। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ বছর ঘনা ধরা শুরু হয়েছে। এটা চলবে জৈষ্ঠ্য মাস পর্যন্ত। পূর্নিমার চাঁদের আলোয় দল বেঁধে সব মায়েরা গাদা গাদা পোলাপানের দঙ্গল নিয়ে পোনা ধরতে যায়। মমতাজ বেগমও তাদের সঙ্গে দূর দূরান্তে পাড়ি জমায়। সারারাত ধরে খালে বিলে টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। তবে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘনের সংখ্যা কমতে থাকে। তখন আর মেয়েরা এ কাজে যেতে চায়না। এ বছর গরম পড়েছে অনেক। পোলাপানের জ্বালায় রাতে ঘুম হয়না মমতাজের। তার উপর কোন কোন দিন ভোর না ভাঙতেই অথবা রাত থাকতেই ছুটতে হয় ঘনা ধরতে। এই আষাঢ়ে জলাশয় গুলো ফুলে ফেপে উঠেছে। তাই মাছ ধরার ফূর্তিটাই আলাদা। আজ খুব ভোরে পদ্মফুল আর কচুরিপানার ভিড়ে কোমরপানি ভাংতে ভাংতে পোনা ধরছিল সে। তাদের দলে জমে গেছে অনেক লোক। এত লোকের ভীড় দেখে পোনারা দৌড়ে পালাচ্ছে। জালে তারা বন্দি হবে কি ! পাশের বাড়ীর জোনাকি আজ কাজেই আসতে চাইছিলনা। ইদ্রিসকে নিয়ে তার যত অস্বস্তি । জোনাকি না থাকলে মমতাজের একা একা লাগে। অনেকটা পথ অসহায় কাটাতে হয় তাকে। তাই একরকম জোর করেই ওকে ধরে এনেছে সে। যশোরের মেয়ে জোনাকি। সবাই ডাকে আঁচুলির মা। সাপে কেটে স্বামী মারা গেছে বছরখানেক। তারপর থেকেই মমতাজের সাথে সাথেই সে এ কাজে আসে, কোনরকমে কষ্টে দিন কাটে তার। জোনাকির জোয়ান তাগরা শরীরের দিকে নজর অনেকের। কিনতু সে আঁচুলির বাপের মমতা আর ভালোবাসা ভুলতে পারেনা। তাই ইদ্রিসের দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার পর সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে সে জোনাকির পেছনে। মমতাজ দুই চোক্ষে ইদ্রিসকে দেখতে পারেনা।

ঘনা ধরতে ধরতে মমতাজ হঠাৎ লক্ষ্য করে আচুলি্র’মা ছপাত করে পানি ভাংতে ভাংতে চোরা গর্তে ঢুকে যাচ্ছে আর চিৎকার করছে……‘ও মমতা’বু…বাঁচাও বাঁচাও’ …পানি কেটে মমতাজ সেখানে পৌছাতে না পৌছাতেই ইদ্রিস শো করে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে জোনাকীর গা। এক পেড়ে শাড়ী, ছেড়া ব্লাউজ, ভেজা আড়ষ্ট শরীর জলের তলে ভাসতে থাকে। আর সে শরীর ইচ্ছে মত নাড়তে থাকে ইদ্রিস।

-‘মমতা’বু……। হারামজাদাটা ধরিসে আমারে……। তুমি টের পাসসোনা? বাঁচাও আমারে, বাঁচাও’।

-‘ওই খবরদার, জোনাকিরে ধরবিনে তুই’, - মমতাজ চিৎকার করতে থাকে।

-‘তোমাগো দেমাগ দেখিলি পর রাগ উঠি যায় আমার। মইরে গেলে জোয়ান শরীর নিয়ে কি স্বগগে যাবা নাকি তোমরা,বুঝতি পারিনে’! ইদ্রিস চিৎকার করে উঠে।

- ‘স্বগগে যাবো না নরকে যাবো তা দিইয়ে তোমার কি? লজ্জ্বা করেনা ঘরে বউ পোলাপান রেখে নষ্টিফষ্টি করতি? দুবেলা খাবার জোগাড়ের মুরোদ নেই, সংসার চালাতে পারিস নে, আবার আরেকখান বিয়ের শখ। শালা মরদের জাত’!

- ‘ওই খবরদার! গালি দিবানা কতিসি। তোমার জামাই কি করে? ঘরে বইসে লটকন চিবোয়? ঘনে ধরতে তোরে পাঠায় ক্যান?’ বলেই জোনাকির ভরা শরীরটা ঝপাত করে পানিতে ফেলে দেয়।

- ‘ইদ্রিস, আমি তোর নামে চেয়ারমেনরে নালিশ করি দিবানে কইতেসি’।

- ‘যাও, যাও, চেয়ারমেন ক্যান,মিনিষ্টাররে নালিশ কইরে আসোগে যাও। মেয়ে মানুষের বুদ্ধি, ভরা নাকের সর্দি’।

মমতাজের রোদে পোড়া শরীরটা রাগে ক্ষোভে আরো তামাটে হয়ে উঠে। জোনাকিকে বাম হাত দিয়ে আগলে ধরে জল কাটতে থাকে সে। মাছ ধরার জালিটা জংলার মধ্যে আটকে আছে। জলের স্রোতে পোনারা এদিক ওদিক দিশেহারা পথ চলছে আর তাদের পিছনে ছুটছে দুজন নারী। ফেরার পথে খাল পারে অম্বলিশাক আর থানকুনী কুড়াতো সবাই। আজকাল সেগুলোরও আকাল। বন্যা আর লবনপানিতে পুরো এলাকা ডুবে যাচ্ছে। গরীব মানুষের কষ্ট বাড়ছেতো বাড়ছেই। ছেলেমেয়েরা যাও দুচারটা খড়কুটো, পাতা কুড়িয়ে আনতো এখন সেটাও পাওয়া দুস্কর। ঘরের উঠোনে মমতাজের স্বামী রইসুদ্দিন একটা চাপকল বসিয়েছিল, সেইটি মাসখানেক ধরে অকেজো পড়ে আছে। জ্বালানীকাঠ আর পানি দুটো্রই এখন আকাল। মমতাজ ভাবে, সুপারি গাছে সুপারি নাই, নারকেল গাছে নারকেল নাই, সফেদা গাছও নিশ্চিহ্ন। এদেশটার কি হোল? কি করে চলবে তার আর জোনাকির সংসার? ইশ্বরের কি একটুও মায়া দয়া নেই??

------------------------------------------------------------

হোগলতলা হাই স্কুলের হেডমাস্টার আব্দুল আজিজ স্যারের বড় ছেলে সুমন। বড় শহরে পড়াশুনা শেষ করে ফিরে এসেছে গ্রামে। ওর উৎসাহেই গ্রামের তরুনরা মিলে গড়ে তুলেছে ‘হোগলতলা ইয়ং ক্লাব’। প্রতিদিন সন্ধ্যায় গ্রামের ছেলেরা এসে জড় হয় এই ক্লাবে। বাজারের সঙ্গে লাগোয়া এই ক্লাবটি জমজমাট হয়ে উঠেছে ক’দিনেই। গ্রামের তরুনরা সুমনের স্বপ্নকে অনুসরন করে মহা উৎসাহে সাজিয়ে ফেলেছে ক্লাবটি। হেডমাস্টার আব্দুল আজিজ অনেকগুলো বই দিয়েছেন। চেয়ারমেন সাহেব একটা টেলিভিশন দিয়েছেন। সন্ধ্যা হলে তাই ক্লাব ঘরে ভীড় জমে যায়। মমতাজ বেগম প্রায়ই কাজ থেকে ফেরার পথে ক্লাব ঘরে একটু দাঁড়ায়। আজো সে ঘনা বিক্রি করে ফেরার পথে যথারীতি থামলো ইয়ং ক্লাবের সামনে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে ক্লাবের ছেলেরা কেউ বই পড়ছে, কেউ সুমনের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলছে। মনে মনে সে ভাবে বাবলু, পরী নিশ্চয়ই একদিন এদের মত অনেক বই পড়বে। সুমনের মত শিক্ষিত হবে।

মমতাজকে দেখে সুমন সবসময়ই খুশী হয়ে যায়। আজো তার ব্যতিক্রম হোল না। দরজার সামনে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো;

-আরে, মমতা’বু যে? আসো আসো, ভেতরে আসো। কেমন আছো তুমি?

-এইতো, আল্লাহ যেমন রাখিসে। তোমার এই কেলাবে আমারে ভর্তি নিবা সুমন?

-কিযে বলো বুবু। তোমার আবার ভর্তি কি? তুমি তো এমনিই আমাদের বুবু। যখন খুশী তখন আসবে।

- আহারে, আমার যদি পড়া জানা থাকিত, তালি ক্লাবের সব বই আমি পড়ি ফেলতি পারতাম

-পড়ার কি কোন বয়স আছে বুবু? চাইলে তুমি এখনও শিখতে পারো। এইযে সারাদিন এত কষ্ট করো, পড়া জানলে তো অন্য একটা কাজে ঢুকতে পারতে ।

-সত্যি যদি শিকতি চাই, তোমরা আমারে শিকাতি পারবা ?

-অবশ্যই, আমি কালকেই আলোর দিশারীর বিলকিস আপাকে বলে দিব। উনি তোমাকে সব শেখাবেন। আর শোন, তোমাকে যে ব্যাঙ্ক একাউন্ট করতে বলছিলাম, করেছো?

- না ভাই, সময় পাইনি। ভোর বেলা উঠি কাজে যাতি হয়, টাইম পাইনেতো...

- এসব বললেতো চলবেনা। কাল না পারো পরশু আসো, আমি ব্যঙ্কে ম্যনেজার সাহেবকে বলে রাখবো।

-আচ্ছা...

ফিরতে ফিরতে মমতাজ ভাবে সুমন ছেলেটা কত ভালো। পড়াশুনা শেষ করে আবার গ্রামে ফিরে এসেছে। বাবা-মার দেখাশুনা করছে। ঘের আছে ওদের, সেগুলোরও দেখাশুনা করে। আবার বাজারে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কতরকমের কাজ করে। আহা কি সোনার ছেলে। মেয়েটা কবে বড় হবে? এই রকম একটা ছেলের সাথে বিয়ে দেবে!

বড় রাস্তা বরাবর হাটছিল মমতাজ। হঠাৎ পেছন থেকে মানসীর ভাই হরিরাম ভ্যান চালিয়ে পাশ দিয়ে যেতে যেতে চিৎকার করে জিজ্ঞেসে করে;

- এত রাত করে ফিরলে নাকি দিদি?

- আজ একটু রাত হইয়ি গেলরে। মানসী কেমন আছেরে হরি?

- আছে ভালই।

-আসো আসো, উইঠে বসো, তোমারে নামাইয়ে দেই।

- কোন দিকি যাবা তুমি? তোমার কোন অসুবিদে হবিনেতো?

- না, না অসুবিদে কিসের। আমিও তো বাড়ি ফিরতিসি।

মমতাজ ভ্যান এর পেছনে উঠে বসে পা ঝুলিয়ে বড় সুখ পায়। কতটা পথ হাটতে হোলনা। ভ্যানতো না যেন পঙ্খিরাজ। হাওয়ার উড়ে ভেসে যাচ্ছে সে। বাজারে বিজলী বাতি এলেও এখনও তার পরিধি ততটা বিস্তৃত হয়নি। চারদিকে অন্ধকার, গাছের ফাঁকে ফাঁকে হারিকেনের আলো ঝিকমিক করে জ্বলে উঠছে। আকাশজুড়ে কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়া, যেন কতকাল ধরে হুক্কো টেনে চলছে গ্রামবাসী। মোটা লাল চাল আর পাটশলা পোড়া ঘ্রান। ভাতের খিদায় পেট চনমন করতে থাকে মমতাজের। বাড়ি গিয়ে নিশ্চয়ই দেখবে জরীটা ঘুমিয়ে গেছে। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে পড়ে।

-----------------------------------------------------------------

নিজের শরীরের উপর থেকে স্বামীর পাঠার মতন ঐ শরীরটা ভোর রাতে ঠেলে ফেলে দিয়ে প্রতিদিন উঠোনে চুলা ধরায় মমতাজ, আর ভাবে এই দিনগুলোর শেষ কবে হবে? ঘেরে কাজ করার জন্য তাকে মাইল দুয়েক পথ হেটে যেতে হয়। এতদিন বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত খালে বিলে কাটিয়েছে বছরের পর বছর। এইবার প্রথম সে ঘেরে কাজ পেলো। ঘের মালিক নিজামের বউ মানুষ ভালো। সেই বাজারে তাকে এই কাজের প্রস্তাব দেয়। মমতাজ তার কষ্টের দিনগুলি থেকে মুক্তি চায়। তাই সে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। কিনতু কে জানতো ঘের মালিকেরা যে দিনকে দিন বজ্জাত হচ্ছে। মেয়েদের কম টাকা দিয়ে দিব্যি কাজ করিয়ে নিচ্ছে তারা। ওরা জানে এর প্রতিবাদ করবার মত একজনই আছে, আর কেউ নেই । সে হোল মমতাজ বেগম। বয়স্ক মহিলারা সারাদিন খেটে খুটে ৪০ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে বাড়ী যায়। আর পোলাপানরা পায় ১৫ থেকে ২০ টাকা। মমতাজ বেগমকে ওরা ৬০ টাকা দেয়। সেজন্য গায়ে গতরে খেটে কাজ করতে হয় তাকে সারাদিন।

নিজামের বড় বড় চার পাঁচটা ঘের। তার দুটিতে মমতাজ কাজ করে। বড় ঘেরটি চাতাল বরাবর চারদিকে খাল কাটা। তার মধ্যে বড় চিংড়ি আর কার্প মাছ ছাড়া হয়েছে। ঘর আর পোলাপান সামলানো, ধানভানা, হাস-মুরগী পালা এর বাইরে কোনদিন এত কাজ তাকে করতে হবে মমতাজ ভাবেনি আগে। পোনা যোগানের সময় যে অমানবিক কষ্ট তাকে করতে হয়েছে সেইটি মনে করে কষ্টে বুক ফেটে যায়। নিজামের ঘেরের চারপাশে সবজি বাগানে সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত যোগালি দেয় মমতাজ। মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, লাউ ছাড়াও নানাজাতের গাছ লাগানো, তাদের যত্ন করা, মাটি্তে সার মেশানো এই তার কাজ। সেইযে ছোটকালে মা বলতেন, হিমালয় থেকে নাকি এদেশে স্বচ্ছ জল বয়ে আনে বড় বড় নদী নালা। তাই এদেশে সবুজ শাক সবজি মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। মাটিতে যাই লাগাও সবকিছুই নাকি মহাফুর্তিতে বগবগ করতে করতে বেরিয়ে আসে। কিনতু এইযে ঘেরের চারপাশ ঘিড়ে এত যত্ন এত আদর করছে সে, কোথায় সেই সবুজ গাছ? মমতাজের দুঃখ আর শেষ হয়না। ঘেরের মধ্যখানে এখন দুই মৌসুমেই ধান চাষ হয়,বোরো আর আমন। সেখানেও কাজ করতে হয় তাকে। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কাদামাটিতে লেপ্টে থেকে আগাছা বাছা, সার দেয়া সবই করতে হয়। বিলাতী বড় সাহেবরা মাঝে মাঝে ঘের দেখতে আসেন আর জ্ঞান দিয়ে যান। তখন উঠোনে গোল হয়ে বসে তাদের কথা শুনতে হয়। এর জন্য নিজাম নাকি বিশেষ টাকা পায়। যখন মেমসাহেরা আসেন তখন কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব হয়।

আজো সেই রকম একটি উৎসবের দিন। নিজামের বউ মমতাজকে ডেকে বললেন, ‘আজ তোর আর ঘেরে কাজ করতে হবেনা। তাড়াতাড়ি উঠোন গুছা, ঢাকা থেকে অনেক লোক আসবে’।মমতাজ তাড়াহুড়ো করে সারা উঠোন ঝাড়লো। শিমূলতলায় ছ-খানা পাটি পাতলো। ঠিক দুপুর একটায় নিজাম তিনজন সাদামহিলা ও চারজন সাদাপুরুষসহ এসে হাজির হোল। আলোর দিশারীর দুইজন কর্মকর্তারা এলো তার পরপরই। তাদেরই একজন কর্মকর্তা মমতাজকে ইশারায় উঠোনের কোনায় ডেকে নিয়ে বললোঃ

- তোমার আর কাপড় চোপড় নাই। এই ছিড়া ব্লাউস পড়ে আছো কেন?

-এইটা কেমন কথা বলেন ভাইজান। আমি কি জানতাম যে উনারা আসতিসে? আমিতো ঘের এ কাজ করতিসিলাম।

- উনারা তোমার ছবি তুলবে। ইন্টারভিউ করবে…।।যাও যাও জামা পাল্টায়া আসো…।

- আমি এখন জামা কোতায় পাবো ভাইজান? আর ছিড়াটারে জোড়াতালি দিইয়ে সুন্দর দেখানের কি দরকার, বুঝিনেতো ...

- চুপ করো, তুমি বেশী কথা বলো। যা বুঝনা, তা নিয়া কথা বলবানা।

-তাইলে আপনি কয়ি দিলেই তো হয়...

- তোমারে উনারা অনেক প্রশ্ন করবে। সেইটা আবার ভিডিওতে তুলে নিয়ে যাবে। কাজেই যা যা শিখায়া দেই ঠিক ঠিক ঠিক জবাব দিবা। উনারা যদি জিজ্ঞেস করে কত বেতন পাও, বলবা দৈনিক একশ টাকা পাও আর তিনবেলা খাবার পাও।

-এটা কি বল্লেন ভাইজান? নিজাম মিয়া কুতি-কাতি ষাট টাকা দেয়,খাবার দাবারতো কিছু দিতি পারেনা...

-এই কথা যদি না বলো তাইলে কিনতু ঘেরের কামটা তুমি আর পাইবানা মমতাজ বেগম। কাজেই চিন্তা ভাবনা কইরা জবাব দিবা।

মমতাজ ভাবে, হায়রে জীবন, সাদা সাদা মানুষ…কত সুখ তাদের মনে, ঘের মালিকদের না জানি কত টাকা দেয় এরা, একটু যদি তারা গরীব মানুষের কথা ভাবতো! মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নেয়, যা সত্যি তাই বলবে, জীবনের সাথে আপোষ করার তার আর কিছুই নাই। পথের মানুষ, পথেই তার বাস…ভয় করে কি হবে আর? ………।।

-------------------------------------------------------------

ঘেরে কাজ শেষে ফিরবার সময় সেদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। গায়ে জড়ানো তাঁতের শাড়িটা ভেজা শ্যাতশ্যাতে। এক হাতে কটা কচুশাক আর অন্যহাতে ছালার ব্যাগে ভাতের পোটলা। সালেহা আর অন্যান্যরা একটু পেছনে পরে গ্যাছে। রাজারপুর বাজার পার হতেই অন্ধকারটা কেমন ঘুটঘুটে হয়ে গিয়েছিলো। মমতাজ লক্ষ্য করে দূরে মাটিতে শুয়ে কেউ একজন গোঙ্গাচ্ছে। কতদিন এ পথ ধরে সে আসা যাওয়া করে কিনতু কোনদিন এমন দৃশ্য তার চোখে পড়েনি। কাছে গিয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখে মানসী’দি মাটিতে লুটোপুটি করছে । এযেন অন্য মানুষ কোনো, মানসী'দি নয় যেন! মুখ ও পরিধি জুড়ে ক্ষত বিক্ষত আঁচড়ের দাগ। হাজার বছরের কষ্টের চাবুক চপ চপ করে পিটিয়েছে কেউ ওর হাঁড় ও শরীরে। সারা শরীর রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। মমতাজ চিৎকার করে ডাকতে থাকে…… ও মানসী’দি কি হোল তোমার? কে করল তোমার এমন সর্বনাশ!! মানসী’দি ডান হাতটা উচু করে ইশারায় দূরের আমগাছটা দেখায়। মমতাজ তাকিয়ে দেখে মানসী’দির স্বামী জগন্নাথকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে কেউ গাছের সাথে। মমতাজের মনে হোল, কত নদী এ দেশে, বালেশ্বর, ভৈরব, বিষখালী……সব নদীর জল এনে ধুয়ে দেয় মানসী’দির চোখ…।আহা!! বেচারার চোখের জল ফেলবার আর পথ নাই। স্বামীর চোখের সামনে এত বড় অন্যায় কি করে মেনে নেবে এই মানুষটি। মুহুর্তে নিজের সন্তানের চেহারাটা ভেসে ওঠে চোখে। চোখগুলো বড় বড়, চিকন নাক, আর ঘন কালো চুল দেখে শখ করে রইসুদ্দিন নাম রেখেছিল পরী। আহারে………আমার পরীর যদি কিছু হয়? পরী…রে…ও পরী…মারে…কই গেলি তুই? চিৎকার করে কাঁদতে থাকে মমতাজ বেগম। অন্ধকার আকাশে বাতাস যেন আটকে যায় মমতাজ বেগমের আর্ত চিৎকারে। হঠাৎ সে টের পায় পাশের ঝোপ জংগলের মধ্যে পাতার মচমচ আওয়াজ। মমতাজ পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে গামছা দিয়ে মুছ পেচিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল দুজন মানুষ। দুজনেরই গায়ে লুঙ্গি এবং স্যান্ডো গেঞ্জি। খুব পরিচিত চেহারা, গায়ের গড়ন। কোথায় যেন দেখেছে সে। মমতাজ বেগমের গা হিম হয়ে আসে। মনে পড়ে তার, এদের দুজনকেই সে চেয়ারমেনের বাড়িতে দেখেছে।

-------------------------------------------------------------

ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে যায়। মমতাজের তাতে আনন্দ ধরেনা। বড় দুই ছেলেমেয়ে বাবলু আর পরী পড়াশুনায় ভালো। তেত্রিশ বছর বয়সে মমতাজ বেগম বয়স্ক শিক্ষার কার্যক্রমে নাম লিখিয়েছে। এই ঘের এ কাজ করে টানাটানির সংসার আর কত? কিন্তু স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের ধারাবাহিক পাঠক্রম কিছুতেই যেন মাথায় ঢোকেনা তার। বাবলু বলে,‘মা,তোমার মাথায় বুদ্ধি কম। এত চেষ্টা করে কি লাভ?’ কিনতু মমতাজ নাছোড়বান্দা।

হোগলপোতায় এন,জি,ওর সংখ্যা অনেক। মমতাজ ‘আলোর দিশারী’র বিলকিস আপার কাছে লেখাপড়া শিখতে যায়। সুমন এই ব্যবস্থা করে দিয়েছে মমতাজের জন্য। বিলকিস আপা নিয়মিত ওকে বাংলা, অংক আর ইংরেজী শেখাতে শুরু করেন। বিলকিস আপা অবশ্য বাবলুর কথাটা উলটো প্রমান করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই মমতাজ বাংলা অক্ষর শিখে ফেললো। ‘আলোর দিশারী’ সবুজ দলের দলনেত্রীও করা হোল মমতাজ বেগমকে। ওর এখন পাঁচটি খাতা। হিসাবের খাতা (অংক), কবিতা খাতা(বাংলা), দিশারী খাতা(সবুজদল), বাজার খাতা(সংসারের মাসিক খরচ) এবং My Dream(ইংরেজী খাতা)।মোট দশ জন সদস্য নিয়ে এই সবুজদল। এরা সকলেই ঘের চাষী পরিবার। মমতাজ বেগমকে বিশেষ গুরুত্বর সাথে দলনেত্রী করা হয়েছে যেহেতু তার পোনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ঘেরে কাজ করার সকল অভিজ্ঞতাই আছে। আলোর দিশারীর কর্মীরা মমতাজকে এতটা গুরুত্ব দিবে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। চেয়ারমেন সাহেবের বাড়িতে যেদিন জিলা পর্যায়ের মিটিং হোল তখন মমতাজকে চেয়ারমেন সাহেব স্বয়ং বক্তৃতার জন্য অনুরোধ জানালেন। মমতাজ বেগম স্তব্ধ, দিশেহারা। এত লোকের সামনে সে কি বলবে। কিনতু আল্লাহ তাকে কি শক্তি দিলেন সেদিন মমতাজ তা নিজেও জানেনা। চিংড়ি চাষে নারীরা কতটা ভুমিকা রাখতে পারে এর উপর নিজের সরল সহজ অভিজ্ঞতাই বলে গেল সে। তুমুল করতালি দিয়ে সবাই তাকে উৎসাহিত করল। চেয়ারমেন সাহেব মমতাজ বেগমকে পরবর্তী শনিবার দেখা করতে বললেন।

শনিবার বিকালে মমতাজ যখন চেয়ায়মেন সাহেবের বাড়িতে যায় তখন তিনি বারান্দায় চেয়ারে বসা। উঠোনে অনেক লোকজন। মনে হয় কোন শালিস বসেছে। সে উঠোনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। চেয়ারমেন সেটা লক্ষ্য করে বললেন,

- ও তুমি আসছো? আসো আসো, এই দিকে আসো, বলে বারান্দার চেয়ারে বসার জন্য নির্দেশ করেন।

মমতাজতো অবাক! এত লোকের সামনে এত সম্মান তাকে কেউ কোনোদিন দেখায়নি। ভেতরে ভেতরে একধরনের শিহরন হয়। আবার লজ্জ্বাও হয়, পায়ে একটা ভাল জুতা নাই। স্পঞ্জের স্যন্ডেল পড়ে এসেছে। ব্লাউজটা পেছন দিকে ছেড়া। শাড়ী দিয়ে ঢেকে রেখেছে। ভেবেছিল এমাসে দুটো নতুন জামা গড়াতে দেবে কিনতু ছেলেমেয়েদের বায়না মিটিয়ে আর তা হয়ে উঠেনি। তাছাড়া, রইসুদ্দিনের শরীরও ভালো যাচ্ছেনা। বাজারের কবিরাজ ঢাকা নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাতে বললেন। এইসব ভাবনা জর্জরিত করে রেখেছে তাকে।

চেয়ারমেন সাহেব সকলের দিকে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে বললেন,

- …… শোন, তোমরা কেউ কেউ হয়ত মমতাজ বেগমকে চিনে থাকবা। আমাদের রইসুদ্দিনের পরিবার। এই গ্রামে সে একজন আদর্শ। নিজে কামাই রোজগার করে চার চারটা পোলাপান নিয়া সংসার চালায়। রইসুদ্দিনের অবস্থাতো তোমরা সবাই জানো। আমি তারে আজকে এখানে আসতে বলছি কারন আমি চাই সে এই বছর মেম্বর পদে দাঁড়াক। আমি শুনছি সে কিছুদুর পড়াশুনাও জানে। কাজ কাম ভালো করবে বলে আমার বিশ্বাস। তোমরা কি বলো?

চেয়ারমেনের কথার উপরে আর কারো কি কথা থাকে? সকলেই সমস্বরে বলতে থাকে, আপনি যা ভাল মনে করেন চেয়ারমেন সাব। কেউ কেউ ভুরু কুঁচকে তার দিকে আপাদমস্তক চেয়ে থাকে এতে তার বড়ই অসস্থি হয়। কিনতু ভেতরে ভেতরে তার বিস্ময়ের সীমা থাকেনা। চেয়ারমেন সাহেব কত বড় ভালো মানুষ, আগে তার জানা ছিলনা। পঞ্চাশের মত বয়স হবে তার। কিনতু কালো চকচকে চুল। সবসময় একটা ধবধবে সাদা সার্ট আর নীল লুঙ্গি পরে থাকে। পকেটে একটা কালো ছোট চিরুনি আর সাদা কাপড়ের টুপি। সারাদিন সে এই গ্রাম ওই গ্রাম টো টো করে বেড়ায়। উপজেলায় তার অনেক সুখ্যাতি।

চেয়ারমেনের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মমতাজ বেগম যখন ফিরছে তখন ঘন সন্ধ্যা। ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ডাকতে শুরু করেছে। চেয়ারমেনের বাড়ী থেকে বেরুলেই বড় রাস্তা পর্যন্ত যে সরু কাঁচা পথ তার দুধারে ঘন সবুজ গাছপালা অন্ধকারে একটা গাম্ভীর্য তৈরী করেছে। হাতের ডান পাশে বড় পুকুর। কিছুদুর হেটে যেতেই মমতাজ দেখতে পায় পুকুরপাড়ে চেয়ারমেন সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। বুকের ভেতরটা কিজানি কেন এক অজানা আশংকায় ঢিপঢিপ করতে থাকে তার।

- বাড়ী যাও মমতাজ?

- জ্বি।

- একটু দাঁড়াও। তোমার সাথে একটু কথা বলি।

- বাড়িতে অনেক কাজ। পোলাপানরা না খায়ি বসি আছে। আজকে যাই চেয়ারমেন সাব । আরেকদিন আসি কথা বলবোনে...

- তাতো আসবাই…কথাটা অনেক জরুরী……

- ও আচ্ছা, বলি ফেলেন তাইলে...

- চেয়ারমেন বুক পকেট থেকে কি যেন একটা বের করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘এইটা নাও’।

- ইটা কি? বলেই মমতাজ বেগম তাকিয়ে দেখে পাঁচশ টাকার একটা নোট। মমতাজের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বলে, ‘চেয়ারমেন সাব, গরীব হতি পারি কিনতু এখনও অন্যের টাকা নিতি শিখিনি, গায়ে গতরে খাটি খাই...

-আরে বোকা, এই টাকা আমি তোমারে দিব কেন? এইটা তো সরকারের টাকা। কাল সকালে অফিসে আইসা সই দিয়া যাইও।

- সরকার আমারে টাকা দিবি ক্যান?

-তোমার জন্য বয়স্ক শিক্ষা আর তোমার স্বামীর জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করসি। এখন থেকে প্রতি মাসে এই টাকা তুমি পাবা। আর শোন, যখন কোন মিটিং এ আসবা কোন ছিড়া জামাকাপড় পইরা আসবানা।

মমতাজ হতভম্ব হয়ে চেয়ারমেনের দিকে চেয়ে থাকে। আর চেয়ারমেন হন হন করে হেটে চলে যায় পশ্চিম দিক বরাবর। একসময় অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তার সাদা সার্ট।

--------------------------------------------------------------

রাত নটা। আজ হাটবার। বাজার পুরোটাই জমজমাট। ক্লাব ঘরে প্রচুর ভীড়। বাংলা সিনেমা হচ্ছে। রাজ্জাক-ববিতার ছবি। ববিতা কথায় কথায় চোখ পিটপিট করছে। তাই দেখে সত্তুর বছর বয়েসী বুড়ো আরেকজনের কাছে জানতে চাইছে, ববিতার কোন অসুখ করেছে কিনা। আর তাই নিয়ে ক্লাব ঘরে হাসির রোল পড়ে গ্যাছে। সিদ্দিকের ভাতের দোকান এখনও খোলা। সুমন, শান্ত, হরি ক্লাব ঘরে ভীড় দেখে তিন জনেই বেড়িয়ে পড়ল। ভাতের দোকানটা ক্লাবঘর থেকে একটু দূরে। ডোবার উপর বাশের ঘর। ওরা প্রায়ই দল বেধে ভাত খেতে যায়। ভারী চমৎকার চেনা পরিবেশ। দক্ষিনের হু হু বাতাস আর ডোবার দূর্গন্ধ, সব মিলিয়ে চির অভ্যস্ত সময় কাটানো।

বাঁশের মাচার উপর ভাতের অপেক্ষায় বসে আছে ওরা। হরির মুখটা অসম্ভব কালো ও কঠিন। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, অথচ গ্রামের একটি লোক এ নিয়ে কোন কথা বল্লোনা। একসময় কত হিন্দু এ গ্রামে বাস করতো। একে একে সব চলে গেল পাশের দেশে। কই ওই দেশের মুসলমানরাতো এদেশে আসেনি!তাহলে ভুলটা কার? হরির বিদ্ধস্ত চেহারার দিকে তাকাতে পারছেনা সুমন। শুধুই ভাবছে এসবের প্রতিকার কি?

- সুমন, অনেকতো সহ্য করলাম। আর না। হরি বলে।

- তোদের কি মনে হয়, পুলিশ এর কোন হদিস করতে পারবে? কোনদিনও না। শান্ত আক্ষেপ করতে থাকে।

-সুমন গম্ভীর ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে, এত স্বপ্ন নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসেছি, এভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে একটার পর একটা অন্যায় সহ্য করার জন্য নয়। শোন, আমার সাথে মমতাবু’র কথা হয়েছে। ও নিজের চোখে দেখেছে চেয়ারমেনের লোক ঘটনার সময় ঐখানে উপস্থিত ছিল। ‘তোদের কি মনে হয়না, চেয়ারমেন নিজে এর সঙ্গে জড়িত আছে?

- হরির চোখদুটো লাল টকটক করছে। খুব উত্তেজিত হয়ে সে বলে উঠলো, আমি ওরে জানে মেরে ফেলবো। দেখিস তোরা।

- তোকে কিছুই করতে হবেনা। তুই মাথা ঠান্ডা রাখ। নে, ভাত খা, তারপর চল মমতাবুর বাড়ীতে যাই, বলে সুমন নিজের পাতে ভাত বাড়তে থাকে।

------------------------------------------------------------

মমতাজ বেগমের অনেকদিনের শখ উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হওয়া। একদিন সে তার এই সুপ্ত বাসনার কথা আরেক মেম্বর ইমাজুদ্দিনকে জানিয়েছিল, কিনতু সে তা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। মমতাজের কি যোগ্যতা আছে মেম্বর হবার? না আছে টাকা, না আছে চেহারা। চার চারটা সন্তানের মা। কোন পুরুষ ওকে ভোট দিতে যাবে? মমতাজ বেগমের ইউনিয়নে মোট বারোটি গ্রাম। একেকটি গ্রামে দুইশোর ও বেশী পরিবার। মমতাজ জানে যে এসবগুলো বাড়ীতে তাকে যেতে হবে ভোটের জন্য। কিনতু ভোট চাইলেই মানুষ তাকে ভোট দিবে কেন? ইমাজুদ্দিনতো ঠিকই বলেছে। সারারাত এই চিন্তায় তার ঘুম হয়নি সেদিন । মেম্বর হলে অনেক লোকে ওকে চিনবে। একটা ব্যবসা দাঁড় করানোর কত শখ ওর, তা হয়তো পূরন করা সম্ভব হবে। কিনতু সে কোনদিন ভাবেনি এই সুযোগটা তার এত সহজেই হয়ে যাবে। চেয়ারমেন ওকে এইভাবে সকলের সামনে এই প্রস্তাবটা দিয়ে বসবে। মনে মনে অস্থিরতা গ্রাস করে তাকে। শুক্রবার বিকেলে রোদ থাকতে থাকতে সে উপজেলা অফিসে হাজির হয়।

চেয়ারমেন সাহেবের ঘরটা অনেক সুন্দর। ধবধবে দেয়াল। চকচকে মেঝে। একজন লোক সারাক্ষন যেই আসছে তাকে চা বিস্কুট খেতে দিচ্ছে। সারা ঘর জুড়ে কেমন একটা ঠান্ডা বাতাস...যেন মনে হয় আকাশ থেকে তুষার ভেঙ্গে পড়ছে। চেয়ারগুলো রাজা বাদশাদের মসনদের মত উচু উচু নকশা কাটা। বিজলী বাতি সারাক্ষন জ্বলছে। মনে হয় সরকারী ব্যবস্থায় কারো কোন তোয়াক্কা নেই। অফিস ঘরে আরো অনেক লোকজন। চেয়ারমেন সাহেব ইশারায় বসতে বললেন তাকে। মমতাজের কেমন একটা অসস্থি হতে লাগলো। এর আগে কখনও সে এই অফিসে আসে নাই। আজ মনে হচ্ছে, এখানে সে বেমানান, পথে ঘাটে মাঠে যে মানুষের বিচরন তাকে কি আর মসনদে মানায়? মমতাজ গুটিশুটি মেরে পেছনের একটা চেয়ারে বসে থাকে। ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পর একে একে সকলে চলে যায়। চেয়ারমেন তাকে সামনে এসে বসতে বলে। মমতাজ বেগম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলে,

- আজ যাতি চাই, চেয়ারমেন সাব।

-যাবা ক্যান? মাত্রতো আসলা!! চা-বিস্কুট খাও, তাছাড়া তোমার সাথে আমার কিছু কথাও আছে।

- জ্বি, বলেন।

- দ্যাখো মমতাজ, তোমারেতো আগেই বলছি, কতদিন এইভাবে সংসারে যোগালি দিবা। বয়সতো তোমার এমন কিছু হয়নাই।

- কি করুম, কপালে আল্লাহ যা লিখি রাখসে তা তো আর বদলানের উপায় নেই ।

- মমতাজ, তুমি দেখতে শুনতেতো খারাপ না। এইভাবে ছেড়া জামা কাপড় পইরে গ্রামে গঞ্জে ঘুইরা বেড়াও এইটাতো ভালো দেখায় না। তারপর শুনলাম ইদানিং তুমি নাকি সুমনের ওই ইয়ং ক্লাবেও যাও।

- ওই পথ দিয়ে প্রতিদিন বাড়ী ফিরতি হয় তাই ওদের ক্লাবে একটু জিরিয়ে নিই। সুমন, রাব্বী, ওরাতো আমারে খুব ভালবাসে। আপনিযে টেলিভিশনটা দিয়েচেন ওটা দেখার জন্য কত লোকের ভীড় !!

-শোন, সামনে ইলেকশন, মেম্বার পদে দাঁড়াইসো, এখন যদি একটু বুইঝা শুইনা না চলো তাইলে পাশ করবা ক্যামনে?

- তাতো ঠিকই বলিসেন চেয়ারমেন সাব। কিনতু মেম্বর হয়ি আমার কি লাভ হবি?

- তুমি আমারে সবসময় চেয়ারমেন সাব, চেয়ারমেন সাব...করো কেন? আমারে তুমি নাম ধইরা ডাকবা। অসুবিধা কি?

- কি বলেন চেয়ারমেন সাব। আপনি কত বড়...মানুষ, আর আমি!!!!

-তুমি আমারে আওয়াল ডাকবা। আর সকলের সামনে আওয়াল ভাই বলবা।

- মমতাজ বেগম লজ্জ্বা পেয়ে উত্তর দেয়। কিযে বলেন ভাই!

চেয়ারমেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, আজও তার পরনে সাদা শার্ট, নীল লুঙ্গি। মমতাজের কাছে এসে বলে,

- দ্যাখো মমতাজ, তুমি চাইলে তোমার ভাগ্য বদলে ফেলতে পারো। আমি তোমারে সব দিবো। শুধু আমার কথা মত চলবা। বলেই খপ করে মমতাজের হাতটা ধরে বলে, ‘আমি তোমারে অনেক পছন্দ করি মমতাজ। অনেকদিন ধইরা ভাবতেসি এই কথাটা তোমারে বলি। তুমি যা চাও, সব তোমারে দেবো, শুধু তুমি একটা রাতের জন্য আমার কাছে আসো’। মমতাজ বেগমের সারা শরীর হিম হয়ে আসে। ভেতরে ঢিপ ঢিপ হাতুড়ি পেটানোর শব্দ। পৃথিবীটা যেন অকারনেই দুলছে। মাথার উপর টিনের চাল, উড়ে যাচ্ছে ঝড়ে…।হঠাৎ করেই যেন সে টের পায়, ওর শরীরটা হালকা হয়ে দুলছে চেয়ারমেনের দু বাহুর ভেতরে।

মুহুর্তের মধ্যেই চিৎকার করে উঠে মমতাজ বেগম।

- ওরে…আল্লাহরে……এইটা কি করিসিশ তুই…………!!! তোরে আমি ভালো মানুষ ভেবেছিলাম……তুইওতো দেখি আরেক ইদ্রিস!! কুত্তার বাচ্চা ছাড়!! বলেই দুইহাত দিয়ে সজোরে একটা ঝাকুনি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড় দেয় সে দরজার দিকে। কোনরকমে চৌকাঠটা পার হয়ে দিক বেদিক ভুলে গিয়ে দৌড়াতে থাকে...। কতটা সময় ধরে অনবরত একটি পথ অনুসরণ করেছে সে তা জানেনা।

একসময় সুমনের চিৎকারে হুঁশ হয় ওর।

-মমতা’বু……মমতা’বু, কি হয়েছে তোমার? এভাবে দৌড়াচ্ছো কেন?

মমতাজ বেগম ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখে, বাজার থেকে সে এখন বিশ গজ দূরে, জনারন্য লোকালয়ে।

-সুমন, ভাই…আমারে তুমি বাঁচাও। বলেই সে হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে পড়ে। এভাবে কতক্ষন সে বসেছিল তা সে জানেনা। হঠাৎ মনে হোল, সুমন ওকে কি যেন বলছে,

-মমতাবু, মমতাবু……।।আরে আগে বলবাতো কি হইসে তোমার?

-আমি মেম্বর হইতে চাইনা ভাই…আমি কিচ্ছু চাইনা… আমার পোলাপানগুলারে বাঁচাতি চাই। তুমিতো জানো ভাই, পঙ্গু বাপ খাতি দিতে পারেনা…… আমি কিচ্ছু চাইনা, কিচ্ছু চাইনা। মমতাজ বেগমের দুচোখ দিয়ে আঝোর ধারায় জল বইতে থাকে…

সুমন ভাবে পৃথিবীটা আজও তেমনি আছে। আদি লোভ, ভোগ এবং অবিচারের। নইলে যে নারীটি এত কষ্ট করে সংসার চালায় ঈশ্বরতো তার প্রতি এইটুকু দয়া দেখাতে পারতেন।

- সুমন মাটিতে বসে মমতাজের মাথায় হাত দিয়ে বলে, ‘বুবু, আমি বেঁচে থাকতে এই গ্রামের একটি মানুষ তোমার ক্ষতি করতে পারবেনা, তুমি শুধু বলো, কে তোমার গায়ে হাত দিসে? আমি তোমার ছোট ভাই। আমারে বলো, চেয়ারমেন তোমার সাথে কি করসে? আমি ওর দুই ঠ্যাং টেনে ছিড়ে দিয়ে আসবো।

- না সুমন। মাথা গরম করি লাভ নেই। ইলেকশন আমি করবই। তুমি শুধু আমার পাশে থাকো ভাই। বলে হাপাতে থাকে মমতাজ বেগম।

সে রাতে সুমন ঘন অন্ধকারে ইয়ং ক্লাবের আর সব বন্ধুদের নিয়ে মিলিত হয় বাজারের পূর্ব দিকে গজাপাড়া ব্রীজের নিচে। একটা গোপন মিটিং করে ওরা। হোগলপোতা গ্রামে একটা অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরী হয় ওরা। চেয়ারমেনের বিরূদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান। ওরা অনেকদিন ধরে শুনে আসছে গোপনে গোপনে চেয়ারম্যান চোরাকারবার করে, মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করে। কিনতু কোনদিন হাতেনাতে ধরতে পারেনি। আজ মমতা’বুকে দেখে ওদের সাহস যেন বেড়ে যায় অনেক। ওরা সকলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, যে কোন মূল্যেই হোক চেয়ারমেনকে গ্রামছাড়া করবে ওরা।

-------------------------------------------------------------

ভোর পাঁচটা। আজ ১লা অগ্রহায়ন। ভরা মাসের শুরুটা এমন ভয়াবহ হবে হোগলতলা গ্রামবাসী কেউ কোনদিন তা কল্পনাও করতে পারেনি। পশ্চিমপাড়ার মানুষজন আজ হতভম্ব। পুব আকাশে সুর্যদয়ের সাথে সাথেই তারা দেখতে পায় পুরো আকাশ জুড়ে কুন্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া। ধোঁয়াগুলো যেন ক্রমশ ঘনীভুত হয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে সমস্ত গ্রাম। গ্রামবাসীরা জড় হতে থাকে উঠোনে। একটা চাপা কোলাহল ছড়িয়ে পড়েছে চারদিক। চিৎকার করছে মানুষ…

বাড়ীর কারো তখনো ঘুম ভাঙ্গেনি। মমতাজ বেগম ভোরবেলা উঠে যথারীতি উনুন ধরিয়েছে উঠোনে। বিশাল বড় হাড়িতে ফুটছে চাল। মরা পাতা ভেঙ্গে মচমচ শব্দ করে কেউ আসছে। মমতাজ তাকিয়ে দ্যাখে শোলার বেড়া পার হয়ে সুমন, অলক, রাব্বী, শাহীন সহ দশ বারো জন এসে দাঁড়ালো ওর সামনে। সকলের চেহারাই বিভ্রান্ত, হাতে পায়ে ময়লা, কালি।

মমতাজ অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে বললো,

- তোমরা, এত সকালে? একটা ঘন বজ্রপাতের শব্দ বুকের ভেতর বাজতে থাকে তার।

- হ্যা, আমরা। কি রাঁধছো বুবু? দাও, কিছু খেতে দাও। খুব খিদে পেটে, সুমন বলে। যেন পৃথিবীর কোথাও কিচ্ছু ঘটেনি। ওরা ওদের বুবুর কাছে খেয়ে দেয়ে ঘুমাবে আজ। শাহীন কাসার জগটা হাতে নিয়ে কল পাড়ে বসে মুখ ধুতে লাগলো।

মমতাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে আগুনের শিখা ক্রমশ উপরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগুন যেখানেই লাগুক এটা ছোটখাট কোন অগ্নিকান্ড নয়। মমতাজ সরাসরি সুমনের দিকে তাকিয়ে বলে,

- ইটা কি তোমাদের কাম?

- হ্যা। সুমন কোন ভনিতা ছাড়াই মাথা নাড়ে।

- কেন করলিরে এটা, ভাই? মমতাজের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠে।

-আমরা কিসু করিনাই বুবু। শালার ব্যাটা নিজের দোষে নিজেই মরসে।

- বলকি?

- ওর পরিবার কই? মমতাজ চিৎকার করে উঠে।

- ওরা কেউ বাড়ীতে ছিলোনা বুবু। তুমি এত চিন্তা কইরনা। আমরা বুইঝা শুইনা কাজটা করছি।

- চেয়ারমেনের বাচচার এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অধিকার নাই। রাব্বী গজগজ করতে থাকে।

- আল্লাহ ছাড়া এই পৃথিবীতে মারি ফেলার অধিকার কারো নাই। মমতাজ বিড়বিড় করে বলে।

- বুবু, তোমারে আমরা চেয়ারমেন বানামু। অলক গামছা দিয়ে গা মুছতে মুছতে বলে।

মমতাজ বেগম স্থির হয়ে কিছুক্ষন ওদের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কিসের টানে এই শিক্ষিত তরুন ছেলেগুলো ওর কাছে এসেছে আজ। ওকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি করছে? পৃথিবীতে নাকি মহৎ মানুষ মরে গেছে সব? এতকাল গ্রাম পর গ্রাম টই টই করে হেটেছে সে। কত গ্রামের কাঁদা মাটি তার পায়ে লেগে আছে। ধুতরা, আর কত শত নাম না জানা গাছের গা মারিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে সে কলমী আর কলুই শাকের ডাল। কতবেলা খেয়ে না খেয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে বাচ্চাগুলোকে। কেউ কোনদিন কখনও প্রশ্ন করেনি। আজ জীবন দিয়ে এই ছেলেগুলো ওকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে। এও কি সে ভাবতে পারে?

চেয়ারমেনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা গ্রাম তোলপাড়। পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। তদন্তের জন্য নানা ধরনের লোকজনের ভীড় জমেছে। চেয়ারমেনের বাড়ীর পুকুরের পানি সব ঢেলে দিয়েও বাঁচানো গেলনা চেয়ারমেনকে। কে বা কারা গভীর রাতে সারা বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ঘরের বাইরে দিয়ে তালা বন্ধ থাকায় চেয়ারমেন বেড়িয়ে আসতে পারেনি। যারা এতদিন চেয়ারমেনের চামচাগিরি করেছে, তারা সাত সকালে ঘুম ভেঙ্গেই পালালো কোথায় কে জানে। পুলিশ কাউকে খুঁজে পাচ্ছেনা। লোকজন বলাবলি করছে মানসীদির ঐ ঘটনার সঙ্গে চেয়ারমেন জড়িত ছিল। নানাভাবে অত্যাচার করেছে হিন্দু পরিবারগুলোকে। গ্রামছাড়া করতে চেয়েছে তাদের। এছাড়া সরকারী গুদাম থেকে রিলিফের চাল হাওয়া হোল কি করে তাও কেউ বলতে পারেনি, এখন সবাই বলছে এও চেয়ারম্যানেরই কাজ। চেয়ারম্যানের অপমৃত্যু তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে আরো বেশী। গ্রামবাসীর জমে থাকা ক্ষোভ যেন উপচে পড়ছে এখন। কেউ চেয়ারম্যানের পক্ষ হয়ে কথা বলছেনা। পুলিশ অসহায় হয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছে কিনতু কোথাও কোন অপরাধীর চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছেনা।

এই ঘটনাপ্রবাহ খুব বেশীদিন দীর্ঘস্থায়ী হোলনা। মানুষ ক্রমশ ভুলে থাকলো একটি অসম্পুর্ণ তদন্ত ঘটনা। গ্রামের ধর্মীয় নেতা আলহাজ মোহাম্মদ হাফিজ আলী, যিনি দীর্ঘদিন আরব দেশে বসবাস করেছেন এবং তিন তিনটি মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা, তিনিই গ্রামের অস্থায়ী চেয়ারমেন নির্বাচিত হলেন। পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঐ মসনদে প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। ফুলতলি গ্রামে প্রাইমারী ইস্কুলে একটা উৎসব হবে। নতুন চেয়াম্যান সাহেব সব মহিলা মেম্বরদেরকে তার অফিসে ডেকে বললেন তারা যেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে। মমতাজ বেগমকে আলাদা করে বললেন,

- তুমি নাকি বেশি কথা বলো সবাই বলে, শোন, অনুষ্ঠানের সময় মুখটা বন্ধ রাখবে, আর মাথায় ঘোমটা দিয়ে যাবে। শালীনতা বলে কথা। ধর্ম কর্ম এখনও দুনিয়া থেকে উঠে যায় নাই।

মমতাজ তেড়ে উঠে বলে, ‘চেয়ারমেন সাব, ঘোমটা দেওয়ার অভ্যাসতো আমার নেই। খালে বিলে ঘুরি বেড়াই, মাঠে ঘাটে কাম করি খাই, বোরকা পড়লে খাওয়াবিটা কেডা? আপনি যদি মনে করেন আমার থাকলি পর অসুবিধা হবি...তো আমার নাম বাদ দিতি পারেন। অত সময় নষ্ট করার টাইম আমার নাই’।

- ইমাজুদ্দিন সাথে সাথে বলে উঠে, না, না, তুমি যাবা কেন, তুমি বসো। চেয়ারমেন সাব, মমতাজ বেগমের বিষয়টা একটু আলাদা কইরে দেইখেন।

- ইমাজুদ্দিন ভাই, আলাদা কইরে দেখারতো কিসু নাই। আমি তো কারো কাছে দয়া চাইতে আসিনি। জনগন আমারে ভোট দিয়া মেম্বর বানিয়েসে শুধু চেয়ারমেনের কথা মত চলার জন্যি না। আর তাছাড়া আমি এমন কোন অন্যায় কাজ করিনি যার জন্যি আমি আমার মত চলাফেরা করতে পাইরবোন। চেয়ারমেন সাহেবের কথা মত আমার চলতি হবি ক্যান?

চেয়ারমেনের ভুরুসহ দুচোখ উপরে উঠে যায়। বিস্ময়ের সীমা থাকেনা তার। গ্রামের একজন সাধারন মহিলা এভাবে কথা বলতে পারে তার জানা ছিলনা। সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘মমতাজ বেগম, তুমি কতদুর পড়াশুনা করছো’?

- ফাইভ ক্লাস পর্যন্ত পড়িছি । আর আপনি আমারে তুমি কইরে কথা বলতিসেন ক্যান? আপনি কইরা বলবেন। আপনি এত দেশ বিদেশ ঘুরিসেন, মহিলাদের কিভাবে সম্মান করি কথা বলতি হয় তা নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে।

চেয়ারমেন হতবাক হয়ে উত্তর দেয়, ‘বাহ,আপনিতো দেখি খুবি সাহসী মহিলা। আপনাকে আপনিই বলা উচিত। আমার এ জীবনে আপনার মতন সাহসী মহিলা আমি খুব কমই দেখছি।

কি কাজ করেন বোন আপনি’?

- আগে ঘেরে কাজ করিতাম এখন আলোর দিশারিতে ফিল্ডের কাজ করি।

- কি কাজ?

- ঐ ধরেন, লোকজনরে ঘের দেখাইতে নিইয়ে যাই। চাষাবাদ কেমনে করতি হয় সেইগুলো বর্ননা করি। মাঝে মাঝে বিদেশীরা আসে, ওদের নিয়ে যাই। এইসব আরকি।

-আপনারে আমার খুবই সম্মান করতে ইচ্ছা করতেসে। আপনি যদি চান তাহলে আমি আপনার জন্য একটা সরকারী চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারি।

- জ্বিনা, চাইনা।- মুখের উপর জবার দিয়ে দেয় মমতাজ বেগম।

- কিনতু কেন? জানতে পারি কি?

- সরকারী চাকরী আমার ভালো লাগেনা।

-ইমাজুদ্দিন! এই মহিলা বলে কি দেখছো? মানুষ সরকারী কাজের জন্য কতকিছু করে?

মমতাজ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আমার আর সময় নাই। চেয়ারমেন সাহেব আমি এখন যাই। মেলা কাম পড়ি আছে।আপনের কোন দরকার হলি পর খবর দিয়েন। বলে মমতাজ বেগম হন হন করে হাটতে শুরু করে। চেয়ারমেনসহ আর সবাই তার যাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। একসময় মমতাজ বেগমের স্থুল শরীরটা মিলিয়ে যায় উপজেলা অফিসের শেষ প্রান্তে সবুজ গাছ গাছালীর ওপারে।

1 টি মন্তব্য:

  1. মংলা এলাকা, চিংড়ীর ঘের, কচুরীপানার ভিড় - তার মাঝে প্রান্তিক মানুষের জনপদে একজন সাহসী মানুষ 'মমতাজ' - এটা একটু সময় নিয়ে পড়ার গল্প। গল্পর 'গল্প' টা দেখতে সহজ, কিন্তু লেখাটা সহজ ছিলনা,- আমি দেখতে পাচ্ছি। অনেক আপন করে নিজের করে গভীর করে দেখতে না জানলে শহুরে মানুষ এর পক্ষে দুরের দক্ষিন বঙ্গের গ্রামের এ গল্প এমন সহজ ভাষায় বলা টা সহজ নয়! এরকম মমতাময় আরও লেখা লেখকের হাত থেকে শোরগোল করে বেরিয়ে পড়ুক - এই শুভকামনা ...

    উত্তরমুছুন