বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

অসাম্প্রদায়িক

রাসেল আল মাসুদ
শ্মশান

কবির কোনো ধর্ম নাই। শ্মশান থেকে পাকা রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে রবিজল মিত্র। কবির কোনো পিছুটান নাই। কিন্তু আসলেই কি নাই? পিছনে ফিরে তাকানোর ইচ্ছেটা তো সাপের জিভের মতো শাখান্বিত হয়ে উঁকি দিচ্ছে। একবার কি পিছনে তাকানো যায় না? এটা ভাবতে না ভাবতেই রবিজল তার লম্বা কোঁকড়ানো চুলসহ মাথাটা ঠিক একশো আশি ডিগ্রি ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকায়। কিভাবে সে এটা করলো এই প্রশ্ন তার মনে জাগে না। তার মাথায় ঘুরপাক খায় কেনো সে পিছনে তাকাচ্ছে। সে দেখে কবির দেহের অন্তেষ্টিক্রিয়া চলছে। লাজরক্তিম আগুন সংকোচে তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। আর পাঁচজন আলো-আঁধারীর মানুষ তাড়িয়ে তাড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। এদের শরীরে আগুনের বিপরীত খেলা। সবচেয়ে বয়স্ক লোকটি তার পাশের জনকে বলে, শালার আগুনের বাড় নাই। আষাইঢ়্যা ম্যাঘা হলো অগ্নিদ্যাবের শত্তুর। ক্যারাসিন আছে রে ভূতো আরো? ভূতো কোনো উত্তর দেয় না। ভূতগ্রস্তের মতোই একটানা সে ম্রিয়মান আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ যখন তার সম্বিৎ ফিরে আসে সে মাটিতে পড়ে থাকা কোকের বোতলের মুখ খুলে যেনো খুব অনিচ্ছার সাথে মড়ার শরীরে কেরোসিন ছিটাতে থাকে। কবির শরীরে বৃষ্টি পড়ে। এই বৃষ্টি ভিজিয়ে দেওয়ার চেয়ে জ্বালিয়ে দিতেই বেশি পছন্দ করে। তবে আরেক ধরণের বৃষ্টি এই স্থান থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে আরেকজনের শরীরে পড়ছে। গোরস্থান পাড়ার সেই বৃষ্টি তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছ্যান-ছ্যান ধ্বনি তুলে নির্বিকারভাবে আরেকজন মানুষকে নির্জনে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। পরে আমরা তার মুখ থেকেই তার কথা শুনবো। এদিকে কাঠের জ্বলন্ত অঙ্গারগুলোকে আরেকটু উষ্কে দিতেই আগুন পটপট শব্দ তুলে মড়ার শরীরকে গ্রাস করে ফেলে। আগুনের উড়ন্ত আঁচল সমস্ত শরীরকে লোভীর মতো গিলে ফেললে রবিজল আর তার শরীরকে দেখতে পায় না। মাথাটা আরও একশো আশি ডিগ্রি বাঁকিয়ে সে সামনে তাকায় এবং শরীর থেকে খাবলা খাবলা মাংশ ওঠা পাকা রাস্তায় উঠে হাঁটা শুরু করে। এই রাস্তাটি শ্মশানঘাট থেকে শুরু করে পূর্বপাড়ার গোরস্থানে গিয়ে তার হাড়সর্বস্ব যাত্রা শেষ করেছে।



চাপাতি

মাথার উপরে জোছনা নেই, সূক্ষ্ম ধারালো চাঁদ আছে। সেই চাঁদের চাপাতির মত বাঁকা পিঠ শাদাকালো মেঘ কেটে কেটে আকাশের বুকে রক্ত ছড়িয়ে দেয়। রবিজল মিত্রের শূন্য করোটিতে উড়ে বেড়ায় চাঁদের সাম্প্রদায়িক চরিত্র। খাদিজা এটাকে হিলাল বলতো। শান্তি, পবিত্রতা এবং মহিমার প্রতীক এই হিলাল। অথচ রাস্তার দু’ধারে বিস্তৃত ধানক্ষেতের অন্ধকারে হাজার খানেক ঝিঝি পোকা সমস্বরে এই চাঁদের বিরুদ্ধে এই মূহুর্তে শ্লোগান দিচ্ছে। এবং একদল অভিমানী ব্যাঙ কী করুণ স্বরে প্রার্থনা করছে খাদিজার ওড়নার কাছে। পূর্ণিমার জন্য এ প্রার্থনা- যার নরম আলোতে থাকবে খাদিজার আতরের খোশবু। চারদিকে ঝাঁক ঝাঁক মৌমাছির গুঞ্জরণ। রবিজল খুব ভালো করেই জানে এই গুঞ্জরণ হলো খাদিজার কোরান তেলাওয়াতের গুঞ্জরণ। গত জীবনে এই ধ্বনিপুঞ্জ তার মনে মারিইহুয়ানার আবেশ ছড়াতো। চোখ বন্ধ করলে সে উড়ে বেড়াতো শব্দ থেকে শব্দে। ধ্বনিপুঞ্জের এক চাক থেকে আরেক চাকে। ও গুনগুন করতো- ইন্না আ তইনা কাল কাউসার, ফাসাল্লি লি রাব্বুকা অনহার, ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার।

-কী হইলো? চোখ বন্ধ করি আছো ক্যান?

-ভাসতেছি। ভাসতে ভাসতে ভাবতেছি। গতকাল হুজুর জুম্মার নামাজে আমাদের নিয়া বয়ান দিছে। হুজুর মুসুল্লি খ্যাপায় তুলতেছে। মিত্রটা কাটি দিয়ে হক বসালে ক্যামন হয়?

-ক্যান কাটবা? তুমি কাটবা না। দেখি কেটায় কী করে।

কে কী করেছে তার সবটুকু খাদিজা দেখে নি। ঘাড় ঘুরিয়ে সে শুধু একটা দৃশ্যই দেখেছে। একটা চকচকে চাপাতি বাঘের মতো হিংস্রতায় ছুটে আসছে রবিজলের মাথার দিকে। কী করতে পারতো সে- চিৎকার, প্রতি আক্রমণ, নাকি পলায়ন? এসব কিছুই না করে হরিণীর মতো একটা নিঃশব্দ লাফ দিয়ে সে নির্ভুলভাবে চলে গেছে চাপাতির নিচে। রবিজলের অজান্তেই একটিমাত্র আঘাতে ভেদ হয়ে গিয়েছে খাদিজার হিজাব ঘেরা করোটি। এরপর রক্তের ফিনকি, খাদিজার আর্তনাদ, দৌড়ানোর শব্দ এবং ঘাড়ের উপর একটি লক্ষচ্যুত কোপ রবিজলের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়।


শূন্যতা

ব্রহ্মপুত্র রংছড়ি নামক একটা জায়গায় এসে তার রঙ বদলে ফেলে। নদীর শরীর ক্রমশ লাল থেকে আরো লাল হয়। লালের নিচে ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ। ছলাৎ-ছলাতের ব্যাকগ্রাউন্ডে মৌমাছির গুনগুন ধ্বনি। কতক্ষণ, দশ মিনিট, অথবা বিশ, অথবা ঘণ্টাখানেক পর গুনগুন থেমে গেলে রংছড়ি জামে মসজিদের ইমামের গলা শোনা যায়। চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা তার স্বভাব। এখানেও সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, আপনাদের জন্ম কি মোসোলমানের ঘরে হয় নাই? সমস্বরে জবাব আসে- হ্যাঁ হ্যাঁ। তাহলে আলবৎ আপনেরা ঘাস খায়া মোসোলমান হছেন। চরাচর ব্যাপী পিনপতন নীরবতা। বলেন, আপনেরা কি ঘাস খায়া মোসোলমান হছেন? এবার সকলের আকাশভেদী ধ্বনি- না না না। আপনাদের গায়ে কি মোসোলমানের লোহু আছে? আছে আছে- আরও দৃঢ় এবং মুষ্ঠিবদ্ধ জবাব। তাইলে একটা মালাউনের বাচ্চা ক্যামনে একটা মোসোলমান আওরাতের সাথে তিন মাস ধরি আপনাদের চোখের সামনে জ্বেনা করি পার পায়া যায়? চারদিকে শতশত কণ্ঠের প্রচন্ড হই হট্টগোল। মার! শালার মালাউনক কুপায় মার! আহারে! মানুষটাক মারি ফেললো রে। মহিলার মগজ বারায়া গেছে। বেঁচে আছে, বেঁচে আছে এখনো। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি। ধাতব ধারালোর টুংটাং শব্দ। বাম কাঁধে হঠাৎ প্রচণ্ড যন্ত্রণা বোধ হয়। যন্ত্রণা বাড়ছে তো বাড়ছেই। মনে হয় অনন্তকাল ধরে তাকে এই যন্ত্রণা বহন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আর সহ্য করতে না পেরে চোখ খোলে রবিজল মিত্র। সে শুয়ে আছে রংছড়ি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার ঠিক সামনেই একটা স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল। কাঁচের দেয়ালের এইপাশে একজন ইন্টার্নি ডাক্তার এবং দুইজন নার্স, আর ওইপাশে সাংবাদিক, প্রকাশক, কবিবন্ধু এবং ভক্ত পাঠক। কিন্তু কোথাও খাদিজা নেই।


অসুখ

রবিজল এখন পূর্বপাড়ার কাছাকাছি। আর মিনিট দশেক হাঁটলেই খাদিজার কাছে যাওয়া যাবে। এই হাঁটা মনে হয় জন্ম-জন্মান্তর ধরে বহন করা এক অশেষ ব্যাধির নিরন্তর প্রকাশ। কতদিন যে পূর্বপাড়া থেকে পায়ে হেঁটেই সে শ্মশান, স্টেডিয়াম, স্টেশন সব পার হয়ে পশ্চিম পাড়ায় গিয়েছে সে হিসাব শুধু এই রক্ত মাংশহীন রাস্তার কঙ্কালই সঠিক দিতে পারবে। রাস্তা কষে যাক সেই হিসাব। রবিজল তো হিসাবের ধার ধারে না। সে শুধু মানুষ দেখে। মানুষের ভিতর মানুষ। ভিতর-মানুষের ভিতরের মানুষ। কী স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি মানুষ পথ হাঁটে! হেঁটে হেঁটে চোখ বন্ধ করে রোগ নিয়েই একদিন মাটির পেটে ঢুকে যায়। চা-গারাম চা-গারাম বলে সারদিন চেঁচিয়ে বেড়ানো লোকটি থেকে শুরু করে রংছড়ি শহরের মেয়র - সবাই একই রোগের গল্প লেখে ভিন্ন অক্ষরে, ভিন্ন ভাষায়। তবে রবিজলের বিষ্ময় এখানে নয়, তার বিষ্ময় মানুষের বিচ্ছিন্নতায়, মানুষ থেকে মানুষের দূর্বোধ্য দুরত্বে। এই যে তিন মাস যার সাথে সে একই খাটে ঘুমালো, যার হৃদপিণ্ডকে কথা-বলা-গোলাপের মতো হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রতিদিন ঘ্রাণ শুঁকলো সে আজ জীবন যাপন করে চিরতরে আটকা পড়া এক নিঃশব্দ স্থান-কালে। আজকের কথা না হয় বাদ দিলাম। যখন আমি তার সাথে শুতাম তখনো কি ছুঁতে পারতাম তাকে? কতদিন কি এমন হয় নি, ওর বুকে হাত রাখার পর আঙ্গুলের ফাঁক গলে হিম অন্ধকার বেরিয়ে যেতো। মুঠোর ভিতর পড়ে থাকতো চামড়ার গন্ধঘেরা রবারের গোলাপ। এমন অনেক হয়েছে আমার। তবু আমার মধ্যে একটা তৃষ্ণাকে বাঁচিয়ে রাখতো ও। নিজেকে যদি একটা দ্বীপ ভাবি তবে তৃষ্ণাটা ছিলো একটা নিরবিচ্ছিন্ন ভূ-খণ্ডকে ছোঁবার। আর এটাই আমাকে প্রতিদিনের জ্বালানী যোগান দিতো। আমার মনে হয় প্রতিটি মানুষই দ্বীপ-ভাবা রোগে আক্রান্ত। আর বেঁচে থাকা প্রত্যেকেই এই রোগের একটা নিজস্ব ওষুধ গ্রহণ করে। আমার ওষুধ ছিলো খাদিজা। খাদিজার ওষুধ ছিলো স্বপ্ন। তার স্বপ্নের শিকড় ছিলো বৃক্ষের নরমতম ফুলটির বোঁটায়। ইমাম সাহেবেরও ব্যাধি আছে। সেও ওষুধ গ্রহণ করে। তার ওষুধ কি সেটা আমি খুঁজেছি ওষুধহীন অবস্থায়। কিন্তু খোঁজা শেষ না হতেই এখন হাঁটা দিতে হচ্ছে পুর্বপাড়ার গোরস্থানে।


আলোকমিস্ত্রি

মোখলেস উদ্দিন মিয়া রবিজলদের পাড়ায় ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করতো। কিন্তু তবু সে গোটা শহরে পরিচিত ছিলো মোখলেস হুজুর নামে। কোনো এককালে সে দাখিল পাস করেছিলো গ্রামের এক মাদ্রাসা থেকে। তারপর কোথাও সুবিধা করতে না পেরে রংছড়ি শহরে এসে শিখে নেয় ইলেক্ট্রিকের কাজ। ধীরে ধীরে সে এই কাজে পারদর্শীতা লাভ করে। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। কিন্তু গালভর্তি চাপ দাড়ির সাথে আজানুলম্বিত শাদা পাঞ্জাবিই হোক অথবা কোনো এককালে মাদ্রাসা পাস করার জন্যই হোক, সে সবার কাছে পরিচিত হয় মোখলেস হুজুর নামে। অন্যান্য ইলেক্ট্রিশিয়ানকে মানুষ তুই তোকারি করলেও মোখলেসকে সবাই আপনি সম্বোধন করে। রবিজল তাকে ডাকতো আলোকমিস্ত্রি বলে। এই শব্দটার ঠিক কয়টা ডাইমেনশন মোখলেছ ছুঁতে পারতো তা জানার সময় মনে হয় এখন চলে এলো। কারণ, অপ্রত্যাশিতভাবে সে এই নিশুতি শেষরাতে গোরস্থানের সামনের ল্যাম্পোস্টের নিচে তার হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। ল্যাম্পোস্টের কাছাকাছি যেতেই রবিজল বুঝলো মোখলেস উদ্দিন মিয়ার সামনে পড়ে আছে আলোকমিস্ত্রির অদ্ভুতদর্শন লাশ। মুখে তীব্র যন্ত্রণার এক অভিব্যাক্তি। চোখদুটো কোটর ঠিকরে বেরিয়ে আসলে যেনো আরাম পায়। শুধু করোটির দিকে টেনে ধরে রাখা শিকড়ের জন্য তারা মুক্ত হতে পারছে না। পাশ থেকে মোখলেস নীরস গলায় বলে, কবিদা যান কোন্টে?

-গোরস্থানে যাই। আপনি যাবেন না?

-নাহ। ভয় লাগে। আর তাছাড়া জানাজাটা হয়া যাক, একবারে শরীলটাক সাথে করিই নিয়া যাই।

- ভয় কিসের? আমি তো যাচ্ছি।

- রাত একটার দিক ঘুম ভাঙিল ভ্যাপসা গরমে। গাও-পাও ঘামি ন্যাদন্যাদা অবস্থা। উঠি ছাদের উপুর গেলেম। পুরা শহরের যে দিকে চোখ যায় খালি আন্ধার। সেই আন্ধার য্যান কলজের ভিতর পিঁপড়ার মতন কুটকুট করি কামড়ান শুরু কল্লো। মাথার ভিতরটা আউলি গেলো ভাই। বউওক ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে থুয়ে মই নিয়্যা বাইর হলেম। হাতোত টর্চ লাইট নাই, চাঁন্দের সলক নাই, এই রংছড়ির তামান আন্ধার য্যান ন্যাংটা ভূতের মত খেলবের লাগিল চারপাশে। হঠাৎ দেখি সামনের পোলে টেরান্সমিটার। মানে সামনেই গোরস্থান। বুকটা ক্যামন ছ্যাৎ করি ঊঠলো। একদিকে পিঁপড়ার কামড়ানি, আর একদিকে গোরের ভূতের ভয়। লা ইলাহা ইল্লা আন্তাসসুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জলেমিন আর আয়াতাল কুরসি মুখোত নিয়্যা উঠি গেলেম মইওত। প্লাস টেস্টার মাত্তুল পিছনের পকেটে অলটাইম থাকে। হাত দিলেম পিছনের পকেটে। এই পকেট হাতড়াই, অই পকেট হাতড়াই প্লাস আর পাই না। কে য্যান বলতেছিল হাত দে, হাত দে, তুই হাত দিলেই কারেন্ট আসবে, আলো আসবে। নূরের মত আলো, মানুষ লওহে মাহফুজের আলোয় চোখ ধুবে। আর ওইদিকে কথা বলে কাউসার নদের রূপার পানি, জোছনাকেশী সবুজ রানী। আলোকমিস্ত্রী নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। খালি হাতেই খুব অবহেলার সাথে সে শুরু করে ইলেক্ট্রিকের তার নাড়াচাড়া। রূপার পানিতে হাত ভেজা হয়ে আসে, শরীরে পড়ে টুপটাপ সবুজ বৃষ্টি। হয়তো দুই-তিন মিনিট। তারপরই শহরের নিজস্ব নিয়মে চলে আসে বিদ্যুৎ। আর আলোকমিস্ত্রি দুই হাতে দুই তারের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক প্রান্তের যাবতীয় নগ্ন অবিশ্বাস এবং বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং শত্রুতা, ভয় এবং নিরাপত্তার যন্ত্রণাকর চিহ্ন নিয়ে নির্জনে আলোর পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।



অসাম্প্রদায়িক

আলোকমিস্ত্রি এবং রবিজল একটা কাঁচা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কবরের ঠিক পেটের মাঝে পুঁতে রাখা একটা খেজুরের শুকনো ডাল হালকা বাতাসে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর মতো মাথা দোলাচ্ছে। তার মাথা দোলানো থামলেই ভিতর থেকে উঠে আসবে খাদিজা- এই কথাটা কে বাতাসের কানে কানে ভেজা স্বরে বলে যায়। এখন অপেক্ষার সময়। উতকন্ঠা নেই তবু দুরু দুরু বুকে সময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অদৃশ্য চোখ।

-একটা কথা কই কবিদা। আপনাক কেটা কোপাছে জানেন?

-না। তবে খাদিজা জানে মনে হয়। সে তো মূহুর্তের জন্য হলেও খুনির মুখটা দেখছিলো।

- আমি কোপাছি। কসাইয়ের মত অতটা নির্ভুল আছিলাম না। তাই আপনের কোপটা ঘাড়ের উপুর পড়ছে। কমাণ্ড আছিল আপনাক মারার, আর মরল আপনার বউ! অবশ্য আপনিও মরছেন, সাত দিন হাসপাতালে শুয়ে থাকার পর।

- মারলা ক্যান?

- মাথাটা আউলি গেছিল ভাই। হুজুরে যেদিন বয়ান দিলো সেদিন থাকি রাতোত ঘুম হয় না। পাশোত বউ শুতি থাকে, কিন্তু মনে হয় সে আসলে কাপড়ের টোপলার ভিত্রে এক খাবলা আন্ধার। বাড়িআলা, চালের দোকানদার, পুলিশ সবাকে মনে হতো বোবা কালা নড়াচড়া করা আন্ধার। যে মানুষগুলা আল্লাহ রসুলের অপমান মুখ বুজি সহ্য করে সে আবার ক্যামন মানুষ?

মানুষগুলা সব আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলি গেলো। রাত দিন আশে পাশে কোনো মানুষ নাই। তিন দিন, পুরা তিন দিন ঘুম নাই, খাওয়া নাই, খালি কলজ্যার মদ্ধে পাহাড়ের নাকান একটা পাথর। সেই পাথর য্যান বুকের যে ফুটা দিয়ে নূরের চিকন আলো আসে সেই ফুটায় বসি আছে। পাথর সরানির একমাত্র উপায় আপনেক সরায় দেওয়া।

- কিন্তু তা আর পারলা কই?

হঠাৎ পিছন থেকে নারী কণ্ঠ হতচকিত করে দেয় রবিজল এবং আলোকমিস্ত্রিকে। পিছনে তাকিয়ে দেখে কাফনের শুভ্র ফিনফিনে কাপড়ে মোড়া খাদিজা স্থির দাঁড়িয়ে আছে ঠিক যেভাবে ভোরের মতো তেতুল চারা নিখুঁতভাবে চেরা বীজপত্রদুটোকে মেলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।

রবিজলের দেহহীন শরীর কচি পাতার সবুজ আলোয় তির তির করে কাঁপতে থাকে। শুকতারার দপদপ কামুক চোখে তাকিয়ে থাকাটা তিনজনকেই বলে দেয় আর কিছুক্ষণের মধ্যে এই জায়গাটা অসংখ্য টুপি পরা মানুষে ভরে যাবে। এইসব মানুষ সারা পৃথিবীর স্রষ্টার কাছে তাদের মুখস্থ কৃতজ্ঞতা জানাবে আরেকটি সূর্যময় দিন পাওয়ার জন্য। যে দিন যাপন করবে না কোনো রবিজল, আলোকমিস্ত্রি কিংবা খাদিজা। তবে রবিজলের পরিবর্তে একটি ফুটফুটে অশ্বত্থ গাছ জন্ম নিবে। রংছড়ি শহরে যাকে মনে করা হয় অশুভ প্রতীক। খাদিজার পরিবর্তে একটি তেঁতুল চারা জন্মেছে। আর আলোকমিস্ত্রির পুনর্জন্ম হবে একটি মৃতবৎসা মাদী কুকুরের উর্বর তলপেটে।



লেখক পরিচিতি
রাসেল আল মাসুদ 
জন্ম- গাইবান্ধা 
অধ্যয়নরত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। 
ই-মেইল- russellsust2012@gmail.com


২টি মন্তব্য: