বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

ক্রসফায়ার

শাহীন আখতার


দুলু কে? কোন দুলু? গাল-কাটা দুলাল সর্দাররে আমি চিনি না -- খোদার কসম খাইয়্যা কই...

আমি ঘুমের মধ্যে ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিলাম! তাহলে তো মিনা ভাবী ছুটে এসে গা-ঝাঁকান দিত-- ‘হাদি, এই হাদি, তোমারে বোবায় ধরছে। উঠ-উঠ!’


আমি বিছানা থেকে অন্ধকারে চোরা চোখে তাকাই। আধবোজা কেওয়ারের ওপাশে নীল সমুদ্র। নীলবাত্তি জ্বেলে সোফায় নিঃসাড় ঘুমাচ্ছেন মিনা ভাবী। তার লম্বা শরীরটা শয্যায় আঁটে নাই। পরনের গোলাপি নাইটি কিঞ্চিৎ সরে গেছে। একটা উদলা ধবল পা সোফার কিনার থেকে ঝুলছে হাঁটু ইস্তক। পায়ে নকল পাথর বসানো চাঁদির মল থেকে থেকে জোনাক-নীল জেল্লা ছড়াচ্ছে। জ্বলছে-নিভছে-- সদ্য ঘুম-ভাঙা ছোট ছোট চোখের দ্যুতি যেন। বা অন্ধকারে মুহুর্মুহু জ্বলে ওঠা নীলাভার টুনিলাইট।

ভাইজানের নাসিকা গর্জন সেই আদ্যিকালের, সাইকেলে প্যাডেল মেরে স্কুলে যাওয়া-আসার সময় থেকে। এন্তার তাবিজ-কবচেও কাজ হয় নাই। নাক দিয়ে হুইসেল বাজাতে বাজাতে মায়ের জমানা পার করে বউয়ের মুলুকে পড়েছেন। বউ এ উৎপাত সইবে কেন। তা বলে রোজ রোজ ড্রয়িংরুমে বিছানা পড়লে তো বাসার অন্য লোকের মুশকিল। পানি খেতে গেলে আমাকে নীল সমুদ্র সাঁতরে রসুইঘরে অবতীর্ণ হতে হয়। আমার বুকের ভেতর মরুর হাহাকার। পানি-পানি করে এক-বুক কারবালার মাতম নিয়ে আমি উপুড় হয়ে চোখ বুজি।

আমি জেগে আছি অনেকক্ষণ, তবু দুঃস্বপ্নের রেশ কাটে না। এখন ‘দুলু কে, চিনি না চিনি না’ বলে একলা ঘরে চিল্লানোর ফায়দা কী। লোকটাকে যা বলার তা তো দিনের বেলা বলেই দিয়েছি। কথা গাছের ঝরা পাতা, কখনো ডালে ফিরে যায় না।



দুলু, গাল-কাটা দুলাল সর্দার। আমবাগানের সখা। কালো টেরি-কাটা চুলে সাদা গুঁড়ি গুঁড়ি বালু, রঙিন বাজারি ব্যাগ হাতে আমগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। দেখামাত্র গাল-কাটা হাসি। খুশিতে ফেনসিডিলের শিশিগুলিও ব্যাগের মধ্যে টুং-টুং শব্দে নাচানাচি করত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবলিশ চত্বর তখনো সুনসান। ছাত্রদের চাক-বাঁধা মৌমাছির মতো বসতে সেই গোধূলি, ক্লাশ-ফ্লাশ শেষ হয়ে ক্যাম্পাস ফাঁকা হওয়ার পর। প্রায় দিন আমাদের তর সইত না। দুলুর হাতছানিতে সোনা-গলা রোদ মাথায় পদ্মার শান-বাঁধানো পাড়। উঁচু পাড়ে চাক্কাঅলা টংঘর। নিচে চর-ভাসা মরা নদী। চর থেকে উড়ে আসা সাদা সাদা কাশফুল সারা গায় পাউডার পাফ বুলিয়ে দিত। ভরদুপুরে জায়গাটা ছিল নির্জন, নির্বিঘ্ন টায়ের পর টংঘরের সর-পড়া ঘন দুধের চা জমত দারুণ। গ্রাম থেকে আসা মহিষের খাঁটি দুধের কড়া চা।

মহাজনের হয়ে ফেনসিডিল বেচা-কিনি এক জিনিস, অস্ত্র নাড়া-চাড়া আরেক জিনিস। বালুর নৌকার খোলে করে তাহলে দুই-ই এপার-ওপার করত দুলু মিয়া!

‘করত মানে এখনো করে!’ হাত থেকে চায়ের কাপ নামিয়ে কপট ভয় মেশানো গলায় বয়ান দেয় অচেনা লোকটা। ‘দুলাল সর্দার জুনিয়র টেরর। চুনো-পুঁটি। পালের গোদা করম আলি। বাঞ্চারামপুরের লোক। এলেম আছে। আরেক মুলুকে ঘরজামাই সাইজ্যা রাজত্ব করতাছে।’

টংঘরে করম আলিও পায়ের ধুলা ঝাড়তেন। নীলখেতের মোরগ-পোলাও খেতে খেতে আমার মনে পড়ে। তবে আমাদের মতো ফেনসিডিলের শিশি খালি করে কাপ কে কাপ দুধ-চিনির কড়া চা সাবাড় করতে তাকে দেখি নাই কোনো দিন। উঁচু টুলে বসে পা নাচাতেন। সেদিনের ইংরেজি কাগজটা মুখের ওপর উল্টা করে ধরা থাকত। কথাটা মনে পড়তে লেবু চিপে রস বের করতে করতে আমি মুচকি হাসি। আনকা লোকটার মুখেও দরাজ হাসি। আমাকে বাগে আনতে পেরে চোখের ক্রুর চাহনিটা মিলিয়ে গেছে। তখনো আমার পাতে রানের অর্ধেক মাংস। অথচ না না করে তাকে কোনো কথাই বলতে বাকি রাখি নাই। ভাবছি এত লুকোছাপার দরকার কী! এ তো স্টুডেন্ট লাইফের ফেনসিডিলের ইতিহাস। লোকটার হাতের নথি আমা-সংক্রান্ত আমবাগানের চৌহদ্দি ছাড়ায় নাই। তারপর পদ্মা-মেঘনায় বিস্তর জল গড়িয়েছে। ঠেলে-ঠুলে কোনোক্রমে অনার্সের সিঁড়ি ডিঙিয়ে তল্পিতল্পাসহ রাজশাহী ছেড়ে ঢাকা ফেরত আসা, পৈতৃক সম্পত্তির দলিল জাল করা, ভাসমান বেশ্যাসঙ্গম, মালের ঠেকে ঘুষাঘুষি, মায়ের তহবিল তসরুপ করে কত পদের রঙিন নেশা! এক কথায় আমার আর্থিক-নৈতিক স্খলনের দীর্ঘ আখ্যান। ওসব রেকর্ড আছে রিহ্যাব সেন্টারে। গোপন কথা পই পই বলে দেওয়া শুদ্ধি হওয়ার প্রথম শর্ত। গর্ব করে বলতে পারি আজ আয়নার মতো আমার দিল সাফা। সেই বলেই সব খোয়ানোর পরও আমি বলীয়ান। উচিত কথা বলতে পিছ-পা হই না।

এসব কারণে লোকটা বোধ হয় আমাকে হাবলা ভাবছে। চায়ের কাপ নামিয়ে গালে হাত দিয়ে সে আমার খানা দেখে। আর অন্ধকারে ডেলা মেরে মেরে সরীসৃপের মতো বুকে ঠেলে এগোয়। আমার আবার এসব আলাপের সময় মুরগির টেংরি খেতে সুবিধা লাগে, জড়া জড়া ভাত মুখে পোরার চেয়ে। ফুল আঁকা চীনা বাসন-ভর্তি তেল-জবজবে বাদামি ভাত, সেদিকে ইঙ্গিত করে লোকটা বলে ‘আপনার তো ভাত খাওয়া হইতেছে না। এক্সটা মুরগির কারি নিবেন?’

ওরে বাপরে, এ দেখি জামাই আদর!‘ভাই, নিজের চরকায় তেল দেন, আপনের তো চা জুড়ায় বরফ হইয়্যা গেল।’ বলেই আমি নোংরা পর্দা ঠেলে পাকসালের বেসিনে হাত ধুতে যাই। লাইফবয়ে হাত ডলে ডলে ফেনা তোলার কসরত করি। আস্তর-ওঠা দেয়ালে জং-ধরা ফাটা আয়না। রিহ্যাব সেন্টারের বেল-মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল গজিয়েছে। গায়ের রঙ আর বুঝি ফেরার নয়। সেন্টারের লাল এঁটেল মাটিতে ঢেঁড়স, কাঁচামরিচ ফলানোর সুবাদে সোনার বরণ রোদে পুড়ে তামা তামা। যা গেছে গেছে। বেঁচে থাকার মতো আনন্দ কিছুতেই নেই। ফাটা আর্শির বুকের ভাঙাচোরা মুখটাকে আমি এক লহমায় ভালোবেসে ফেলি। দুলুও নিশ্চয় ভালোবাসে তার গাল-কাটা বদন! দুলাল সর্দার, করম আলিকে পাকড়াও করে লোকটা আদতে কী করতে চায়। এসব ঝুটঝামেলায় আমাকেই বা জড়াচ্ছে কেন।

গা থেকে জোঁক-ঝাড়া মনস্থ করে আমি সোজা ক্যাশ কাউন্টারে চলে যাই। একদিনের বিলাসিতায় পকেট মানির পুরাটাই যাবে। তা যাক। আজকাল তো গাঁটের পয়সা ফুরাতেই চায় না। যা খরচা, সেটুকু ধূমপানে।

কিবম আশ্চর্য, লোকটা কি আমাকে ভুখা-কাঙাল ঠাওরালো যে, চেনা নাই জানা নাই খাবার বিল শোধ করে দিয়েছে! এমন কান্ডে অপ্রস্তুত হওয়ার চেয়ে বিরক্তই লাগে। তার ওপর ধোঁয়া-উড়া চা নিয়ে পতিঅন্তপ্রাণ বউয়ের মতো টেবিল আলো করে বসে আছে সোনার চাঁদ। এখন টাকা সাধতে গেলে হাত ধরে টেনে বসাবে। ফের টেবিলে মুখ নামিয়ে ফুসুর ফুসুর। আমি মৌরি চিবাতে চিবাতে ফুটপাতে নামি। একবার কাঁটাবনের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। এ পথে হেঁটে হেঁটে কত কত শুকতলা ক্ষয়ে গেছে, কস্মিনকালেও কাছ থেকে দেখা হলো না অ্যাকুরিয়ামের সাঁতরানো মাছ, পানির বুদবুদ, খাঁচা ভরা রঙিন পাখি। মিনা ভাবী বলে, এসব পাখি পোষ মানালে টট্টরিয়ে কথা কয়। জিন্দেগিতে মানুষের সঙ্গে তো বহুৎ বাতচিত হলো, এবার না হয় পাখ-পাখালির সঙ্গে, যদি নতুন করে বাঁচার তরিকা মেলে! এখন কাঁটাবনে যেতে গেলে নিউমার্কেট থানা এড়ানো যাবে না। পক্ষী-দর্শনের আগে পুলিশ-পক্ষীর সঙ্গে মোলাকাত। আচাভুয়া লোকটা এ কেল্লারই বাসিন্দা মনে হয়।

আমি কয়েক কদম এগিয়ে দ্রুত পুরোনো বইয়ের আড়তে ঢুকে পড়ি। ডানে-বামে অজস্র চিপা গলি। গলিতে গলিতে নানা কিসিমের ব্যবসা-ফিকির। সব চেয়ে ফটোকপির বাজারই রমরমা। মেশিনের পেট থেকে দিস্তা দিস্তা কাগজ খালাস হচ্ছে আগুনের হলকা ছড়িয়ে। বাতাসটা ভাঁপানো গরম, দমবন্ধকর। ব্যস্ত আঙুল, কাগজে স্টেপলার বিঁধানোর খুটখুট ধাতব আওয়াজ পেছনে ফেলে এ গলি তস্যগলি করে অবশেষে খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে আসি।

বলাকা বা বিনাকার ম্যাটিনি শো’র দর্শকের তোড়ে নিউমার্কেটের সামনের রাস্তায় যান-জট লেগে গেছে। ফুটপাতেও অসম্ভব ভিড়। চাঁদনি চক আসতেই আমার গা দিয়ে ঘাম ছোটে। এ অবস্থায় ঝাঁপ দেই রাস্তায়। বিলি কেটে কেটে বড় সড়ক উৎরে কাঁচা বাজারের গলিতে নামা ইস্তক ফিরে তাকাই না। দূরে উত্তাল জনসমুদ্র। তারপর ছাড়া ছাড়া পথচারী, ভিড়টা ক্রমে পাতলা হয়ে ওভার ব্রিজের ঢালে মিশে গেছে। লোকটাকে ধারে-কাছে কোথাও না দেখে আমি মৌজ করে সিগারেট ধরাই। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বাজারের দিকে হাঁটি। নজর বাঁ ফুটের ফলের দোকানগুলিতে। এসব বিক্রেতাদের দেমাক সাংঘাতিক, সঙ্গে কুলি-মুটে না থাকলে পাত্তাই দেয় না। না দিক, আমারও গরজ নাই। ধারেই বাঁশের চাঙারিতে পুদিনা পাতা, গন্ধ লেবু, ছোট ছোট আঁটি-বাঁধা সোনা-রঙা কাঁকরোল, লাল শাক, তেলাকচু পাতাসহ সস্তা দরের নানা শাক-সব্জি। ঘন ঘন জল ছিটানোর সুবাদে রঙ বেশ খোলতাই হয়েছে। আজকাল গান্ডেপিন্ডে খাওয়ার পরও আমার চোখের খিদা মিটে না। নেশা ছাড়ার এ এক কুফল। জিন্দেগিভর আবর-জাবর খেয়ে এখন সারাক্ষণ মনে হয় সকাল-বিকাল নানাপদের ভোজ খাই। ঘরে সোজা-সাপ্টা পাক। শুক্র-শনি ছাড়া পঞ্চব্যঞ্জন রাঁধার সময়ই হয় না ভাবীর। আমি এক ডজন লেবু মুলামুলি করে পেছন ঘুরেই থ। হাত দুই তফাতেই লোকটা, শিয়ালের মতো গলা তুলে ঝুলন্ত আঙুর ফল দেখছে।

একি আলামত! আমার মোরগ-পোলাও খাওয়ার শখ চাপলে, ইনি উড়ে এসে জুড়ে বসেন চা খেতে। আমার গন্ধ লেবুর দাম-দস্তুর করা যখন সারা, তখন তার বাই ওঠে আঙুর কেনার। ফের ফুসুর-ফাসুর করতে এলে কুস্তাকুস্তি হয়ে যাবে। মেজাজটা লহমায় তিতা হয়ে গেল। আমি আধ-খাওয়া সিগারেট পায়ে পিষে বাজার থেকে বেরিয়ে আসি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় ফিরে তবেই নিস্তার।



সাতসকালে বাসার কলবেল বেজে ওঠে। ময়লাঅলা খুব সম্ভব। কিন্তু আমার তো দিন শুরু হওয়ার কথা সূর্য পাটে বসলে। গেটের বাইরে ময়লার বিন রেখে গেলেই পারতেন ভাইজান! অসময়ে এ উপদ্রপ সহ্য করতে হতো না। আমি পাশ ফিরে কানে বালিশ ঠেসে ধরি। তাতে আওয়াজ আটকানো গেলেও রোদ ঠেকানো দায়। পর্দাবিহীন জানালার গ্রিল-চুঁইয়ে পড়া রোদ্দুরে বিছানা তেতে উঠেছে। আমার উদলা গায়ে রৌদ্র-ছায়ার জেব্রা-ডুরির কারুকাজ। বিছানার কিনারের বিড়া পাকান চাদরটা নির্ঘুম রাতের সাক্ষ্য বহর করছে। দুলু-দুলু বলে চিল্লানোর পর ফজরের আজান পর্যন্ত আমি জেগেই ছিলাম। তারপর ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম কখন জোড়া লেগে রোদের তেজে গড়িয়েছে, ভাবী-ভাইজানের অফিস-যাওয়ার হুলুস্থূলেও চিড় ধরে নাই। ওরাও আমার লম্বা ঘুমই চায়। যার ভালো কিছু করার মুরদ নাই, তার জাগনের কী দরকার। ঘুমাক বা দিনচুক্তি বিছানায় গড়াগড়ি খাক, তাতে নয়া তোষকের আবর ফেটে রুইয়ের ডেলা বেরিয়ে পড়লেও লোকসান কম। এক ফাঁকে মিনা ভাবী নিশ্চয় পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে পকেটের পাই-পয়সা গুনে গেছে। ফের নেশা-ভাঙ করার সাবুদ এই পকেট। মোরগ-পোলাও খাওয়ার পরও কীভাবে টাকার জায়গায় টাকা থাকে-- এ ধাঁধা নিয়ে ভাবীসাহেব আজ অফিসে গেছেন। রাতে তলব পড়বে। যেখানে ইমানের জোর কম, সেখানে টাকা খরচ করলেও দোষ, না করলেও দোষ। অদৃশ্য মালদার সাঙ্গাতের ভাবনা মুরুব্বিদের মাথায় ভর করে।

আমার মাথায় মুহুর্মুহু কলবেলের করতালি। ময়লাঅলাটা দেখি নাছোড়বান্দা! ঘরদোর সাফা রাখতে গৃহস্থের ওপর টেক্কা দিচ্ছে! ওকে আচ্ছাসে ধমক কষাতে আমি বিছানা ছেড়ে এক লাফে বারান্দায় চলে আসি। নিচের কানা গলিটা ফাঁকা। উঁচু উঁচু দালানের কোলে কেমন আত্মবিস্মৃত, ছায়াচ্ছন্ন। এ সময় বাচ্চা-কাচ্চার সঙ্গে মায়েরাও স্কুলে চলে যায় বলে পাড়াটা নিঝুম। প্ল্যান করে ফেরিঅলারাও অনুপস্থিত থাকে। স্কুল ছুটির পর ঝাঁকের কইয়ের মতো দলে দলে আসতে শুরু করে। কত বিচিত্র সুরের মন-গলানো ডাকাডাকি! এ কয়দিনেই আমার বেশ মুখস্থ হয়ে গেছে। বহু দিন আগে পাখির ডাকও সড়গড় হয়েছিল, যেইবার ডন্ডিসে ভুগে টানা একুশ দিন বিছানায় শুয়েছিলাম। ঘরের চালে নানাজাতের পাখি বসত। মা শিঙি মাছের ঝোল রাঁধতেন পেঁপে, কাঁচকলা বা আস্ত থানকুনি পাতা দিয়ে। তেল-হলুদ ছাড়া এমন মুখরোচক রান্না দুনিয়ায় কেবল মা-ই পারেন। লম্বা দুপুরে গরম মশলার সুবাস ছড়িয়ে বসতেন শিথানে। চুলে আঙুল ডুবিয়ে বিলি কাটা, গায়ে হাত বুলানো, কত আদর-যত্ন ফেরার সময় হোস্টেলের বাক্স-বেডিং গোছাতে গোছাতে দুজনেই কাঁদছি। যে দিন যায়, সে আর ফিরে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বারান্দা থেকে সরে আসি। তখনো বেলের বাজনাটা থেমে থেমে বেজেই যাচ্ছে।

পিপহোলে চোখ না রাখাই কাল হয়েছে। এই মর্দ বেল বাজায় জানলে আমি দুয়ার খুলি! হাতে সাদা পলিথিন মোড়ানো গতকালের নিউমার্কেটের আঙুর, ফরমালিনের গুনে এখনো টসটস করছে। ঘরে ঢুকে আরেকটা ঠোঙা খুলে ডজন খানেক লাল টুকটুকে আনার সে সাইড টেবিলে রাখে। মুখে তোষণকারীর তৈলাক্ত হাসি-- ‘এই আনারগুলি আপনের আর ভাবীর জন্য আঙুর...’

ভাবীর জন্য আঙুর! ঘরে যে আমার ভাবী আছে, এ খবর তেনারে কে দিল? তবে সবজান্তারও সামান্য ভুলচুক হয়। মিনা বেগম রোজ রাতে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে দেখতে আঙুর-টাঙুর না, মুড়ি-মুড়কির মতো ডালিম দানা মুড়মুড়িয়ে খান। হাতের সাদা তেলোভর্তি চুনির মতো ডালিম দানা। আরেক হাতে রিমোট কন্ট্রোল। তখন নাইটির ওপর রঙিন জর্জেট ওড়না গলা প্যাঁচিয়ে বুকে ফনা তুলে থাকে। এসব রাতের হালচাল। এখন তো কড়কড়া রোদ-জ্বলা দুপুর। দুপুর না হলেও সকাল-দুপুরের মাঝামাঝি। বেডরুমের পর্দা হাওয়ায় দুলে লোকটাকে আরেক দফা বোকা বানায়। আমি মনে মনে হাসি। নষ্ট ঘড়ির কাঁটার মতো সময় যেন থেমে আছে। রঙিন পর্দা ঠেলে কোনো আঙুর-খেকো নারী বেরিয়ে আসে না। টাইয়ের নটে ঢিলা দিয়ে লোকটা বেকুবের মতো আমার দিকে তাকায়। আমার তখনো আদুড় গা। ঘাড় ত্যাড়া করে ঘরের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছি। লোকটাকে বসতেও বলি না। কিন্তু এ তো জোঁক, চিনেজোঁক। জুতা খুলে নরম সোফার গায়ে কেমন লেপ্টে গেছে। আমি ভালো-মন্দ কিছু না বলেই বাথরুমে ঢুকে কমোড ভরে হিসি করি। পেশাবটা এখনো ফেনার তলে বিয়ার-রঙা ম্যাদা হলুদ। এ সফেদ করতে মনে হয় ফিটকিরি লাগবে। যাক তলপেট খালি হয়েছে, এবার মাথা ঠান্ডা করা দরকার।

‘এভাবে ভদ্রলোকের বাসায় চলে আসা তো ঠিক না।’

‘আমিও ভদ্রলোক!’ লোকটা বুক পকেট থেকে পরিচয়-পত্র বের করে হাতের পাঞ্জায় মেলে ধরে। লেমিনেট করা তালু সমান শক্ত কাগজ। কালো ইউনিফরম দেখেই আমার পেট-মুচড়ে পায়খানার বেগ চলে আসে। শুরু থেকে আমি ওকে ধোয়া তুলসি-পাতা ভাবি নাই। তবুও দুঃস্বপ্ন সত্যি হলে কে না ভড়কায়!

আমি ঘরের দেয়ালে মুঘল মিনিয়েচার দেখি। সালঙ্কারা লাস্যময়ী ললনার প্রোফাইল। ভাই-ভাবী হানিমুনে গিয়ে দিল্লির জনপদ মার্কেট থেকে কিনে এনেছে। নেশার টাকা ভূতে জোগায়। আমি এটি পাড়ার ছবি তোলার দোকানে বেচে দিলে মিনা ভাবী ডবল দাম দিয়ে ফের ছাড়িয়ে আনে। তারপর যেদিন শোকেস থেকে ক্রিস্টালের ফুলদানি-জোড়া গায়েব হয়ে গেল, সেই দিনই মায়ের পেটের ভাই বাড়ি থেকে খেদিয়ে দিলেন। বাপ গত হয়েছে ন্যাংটাকালে। বুড়া মায়ের শেষ সম্বল বিয়ের গয়নাশুদ্ধ তহবিল ফাঁক করে দিয়ে কোন মুখে বাড়ি ফিরে যাব! ওখানে মালকড়িও অবশিষ্ট নেই। আমার দশা তখন এক ঠ্যাং কাটা রাস্তার বেওয়ারিশ কুত্তার মতোন। মাসাধিককাল গোসল না, পরনের কাপড় ঝাড়লে মন মন ধুলা ওড়ে, গা-ভর্তি উকুন, জায়গায় জায়গায় দাউদের ঘা, যেদিক দিয়ে পা টেনে টেনে যাই পেয়াজ-পচা দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এক খুরে মাথা কামানো দোস্তরাও তখন কাছে গেলে দূর দূর করে তাড়িয়ে। এরা নেশাখোর তবে অ্যালসেশিয়ান ঘরানার, মাথার ওপর ছাদ আছে। আমার রাত কাটে সদরঘাটে, পিজি হাসপালের চত্বরে, কমলাপুর রেলস্টেশনে। ওসব জায়গার দখলদারদের লাত্থি-উষ্টা খেতে খেতে এক ফুটফুটে খই-ঝরা জ্যোৎস্নায় বোধোদয় ঘটল।

রিহ্যাবে তো অনেকেই যায়, কজন নেশা ছাড়ে! সব জেনে-শুনে ভাই-ভাবী ফের ঘরে তুললেন। সেই ঘরের সোফায় আজরাইলের মতো লোকটা এখন বসে বসে পা নাচাচ্ছে! ‘ভাই, আমি যমের দুয়ার তে ফিরা আইছি। এহনও স্বপ্নে ফয়েল পেপার, বাঘ-মার্কা সিকি ফিরা ফিরা আসে। আপনে আমারে কী করতে কন?’ অতলে ডুবতে ডুবতে আমি তাকে কান্ডারি ঠাওরে জাপটে ধরি। বল এখন লোকটার কোর্টে। মওকা পেয়ে সে ঠোঁট মুচড়ে হাসে, ‘আপনের কিচ্ছু করতে হইবো না। আমার লগে যাইবেন আর আঙুল দিয়া দুলাল সর্দাররে চিনাই দিবেন। কান টানলে মাথা আপনিই আসবে। করম আলিরে হাতের মুঠায় পাওয়া এক দ-ের ব্যাপার। এরপর যা করনের আমরাই করুম।’

‘কী করবেন-- ক্রসফায়ারে দিবেন?’

‘ছি-ছি এইটা কী বললেন! বিনা কারণে আমরা পিঁপড়াও মারি না। মিডিয়ার অপপ্রচার এইসব।’ লোকটার পাছায় যেন বিষপিঁপড়া কামড়ে ধরেছে, বসা থেকে ঝটকা মেরে উঠে কার্পেটের ওপর পায়চারি শুরু করে। ঘন ঘন হাতের মুঠো পাকায়। এত গোসসা কার ওপর? যে দুলাল সর্দার, করম আলিরে জন্মেও দেখ নাই, তাদের মারার জন্য হাত নিশপিশ করতাছে? নাকি টাকার বখরা পাও না বলে রাগ ঝাড়তেছো পুলিশের ওপর?

লোকটার অস্থিরতা দেখে আমি স্বস্তি পাই। ঝুরঝুরে বালুর মতো মুখোশ খসে পড়ছে ক্রমশ। ছেনালিপনা ট্রেনিংয়ের অঙ্গ হলেও স্বভাবের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। তবু পায়চারি করতে করতে একসময় সে ফের ছেনালিপনারই দ্বারস্থ হয়। কার্পেটের ওপর টান টান দাঁড়িয়ে বুকে হাত রেখে যাত্রা-পার্টির বিবেকের ডায়লগ দেয়-- ‘আমার কী লাভ! করম আলি, দুলু আমার নিজের দুশমন না দেশের দুশমন? আপনে লেখাপড়া জানা লোক, নেশা ছাইড়্যা নিজে কলুষমুক্ত অইছেন। এইবার দেশটারেও কলঙ্কমুক্ত করেন।’

বটে! নিজেরে হেফাজত করার তৌফিক আল্লাতালা যারে দেন নাই, তার ওপর পড়ছে দেশ উদ্ধারের ভার! লোকটাও প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ভাব নিচ্ছে-- যেন একজন নিঃস্বার্থ ভালো মানুষ। দুজন ক্রসফায়ারে দিলে ডবল প্রমোশন। রক্তে মাছি বসার আগেই টেবিলে টেবিলে মিষ্টি বিলি। আর এ নোংরা কাজের মদদকারীর রোলে নামানো হচ্ছে আমাকেই। ভাবছে হয়তো হার্ড-ড্রাগ-খোরের নেশা ছাড়াটা তো কচুপাতার জল, সামান্য অসাবধানেই ভূপাত। যে নিজের কবর নিজে খুঁড়ছে, সে ফায়ার বা ক্রসফায়ারে মরলেই কী। মরণ এমনিই আসবে--দু’দিন আগে আর পরে।

লোকটার হয়ে এসব ভাবনা ভাবতে আমি দেখি ভয় পাচ্ছি না। তবে ওর কাছে আমার জীবনের কানাকড়ির মূল্য না থাক, আমার কাছে আছে। আমি এক টুকরা ভিজা-নরম জমিনে নতুন করে শিকড় চারানোর স্বপ্ন দেখি। নিজহাতে খুরপি চালাই। আগাছা সাফ করি। ফুল-ফলের আবাহনী গীত গাই। তা-ও বোধ হয় না। আমি তো জন্ম কুঁড়ে। বিড়ালের মতো থাবায় চোখ লুকিয়ে যখন-তখন ঘুম যাই। ঘাড় ফুলিয়ে উপভোগ করি স্বজনদের আদিখ্যেতা। আজকাল ভাইজানের বোল-চাল পাল্টে গেছে। ভাবীও হাত পুড়িয়ে ছুটি-ছাটায় দেবরের জন্য ভালো-মন্দ পাকান। হপ্তায়ান্তে নানা পদের সুখাদ্যের ঘ্রাণে ফ্ল্যাটবাড়ি ম-ম। খেতে বসে আমার কেমন ধাঁধা লাগে। আগবাড়িয়ে দামী খাবারের তসতরি কাছে টানার সাহস হয় না। ভাইজানই তখন চোখের ইশারায় বউকে মাছের পেটি বা মাংসের শাঁসালো টুকরাটা আমার পাতে তুলে দিতে বলে পরিস্থিতি সামাল দেন। তখন কথা কন যখন, গলার স্বর খাদে নামানো, মাথা আরো নিচু। এক তুমুল বাদলা রাতে ঘেঁটি ধরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া নেশাতুর ভাইটি যেন জীবনবাজির খেলা খেলে স্বর্ণপদক জিতে এনেছে, এমন তার নতজানু, হাতকচলানো ভঙ্গি। আমার বিবাগী মনটা করুণায় ভিজে ওঠে। লোকটাকে জোর দিয়ে বলি, ‘দুলু তো আমার বেড কোম্পানি-- বিসি। হের কাছে ঘেঁষা আমার জন্য বারণ।’

‘হের কাছে ঘেঁষবেন কেন আপনি? আমি না সঙ্গে থাকতেছি!’

আমার তরফ থেকে আর কী বলার আছে! এ যেন আজরাইলের সঙ্গে যোজাযুজি। সব অরণ্যেরোদন হয়ে যাচ্ছে। ফাঁসে গলা ঢুকিয়ে ঘড়ির কাঁটা গোনার ছলনা কেন। এখনই হেস্তনেস্ত হয়ে যাক।

লোকটার এগিয়ে দেওয়া নকিয়া সেট থেকে আমি দুলাল সর্দারকে ফোন দেই। হেসে হেসে কই, আমার আগের নম্বরটা বদলায় গেছে। একদিন সারপ্রাইজ ভিজিট দিব, দোস্ত। থাকবা তো সেই টংঘরে, যেখানে বসে আমরা পদ্মার শোভা দেখতাম? দুলু আমারে আমের দিনের দাওয়াত দিলে আমি তা-ও কবুল করি। যদিও এখন হেমন্ত ঋতু, শীত আসি আসি করছে। কবে আমের বৌল ফুটবে, গুটি ধরবে, আঁটি শক্ত হবে, গায়ে লালিমা লাগবে, ততদিন তর সইবে কি!

‘দাওয়াত দিছে যখন যাইবেন, আমের দিনেও যাইবেন। এক জায়গায় দুইবার যাইতে দোষ কী?’ বলতে বলতে লোকটা আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে পকেটে পোরে।

‘সে কি আমার তকদিরে আছে?’

‘আছে মানে? আলবৎ আছে। আপনের গায়ে চুল পরিমান আঁচড়ও লাগবে না। সব দায়িত্ব আমার।’

তথাস্তু!

আঙুর-আনার ঠেসে ঠেসে ময়লার ব্যাগে ভরে আমি গলির মাথার ডাস্টবিনে ফেলতে যাই। বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরতে শুরু করেছে। মায়েদের কলকাকলিতে পাড়াটা মুখর। অজানা খুশিতে ডাস্টবিনের কাকগুলি লাফালাফি করছে। আমি ময়লার ¯তূপে ফলসমেত ব্যাগটা উড়া মেরে আর পেছন ফিরে তাকাই না। বাসার সামনে ময়লার গাড়ি। দুটি ধাঙ্গড় ছোড়া বালতি উপুড় করে গাড়িতে ময়লা ঢালছে। ওদের ঘিরে ডুমো ডুমো মাছির ঝাঁক। নোংরা-আবর্জনায় ভনভন করা এ সব পতঙ্গের চেয়েও আমি অধম। পচা-বাসি খুঁটে খেয়েও এরা নিজের ডানার জোরে ওড়ে। কারো নজরদারির মধ্যে নেই।

বাসায় ঢুকে আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজি, লোকটার চিহ্ন যেন কোথাও পড়ে না থাকে। কুশন-টুশন সব সোফার গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে একবার ভাবি নাইতে যাই। তার আগে শলার ঝাড়– দিয়ে কার্পেটটা আচ্ছাসে পেটানো দরকার। পাপোষেও খন্নাসের বুটের ছাপ থাকতে পারে। ঠান্ডা মাথার খুনির মতো তামাম আলামত নষ্ট করে আমি ফ্যান ছেড়ে ভাবতে বসি। মাথার ওপর ছাদপাখার থাক-টাক থাক-টাক আওয়াজটা বাড়ছে আমার হৃদপিন্ডের বাজনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। কী বাজে কাজে সময় নষ্ট করছি! আমার আসল কাজ তো সামনে। যার পায়ের ধুলা নসাৎ করতে এত ঝাড়ন-পোছন, সে তো সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো আমার ঘাড়েই সওয়ার। দৈত্য যেদিকে চালিত করবে, সেই দিকেই যেতে হবে।



ভোরের আলো ফোটার আগেই অপারেশন। পাঁচ-ছ ঘণ্টার পথ। রাতে রাতে পৌঁছানো চাই। পদ্মার বুকে সারি সারি বালুর নৌকা রাতভোর বিরামহীন চলে। এই সময়টায় তালাইমারির ঘাটে থাকে দুলাল সর্দার। তার গাল-কাটা হাসি কাকভোরের ফিকা আলোয় শতেক মানুষের ভিড়েও সনাক্ত করতে অসুবিধা হবে না। আমি জামা-প্যান্ট পরে ডাইনিং-ড্রয়িং পায়চারি করি। কব্জিতে ঘড়ি নেই। দেয়াল ঘড়িগুলিও কি উধাও হয়ে গেল! এ ভাইজানের কীর্তি। সামনা-সামনি ছোটভাইকে খাতির করলেও আবডালে ঠিকই কাছা সামলান। আমার আর চোরের পরিচয় ঘুচিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো হলো না। দাঁড়াবো কি, শিরদাঁড়াই তো ভাঙা। খানিকবাদেই শুরু হবে নেশার সময়কালের সেই মিথ্যার জারিজুরি।

ভাবী পায়ের স্যান্ডেলও খুলতে পারে নাই, সবে কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়েছে, আমি বাবু সেজে সামনে দাঁড়াই। ‘ভাবী, আজ যে বড় দেরি করলা! আমার তো রাইত নয়টায় বাস। রাজশাহী যাইতাছি। সার্টিফিকেট তোলা লাগব। চাকরির ইন্টারভু আছে পড়শুদিন।’

আমার দিকে চোখ পিটপিট করে চেয়ে থাকে মিনা ভাবী। বিদেশি ব্যাংকের অফিসার। কাস্টমার সার্ভিসে মন-প্রাণ সঁপে দিতে হয়। সকাল-সন্ধ্যা দম ফেলার ফুরসত নেই। অফিস টাইমে কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, বাসায় ফিরেও সব কিছু দেখে চোখ পিটপিটিয়ে। একসময় আঁখি দুটি যে ডাগর ছিল, তা না বললে আজ কেউ বিশ্বাস করবে না।

‘এমন কইরা তাকায় আছো ক্যান? আমারে মনে অয় নতুন দেখতাছো!’

‘না, কথাটা বুঝতে চাইতেছি।’ বলে পায়ের মল বাজিয়ে রসুইঘরের দিকে যায় মিনা বেগম। আমার চাকরির সংবাদে তাকে খুশি খুশিই লাগে।

রসুইঘরে ডবল বার্নার চুলার একটাতে ভাত, আরেকটাতে ডিমের কারি। টমেটোর সসে বিস্তর পেয়াজ-রসুন দিয়ে আমি সদ্য সদ্য পাকিয়েছি। ভাবী কড়াই উদাম করে চামচ খোঁজে। কাপবোর্ড খোলারও ধৈর্য নেই। আঙুলের ডগায় লালচে-বাদামি ঝোল-- ‘ইস, এমন সুন্দর তরকারিটা, এক ফোঁটা লবন দেও নাই!’

আমি পায়ে পায়ে নিজের ঘরে ফিরে আসি। কিছুই সঙ্গে নেওয়ার নেই। আসছো ন্যাংটা যাইবা ন্যাংটা। তবু হাতে একটা ব্যাগ না নিলে সন্দেহ করবে। রাহাখরচ যদিও লাগবে না, একই কারণে তা-ও চেয়ে নিতে হয়। ‘এহন বাজে কয়টা? মোবাইলটা সঠিক টাইম দিতেছে না’ বলে আমি ভাবীর কব্জি উল্টিয়ে ঘড়ি দেখি। সারাদিনের মেহনতে হাতটা গরম। সে আমার পেছন পেছন আসে দরজা পর্যন্ত।

‘রিহ্যাব থেকে আসছো-- মাস পুরা হয় নাই। আর কয়দিন রেস্ট নিলে কি হইতো! চাকরি তো পরেও করা যাবে।’

এর কোনো জবাব নেই। এখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা-- তিনতলা থেকে নামতে অসংখ্য সিঁড়ি। এর মধ্যে ভাইজানের সামনে না পড়ে যাই। আরেক দফা মিথ্যা বুলি আওড়াতে হবে।



গাড়িটা যখন আমিনবাজার ছাড়িয়ে যায়, আমার বুকটা হু-হু করে ওঠে। বাজারের ডানপাশের রাস্তায় ঢুকে ছোট ছোট টিলার ধারের নিপাট একটি গ্রামে পড়েছিল রিক্সাটা। সঙ্গে রিমা। পথের ধারের মাটির ঘর, নিকানো উঠান, শান্ত-সবুজতা রিমাকে আপ্লুত করে। আমার কোমর-পেঁচিয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে কয়, ‘তুমি ভালোয় ভালোয় রিহ্যাব থাইকা ফিরা আসো। আমরা লালমাটির ঘর তুলে এখানে সংসার পাতুম।’ আমার ডায়েরি, শখের সানগ্লাস, সিগারেট প্যাকেট-লাইটার নিয়ে রিমা সেই রিকশায় একা ফিরে গেল। তিন মাস পর রিহ্যাব থেকে বেরিয়ে দেখি, রিমা না ভাবী মিনা অফিসঘরে, কাগজে সই-সাবুদ করে আমাকে ছাড়িয়ে নিচ্ছে।

আমাকে ভালো করার নিয়ত করে মাঠে নেমেছিল নাকে রিমলেস চশমার রিমা। কোথায় হাজারিবাগ, মোহাম্মদপুর, বাবুপুরা বস্তি-- তালাশ করে করে হাজির হতো। নেশায় বাগড়া দিতে গিয়ে আমার হাতের চটকানাও খেয়েছে। আমি তো এখন ভালো হয়ে গেছি, ড্রাগ ফ্রি। রিমা কই। লালমাটির খ্রিস্টানপাড়ায় ঘর-বাঁধাটা ছিল খোয়াব। ফোনের সিম বদলে কোন সাগরে ডুব মারল সে!

সব খোয়ানোর যাতনা আমি আর অনুভব করি না। রিহ্যাবের সকাল-সন্ধ্যা বাইবেল-পাঠ রুটিন থেকে বাদ গেলেও, কনফেশনের ধাঁধায় পড়ে রইলাম। আমার সত্যবাদিতায় দুলু, করম আলি আজ ক্রসফায়ারে মরতে যাচ্ছে।

আলুনি ডিমের তরকারি আমার গলায় পাঁক দিয়ে দিয়ে ওঠে।

‘ভাই, আমার পেট ফাইট্টা বমি আসতেছে’ বলেই আমি বমি করে গাড়ি ভাসিয়ে দেই।

ঘ্যাঁচ করে অজায়গায় থামে আমাদের বাহন। সামনের সিট জাপটে ধরেও আমি টাল সামলাতে পারি না। হুমড়ি খেয়ে পড়ি লোকটার কোলের ওপর। ফের হড়হড়িয়ে বমি। তবে তেনার ধৈর্য আছে। গাড়ি থেকে নেমে টিস্যু পেপার দিয়ে ঘষে ঘষে নিজের জামা-প্যান্ট পরিষ্কার করে। আমি রাস্তার কিনারে উবু হয়ে বসে ঘাসের ওপর ওয়াক ওয়াক শব্দে পানি উগড়াই। পিত্ত থলি নিংড়ে নির্গত হচ্ছে তিতা তিতা রস। হায় আল্লাহ, এখন আমার মরণ ভালো। দুই দুইটা মানুষ জানে বাঁচত।

অপারেশন টিমের গাড়ি দুটি সাভার বাজার ছাড়িয়ে নবীনগর মোড়ে পড়েছে। সশস্ত্র সওয়ারিদের ফোনে থামতে বলে লোকটা। তবে ভয়ের কিছু নেই। সোর্স সুস্থ হয়ে উঠছে।

বমির কটু গন্ধে গা-গুলানো ছাড়া আর কোনো অসুস্থতার অনুভূতি নেই আমার শরীরে। গায়ের জামাটা খুলে ফেলতে বরং আরামই লাগছে। পেটখালির আরাম। ভরপেট খাওয়ার তৃপ্তি রিহ্যাবে গিয়ে আমি প্রথম অনুভব করি। তখনই বুঝি মেহনত কী জিনিস আর কামলারা এত খায় কেন। বিশ-পঁচিশটা ঘর ছালা ভিজিয়ে মুছতে মুছতে হাঁটুতে কড়া পড়ে গেল। গোল গোল ছাই-গোলা টিক্কার মতো। ফসলের খেতিতে কাজ করতে করতে পিঠ ঝামা ঝামা। যেদিন রসুইঘরের ভার পড়ত, সেদিন ছিল ঈদ। উপুড় হয়ে তাল তাল আটা ছানা। তারপর বেলনি চেপে ধোয়া মেঝেতে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে গোল গোল রুটি বেলা। টিনের তাওয়ায় খুন্তি দিয়ে উল্টানো মাত্র জিবে পানি চলে আসত। গরম রুটির গন্ধটাও কত সুস্বাদু!

মরা ডালে কচিপাতা মেলা, কুঁড়ি ফোটা সব ওখান থেকেই। তার আগে-পিছে কী-- ভাবতে চাই না। জানালায় মাথা ঠেকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। একবার চোখের পাতা আলগা হতে শুনি লোকটা মোবাইলে বাতচিত করছে। ট্রেনের ঝিকঝিক ঝিকঝিক শব্দে চিড়া-চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে সাঙ্কেতিক শব্দমালা। লোকটা কান থেকে ফোন সরায়। রক্তনাচানো ঝঙ্কার তুলে আমাদের পাশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু উতরে যায় উত্তরবঙ্গের ঢাকাগামী রেলগাড়ি। বাকি পথ দোল দোল দুলুনি ঘুমপাড়ানি গান ছাড়া আমার কানে আর কিছু দোল খায় না।

শহর দূরে রেখে গাড়ির বহর থামে। প্রথম চটকা ভেঙে বুঝতে পারি না এ কোন জায়গা। সঙ্গী-সাথীরাই বা কে। ধাতস্থ হতে খানিক সময় লাগে আমার। ততক্ষণে রাস্তা থেকে নেমে ধইঞ্চা খেতে নাক ঢুকিয়ে দিয়েছে অপারেশনের গাড়ি দুটি। ব্যাকলাইট নিভিয়ে দিতে জাগয়াটা নিঃসাড়। ঝিঁঝিরা ফের ডাকতে শুরু করেছে। কাছের আবনা ঝোপে জোনাক-পোকার ভিড়। যেন বিয়েবাড়ির আলোকসজ্জা, এমন ঝিকমিক ঝিকমিক করছে। গায়ে ধোয়া জামা চড়িয়ে আমি ব্যাগ হাতে গাড়ি থেকে নামি। অগস্ত্যযাত্রা বলে কথা, সঙ্গে আতর-টাতর থাকলেও মাখতাম। লোকটা ড্যাস-বোর্ড থেকে কী যেন তুলে কোমরে গুঁজল। আমি তো ঘাটের মড়া, আমার কাছে গোপন করার জরুরত কী? বলে, ‘পিস্তল, পুলিশ তেরিমেরি করলে কাজে দিবে।’

আমাদের কালো নিশান পাছা নাচিয়ে ফেরত যাচ্ছে। আমি তো কবরে যাচ্ছি, যেখানে আওন আছে যাওন নাই। ফেরার বাহন নিয়ে ভাবনা কী।

বড় রাস্তা বাদ দিয়ে লোকটা বেছে নেয় মেজো কিসিমের একটা অন্ধকার সড়ক। এর আগে ওর হুকুমমাফিক মোবাইল ফোনটা মুক করে বুকপকেটে ঢোকাতে হয়েছে। সে-ও নিজেরটায় তালা-চাবি মারে। এসব করার মানে কী-- প্রশ্ন করা বৃথা। সত্য-মিথ্যা জবাব আসবে। আমি চাঁদ-ডোবা মরা আলোয় অন্ধের মতো ওকে অনুসরণ করি।

এসব জায়গা চার-পাঁচ বছরে বিশেষ বদলায় নাই। তার ওপর আমি ছিলাম নিশাচর। রাতেই ভালো চিনতাম এখানকার পথঘাট। আজ কিছু চিনতে পারি না। আগে তালাইমারির ঘাটে তো হাওয়া খেতে গেছি। পদ্মার শোভা দেখতে গেছি। যখন বাইরম-বাইরম করত মনটা তখনো গেছি। কাউকে ধরিয়ে দিতে যাই নাই। তবু দুলুর সঙ্গে দেখা হবে ভেবে আগের মতো জিবে তিতা-মিঠা স্বাদ চলে আসে। শরীরে কোনো অবসাদ থাকে না। মনে হয় উড়ছি, গাছের শুকনা পাতার মতো এঁকে-বেঁকে বাতাসে দোল দিয়ে। আগের মতো গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে এন্তেজার করবে তো দুলু? আমবাগানের সখা! আমার বিসি!

শুরুতে দুলু কিন্তু আমার ফেনসিডিল খাওয়া পছন্দ করত না। বলত শিক্ষিত মানুষ এসব খান ক্যান। আমার অজুহাত পরীক্ষার পড়া ভালো মুখস্ত হয়। প্রচন্ড ভয় থেকে পড়ালেখা-পরীক্ষা এসব সমীহ করত দুলু। গরিব ঘরের ডানপিটে ছেলে। গুচ্ছিগ্রামে বাড়ি ছিল। তা নদী গ্রাস করে নিলে বাপ বাল-বাচ্চা লয়ে সৎমায়ের বাপের বাড়ি ঘরজামাই হয় আর সে চলে আসে শহরে। সঙ্গে আনে পৈতৃক নামের শেষাংশ জবরদস্ত এক লেঙ্গুর-- সর্দার। পরবাসে চায়ের ভাঁড় বইতে বইতে, ফেনসিডিলের খুচরা ব্যবসা ধরল। তখন কাটা-গালে নিয়মিত রেজার টানে, টেরি কেটে চুল আঁচড়ায়, জিনস গোড়ালির কাছে গুটিয়ে পরে। রোজ রোজ সাবান মেখে পদ্মায় গোসল করা বা পরিষ্কার কাপড় পরায় আলসেমি ছিল না। আমাদের খালি বোতল ব্যাগে ভরত নিঃশেষে তলানিটুকু খেয়ে। এ স্রেফ গলা ভেজানো। মুখে সর্বদা দুধ-উপচানো শিশুর হাসি, ঘুম ঘুম মায়াবি চোখ। এসবই হয়তো ক্যাশ টাকার চেয়ে দামি পুঁজি, যা চোরা-কারবারে খাটাতে বিলম্ব করে না ধূর্ত করম আলি। নেশা জয় করেও শেষ রক্ষা হলো না দুলুর! হেরে গেল কাঁচা টাকার কাছে! তবে এ নিছকই আমার অনুমান, নিজেকে মধ্যরাতে তালাইমারির পথে জায়েজ করার।

কী হতো যদি পথ শেষ না হতো? বিপজ্জনক ভ্রমণপথে কানামাছির মতো ঘুরতাম না হয়। চোখে রুমাল-বাঁধা চোর-পুলিশ খেলার দিন ফুরিয়েছে। লোকটা ঘন ঘন টর্চ মারে। আমরা নেমে পড়েছি খোয়া বিছানো চিপা গলিতে, যার দুধারে ফাঁদ পাতা উদলা ড্রেন। রাস্তার কুত্তাগুলি ছোটাছুটি করছে। চলন্ত অবস্থায়ও মশা আমাদের ছেঁকে ধরে, কানের পাশ দিয়ে ভ্যানভ্যানিয়ে উড়াল দেয়।

বাবলা গাছে শনশনিয়ে হাওয়া বইছে। বাতাসটা কেমন সোঁদা সোঁদা। কাছেই নদী। দিগন্ত-ছোঁয়া বিস্তীর্ণ চরের ওপাড়ের গ্রাম থেকে মোরগের ডাক ভেসে আসছে। কত চেনা-অচেনা। আমার পা চলে না। দুলু তো আমের দিনের দাওয়াত দিয়েছে। আমি তা কবুলও করেছি। এখন সবে হেমন্ত ঋতু। শীত শীত কুয়াশা জড়ানো রাতের শেষ প্রহর। কোন মুখে তার সামনে দাঁড়াব! এর চেয়ে রুখে দাঁড়ানো ঢের ভালো, নিদেন লাফিয়ে পড়ে নর্দমার পঙ্কে গড়াগড়ি যাওয়া। পিঠে উড়া গুল্লি লাগুক, কুত্তায় গা চাটুক, তবু আমি তালাইমারির ঘাটে যাব না।

ঘাটে যাব না! এ যেন শ্রী রাধর আবদার। আমি নিজেকেই নিজে মশকরা করি। ঢাকা থাকতে কীভাবে অন্ধ হয়েছিলাম? ছায়ার ভয়েই কাবু। এখন এতগুলি কায়া সামলাবো কেমন করে। বাতাসে তুলার মতো হাপিস হয়ে যাব না!

যাই হোক, তালাইমারির ঘাটে আমাদের যেতে হয় না। গলির মুখের চা দোকানে দুলুকে দূর থেকে দেখেই আমি চিনে ফেলি। অলওয়েজ ভিজি, আগের মতো পিরিচে চা ঢেলে খাচ্ছে। কোমর-প্যাঁচানো গামছার দেহাতি মানুষ। গা-ভর্তি চাপ চাপ ভিজা বালু। বেশভূশায় জুনিয়র-সিনিয়র কোনো টেররেরই মনে হয় না। মানুষ তো ঘরের চৌকাঠ থেকে বেজুইতে পড়েও গাল কাটে, এমনকি পটল তোলে। লোকটা ঘাটের দিকে আগ বাড়ালে আমিও দুলুকে না চেনার ভান করে তার পেছন পেছন কিছুদূর এগিয়ে যাই। যখন ভাবছি ফাঁড়া কেটেছে, তখনই ‘হাদি ভাই, হাদি ভাই’ বলে তারস্বরে দুলুর চিৎকার।

কপালে মরণ থাকলে এই হয়!

আমি দুলুর সঙ্গে লোকটার পরিচয় করিয়ে দেই।‘ঢাকার দোস্ত। আমরা একটু আগে নাইটকোচ থেকে নামছি, ওই তো ছক্কার মোড়ে। পদ্মার ঘাট-মাট ঘুইরা-ফিরা দেখার শখ আর কি। পারবা না দুলাল এট্টু টাইম দিতে?’

‘কী বুইলছেন গো হাদি ভাই? আপনে চুল ছাইটে মিলিট্রি সেজে আইসেছেন!’ একখান আল-টপকা জবাব দিয়ে চোখের কোণা মুচড়ে তাকায় দুলু সর্দার। আমার মনে পড়ে ও বরাবরই সাবধান, গরজ দেখালেও ফেনসিডিল নিয়ে ইবলিশ চত্বরে ঢুকত না। কাজলার গেট দিয়ে জুবেরির লাগোয়া পার্কে এসে টোপ ফেলত, বড় জোর কাছের গরু-চরা আমবাগানে। এ কয় বছরে মনে হয় আরো সেয়ানা হয়েছে। অচেনা লোকটার আপাদমস্তক মাপছে। ঢাকার দোস্তকে আড়ে-লম্বায় মাপতে মাপতে গরম পানিতে কাপ ধুয়ে আরো দুটি চা লাগাতে বলে দুলাল সর্দার।

‘এত সাধু অইলা কবে! টা না খাওয়াইয়া চায়ের অর্ডার দেও?’

দুলু আমার কথাটা বোঝে আবার বোঝেও না। নতুন মানুষের সামনে যেন শরমে মাথা কাটা যাচ্ছে, পায়ের নখ দিয়ে মাটি খোঁড়ে। দুলুর দোনামোনার ফাঁকে চায়ের কাপে দুধ-চিনির বাড়ি পড়ে।

ঢাকার দোস্ত আড়চোখে ঘড়ি দেখলেও আমি পাত্তা দেই না। জুনিয়ার টেরররে আঙুল দিয়ে চিনাই দেওয়ার কথা, আমি গায়ে পড়ে পরিচয়ও করাই দিছি। তোমার কথামতো ফেনসিডিল আনতেও কইলাম। টেরর কথা না শুনলে আমার কী!

হাতে গরম চায়ের কাপ নিয়ে আমি লোকটার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসি। দুলুরেও আমলে আনি না। আমার বাক্যি শেষ, যা হওয়ার হবে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমি এনার্জিপ্লাস বিস্কুটে কামড় বসাই। আমার দৃষ্টি দূরে, সামনের গলিপথটার শেষ মাথায়, যেখানে শহর রক্ষা বাঁধের বড় বড় গাছগুলি অন্ধকার ঠেলে উঁকি মারছে। ফিসফিসিয়ে কথা কইছে প্রাচীন কোনো ভাষায়। নিচে ক্ষীণাঙ্গী পদ্মা। খোল-ডোবা বালুর নৌকার ভটভট আওয়াজ শুধু শোনা যাচ্ছে। কুয়াশার ধূসর আভায় চর জেগে উঠছে বুকে সাদা সাদা বালু নিয়ে। ওখানে আজও ঝাঁক বেঁধে বক নামবে ভাবতেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ঢাকার দোস্তের কাপে উবু হয়ে বাড়তি চিনি মেশাচ্ছে দুলাল সর্দার। পাকা হাতে চামচ নাড়ার টুং টুং আওয়াজ। কারে সমাদর করে চা খাওয়াচ্ছে দুলু! পাশেই রাবনের চিতা জ্বলছে। এসব চুলা থেকে কদাচ কেটলি নামে না। বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে সারা রাত টগবগিয়ে চা ফোটে। দেদার দুধ-চিনি মেশানো জিহ্বা উল্টে যাওয়ার মতো কড়া স্বাদের চা। তাতেই একদিন সুখ ছিল।

সুখের নাগরদোলা আচমকাই থেমে যায়। একটি চিরকুট আসে ঢাকার দোস্তের কাছ থেকে। লেখা করম আলি! তার মানে সিঙ্গল প্রমোশনে হবে না, ডবল চাই। আমি ঝন্টু-মন্টু কে কেমন আছে বলে চটজলদি করম আলির কুশল-সংবাদে চলে আসি।

দুলু মাথা দোলায়। বসের অবস্থা নাকি যখন-তখন। দুইডা কিডনিই শেষ। পায়ে পানি চলে এসেছে। সেই টুল থেকে ঝোলানো পা, চা খেতে খেতে আমি ভাবি, গোদা গোদা তখনই ছিল। এখন না জানি কেমন।

করম আলির বিমারির সংবাদ দিতে দিতে কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ে দুলু। জিহ্বার আঁটসাঁট ভাবটাও তিরোহিত। ‘রাইতে বশের ঘুম হয় নি! জেগে-জেগে আল্লাবিল্লা কুরছেন গো। ফোনে কথা বুইলবেন হাদি ভাই’ বলেই নম্বর টিপে মোবাইল বাড়িয়ে ধরে দুলাল সর্দার--‘এই লেন’। আমি না না বলে বেঞ্চি থেকে লাফিয়ে নামি। লোকটা সাঙ্কেতিক ভাষায় জানায় আর মাত্র কুড়ি মিনিট। অর্থাৎ ধইঞ্চা বনে অপারেশন টিম ছটফটাইতেছে। কুড়ি মিনিটের বেশি মশার কামড় সহ্য করা হবে না। এর শানেনজুল না বুঝেই দুলু আঁতকে ওঠে, ‘মাত্র কুড়ি মিনিট! কী বুলছেন গো হাদি ভাই? এত তাড়া যুদি, আইসলেন কেনে? এর মধ্যি টা-ফা কী কুইরবো? আমার বুলে মাথা খারাপ হচ্ছে গো।’

ফাঁদে ধরা দিলি, ওরে ত্যাঁদড় দুলু! আমবাগানের সখা! আমার বিসি! আমার বুকের মধ্যে একটা পাহারাদার কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাক ছাড়ে।

তিন জন মিলে শলাপরামর্শ করে সাব্যস্ত হয়, দুলু যাবে ফেনসিডিল আনতে। আমরা মৌজ করে বসব করম আলির ঘরে। সুখ-দুখের কথা কইতে কইতে মাল চলে আসবে। এই সাদাসিদা কথা কয়টা দুলু মোবাইল ফোনে সাদা দিলে করম আলিকে জানিয়েও দেয়।

আমরা পথে নামি। এবার দুলু সামনে। লোকটার পেছনে আমি। দোস্ত-দুশমন এক কাতারে-- জানটা খোদার হাতে সঁপে হাঁটছি। যে রাস্তা দিয়ে আমি আর লোকটা তালাইমারির ঘাট অব্দি পৌঁছে গিয়েছিলাম, দুলু সে পথেই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন অন্ধকারের ঘনঘটা নেই। রাস্তার ধারে শুকাতে দেওয়া গোবরের ঘুঁটে, ঘাসের ডগায় জমা বিন্দু বিন্দু শিশির কণা-- সব স্পষ্ট। লোকটা ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে, কপালে বড় বড় ভাজ। ভোর হয়ে যাচ্ছে। প্ল্যানটা মনে হয় ভজকে গেল।

বিস্তর হাঁটাহাঁটির পর নদীর দিকে মুখ করা একটা চিপা গলির মাঝখানে দুলু থামে। গলির দুই ধারেই গায়ে গা-লাগা ঝুপড়িঘর আবছা অন্ধকারে ডুবে আছে। তস্যগলির ফাঁক দিয়ে একটা বরফ-সাদা নিস্তেজ আলোক রেখা রাস্তায় পড়েছে। হাতে সময় কম। দুলু আমাদের সেদিকে যেতে বলে নিজে ফেনসিডিল আনতে চলে যায় রাস্তার আরেক পাশের ঝুপড়িতে। আমিও ওর পেছন পেছন পা বাড়িয়েছিলাম, হয়তো বলতে চাচ্ছিলাম-- দুলু শিগগির পালা! এই তোর সুযোগ। আচমকা মনে হলো পিঠে বাঘের থাবা, অসুরের শক্তিতে আমাকে বাত্তির দিকে ঠেলে দিয়ে লোকটা নিমেষে গায়েব হয়ে যায়।

খেলা শুরু হয়ে গেছে। কাশগাছে বোনা একটা খোলা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কাঁপছি। পাশেই ছাগলের খোয়াড়। পা ধাপাধাপির আওয়াজ আসছে। বাড়িতে ঢুকব না নদীতে ঝাঁপ দিব? লোকটা ফের গলির মুখে উদয় হতে আমি সুড়সুড়িয়ে খোলা গেট দিয়ে ঢুকে পড়ি।

‘কী মামুর বেটা, মামুবাড়ি আইসবেন তো ডরাও কেনে? আমি বাঘ না ভালুক?’ ঘরের দাওয়া থেকে করম আলি আমাকে সানন্দে ডাকে। গলায় লম্বা তজবিমালা, মাথার টুপি। কপালদিষ্টে আলগা তার থেকে একটা বালব ঝুলছে। এই সেই আলো বিলানো এনার্জি সেভিং বালব, যার সাদা রেখা রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। সবে তাহাজ্জতের নামাজ শেষ করেছেন করম আলি। চৌকিতে না পেতে নামাজের মছল্লাটা তার কোলের ওপর বিছানো। তাতে কাবাশরিফের তজবির। এমন রক্ত হিম করা পরিবেশেও তার মুখের ওপর উল্টা করে ধরা ইংরেজি কাগজের কথা আমার মনে পড়ে। করম আলি ব্যাখ্যান করেন, পা ভাঁজ করতে পারেন না বিধায় চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে কোলে মছল্লা পেতে সিজদা দিতে হচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে গোল করে জায়নামাজটা পাকাচ্ছেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার চোখ-কান গেটের বাইরে। বারবার চৌকিতে বসতে বলা সত্ত্বেও আমি করম আলির হাতের নাগালের বাইরেই থাকি। সে সময় ধুম করে বাত্তি চলে যায়। যাক বাঁচা গেল। তার ছুরির মতো ধারালো দৃষ্টি সহ্য হচ্ছিল না আমার। কিন্তু করম আলির মুখে অজস্র খিস্তি-খেউর। সরকারের পিন্ডি চটকে তিনি পড়েন ঘরের বউ-ঝি আর বালবাচ্চাদের নিয়ে। তারা যে নামাজের ওয়াক্তে ঘুম পেড়ে শয়তানের ডিমে তা দিচ্ছে, এ নিয়ে লম্বা কাসুন্দি। রোগা-ভোগা রাতজাগা মানুষ করম আলির নসিহত আর থামে না। পরকালের বিধান শুনতে শুনতে আমিও কেমন আনমনা হয়ে যাই। সে তো আর দূরে নয়। আর কয় মিনিটের দুনিয়া! ঘরের টিনের বেড়ায় কাত করে রাখা একটা জলচৌকি টেনে করম আলির পায়ের কাছে বসে পড়ি। বসেই বুঝি যে, এর পায়া ভাঙা। তখন কিচ্ছু করার থাকে না। আওয়াজটা কিসের? দাওয়া থেকে আমার দশাসই শরীরটা আঙিনায় পড়ার! শোয়াবস্থায় আরেকটা গুলির শব্দ। দুলুরে খতম করে দিলো জল্লাদরা! খোলা গেটের সামনে দিয়ে লম্বা লম্বা কতগুলি পা ছুটে যাচ্ছে। বাড়িটা মনে হয় ঘিরে ফেলল! করম আলি দাঁড়িয়ে গেছে ফোলা পায়ের ওপর ভর দিয়ে। হাতে উঁচানো লাঠি। আমি হামা দিয়ে উঠে বসেই ব্যাগটা বগলে নিয়ে দেই ছুট। ‘অই তুই কেডা? এ মানুষ না আজরাইল গো! বিহান বেলা জান কবজ করতে আইসাছিস!’ এর বেশি করম আলির চিৎকার আর শুনতে পাই না। আমি পালাচ্ছি সিঁদকাটা চোরের মতো। নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু। তখনো ভাবতে পারছিলাম বিনোদপুর গেট বরাবর দৌড়ে আমাকে বড় রাস্তায় উঠতে হবে। জায়গাটা তালাইমারি থেকে দূরে আর ওখানে ঢাকাগামী বাস দাঁড়ায়।



কখন নদীটা সাঁতরে পার হলাম। আমার যাওয়ার কথা তো বিনোদপুর। এদিকে আসার বুদ্ধিটা কে দিলো। আমার শরীরের আধখানা পানিতে, বাকি আধেক ডাঙায়। মাথা তুলে দম নিতে গেলে নাকের ফুটা দিয়ে চরের শুকনা বালু ঝুরঝুরিয়ে পড়ে। বুকে বাতাস আটকানো হাঁসফাঁস অনুভূতি। সেসময় কাশবন ফাঁক করে কাটা-গালে হেসে ওঠে দুলাল সর্দার। হাতে বাজারি ব্যাগ। ব্যাগ নাচাতে নাচাতে দূর থেকেই কয়, আপনে ফেনসিডিল খাইতে চাইলেন বলে আইজ আমি বাঁচছি। ঘাটে ফিরা গেলে মরণ ছিল আমার। করম আলির বালুর নৌকা সব তছনছ কইর‌্যা হালছে শুয়ারের বাচ্চারা।

এমন পরদেশি ভাষায় কথা কয় কে-- দুলু? দুলাল সর্দার বেঁচে গেছে! তাহলে বুক খামচে ধরে বেঁকা হয়ে আছে কেন। আমি চোখের পাতা থেকে বালু সরিয়ে নিরিখ করে দেখি। দুলু হাসে, যদিও তার গায়ের কোর্তা চিপলে পোয়াটাক রক্ত ঝরবে। হৃদপি-টা মনে হয় পুরোপুরি ছ্যাঁদা হয় নাই। আমি মিনতি করি-- দুলু ডাক্তারখানায় চলো। এহনো তোমার আশা আছে। কথা শোনে না দুলাল সর্দার। চরের ঢালের কাদা মাটিতে তার লম্বা ছায়াটা দুলে ওঠে। সে আয়ু ক্ষয় করতে করতে হেঁটে যায় সূর্যের উল্টা দিকে। পেছনে আঁকাবাঁকা রক্তের স্রোত। পরনে ছোটবেলার জিনস। হাতে চায়ের কেটলি। চোঙা ফোঁকা গলায় হাঁক দেয়-- চা গ্রম চা গ্রম...

তাতেও বোধ হয় আমার চেতন আসত না, যদি না বুকপকেটে মোবাইল ফোনটা খিঁচুনি দিয়ে পাশ ফিরত। কে অসময়ে মিসকল দেয়, না টেক্সট ম্যাসেজ। যখন-তখন আপন খেয়ালে ছোট ছোট বার্তা পাঠাত রিমা। এখনো ইনবক্স ভর্তি সেসব ক্ষুদে প্রেমপত্রে। বুকে হাত বুলিয়ে আমি চোখ মেলি। এ কেমন জায়গায় বাসটা থামল? রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে! আমি দড়ির নেয়ারে পর্দার কুচি ছড়িয়ে দিয়ে সিটে ডুব দেই। চা-অলার মাথাটা এক ঝলক কেবল নজরে পড়েছিল, তাতেই বুকের ধড়ফড়ানি চরমে উঠেছে। সেই টেরি-কাটা চুল!

লোকাল বাস। স্টার্ট বন্ধ করে মরা মাছের মতো রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছে। কখন ছাড়ে ঠিক আছে! এর মধ্যে চা-গ্রম হাঁক দিতে দিতে সে বাসে উঠে না এলেই বাঁচি।

আমি তো বেঁচেই আছি। ঢাকা ফিরে যাচ্ছি। দুলু, করম আলির কী গতি হলো, তা জানার জন্য পরদিনের খবরের কাগজের অপেক্ষা করতে হবে। ফের ফেরিঅলার হাঁক। এক বা-িল কাগজ বগলে চেপে গোত্তা মারতে মারতে আমার দিকে আসছে। আমি কি পর্দা তুলে বাইরে তাকাব? চোখ বুজে ঘুমের ভানও করতে পারি। নাকি পকেট থেকে বের করব মোবাইল ফোন? এই একরত্তি যন্ত্রের কী অপার মহিমা। চোখের সামনে ধরামাত্র তামাম দুনিয়া লোপাট হয়ে যায়। এর গহিনে আমি ডুব দিতে পারি, যেখানে বিলুপ্ত প্রেম এখনো অতন্ত্র প্রহরীর মতো জেগে আছে।

আমি নিচু হয়ে পকেটে হাত ঢুকাই। শক্ত করে মুঠোতে চেপে ধরি ফোনটা। খানিক টেপাটিপির পর এর ক্ষুদে পর্দায় ভেসে ওঠে সদ্য আসা একটি সংক্ষিপ্ত টেক্সট-- থ্যাংকস।

আমার দেশপ্রেমের পুরস্কার।


রচনাকাল : অক্টোবর-নভেম্বর ২০১০

লেখক পরিচিতি
শাহীন আখতার
বিগত দুই দশক ধরে শাহীন আখতার লেখালেখি করছেন। ইতোমধ্যে সিরিয়াস লেখক হিসেবে সাহিত্য জগতে সুনাম অর্জনও করেছেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘তালাশ’ প্রথম আলো বর্ষসেরা বই-১৪১০ পুরস্কার লাভ করে। তিনি গল্প ও উপন্যাসের পাশাপাশি বেশ কিছু সাহিত্য সম্পৃক্ত বই সম্পাদনা করেছেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সতী ও স্বতন্ত্ররা- বাংলা সাহিত্যে নারী’ তিন খণ্ড অন্যতম। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে শাহীনের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘ময়ূর সিংহাসন।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন