বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

সুপ্রিয় সাহা'র গল্প : অতনুর নামগন্ধ

(অ্যাক্টিভিস্ট কাকে বলা যায়। আমাকে না অতনুকে? নাকি সবটাই ভাঁওতা?)

জানালা দিয়ে রোদের ছটা অতনুর মুখে পড়তে বেশ অলস ভাবে জেগে উঠল সে। আজ দিনটা একেবারেই উদ্দেশ্যহীন। হাতে কোনও কাজ নেই। বাসি হয়ে যাওয়া রাতটার মতো সকালটারও কোনও গুরুত্ব নেই। চৌকিটা থেকে নিচে নামারও কোনও তাড়া নেই। গোটা ঘরটা জুড়ে একটা ছেনালি ছেনালি গন্ধ।
ঘরের কোণের মাকড়সার সরু জাল, পড়ে থাকা বিড়ির টুকরো আর নেতানো মশারিতে ওর দৃষ্টি ঘোরাফেরা করে। জানালার চরকা কাটা খোপ দিয়ে যে রোদটা ফালির মতন এসে পড়েছে ওর বিছানায়, তার মধ্যে ধুলোকনাগুলোর ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে আবার একবার বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। অতনুর আজ কোনও কাজ নেই। ও যখন বিছানা ছেড়ে, বাইরে বেরিয়ে আসে তখন রোদটা ভালোই উঠেছে। রাস্তার লোকজনের ব্যস্ততা তুঙ্গে। ও একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খায়। সামনের রাস্তাটা তখন স্কুলের ছেলেমেয়ে, অফিসের লোক আর দেরিতে বাজারে বেরোনো মানুষজনের দখলে। ও মনে মনে হিসেব করে, আজ কোথায় যাওয়া যায়। এরকম দিনে সাধারণত ও কোনও রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকজনের আসা যাওয়া দেখে। ব্যস্ত জনপথে ওকে একটা স্থির বিন্দুর মতো দেখায়। এক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ওর বিরক্তি ধরে আসে। তখন ও হঠাৎ কোনও লোক বা মেয়ের পিছনে ধাওয়া করে। ঠিক গোয়েন্দাদের মতো, তাকে তার গন্তব্যস্থল পর্যন্ত অনুসরণ করে যায়। এই যেমন সেদিন স্টেশন থেকে ও যে লোকটার পিছু নিলো, তার হাতে একটা ছোট্ট ব্রিফকেস। লোকটা বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করে, কাকে যেন খুঁজছিল। তারপর না পেয়ে বেরিয়ে এসে একটা রিক্সায় উঠল। অতনু লোকটাকে বেশ অনেকক্ষণ ধরে ফলো করেছে, লোকটার টেনশনটা কিছুটা হলেও ও পড়ে ফেলেছে। ও নিজেও এবার একটা রিক্সা নিয়ে ওর পিছু নিলো। লোকটা বেশ কিছুটা গিয়ে একটা ব্যাঙ্কের সামনে থেকে রিক্সাটা ছেড়ে দিয়ে ব্যাঙ্কে ঢুকে গেল। অতনু ব্যাঙ্কের সামনে একটা গাছতলায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এরপর লোকটা ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে, সোজা হাঁটা লাগাল। এ গলি ও গলি দিয়ে বেশ অনেকটা ঘুরে এসে, ওরা একটা বস্তিতে এসে পড়ল। লোকটা বস্তির একটা ঘরে সটান ঢুকে পড়ে, দরজা আটকে দিলো। ও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও লোকটা বেরোচ্ছে না দেখে, একটা মেয়ের পিছু নিলো। মেয়েটা বেশ তাড়ায় আছে মনে হয়। হাঁটার গতিতে অতনুকে অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছে। তবুও ও এত দূর থেকেও মেয়েটার গা থেকে আসা সুগন্ধি সাবানের গন্ধটা টের পাচ্ছিল। মেয়েটাও কিছুটা গিয়ে একটা রিক্সা ধরে নিলো। আজকাল লোকজনের রিক্সায় ওঠার বাতিক বেশ বেড়ে গেছে। অতনুর আজ বেশ মোটা রকমেরই খসবে। মেয়েটার রিক্সায় পিছনের পর্দাটা উড়তে থাকায় ওকে কিছুটা দেখা যাচ্ছে। রিক্সাওয়ালাটা জোয়ান ছেলে, মাঝে মাঝেই মেয়েটার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে। অতনুর বেশ ভালো লাগছে। এরকমভাবে লোকজনকে অনুসরণ করে যেতে ওর বেশ ভালো লাগে। কতরকম লোকের কত কিছুই না জানা যায়। এই যেমন মেয়েটা একটু পরেই নেমে গেল একটা ম্যাসাজ সেন্টারে। অতনু ওখানেও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার ফিরে এসেছে। মেয়েটাকে আর বের হতে দেখেনি।

আজ যেহেতু অতনুর কোনও কাজ নেই, তাই ওর তাড়াও নেই। চা-টা শেষ করে ও খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, ওভারব্রিজটার দিকে। ওভারব্রিজের উপরে উঠে মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগে। লোকজন ওকে দ্রুততার সাথে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায়। ও তাদের চলে যাওয়া শরীরগুলোর দিকে অলসভাবে তাকিয়ে থাকে। ওর সামনে দিয়ে এখনই কলেজের কটা ছেলেমেয়ে, স্কুলের কয়েকটা বাচ্চা আর একরাশ মানুষ বেরিয়ে গেল। অফিসের লোকজনদের খুব তাড়া। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে ছুটতে থাকে, যেন পিছনে ষাঁড় গুঁতোতে আসছে। ওর নিজের কোনও অফিস নেই বলে, মাঝে মাঝে আনন্দ হয়। ওর অফিস নেই তাই কাজও নেই। ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভারব্রিজটায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কোথাও কিছু বলার নেই, বকারও নেই। বেশ কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর, অতনু একটা লোকের পিছু নিলো। এই গরমে লোকটা একটা ওভারকোট পরে ঘামতে ঘামতে নিচে নামছে। অতনুও লোকটার পিছন পিছন নিচে নেমে এলো। অতনুর বয়স যে খুব হয়েছে তা নয়, চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। এই গরমে এইভাবে লোকজনের পিছু নিয়ে ধাওয়া করতে ওর যে কষ্ট হয় না, তাও নয়। কষ্ট হয়, কিন্তু কী করবে? এটাকে ও উপেক্ষা করতে পারে না। লোকটা এবার একটা বাসের সামনের দিকে উঠল। অতনুও বাসটার পিছন দিকে উঠে পড়ল। ও লোকটাকে দেখতে পাচ্ছে। অবাঙালি, সম্ভবত ব্যবসায়ী। গলগল করে ঘামতে ঘামতে, রুমাল বের করে মুখ মুছছে। হাতের ব্রিফকেসটা পায়ের ফাঁকে ঢোকানো। বাসটায় বেশ ভিড়। লোকজন সবার মুখই তেতো। সবাই ভিড়ের জন্য একে অপরকে দোষী ভাবছে মনে মনে। বাসটা ঘণ্টাখানেক যাওয়ার পর লোকটা বাস থেকে নেমে পড়ল। ওর পিছু পিছু অতনুও নেমে পড়ল। রাস্তা ছেড়ে লোকটা এবার জমির দিকে নেমে যাচ্ছে। এখানে বাড়িঘর খুব একটা নেই। চারদিকেই শুধু ফাঁকা চাষের জমি নজরে আসছে। মাঠের মাঝে মাঝে, একটা দুটো বিশ্রাম ঘর বা পাম্প ঘর করা আছে। লোকটা মাঠের আল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা পাম্প ঘরের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে মনে হয়। অতনুও ওর পিছু পিছু চলল। এর মধ্যেই অতনুকে লোকটা কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিয়েছে। অতনু এবার ওর কোমরে হাত দেয়। চারপাশটা ভালো করে দেখে নেয়। কাউকেই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। একটু আশ্বস্ত হয় ও। তারপর একটানে কোমরের অনেকটা নিচে লুকিয়ে রাখা মালটাকে বার করে আনে। বিদেশি রিভালবারটা ও সবসময়ই কোমরে নিয়েই বের হয়।

২।।

আমি দেখলাম সোমা অতনুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। সোমার শাড়ির আঁচল বুক থেকে গড়িয়ে পড়েছে। অতনুর হাতও সেখানে বেশ খেলা করছে। সোমা এক হাত দিয়ে অতনুর চুল আর অন্য হাত দিয়ে ওর পিঠ খামচে ধরতে চাইছে। একটা মেয়ে একটা ছেলেকে চুমু খেতে শুরু করলে যা যা হয় এরপর ঐ সব কিছুই যে ঘটবে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আমার ঘরের বেডরুমে আমার অবর্তমানে এরকম একটা দৃশ্য যে আমায় একেবারেই খুশি করতে পারেনি সেটা বলাই বাহুল্য। দুজনে তাদের জগতে এতটাই হারিয়ে গেছে যে ঘরের দরজাটা অবধি বন্ধ করার কথা মনে আসেনি। আর আমার ভাগ্যটাও অদ্ভুত, আজই অফিসের একজন মারা যাওয়ায় অফিস ছুটি হয়ে গেছে। নইলে এইসময় আমার ফেরার কথা নয়। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কী করা উচিত। এখন এখানে আমার উপস্থিতিটা জানান দেওয়ার ফলে কী কী হতে পারে সেগুলো ভাবতেই আমার পা দুটো অবশ হয়ে এলো। আবার যেমন নিঃশব্দে এসেছিলাম, সেরকম ভাবেই ফিরে চললাম। বিকেল পর্যন্ত সময়টাও কোথাও একটা কাটাতে হবে। মনে হলো গঙ্গার ধারে গিয়ে বসা যাক। বছর দশেক বিয়ে হয়েছে আমার আর সোমার। সোমাকে সুন্দরী না বললে, মিথ্যে বলা হবে। এখনও যে কোনও রাতে ওর টানটান উত্তেজনা আমায় বিবশ করে দেয়। কোনও দিক থেকেই ওকে কখনও অসুখী মনে হয়নি। আমাদের সন্তানও আছে একটি। সে হোস্টেলে থাকে। বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর কারোরই থাকার কথা নয়। অতনুর আগমণ বছরখানেক আগে। অতনু আমার এক দূরসম্পর্কের কাকার ছেলে, আমারই বয়সী। বেশ কয়েকবছর আগে নিখোঁজ হয়ে যায় হঠাৎই। তারপর মাঝে এক-দুবার খবর আসে, সে অ্যাক্টিভিস্টদের দলে নাম লিখিয়েছে। দেশই তার ধ্যান জ্ঞান, বাড়ি আর সে ফিরবে না। আমাদের সাথে ওর কোনও যোগাযোগও ছিল না তারপর থেকে। হঠাৎই কয়েক বছর আগে, এক মিলেটারি অপারেশনে ধরা পড়ে ও। তার আগে থেকেই অবশ্য কাগজে ওর নাম মাঝেমধ্যেই দেখা যেত। ওয়ান্টেড অ্যাক্টিভিস্ট। ধরা পড়ার পর ওর সূত্র ধরে পুলিশ ফ্যামিলিকেও টেনে আনে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় কাকাও অনেক টাকা পয়সা দিয়ে উকিল-টুকিলের ব্যবস্থা করে। কিন্তু ছাড়া পায়নি। পাঁচ বছর জেল খাটতে হয়। এরপর জেল থেকে বেরিয়ে, সে ওসব কাজ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাড়িতে ওর জায়গা হয় না। পাড়ার লোক এরকম একটা খতরনাক আসামীকে বাড়িতে রাখতে বাধা দেয়। শেষমেষ ব্যবস্থা হয় আমার এখানে। আমার বাড়িতে দুটো ঘর ফাঁকাই পড়ে থাকে। কাকা বলে, “তুই ওকে তোর ওখানে রেখে দে। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। বলবি ভাড়া দিয়েছিস।” আমি রাজি হয়ে যাই। আর এদের প্রতি আমার একটু দুর্বলতাও রয়েছে। এরা ঠিক করেছে কি ভুল করেছে জানিনা, কিন্তু এই যে দেশের মানুষের জন্য নিজের পরিবার পরিজন, সুখ শান্তি ছেড়ে, এভাবে দিনের পর দিন সশস্ত্র আন্দোলন করে গেছে; এর জন্য আমার একটু গর্ববোধ হয়। যার ফলে অতনু এ বাড়িতে নির্দ্বিধায় প্রবেশ করে। অতনু এখানে থাকাতে সোমা খুব একটা খুশি হয়নি। একে তো জেল খাটা আসামী, তার উপর একটা অবিবাহিত মাঝবয়সি লোক। আর এই চল্লিশ বছর বয়সটাও বড্ড মারাত্মক। আমি নিজেও মাঝে মাঝে টের পাই। সোমা এক রাতে আমায় বলল, “অতনু কি এখানে সারাজীবন থেকে যাবে?” কথাটার উত্তর আমারও জানা ছিল না। কারণ অতনুকে আমি থাকতে দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু ওর সাথে খুব বেশি কথা হয় না। আর ও নিজেও যেন একটু একা থাকতে চায়। একা থাকতে চাওয়া দোষের কিছু না। তাই আমিও বেশি ঘাঁটাইনি। এর ফলে ও যে ভবিষ্যতে কী করতে চায়, সেটা জানা হয়ে ওঠেনি। ও আমাদের সাথে খায় না, হোটেলে নিজের মতো খায়। কাকাই মনে হয় মাসে মাসে পয়সা পাঠায়। কাকা একদিন নিজের থেকে বলছিল, “ওকে তো একটা চাকরি বাকরির চেষ্টা করতে বললাম। এভাবে আর আমিই বা কতদিন টানব, আর তুইও বা কতদিন থাকতে দিবি। তুইও একটু দেখিস যদি তোর হাতে কোনও কাজ-টাজ থাকে।” আমি সোমাকে আশ্বস্ত করলাম, “না, না বেশিদিন মনে হয় থাকবে না। সেদিন কাকা তো বলছিল যে ও চাকরির চেষ্টা করছে। আর যদি কিছুদিন থাকেও তো আমাদের তো ক্ষতি কিছুই নেই। ও ওর নিজের মতো থাকে, কাউকে বিরক্ত তো করে না।” সোমা বলে, “সে বিরক্ত নাই করুক। তবুও, ঘরে এভাবে একটা পুরুষ মানুষ থাকবে। আমার কেমন যেন মনে হয়। ভয় ভয় করে।”

রাতে যখন বাড়ি ঢুকলাম, সব স্বাভাবিক। ঘরের দরজাটা ভিতর থেকেই আটকানো। সোমার মুখও প্রতিদিনের মতো মনে হলো। আমি একটু খুঁটিয়ে দেখাতে, ঠোঁটের কোণায় যেন একটা কালচে আভা চোখে পড়ল। অবশ্য আমার মনের ভুলও হতে পারে। আমি চেষ্টা করছি প্রতিদিনের মতো কথা বলার আর সোমার কথায় কোনও অসঙ্গতি খুঁজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। রাত বাড়ছে। পাশের ঘরে অতনুর চলাফেরার টুকটাক শব্দ হচ্ছে। আমার মনের ভিতরটা পাকিয়ে উঠছে খালি। বিছানায় শুয়ে শুয়েও ঘুম আসছে না। সোমা এখন কাপড় বদলাচ্ছে। ওর শরীরে এখন খালি সায়া আর ব্লাউজ। আস্তে আস্তে ও ব্লাউজের পিছনের হুক গুলো খুলছে। ঘর প্রায় অন্ধকার। বাইরের স্ট্রিট লাইটের আলো জানলার ফাঁক দিয়ে এসে ওর খোলা পিঠের উপর পড়ছে। গোটা পিঠটা এক সমুদ্রতটভূমির মতো চিকচিক করে উঠছে। আমি যে কখন বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছি আমারই খেয়াল নেই। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সোমাকে জড়িয়ে ধরতেই ও চমকে উঠল। ওর উন্মুক্ত স্তন যুগল আমার হাতের মুঠোয়। ওর কাঁধের ধার ঘেঁষে আমার খসখসে জিব নেমে আসছে নীচে। ওর গোটা শরীরটা সোহাগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে ফেললাম বিছানায়। ওর দুচোখ বন্ধ, যা প্রবেশের অনুমতি। এবার আমার নিজের শরীরটাই কেমন গুলিয়ে উঠল। আমি তো কিছুটা পরীক্ষা করতে চাইছিলাম, যদি আজ দুপুরেই কিছু একটা হয়ে থাকে তবে নিশ্চয় ও রাতে রাজি হবে না, কারণ ধরা পড়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ওকে দেখে তো সেরকম কিছুই মনে হচ্ছে না। আমি কি তবে ভুল দেখলাম?

৩।।

সেই দিনটার পর আরও বেশ কিছুদিন কেটে গেল। এর মধ্যে আমি দু-এক বার অফিস থেকে হঠাৎ বেরিয়ে দুপুরবেলা এসে বাড়িতে উঁকি দিয়ে দেখে গেছি। কিন্তু সেরকম কিছুই পাইনি। তবে কি ওরা আমার উপস্থিতি সেদিন টের পেয়েছিল? সাবধান হয়ে গেছে আগের থেকে? কথাটা মাথায় আসতেই মনের ভিতর খচখচানিটা আরও বেড়ে গেল। তার মানে ওরা এখন থেকে আমার বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করবে নিশ্চয়। আর এভাবে প্রতিদিন আমার পক্ষে অফিস থেকে এসে বার বার করে খোঁজ নেওয়াও সম্ভব নয়। আমার শুধু সেদিনের দেখা দৃশ্যটার কথা মনে পড়ছে। সোমাকে আমি এত বছরে না হলেও কয়েকশ বার আদর করেছি। কিন্তু সেদিন অতনুর সাথে ওকে যেভাবে দেখলাম সেভাবে পাইনি কখনও। সেদিন ওর সারা শরীর যেন শুধু অতনুর নামেই উৎসর্গ করেছিল। অতনুর মুখের মধ্যে বার বার ওর কামার্ত ঠোঁট জোড়া চেপে ধরছিল। আমি আর ভাবতে চাই না। কিন্তু এতদূর পর্যন্ত ওরা এগিয়ে গেল আর আমি কিছুই টের পেলাম না। এই তো কিছুদিন আগেও সোমা অতনুকে একেবারেই পছন্দ করতো না। আমি একবার বলেছিলাম, “আজ অতনুকে আমাদের সাথে খেতে বলি। ও তো প্রতিদিনই বাইরে খায়। যতই ও এখানে ভাড়াটিয়ার মতো থাকুক না কেন, আত্মীয়তার রক্ত তো আমাদের ধমনীতে বইছে।” এই কথাতেই সোমা একেবারে রেগে আগুন। “তোমাকে বলেছি না ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয় না। একে তো থাকতে দিয়েছ, আবার খেতে। এবার তো শুতেও চাইবে। ওকে তাড়াতাড়ি নিজের ব্যবস্থা করতে বলো।” আমি এর মধ্যে একদিন অতনুর সাথে কথা বললাম। অফিস থেকে ফেরার সময় দেখি ও বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে লোকজন দেখছে। আমায় খেয়াল করেনি। ওর গায়ে একটা টোকা দিয়ে বললাম, “কী কোথাও যাবে না কি?” আমায় দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না, না, এমনি দাঁড়িয়ে আছি।” “তারপর খবর কী বলো? কাকা বলছিল, তুমি নাকি চাকরির চেষ্টা করছ। তা কতদূর এগোলো? ইন্টারভিউ দিলে কোথাও।” অতনুর যেন কোনও হেলদোল নেই। একই রকম নির্বিকার মুখ। সবসময়ই যেন খুব চিন্তিত। কিন্তু কীসের যে চিন্তা, সেটা মনে হয় ও নিজেও জানে না। “হ্যাঁ, মানে বাবা বলছিল, চাকরির চেষ্টা করতে। দেখছি দু-এক জায়গায়।” আমার মেজাজটা এবার বিগড়ে যাচ্ছে। এরা নাকি অ্যাকটিভিস্ট। এতদিন যে ফ্রিতে আমার ঘরটায় পড়ে আছিস, তার জন্য তো কোনও অনুতাপ দেখছি না। আমি তো অন্যের বাড়িতে একদিনের বেশি দুদিন থাকতে পারি না। এবার কথাবার্তার লাইনটা একটু ঘোরানোর চেষ্টা করলাম, “তোমার ওদিকের খবরাখবর কী? যোগাযোগ আছে এখনও? পেপারে টেপারে তো পড়ে মনে হচ্ছে, পার্টি এখন বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই তো তোমাদের অনেক নেতা ধরাও পড়ে গেল। আন্দোলনে কি ভাঁটা পড়ছে?” অতনু এবারও চুপচাপ। শুধু বলল, “কোনও আন্দোলনেই কখনও ভাঁটা পড়ে না। সব আন্দোলনই কেমিক্যাল রিয়্যাকশনের মতো। বাইরে থেকে দেখে অনেক সময় মনে হয় রিয়্যাকশন বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে কোনও নতুন পদার্থ প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকে।” আমি আর কথা বাড়ালাম না। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে চললাম।

আমাদের দুজনকেই একসাথে দেখে সোমা বেশ খুশি হয়ে উঠল। সোমার খুশি হওয়াটা আমি মোটেও খুশি মনে মেনে নিতে পারলাম না। ও অতনুকে চা খেয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল, কিন্তু অতনু সেটা খুব সুন্দরভাবে প্রত্যাখ্যান করল। যে সোমা কিছুদিন আগেও অতনুকে কোনও কিছু খাওয়ার জন্যেও ঘরে আসতে দিতে চাইত না, আজ সে নিজে চায়ের নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে, বিষয়টা আমার কাছে একটু অদ্ভুত ঠেকল। সোমাকে জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, “সেরকম কিছু না। তোমাদের একসাথে আসতে দেখলাম, তাই। তাছাড়া এখন দেখছি, অতনু খুব খারাপ না। মানে আমি যেমন ভেবেছিলাম, তেমন না। ভালো ছেলেই।” আমার ভিতরটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। এই কদিনের মধ্যেই ও খারাপ থেকে ভালো হয়ে গেল। কী এমন দেখলও সোমা ওর মধ্যে যে, আগ বাড়িয়ে চায়ের নিমন্ত্রণ পর্যন্ত করে ফেলল। তার মানে আমি না থাকাতে নিশ্চয় ও এ ঘরে আসে এবং অনেক নিমন্ত্রণই ও এমনি এমনিই খেয়ে যায়। আমি বিষয়টা কাউকে বলতেও পারছিলাম না আর ভুলে যেতেও পারছিলাম না। আমার সাথে সোমার সম্বন্ধ করেই বিয়ে, যা শুনেছি আগে সোমার কোথাও কোনও সম্পর্ক ছিল না। এতবছর তো আমরা বেশ ভালোই ছিলাম। আমি দেখতে খুব একটা খারাপ নই, ভালো চাকরি করি, বাড়ি আছে নিজের, ছেলেকে ভালো জায়গায় পড়াই আর আমার থেকে কিনা ঐ বেকার, ফালতু অতনুটা ওর কাছে ভালো হয়ে গেল। রাত্রে শুয়ে শুয়ে আমার বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে সোমা বলল, “জানো অতনুর কাছে একটা রিভালবার আছে।” “তুমি কী করে জানলে? তার মানে অতনুর সাথে তোমার এখন বেশ ভালোই ভাব হয়ে গেছে।” “তুমিও না। ভাব-আড়ির কী আছে? আমিই একদিন জিজ্ঞাসা করছিলাম যে, ওর আগের জীবনটা কেমন ছিল, কোথায় থাকতো, কী করতো। সেই সব কথা হতে হতেই, জানলাম যে ও খুব ভালো বন্দুক চালাতে পারে। তখনই বলল যে ওর কাছে এখনও একটা বন্দুক আছে।” আমার প্রচণ্ড ঘেন্না হচ্ছিল, কিন্তু চুপচাপ মুখ বুজে শুনতে শুনতে বললাম, “একবার ওর বন্দুকটা দিতে বোলো তো। বোলো আমি দেখতে চেয়েছি।” সোমা লাফিয়ে উঠল খুশিতে, “আমাকে তো দেখিয়েছে একবার। ঠিক আছে কালকেই বলব ওটা দিয়ে যেতে।” আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। চুপচাপ মড়ার মতো ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। সোমা আরও কিছুক্ষণ একা একা বকে যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়ল। আমার দুচোখে ঘুম নামতে তখনও ঢের বাকি।

৪।।

আজ অনেকদিন পর আবার অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোলাম। আমার সন্দেহ, আজ নিশ্চয় একটা কিছু হবে। খুব ভালো করে চারদিক নজরে রেখে এগিয়ে চলেছি। বাড়িতে ঢোকবার আগে, আর একবার নিজের মনকে প্রস্তুত করে নিলাম যে কোনও পরিস্থিতির জন্য। মেন গেটটায় তালা মারা থাকে না। খুব ধীরে ধীরে খুলে ভিতরে ঢুকে দেখি আজ সব দরজা বন্ধ। আমার ঘরের দরজায় তালা মারা। আর অতনুর ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। কীরকম যেন সন্দেহ হলো। খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে দরজায় কান পাতলাম। ভিতর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, দুজন নারী-পুরুষের গলার স্বর। সোমার গলা চিনতে আমার কোনও ভুল হওয়ার কথা নয়। মনে হলো এখনই দরজা ভেঙে, দুজনকেই হাতেনাতে ধরি। কিন্তু মনকে একটু শান্ত করতে হলো। জীবনের অনেক কটা বছর পার করে এসেছি। এই বয়সে এসব করলে মান সম্মান থাকবে না। আবার যেমন এসেছিলাম তেমন করেই ফিরে গেলাম রাস্তায়।

বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর অতনুর দেখা মিলল। আমায় সে দেখতে পায়নি। অতনু হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে ওভারব্রিজটার দিকে। আমি আবার বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। সোমা এই অসময়ে আমায় দেখে চমকে উঠলেও, নিজেকে সামলে নিলো। আমি স্বাভাবিক। বললাম, “অফিস ছুটি হয়ে গেছে।” আজ আর জামা কাপড় ছাড়লাম না। সোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “অতনু রিভালবারটা দিয়েছে?” সোমা প্রথমটায় একটু চুপ। তারপর বলল, “হ্যাঁ। তুমি দেখবে?” রিভালবারটা হাতে নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। খাসা মাল। ভারীও। সোমাই আমাকে বুঝিয়ে দিলো কীভাবে ওটা চালাতে হয়। তারপর আবার যথাস্থানে রেখে দিলো। আমি চা খেয়ে উঠে পড়লাম, “একটু বেরোতে হবে। অফিসের একটা কাজ আছে।” সোমা রান্নাঘর থেকেই জবাব দিলো, “তাড়াতাড়ি ফিরো।” রাস্তায় বেরিয়েই সোজা হাঁটা দিলাম ওভারব্রিজের উদ্দেশ্যে। অতনু তখন ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “কোথাও যাবেন?” “হ্যাঁ, একটু বাইপাসের দিকটায় যেতাম। একটা জমির খোঁজ পেয়েছি। কমের মধ্যে। তুমি ফ্রি থাকলে চলো না আমার সাথে।” অতনু রাজি হয়ে গেল। বাসে উঠে পড়লাম দুজনে। এখনও সব অফিস ছুটি হয়নি, তাই ভিড়টা খুব বেশি নয়। জ্যামও কম। দুপুরের রোদও পুরোটা পড়েনি। বাসটা ফাঁকা রাস্তায় বেশ জোরে টেনে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে দিলো।

দুপাশে শুধু চাষের জমি। ফাঁকা ধু ধু করছে। অতনু বলল, “এখানে জায়গা কিনবে? এ তো সবই চাষের জমি।” আমি বললাম, “আজ চাষের জমি আছে, কাল শপিংমল হবে। তাই আগে থেকে কিনে রাখাই ভালো। চলো, ঐ জমির আলে আলে যেতে হবে। জমিটা একটু ভিতরের দিকে।” অতনুর দুচোখে কেমন যেন একটা সন্দেহ ফুটে উঠল। তবুও মুখে কিছু বলল না। আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল ও। ওর পিছনে আমি। দুজনেই হাঁটছি। আর ক্রমশ নিজেদের মধ্যে দূরত্বটা বাড়িয়ে নিচ্ছি একটু একটু করে। চারপাশটা দ্রুত একবার দেখে নিলাম, কেউ কোথাও নেই। হঠাৎই আমার হাতটা চলে গেল কোমরের নিচে। দ্রুত হাতে বের করে আনলাম অতনুরই সেই রিভালবার, যা আমি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় লুকিয়ে নিয়ে এসেছি। অতনু তখনও সামনের দিকে চলেছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়েছি আলের উপর। এই চরম মুহূর্তে শেষবারের মতো ডাকলাম, “অতনু।”

আকাশটা তখন একেবারে লালে লাল।



লেখক পরিচিতি
সুপ্রিয় সাহা
জন্ম : ১৯৮৭
দেবগ্রাম, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ।
গল্পকার। প্রবন্ধকার।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখেন।

ইমেইল : supriyasaha12@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন