শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

জ্বালায় জ্বলি তবু রসে ঢলি

সামরান হুদা

তিতা খাইলাম মিডা খাইলাম
খাট্টাও খাই চাই
বন্ধুর পিরিতির মজা
কোন কিছুত নাই।



যেঁত্যে আছিলাম ছোড
মন্নান আছিল খোলা
আম তলে জাম তলে
খাইতাম খোয়া বাতী রে
বছরকালে দিল বন্ধু পিরিতি খিখাই।।


( চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান/ আবদুল গফুর হালী/ সং- কল্যানী ঘোষ/ বাংলা একাডেমী ১৯৯৮)


লশকরপাড়ার শেষ বাড়িটা সখিনাবুবুর। ছোট্ট এক টুকরো উঠোন, যেখানে বসে সখিনাবুবুর বাবা বেতের কাজ করে। ধান রাখার গোলা, টাইল, খলই বানান তিনি। সারা উঠোনে দ্বীপের মত ছড়িয়ে থাকে সেই সব জিনিস। উঠোনের যেখানে সেখানে উঁচু ঘাসের জঙ্গল, বাড়ির সীমানা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে আম, কাঁঠাল, পেয়ারার গাছ। এক সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো এই বাড়ির সীমানা নির্দেশ করে। লশকর পাড়ায় সব ক’টা বাড়ির সীমানাই এইরকম ফলের গাছ দিয়ে আলাদা করা। উঠোনের শেষ মাথায় পূবে-দক্ষিণে দুটি ছোট্ট ঘর, টিনের বেড়ার উপর খড়ের চালে ছাওয়া। পূবদিকে কয়েকহাত ফাঁকা জমি, যাতে বিশাল এক গর্ত, গোবরের নাদা– সবাই যাকে বলে ‘গোবরটাল’। লশকর পাড়ার সকলে এই গর্তে গোবর ফেলে। তারপরেই শুরু হয়েছে ঘন বাঁশঝাড়ে ঢাকা কবরস্থান, দিনের বেলাতেও যেখানে গা ছমছমে ঘন অন্ধকার। দক্ষিণে, বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এক খাল। শুকনো মরশুমে যা থাকে খটখটে শুকনো, বর্ষায় যার ওপচানো জল ছুঁই ছুঁই করে সখিনাবুবুর উঠোন, ঘর। তখন বন্ধ থাকে বেতের কাজ। দক্ষিণ ভিটের ঘরটা সখিনাবুর বাবার, পূব ভিটের কবরস্থান ঘেঁষা ঘরটা সখিনাবুর, দুটো ঘরের মাঝখানে কোণাকুণি চারটে বাঁশের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে এক ছোট্ট খড়ের চালা, দেওয়ালবিহীন রান্নাঘর। উঠোন থেকে হাতখানেক উঁচু লেপা-পোঁছা ছোট্ট, একচিলতে সেই রান্নাঘরের একধারে পর পর দু’টি একমুখো উনুন। পাশেই রাখা থাকে এক কলসি জল। পূবের ভিটে, সখিনাবুর ঘরের ঠিক পেছনটায়, গোবরটাল আর ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রয়েছে এক বেলগাছ। ঘরের চালের উপর ডালপালা ছড়ানো বেশ বড় ঝাঁকড়া এক গাছ।

সখিনাবু বলে, অনেক গাছেই নাকি ভূত-পেত্নি থাকে। গাবগাছে থাকে, তেঁতুলগাছে থাকে। আর বেলগাছেও থাকে। তবে তাদেরও রকম ফের আছে। সব ভূত সব গাছে থাকে না। তাদের সব আচার ব্যবহার আলাদা। মেজাজ-মর্জিতেও বিস্তর ব্যবধান। সখিনাবুর বেলগাছেও নাকি ভূত-পেত্নির বাসা। অনেকেই নিজের চোখে দেখেছে, সখিনাবু তো দেখেইছে। চাঁদনি রাতে পেত্নিরা সব খাটো সাদা রঙের শাড়ি পরে সখিনাবুর আঙিনায় ঘুরে বেড়ায়। সখিনাবুর ঘরের চালে বসে চাঁদের আলোয় উকুন বাছে তারা। কেউ কেউ কবরস্থানের দিকে হেঁটে চলে যায়। সখিনাবুর ছেলে জয়নালকে তো যখন তখন ঘাড় মটকাতে আসে! কিন্তু সখিনাবুকে কিছু বলে না। সখিনাবুর গাছেই তো তারা থাকে, সখিনাবু যদি রেগে গিয়ে গাছ কেটে ফেলে! সখিনাবুর সঙ্গে পেত্নিদের পারস্পরিক বোঝাপড়া আছে। ভূত-পেত্নিরা খুব স্বাবলম্বি, খাই খাই করে সখিনাবুকে তারা জ্বালায় না। সাবধানের মার নেই বলে রাত্রে খাওয়ার পরে সখিনাবু এঁটো-কাঁটা বাইরে ফেলে না, সে শুনেছে, পেত্নিরা নাকি এঁটো-কাঁটা খেতে খুব ভালবাসে। থালাসুদ্ধু যদি কেড়ে নিয়ে যায় সেই ভয়ে সব জমিয়ে রেখে দেয় সকালে ফেলবে বলে! গোববরটাল ছাড়িয়ে চৌকো জমি গভীর করে কাটা সেখানে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা। ময়লা জমতে জমতে ভরাট হয়ে এলে উপরে মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশেই আরেকটা গর্ত খুঁড়ে দেওয়া, তাতে আবার ময়লা জমতে থাকে। এই ভাবেই চলতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

হেমন্তে শীত যখন আসি আসি করে আগে-ভাগেই এসে পড়ে সকালে হালকা কুয়াশার সর বিছিয়ে, পাড়া-গাঁয়ের বাতাসে যখন শুধুই নতুন ফসলের ঘ্রাণ, সখিনাবুর গাছে তখন অগুন্তি, অজস্র ছোট্ট ছোট্ট কুঁড়ি, বেল। বেল যেহেতু আম-জাম-বরই-জামরুলের মতো জিনিস নয় যে কচি বেল পাড়লাম আর খেলাম তাই ছেলে-পুলেদের ঢিল ছুঁড়ে ফল নষ্ট করার কোনও ব্যাপার ছিল না। বড় নিশ্চিন্তে গাছে বেল বড় হতো, পোক্ত হতো। পাকা বেল দুপদাপ পড়ত সখিনাবুর পিছদুয়ারে, ঘরের চালে। পাকা বেলের উপর লোভ থাকে বড়দের, আশে-পাশের বাড়ির মেয়ে-বউরা বেল পড়ার শব্দ পেলেই উঁকি দিয়ে দেখে সখিনাবু বাড়িতেই আছে নাকি বেড়ার ঘরে ঝাঁপ টেনে দিয়ে কাজের বাড়ি গেছে। সখিনাবুকে দেখতে না পেলে ত্বরিত পায়ে এসে বেলটা কুড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। কেউ কেউ একটা-দুটো বেল চেয়েও নিয়ে যায়। বেল যখন কচি, টেনিস বলের আকারের, তখন সেই বেলের খুব কদর, মোরব্বা বানানোর জন্যে। যারা বেলের সৌখিন, তারা অবশ্য মোরব্বা ছাড়াও কচি বেল আগুনে পুড়িয়ে খান। পেটের রোগীদের জন্যে যা কিনা ওষুধ। গুণাবলীতে বেলের মোরোব্বাও ফ্যালনা নয়। এই মোরব্বার নাকি অনেক গুণ, এইরকম কীর্তন সহ আমাদের খাওয়ানো হত। এর স্বাদ খুব অদ্ভূত। আর তীব্র মাদক গন্ধ সারা সকাল জুড়ে পাওয়া যায় একটুকরো খেলেও। যা প্রায় সবার ঘরেই তখন দু’দিন-চারদিন ছেড়ে ছেড়ে বেলের মোরব্বা হয়। আমাদের বাড়িতেও হতো।



-দুই-

রাঙ কি পিতল সনা চিনলি না রে জন্মকানা
উদয় বলে সাঁচা যেন চিনির পানা রে।
পিরিতি রতন কাঁচা সনা।।
( ঝুমুর গান/ উদয় কবি)



সখিনাবু কচি বেল বিক্রি করত জোড়া হিসেবে। বেলগাছে সচরাচর কেউ উঠতে চায় না। ভূত-পেত্নি নয় বেলের কাঁটার জন্য। সারা বেল গাছেই থাকে তীক্ষ্ণ কাঁটা। বেল গাছের নীচ দিয়ে যেতে গেলেও অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে হয় এই কাঁটার জন্য। আমাদের বছরবান্ধা মুনিষ মজিদ ভাই বাজারের থলে নিয়ে সখিনাবুর গাছে উঠে পছন্দসই বেল নিজেই পেড়ে নিত ব্যাগ ভর্তি করে। গাছ থেকে নেমে জোড়া হিসেবে পয়সা মিটিয়ে ব্যাগভর্তি বেল নিয়ে বাড়ি আসত। সেই বেল এত কচি যে আমের খোসা ছাড়ানোর মতো করে তার খোসা ছাড়ানো যেত। মজিদ ভাই নিজেই বসে যেত বটি নিয়ে। এক এক করে খোসা ছাড়িয়ে দু’ভাগ করে ছেড়ে দিত সামনে রাখা বড় অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ভর্তি জলে। সব বেলের খোসা ছাড়ানো হয়ে গেলে চাচির কাছে দিয়ে যেত গামলা ভর্তি বেল। চাচি বসত মোটা নারকেলের কাঠি ও বটি নিয়ে। দুই ভাগে ভাগ করা বেল মোটা মোটা চাকা চাকা করে কেটে আবার জলেই রেখে দিত। কচি বেলেও আঠা হয় যথেষ্ট। ছোট কচি বেলে বিচি হয় কি হয় না কিন্তু স্বচ্ছ আঠা দিয়ে ঘেরা থেকে বিচিগুলো। জলে পড়লে আপনা থেকেই জলের সঙ্গে মিশে যায় সেই আঠা, হাতে লেগে থাকে না একটুও। নারকেলের শলা ছোট কাঠির আকারে ভেঙ্গে সেই কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে জালির মতো ছোট্ট ছোট্ট বিচি বের করে ফেলা হয় যা কিনা গোল মালার মতো করে জড়ানো থাকে বেলের ভিতরে। এই কাজটা করতাম আমরা, বাড়ির ছোটরা যারা সব কাজেই চাচির সঙ্গে সঙ্গে থাকি। বিচি বের করে নেওয়ার পর বেলের মধ্যে অদ্ভুত এক নকশা ফুটে বেরোয়। চাচি আবার বেলের টুকরোয় বটি দিয়ে নকশা করে। ধারগুলোয় আলতো করে কেটে কেটে একটা ঢেউ এর মতো আকার দেয় প্রতিটা টুকরোয়। বেলের টুকরোগুলোকে দেখায় একই ধাঁচের সব ফুলপিঠার মতো। হালকা ঘিয়ে রঙের সব ফুলপিঠার মত কচি বেলের টুকরোতে রেকাবি ভরে ওঠে।


কাটা শেষ হলে বড় পোলাও রাঁধার হাড়িতে চাচি বেল বসায়। একমুখো চুলোয় শুকনো কাঠের জ্বাল। চিনি দেয় আন্দাজমতো, সঙ্গে দেয় দু-তিনটে তেজপাতা আর দু’কুচি দারুচিনি। ব্যস, আর কিচ্ছুটি নয়। ধিমে আঁচে জ্বাল পড়ে উনুনে, চিনি গলতে থাকে ধীরে ধীরে। কচি বেল থেকে মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়। অদ্ভুত সেই গন্ধ। বাতাসের ডানায় ভর দিয়ে সেই গন্ধ পাড়ি দেয় ছেলেবেলা। দেশ-কাল পেরিয়ে এখানে এসে হাজির হয়, এই কলকাতা শহরে, পাখির বাসার মতন ছোট্ট এক ফ্ল্যাটে। সে বিরাজ করে আমার ঘর জুড়ে। সোনালি রঙ ধরে গলে যাওয়া চিনি। তার মধ্যে সাঁতার কাটে নকশা করা টুকরো টুকরো বেল। তাদের গায়ের রঙ গাঢ় হয়। গাঢ় সোনালি। মাঝে মধ্যে শুধু কাঠের বড় হাতা দিয়ে একটু নেড়ে-চেড়ে দেওয়া। অনেক অনুরোধে চাচি রাজি হয় বসে জ্বাল দেওয়ার দায়িত্ব আমাকে দিতে। আলতো হাতে ধানের তুষ ছড়াই উনুনের মুখে। ধিকি ধিকি জ্বাল পড়ে উনুনে। একসময় চাচি ঢাকনা খুলে দেয়। চিনির রস ঘন হয়ে এসেছে, স্বচ্ছ সিরা ছিটকে ছিটকে হাড়ির বাইরে এসে পড়ছে। চাচি আমাকে আগুনের পাশ থেকে তুলে দেয়, গায়ে গরম সিরার ছিটে লাগবে বলে। বেলের রঙ একদম পালটে গেছে। বড় হালুইকরের দোকানের শোকেসে শুয়ে থাকা ল্যাংচার রঙের সঙ্গে তু্লনা করা যায় চাচির এই মোরব্বার। গাঢ়, স্বচ্ছ চিনির সিরায় বেলের টুকরো তখন গায়ে গায়ে। উনুন থেকে জ্বাল টেনে নেয় চাচি, মোরব্বা যেন হাড়িতে ধরে না যায়। কাঠের হাতা আর নয়, মোরব্বা ভেঙ্গে যাবে। ন্যাতায় করে হাড়ি ধরে খানিক পর পর নেড়ে চেড়ে দেয়, তলায় একটুও ধরে না মোরব্বা। অদ্ভুত কড়া এক মিষ্টি গন্ধ গোটা বাড়ি জুড়ে।

এক সময় চিনি এতটাই গাঢ় হয়ে যায় যে হাড়ি ধরেও আর মোরব্বা নাড়াতে পারে না চাচি। নামিয়ে দিতে বললে চাচি বলে, ‘ঠাণ্ডা হইলেই দেখবি চিনির সিরা আবার পাতলা হইয়া গেসে, যত বেশি জ্বাল দিবি, মোরব্বায় তত সোয়াদ আইব।’ আমি বসে বসে মোরব্বায় সোয়াদ আসার অপেক্ষা করি। এক সময় চাচি বুঝে যায় মোরব্বায় ‘সোয়াদ’ এসে গেছে তখন হাড়ি ধরে নামিয়ে ভাঙা কলসির মুখ দিয়ে বানানো স্ট্যান্ডে রাখে। গাঢ় সোনালি রঙের টুকরো টুকরো বেলের গায়ে স্বচ্ছ চিনির বিন্দু! সোয়াদ যেন মোরব্বার গা থেকে বাষ্প হয়ে উড়ছে রান্নাঘর জুড়ে। না। গরম গরম খেয়ে দেখব তার উপায় নেই। এই মোরব্বাও ঠাণ্ডা খেতে হয় নইলে নাকি সোয়াদ এসেও আসে না। কত কিছুতে যে স্বাদ লুকিয়ে থাকে! কাল সকাল পর্যন্ত স্বাদ আসবে না? চাচিকে জিজ্ঞেস করতেই চাচি হেসে ফেলে। হাসলে চাচির গজদাঁত ঝিকমিকিয়ে ওঠে। কি সুন্দর যে লাগে চাচিকে! বলে, ‘গরম খাইয়া মুখ পুড়বি নিহি! একটু ঠাণ্ডা হউক, দিতাসি।’ বিকেলে চায়ের সঙ্গে কাঁচের তশ্‌তরিতে করে সবার জন্যে মোরব্বা বাড়ে চাচি। নকশাদার চাকা চাকা বেলের টুকরো তাতে স্বচ্ছ বিন্দু বিন্দু চিনি! এক কণা ভেঙ্গে মুখে দিতে আপনা থেকেই যেন গলে গেল রসে টই টুম্বুর মোরব্বা। আর তার কি সোয়াদ! আহা...

কলকাতায়, নিউ মার্কেট অঞ্চলে ড্রাই ফ্রুটের দোকানে দেখে খুব অবাক এবং খুশি হয়েছিলাম। এখানে বেলের মোরব্বাও পাওয়া যায়! ছোটবেলার উৎসাহ ফিরিয়ে আনে এক লহমায় সেই বেলের মোরব্বা। কাঁচের বৈয়ামে পাতলা চিনির রসে ডোবানো চাকা চাকা বেলের টুকরো, মোরব্বা। প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে সেই মোরব্বা কিনে বাড়িতেও নিয়ে এসেছিলাম। সেই আগ্রহ আর আনন্দ যদিও ফিকে হতে সময় লাগেনি একেবারেই। ফিকে লালচে রঙের সেই মোরব্বায় ততোধিক ফিকে মিষ্টি, বাসি গন্ধ আর রসগোল্লার মতো করে জল জল এক রসে ডোবা পাতলা পাতলা বেলের টুকরো। প্রায় টুকরোতেই এমনকি বীজও রয়েছে, ভাল করে ছাড়ানোই হয়নি। সেই একবারই। দ্বিতীয়বার আর কেনার বা খাওয়ার সাধ হয়নি। আজকাল শহরতলির মিষ্টির দোকানগুলিতে দেখি বটে কিন্তু সাহস হয় না আর। বেলের ঔষধি হিসাবে অনেক গুণ আছে বলে জানি সেই ছোটবেলা থেকেই। পিত্তনাশক পাকা বেলের সরবত তো সবাই জানেন। তবে চৈত্রের গরমে এখন বছরে দু-চারবারের বেশি খাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু কাঁচা বেলের মত একটা আঠালো কষাটে জিনিসকে জব্দ করে মোরব্বায় রূপান্তর শুধু স্বাস্থ্যের কারণে হতে পারে না। রসনা যে অধিক গুরুত্ত্বপূর্ণ তা যারা সত্যিকারের মোরব্বা খেয়েছেন তারাই স্বীকার করবেন। আর তা মানলে আজকালকার দোকানের মোরব্বা স্পর্শ করাই যায় না। সে সব যেন কেবলই ঔষধি। চোখ-নাক বন্ধ করেই খেতে হবে, উপায়ন্তর যদি না থাকে।


-তিন-
কাশী কি মক্কা যাই।
পেট্‌ ফাঁপে আর ঢেকুর উঠে
যেন খেউ খেউ কেউ।।
চোখের জল চোখে মরে,
বেড়াই আমি আমোদ করে,
জ্বালায় জ্বলি তবু রসে ঢলি,
আমি হেলে দুলে চলেছি।।
পোড়া গয়না বুঝি সয়না আর,
পাঁচ আবাগীর পাঁচ নজরের ছার,
পোড়া বিধির বিষম মার,
কার ধার যেন করেছি।।

( ঝুমুর গান/ ভবানী স্বর্ণকার)



শান্তিনিকেতনে পৌষমেলায় দেখেছিলাম সিউড়ির আচার ও মোরব্বার স্টল। কলকাতা ও শহরতলির হরেক সুভাষমেলা-বিবেকানন্দ মেলায় এমনি স্টল দু-একটি থাকেই। নানা রকম সব মিষ্টি আচার ও মোরব্বা সব বড় বড় কাঁচের বৈয়ামে রাখা। এখানে মোরব্বা বলতে- আম, বেল আর চালকুমড়োর শুকনো মোরব্বা। চালকুমড়োর মোরব্বা মুখ খোলা বস্তায় রাখা, চকচকে সাদা চিনির মোড়কে বড় বড় সব মোরব্বার টুকরো। দেখে ক্ষণিক সেখানে দাঁড়ালেও খেতে ইচ্ছে করেনি। অথচ এই শুকনো মোরব্বা এক সময় ভীষণ প্রিয় ছিল আমার। তখন পাড়ায় পাড়ায় অত দোকান ছিল না আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর তো ছিলই না যাতে সবকিছুই পাওয়া যায়। সিলেটে থাকতে মোরব্বা আব্বা আনত বন্দরবাজারের বড় মিষ্টির দোকান থেকে। কিন্তু সে তো রোজদিন নয়, মাঝে সাঝে। সেই সময় স্টেডিয়ামের মাঠে মেলা বসত বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে। কোনও মেলা একমাসের, কোনও মেলা পনেরো দিনের। গোটা সিলেটের নানান জায়গা থেকে দোকানিরা নানা রকম সব হাতে বানানো পসরা নিয়ে স্টল দিতেন, স্টল আসত সিলেটের বাইরে অন্য জেলা থেকেও। সেখানে অন্য সব খাবারের সঙ্গে এই শুকনো মোরব্বাও থাকত। প্রায় প্রতিদিনই কারও না কারওর সঙ্গে মেলায় একবার তো যেতামই এবং সবার আগে গিয়ে দাঁড়াতাম মোরব্বার দোকানের সামনে। বেশ বড় দেখে এক টুকরো মোরব্বা কাগজে মুড়িয়ে নিয়ে মেলায় ঘুরতাম আর হাতের মোরব্বা ভেঙ্গে ভেঙ্গে খেতাম। ছোট্ট ছোট্ট কামড়ে সেই মোরব্বা খেতে কি যে ভাল লাগত! আহা! আমার দাদি মোরব্বা খেতে ভালবাসত বলে দেশের বাড়ি যাওয়ার সময় প্রতিবারই আব্বা নিয়ে যেত এই শুকনো মোরব্বা। বাদামি কাগজের ঠোঙায় পাতলা সুতলি দিয়ে বাঁধা মোরব্বা। দাদি সেই ঠোঙা খুলে সবার হাতে এক টুকরো করে মোরব্বা ধরিয়ে দিয়ে বাকিটা বৈয়ামে করে রেখে দিত মাঝের ঘরের কালো মেহগনি কাঠের আলমারিতে। সেই আলমারি খুললে দেখা যায় তাতে একটা তাকে শুধু নানান রকমের সব খাবার জিনিসই রাখা আছে কৌটো কৌটো করে। দাদি ঘুমিয়ে থাকলে বা কোথাও গেলে কতবার যে চুপি চুপি বালিশের তলা থেকে চাবি নিয়ে সেই আলমারি খুলে চুরি করে বিশেষ পছন্দের এই মোরব্বা খেয়েছি তার পরিমাণ হিসেব নিতে গেলে আজকের পাঠকদের মনে হবে বাংলাদেশে বুঝি শুধু চালকুমড়োই উৎপন্ন হয়।

বহু বছর আগে আগ্রায় গিয়েছিলাম তাজমহল দেখতে, সেখানে তাজমহল ছাড়া আর যা দেখেছিলাম তা এই মোরব্বা। একসঙ্গে অত মোরব্বা আর কোথাও কখনও দেখিনি। সারসার সব দোকান তাতে শোকেস ভর্তি মোরব্বা, সব ক’টা তাক ভর্তি শুধু মোরব্বারই বৈয়ামে। রাস্তায় ভ্যানে করে মোরব্বা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিক্রেতা, তাতে ভনভন করে মাছি উড়ছে শয়ে শয়ে। যখানেই সেই ভ্যান যায়, মাছিও যায় সঙ্গে। একসঙ্গে অত মাছিও অবশ্য আজ অবধি অন্য কোথাও দেখিনি। সেই মোরব্বা দেখেও আমার খেতে ইচ্ছে করেনি। অত মোরব্বা একসঙ্গে দেখে খাওয়ার ইচ্ছেটাই উবে গিয়েছিল। আমি খেতে না চাইলেও মোরব্বা কেনা হয়েছিল আগ্রা থেকে, আত্মীয়-বন্ধুদের বিলি করার জন্যে মোরব্বা কিনেছিলেন আমার সফরসঙ্গী। মিষ্টির বাক্সের মতো গোটা কতক বাক্স, যাতে ভর্তি মোরব্বা, সোনালি রঙের জরির ফিতে দিয়ে বাঁধা সেই বাক্স। পরিচিত এক ভদ্রলোকের মেয়ের শ্বশুরবাড়ি আগ্রায়, সেখানে নেমনতন্ন খেতে গিয়ে উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম এক বাক্স মোরব্বা। তাঁদের আবার মোরব্বারই ব্যবসা! সোনালি জরির ফিতে বাঁধা প্যাকেটটি হাতে দিয়ে বলেছিলেন, এখানকার মোরব্বা খুব ভাল, খেও। কে জানে কেন সেই ‘ভাল’ মোরব্বাও আমার খেতে ইচ্ছে হয়নি।

বাড়িতে যে চালকুমড়োর মোরব্বা হয়, তাতে খুব অল্প হলেও রস থাকে আর রঙও হয় সোনালি কিন্তু বাজারের এই মোরব্বা অদ্ভুত সাদা আর একদম শুকনো, দেখে মনে হয় যেন চিনির পাউডার মাখানো। আম্মা বলে, ফিটকিরি দিয়ে অমন সাদা করে মোরব্বার রং। আমরা ফিটকিরি দিই না। যদিও শুকনো মোরব্বা আমাদের বাড়িতে হয়, যে মোরব্বাটা শুকনো করে, বেশিদিন রেখে খাওয়ার জন্যে বানানো হয়, সেই মোরব্বার চালকুমড়োকে চুন ভেজানো জলে ভিজিয়ে রাখা হয়, যাতে মোরব্বা শক্ত হয়, রসের মোরব্বার মতো নেতিয়ে না যায়। যে কোনও ছুটিতে দেশের বাড়িতে যাওয়া মানে বরাবরই এক উৎসব সেইখানে বিয়ে-সুন্নত বা ঈদ না থাকলেও। যে ক’দিন থাকা, তার প্রতিদিনই সবাই মিলে কোনও না কোনও একটা কিছু বিশেষ খাবার বানানোটা আসলে সেই উৎসবেরই অংশ।

বিশেষ করে যখনই চাচি কিছু একটা রান্না বা বানানোর আয়োজন করে, সেদিন আমরা, ছোটরা আর সব জরুরি কাজ মানে সকল প্রকার দুষ্টুমি বাদ দিয়ে চাচির পিছন পিছনই ঘুরঘুর করি। চাচির বানানো মানে রোজকার রান্না থেকে দূরে অন্য কোনও পদ। চাচি কিছু একটা আনতে বললে ছুট্টে গিয়ে সেটা নিয়ে আসি, সদা প্রস্তুত একটা ভাব নিয়ে। যেন আমাদের সাহায্য ছাড়া চাচি কিছু করতেই পারবে না!


-চার-

গেদির দামান বাবে ক্যা
গলা ফুলায়া থাকে ক্যা?
অসগোল্লার ঠিলা দিলাম
মৈ মাছির মাচাং দিলাম
পাইড়া হোয়ার শীত্‌লা দিলাম
হিতান দেওয়ার বালিশ দিলাম
মেবু দিলাম জামির দিলাম
নাউ কুমুর ব্যাবাক দিলাম
দামান বাবে ক্যা?
অ্যাবা গেদিক দ্যাহে নাই
এগ্‌না চোহেত্‌ পড়ে নাই

(মেয়েলী গীত। বাংলা একাডেমী ফোকলোর সংকলনঃ ৭০)



শীত শেষ হয়ে এলে যখন রান্নাঘর, গোয়ালঘরের চাল, উঠোনের কোণ, বাড়ির পিছদুয়ারের ছোট-বড় সব বাঁশের মাচা, পুকুর পাড়ের ঢাল থেকে লাউ-শিমের গাছ নামানোর সময় হয়ে যায় তখন বীজ বপনের সময় আসে চালকুমড়ো, মিষ্টি কুমড়ো, ঝিঙ্গে-উচ্ছে-করলার। ছোট্ট ছোট্ট পাতা নিয়ে যখন মাটি ফুঁড়ে গাছ বেরোয়, একটু একটু করে বড় হয়ে পাতা- লতানে ডগা, তখন যে গাছগুলো ঘরের চালে উঠবে তাদের বাঁশের কঞ্চির সঙ্গে জড়িয়ে দেন অভিজ্ঞ গৃহীনি। লাউ-মিষ্টি কুমড়োর পাতা-ডগা যেমন শুটকির ভর্তা বা শাক-শুটকি রেঁধে খাওয়া হয়, চাল কুমড়োর পাতা বা ডগা খাওয়া হয় না, বোধ হয় খড়খড়ে, সুক্ষ-ছোট কাঁটাযুক্ত লতা-পাতা হয় বলে। চালের একদিকে থাকে চালকুমড়ো তো অন্যদিকে মিষ্টি কুমড়ো। মিষ্টিকুমড়োর ডগা-পাতা মাঝে-মধ্যেই খাওয়ার জন্যে কেটে নেওয়া হয় বলে চালের উপরে একটু ফাঁকা ফাঁকা দেখায় আর অন্যদিকে ছড়ানো সব পাতা আর লতানে ডগা নিয়ে গোটা চাল জুড়ে বিছিয়ে থাকে চালকুমড়োর গাছ। খুব তাড়াতাড়িই ফুল আসে গাছে। গাঢ় সবুজ লতা-পাতার উপর মুখ উজিয়ে থাকে একদিকের চালে হলুদ ফুল তো অন্যদিকে সাদা। রান্না-গোয়ালঘরের চালে, পিছন দুয়ারের মাচায়, পুকুরের ঢালে বাতাসে দোল খায় সবুজ পাতা, সাদা আর হলুদ ফুল। আহ্লাদে কুঁড়ি মেলে ছোট্ট ছোট্ট কুমড়ো।

চালের উপর যেন রঙের মেলা। একদিকে কচি সবুজ রঙের সরু-লম্বাটে কচি গোঁফ-দাড়ির মত রূপালি রোয়াতে ঢাকা হালকা সবুজের চালকুমড়ো তো অন্যদিকে কালচে সবুজের উপর হলুদ ছিটে গোল গোল মিষ্টিকুমড়ো। কোথাও এক মানুষ সমান মাচায় ঝোলে সব কুমড়ো, মাচার উপর বিছিয়ে থাকে কুমড়োর গাছ, লকলক করে সতেজ তরুণ লতানে ডগা। কোথাও নতুন ফুল, তো কোথাও ল্যাজায় শুকনো ফুল নিয়ে ঝুলছে কচি কুমড়ো। কিছু কুমড়োর ল্যাজার দিকটা সরু হয়ে যায়, সমানভাবে বাড়ে না, কোনওটার আবার মাথার দিকটা সরু। বেছে বেছে ওইরকম বেয়াড়া চালকুমড়োগুলোকে নামিয়ে নেওয়া হয় কচি অবস্থাতেই। সরু সরু ঝিরি ঝিরি কাটা ভাজা সঙ্গে কুচো চিংড়ি। বা ফালি ফালি কেটে নিয়ে শুটকি দিয়ে রান্না। কেউ কেউ আবার একটু বড় বড় টুকরোয় কেটে নিয়ে চিংড়িমাছ দিয়ে গা মাখা মাখা ঝোল করেন। সেই স্বাদ স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল।

নানাবিধ শাক নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল,
মরিচের ঝালে ছেড়াবড়ি বড়া ঘোল।
দুগ্ধতুম্বী, দুগ্ধ কুষ্মাণ্ড, বেশারী নাফরা,
মোচা ঘণ্ট, মোচা ভাজা, বিবিধ শাকেরা।
ফুল বড়ি ফল মূলে বিবিধ প্রকার,
বৃদ্ধ কুষ্মাণ্ড বড়ির ব্যঞ্জন অপার।

( চৈতন্যচরিতামৃত/ কৃষ্ণদাস কবিরাজ)



সঠিক স্বাস্থ্যবান চালকুমড়োরা ঘরের চালে-মাচাতেই থাকে, বড় হয় বড় নিশ্চিন্তে। শুধু যে সৌখিন মোরব্বা খাওয়ার জন্যে গাছে চালকুমড়ো রেখে দেওয়া হয়, তা নয়। অগ্রিম চলে আসা বর্ষায় যখন বাড়ি থেকে বেরুনো যায় না, বাজার হাট করা যায় না, তখন পাকা-পুরুষ্টু চালকুমড়ো ঘরের চাল থেকে নামানো হয়, সরু সরু ফালিতে কেটে ঝাল ঝাল করে শুটকি দিয়ে রান্না হয়, বাড়ির লোকের-মুনিষের খাওয়া নিয়ে চিন্তা থাকে না গৃহস্থের। আমার চাচি বলে, এই কুমড়ো গাছেদের আয়ু নাকি নব্বই দিন। এর মধ্যেই বীজ থেকে গাছ হয়, গাছ বড় হয়ে ফুল-ফল হয়, সেই ফল পাকা-পোক্ত হয়ে কম-বেশি নব্বই দিনেই গাছ নাকি আপনা থেকেই শুকিয়েও যায়! পুরুষ্টু চালকুমড়োরা তখনও গাছেই থাকে, শুকিয়ে আসা গাছ থেকে রস টেনে নিয়ে ভেতরে শক্ত হয় বীজ, বাইরে চালকুমড়োর খোসা মোটা আর শক্ত হয়। গাত্রবর্ণে সবুজ কেটে গিয়ে সাদাটে রঙ ধরে চালকুমড়ো, গায়ের সরু-সুক্ষ রোম মরে যায়। যত দিন যায়, ফ্যাকাশে সাদা রঙ বাড়তে থাকে, সবুজ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না চালকুমড়োর গায়ে। উঠোনে দাঁড়িয়ে চালের দিকে তাকালে চাল ছাপানো সবুজ আর দেখা যায় না, শুকিয়ে আসা কিছু লতা আর চালে বিছিয়ে থাকা পাশবালিশের মত বিশাল বিশাল সব গায়ে খড়ি ওঠা কুমড়ো দেখা যায় এদিক সেদিক ছড়িয়ে। টালি বা খড়ের চাল জুড়ে যেন আলপনা এঁকে দিয়েছে কেউ।


শুকিয়ে আসা গাছ থেকে পাকা চালকুমড়ো যখন নামানো হয় তখন আজ লোবানি তো কাল মোরব্বা প্রায় দিনই হয়। বিশেষ করে সে যদি স্কুল ছুটির সময় হয়। সকাল সকাল চাচি বড় একটা খড়ি ওঠা পাকা চালকুমড়ো নিয়ে বসে ভারি-মোটা করে সেই কুমড়োর খোসা ছাড়ায়। ফেলা যাবে না এই খোসা, শিলে বেটে হালুয়া হবে তার। বড় বড় টুকরোয় কেটে নিয়ে গামলায় রাখতেই আমাদের কাজ শুরু। বটি দিয়ে চালকুমড়োর বুক কেটে ফেলে দিয়েছে চাচি কিন্তু সব বিচি যায় না বুকের সঙ্গে, কিছু তাও লেগে থাকে কুমড়োর গায়ে। আমরা সেই লেগে থাকা বিচিগুলোকে খুঁটে খুঁটে বার করি। একগোছা কাঁটাচামচ নিয়েই চাচি বসেছিল, এবার থালায় করে টুকরো কুমড়ো নিয়ে সেটাকে কাঁটা দেওয়ার পালা। এমন ভাবে কাঁটা দেওয়া হয় যাতে কুমড়োর গায়ে এতটুকু জায়গাও ফাঁকা না থাকে, তাহলে মোরব্বা ভাল হবে না, মিষ্টি ঢুকবে না তাতে, ফিকে লাগবে খেতে। উল্টে-পাল্টে চারপাশ থেকে কাঁটা দেওয়া হয়ে গেলে সেই টুকরোটা চিপে রস ফেলে দেয় চাচি। মোরব্বা বসালে যাতে জল না ছাড়ে কুমড়ো, তাই এই ব্যবস্থা। সমস্ত টুকরো কাঁটা দেওয়া হয়ে গেলে আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রাখা চুনের হাড়ি নিয়ে এসে চুন ভেজানো জলে আরও জল মিশিয়ে সেই জলে চালকুমড়োর টুকরোগুলোকে ভিজিয়ে দিয়ে আপাতত কাজ শেষ, বিকেল অবধি চুনজলে থাকবে চালকুমড়ো।


দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে চাচির খানিক বিশ্রাম, আমাদের তখন পাড়া বেড়ানোর সময়। কার গাছে মিষ্টি পেয়ারা, কার বাড়িতে উঠোনে আচার শুকোচ্ছে সে’সব দেখে, খানিকটা করে খেয়ে, কিছু পেয়ারা কোচড়ে করে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরি ততক্ষণে চাচিরও বিশ্রাম সারা হয়ে মোরব্বার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। সারাদিন চুনজলে থেকে চালকুমড়োর টুকরোগুলো শক্ত হয়ে গিয়েছে, কাঁটা খেয়ে যে ন্যাতানো ভাবটা ছিল তা চলে গিয়ে নিজের আকারে ফিরে এসেছে টুকরোগুলো। চুনজল ফেলে দিয়ে পরিষ্কার জলে ভাল করে ধুয়ে নিয়ে একটা একটা করে টুকরো নিয়ে চিপে জল ঝরিয়ে হাড়িতে দেয় চাচি। এই রান্নায় কোনও বিশেষ ব্যপার নেই। বড়, ছড়ানো হাড়িতে কুমড়োর টুকরোগুলো দিয়ে ইচ্ছেমতন চিনি ঢেলে ধিমে আঁচে জ্বাল দেওয়া। যতই চিপে জল ঝরানো হোক, উনুনে বসালে খানিকটা জল তবু ছাড়ে চালকুমড়ো, সেই জল আর চিনির রসে জ্বাল হবে মোরব্বা। যতক্ষণ চিনির সিরা পাতলা থাকে, নেড়ে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই, সিরা ঘন হয়ে এলে তখন একটু নেড়ে দিতে হয়, যাতে ধরে না যায়। বাষ্পের সঙ্গে মিষ্টি গন্ধ ওঠে, বাতসে ভেসে বেড়ায় মোরব্বা মোরব্বা গন্ধ।


-পাঁচ-

চুয়া চুন্নে বাঁট্যারে লীলা বাসর কোটরা ভরে।
আমলা মতি বাঁট্যারে লীলা আবের কোটরা ভরে।।
তোলা পানিতে নায়ারে বাপজান মাথা হয়েছে আটা।

( মহীপালের গান/ পূর্ববঙ্গ গীতিকা)



সল্টলেকের সরস মেলায় গিয়ে গেটের পাশে এক অবাঙ্গালি পানওয়ালার টেবিলে দাঁড়িয়ে মিষ্টি পানের মশলার খোঁজ করার সময় রকমারি সব টক-মিষ্টি চুরন আর পানের মশলার মধ্যে চোখে পড়ল একটা জিনিস, আমলকির মোরব্বা! কতকাল পর!... একটু খেয়ে দেখব কিনা জিজ্ঞেস করতে দোকানি সাগ্রহেই কয়েক টুকরো হাতে তুলে দিলেন যার থেকে দুটো টুকরো নিয়ে মুখে দিতেই যেন মন ভরে গেল। ছোট ছোট প্যাকেটে করে দোকানি বিক্রি করছিলেন এই আমলকির মোরব্বা, উনি যার নাম বলছিলেন ‘সুখা আওলা’। কাঁচা আমলকি খেতে একটু কষ্‌টি লাগত বলে কখনই আমার খুব একটা পছন্দের ছিল না। কিন্তু ওই কষ কষ আমলকি দুটো চিবিয়ে খেয়ে নেওয়ার পরে এক গেলাস জল খেলে অদ্ভুত মিষ্টি লাগত জলটা খেতে! শুধুমাত্র জলের ওই স্বাদ পাওয়ার জন্যেই আমি আমলকি খেতাম। আর এ তো আমলকির মিষ্টশাক। কষ ভাব বিলকুল গায়েব। বিক্রেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না। হাফ কেজি করে দু’প্যাকেট সেই সুখা আওলা বাড়ি নিয়ে এলেও পরদিনই বাজার থেকে এক কিলো তাজা আমলকি চলে আসে মোরব্বা বানানোর জন্যে! নানান ঝামেলায় থাকার জন্যে সেই আমলকির আর মোরব্বা হয়ে ওঠা হয় না। কিন্তু খোঁজ চলতেই থাকে। কিছুদিন পরে নিউ মার্কেটের ড্রাই ফ্রুটের দোকানগুলিতে খোঁজ করে একটা দোকানে পেয়েও গেছিলাম আমলকির মোরব্বা।

কলকাতায় আসার পর প্রথমবার কাঁচা আমলকি দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম, এত বড় বড় আমলকি! আমাদের ওদিকে, কুমিল্লা, সিলেট অঞ্চলে আমলকি এত বড় হয় না। ছোট্ট ছোট্ট দেখতে, বড়জোর একটা কুলের সমান হয় আমলকি, আমরা যাকে বলি ‘আয়লা’। আমাদের কোনও আমলকি গাছ ছিল না। আব্বা, কাকা বাজার থেকে কিনে আনত আবার গ্রামেরই এক আত্মীয় বাড়ি থেকে কখনও সখনও বেতের ঝুড়ি করে তাদের গাছের এক ঝুড়ি আমলকি আসত। দাদি নিজেই বারান্দায় বসে ছোট্ট ছোট্ট সেই আমলকি কেটে দিত চার ভাগ করে, কাটার সময়েই বিচি ফেলে দিত। চুনজলে আমলকি সারাদিন ভিজিয়ে রেখে বিকেল হলে দাদি নিজেই আমলকি নিয়ে রান্নাঘরে চলে যেত। খুব কম হলেও কিছু কিছু জিনিস আমার দাদি নিজের হাতে রান্না করত, যেমন কোরবানির ঈদে বড় হাড়িতে করে ভুনা গোশ্‌ত, যেমন শবে বরাতের দিনে চালের গুড়োর হালুয়া। তেমনই আমলকির মোরব্বা। যা অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে কিছুতেই নিশ্চিন্ত থাকা যায় না।

চিনি দিয়ে আমলকি জ্বালে বসিয়ে দিলেই চাচি বলত, ‘যাইন গিয়া আম্মা, আমি দেইখ্যা নামাইয়া নিমু নে।’ চাচি বসে আমলকি জ্বাল দিত। একটা টক-মিষ্টি গন্ধ ছাড়ে আমলকি, চিনির রস গাঢ় হয়ে এলেও চাচি হাড়ি নামায় না। ধিমে আঁচে জ্বাল হতে থাকে, বারে বারেই চাচি মোরব্বাকে নেড়ে দেয় এবং নাড়তেই থাকে যেন ধরে না যায়। লালচে হয়ে আসে চিনি, ফিকে সবুজ রঙ চলে গিয়ে আমলকিও একটা লালচে রঙ ধরেছে। এক সময় চিনির সিরা এতটাই ঘন হয়ে যায় আর নাড়া যায় না, পোড়া পোড়া গন্ধ আসে। চাচি চট-জলদি হাড়ি নামিয়ে হাতায় করে সবটুকু মোরব্বা বার করে ছড়িয়ে বড় থালায়। হাড়ি থেকে বের করে নেওয়ার পরেও হাতা দিয়ে বারে বারেই নেড়ে দেয়, ঘন সিরা যাতে সব জায়গায় সমানভাবে লাগে। মোরব্বার থালা তুলে নিয়ে খাবার ঘরে টেবিলের উপর রাখে চাচি। বাজার থেকে কেনা আমলকির মোরব্বার মত এর রঙ কখনই ফ্যাকাশে হতো না। আমলকির এই মোরব্বা এখন সকাল অবধি এভাবেই থাকে হাত-পা গুটিয়ে, ঠাণ্ডা হয়ে জমাট বাঁধে চিনি, দেখতে ঠিক যেন এক থালি মিছরি। জমাট বাঁধা মোরব্বা টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে দিয়ে হাতে করেএকটার গা থেকে আর একটাকে ছাড়িয়ে দেয় চাচি, আলগা, ঝুরঝুরে সব চিনি ঝেড়ে ফেলে দেয় আর তারপর আগে থেকে ধুয়ে-মুছে শুকিয়ে রাখা কাঁচের বৈয়ামে করে দিয়ে আসে দাদির টেবিলে। যতদিন বৈয়ামে আমলকির এই মোরব্বা থাকে, প্রায় দিনই দুপুরে, রাত্রে খাওয়ার পরে বৈয়াম খুলে এক মুঠো মোরব্বা বার করে দাদি দুটো-চারটে করে সবাইকে দেবে, মিছরির দানার মতো দেখতে এই মিষ্টি আমলকি, হালকা কষ কষ, যা খেয়ে এক গেলাস জল খেলে সেই জল লাগে অদ্ভুত মিষ্টি!



-ছয়-

এই তো বোশেখ মাস
আমে আইছে আটি
ছেমড় ছেমড়িরা খায় যে
কুচি করে কাটি।
পালানে কুমড়া ধরে
মরিচ পাহে গাছে
ডগরায় উলোক দেয়
ডিম ভরা কৈ মাছে।

( নাইয়ারির বারোমেসে/ ফরিদপুর অঞ্চল/ ফোকলোর সংগ্রহমালা ৩৬/ বাংলা একাডেমী, ঢাকা)



গাছে যখন আম, তখন প্রায় দিনই ঝড় ওঠে, কালবৈশাখী। উষ্ণায়নের জেরে এখনকার মতো চৈত্র-বৈশাখ মাস থেকে তখনও কালবৈশাখী গায়েব হয়ে যায়নি। প্রায় দিনই দুপুরের পরে আকাশের কোণটা কালো হয়ে যায় মেঘে। সাঁই সাঁই শব্দে তুমুল হাওয়া, আর উথালি-পাথালি ঝড়। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে যে হাওয়া শুরু হয়, তাতেই গাছ থেকে আম পড়া শুরু হয়ে যায়। এদিকে তুমুল বাতাস, যেন মানুষ উড়িয়ে নিয়ে যাবে, মেঘ ডাকছে, মাঝে মধ্যেই আকাশ চেরা বিদ্যুতের ঝলকানি কিন্তু সে’সব পরোয়া না করে আম কুড়োতে দৌঁড়ায় সবাই। সবার আগে গাছতলায় পৌঁছায় বাড়ির কাজের লোকেরা, বাড়ির এবং পাড়ার সব ছেলে-মেয়েরা। ঝড়-বৃষ্টিকে খুব ভয় পেত দাদি, তাই যতক্ষণ ঝড় হচ্ছে, ততক্ষণ ঘর ছেড়ে বেরুতো না, জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আম কুড়ানো দেখত, বড়জোর বাংলাঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াত। মজিদভাই ধান তোলার খলই নিয়ে গিয়ে তাতে রাখতো কুড়ানো আম। ঝড় যদি মাঝরাতে হয় তখনও আম কুড়ানোর লোকের অভাব হতো না। কেউ হ্যারিকেন তো কেউ টর্চ নিয়ে গভীর রাতেও আম কুড়োতে চলে আসত সবাই, সকাল হলে যে গাছতলায় একটা আমও আর থাকবে না।

আম কুড়্যাইতে যাবি কিন্যা
মোল্লের বাগানে
ঝড় ঝাঁকাসে ডাল ভাঙ্গ্যাছে
বাইড়্যালের সামনে।

(ফার্স গান)


আচার-আমসি-মোরব্বা ইত্যাদি করার জন্যে কেউ গাছ থেকে আম পাড়ে না। দরকারও পড়ে না অবশ্য, ঝড়-বৃষ্টিতেই তো কত আম পড়ে যায়। চোর এবং হাওয়া-পানি সামলে যে সমস্ত আম গাছে থেকে যেত, তাদেরকে রাখা হতো পাকার জন্যে। ঝড়-বৃষ্টিতে কুড়োনো প্রায় সমস্ত আমেরই গা ফেটে যায় মাটিতে পড়ার ফলে, যেগুলো একেবারে থেঁতলে যায়, সেগুলো দিয়ে আমসি বানানো হয়, আধ-ফাটা বা একটু থেঁতলানোগুলো দিয়ে আচার আর যে আমগুলো সবচাইতে কম ফাটা বা থেঁতলানো সেগুলো দিয়ে মোরব্বা।

বারান্দায় পিড়ি পেতে বসে গামলাভর্তি আমের খোসা ছাড়ানো হয় দুপুরের খাওয়া-দাওয়া মিটে গেলে। বাতাসে কাঁচা আমের টক টক গন্ধ। আঁটি সুদ্ধু দু’ফাঁক করে আঁটির ভেতরের নরম সাদা শাস ফেলে দেয় চাচি। গামলাভর্তি জলে কাটা আম ধুয়ে নিয়ে তাকে কাঁটা দেওয়া হয়। কাঁটাচামচ দিয়ে সব আম ফুটো ফুটো করে দিলে আমের সব টক টুকু বেরিয়ে আসে। বেশিক্ষণ সময় লাগে না কাঁটা দিতে, সদ্য গাছ থেকে পড়া টাটকা আমে হাত চলে খুব তাড়াতাড়ি। চুনের হাড়ি নিয়ে এসে চুনের জলে আরও জল মিশিয়ে কাঁটা দেওয়া আমকে ভিজিয়ে দেয় চাচি। যদিও বেশিক্ষণ এই চুনজলে আমকে রাখা হবে না, বড়জোর ঘন্টাখানেক। একটু শক্তভাব এলেই চুনজল থেকে আম তুলে পরিষ্কার জলে ধুয়ে আমের গামলা নিয়ে রান্নাঘরে যায় চাচি। বড় ভাতের হাড়ি ভর্তি করে জল বসায় উনুনে, আমকে ভাপানো হবে এই হাড়িতে, টক বের করার জন্যে। চড়া জ্বালে জল ফুটে এলে আস্তে আস্তে করে সমস্ত আমের টুকরো দিয়ে দেয় ফুটন্ত জলে। টক গন্ধে আমাদের সবার জিভে বাঁধ না মানা জল! মিনিট দুই-তিন ফোটার পরেই উনুনের জ্বাল টেনে নিয়ে হাড়ি নামায় চাচি। ঝাঁঝরি হাতায় করে সমস্ত আমের টুকরো জল থেকে বের করে পরিষ্কার বেতের ঝুড়িতে রাখে চাচি। চুনজলে ভেজানোর ফলে জলে ভাপানো আমের টুকরোগুলো একই রকম দেখতে থাকে, একটুও ভেঙ্গে বা গলে যায় না।

দু’মুখো চুলোয় আগুন দিয়ে ছড়ানো দুটো হাড়ি বসায় উনুনে। দু’টো হাড়িতেই আমের দ্বিগুন পরিমাণ চিনি দিয়ে সিরা বানায়। রান্নাঘরের ভিতরে ও বাইরে তখন ছোটোদের ভীড়। ধিমে আঁচে জ্বাল হয় চিনির সিরা। সিরা ঘন হয়ে এলে একে একে দু’টো হাড়িতেই সমান ভাগে ভাগ করে আম ছেড়ে দেয় চাচি। টক-মিষ্টি গন্ধে ভারি হয়ে আসে বাতাস। অধীর আগ্রহে আমরা সব অপেক্ষা করি, দাদিও বারে বারেই রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যায়, মোরব্বা কদ্দূর হলো। গরম জলে দেওয়ার ফলে একটা ফ্যাকাশে রঙ ধরেছিল আম, চিনির রসে দেওয়ার পরে সেই ফ্যাকাশে ভাব কেটে সোনালি রঙ ধরে। টক আম চিনির রসে পড়ার ফলে চিনির রসকে দেখায় আরও বেশি স্বচ্ছ। খুব বেশিক্ষণ জ্বাল দিতে হয় না আমকে, গাঢ় সোনালি রঙের ঘন রস কাঁটা দেওয়া আমে ঢুকে গিয়ে টই-টুম্বুর দেখায় আমের টুকরোগুলোকে। রস ঘন হয়ে আমের গায়ে মাখা মাখা হয়ে এলেই একে একে হাড়ি নামায় চাচি।

বাতাসে কোনও টক গন্ধ নেই আর, অদ্ভুত এক মিষ্টি গন্ধ গোটা বাড়ি জুড়ে। কাজের বুবু ভিজে ন্যাতা দিয়ে ঘষে ঘষে কালি তোলে মোরব্বার হাড়ি থেকে, ধানের তুষ রান্নাঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে দিয়ে সেই তুষের উপর হাড়ি চেপে ধরে বার কয়েক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলগা কালি ছাড়ায় হাড়ির তলা থেকে তারপর মোরব্বার হাড়ি চলে যায় খাবার ঘরে, চৌকির উপর। হ্যাঁ। এই মোরব্বাও ঠাণ্ডা খেতে হয়। কিন্তু আমাদের যে তর সয় না! কাঁচের তশ্‌তরি যে যার হাতে নিয়ে সবাই মোরব্বার হাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। এই দাঁড়িয়ে থাকাটা আজীবনের, লিখতে লিখতে স্বাদ-গন্ধ ভেসে আসে বটে কিন্তু কিছুতেই ছুঁতে পারি না ঠিকঠাক। কয়েক বছর আগে কলকাতার মিলনমেলার হস্তশিল্প মেলায় এক মোরব্বা ও আচারের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আমের মোরব্বা কিনেছিলাম খেয়ে দেখব বলে। সেই মোরব্বায় স্বাদ বলতে শুধু চিনির, আমের ফালির আকার দেখতে না পেলে ওটাকে পেঁপে বলে ভুল করলেও খুব একটা ভুল হতো না। স্বাদ-গন্ধহীন চিনির রসে ডোবানো সেই মোরব্বা খানিকটা খেয়ে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।



-সাত-

সাধনার সাধ মিটেছে
মধ্যে কারে রাস
বিচারিয়া বল কর
আদি অন্তে আস

( এক বাউল সাধকের হেঁয়ালি/ শক্তিনাথ ঝা/ লোকশ্রুতি/ আষাঢ় ১৪২০)



চালকুমড়ো, বেল, আম ইত্যাদির মোরব্বা প্রায় সবার ঘরেই হয়, এছাড়াও মোরব্বা হয় আনরসের। এমনকি আদারও। ঠাণ্ডা লাগা বা সর্দি-কাশিতে ঔষধি হিসেবে কাজ করে চিনির গুড়োয় মাখামাখি হয়ে থাকা ফালি ফালি আদা– আদার মোরব্বা। আদার স্বাদ-ঝাঁজ, ঝালভাব সবই বর্তমান থাকে তাতে। শীতকাতুরে দাদার জন্যে আব্বা খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসত এই আদার মোরব্বা। টেবিলে রাখা ছোট কাঁচের বৈয়াম থেকে সকাল-বিকেল দু’ফালি বের করে দাদা নিজে খেত, দু’ফালি করে দাদিকে দিত। সামনে থাকলে আমার দিকেও এগিয়ে দিত, বলত, ‘খাইয়া লও সামুবিবি, ওষুধ।’ তো সেই ওষুধ আমিও খেয়েছি। দিব্যি খেতে। বর্তমান ঢাকায় বাসে-ট্রেনে টক-মিষ্টি লজেন্সের সঙ্গে ছোট ছোট প্যাকেটে করে এই আদার মোরব্বা বিক্রি হতে দেখে মনে পড়ে যায় কত পুরানো দিনের কথা। কাজের শেষে রাত করে বাড়ি ফিরত আব্বা। আমরা ভাই-বোনেরা আধো ঘুমে আবছা দেখতে পেতাম আব্বা ব্যাগ থেকে বার করছে কাগজের ঠোঙায় সুতলি দিয়ে বাঁধা আদার মোরব্বা।

দৈবের নির্বন্ধ কথা শুন মন দিয়া।
পুবল্যা ব্যাপারী যায় সাত ডিঙ্গা বাইয়া।।
এক ডিঙ্গায় ধান চাউল আর ডিঙ্গায় দর।
মরিচ লবণ আদা লইয়াছে বিস্তর।।

( মইষাল বন্ধু – দ্বিতীয় পালা/ পূর্ববঙ্গ গীতিকা)


আমাদের সিলেটে সব থেকে বিশেষত্ব ছিল আনারসের মোরব্বায়। সে ছিল আনারসের সংসার। আজও আনারস বললেই সিলেটের কথা মনে পড়ে। গোটা বর্ষাকাল জুড়ে সিলেটে যেন আনারসের মেলা। স্টেশন চত্তরে, বাসস্ট্যান্ডের ভিতরে ও বাইরে, রাস্তার ধারে ধারে প্যাচপ্যাচে জল-কাদায় বেতের চাটাইয়ের উপর বস্তা পেতে বসে আছেন বিক্রেতারা, সামনে স্তুপিকৃত আনারস। হালিতে বিক্রি হয় সেই আনারস, এক হালি মানে দু’জোড়া। কেউ দু’হালি কেনেন তো কেউ তিন। এক হাত সমান লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে আনারস, দড়ির এ’মাথায় একটা, ও’মাথায় আর একটা। আনারসের মরসুমে প্রায় সবার হাতে ঝোলে এই দড়িতে বাঁধা আনারস, দড়ির মাঝখানটায় ধরে আনারস ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরেন প্রায় প্রত্যেকে। প্রায় দিনই অফিস-ফেরত আব্বার হাতেও থাকত দু’হালি-তিন হালি করে দড়িতে ঝোলানো আনারস। ছোট ছোট দেখতে সেই আনারস, কলকাতার নিউ মার্কেট কিংবা বড়বাজারের ফলের আড়তে যেমন বিশাল বিশাল আনারস দেখা যায়, আকারে তার অর্ধেক। মিষ্টি আর রসালো সেই আনারস। দুই একদিন অন্তর অন্তর সেই আনারস কেটে খাওয়ার সঙ্গে প্রায় সবার বাড়িতেই হয় আনারসের চাটনি, জেলি আর মোরব্বা। সারা মরশুম জুড়ে।

সিলেটে, মাথায় ঝুড়িতে করে মরসুমি ফল ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত বিক্রেতারা। ঝুড়িভর্তি ছোট ছোট দেখতে, কাটাওয়ালা ল্যাজা সমেত সব কাঁচা-পাকা আনারস নিয়ে সকাল-বিকেল কিংবা দুপুরে তাঁদের হাঁক শোনা যেত, ‘খাইবাইননি আনারস, খাইয়া দেখইন, এখবার খাইলে আবার খাইবাইন।’ এবং যার দরজাতেই ঝুড়ি নামিয়ে বসত, দুই-তিন হালি করে আনারস বিক্রি করে দিয়ে যেত। এক একজনে গোটা একটা আনারস অনায়াসে খেয়া ফেলতে পারত এমনই মিষ্টি সেই আনারস। দাদি বলত– সকালবেলায় নাকি খালি পেটে আনারস খেতে হয়, পেটের সব কৃমি মরে যায় তাতে। সিলেটে যতদিন ছিলাম, সকালবেলায় নাশতার টেবিলে বড় একথালা আনারস তাই গোটা মরশুম ধরেই থাকত। খোসা ছাড়ানোর পরেও আনারসের গায়ে যে দানা দানা দেখা যায়, আমরা সেগুলোকে বলতাম আনারসের চোখ।

গৌর আমার কাঁচা সুনা
ওরূপে যাইগো মরি বলিহারি, কী দিয়ে করি প্রাণ সান্ত্বনা।।
গিয়েছিলাম সুরধুনি হেরিয়াছি শ্যামগুণমণি
আর নয়নে দেয় গো দেখা, আঁখির ঠারে প্রাণ বাঁচে না।।

( রাধারমণের গান/ সম্পা- তপন বাগচী/ বর্ণায়ন, ঢাকা-২০০৯)


সেই চোখ নাকি কৃমির মহৌষধ! খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে আরেকবার পাতলা করে খোসা ছাড়ানোর মতো করে সেই চোখগুলো কেটে নিয়ে একটু নুন ছড়িয়ে দিত আম্মা, পেটে কৃমি থাক বা না থাক ওগুলো আমাদের ভাই-বোনদের খেতে হতো এবং আমরা খুশি হয়েই খেতাম। তিন-চারটে করে আনারস নিয়ে কাটতে বসে গোল গোল চাকা চাকা করে কেটে দিত, কখনও বা লম্বালম্বি চার ফালি, টুকরোও করত না। শুধু বাইরের কেউ এলে তখন ছোট ছোট টুকরোতে কেটে বাটিতে করে কাঁটাচামচ দিয়ে দিত।

ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ধরে সিলেট গেলে রাস্তার দু’পাশে উঁচু-নিচু, ছোট-বড় টিলার ঢালে ছবির মতো বিছিয়ে রয়েছে সব আনারসের বাগান। সারি সারি সব আনারসের গাছ ঢাল বেয়ে নেমে গেছে একেবারে টিলার নিচ অবধি। সিলেটে এমনকি সমতলেও ছিল সার সার আনারসের খেত। উঁচু করে আল তুলে বানানো জমিতে সারি সারি আনারসের গাছ। সরু লম্বা পাতাগুলো ছড়িয়ে রয়েছে চক্রাকারে, মাঝখানে ফুলের মতো ফুটে রয়েছে সবুজে-হলুদে মেশানো সব আনারস। ছোট ছোট গঞ্জ বা টাউন– যেখানেই কাউকে নামানো বা ওঠানোর জন্যে বাস দাঁড়ালেই দরজা দিয়ে বিক্রেতা উঁকি দেয় দুই হাতে ডজন কয়েক করে আনারস নিয়ে। শুধুই হাতেই নয়, দড়িতে বাঁধা কয়েক হালি আনারস ঝোলে বিক্রেতার গলা থেকেও। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায় উঁচু উঁচু সব আনারসের ঢিপির পেছনে বসে রয়েছেন বিক্রেতা। কাঁচা-পাকা সবুজে-হলুদে মেশানো সব আনারস, বাড়ি এনে রেখে দিলে একদিনেই সব পেকে গাঢ় হলুদ!

তেলিয়াপাড়া চা বাগান পেরোলেই শুরু হয় এই আনারসের বাগান। মাঝে বেশ কয়েকটা বড় চায়ের বাগান পড়ে, শায়েস্তাগঞ্জ, শমশেরনগর, শ্রীমঙ্গল, মৌলভিবাজার। চায়ের বাগান যেখানে শেষ, আনারসের বাগান সেখানে শুরু। বাস চলে টিলা– আমরা যেগুলোকে পাহাড় বলি, সেই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আকা-বাঁকা রাস্তা ধরে, কোথাও টানা শুধুই চায়ের বাগান তো কোথাও আনারস। কোথাও শুধুই সবুজ, গাঢ় কালচে সবুজ চায়ের বাগান তো কোথাও সবুজ আর হলুদ আনারসের। যতদূর চোখ যায়, ছবির মতো একই দৃশ্য। রাতের দিকে ভেসে আসে আদিবাসীদের মাদলের আওয়াজ। ঝুমুর যে কেবল পুরুলিয়া মানভূমে আবদ্ধ ছিলনা তার প্রমাণ ভেসে বেড়াত বাতাসে। তারা কেবল চা-বাগানের শ্রমিক ছিল এমনটা না। আনারসের সঙ্গে তাদের ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। সারা বাংলাদেশে বিক্রি করার পর যখন প্রচুর পরিমাণে আনারস সিলেটের বাগানেই পড়ে থাকত, তখন তারাই বিভিন্ন উপায়ে সেগুলো রক্ষা করত। তখন ফল সংরক্ষণের অন্য কোনও ব্যবস্থা ছিল না। মানে কারখানা বা কোম্পানী। ঘরে ঘরে বসত আনারস কেটে জ্বাল দেওয়ার পালা। সঙ্গে গানের আসর। অত আনারস সারা বছরই মোরব্বা হয়ে ঘরে থেকে যেত। ঝুমুরগানের কথা শুনলে কেমন জানি আনারসের মোরব্বার কথা বড় মনে পড়ে।

তবু মধু কভু না সিরায়।।
ফুল ফুটল জইসে, অলিগণ উড়ি বসে,
হিতে পিতে পিয়া সমুঝায়,
তবু মধু কভু না সিরায়।।
বিনন্দ সিংহ কয় যে জন রসিক হয়
সব শেষে দরশন পায়,
তবু মধু কভু না সিরায়।।


রসিক রসেতে ভাসে ভ্রমর কমলে বসে
নিরমল রসে ডুবি যায়
তবু মধু কভু না সিরায়।।
বিনন্দ সিংহ কয় যে জন রসিক হয়
সব শেষে দরশন পায়,
তবু মধু কভু না সিরায়।।

( ঝুমুর গান/ বিনন্দ সিংহ)



-আট-

পুষ পঁহাতে মাহানন্দাতে
কুমহা পড়া ছাহ্‌নি
বাইস্যা পিঠা মিঠ্যা মিঠ্যা
কুসুম কুসুম পানি
এক বাটি খাইও বন্ধু
ও আমার পবন লায়ের মাঝি।

( খ্যামটা/ নবাবগঞ্জের আলকাপ গান/ মহবুব ইলিয়াস)




বর্ষাকাল চলে গিয়েছে, মাঠ-ঘাটের জলও শুকিয়ে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে পায়ে চলা সব পথ, খেত-খামার যা কিনা বর্ষার পানির তলায় ছিল। খালে শুধু তখনও রয়ে গিয়েছে জল, বাঁশের এক সাঁকো দিয়ে খাল পারাপারের ব্যবস্থা। ঈদ চলে গেলেও আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি ঈদের দাওয়াত তখনও চলছে। চলছে ঈদ পরবর্তী বেড়ানো, আজ ফুফুর বাড়ি তো কাল খালার বাড়ি। যেদিন কোথাও যাওয়ার থাকে না সেদিনটা কাটে সারাদিন চাচির সঙ্গে। আম্মা, চাচি বসে গল্প করে, দাদি বারান্দায় বসে পান খায়, আমি একবার পুকুরপাড়, একবার খালপাড় তো আবার চাচির কোলের কাছে বসে গল্প শুনি। তেমনি একদিন সকালের নাশতার শেষে দুপুরের রান্না-খাওয়ার আগে খানিক অবসরে আম্মা, চাচির গল্পের আসরে ঢুকে পড়ে ধনা’বু। হাতে কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা মেটে হাড়ি যাতে দু-তিন রকমের পিঠা। চাচির হাতে পিঠার হাড়ি দিয়ে ধনাবু পিড়ি টেনে নিয়ে বসে, সবার শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেয়। আম্মাকে বলে, ‘বু’জানে কইসে বিকালে পাডানবাড়িত যাইতাইন, আফনের লাইগ্যা পুরান চালকুমড়া রাখসি, ‘লুবানি’ বানামু’। চা-পান খেয়ে চটজলদি উঠে পড়ে ধনাবু, বলে যায়, ‘বেইল পড়লে রিকশা পাডাইয়া দিমু, তৈয়ার থাইকবেন।’



ধনাবু আমার মেজখালার বাড়িতে থাকে, মেজখালার সংসার ধনাবুর জিম্মায়। বরাবরের রুগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী আমার মেজখালার ছেলে-মেয়ে, ভেতরবাড়ি, বারবাড়ি থেকে নিয়ে জমি-জমারও দেখভাল ধনাবু যেন দশ হাত দিয়ে করে। মেজখালা এমনকি কোনও কিছুর তদারকিও করে না। ধনাবুর বাড়ি ছিল টাকানগর বা ট্যাহানগরে। বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে যাতে কোনওরকম অসুবিধের মধ্যে না পড়তে হয় সেজন্যে কাজের লোক সঙ্গে পাঠানোর যে রীতি ছিল, সেই রীতি মেনেই মায়েদের মামারবাড়ি ট্যাহানগর থেকে সে মেজখালার সঙ্গে এসেছিল, সেই থেকে এই শাহবাজপুরের পাঠানবাড়িতে, মেজখালার শ্বশুরবাড়িতেই ধনাবুর বাস। শ্বশুরবাড়িতে মেজখালা থিতু হয়ে যাওয়ার পরেও ধনাবু টাকানগরে– নিজের সংসারে ফিরে যায়নি বরং ধনাবুর স্বামী তার ছেলে-বউ নিয়ে শাহবাজপুরে চলে আসে। পাঠানবাড়ির সীমানার শেষপ্রান্তে, পুকুরের পার ঘেঁষে যে ছোট দু’টি দোচালা টিনের ঘর, তাতে ধনাবুর সংসার। যদিও সে শুধু রাতে ঘুমাতে যায় নিজের ঘরে। রোগা, একহারা চেহারার ধনাবুর গায়ের রঙ কালো। ধনাবুর নাকে নোলক, কানে কানবালা, হাত ভর্তি রঙিন কাঁচের চুড়ি। খালি গায়ে আটপৌরে করে পরা শাড়ির আঁচল সব সময়েই আলতো করে মাথায় তোলা থাকে।

সূর্য ওঠার আগে ধনাবু এসে রান্নাঘরের দরজা খোলে, চুলায় আগুন দেয়, একে একে সব বাসি কাজ সেরে নাশতার আয়োজন সারে।



ধনাবু বলেছে বিকেলে রিকশা আসবে, তাতে করে মেজখালার বাড়ি যেতে কিন্তু আমি তখনই ধনাবুর সঙ্গেই মেজখালার বাড়ি যেতে চাইছি, আম্মাকে বললে সুবিধে হবে নাকি দাদিকে– মাথায় সেই চিন্তা। রিকশা তো যাবে সেই কাঁচা সড়ক ধরে, তারপরে সিএন্ডবির রাস্তা ধরে সোজা দখিণগাঁওয়ে ঢুকে দাঁড়াবে গিয়ে হাইস্কুলের পাশে, মেজখালার বাড়ির সামনে। এদিকে ধনাবু যাবে গ্রামের মাঝখান দিয়ে, পূবহাটির প্রাইমারি স্কুলের পাশ দিয়ে, মিঞাবাড়ির পাশের সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাবে ধনাবু, আমি ধনাবুর সঙ্গেই যাব! আম্মাকে বলতে আম্মা কিছু বলার আগেই ধনাবু বলে ওঠে, ‘হ, চলেন আম্মা, আমার লগেই চলেন, বুজান তো বেইল্যাবেলায় আইবই’। কাউকে না বলার অবকাশ না দিয়ে আমি একছুটে ঘরের ভিতরে, জামা পালটে জুতো-চিরুণী-ফিতে হাতে নিয়ে চাচির কোলের পাশটিতে বসে পড়ি চুল বাঁধার জন্যে। মাথায় শুধু ঘুরছে লোবানি।



কান্‌টার ব্যাড্‌হার –ধলো ডাঁঠা

নামা টালের কুমড়্‌হা দুটা

ভাল ত্যাল ভৈরা দে বাঁশাতে

হাট করতে গেনু চৈলা

বাইরষ্যাই যাইবে নুন গৈলা

হাট হৈন্যা আইলে নুন ভরিস চোঙ্গাতে।

( ফার্স গান)

বিশাল বড় এক চালকুমড়ো, দেড় হাত মতো লম্বা আর আমার দুই হাতের বেড়ে আসবে না এতখানি চওড়া এক সাদা খড়ি ওঠা চালকুমড়ো মেজখালার খাওয়ার ঘরে টেবিলের উপর রাখা, সে এত বড় যেন ছোট একটা মোটা-সোটা পাশবালিশ! ধনাবু বললো রান্নাঘরের চালের উপর হয়েছে। আরও অনেক ক’টা আছে শুনলাম, খাটের তলায় উঁকি দিতেই চোখে পড়ল অত বড় না হলেও বেশ বড় বড় গোটা কতক চালকুমড়ো বস্তা পেতে তার উপর রাখা, সেগুলো আবার বস্তা দিয়ে ঢাকা দেওয়া। ঢাকা দিয়ে রাখার উদ্দেশ্য হলো, কোনও গর্ভবতী নারী যদি বাড়িতে আসে তবে তার চোখ যেন এই কুমড়োগুলোতে না পড়ে। কেউ এলে তাকে তো আর না করা যাবে না যে আমাদের বাড়িতে এখন এসো না, পাকা চালকুমড়ো রয়েছে! তাই ঢেকে রাখা। ধনাবুর বিশ্বাস, গর্ভবতী নারী যদি পাকা চালকুমড়ো দেখে ফ্যালে তবে সেই কুমড়ো নাকি আর বেশিদিন থাকে না, পচে যায়! তাই নিরাপত্তার জন্যে সব সময়েই সবাই নাকি পাকা চালকুমড়ো ঢেকে রাখে! মেজখালা বলল, চালকুমড়ো ম্যালা হয়েছিল, গোটা চালে নাকি শুধু চালকুমড়োই দেখা যেত, যার বেশি ভাগই কচি অবস্থায় খাওয়া হয়ে গিয়েছে, মাত্র এই কয়টা আছে মোরব্বা-লোবানি খাওয়ার জন্যে! তো মাত্র সেই কয়টা পাকা, খড়ি ওঠা চালকুমড়োতে দেখলাম খাটের তলায় আর জায়গা অবশিষ্ট নেই!



-নয়-

শুন অল্প বুদ্ধি কন্যা নিজেরে ভাড়াও।

সোণার থালার অন্ন থুইয়া বনের ফল খাও।।

সুবর্ণ পালঙ্ক কন্যা ফুলের বিছানা।

কুশ কন্টকে দিব দেহে তোমার হানা।।

কটু তিক্ত বনের ফলে সুখ না পাইবা।

দুরন্ত আশার আসে কান্দিয়া মরিবা।।

( আন্ধা বন্ধু/ পূর্ববঙ্গ গীতিকা)



লোবানি। জিনিসটা মোরব্বার মতোই কিন্তু মোরব্বা নয়। আজকাল আর রাঁধতে দেখি না কাউকে। পোক্ত চালকুমড়োর খোসা-বীজ ছাড়িয়ে প্রথমে সরু লম্বা লম্বা ফালিতে কেটে নিয়ে তারপর ছোট ছোট টুকরোতে কাটা হয় কুমড়োকে। বড় কাঁটাচামচ দিয়ে আলতো করে কেঁচে নিয়ে চিপে যতটা সম্ভব রস ফেলে দিয়ে বড় ছড়ানো হাড়িতে দিয়ে উপর থেকে ইচ্ছেমতন চিনি ঢেলে দিতে হয়। সঙ্গে গোটা গোটা কিছু এলাচ আর কয়েক টুকরো দারুচিনি। ধিমে আঁচে চিনি গলবে, রস ছাড়বে কুমড়ো আর সেই চিনি-কুমড়োর রসেই রান্না হবে লোবানি। একবার বসিয়ে দেওয়ার পরে আর কোনও বিশেষ মনোযোগের দরকার পড়ে না। অন্য সব কাজকর্ম করার ফাঁকে একবার করে কাঠের হাতা দিয়ে নেড়ে দেওয়া আর কাঠের জ্বাল যাতে একভাবে পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখা। চালকুমড়ো, গরম মশলার মিশ্র গন্ধ ছড়ায় বাড়িময়। কড়া নেশালু মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। প্রতিটা খাদ্যবস্তুর স্বাদ যেমন আলাদা, গন্ধও তেমনি আলাদা, এই গন্ধ বলে দেয় লোবানি হচ্ছে। হাড়িতে টগবগ টগবগ ফোটে ছোট ছোট টুকরোয় কাটা কুমড়ো। চিনির রসে সোনালি রং ধরে, যত জ্বাল হয়, রস ঘন হয়, গাঢ় হয় তার সোনালি রং। চিনির রস আর আগুনে পড়ে প্রথমে ফিকে সবজে একটা রং ধরে চালকুমড়োর টুকরোগুলি তারপর ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে আসে।



লোবানি যখন রান্না হচ্ছে ধনাবু তখন পুকুরপাড়ে, নারকেল গাছের তলায়। গাছের মাথায় ধনাবুর ছেলে। নারকেল চাই লোবানির জন্যে। পাকা বা ঝুনো নারকেলে তার চলবে না, কচি নারকেল চাই, যা কিনা এখনও ঠিকঠাক পোক্ত হয়নি। পোক্ত ডাব আর নারকেলের মাঝামাঝি এক নারকেল চাই। গাছের নিচে থেকে ধনাবু নিজেই ছেলেকে দেখিয়ে দেয় কোন কাঁদি থেকে নারকেল পাড়তে হবে। নারকেল নিয়ে রান্নাঘরে ফিরে এসে একবার লোবানি দেখে নিয়ে নারকেল কুরতে বসে। চামচ দিয়েই ছাড়িয়ে নেওয়া যায় এমন কচি নারকেল নিয়ে এসেছে ধনাবু। পিড়ি পেতে বসে কুরানি দিয়ে যত্ন করে নারকেল কোরায় ধনাবু। লোভী চোখে নারকেলের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ধনাবু একবাটি নারকেল কোরা আমাকে দিয়ে আরও নারকেল নিয়ে বসে। কি ভীষণ মিষ্টি সেই নারকেল! নিমেষে বাটি খালি হয়ে গেলেও আরও নারকেল খেতে না চেয়ে বাটি ফেরত দিয়ে আমি অপেক্ষা করি লোবানির জন্যে। ততক্ষণে উঠোন পেরিয়ে পুকুর ছাড়িয়ে আশে-পাশের ঘর-বাড়িকে তীব্র মিষ্টি গন্ধে ভরিয়ে দিয়ে হাইস্কুলের মাঠে চলে যায় লোবানির সুবাস। বারে বারেই উঠোন পেরিয়ে বারবাড়ির উঠোনে গিয়ে রাস্তার দিকে তাকাই, যেদিক দিয়ে আম্মা আসবে রিকশা করে।



গাঢ় সোনালি চিনির রসে ততোধিক সোনালি ছোট্ট ছোট্ট টুকরো চালকুমড়ো ভাসছে, তার উপর সদ্য গাছ থেকে পাড়া ধপধপে সাদা নারকেল কোরা। মালসায় করে জল নিয়ে ধনাবু ন্যাতা ভিজিয়ে ঘষে ঘষে হাড়ি মোছে, হাড়ির গায়ে যাতে একটুও কালি লেগে না থাকে। পরিস্কার ঝকঝকে হাড়ি ভর্তি লোবানি চলে যায় খাবার ঘরে, সেখানে পেতে রাখা তক্তপোশ, যাতে রান্নার পরে হাড়ি-কুড়ি এসে জায়গা পায়। উঁচু জলচৌকিতে বসে মেজখালা এতক্ষণ লোবানি রান্নার তদারকি করছিল, এখন, লোবানি যখন হাড়ি করে খাবার ঘরের চৌকিতে, সেখানে বসে তালপাখা দিয়ে লোবানির হাড়িতে বাতাস করে, লোবানি ঠাণ্ডা হওয়ার জন্যে। এই টুকরো টুকরো লোবানির কথায় মনে পড়ছে এই কলকাতায়, কোনও এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে মেন্যু কার্ডে ‘শাহী টুকরা’ নাম দেখে আমি লোবানি বা ওই জাতীয় কিছু একটা ভেবে প্রবল আগ্রহে অর্ডার করেছিলাম খাব বলে। হায় আল্লাহ! সে ছিল পাউরুটির টুকরো! ঘন দুধে জ্বাল আর চিনির রস-টসে কিছু একটা করে তারই নাম শাহী টুকরা! শাহী খানা-পিনায় পাউরুটি কি করে ঢোকে বা পাউরুটি দিয়ে কবে কোথায় শাহী রান্না হয় ? ফেরা যাক অধুনা বিলুপ্ত লোবানির কথায়। দেশ-গাঁয়ে তখন না ছিল বিজলীবাতি আর না ছিল ফ্রিজ। কিন্তু মিষ্টান্ন জাতীয় সমস্ত খাবারই ঠাণ্ডা খাওয়ার রীতি। ঠাণ্ডা করে না খেলে তার ঠিকঠাক সোয়াদ আসে না তাই আগে-ভাগে রান্না করে রেখে রাতভর রেখে দেয় সবাই। পরদিন সকালে ঠাণ্ডা সেই অমৃতসম খাদ্যবস্তুটি দেবতার ভোগের মতো করে সবাই খায়। দেওয়া হয় এমনকি পাড়া-পড়শিকেও। তো দুপুরবেলা রান্না করা সেই লোবানি আমার মেজখালা ক্রমাগত তালপাখায় হাওয়া করে ঠাণ্ডা করে, বিকেলে কুটুম আসবে বলে।













কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন