বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : এক আঁজলা জলও নেই


(১)

হাওয়াই চটি ঘষটে ঘষটে বাঁহাতে প্লাস্টিকের থলে, শিরা জাগানো ডানহাত আলতো করে রেলিঙে ভর। ওই হাতটা না? না বাঁ-টা? একটু দাঁড়িয়ে দেখলে ভালো বোঝা যেত। পেট-বুক-কোমর নারকেল দড়ি। শাড়িটা অভ্যস্ত গোড়ালির ওপরে। পেটের ওপর ব্লাউজের বুকে পাঁচছটা সেফটি-পিন, কালোজাম খোঁপা। সকালেই হাজির। আগে কবে এসেছে এত ঠিক সময়ে? মহুয়ার বেরনোর সময় সাধনার মগজস্থ চার বছরে। নাকি আরো বেশি?


কাঁধের বল-সকেট সন্ধি ভেঙে আট টুকরো, ফোন করেছিল ওর বড়ো মেয়ে। বাড়ি ফেরার লোকাল ট্রেন থেকে পা স্লিপ করেছিল, তখনও প্ল্যাটফর্ম ছাড়ায় নি ট্রেন।

- ইসপিরিং দিয়ে জুড়েচে। পেলাস্টার ছিল, খুলে দিইচে পনর-কুড়ি দিন। তাপ্পর ওই ফিজো না কি... হাতটারে মেশিনে টেনেটুনে... ঝা নাগে গো... আর দশ পনর বাদে ঠিক হইয়ে ঝাবে মনে হয়।

- সেরে যাবে।

মহুয়া ওইটুকুই বলেছিল, আর একটা কথাও না। একমাসের পুরো টাকা ধরে দিয়েছে, পরিমান নেহাৎ মামুলি নয়। কিসের খেসারৎ? সঙ্গে না-পুরনো হলুদ শিফন শাড়ি, পরতনা সেটা। ভরেছে ঝোলায় - মুখ ভয়ানক আঁধার। অবজ্ঞায় টাকাটা কোমরের কষি খুলে সায়ার পটিতে রাখা ছোট্ট পার্সে গুঁজেছে। মুখ চলেছে সমানে, মানুষের অভ্যাস বদলায় না।

- ওট্যাকায় কদ্দিন চলবে গো বৌদি? চিকিচ্চের ঝা খরচ... ডাক্তারগুনো অক্ত চুষে পেটমোটা... পয়সার কাঙাল সব হাড়বজ্জাত... আমাদের অক্ত চুষলে ধম্মে সইবে ভেবেচে? পাপ হবে পাপ। অখন যাব রেশন তুলতে, দেকি কী পাই। এখুন হেই শাড়ি দ্যে কি হবে গো বৌদি? পেটে বেঁধে রাকব না গলায়?

সেই ঢিল-খাওয়া কুকুরের মতো স্বর। ঝিরকুট্টি শুকিয়ে হাড্ডিসার, কঙ্কাল। গা রীরী করছিল মহুয়ার, তেজটুকু তবে জিইয়ে রেখেছে! ভালোমুখে নরম করে বললে আরও কিছু টাকা অন্তত...। দেবে না মহুয়া, তার একার শিরঃপীড়া নয়। ক’টি বাড়িতে করে, ছয় না সাত না আট ঠিকঠাক কোনোদিন বলেছে নাকি সাধনা?

অবান্তর মনোবিকারের বকর বকর, গায়ে মাখার কিছু নেই। বিঁধছে তবু, ডগা-ভোঁতা গুনছুঁচেও আঘাত লাগে! বুবকা চেন্নাইতে, মেডিকেল থার্ড ইয়ার।

ভ্রূ কুঁচকে ছিল অজান্তে, মুখে পিত্তর বিস্বাদ। কষে ঝাড় দিলে হত, যা কখনো করেনি মহুয়া আগে। মানে করতে পারেনি। উলটে তেলিয়ে, মিষ্টি করে, সহ্য করে... কী না খুব বিশ্বাসী... কী না পুরনো... কী না ছেড়ে দিলে অন্য কাউকে ঢোকান মুশকিল। হিসেবমতো মাসে তিনদিন কামাই, অলিখিতভাবে সাতদিনও - আপারহ্যাণ্ড ওর। তিনবছরের যত তেতো বটফল নিমফল গলার ভেতরে পাক খাচ্ছিল। এত বিচলিত হওয়া স্বাভাবিক নয়, মহুয়ার হয়ত স্পর্শকাতরতা বেশি। ভীষণ জ্বালিয়েছে ক’বছর। অগোচরে কয়েকবার ‘বে-শ হ-য়ে-ছে’র ওঠানামা, লুকনো ঈষৎ উল্লাস। হাসিমাছি হয়ত উড়ে বসেছিল ঠোঁটে, মহুয়া সোফায় বসেছিল।

- আসচি বৌদি, খাবার টেবিলে গুচিয়ে গ্যাস মুচে রেকেচি।

খেয়াল হল ওই আরেক, ন্যাকাচণ্ডী। রেখা নামে মহিলার জনমদুখী থোবড়া দেখলে পা থেকে মাথা জ্বলে মহুয়ার। কক্ষনও হাসেনা। এমনিতে শান্ত, কথা খুব কম, বিশ্বাসী। অভ্যাসবশত খুশমুখে দ্য স্টেটসম্যান ওলটাচ্ছিল, ঘাড় হেলাল শুধু। অফিস যাবেনা বলে স্নানে ঢিলে দিয়েছিল। বাবলি ঘরে ঘুমোচ্ছে। রেখা আস্তে ডেকেছিল।

- বৌদি...

- হ্যাঁ কি হল? বল। ঠিক আছে যাও... কাল অফিস আছে, দেরি করো না।

কাগজ থেকে চোখ তুলেছিল মহুয়া। সামনে রঙমোছা সাদাকালো ফিলমের মতো ঝাপসা নেগেটিভে... রেখা? পরিষ্কার দেখা, বেশ কয়েক সেকেণ্ড। ঘটনাটা কি? শক-লাগান ঝাঁকুনি খেয়ে টানটান, ঝুলন্ত চশমা ফিট করল নাকে... নাঃ কই, সব তেমনিই যথাস্থানে। ওভাবেই রেখা দাঁড়ানো! রোগা, চোখ ছলছল রেখা, বেয়াল্লিশ কি তেতাল্লিশ। ন্যাতানো ছাপা শাড়ি, ঘামভেজা ব্লাউজ, ধ্যাবড়ান সিঁদুর। না-আঁচড়ান চুলে অনাদরের ফিতেবাঁধা খোঁপা। একদৃষ্টিতে তার চোখে তাকিয়ে অদ্ভুত হাসছে একটু। বিটকেল তাড়াতাড়ি অস্বস্তি কাটিয়ে সহজ হতে গিয়ে মহুয়ার স্বর কাঁপছিল,

- কি বলছ বল, ওরকম শাড়ি? পুজোয় নিও বরং? আর আলমারিতে যদি থাকে দেখব, বের করে রাখব?

- নাহ্‌।

চটি পরে ধীরেসুস্থে মেঝেতে গুটিয়ে রাখা প্লাস্টিকের থলে তুলল। কোণ-খামচানো ছিটের ছাতা বের করল। দরজা টেনে বেরল, মহুয়া দেখল পুরোটা। মাথা পেছনে হেলিয়ে ঘাপসা চুলে আঙুল চালিয়ে চেপে চেপে ধরল। আগুণ হয়ে আছে চুলের ভেতরে। হঠাৎ কী হল... কাল অফিসে লাবণীর দেওয়া ট্রীট থেকে গ্যাস? অকারণ চাপা টেনশন? অঞ্জন–বুবকা–বাবলি?

মাথা দপদপ অনবরত। জোর করে ধুলো ঝাড়ার মতো দুহাতের পাতা ঝেড়ে, ডলে চোখে ওপরে চেপে ধরল।

- বাবলি এবার ওঠ্‌। ব্রেকফাস্ট কর।

এসির সুইচ বন্ধ করে গলির মুখের দিকে জানালার একটা দিক খুলতেই, দুম করে একমুঠ আগুণ হাওয়া আচমকা ঢুকে ঠাণ্ডাকে ঘুঁষোতে শুরু করল।

- ওহ্‌ মা, কী যে করো সাত সক্কালে!

- সাতসকাল কিরে, বেলা হয়েছে। লাইব্রেরি যাবি বলেছিলি?

শুয়ে শুয়ে ধনুক হয়ে আড়মোড়া ভাঙছিল বাবলি। রাস্তায় উল্টোদিকের কোণাকুণি ফ্ল্যাটের গ্যারাজে ইস্তিরিওলার ঠেক। প্লাস্টিকের টুলে কেন্নোর আকারে নুয়ে গুটিয়ে কে বসে আছে। চোখের সামনে আবার ওরকম ফিলমের ঝাপসা, ঘষা অস্পষ্ট নেগেটিভ। কী হচ্ছে য্বে! নিমেষে ছমছমে অন্ধকার, মাথা ঘুরে বিছানায় থুবড়ে পড়েছে। বুক ধড়ফড়, দমাদ্দম প্যালপিটিশন। বাবলি ডিঙি মেরে ঘাড়ের ওপরে জানালা দিয়ে বাইরে চোখ...।

- মা কি হল? আরে ওখানে সাধনাদি না? এসেছিল? আর কাজ করবে না?

- আঃ...

- কি হয়েছে তোমার? চক্কর?

- কিছু একটা... গ্যাস নয়ত প্রেসার... এমনিতেও আজ যাইনি।

- দেখছি তাই। যাও ঘরে রেস্ট নাও। প্রচণ্ড গরম...

বাবলি বাথরুমে ঢুকল মানে কম করে আধঘন্টা। মহুয়া পায়ে পায়ে নিজের ঘরে, টুকটাক গোছান ইত্যাদি। মাথায় নেগেটিভদুটো আটকে গেছে। ওরকম অস্বস্তি কোনও জন্মে... কটকটে আলোয়, সকালবেলা অবাস্তব ভূত ভূত খেলা? মহুয়া ভীতু নয়। তাহলে বাবলিকে নিয়ে একা কাটাতে পারত না।

অঞ্জন টেম্পোরারি ট্রান্সফারে তিনবছরের শাটল কক। একবছর হয়েছে সবে। মাঝে মাঝে উড়ো উড়ো কিছু খবর... নিরামিষ ছুঁকছুঁকনি অঞ্জনের চিরটাকাল, বিয়ের আগে থেকে। মহুয়া আর ঘাঁটায় না। মাপা দূরত্ব রেখে, কড়াকড়ি রাখেনি। বুবকার ফোন আজকাল খুব কমে গেছে কোর্সের ব্যস্ততায়। বাবলির উচ্চ-মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরনোর সময় আসছে। মেগা-সিরিয়ালের আবর্তনে চরকিপাক অস্থিরতা - শেষ নেই, সমস্যা সমাধান না হতেই আবার নোতুন। ক্লান্ত লাগে। অবসাদ-গেলা শেষযৌবন আর খুলে বললে মাঝবয়স। বিরক্তি, বিষণ্ণতা, ভাল্লাগেনা নিয়ে মহুয়া শবাসনে শুল বাতানুকূল বাড়িয়ে, মোবাইল কানে।

- হ্যালো ছোড়দি, কেমন আছ?

- আরে মৌ! অফিস যাসনি?

- না, ম্যাজম্যাজ করছে। সি-এল নিলাম। জান দুমাস বাদে মহারাণী এসেছিলেন আজ সকালে।

- মহারাণী? কে রে?

- সাধনা...। কাল রাত্তিরে ফোন করেছিল।

- ওমা! তারপর কাজে রাখলি?

- আবার? কত ভোগাল বল! জানই তো এমনিতেই ... একা অফিস বাড়ি বাজার বাসন... একটা লোক পাচ্ছিলাম না। দুম করে... যা অসুবিধে হচ্ছিল! এমনিতে যা বদমাইশি করছিল... ইরিটেটিং, ছাড়াতেই হত! একদিন বলে দুদিন কামাই... তার ওপর মুখ! ওদিকে নিত্যদিন প্যানপ্যানানি...

- হুঁ সবকটা এক, বজ্জাতের ঝাড়।

মহুয়া না থেমে গলগল করে বলে যাচ্ছিল। ‘শেয়ার’ করতে পেরে হাল্কা অনেকখানি, ফুরফুরে। ভূত দেখার গল্প শোনালে ননদ যদি ভাবত ভাই বিহনে বৌ... যত্তসব। বলেনি মহুয়া। বোকা বোকা – বলা যায় নাকি কাউকে?


(২)

- দাদার শার্টের কলার একটু ঘষে দিও সাধনা। আর কাপড়গুলো চেপে জল না ঝরালে এই বর্ষায় শুকোয় কখনো?

- একটা মিশিন কিননে নাও দি’নি, পয়সা কি কম নেকি তোমাদের? সবেতে কিটিরকিটির কর কেন বলোত? হেই জন্যি লোক টেঁকেনি, শুদু আমি বলে এতবছর...

কথার ঝালে মাথা জ্বলে ওঠে। মহুয়া বস্‌-এর সঙ্গে এভাবে কখনো কথা বলতে পারবে, দুঃস্বপ্নও দেখেনা। অর্ধেকদিন দেরিতে ইচ্ছে করেই, ট্রেন লেট্‌-এর দোহাই! প্রায়শঃ কোমরে খিঁচুনি, জ্বরজ্বর, হাতে ব্যথা। কাজ শুরুর আগের গৌরচন্দ্রিকা - সাতখুন মাপ। মুখ বুজে গিলতে হয়েছে মহুয়াকে, তেতো-ঝাল-ঝাঁঝ-অম্বল মিলেমিশে গলায় আটকে থেকেছে। তটস্থ সকালটা দৌড়ে পালিয়েছে আঙুলের ফাঁক গলে।

- সাধনা, ঐদিকটা ন্যাতা বুলিয়ে নাওনা... দেখ, মনে হচ্ছে কখনো ঝাঁটও পড়েনা!

- জ্বালিওনি তো বৌদি... আমারে কি কিনে রেকচ নাকি? অতগুনো বাড়ি বাকি। ঘরেও অনেক কাজ, তাড়াহুড়ি সেরে যাব মেয়ের ইশকুলে। বড়দিদিমুনি খবর পাইটেচে। সেকান থেকে ফিরতে কত দেরি হবে কে ঝানে... টাইমের জল ধরার আগে আসতে পারব কিনা, সেইটে ভাবচি।

হপ্তার রেশন ধরতে দুদিন, কোনোদিন টাইম-কলে সময়ে জল আসেনি বলে... মহুয়ার কিছু বলার নেই। মেশিনের বেগে বাক্সে বাক্সে টিফিন ভরেছে, চুল আঁচড়ে ক্লাচার আটকেছে, ময়শ্চারাইজার কিম্বা সানস্ক্রিন মেখেছে, লিপস্টিক ঘষেছে, হন্যে হয়ে সালোয়ারের ওড়না খুঁজেছে। এভাবে অসুবিধে হচ্ছে ভীষণ - কথাটা সাবধানে তুলেছিল দুএকবার। যদি সাধনা না পারে, তবে অন্য কাউকে রাখার কথা ভাবা যায় - ভাববে মহুয়া।

রেখা আড়ালে সতর্ক করেছিল,

- ওকে ছাড়ালে মুশকিলে পড়বেন বৌদি। কাউকে টিকতে দেবেনা, পোচণ্ড মুখরা! বস্তির লোকেরা ওকে ভয় খায়।

স্বার্থপর! অসভ্য! চোরে চোরে মাস্তুত বোন জুটেছে, দুটোতে নির্ঘাৎ গোপন প্যাক্ট আছে। অসহায় লেগেছিল মহুয়ার, জ্বলেছিল। বস্তিতে? জঘন্য নোংরা শব্দটাই। চটা ফাটা শ্যাওলা বিছে আরশোলা কিলবিল, জঞ্জাল হিসিহাগুর উৎকট গন্ধ... উফ্‌। এদিককার বস্তিগুলো কোথায় তুলে দিয়েছে খবর রাখা হয়নি। ঝগড়াঝাঁটিতে ভীষণ ভয় মহুয়ার, পেটগুলোন কুচ্ছিত ভাষা, ঘিনঘিনে মাছিভরা স্ট্রাগল আর লড়াই।

কদাচিৎ ওয়ানস্‌ ইন আ ব্লু মুন... বছরে দুই কি তিন কি চারবার... হাঁটুর ওপর কাপড় গুটিয়ে, ঘরমোছা বালতিতে দুহাত ডুবিয়ে ন্যাতা থামিয়ে, উবু বসে গল্প জুড়েছে সাধনা। পরিবারের কথা। মহুয়ার সেদিন অফিস হয়ত ছুটি, কিম্বা দেরিতে যাবে, সি-এল নিয়েছে। আলসেমিতে আধোঘুম, নিষ্ক্রিয় বিছানায় বা সোফার বিন্দাস আরামে। চুটিয়ে ফাঁকি মেরেছে সাধনা, বাসনে এঁটো বা একটা জামার রঙ গেছে আরেকটায়।

ইতিবৃত্ত শোনানো কি ইচ্ছাকৃত? সহানুভূতি কুড়নো? বেখেয়ালে মহুয়ার মুখ ফসকে ‘আহা’ বেরিয়ে গেছে বলে?

- তুমিও গ্রামে ফিরে যেতে পারতে, জমিটমি যখন আছে বলছ? এত পরিশ্রম করছ এখানে।

- গেরামে? কক্ষুনও না। হারামজাদা মাগীবাজ আবার ঘর বইসেচে। আমি নেকি কুচ্চিৎ খ্যাংরাকাটি, নেকি মাংস নেই। উপরি দুটা মেইয়ে হইচে... একটা হাবাগবা, কতা কইতে পারেনা। কত দোষ আমার বল দিকিন? ওপক্ষের মাগীর গতর আছে, খাটতে পারে না কিন্তুক। আবার ছেলে হইচে একটা!

- খুব খারাপ!

- ঝানো বৌদি, লিলিটার কি পশংসা ইশকুলে। বাপেরে কয়ে এইচি, দেখ্‌ কী করি আমি! হেই মেইয়েটারে মানুষ করবই। তা বড়োটা পড়ল না, ইশকুলে ত ওরেও দিইছিলাম। পেরেম করছিল। নুকিয়ে গ্যে সিন্দুর পরে এল কালীঘাটে। তখন তার মা জম্মোশত্তুর, দুচক্ষের বিষ। পরে ত শুনি জামাইটা ঝা হারামি। শুদু বলে – তোরে এই দেয়নি তোর মা, হেই দেয়নি। ইদানি আবার খুব আসে নীলি। বলে বুনকে পড়াচ্ছ, আমার ছাওয়ালটারে পড়াও। ছোটোটার বিয়ের নামই কইরবনা।

দুটো কানেই যখন আছে, সঠিক ও সদ্ব্যবহার করা সবচেয়ে সোজা। মহুয়া তাই করেছে। সোফায় কাৎ, হাই তুলতে তুলতে, হাতে টিভির রিমোট বা ম্যাগাজিন।


বাবলির ছোটো, সামান্য রঙচটা, অপছন্দের কুর্তি লেগিং জুতো ব্যাগ স্কার্ট নির্বিচারে দিয়ে দিয়েছে মহুয়া। চিড়-খাওয়া কাপপ্লেট, ফুটো হওয়া বেডশিট, ছোটো হওয়া ব্লাউজ - বিনা মন্তব্যে ঝোলায় পুরেছে সাধনা। বাসি শক্ত পাঁউরুটি কিম্বা মিষ্টি, বেস্ট বিফোর পরবর্তী ম্যাগির প্যাকেট, সাতদিন ফ্রিজে থাকা কাঁচা মাছের মাথা – বিনা বাক্যে নিয়ে গেছে সাধনা। মহুয়া ভেবেছে পচে নষ্টর চেয়ে, ভোগে লাগুক। ভেবেছে, সন্তুষ্ট রাখলে যদি কামাই কম করে।

সাধনা হাত পাতেনি কখনো, ধরে নিয়েছিল এসব প্রাপ্যই। অভিব্যক্তিহীন। খুশি প্রকাশ করেনি, কৃতজ্ঞ হয়নি। মহুয়া আশা করেছে, এত পায় যখন, অন্তত মুখে তো একবার...। ক্রমশ সয়ে গেছে। লোভী স্বার্থপর জাত, পরোক্ষে এক্সপ্লয়েট করে। তাই পাঁক থেকে ওঠেনা, যেখানে ছিল ওখানেই পচে।

অফিসে চঞ্চল ব্যানার্জীর ভাট বকুনি – সাব-অলটার্ন থিওরি, বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত। অসহ্য... বেশি বেশি! বিয়ে-থা করেনি, অবাস্তব কিছু দম আটকানো কথা ছেটান। মুখ বেঁকিয়েছে মহুয়া। অত দরদ নেই, মহৎ হওয়ার ইচ্ছেও না। রোজকার হাজার ঝামেলায় ওষ্ঠাগত দিনপাত।

খেয়ে না খেয়ে, এতগুলো বাড়ির নমো নিত্যং সামলে মূকবধির স্কুলে সাধনা পড়াচ্ছে মেয়েটাকে, নাচফাচ নাকি শিখছে। কত আশা! ক্যালি আছে, দম আছে, করুক। কামাইটা একটু কম, কাজটা একটু পরিষ্কার হলে বলার কিছু থাকত না মহুয়ার।

- ঝান, পেথমে তো বলে নেবে না, ভত্তির ডেট নাকি পেইরে গেছে। আমিও কি ছাড়ার পাত্তর? ধন্না দিয়ে থাকলাম। নেবে না মানে? টেস নিয়ে দেখ দি’নি, মেয়ে আমার পারলে কেন নেবেনি? আমরা গরীব মানুষ, এতদূরে ইশকুল... ডেট জানব কি করে? তাপ্পর ঝান, কাটখড় পুইড়ে কাউনসিলারের চিঠি নে গেলাম।

- বাববাঃ অনেক করেছ।

- হ্যাঁ বৌদি। তখন বলে টেস নেবে। নিল। বলল ও পারবে, নিব। বলে কি, ইশকুলের খর্চা চালাতে পারবে? বললাম হ্যাঁ, গতর যখুন আছে, খেটে খাব। ও পড়ুক।

- হুঁ, সে-ই।

- ত্যাখন এক বাড়িতে খাওয়া-পরার কাজ, থাকি বস্তিতে একটা ঘরে। সি মাসিমা খুব ভালো ছেল। বলেচেল, একানটা ছেড়োনি। তা, মেয়ের পড়ার যাওয়া-আসার ধুম খরচ... আরো বাড়ি ধইরতে হল।

- মেয়ে একা যাতায়াত করে, পারে?

- সব শিকেচে। বুদ্ধি খুব। ইশারায় বুইঝে দেয়। বাসের লোকেরা হেল্প করে। আমাকেও টেনিং নিতে হইছিল। কেমন করে অরে বুঝাব, শিকাব... হেই রকম সব।

- তাই? তুমি ওদের ভাষায় বলতে শিখেছ?

- শিকতে হইচে। ভুগুল, বাঙলা, অঙ্ক – পড়াতে পারতম নিচের কেলাসে। একন টিপশন পড়ে ইশকুলে। টিচার বলেচে, লিলি খুব ভালো কইরবে পরীক্ষায়।

লজ্জা পেয়েছে সাধনা, পাঁচ’ছ ক্লাস অবধি ইস্কুলে গেছে সেও। ভালোই তো! মহুয়া বিস্মিত, প্রকাশ করতে বেধেছে। প্রশংসা গোপনে, হয়ত হিংসের মতোও কী একটা। তুলনা? প্রতিযোগী? প্রতিস্পর্ধী? এবাবা... ছোঃ, হ্যাক্‌, ধুস্‌! আর কিছু না? পাগল নাকি মহুয়া? কী যেন গালভরা টার্মটা বলে গাড়োল চঞ্চল মুখার্জী - শ্রেণী-শত্রু! কে? কার? সেও ওসব কষে মুখস্ত করেছিল গ্রাজুয়েশনে। ঘেঁটে গেছে। বেচে দিয়েছে আটঘণ্টার ডিউটি, গুলতানি, ডেইলি চলাচল আর সংসারখাতে।


খুব দূর নয়, লোকাল ট্রেণে চারটে স্টেশন মোটে - সাধনা যে বস্তিতে থাকে। পরিবারপিছু এক-দেড়খানা করে ঘর। থাকা, রান্না খাওয়া, টাইমের কল। প্লাস্টার ওঠা। পোকামাকড়, ইঁটফেলা সরু গলি, বর্ষার পাঁক। টিউবওয়েল বসান আছে। স্কুল না থাকলে বাবলি পড়া ফেলে গাল পেতে শুনেছে ওর ঘরগেরস্থীর গল্পকথা। মহুয়া অফিসে।

- খাটা পায়খানা না কি বলে, ওইটা তোমাদের ওখানে?

- নাগো, সেনিটারি টেংকি, তোমাদের কুমড না কি, হেরকম না। বালতি করে জল নিয়ে ঢুকতে হয়। আর ঝান তো, হিন্দুস্থানি আচে তিনঘর। মদ্দাগুলো ঈয়া মোটকা, লেংগট পরে তেল ডলে ছ্যান করে কলতলায়। তখন আর কাউর ঝাবার উপায় নাই। আটঘর মাইনষের জন্যে দুটো কলঘর দুটো পাইখানা। ঠেলাঠেলি হবেনি? হেগে জল না ঢেলে পাইলে আসে... নুম্‌রার হদ্দ নুম্‌রা। দেয়ালে মুতে রাকে কতজনা। কে করচে ধর্তে যাও দি’নি... কুরুক্ষেত্তর গো! বলেচি বাড়িওলাকে, অনেকে মিলে কাগজে সই করেচি, আরও দুটা কলঘর আর তিনটে পাইখানা বাইনে দিতে হবে।

- দেবে?

- বলেচে দেবে... দ্যাক একন কবে দ্যায়। আমার ঝা জীবন... জাননি গো। তবে আমাকে উরা ভয় খায়, খারাপ কতা বইলতে সাহস পায় নেকো।

- তোমার মেয়ে কোন্‌ ক্লাসে সাধনাদি?

- নাইনে উটেছে। যে বচর ফাইনাল দেবে ইশকুল থে’, তখুন কদিন ছুটি নিব বৌদির ঠেঁয়ে।


বড়ো বেডকভার বালতিতে নামিয়ে দিয়েছে মহুয়া, কতবারই তো। বাবলির পিরিয়ডস্‌ - মাখামাখি চাদরে, স্কার্টে। মেয়েকে একটু বকেছে। ইতস্তত ভেবেছে, ওয়াশিং মেশিন কেনা একান্ত জরুরি। ভেবেচিন্তে গুছিয়ে বলেছে,

- সাধনা গরমজল সাবানে একটু ভিজিয়ে দিও খালি, আমি সন্ধ্যেয় ফিরে ধোব’খনে। মেয়েটা যে কবে সামলাতে শিখবে!

- ওতে আর কি হইয়েচে? দাও গরমজল, ভিজ্যে কেচে দিচ্চি। সরো দি’নি, দাঁইড়ে থাকলে দেরি হইয়ে যাবে...

কৃতজ্ঞতার পলি জমেছিল একটুও? বরং তখন মনে হয়েছে, অস্বস্তির কি, কাপড় কাচার জন্যে বেশি টাকা প্রথম থেকেই দেওয়া হচ্ছে। শি’জ পেইড ফর ইট।

বছরে বারদুই শাশুড়ি তাদের কাছে আসেন। ভেতরে ভেতরে সন্ত্রস্ত থাকে মহুয়া। দীক্ষিত, পরিচ্ছন্নতাগ্রস্ত। বাধ্য হয়ে অনুনয়,

- মা আসবেন পরের হপ্তায়, তুমি কিন্তু কামাই-টামাই করো না সাধনা। আর জানই তো, কী পরিষ্কার মানুষ। নিজের রান্নাটাও নিজে করতে চান... ছোঁয়াছুঁয়ি ওসব... বুঝলে তো?

জবাব আসেনি। একমনে বাসন ঘষেছে সাধনা, শুনল কি শুনল না বুঝতে পারেনি মহুয়া। বাসনে একটু-আধটু এঁটো পাওয়া গেছে, কাপড়ে দাগ, বা ওরকম কিছু। ক্লান্তিতে ব্যর্থতায়, হতাশ টেনশনে ভুগেছে মহুয়া। শাশুড়ি এসে থেকেছেন, অভ্যেসবিহিত খুঁত ধরেছেন, যাওয়ার আগে সাবধানে থাকতে বলেছেন। রেখা আর সাধনার হাতে বকশিশ দিয়ে গেছেন। এরকম কতবার।

বাবলির জন্মদিন, বুবকার বন্ধুরা, অঞ্জন বা মহুয়ার পার্টি... সাধনাকে ইচ্ছে করে বলা হয়নি আগে। টেনশন, আসবে তো সকালে? এসেছে, রান্নাঘরের মেঝেয় এঁটো বাসনের ডাঁই, মেজে চলেছে, মেজেই চলেছে। সঙ্গে অস্ফুট বিড়বিড়। মহুয়া মুখ কাঁচু করে ঘরে উসখুস, এই বুঝি কিছু...। তুলি বুলনোর মতো ঝাঁটা বুলিয়েছে সাধনা,

- কাল ঝেদি বলে দিতে, আজ আগে এসে ঝেতুম। তা তোমরা সব একই ঝাড়ের বাঁস গো। কত দেরি হই গেল বল দি’নি!

মহুয়া মুখ বেঁকিয়েছে। বললে আজ কি আর ওই চাঁদবদনখানি...? চালাকি কত! অফিস না গিয়ে সারা সকাল... ঝিগিরি।

কেকের টুকরো, উদ্বৃত্ত পনির পকোড়া, ফ্রায়েড রাইস, মাংস, উপরি টাকাও কিছু – খেয়ে, মুখ মুছে, গুছিয়ে প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে নিয়েছে সাধনা। পাওনা তার এসব।



(৩)

মহুয়া মোটেও এতকিছু ভাবছিল না। শরীরে আনচান বলে কদিন রাতে ঘুমও গাঢ় হচ্ছেনা। সুগার ধরা পড়েছে। হঠাৎ পাওয়া ঘুমটুকু সযত্নে উদযাপন করছিল মহুয়া। ঠাণ্ডায় গুটিসুটি দেখে বাবলি চাদর চাপা দিয়ে গিয়েছিল গায়ে।

মোবাইলের মতো না-মিত্র না-শত্রু কে বা আছে আর অধুনা যাপনে?

- এই দিভাই, সকালবেলা টেনে ঘুম দিচ্ছিস? বেঁচে আছিস? অফিস যাস নি? রাত জেগেছিস? বর এসেছে? চলছে তোদের?

- তোর কি তাতে? মারব টেনে... স্কুলে পড়াস না? ফোন রাখছি।

- আরে সিরীয়াসলি, মা চিন্তা করছিল। কবে আসবি? বাবলিদেবীর রেজাল্ট সম্ভবত নেক্সট উইকে - হোটেলের টেবিল বুক করে রাখিস। অঞ্জুদা আসবে কবে?

- জানিনা। জানিস আজ দুমাস বাদে এসেছিল সে...

- সে মানে? তোর সেই ঠিকে? পারিসও দিভাই।

- হ্যাঁ। যা চেহারা হয়েছে ভাবতে পারবি না।

- ন্যাচারাল। ধকল তো একটা। কি বললি, রাখবি আবার? পুরনো লোক তোর...

- আবার? গন ক্রেজি? অসহ্য! একমাসের মাইনে, শাড়ি দিলাম আবার কি? ঠিক তেমনই - নেভার হ্যাপী। নো গ্র্যাটিট্যুড।

- হুঁ।

- ঘুরিয়ে বলে দিলাম ভারী কাজ আর হবেনা ওর দ্বারা। বরং রান্নার কাজ খুঁজে নিক। দেখে মনে হল, হাতটা প্রায় অকেজো।

- আহারে, ঈস্‌।

- ভাব, ও করবে রান্না! যা নোংরা। কোথায় কাজ পাবে রে? আহারে... বলা দূর থেকে সোজা! বলে কি, কাপড়কাচাটা বাদ দিলে করতে পারে আমার বাড়িতে।

- রেখে নে... মেশিন কিনবি তো বললি।

- নাঃ, নেভার। আরে অন্য কাজও পারবেনা... শিল্পা বেশ গাট্টাগোট্টা। বয়স কম, কাজটা তুলনায় বেটার। টাইমে আসে।

- সবে ঢুকেছে বলে। সব ক’জন এক - যাক কিছুদিন... কাপড় কাচবে বলেছে?

- হুঁ। একটু গাঁইগুঁই আছে... দেখি। সাধনা একদম দমে গেছিল বুঝলি? দেখাচ্ছিল না অবশ্য। অত্যধিক ডাঁট... ওফ্‌ গা জ্বলে যেত কথা শুনলে। রান্না করতে পারে কিনা সন্দেহ আছে! কড়া ডোজ হয়েছে...

- নে ধর, মা...।


মশগুল ছিল, খেয়ালই করেনি মহুয়া। দরজার মাথায় ঘড়ি দেখতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল। কে দাঁড়িয়ে? সেরকম সাদাকালো নেগেটিভ। বাবলি? শর্টস আর ঢিলে টী-শার্ট, হাওয়াই চটি... মুখচোখ প্রায় অদৃশ্য। দুলছে হালকা করে। চেঁচাতে গিয়ে স্বর আটকে গেছে, বুদ্ধিতে কুলোচ্ছে না। পাগল হয়ে যাচ্ছে সে? দাঁতে দাঁত লেগে চীৎকার করে উঠেছে,

- বা – ব – লি – ই-ই!

গলা চেপে গিয়েছিল, আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না। বাবলি লাফ দিয়ে ঘরে, ধরেছে মাকে। পড়ে যাচ্ছিল মহুয়া খাট থেকে। কোনোরকমে তুলে শুয়েছে। রোগাপটকা বাবলি, মহুয়ার শরীর যথেষ্ট ভারি। তোয়ালে ভিজিয়ে মুছে দিয়েছে মাথা মুখ কান। থতমত খেয়ে, পাড়ার ডাক্তারকে ফোন করেছে। উনি জ্ঞান দিয়ে, স্ট্রেস রিলিফের, ঘুমের মাইল্ড দাওয়াই লিখে দিয়ে গেছেন।

মা-মেয়েতে বেরিয়েছিল বিকেলে। উইণ্ডো শপিং, খাওয়া, মজার সিনেমা দেখে, ওষুধ কিনে বাড়ি। ভালো লাগছে মন – অনেক হালকা। এজন্যই বাইরে যাওয়া। মনোবিদরা বলছেন, হুটহাট বেরিয়ে এলোপাথাড়ি কেনাকাটা করলে নাকি... অনেকটা ফ্রেশ লাগছে, বেশ লাগছে।

নিজের গুহা ছেড়ে বাবলি মায়ের পাশে অঘোরে ঘুমিয়ে। জানতে পারেনি, তার মা বলেনি, কী হয়েছে।

সকালে ছোটোপিসি, দুপুরে মাসিমনি... কী সব বলছিল মা! খুব কেন নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল, রিভেঞ্জফুল? খারাপ লাগছিল, কষ্ট হচ্ছিল বাবলির... সাধনাদির মতো পুওর উওম্যানের সঙ্গে, কি করে...? কুটকুট করে কী কামড়াচ্ছিল, মশাই হবে। অনেকক্ষণ ছটফট করল ঘুমের আগে, ‘সরি – সরি – সরি’ অক্ষর হিজিবিজি হয়ে ভাসছিল বন্ধ চোখের ভেতরে। পাশ ফিরে জড়ায় মাকে।

মহুয়া ওষুধ খেয়ে তন্দ্রায়। বুকের ওপরে ভারি কী একটা... বোবায় ধরেছে বুঝি!

ঝুরঝুর ঝুরো বালি দুহাতে সরাচ্ছে জলের আশায়। আলগা হাতে সরাতে সরাতে গর্ত অনেক গভীর, আরো গভীর। যতই হাঁকপাঁক করছে, জল পাচ্ছেনা। বিস্তর খোঁড়ার পরে, নিচে পাতলা পলির কাদা কাদা স্তর। জল নেই একফোঁটাও।

বে-শ হয়েছে, উচিৎ শিক্ষা... প্রয়োজন ছিল। গুলগুল হাসি গুলোচ্ছে মহুয়ার...


টিংটং টিংটং টিংটং – শিল্পা একনাগাড়ে বাজিয়ে যাচ্ছে কলিংবেল। শিল্পার আসল নাম হয়ত অন্য কিছু। হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলেছে মহুয়া। লেগিং-কুর্তি পরা, কানে দুটো করে ছেঁদা। মোবাইলের প্লাগ কানে গোঁজা, এফ-এম চলে।

ঢুকে আর দাঁড়ায় না। কিচেনে, ঘসঘস ঘষছে বাসন। থুপথুপ করে স্রেফ জল দিয়ে ধুয়েছে কাপড়গুলো। মেলে দিচ্ছে ব্যালকনিতে... অঝোরে জল। হাওয়ায় উড়িয়ে ঘর ঝাঁট হচ্ছে... মহুয়া দেখছে, তেতো মেজাজ ফুটছে। ভেতরের মসৃণতা কুঁকড়ে যাচ্ছে। বোবা হয়ে আছে, বলতে পারছে না। আসলে, কোনওদিন সে জোরে কথা শোনায় না কাউকে।

রেখা কড়ার গরম তেলে তরকারি ছাড়ছে। স্নানে যাচ্ছে মহুয়া। এসে টিফিন গোছাবে... চুল শুকোবে... ক্লাচার লাগাবে... ওই ওই ওই এক – রোজ...

শিল্পা ছাতা নিয়ে চটি পরে বলছে,

- এলাম বৌদি

মহুয়া এখন চোখ তুলে দেখছে না, পাছে সেই নেগেটিভ আবার...

২টি মন্তব্য: