বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

শিমুল মাহমুদের গল্প : ইলিশখাড়ি

দমটা বের হবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অরবিন্দ নিজের দেহটাকে যেন নিজেরই দু’খানা হাত দিয়ে রক্ষা করতে চাইছে। আর তার পরপরই সেই ভয়ানক যন্ত্রণাটা বুকের হাড্ডির নীচে ফাটফাট শব্দে ভেঙে পড়তে পড়তে বুকের রক্তগুলো সব আগুনের ফুলকি হয়ে এক এক বলকে কানের ছিদ্র, চোখের কোণ আর কণ্ঠনালি ফেটে বেরিয়ে পড়ল। অরবিন্দ হঠাৎ নিজ দেহ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে একটু যেন ভড়কে গিয়ে দেখলো তার দেহখানা স্রোতের গোলায় ওলট পালট খাচ্ছে; তার পর আবার চিৎ হয়ে উপুড় হয়ে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে স্রোতের কেন্দ্র বরাবর তলানীর গভীরে শ্যাওলা দেয়ালের সাখে পিছল খাড়ির খাঁজে খাঁজে কাদা আর কাদার ডান পাশটায় সাদা বালির পশ্চিমে।
ইলিশের বাচ্চাগুলো হড়বড় করে লেজে লেজে পানিতে বাড়ি মারতে মারতে স্রোতের ঝাঁকে ঝাঁকে ছড়িয়ে পড়লো গোটা খাড়িটার মাঝে। অন্ধকার পানি মুহূর্তে সিলভার সাদায় ঝিকমিকিয়ে উঠল। অরবিন্দ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তবে তার মনে হতে লাগলো এই জায়গাটা ইতিপূর্বে কোথাও না কোথাও দেখেছে সে। তা না হলে ওর বাবা বিশু মাঝি নিশ্চয় দেখে থাকবে। কিছুক্ষণ পর অরবিন্দর নিজেকে ভীষণ অচেনা মনে হল। এক সময় সত্যি সত্যি সে চিনতে পারে না নিজেকে। আসলে সে কে! আর কেনই বা ওর দেহটা কাদাতে আটকে গিয়ে নিশ্চিন্তে দুলে উঠতে শুরু করেছে!

অনেক প্রাচীন আর ভীষণ বুড়ো বয়সের ইলিশগুলো প্রথমে গম্ভীর সাঁতারে অরবিন্দর মৃত দেহটাকে ধাক্কা দিতে শুরু করলো। এর পর স্ত্রী ইলিশগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু যেন কৌতুক করে নিল আর এই ফাঁকে তরুণ ইলিশেরা অরবিন্দের দেহটাকে ঘিরে ইলিশনৃত্য শুরু করে দিল; যেন আকাশে মেঘ জমেছে এখনি বৃষ্টি ঝাঁপ দেবে স্রোতের জলে। আসলে রাতটা ছিল ভরা পূর্ণিমা। আর জ্যোৎস্না বর্ষণকে ইলিশেরা বৃষ্টি পূর্ণিমার মতই পবিত্র আর দেবশক্তি জ্ঞানে পূজা দিয়ে থাকে। এই রাতে খাড়ি ছেড়ে স্রোতে ভেসে যাওয়া মানা। দলবৃদ্ধা গাগুঢ়ি তাহলে ভয়ানক শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। একেবারে মানুষের মৃত দেহের পেটের ভেতর পুঁতে রাখবেন তিনি সেই ইলিশের বাচ্চাটাকে। জ্যোৎস্নাপাতের সাথে সাথে আজকে প্রায় দুইশত সত্তর সূর্যদিবস পর বৃষ্টি শুরু হল। অরবিন্দ মাঝি ভয় পাচ্ছে। অণ্ডকোষটা ভয়ে জ্যোৎস্নাবৃষ্টিস্রোতে দ্বিমুখি অনুভূতিতে কাঁপছে। দলবৃদ্ধা গাগুঢ়ি লেজের কাঁটা দিয়ে বাড়ি মেরে দেখলেন, নাহ, এখনও পচতে শুরু করেনি। এতে কাজ হবে না। অপেক্ষা করতে হবে আরও তিনটি চাঁদের সমান সময়।

গোলমালটা বহু পুরাতন। খাড়িটার প্রথম সন্ধান পেয়েছিল বিশু মাঝি। সে খানিকটা নির্বোধ স্বভাবের পিচাশ শ্রেণির কাল মানুষ। প্রত্যেকটা অমাবস্যার মধ্যরাত্রিতে মা চণ্ডীর নামে তাড়ি টানতে হবে তাকে। সাথে যোগ দেবে হারু মুচি। এই দুটো জানোয়ারকে নিয়ে নানান আকথা কুকথা। ঘোষবাড়ির মোড়ে নিধু ঘোষের দোকানে সন্ধ্যার খানিকটা পর অনীলের বড় বেটা শিবু ভাঙ টেনে নিয়ে টেনে টেনে গল্প বলতে থাকে। দেবুদা সমর্থন করে বসে, সেদিন নাকি সারারাত ওরা তিন তিনটে মরা পুড়িয়েছিল নন্দিঘাটে। নন্দিঘাটের ওপারে মস্ত একটা বাঁক নিয়েছে পদ্মা। তার পরই ইলিশখাড়ি। কেউ সচরাচর সেদিকটা মাড়ায় না। যুদ্ধের বছরটাতে ছোট্ট একটা তাবু ছিল খাড়িটার উঁচু ঢিবিটার ওপর। এক জোড়া পাকসেনা সারাদিন লম্বা দাঁড়িয়ে থাকতো। আর শোনা যেত একটা পিঠখোলা জিপের শব্দ। গাড়ির শব্দটা সবারই পরিচিত আর ঠাণ্ডা। সবাই অনেক ক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতো। কুপি বাতিটা নিভিয়ে ফেললো নিধু ঘোষ। মনে মনে মা দুগ্গাকে স্মরণ করতে করতে হঠাৎ নাতনীটার দিকে তাকিয়ে ভয়ে সাদা হয়ে গেল। মনে হল নাতনীটা চিকন স্বরে কেঁদে উঠবে আর অমনি জিপখানা সোজা তাদের দরজায় এসে ঠেকবে। নিধু বালিশটা তুলে নিল; নাতনীর মুখখানা কি ঢেকে দেবে? আর ঠিক তখনই চিৎকারটা ভেসে এলো ইলিশখাড়ি থেকে।

সেই রাতেই বিশু মাঝি আর হারু মুচিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পাক সেনারা। বোকা বিশুটার কিন্তু ভয় লাগছে না। আর হারু মুচি লুঙ্গিটা ভেজাবার পর পশ্চাৎদেশে পাকসেনাটার দেড়মনি বুটের ধাক্কা খেয়ে যখন বুঝতে পারে ডান পাশে পড়ে থাকা মরাটা ওদের দুজনকে টেনে নিয়ে খাড়ির স্রোতে ফেলে দিতে হবে, তখনই যেন ওরা একটু স্বস্তি বোধ করলো। এর পর কোন কিছু না ভেবেই দুজনে ধরাধরি করে মরাটাকে খাড়ির কিনারে নিয়ে গেল। মাটিতে নামাবার আগ মুহূর্তে লাশটার ওপর দুজনেই হাঁটু ভেঙে আছড়ে পড়ল; আর ঠিক তখনই যেন বুঝতে পারে মৃত দেহটা একটা মেয়ে মানুষের। সিঁথির মাঝখানটা টকটকে লাল। বিশুর চোখ দু’খানা চাঁদের আলোতে গরুর মত মায়াবি মনে হচ্ছে। অথচ হারু মুচি মেয়েটার ওপর হড়হড় করে বমি করে ফেললো। বিশু প্রথমে ধাক্কা দিতে গিয়ে আবারও মেয়েটার মুখের ওপর তাকায়। তার পর লাশটাকে গড়িয়ে দেয়। একুশ হাত ওপর থেকে মেয়েটা আছড়ে পড়লো গঙ্গার জলে। বিশু বসে থাকে। ওঠে না। খানিক পর হারু মুচিকে কোথাও পাওয়া গেল না। এই ঘটনার পর থেকে বিশু মাঝি যেন আরও খানিকটা নির্বোধ হয়ে গেল। প্রায় রাতেই হাঁটতে হাঁটতে সে চলে আসতো ঢিবিটার কাছে। আর তার পর থেকে কতগুলো লাশ সে ছুড়ে ফেলেছে খাড়িটার ভেতর তা বিশু ঠিক মত কখনওই বলতে পারে না।

পাক সেনাদের তাবুটা উঠে যাবার পর পরই বর্ষা নামলো। বিশু মাঝির উঁচু ঢিবির নেশা কেটে গেছে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না ওর নৌকাটা খাড়ির বাঁকে এসে থেমে যায় কেন! সারা রাত জাল ফেলতে ফেলতে খাড়িটার বাঁকে গিয়ে বিশুর নৌকাটা বাদবাকি রাত কাটিয়ে দেয়। আর সকালে আড়াই সের তিন সের ওজনের সাদা সাদা ইলিশ ভর্তি নৌকা নিয়ে নন্দিঘাট পাড়ি দিয়ে বাঁকালিয়া বাজারে গিয়ে হাজির হয়। গর্দভটা বুঝতে পারে না এ বছর ইলিশগুলোর এত তেল হল কীভাবে। মহাজনদের বলতে শুনেছে, মরা খেয়ে খেয়ে নাকি ইলিশগুলো সব ওজনদার হয়েছে। এখনকার ইলিশ খাওয়া আর মরা মানুষ খাওয়া একই কথা। বিশু কিছুই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। টাকার হিসাবটাও যেন কেমন গোলমেলে। ত্রিশ টাকা পাবার পর বেঁকে বসে, আরও দুটো টাকা তার চাই। আড়তদার খেকিয়ে ওঠে, হারামজাদা, তোর মরাখেকো ইলিশ কিনবো কেডায়?

শিবরাত্রিতে বিশুর আর যাওয়া হল না নৌকাতে। মুখটা ভাঙা হাড়ি বানিয়ে বসে থাকে সে। তার কেবলই মনে হতে থাকে ছেলেটা নৌকাতে একা। অথচ সে হারু মুচির সাথে ভাঙ টানতে বসেছে। খামাখা ছেলেটাকে পাঠালাম। হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে অরু। তিন বারের বার কল্কিতে টান দিতেই ছেলের কথা ভুলে গেল বিশু।

শেষ রাতের দিকে হঠাৎ অরবিন্দর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের ভেতর সে যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসা একটা ধারালো শব্দ শুনতে পেয়েছে। চোখ মেলতেই বুঝতে পারল অনেকক্ষণ ধরে যেন একটা চিকন শব্দ লম্বা হয়ে খাড়িটার গভীর থেকে ভেসে আসছে। খানিক পর ভেসে যাওয়া শব্দের রেশের সাথে শোনা গেল মেয়েদের চুড়ির আওয়াজ। অরবিন্দ হামাগুড়ি দিয়ে ছইয়ের ভেতর থেকে মাথা উঁচু করে একেবারে হা হয়ে গেল! খাড়িটার মাঝে লাল টকটকে সিঁদুর মাথায় একটা মেয়েছেলে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। অরবিন্দর মাথাটা যেন ফাঁকা হয়ে এলো। ভয় পাবার মত কোন জ্ঞান নেই ওর বুকে। শুধু সূর্য ওঠার অনেক ক্ষণ পর বিশু মাঝি অনেক ক্ষণ ধরে চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিয়ে জ্ঞান ফেরালো ছেলেটার। বিশু মাঝি যেন বা বিজ্ঞের মত বুঝতে পারল ছেলেটা ধাঙড় হয়েছে। কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করে, কল্কি দেছে কেডায়? অরবিন্দ গোরুর মত মায়ামায়া নির্বোধ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে; কোন কথা বলতে পারে না। চৌদ্দ বৎসরের ছেলের চোখে তাকাতেই এই প্রথম বারের মত কেন যেন বিশুর মনে হল, ওর ছেলে যেন ঠিক ওর নিজেরই হুবহু নকল। ছেলেটার জন্য বিশুর কেমন যেন মায়া বোধ হতে থাকে।

দিনকাল খুব খারাপ। চারিদিকে আকাল পড়েছে। মাঝি পাড়ার কোনও মাঝিই ঠিক শুবিধে করতে পারছে না। শুধু বিশু গোপনে অরবিন্দকে নিয়ে শেষ রাতের দিকে খাড়িটার ভেতর নৌকা ঢুকিয়ে দিয়ে নৌকাভর্তি ইলিশ নিয়ে সোজা গঞ্জে চলে যায়। মনে মনে বিশু নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবে আজকাল। খাড়িটার কথা কাউকে বলে না। তিন দিন পর বিশু সিঁদুর মাথায় দীর্ঘদেহী মেয়েটাকে দেখে ফেলে। মুহূর্তে তার শরীরটা বরফের মত জমে যায়। অরবিন্দ এবারে আর ভয় পায় না। বরং সাথে বাবা থাকাতে বেশ কিছুটা অহঙ্কারী মনে হতে থাকে নিজেকে। বিশুর মনের মধ্যে ভেসে ওঠে গত বর্ষার আগের ঘটনা। প্রথম যে মরাটা সে খাড়িতে ফেলেছিল সেটাও ঠিক এমনই চেহারার ছিল। থরথর করে কেঁপে ওঠে বিশু। কেবলই মনে হতে থাকে সিঁদুর মাথায় মেয়েটি আসলে মৃত দেহ ছিল না। নির্ঘাৎ তাজা মেয়েছেলে। অথচ সে নিজের হাতে তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল খাড়ির মধ্যে। সত্যি সত্যি বিশুর বিশ্বাস হল নিধু ঘোষের দোকানে অনীলের বেটার গালগপ্পগুলো। ওর মুখেই সে প্রথম শুনেছিল অনেক রাতে নাকি যুদ্ধের সময় হারিয়ে যাওয়া ঘোষেদের বউ খাড়িটার মধ্যে ভেসে উঠে চড়া সুরে গান জুড়ে দেয়। সে নাকি পাতালে যক্ষের ঘরে এখনও দুধ জাল দিচ্ছে। তার পর অবসরে জলের ওপরে উঠে আসে। রাতে ওদিকটায় ভিন গাঁয়ের কেউ গেলে তার ঠোঁটে গরম দুধের বাটি তুলে ধরে। তার পর জাপটে ধরে তাকে সোজা পাতালে নিয়ে যায়। বিশু বাঁকা ঠোঁটে হেসে ওঠে। সেই যুদ্ধের বর্ষা থেকে নিয়মিত খাড়িতে ইলিশ শিকার করে আসছে সে; আর ওর কাছে গালগপ্প! কিন্তু আজ বিশু বিশ্বাস করলো গল্পটা আসলে গল্প নয়। সে যেন হঠাৎই চালাক হয়ে ওঠে। বুঝতে পারে মাঝিপাড়ার সবকটা মাঝি কেন খাড়িটা এড়িয়ে চলে। ওর ভেতরটা কেমন বিশ্রী হয়ে গেল। পরক্ষণেই বিশুর নিজেকে ভীষণ পাপী মনে হয়।

আজ চৌদ্দ দিন হল অরবিন্দ বিছানায়। নাভির নীচের ব্যথাটা নীল হতে হতে জমে গেছে। কোমরের নীচ থেকে পাথরের মত মনে হচ্ছে নিজেকে। আজ শিবরাত্রি। আর ভয়টা ক্রমেই বেড়ে চলেছে অরবিন্দর ভেতর। বিশু মরার আগে অরবিন্দকে আদেশ করে গিয়েছিল, প্রতিটা শিবরাত্রিতে ইলিশখাড়ির বাঁকে পুজা দিতে হবে। সেই থেকে চৌদ্দ বৎসর হল একটা শিবরাত্রিও সে বাদ দেয়নি। এক সময় বিশ্বাসটাও পাকা হয়ে আসে। অথচ ওর বাবা বিশু মাঝি কোন দিন পুজা দেয়নি। বাবার কথা মত সে যখন থেকে পুজা দিতে শুরু করেছে তখন থেকে সেই চিৎকার আর সুর করে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখেনি অরবিন্দ। তবে লাল সিঁদুরের মেয়েটাকে মন থেকে দূর করতে পারেনি সে আজও। এদিকে এতদিনে মাঝি পাড়াতে খাড়িটাকে নিয়ে ভয় কেটে গেছে। খাড়িটার দখল নিতে তিন বর্ষায় মোট চৌদ্দবার কাইজ্যায় পড়েছে অরবিন্দ। কিন্তু খাড়িটার মালিক ওর বাবা। এই ভয়ানক সত্যি কথাটা কেউ বুঝতে চায় না। পানির সম্পত্তি নাকি ভগবানের দান। কিন্তু ইলিশ খাড়ির ইতিহাসটা কারও জানা নেই। পোলাপানেরা বিশ্বাস করতে চায় না খাড়িটা ছিল সব বাঙালি মেয়েছেলে আর নিরীহ লোকদের লাশ ফেলার জায়গা। খাড়ির বাঁকের তেতুল গাছটাও আর আগের মত জমকালো ঝাঁকড়া অবস্থায় নেই। অন্ধকার অন্ধকার গা ছমছম ভাবটা অনেক আগেই সবার চোখের অগোচরে মিইয়ে গেছে।

লাল সিঁদুরের দেবী এই নিয়ে চৌদ্দবার অরবিন্দকে স্বপ্নে দেখা দিলেন। বিশু মাঝি যখন শিবরাত্রিতে পুজা দেবার কথা বলেছিল অরবিন্দ তখন বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছিল। কারণ ততদিনে অরবিন্দ বুঝে গিয়েছিল এই ইলিশখাড়িটাই ওদের সমস্ত জৌলসের উৎস। সেই বালক বেলা থেকে সে দেখে আসছে। অরবিন্দর ছেলে এখন শহরে লেখাপড়া করে। ওর মা-র চেহারা যেন দিনে দিনে লাল সিঁদুরের দেবীর মত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু দেবীর মত মোটেও মায়াবী আর গা ছমছমে না। কেমন যেন একটু বেশি মাত্রায় চৌকস। অথচ অরবিন্দ যেন এত দিন মনে মনে নিজের বৌকেই পুজা দিয়েছে। আর ছেলেকে দেবীপুত্র জ্ঞানে সব সময় মাছমাচা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এতকাল পর স্বপ্নের মধ্যেই অরবিন্দ বুঝতে পারে লালসিঁদুরের দেবী আসলে সাক্ষাৎ শিবের স্ত্রী। অরবিন্দ কেঁপে উঠলো। তিন দিন হল বউটা বাড়িতে নেই। অথচ আজকে শিবরাত্রির পুজায় ওকে ভীষণ দরকার।



খাড়িটার দখল অরবিন্দ ওর জীবন থাকতে ছাড়বে না। মাধবকে খুব দরকার। কেন যে লেখাপড়া শেখাতে গেল ছেলেটাকে। এখন দখল নেবার সময় নিজের রক্তের কেউ নেই। আর দখল নেবার পর কার হাতে তুলে দিয়ে যাবে অরবিন্দ ইলিশখাড়ির অধিকার। অরবিন্দ এত দিন পর বুঝতে পারে আসলে ওর বুকের ভেতর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবটুকু ফাঁকা। মাধবকে টাকা পাঠাতে হবে। মাধবের মা সম্ভবত মাধবের কাছেই গেছে। ছেলেকে নিয়ে হয়তো এসেছিল। অরবিন্দ বুঝতে পারছে না ওদের আসা-যাওয়াটা। মনে হচ্ছে আজকের ঘটনা। না আসলে গতকাল এসেছিল। না, তাও ঠিক নয়; ঘটনাগুলো হয়তো স্বপ্নে ঘটে যাচ্ছে। গভীর জ্বরের ঘোরে উঠে দাঁড়ায় অরবিন্দ। বাইর-বাড়িতে সারা সন্ধ্যা বসে থাকে। তার পর খানিকটা আঁধার হলে হামাগুড়ি দিয়ে নৌকাতে গিয়ে উঠে পড়ে। ইলিশখাড়ির দখল রাখতে হবে। এই বর্ষাতেই মাধবের মাকে আরও কিছু টাকা পাঠাতে হবে। অরবিন্দ মনে মনে বালকবেলার মাধবকে চুমু খায়। মাধবের মাকে দেবীজ্ঞানে পুজা দেয়। চোখের কালি বেয়ে নেমে আসে অনেক দিনের জমে ওঠা নোনা জল।

চুন আর হলুদ বাটার সাথে কী সব গাছের শেকড়-পাতা মিশিয়ে ক্ষতস্থানটা বেঁধে দিয়েছিল মাধবের মা। এখন অণ্ডকোষটাকে ভারি পাথরের মত মনে হচ্ছে। মাছ মারার লম্বা কোচের তিনটা চিকন শিকের সামান্য অংশ ঢুকে গিয়েছিল। তবু অরবিন্দ ইলিশখাড়ির দখল ছাড়েনি। বৈঠার আঘাতে হরিশংকরের বাঁ হাতটা সম্ভবত ভেঙে দিয়েছে অরবিন্দ। দেবুদাকে ওদের সাথে দেখে প্রথমটা অরবিন্দ সাহস পেয়েছিল অথচ দেবুদার হাতের কোচটাই শেষ পর্যন্ত ছুটে এসে আঘাত করলো অরবিন্দর লুঙ্গির নীচে। অনেক সময় পর্যন্ত ডুব সাঁতারে গোপন করে রাখলো নিজেকে। শেষ রাতের দিকে পাঁচ সাতজনকে লাঠি সোটা হাতে এগিয়ে আসতে দেখলো; সাথে মাধবের মা। অরবিন্দ সাহস ফিরে পায়। পানির ভেতর থেকে উঠে এসে বালির ওপর শুয়ে পড়তেই দেখে হরিশংকরের দল নৌকা নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। অরবিন্দর চোখ দুটো তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে। পরমুহূর্তেই চোখ দুখানা খুব গভীর থেকে বুজে আসে।

দুই বর্ষা পর অরবিন্দ সীমান্তের কাছে আরেকখানা খাড়ির সন্ধান পায়। অরবিন্দর সাথে যোগ দেয় বরুন কাকা, নান্টু আর কৃষ্ণগোপাল। শেষ রাতে মাচাভর্তি ইলিশ পাচার করে দেয় সীমান্তের ওপারে। অরবিন্দ এখন ইলিশমাচার মহাজন। অথচ সে বাজারে যায় না। অর্ধশিক্ষিত নান্টু এক দিন অরবিন্দকে বোঝাতে থাকে, ইলিশচুক্তি হলে ওদের হাতে আর পয়সা আসবে না। তখন সরকার নিজেই কলকাতার বাবুদের কাছে ইলিশ বিক্রি করবে। অরবিন্দর কোন ভাবান্তর হয় না। সিগারেটে টান দিতে দিতে অনেক দিন পর সে মাছবাজারে প্রবেশ করে। বাজারটা কেমন শুকনো আর পচা গন্ধে নিস্তেজ। একটু বেশি ফাঁকা। ওর বাবার মহাজন লক্ষীনাথকে খানিক সময় খুঁজলো। প্রথমে ইলিশের আড়ৎ। আড়তের ঝাঁপিটা নামানো; রোদ লেগে কেমন যেন খড়খড়ে দেখাচ্ছে। ঝাঁপির ফাঁক দিয়ে ভেতর বারাবর চিকন গলি ধরে হেঁটে যায় অরবিন্দ। একটা নেড়ি কুত্তাকে ঘুমাতে দেখলো। আরও খানিকটা যাওয়ার পর পায়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে একটা কাল বেড়াল ছুটে গেল। লক্ষীনাথকে পাওয়া গেল না কোথাও।

অরবিন্দ নিখোঁজ হবার তিন দিনের মাথায় মাঝি পাড়াতে বুড়োদের মুখে সেই লালসিঁদুরেরর পেত্নীর কাহিনি আবার ভেসে ওঠে। মাধবের মাকে ঘিরে সুর করে নাকি কান্না জুড়ে দেয় মাঝিপাড়ার বুড়িগুলো। আর মাধব দিনে দিনে বিরক্ত হতে লাগলো। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল ইলিশখাড়ির বাঁকে অরবিন্দর খালি নৌকাটা পাওয়া গেছে। কিরণ কাকা মাধবকে আড়ালে ডেকে নিয়ে অনেক সময় ধরে লাল সিঁদুরের দেবীর কাহিনি বর্ণনা করতে থাকে। আজ চৌদ্দ বৎসর পর শিবরাত্রিতে দেবী উঠে এসে দুধের বাটি ঠেসে ধরেছিল অরবিন্দর মুখে। শিবরাত্রিতেই তো অরু নিখোঁজ হল। গেল বর্ষার আগের বার যখন শংকরদের সাথে গোলমালে সারাটা মাস বিছানায় পড়ে ছিল তখন শিবরাত্রিতে পুজা দিতে পারেনি অরু। তার পর থেকে ওর কত আপসোস। প্রায়ই বলতো, দেখে নিও কাকা লালসিঁদুরের দেবীই এক দিন ঠিক আমার ঘাড় মটকে পাতালে নিয়ে যাবে। কিরণ কাকা প্রতিটি ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে থাকে; যেন সে নিজের চোখে লালসিঁদুরের দেবীর প্রতিটি ঘটনা দেখেছে। কীভাবে যুদ্ধের বছরে লালসিঁদুরের দেবী মাঝ রাতে উঠে এসে একলা পুরুষকে ঝাঁপটে ধরে পাতালে লাফিয়ে পড়তো। মাধব সন্ধ্যার খানিকটা পর বিরক্ত মুখে উঠে এলো। মাধবের বন্ধু বান্ধব বলতে তেমন কেউ নেই। সে নিজেকে মাঝি ভাবতে পারেনি কোনদিন।

পরদিন সকালে আশু আর কার্তিককে একশ টাকায় ইলিশখাড়িতে জাল ফেলতে রাজি করালো মাধব। কোথাও অরবিন্দর লাশ পাওয়া গেল না। সারা সকাল জাল ফেলার পর সূর্যটা যখন ঠিক মাথার ওপর তখনই জালটা কিঞ্চিৎ ভারি মনে হল। খুব সাবধানে জাল তোলার পর ওরা একটু অবাকই হল। জালে আটকা পড়েছে একটা মাত্র মাছ। শরীরটা ঠিক সাদা চকচকে নয়। কেমন যেন শ্যাওলাটে আর ফোলা ফোলা। ওজনটা একটু বেশি। মাধবের রক্তে যেন বা ইলিশের গন্ধ সাড়া জাগায়। চোখ দুটো একটু যেন চকচকে মনে হল। ভর দুপুরে ইলিশটার কানকোর মধ্যে কলাগাছের ছোবড়া ঢুকিয়ে হাতে ঝুলিয়ে নিল মাধব।

অরবিন্দর দেহটা তিন চন্দ্র দিবস পর পচে ঢোল হয়ে উঠলো। ইলিশবৃদ্ধা গাগুঢ়ির নির্দেশে শুরু হল উৎসব। গাগুঢ়ি একটু বেশি মাত্রায় পুরনো স্মৃতিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। ওর সমান বয়স আর ওর সমান দেহধারী এই খাড়িতে এখন আর কেউ নেই। তার মনে পড়ে যায় কোন এক বর্ষায় ঠিক এ রকমই অসংখ্য লাশ বর্ষার বৃষ্টিতে নেচে নেচে খেয়ে নিয়েছে ওরা। কেন যে তখন মানুষগুলো খাড়িতে এসে মরে মরে পড়ে থাকতো। গাগুঢ়ি ভাবতে থাকে, এক বার একটা মানুষের বউয়ের তাজা চোখ সে এক ঠোঁকরে খেয়ে নিয়েছিল। তখনকার সময়টাই ছিল আসলে একটা আজগুবি সময়। আর মানুষগুলো সব যে যেমন পারতো আমাদের ধরে নিয়ে বেঁচে দিত বাজারে। অধিকাংশ রাতেই আমি ভয়ে মানুষের কলিজাটা ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে গর্ত বানিয়ে গর্তের মধ্যে ঢ়ুকে লুকিয়ে থেকেছি। অরবিন্দ যেন বা গাগুঢ়ির ভাবনায় মজা পায়। নিজের ফুলে ওঠা শরীরটাকে আর পছন্দ হয় না অরবিন্দর। দীর্ঘদিন পর গাগুঢ়ি মানুষের শিশ্নের চর্বি খেল অনেক পরিতৃপ্তি নিয়ে। আর শেষটায় সে অরবিন্দর কলিজাটা চোষা শুরু করলো। এক সময় গাগুঢ়ি অরবিন্দর কলিজার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। দুর্ঘটনাটা ঘটলো ঠিক তখনই। কার্ত্তিকের জালে আটকে যায় গাগুঢ়ির দেহ।

অরবিন্দর পুরনো কষ্ট; আরেকটা ছেলে হবে। তবে মাধবের মত নয়। ছেলেটা ওর মত নৌকাতে সারারাত ইলিশখাড়িতে ইলিশ শিকার করবে আর খাড়িটা ওর বংশের হাতেই বেঁচে থাকবে। অরবিন্দর কষ্ট বোধ হয়। আরেকটা ছেলে জন্ম নেবার আগেই গাগুঢ়ি ওর শিশ্নরস ঠুকরিয়ে তুলে নিয়েছে। পরক্ষণেই অরবিন্দ অবাক হয়; ওর কলিজাটা আস্তে আস্তে গাগুঢ়ির শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছে। গাগুঢ়ি তেলচর্বিতে হাঁপিয়ে ওঠে। অরবিন্দ আরও বিস্ময়ে ফেটে পড়লো যখন দেখলো ওরই পুত্র মাধব গাগুঢ়িকে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। যে গাগুঢ়ির দেহে রয়েছে ওর কলিজা আর শিশ্নরস। অরবিন্দ অনেক কষ্টে গাগুঢ়ির দেহের সাথে মিশে রইলো।

অরবিন্দ নিখোঁজ হবার চার দিন পর মাধব আর মাধবের মা রাতের খাওয়া শেষে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলে। অরবিন্দ এবারে অবাক হয় না। তবে সে বুঝতে পারে, যে বাড়ি থেকে লাশ শশ্মানে নিয়ে পোড়ানো হয় না সে বাড়িতে শোকচিহ্ন থাকে না। ওর ছেলেও চুল চাছবে না, উপোস করবে না। অরবিন্দ মাধবের মাকে বলতে শুনলো, খোঁজ নিয়ে দেখ তোর বাবা কোথাও না কোথাও খুব ভালই আছে। জলে ডুবে মরেছে না ছাই। সারা জীবন জলের মধ্যেই কাটালো। টাকা পয়সা তো আর কম করেনি। বিয়ে করার ক্ষমতা থাকলে এত দিনে তাও করতো। মায়ের কথা শুনতে শুনতে মাধব গাগুঢ়ির তলপেটের চর্বি মুখের ভেতর পুরে দিয়ে আরেক টুকরো মাছ তুলে নেয়। আর মাধবের মা কথা শেষ না করেই ইলিশের মাথাটা দাঁতের মধ্যে পিষে ফেলে।

সেই রাতেই মাধব স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নে সে তার বাবার বুক চিরে ফেলে ফুসফুসের ভেতর ঠোঁট চেপে ধরেছে। তার পর বুকের গভীর থেকে রক্ত চুষে নিতে শুরু করলো। মাধবের চোখ দুখানা যেন আনন্দে গোল গোল হয়ে বেরিয়ে আসছে। স্বপ্নের মধ্যেই সে মা-কে হাসতে দেখলো। ওর মা এগিয়ে এসে দ্রুত তার স্বামীর তলপেটে আঙুল ঢুকিয়ে দিচ্ছে। মুহূর্তে আঙুল ঘেঁষে বেরিয়ে আসে অরবিন্দর নাড়িভুড়ি আর থকথকে চর্বি। মাধবের মা যেন বা দীর্ঘ দিন অপেক্ষার পর ঠোঁট ঠেসে ধরে থকথকে চর্বি আর রসালো রক্তের ওপর। মা বেটা দুজনে অনেক তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে নিচ্ছে অরবিন্দর তাজা শরীর। স্বপ্নের ভেতর ভেসে ওঠে একটা সাদা ধবধবে শুকনো নদী। একটা বিশাল ইলিশ তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। মাধবের কেন যেন মনে হলো ইলিশটা ওর অনেক দিনের পরিচিত। মাছটা যেন ওদেরকে ডাকছে। পর মুহূর্তেই মাধব গাগুঢ়িকে চিনতে পেরে চমকে ওঠে।

মাধব আর মাধবের মায়ের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য এক রহস্যময়ী ভঙ্গিতে হেসে উঠলো গাগুঢ়ি।

লেখক পরিচিতি
শিমুল মাহমুদ
কবি। গল্পকার। ঔপন্যাসিক। প্রবন্ধকার।
উপন্যাস :  শীলবাড়ির কাহিনী

৬টি মন্তব্য:

  1. কী সাঙ্ঘাতিক গা ছমছমানো বর্ণনা... অদ্ভুত নিরীক্ষণ ... অসামান্য লেখা।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন
  2. আমার না পড়া বাংলাগল্পে নতুন পটভূমি। নতুন ভয়, ইলিশের স্বাদ গন্ধে ঢুকে পড়লো। গল্পের ব্যঞ্জনা সমাজের গভীরে ঢোকার অপেক্ষায় অস্থির ছিলো।
    -সাধন দাস।

    উত্তরমুছুন
  3. এত্ত সুন্দর দৃশ্য কল্পের বর্ণনা যেন চিত্র টা ঠিক সামনেই সিনেমার রিল গোটানোর মত চলন্ত।এমন লেখা বার বার পড়া যায়।

    উত্তরমুছুন