বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

তারা দুজন এবং চৈত্র সেল

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য

-- চৈত্র সেল কি চলছে এখনও? নাকি, শেষ?

কলকাতার ভিতর দিয়ে সরু শিরা হয়ে চলে যাওয়া একটি রেলস্টেশনে বিকেল থেকে বসেছিলাম আমি। ট্রেন আসার কথা অনেকক্ষণ। আসেনি। কি একটা ঝামেলা হয়েছে, অবরোধ টবরোধ। বিকেলের গায়ে শ্যাওলা জমছে ধীরে। তিনটে সিগারেট শেষ হয়েছে এর মধ্যে। এক প্যাকেট বাদাম। একটা কলা।
মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে অল্প একটু জল। ধোঁয়া, বাদাম আর কলা পিত্তে জমে একটা জারজ সন্তান তৈরি করে ফেলছিল, তাকে হত্যা করা হল, অতএব। চৈত্র মাসের শেষ দিন। ষ্টেশনের বাঁ-দিকে গঙ্গা, ডানদিকে রাস্তা। গুগল ম্যাপে ফেলে দিলে পুরো ব্যাপারটাকে দেখতে কলকেতে গাঁজা খাওয়া পাবলিকের একচোখ বোজা শ্যামলা মুখের মতো লাগবে। চত্বরটা জুড়ে কয়েকগন্ডা মানুষের সাধারণ হাঁটাচলা। কারওর কোনও তাড়া নেই কোথাও যাওয়ার। এই সময়টা এই লাইনের মানুষদের যাওয়ার তাড়া থাকে না তেমন। যা থাকে, তা ভোরের ট্রেনে। ওই সময়ই সবজি, ছানা, জ্যারিকেনে করে জল মেশানো চোলাই মদ- সব যায় কলকাতায়। বিকেলের দিকে সাধারণত ভিড়টা থাকে ইস্কুল-কলেজ স্টুডেন্টদের। দুজন হিজড়ে খানিকক্ষণ আগে ‘আত কলি এক খোয়াব মে আয়ি’ গাইতে গাইতে টাকা নিচ্ছিল। ষ্টেশনের মাঝামাঝি একটি চায়ের গুমটির সামনে ওই সময়ই ডিগবাজি খাচ্ছিল এক খালি গা নাক দিয়ে শিকনি গড়ানো বাচ্চা। মানুষ কথা বলছিল তখন স্টেশনে। কথা হচ্ছিল। কথা। নতুন নতুন। বেশিরভাগই চেনা যায় না। অনেক কথার মানে বুঝতে পারা যায় না। তবু অনেক কিছুই ছিল সে সব কথায়। মাঠের বাঁশির মতো মৃত্যু, মাঝরাতের হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া অতি নির্জন সঙ্গীত, নিষিদ্ধ ভিনদেশি অনুভব, ঢেউ খেলে যাওয়া অনুচিত আবেগ, বিষাদ, ক্লান্তি, দাবার ছকের শব্দ, অনেক পুরনো দুপুরের ভাতঘুম মিসকল- সব ছিল সে সব কথায়। সব। সক্কলে। সকলে। কিন্তু একের পর এক ট্রেনের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে শূন্য হতে থাকে স্টেশন। সেই সব কথারা বহুদূরে ভেসে চলে যায় কাঁপতে কাঁপতে। তারপর শুরু হয় শব্দলুপ্ত, স্পেসলেস, নিরাকার মুহুর্তের ম্যান্ডেটরি বাখোয়াজি। একটি সিগারেট, দুটি সিগারেট, তিনটি সিগারেট খেতে খেতে স্টেশনের বিকেলের সেই শব্দলুপ্ত মুহুর্তের কঠিন ক্লাসিক গ্রীক ভাস্কর্যকে অতি স্বল্প সময়ে অতিক্রম করতে করতে টের পাই আমার ভিতর থেকেই আরেকটি বিকেলবেলা কখন যেন বেরিয়ে এসে আমাকে নিয়ে বসে পড়েছে স্টেশনের এক ফাঁকা বেদীতে। স্টেশনে লোক আর তেমন নেই। ট্রেন আসবে, ট্রেন ঠিকই আসবে- এমন একটা আশা নিয়ে বেদীতে বসে থাকি আমি। গঙ্গার দিক থেকে হাওয়া এসে চুলকে দিয়ে যায় আমার নারকোল তেল মাখা ছোট চুলের গোড়া অবধি। এমন সময়ই প্রশ্নটা কানে এসেছিল।

প্রশ্নটা আবার কানে এল।

- চৈত্র সেল কি চলছে এখনও? নাকি, শেষ?

চেক শার্ট আর লুঙ্গি পরা এক মানুষ প্রশ্নটা করেছে। দেখলেই মালুম হয় এই লাইনের ডেইলি প্যাসেঞ্জার। লোকটি কখন এসেছে আমি টের পাইনি। হাতে একটা ছোট চটের ব্যাগ। সেখানে বেশ বড় করে এক সময় ‘মামণি’ লেখা ছিল তা বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের জল হাওয়া খেয়েই হবে সম্ভবত, ‘ম’-টা উঠে গেছে। স্রেফ ‘আমণি’-টা পড়ে আছে। লোকটির মুখে অজস্র ভাঁজ। সেখানে বয়স বসে গিয়েছে কেটে কেটে। খোঁচা দাড়ি। গাল ভেঙে ঢুকে গিয়েছে ভেতরে। জটিলতর খাঁচার মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রায় দুর্বোধ্য মুখের লোকটি আরেকটি কথা বলে এবার।

- আপনি কি কিছু কিনলেন সেলে?

- না। আমি কিছু কিনি না।

বলেই বুঝলাম একটু ভুল হয়ে গেল। এই বাক্যের পর অবশ্যম্ভাবী বেশ কিছু প্রশ্ন আসতে পারে। নাও, পারে। কি কি আসতে পারে এবং আসলে সেগুলোকে কি করে সামলে দিয়ে তারপর সঙ্গে সঙ্গেই পাশের কিংবা তারও পাশের বেদিটাতে গিয়ে বসতে হবে তার একটা আলগা ছক মনে মনে করতে আরম্ভ করলাম। প্রায় মিনিট পাঁচেক কেটে গেল এইভাবে। স্টেশনের পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা করল, ট্রেন ঢুকতে আরও আধঘন্টা। এই কথায় স্টেশনের আপাত শূন্যতার ভিতরে একটা উচ্ছলতা তৈরি হল। দুটো ছাগল নিয়ে একজন লাইন টপকে উঠে এল স্টেশনে। ভেন্ডরে করে যাবে। এই সময় লোকটি প্রশ্নটা করল। খুব সহজ এবং সবথেকে পরিচিত যে প্রশ্নটা ওই বাক্যের পরিপ্রেক্ষিতে সবার আগে আসতে পারে, ঠিক সেটাই।

- কেন?

লোকটাকে ভাললাগল। যে মানুষ কথার তোড়ে চলে আসা একটি সহজ কৌতূহলকে জিভের ডগায় রেখে দিয়ে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে পারে তাকে ভাললাগাটা খুব জরুরি এবং কর্তব্য।

উত্তর দেওয়ার মতো তেমন কিছু ছিল না আমার কাছে। তাই বললাম, এমনি!


- উনি নিশ্চয়ই কিছু কিনলেন?

- কে?

- ওই যে, পাশের বেদীতে বসে আছেন যিনি? লেডিসে উঠবেন বোধহয়।

- হতে পারে। কিন্তু তা জেনে আমাদের কি-ই বা হবে বলুন!

- কী কিনতে পারেন বলুন তো? হাতের ব্যাগটা দেখে কী মনে হচ্ছে?

- আরে! অদ্ভুত লোক তো দাদা আপনি! ছাড়ুন না! এসব নিয়ে ভেবে কি হবে? আপনি যাবেন কোথায়?

লোকটি আমার কথা পাত্তাও দিল না। বলল, হাতের ব্যাগটা দেখে মনে হচ্ছে গড়িয়াহাট, কি, তাই না?

কেন জানি, গলাটা খুব চেনা মনে হল লোকটির। কোথায় যেন শুনেছি!

ট্রেন আসতে এখনও দেরি আছে বেশ খানিকটা। আর তেমন কিছুই করার নেই বুঝেই ব্যাপারটা ঠিক কি দাঁড়াতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতে আমি উত্তরটা দিলাম, মনে তো হচ্ছে।

- কেন মনে হচ্ছে?

- একটু ভেবে বলতে হবে।

- অত ভাবার সময় নেই। আমি বলে দিচ্ছি, নোট করে নিন। চৈত্র সেলের সময় গড়িয়াহাট থেকে বাজার করে ফেরা সমস্ত মানুষের গায়ে একটা হলদেটে আভা লেগে থাকে। এই মহিলার গায়েও সেটা দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট।

- হলদেটে আভা?

- হ্যাঁ। হাতিবাগানের থেকে আসা পাবলিকদের আবার কপালের সামনের দিকটা অল্প উঁচু হয়ে থাকে। খুব ভাল চোখ না হলে ধরা মুশকিল। বাজার থেকে ঠেলেঠুলে বেরনোর পর ও জিনিস কপালের উপর থাকে খুব জোর পঁয়তাল্লিশ মিনিট। বাইরের ধুলো হাওয়া’তে তার বেশি টিকে থাকা সম্ভব হয় না। আবার, বেহালার ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা। ভিড় থেকে বাজার করে বেরিয়ে আসার পর গলার স্বরটা একদম বদলে যায়। তবে এটা বেশিক্ষণ থাকবে না। খুব জোর আধঘন্টা।

- গলার স্বর বদলে যায় বলতে?

- মানে, আপনার বউয়ের গলাটা ধরুন পাশের বাড়ির বউদি কিংবা পাশের পাশের বাড়ির মাসিমার মতো হয়ে গেল। এই রকম। গলা পাল্টে গেল বলে এমন নয় যে, আপনার বউয়ের গলা ঝট করে আশা ভোঁসলে হয়ে যাবে! বিয়ে করেছেন?... লোকটার গলাটা...

- না। আপাতত করার ইচ্ছা নেই। কিন্তু ঘটনা হল, এই গলার স্বর পালটে যাওয়ার ব্যাপারটা তো তাহলে একটু পরীক্ষা করে দেখতে হয়, তাই না?

- মানে?

- হ্যাঁ। ধরুন, ওঁর গায়ের হলদেটে আভা থেকে তো এটা স্পষ্ট যে, উনি গড়িয়াহাটে বাজার করতে গিয়েছিলেন। এবং, আমি যদি বলি, উনি বেহালাতেও বাজার করতে গিয়েছিলেন, তাহলে?

- সে তো যেতেই পারেন… না! পারেন না!

- কেন? গড়িয়াহাট থেকে বেহালায় না যাওয়ারই বা কী আছে! তাছাড়া, উনি যে দুটো ব্যাগ নিয়ে রয়েছেন, ভাল করে দেখুন, তার একটা বেহালা মার্কেটের।

- সে হয় তো উনি অন্য কোনওদিন গিয়েছিলেন ওখানে। ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়েছেন আজ। এ জিনিস তো সবসময়ই হয়। অসুবিধা কী!

- আমার কিন্তু তা মনে হয় না।

- তাতে কিছু আসে যায় না। গড়িয়াহাট থেকে বেহালায় ঢোকার পর এখানে আসলে ওই হলদেটে আভা থাকত না গায়ে। এক মার্কেট থেকে কেনাকাটা করে অন্য মার্কেটে ঢুকলে আগের মার্কেটের যা যা দোষ, তা কেটে যায়।

- ব্যাপারটা ঠিক না ভুল, সেটা জানার জন্য তো আমাদের তাহলে ওই মহিলার সঙ্গে একটা ঘন্টাখানেকের কথাবার্তা চালাতে হয় তাহলে।

- গলার স্বর বদলে যায় কি না দেখবেন?

- হ্যাঁ। পুরো ব্যাপারটাই যথেষ্ট আজগুবি মনে হচ্ছে আমার। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীতে কোনও কিছুই একশো শতাংশ খাঁটি হতে পারে না। আজগুবি হলেও তার মধ্যে নিশ্চয়ই এমনকিছু আছে এক শতাংশ হলেও, যার মধ্যে একটা, অন্তত একটা বাস্তব ভিত্তি আছে।

- সে দেখুন না! আমি দীর্ঘদিন ধরে এই লাইনে আছি। মানে, এই লক্ষ্য করে যাওয়ার লাইনে। অত সোজা নয় স্যার। ভাল করে ভালবেসে মানুষ দেখতে জানতে হয়। প্রত্যেক মানুষের হাতের ছাপের মতোই তাদের গায়ের গন্ধ কিংবা হাঁটাচলা আলাদা। সেটাকে বুঝতে হয়। খুব কঠিন কিছু নয় কিন্তু! আপনিও পারবেন।

- আপনি বিয়ে করেছেন?

- করেছি তো! ফ্যামিলিকে নিয়ে তো প্রতি বছর চৈত্র সেলে যেতাম।

- কোথায়?

- কোথায় নয়! কলকাতার সব মার্কেটেই।

- আপনার বাড়ি কি এই লাইনে?

- হ্যাঁ। প্রতি বছরই আসতাম। দু’দিন ধরে বাজার করতাম। নতুন চুড়ি একটু ঝকমকি কাঁচের, ম্যাক্সি, চটি, স্কার্ট ব্লাউজ, জামা, গেঞ্জি… সবই তো কিনতাম।

- বউ ছেলে মেয়ে, সবার জন্য?

- ছেলে নেই। তিনটেই মেয়ে। তারপর আমি আর বউ।

- এখন কেনেন না?

- সে কথা থাক…

লোকটির কথায় আমার অস্বস্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল হয়তো। হল না। তার বদলে মনে পড়ল, বহু বছর আগে এরকমই এক চৈত্র সেলের বাজার দিয়ে যাওয়ার সময় আমার জামাটা খিমচে ধরে চলতে থাকা আরেকজনের কথা। তখন রোজগার বলতে কয়েকটা ফাইভ-সিক্সের টিউশনি। পকেটে বাসভাড়া ছাড়া থাকত আর তেমন কিছুই। সেলের তুমুল হাঁকডাকের পাশ দিয়ে যেতে যেতেই সেই মেয়েটি আবদার করত একটা হাতকাটা ম্যাক্সি কিংবা চটি কিনে দেওয়ার। আমি অভয় দিতাম- হবে। হবে! নিশ্চয়ই হবে। আরেকটু সময় দাও। রোজগারটা বাড়ুক আরেকটু। বড় দোকান থেকেই কিনে দেবো। এই ফুটপাথ থেকে নয়। এসব বলতে বলতেই আমরা পেরিয়ে যেতাম কত চৈত্র সেলের বিকেল দুপুর সন্ধ্যা, ট্র্যাফিকের কড়া চোখ এবং আরেকটি নতুন ফুটপাথ…

সেই মেয়েটির মুখ আর মনে পড়ছে না। তার জায়গায় বঁটি দিয়ে কেটে নেওয়া একটা মেঘ বসিয়ে দিয়েছে কেউ। শুধু ওই হাতটুকু মনে আছে। রোগা শ্যামলা এবং শক্ত। যা আমার জামাটা অনেক ভিড়ের মাঝে খামচে ধরে থাকত প্রাণপণে।

- চলুন। ওই মহিলার কাছে যাওয়া যাক। ট্রেন আসতে তো আর দেরি নেই বেশি। ভদ্রলোক উঠতে গেলেন।

আমি কোনও কথা না বলে বসে রইলাম।

ভদ্রলোক আবার বললেন, কি দাদা! চলুন! কথা বলবেন না ওঁর সঙ্গে? বললেন যে! কি হল! চলুন! জানা দরকার তো ব্যাপারটা!

আমি চুপ করেই রইলাম। ঠিক করলাম আর একটা কথা বলব না। আর একটা কথাও বলা যাবে না।

লোকটি খানিকক্ষণ গাঁইগুঁই করে একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে লাগল। আমার সিগারেট ফুরিয়েছিল।

ট্রেন এসে গেল। দাঁড়াল। আমি আর একটি কথাও লোকটার সঙ্গে না বলে উঠে গেলাম। ফাঁকা ট্রেন। দাঁড়িয়ে রইলাম দরজায়। দেখলাম শ্যাওলার ভেতর থেকেই বিকেলের একেবারে শেষ একটু রোদ বেরিয়ে এসে শপাং করে পড়ছে লোকটার গায়ে ছোটবেলার স্কেলের মতো। সেই একই রোদ পড়ছে ওই মহিলার গায়েও। তিনি বসে আছেন এখনও। লোকটি বিড়ি শেষ করে ওই বেদীর দিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টে।

ট্রেন ছেড়ে দিল। আর তখনই মনে পড়ল সেই প্রশ্নটা যা বহুক্ষণ ধরেই বলার চেষ্টা করছিলাম- ‘দাদা, ওই মামণি-টা কে? আপনার বউ, মেয়ে, প্রেমিকা নাকি অন্য কেউ?’ প্রশ্নটা চেঁচিয়ে ট্রেনের দরজা থেকে করতে গিয়েও চেপে গেলাম বেমালুম...

লোকটির গলাটা কথা বলতে বলতে পুরো আমার মতো হয়ে গিয়েছিল। আমার গলাটাও যদি এই কদাকার মুখের বেঁটেখাটো লোকটির মতো শোনায় ট্রেনের দরজা থেকে, তাহলে সেটা খুবই বাজে ব্যাপার হবে।

২টি মন্তব্য: