বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

সামরান হুদার নভেলেট : সংসারে এক তালব্য শ

তাল তমালের বনেতে
আগুণ লাগে মনেতে
বন্ধু আমার বুনো হাওয়া
সুখ হল না প্রাণেতে।

শহর নগর বন্দরে
ঘুরি আমি ঘুরিরে
ভাব লাগে না মনেতে
অভাবে দিন গেল রে।


সকাল দুপুর সন্ধ্যা গেল
সূর্য ডোবে আধারে
নদী পাহাড় সাগরে
খুঁজি আমি তাহারে

এখন কোনো গল্প নাই
গল্পে কোনো কথা নায়
দিন মানে সূর্য নায়
রাতে কোনো চন্দ্র নায়
না হয়লোনা কথামালা
কি পরিব গলেতে

গল্প করি কাহারে
কবে পাব তাহারে
বন্ধু আমার বুনো হাওয়া
সুখ হল না প্রাণেতে ।।

–এফ রাজীব


এই পাড়ার সবাই জানে অজাবির স্বপ্নের কথা। সেই ছেলেবেলায় একদিন অজাবি স্বপ্নে দেখেছিল এক দ্বীপ। চারদিকে নীল জল, মাঝখানে এক টুকরো পৃথিবী। নারকেলের বন আর এক রাজপুত্র। একদিন সেই রাজপুত্র সমুদ্র পেরিয়ে এই দেশে আসবে, অজাবিকে বিয়ে করবে আর তারপর সঙ্গে করে নিয়ে যাবে সেই দ্বীপে, নিজের এক ছোট্ট পৃথিবীতে। সেই থেকে অজাবির অপেক্ষা শুরু। নিজের সঙ্গে কথা বলা শুরু। রাজপুত্র আসবে বলে জীবনে আর কোনো পুরুষমানুষের মুখদর্শন করেনি অজাবি। পা দেয়নি নিজের উঠোন, বাগানের বাইরে। তার বাড়ির সীমানায় পুরুষের প্রবেশ নিষেধ। পুরুষ- সে যেই হোক না কেন। হতে পারে মাটির হাড়ি-কলসি’র ফেরিওয়ালা, বা তার নিজের জমিতে কাজ করা মুনিষ। ফিসফিসিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলা অজাবির চিল চিৎকার শোনা যেত তখনই, যখন সে ঘরের ভিতর থেকে কোনো পুরুষ মানুষের গলা শুনতে পেত। অজাবির ক্ষেতের ফসল তুলে এনে মুনিষেরা আমাদের উঠোনে ফেলত। আমাদের মুনিষ সেই সব ধান-পাট ঝাড়াই-বাছাই করে, শুকিয়ে দিলে হাসিনার মা বুবু খলইতে করে সেসব অজাবির ঘরে রেখে আসত। বড়কাকা নিজে পাটের গাঁট অজাবির ঘরে দিয়ে আসে, গুছিয়ে রেখে আসে কারণ ভারি বোঝা টানা, মোটা মোটা গোছা তুলে বিড়ের মতন পাকিয়ে গুছিয়ে রাখতে হাসিনার মা বুবু পারবে না।



শোনা যায় অপেক্ষায় অপেক্ষায় একসময় মাথা খারাপ হতে শুরু করে অজাবির। অপেক্ষার শেষ হয় না। নিজের সঙ্গে কথা বলতে দেখে লোকে অজবিকে পাগল বলে ডাকতে শুরু করে। লোকে বলে, বাগানের গাবগাছে জ্বীন থাকে, পুরুষ জ্বীন। স্বপ্নে নাকি সেই জ্বীনই রাজপুত্র হয়ে দেখা দিয়েছিল। খোলা চুলে, খোলা পিঠে অজাবি বাগানে ঘোরাঘুরি করত, গাছের পাতা কুড়াতো। তখনই নাকি অজাবিকে জ্বীনের পছন্দ হয়ে যায়, স্বপ্নে এসে দেখা দেয় বারে বারে। পাড়ার লোকে বলে, অজাবির ঘরে নাকি জ্বীনও বাস করে অজাবির সঙ্গে। তাই জ্বীনের বউ অজাবি। ছেলে পুলেও আছে তার। এই যে এত বাগানের এত ফল, এত সব ফসল, সে সব একা অজাবি খায় নাকি? এদিকে কাউকে তো কোনোদিন গাছের একটা ফলও পাড়তে দেয় না। সবই জ্বীন আর তার পোলাপানে খাওয়ার জন্য গচ্ছিত! এমনটাই ধারণা করে লোকে। জ্বীনে নাকি ভাত-মাছ খায় না, খায় কেবল রুটি, মাংস। জ্বীনের বউ অজাবিও তাই ভাত-মাছ খায় না, খায় রুটি-মাংস! অজাবি সত্যি সত্যিই ভাত খায় না। মাছও না। মাংস তার জুটে যায় মাঝে মধ্যে। কোরবানির মাংস বা কদাচিৎ পাড়ায় জবাই হওয়া গরুর মাংস। আর বাগানের ফল। অঢেল।

আমাদের উত্তরের দালানের পেছনে এক ফলের বাগান। অজাবির বাগান। সূর্যের আলো সেই বাগানে ঢুকতে পায় না বলে দিনের বেলায়ও সেখানে বিরাজ করে আবছা আলো-আঁধারের খেলা। আম, জাম, জামরুল, কাঁঠাল ছাড়াও সেখানে রয়েছে আতা, শরীফা, বড়ই, পেয়ারা, গাব, নারকেল। আর রয়েছে এক তালগাছ। সেই তালগাছ, যে কিনা থাকে ছোটদের পড়ার বইতে-
এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।
আমাদের উঠোনের দক্ষিণের ভিটেয় দোচালা টিনের লম্বাটে এক ঘরে অজাবির বাস। অজাবি। ভালো নাম হয়ত কিছু একটা ছিল, কিন্তু লোকমুখে অজা বিবি থেকে ‘অজাবি’ হয়েই থেকে গেল সারা জীবন। অজাবিকে সবাই পাগল বলে। কারো সঙ্গে কথা বলে না অজাবি। সামনেও আসে না কখনও কারও। আমাদের উঠোনের দিকে মুখ করা একটা নড়বড়ে কাঠের দরজা রয়েছে অজাবির ঘরে। এটা অজাবির সমুখ দরজা হলেও বারো মাস বন্ধই থাকে। এমনকি ঈদে-চান্দেও এই দরজা খোলে না অজাবি। সৈয়দ দাদা, অজাবির ছোটভাই যখন ছুটিতে বাড়ি আসত তখনই শুধু এই দরজটা খুলত। দরজার সামনে ছোট্ট এক পাকা সিড়ি, যেখানে সৈয়দ দাদা হুকো হাতে বসে থাকত সকাল-বিকেল। গরম পড়লে দাদা এই দরজা এমনকি রাতেও খুলেই ঘুমোতো।

গোটা উত্তরগাঁওয়ে একমাত্র তালগাছটি অজাবির। পশ্চিমের উঠোনের শেষ সীমানায় লস্করদের বাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তালগাছ। উত্তরে লস্করবাড়ি, পশ্চিমে তালগাছের গোড়া থেকে অল্প দূরেই কচুবন, বাড়ির ঢাল। উঠোনের দিকটায়, পূবদিকে গাছতলায় খানিকটা জায়গা পরিস্কার করে লস্করবাড়ির ছোট মেয়ে চম্পা, জোহরা বিবির মেয়ে সাহানার আড্ডার জায়গা। মাদুর পেতে রেডিও নিয়ে বসে থাকে চম্পা। ওদিকটায় গেলে আমারও বসে ওদের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করে কিন্তু জঙ্গলের মাঝে বলে ভয়ও করে। শকুনেরা সব দল বেঁধে বসে থাকে বলে এমনিতেই তালগাছকে আমার ভয়। যদিও শকুন রোজদিন এসে বসে না। আর বসলেও সব সময় থাকে না। মাঝে মধ্যে কোথা থেকে যেন ঝাঁকে ঝাঁকে চলে আসে আর এসে বসে এই তালগাছের উপর। এত শকুন আসে যে তখন তালের পাতা দেখা যায় না। ঝুলন্ত বাসাগুলো থেকে ছানা-পোনা নিয়ে বাবুই পাখিগুলোও অন্য গাছে এসে আশ্রয় নেয় তখন। তাছাড়া এই বাড়িতে জ্বীন রয়েছে পোলাপাইন শুদ্ধু। সাহানা অবশ্য বলে যে জ্বীন থাকে গাবগাছে, কিন্তু তারা যে শকুনদের মত দলবল নিয়ে তালগাছেও বসে থাকে না তার গ্যারান্টি দেবে কে?

নিজের সঙ্গে কথা বলে অজাবি। সারাক্ষণ, সারাদিন। সে ভীষণ আস্তে, সে প্রায় ফিসফিস। অজাবির কথা সে নিজে ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় না। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা যখন তখন অজাবির টিনের দেওয়ালে কান পাতে তার কথা শোনার জন্যে। ওই টিনের দেওয়ালে কান পেতেছি আমিও বহুবার। তবে কান পেতে রাখাই সার। ফিসফিসে একটা শব্দ শোনা যায় বটে কিন্তু কোনো কথা বোঝা যায় না। মাঝে মধ্যেই হাতে বাঁশের শুকনো কঞ্চি নিয়ে হুট করে দরজা খুলে বেরিয়ে আসত অজাবি। অমনি পড়ি মরি করে সবাই যে যেদিকে পারে দৌড়। সিঁড়ি থেকে নেমে অজাবি দু-এক পায়ের বেশি এগুতো না কিন্তু অজাবির সাড়া পাওয়া মাত্রই গোটা উঠোন শুনশান। ছেলে-মেয়েদের লুকোনোর একটাই নিরাপদ জায়গা, আমাদের বাড়ির সীমানার উঁচু লাল দেওয়ালের পেছনে। নিরাপদ এই জন্যে যে অজাবি কক্ষণও বাড়ির সীমানা পেরিয়ে বাইরে পা রাখে না। কখনও কখনও দেওয়ালের পেছন থেকেও উঁকি-ঝুকি দেয় দুঃসাহসী দুটো একটা মুখ, আস্তে করে ছূঁড়ে দেওয়া আলতো প্রশ্নঃ ‘অজাবি, তুমি বিয়া বইতা না?’ ব্যস! আর দেখতে হয় না। এক লাফে ঘরে ঢুকেই অজাবি কোচড় ভর্তি ঢিল নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আবার বেরিয়ে আসে । ছোট ছোট পাথর, ভাঙ্গা ইঁটের টুকরো, যাকে সিলুক বলে, সেই সব একের পর এক এলোপাথাড়ি ছুঁড়তে থাকে প্রশ্নের জবাবে।

সবাই বলে, জ্বীনের সঙ্গে কথা বলে অজাবি। সেই জ্বীন, যে নাকি অজাবির বর। যার সঙ্গে অজাবির ঘর। অজাবির উপর যার ভর। সেই জ্বীন, যে নাকি অজাবিকে পাগল বানিয়ে লোকসমাজ থেকে আলাদা করে দিয়েছে। মাঝারি গড়নের অজাবিকে দেখতে ভীষণ সুন্দর। দুধে-আলতা গায়ের রঙ, ছোট্ট তিলফুল নাক। একটু চওড়া আর উঁচু কপালের নিচে কোথায় যেন হারিয়ে যাওয়া স্থির, অচঞ্চল দুই চোখ। ঘন আঁখি পল্লব, ঘন জোড়া ভুরু। হাঁটু ছাপানো ঘন কালো চুল, যাতে অযত্ন আর বেখেয়াল রূপ নিয়েছে মোটা মোটা জটায়। কালো সরু পাড়ের সবুজ কিংবা নীল মিলের শাড়িটা সায়া-ব্লাউজ বিহিন শীর্ণ শরীরে জড়ানো থাকে হেলায়। কোমরে গিঁট দিয়ে বেঁধে আটপৌরে করে পরা শাড়ির আঁচল তখনই শুধু ঘাঁড়, পিঠ ঢেকে মাথায় ওঠে, যখন উঠোনের গায়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ফলের বাগান পেরিয়ে আমাদের উত্তরের জানালায় এসে দাঁড়ায় অজাবি। হাঁক দেয়, ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ, এট্টু সদাই আনন লাগব যে বাজার থেইক্যা, মিন্টু মিঞা কি বেইল্যা বাজার থন ঘুইরা আইয়া পড়সে নিহি।’ বারান্দা থেকে শুনতে পেয়ে বড়কাকা এগিয়ে যায় ঘরের ভিতরে, উত্তরের জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অজাবিকে বলে, ‘নাগো ফুফু, যামু, কইন কিতা লাগব আফনের।’


-দুই-

মাঘ না মাসেতে ভাইরে ক্ষেতে দিলাম আল।
লাঙ্গল ভাঙলাম, জোয়াল ভাঙলাম, আরো ভাঙলাম ফাল।।
ফাল্গুন মাসেতে ভাইরে ক্ষেতে দিলাম মই।
দুর্‌রা ভদল্যা কয়, আমরা যাইবমি কই।।
চৈত্র না মাসেতে ভাইরে রবির বড় জ্বালা।
নাল্যা ক্ষেতে গবর ফেলতে শরীল করলাম কালা।।
বৈশাখ মাসেতে ভাইরে নাল্যার ফাল্‌লাম আলি।
বাকী আলি বেইচ্যা আনলাম ভাইজের লাগ্যা বালি।
নাল্যা নিড়াও গো তুমি, ধানত নিড়াও না।
গোসা কইরা বইয়া থাকবাম ভাতত রানতাম না।।

- ন্যালার বারমাসি/ বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত পরিচিতি/সম্পা; নির্মল ভৌমিক/ পৃঃ ১৮৩-৮৪

লম্বাটে ঘরটার পশ্চিম দিকের দরজার নিচে মোটা একটা গাছের গুড়ি রাখা, যা কিনা সিঁড়ির কাজ করে। দরজা পেরিয়ে ঘরের ভিতর উঁকি দিলে দেখা যায় বেতের পার্টিশনের এধারে ছোট্ট এক খুপরি রান্নাঘর। দরজার বাঁ দিক ঘেঁষে ঘরের কাঁচা মেঝে খুঁড়ে বানানো দু’খানি উনুন। একটা একমুখো, অন্যটা দু’মুখো। উনুনের পাশ ঘেঁষে মেঝের উপরেই বসানো আছে লুডোর ছক্কার মতন দেখতে, জলচৌকির সমান উঁচু একটা চারকোনা মাটির ঢিপি, যার নাম ‘পৈডাল’। লেপা-পোঁছা এই মেটে পৈডাল দেশ-গাঁয়ে সবার রান্নাঘরেই দেখা যায়, এর উপর ভাতের হাড়ি রেখে মাড় গালার কাজটি করেন সকলে। যদিও অজাবির ঘরে এর ব্যবহার কুপিদানি হিসেবেই সীমাবদ্ধ। টিনের দেওয়ালে আড়াআড়ি যে বাঁশের বাঁধুনি, তাতে গুঁজে রাখা আছে নারকোলের মালা দিয়ে বানানো চুয়োর, লোহার খুন্তি, সাঁড়াশি। দেওয়াল ঘেঁষে সারসার ঝুলছে পাটের বোনা নানান আকারের সিকে। যার কোনোটায় মেটে হাড়ি, কোনোটায় কলসি তো কোনোটায় তেলের বোতল। অজাবির এই রান্নাঘরটি শুধুই রান্নাঘর নয়, হাঁস-মুরগিদের আবাসস্থলও বটে। আলাদা করে তাদের জন্যে কোনো খোঁয়াড় অজাবির নেই। দরজার ডানদিকের কপাট আটকে আছে একটা মাঝারি পলোতে। ওপাশে, পার্টিশনের গায়ে পাশাপাশি রাখা আছে কতগুলো মুখ ভাঙ্গা মাটির কলসি, ভাঙ্গা লোহার কড়াই। খড় বিছানো এই সব কলসি, কড়াইগুলো কোনোটা ডিম পাড়ার জন্যে তো কোনোটা ডিম দিয়ে মুরগি বসানোর জন্যে। সদ্য ফোটা হাঁস, মুরগির ছানারাও থাকে এই ভাঙ্গা কলসি বা কড়াইতে খড় বিছানো বিছানায়। বিশাল বড় এক জালি কাটা বাঁশের টুকরিতে শুকনো পাতা, যা কিনা বিকেলের রান্না করার জন্যে কুড়িয়ে এনে রাখে অজাবি। মাথার উপর বাঁশের ভারা বোঝাই করে রাখা শুকনো পাটখড়িতে। রান্না করার জন্যে কাঠের দরকার পড়ে না অজাবির, এই পাঠখড়ি আর বাগানের শুকনো কুটো, পাতা দিয়েই বছরভর কাজ চলে যায়।

ঘরের আড়াআড়ি বেতের বোনা এক পার্টিশন। একটা মানুষ গলে ওপাশে যেতে পারে এতখানি জায়গা ছেড়ে বসানো আছে পার্টিশনটা। কোনো দরজা বসানো নেই এর গায়ে। পার্টিশনের গলা পর্যন্ত উঁচু বেতের ঠাঁস বুনোট, গলার উপর থেকে ঘরের চাল অব্দি ফাঁক ফাঁক জাফরি কাটা নকশা। পার্টিশনের ওধারে অজাবির থাকার ঘর। ঘরের মাঝামাঝি এক গরাদহীন জানালা। জানালার ওধারে ঘরের দেওয়াল বরাবর সার দিয়ে পরপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বাতাবী লেবু, আতা আর শরীফার গাছ। ঘরের শেষ মাথায় ছোটো ছোটো দু’খানি পুরনো মেহগনি কাঠের চৌকি। নকশাদার গোলাকৃতি পায়া। কত পুরনো কে জানে। খাঁজকাটা নকশার উপর ধুলোর মোটা আস্তরণ। চৌকির নিচে এলোমেলো রাখা ধানের খলই, ডালের মটকা, পেঁচিয়ে গাঁট বেঁধে রাখা পাট। রয়েছে ফলের টুকরি। বারো মাসই যাতে থাকে বাগানের কোনো না কোনো ফল। ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রাখা নারকেলের শলা, সরু করে তোলা তালপাতার বেত এবং আরও অনেক খুঁটিনাটি জিনিসপত্র। মোটকথা এই চৌকির তলায় এলো করে রাখা অজাবির সংসার। চৌকির মাথার দিকে ছোটো একখানা নামাজের চৌকি। একসময় এতে নামাজ পড়তেন অজাবির মা। এখন সেই চৌকির উপরে অজাবির ছোট্টো ধানের গোলা। গোলার পাশেই হাতলবিহীন চেয়ারে টিনের বড় তোরঙ্গ, যার উপর ভাঁজ করে রাখা কাঁথা, ওয়াড়বিহীন লাল শালুর লেপ। ঘরের ঠিক মাঝখানে টিনের চাল থেকে ঝুলিয়ে বাঁধা বাঁশ, যাতে ঝোলে অজাবির শাড়ি, গায়ে জড়ানোর চাদর। পার্টিশনের গায়ে রাখা পরপর দু’খানি গাইল, পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একখানি সিয়া। নানান রঙের চারকোণা, তেকোণা কাপড় জুড়ে জুড়ে বানানো এক চাঁদোয়া টাঙানো আছে চৌকি দুটোর উপর। চাঁদোয়ার চারদিকে সাদা কাপড়ের কুচি দেওয়া ঝালর। কবেকার এই চাঁদোয়া কে জানে। ঝালরের সাদা কাপড় পুরনো হতে হতে হলদে, মলিন এখন। হয়ত অজাবির মায়ের বানানো কিম্বা অজাবি নিজেই হয়ত বানিয়েছিল কুচির ঝালর দেওয়া এই চাঁদোয়া। হয়ত তখন অজাবি তার সেই স্বপ্নে দেখা রাজপুত্তুরের স্বপ্ন দেখত। তার কথা ভাবতে ভাবতে, তার জন্যে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে সেলাই করে করে স্বপ্নগুলোকে জুড়েছিল নানান রঙের এই টুকরো কাপড়ের সঙ্গে।

বাগানের শেষমাথায় ঢালু জমিতে ছোট্ট এক বাঁশঝাঁড়ের ভিতর পাটখড়ির বেড়া দিয়ে ঘেরা অজাবির গোসলখানা। আরেকটু দূরে একই রকম বেড়ায় ঘেরা পায়খানা। এমনি দিনে কোনো অসুবিধে নেই কিন্তু বর্ষাকালে পানি বেশি হলে সবার আগে ডোবে ওই গোসলখানা, পায়খানা। অজাবি এই সব বানের পানি-টানির না করে তোয়াক্কা, আর না তো ভয় পায় সাপ-খোপকে। বদনা হাতে কখনো হাঁটুজল তো কখনও কোমর অব্দি জল ঠেঙ্গিয়ে সে যাবে ওই পায়খানাতেই। গোসলটা শুধু রান্নাঘরের দোরের নিচে পেতে রাখা গাছের গুড়ির উপর বসে করে। দরজার সামনে টেনে নেয় হাসিনার মা বুবুর এনে দেওয়া জলের কলসি, যাতে মাস্টারবাড়ির পুকুরের হিম ঠাণ্ডা জল। ওই পুকুরের জল ছাড়া অন্য জলে অজাবি গোসল করে না বলে প্রতিদিনই হাসিনার মা বুবু আমাদের বাড়ি কাজে ঢোকার আগে মাস্টারবাড়ির পুকুর থেকে দু’কলসি জল এনে অজাবির দোরগোড়ায় রেখে যায়। বর্ষার জল বাড়তে শুরু করলেই সকাল বিকেল বড়কাকা গিয়ে দাঁড়ায় অজাবির দরজার সামনে, ‘অ অজাফু, আফনে য্যান এই বর্ষাইত্যা পানি ভাইঙ্গেন না, জ্বর-জারি বাদই দিলাম, যদি সাপে কামুড় দ্যায়, তয় আর উপায় থাকত না, বাড়ির ভিতরে আইয়া পইড়েন যে, উত্তরের দুয়ার খুইল্যাই রাখসি। অ হুফু, আল্লার দুয়াই, আফনে য্যান পানি ভাইঙ্গেন না।’ কে শোনে কার কথা। অজাবির জ্বীন বর নাকি বারণ করে রেখেছে, সংসারী মানুষের বাড়ির ভিতর না ঢুকতে।

বাড়ি-জমি যখন ভাগাভাগি হয়, তখন ওসমান দাদা পায় গোটা বাড়িটার তিন ভাগের এক ভাগ। এক ভাগ সৈয়দ দাদার, বাকি এক ভাগ অজাবি-উন্দাবি দুই বোনের। ওসমান দাদা জোহরা বিবিকে বিয়ে করে নিজের ভাগ বুঝে নিয়ে সংসার আলাদা করলেও সৈয়দ দাদা বিয়ে করেনি। গাঁয়েও থাকে না, দূরের সেই নারায়ণগঞ্জে পাটকলে চাকরি করে। ছ’মাসে ন’মাসে বাড়ি আসে ছুটিতে। দিন কতক থাকে বোনের সঙ্গে, আবার চলে যায়। নিজের অংশ বুঝে নিতে উন্দা বিবি কখনই বাপের বাড়ি আসেননি। এক একর জমির উপর বাড়ি-বাগানে ওসমান দাদার উপস্থিতি থাকলেও একচ্ছত্র আধিপত্য চলে অজাবির। যেদিকটায় ওসমান দাদা থাকে, সেদিককার উঠোনের পশ্চিমদিকটা অজাবির। সেখানকার সব গাছ-পালাও অজাবির। মিঠা বরই এর সঙ্গে সঙ্গে সব গাছেদের থেকে মাথা উজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একা তালগাছটিও অজাবির দখলে আসে ভাগাভাগির জেরে। বাড়ির লাগোয়া বির্চা ছাড়াও মাঠে অজাবির ধানজমি আছে বেশ কিছু। সৈয়দ দাদা তো গ্রামে থাকে না, ওসমান দাদার সঙ্গে অজাবির মোটে বনে না বিধায় বড়কাকাই দেখা-শোনা করে সেসবের। ধান যখন আসে, মাড়ানো, শুকানো আমাদের উঠানেই হয়। মহিদদাদা, মজিদ ভাই মলন দেয়, হাসিনার মা বুবু ধান শুকায় দু’দিন-তিন দিন ধরে। তারপর খলই ভরে ভরে সেই ধান অজাবির ঘরে গোলায় ঢেলে দিয়ে আসে সবাই মিলে।

বাগানের মাঝখানে সরু এক পায়েচলা পথ এগিয়ে গিয়ে নেমেছে নিচু এক জমিতে। অজাবির বির্চা। বাড়ির পাশে লাগোয়া এমন সব জমিকে সবাই বলে ‘বির্চা’। ডানপাশে লস্করদের পুকুর, বাঁপাশে আমাদের। দুই পুকুরের মাঝের লম্বাটে এই বির্চা গিয়ে মিশেছে পশ্চিমের সরু খালে। বর্ষার জল যখন খালের পাশের সরু কাঁচা রাস্তা ডুবিয়ে দিয়ে এপাশে চলে আসে, তখন জলের তলায় চলে যায় অজাবির বির্চাও। ওই সময়টা এই বির্চায় থাকে ‘নাইল্যা’। পাটগাছ। বর্ষার পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড় হয় নাইল্যা, গলা অব্দি পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দুই-আড়াই মাস। পোক্ত আর মোটা হয় পাটখড়ি বা শুলা। মজবুত হয় শুলার গায়ের আঁশ, পাট। যে বছর বর্ষার জল বেশি হয়, বির্চা ডুবিয়ে দিয়ে জল চলে আসে অজাবির বাগানে। আর বন্যা হলে তো কথাই নেই। বাগান, উঠোন পেরিয়ে পানি এসে যায় অজাবির দোরগোড়ায়। ঘরের ভেতর বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরা যায় এমন জল। সৈয়দ দাদা বাড়ি থাকলে তাই করত। সারাদিন রান্নাঘরের দোরগোড়ায় বসে থাকত ছিপ নিয়ে। একটা করে মাছ ধরে আর পাশে রাখা ছোট্ট বেতের ঝুড়িতে ফ্যালে। আট-দশটা মাছ হয়ে গেলেই পেছন দিকে ফিরে অজাবিকে বলত, ‘বুজান, মাছডি বিরান কইর‍্যা দ্যাও।’ অজাবি নিজে মাছ না খেলেও দুই ঠ্যাংওয়ালা বটি নিয়ে বসে মাছ কুটে-বেছে ভাইয়ের জন্যে ভাজতে বসত।

সৈয়দ দাদা বাড়ি এলে একবার করে তালগাছে চড়ে তার ডাল-পাতা ছেটে দেয়। বিশাল বড় বড় পাতা গোড়া থেকে কেটে দিলে ঝপাং করে নিচে পড়ে। সৈয়দ দাদাকে তালগাছে চড়তে দেখলে অনেকেই বলে রাখে, তাকে যেন একটা পাতা দেওয়া হয়। গাছের নিচে জড়ো হওয়া মানুষগুলো অপেক্ষা করে কখন দাদা গাছ থেকে নামবে, আর তারা পাতা নিয়ে বাড়ি যাবে। পাড়ার সব বউ-ঝিই তালের পাখা বুনতে জানে। ছেলেবেলায় পুতুল খেলার সঙ্গে সঙ্গেই পাখা বোনাও শিখে যায় সবাই। এক একটা বাড়িতে আট-দশটা করে তালপাখা ঝোলে দেওয়াল-বেড়ায় গাঁথা পেরেক থেকে। গরমে পাখা ছাড়া গতি নেই। নিজেদের জন্যে ছাড়াও শহরে থাকা আত্মীয়-স্বজনের জন্যেও পাখা বোনে অনেকে।

আষাঢ় মাসে আদলেতে বোঝাই নদীনালা।
পোক-পাহালী ভিজ্যা মরে, হারে কিনা দুক্‌কের জ্বালা।।
ওরে পুরুষেরা খানকায় বসে পাহায় নানান রশি
কেহ বানায় খালই টোপা, আবার কেউ গান ধরিছে কষি।।
ওরে মাইয়া লোকে নাইদ্যা বাইর‍্যা খায় পানপাতা।
কেহ বানায় শিকা পাখা, কেহ শিলায় খাঁতা।।
 - উত্তর বাংলার লোকসাহিত্য/ সামিয়ূল ইসলাম/ রংপুর/ পৃঃ ১২৮

শহরে যদিও কারেন্ট আছে, বাতি টিপলে আপনা থেকেই পাখা ঘোরে কিন্তু তবুও হাতে বোনা পাখা পেলে সকলেই খুশি হয়। সৈয়দ দাদা নিচে নেমে যাকে যা দেবার দিয়ে দেয়। তারপর ভারী ডাল সমেত পাতাগুলোকে একে একে টেনে জোহরা বিবির উঠোনে রাখে। ওসমান দাদা পাতা ছেঁটে বেত তুলে দেবে। ওসমান দাদার মত ভালো বেত তুলতে আর কেউ জানে না। সাহানাকে ডেকে সৈয়দ দাদা বলে, ‘সুন্দর কইরা দুইডা পাঙ্খা বুইন্যা দিস তো মাঈ, রুসমত আরা কইসিলো পাঙ্খার কতা।’ রুসমত আরা উন্দা বিবির মেয়ে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেয়েদের কলেজে পড়ে। সৈয়দ দাদা ছাড়াও অজাবির আছে এক বড় ভাই, ওসমান আলি, অজাবির উঠোনের পূব ভিটায় যাঁর ঘর। এক বড় বোন উন্দা বিবি। উন্দা বিবির বিয়ে হয়েছিল দশ মাইল দূরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। সেখানে বাসস্ট্যান্ডের গায়ে তাঁদের নিজস্ব বিশাল তিনতলা বাড়ি ।

অজাবির মতই সুন্দরী ছিলেন উন্দাবিও। বড়লোক বাড়ির বউ, বড়লোক ছেলেদের মা উন্দাবি। দু’মাস চার মাসে একবার করে বাপের বাড়ি আসতেন। চওড়া লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, গায়ে রঙ মিলানো লম্বা হাতার ব্লাউজ, হাতে-গলায় ভারি সোনার গয়না, পরিপাটি সিঁথির দু’পাশে বাহারি পাতা কাটা চুল ঘাড়ের উপর বাঁধা থাকত বিশাল এক খোঁপায়। উন্দাবি যখনই বাপের বাড়ি আসতেন, থেকে যেতেন তিন-চারদিন। বোনের কাছেই থাকতেন। পাশের ভিটেয় বড় ভাইয়ের ঘর হলেও সেখানে যেতেন না একটিবারের জন্যেও। পাশের পাড়া মুনশীবাড়ির এক নিচু জাতের মেয়েকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিলেন ওসমান আলি, সেই থেকে অন্য ভাই-বোনদের সঙ্গে মনোমালিন্য। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কথা-বার্তা থাকলেও ভাজের সঙ্গে কদাপি নয়। উন্দাবি এলে তাঁর খাওয়া দাওয়া, চা-নাশ্‌তা-পান সবই আমাদের বাড়িতে হতো। দাদির সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল উন্দাবির। দাদিকে ‘ভাউজ’ বলে ডাকত। বোধ হয় একমাত্র উন্দাবিই এই ‘ভাউজ’ বলে ডাকতেন দাদিকে, এছাড়া সকলেই হয় ভাবিসাব নয় বড়বিবি বলত। পানের বাটা সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন উন্দাবি। যখন তখন নিজেও পান খেতেন, অন্যদেরও খিলি বানিয়ে দিতেন। উন্দাবি এলে জমাটি আসর হতো সারাদিন ধরে। চলত সেই মাঝরাত্তির অব্দি। উন্দাবি যখনই আসতেন, অজাবির জন্যে শাড়ি, অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র নিয়ে আসতেন। মশলা-পাতি, নানা রকমের ডাল কিনে দিয়ে যেতেন বেশি করে। উন্দা বিবি মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলেরা আসে তিন-চার মাস পর পর। সকালে আসে, খালার সঙ্গে একবেলা থাকে, বিকেলে চলে যায়। বরাবরই দেখেছি, অজাবির ঘরে মেহমান এলে তাদের খাওয়া দাওয়া আমাদের বাড়িতে হয়। কাকা বলে, ‘এই বিটির ফকিরি জীবন, মেহমানদারি কি করব!’



-তিন-

হাপু হাপু হাপু, গাবের বিচি খাবু।
তোর লাল পেয়াদা মরে গেলে
কার দুয়ারে যাবু।
হেইলাম ফুঁ তো, হেইলাম ফুঁ তো,
হেইলাম ফুঁ তো।
বুড়ো গেল মাছ ধরতে, মেরে আনলে পাবা তো।
দুই সতীনে যুক্তি করে বুড়োক বলে বাবা তো।।
হেইরে এক পয়সার কুড়মুড়ি, বিয়ার কুরকুরি।
হেইরে এক পয়সার খৈ, বিয়ার কথা কই।।
হেইলাম ফুঁ তো, হেইলাম ফুঁ তো,
হেইলাম ফুঁ তো।
হেই রে এক পয়সার ম্যাচবাতি,
বিয়া হলি টপ করি।

-হাপুগান/ নাটোর/ বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারা/ওয়াকিল আহমেদ

বাগানের শেষপ্রান্তে প্রায় জঙ্গলের মধ্যিখানে অজাবির গাবগাছ। গাছে এন্তার গাব। গাবের সময় পাড়ার বৌ-ঝিরা এসে অজাবির দুয়ারে দাঁড়ায়, ‘হুফু, কয়েকডা গাব দেইন না, টাইল-খলইত লেপ দিমু।’ অজাবি বলে, ‘গাছত উডব কেডা? দেহি কাউরে পাওয়া যায় নিহি। সমো থাকলে আমার টাইল-খলইডিও এট্টু লেপ দিয়া যাইস।’ এদিকে দাদি কাকাকে বলেছে বাজার থেকে গাব এনে দিতে, আমাদেরও ধানের গোলা, যাবতীয় খলই-কুলো ইত্যাদি বেতের জিনিসগুলো লেপতে হবে গাব দিয়ে। কাকা বলে, ‘অজাফুরে জিগাই খাড়ইন, যদি দেয় তয় বাজার থেইক্যা আনন লাগত না, গাবের বদলা অজাফুরে আডা দিয়া দিমু নে।’ কাকা গিয়ে আওয়াজ দেয় অজাবিকে, ‘অজাফু, কতডি গাব লাগে যে, বাজার থন আফনের কিছু আনন লাগবনি? আমি তইলে গাছত থন গাব পাইড়া লইয়া যাইতাম।’ অজাবি বলে, ‘হ, গাছো এমনেও কেউর একডা উডন লাগত, হগ্‌গলেরই গাব লাগব, আমি মানু পাই না গাছত উডানের লাগি।’ আমাদের মুনিষ মজিদ ভাই গাছে ওঠে, পাতাসুদ্ধু থোকা থোকা গাব পাড়ে আর ডালে ঝোলানো বাজারের ব্যাগে রাখে। ব্যাগ ভরে গেলে গাছ থেকে নেমে এসে অজাবির দরজায় গিয়ে গাবের ব্যাগ রেখে দিলে অজাবি বলে, ‘অর্দেকডি আমারে দিয়া বাকি অর্দেক লইয়া যা গিয়া তগো গরোত, মিন্টু মিঞা কইসিল গাব লাগব।’

গাবগাছে লোক উঠেছে খবর পেয়ে জনে জনে হাজির হয় অজাবির ঘরের সমুখে। ধান মাপার বেতের একসেরি ‘সের’ ভর্তি করে করে প্রত্যেককে গাব দেয় অজাবি। নিজের জন্যে দু’টুকরি মতন তুলে নিয়ে ঘরে যায়। ডাঁটি ভেঙ্গে পাতা ছাড়িয়ে বড় মাটির হাড়িতে সেদ্ধ বসায় গাব। ভাল করে সেদ্ধ করে কাঠের হাতা দিয়ে নেড়ে নেড়ে। জল যখন গাঢ় আঠালো হয়ে ওঠে, চুলা থেকে জ্বাল তুলে নেয় অজাবি। গাব ঠাণ্ডা হলে গাইলে দিয়ে পাড় দিয়ে মিশিয়ে দিলে যে লেই লেই মণ্ড তৈরি হবে সেটা দিয়ে লেপা হবে ধানের গোলা, খলই, কুলো। পরদিন সকালে সমুখ দরজা খুলে দিয়ে ঘর থেকে বার করে গোলা, যাকে সবাই বলে টাইল, ধান মাপার একসেরি ‘সের’, চার সেরি ‘পুরা, আধসেরি ‘টুরি’, সবক’টা কুলো, মাথায় করে ধান রোদে দেওয়ার বেতের ‘খলই’। জ্বাল দেওয়া গাব দিয়ে লেপে দিলে বেতের জিনিসগুলোর ফাঁক-ফোঁকরগুলো ভরে যায়, জিনিসগুলো টেকসই হয়। কুলো-ডালা যেগুলো হয়ত ছ’মাস চলত, সেগুলো চলবে এক-দেড় বছর করে।

বাঁশের বেত দিয়ে মুখ কাটা কেরোসিনের টিনের মত দেখতে বিশালাকারের যে জিনিসগুলো তৈরি হয়, সেগুলো ধানের ‘টাইল’। এক-একটা টাইলে ধান থাকে একশ-দেড়শো মণ। ছোট-বড় নানান আকারের টাইল হয়, যার যেমন প্রয়োজন সে সেই মতো টাইল কেনে। অজাবির ঘরে আছে পঞ্চাশ মণি টাইল। কাঠের চৌকির উপর বসানো থাকে টাইল। ঘরে তোলার আগেই গেরস্থ একবার টাইল লেপে নিয়ে বুনোটের ফাঁকগুলো বুজিয়ে দেয় জ্বাল দেওয়া গাব দিয়ে। যাতে করে এদিক-সেদিক ফাঁক-ফোঁকরে ধান আটকে না যায়। হাসিনার মা বুবুর মেয়ে শাফিনা এসে অজাবির টাইল-সের-টুরি-পুরা লেপতে বসে উঠোনে। গাইলে পাড় দিয়ে টুকরো গাবকে আগেই ভাল করে মণ্ড বানিয়ে দিয়েছে অজাবি। হাতে করে সেই মণ্ড নিয়ে সাবধানে লেপ লাগায় শাফিনা, হাতে যেন বেতের উঠে থাকা কোনা বা কোনো কিছু ফুটে না যায়। খানিক পরপর অজাবি এসে তদারকি করে করে টাইল লেপার। মাঝে-মধ্যে নিজেও হাতে করে গাবের মণ্ড নিয়ে এখানে-সেখানে একটা করে পোঁচ দেয়। লেপা হয়ে গেলে সার দিয়ে খলই-সের-টুরি ঘরের উঁচু ভিটের গায়ে দাঁড় করিয়ে দেয় শাফিনা। রোদে দিলে বেত মুচমুচে হয়ে ভেঙ্গে যাবে বলে ছায়ায় রেখে শুকায় বেতের জিনিস। টাইল ইত্যাদি লেপে দেওয়ার মজুরী অজাবি ধান দিয়ে দেয়। চার সেরি ধানের ‘পুরা’য় এক পুরা ধান এক দিনের মজুরী। সন্ধ্যে বেলায় শাফিনা আবার এসে জিনিস-পত্রগুলি অজাবির ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে যায়।

অজাবির টাকা-পয়সা নেই। টাকার দরকারও পড়ে না তার। বাজার থেকে কোনো কিছু আনবার প্রয়োজন হলে সে ধান বেনে চাল দিয়ে বাজার থেকে সওদা-পাতি বদলিয়ে নিয়ে আসে কাকাকে দিয়ে। দুপুর দুপুর উত্তরের জানালায় এসে দাঁড়িয়ে চাচিকে আওয়াজ দেয়, ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ, মিন্টু কী আইজ যাইব বেইল্যা বাজারো?’ অজাবির আওয়াজ শুনে বারান্দা থেকে উঠে ঘরে আসে কাকা। অজাবিকে বলে, ‘হ ফুফু, বাজারো তো যামু, কিতা লাগব কইন।’ জানালা দিয়ে নিজের দুই হাত তুলে চালের পোটলা দেখায় অজাবি, বলে, ধান বানছিলাম কতডি, বদলাইয়া বাজার থন আমারে এট্টু কেরাসিন তেল, গুড়, চা পাতা আর কতডি আডা আইন্যা দিও।’ কাকা বলে, ‘আফনে ঘরো যাইন, বাজার যাওনের সময় আমি লইয়া যামু নে।’ এভাবেই চালের বদলে নিজের প্রয়োজনীয় সওদা পাতি আনিয়ে নেয় অজাবি। দুধ-চিনি খায় না অজাবি, চা খায় গুড় দিয়ে।

নিজেই ধান বানে গাইল-সিয়া দিয়ে। ধুপ ধুপ আওয়াজ শুনে একবার আর সবার মত তার ঘরের দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়েছিলাম, কি হচ্ছে বোঝার জন্যে। সমুখ দরজা খুলে অজাবি উঁকি দেয়। দৌড় দেব না কী করব বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে মিহি, নিচু গলায় অজাবি বলে, ‘ঘরো আইবা সামাবিবি? আইয়ো।’ যাবো নাকি উলটো দিকে ফিরে ছুট লাগাবো বলে যখন ভাবছি অজাবি এগিয়ে এসে হাত ধরে, ঘরে নিয়ে যায়, হাতটা ধরে রেখেই দরজা ভেজিয়ে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেয় চৌকিতে। বলে, ‘শয়তান পোলাপাইনের লগে গিয়া শয়তানি করো ক্যান বুবু? তুমি না লুলু ভাইসাবের নাতিন, বুরু মিঞার ঝি?’ বুড়ো মিঞা, আব্বার ডাকনাম, গ্রামের সকলের মুখে সে ‘বুরু মিঞা।’ ভয় না করলেও চিন্তা হচ্ছে অবশ্যই, যদি আমাকে পায়রা বানিয়ে দেয় অজাবি? বলি, আফনে আমারে কবুতর বানাইয়া দিবেন? ফিক করে হেসে ফ্যালে অজাবি। সেই প্রথম আমি অজাবিকে হাসতে দেখি। বলে, ‘কবুতর? তুমারে বুঝি অই নডির ঝি-পুতে এই সব কতা কইছে ? কবুতর না, আমি হেগো রে আঁস বানাইয়া ফলোর তলে ঝাঁপাইয়া থুইয়া দিমু।’ দুলে দুলে হাসে অজাবি। বুঝতে পারি ঠাট্টা করছে।

সেই থেকে অজাবির ঘরে আমার যাওয়া শুরু। সেদিন অজাবি ধান বানছিল। বেড়ায় ঠেস দিয়ে রাখা দ্বিতীয় সিয়াখানি তুলে নিয়ে আমি ধান বানতে গেলে অজাবি বলে, ‘তুমি ফারতা না সামাবিবি, তুমি বও।’ বলি যে খুব পারব। হাসিনার মা বুবু যখন পিঠার চাল কোটে তখন আমিও তো গাইলে পাড় দিই। মিষ্টি হাসে অজাবি, বলে, ‘হ, তুমি ধান কোটবা, বড়বিবি হুনলে পরে আমারে বাড়িছাড়া করব নে আইয়া।’ বড়বিবি- আমার দাদি। তবে কি দাদিকে ডরায় অজাবি! হাসলে পরে সেই হাসি অজাবির মুখ ছাড়িয়ে চোখে, কপালে গলায়ও ছড়ায়। অজাবিকে দেখতে যে এত সুন্দর সে সামনে থেকে না দেখলে জানতেই পারতাম না! ধান বানার পরিশ্রমে টুকটুকে লাল হয়ে আছে মুখ, গলা।

কাছে গেলে দেখা যায়রে সোনার পত্তিমা।
আর সোনার লাগে ভেলুয়ার চোক্ষের ভঙ্গিমা।।
আঙ্খির তারা যে কন্যার অতি মনোহর।
পদ্দফুলের মাঝে যেন রসিক ভোমর।।
ভাল পুষ্প পাই ভোমরা মধু করে পান।
সোন্দর লাগেরে কইন্যার বাঁকা দুনয়ন।।
হাসিতে বিজলী ঝরে অতি চমৎকার।
চাচর চিকন কেশ পায়ে পড়ে তার।।
হস্ত সোন্দর পদ সোন্দর যেমন কুন্দের শলা।
গায়ের রঙ যেন তার চিনি-চাম্বা কলা।।
চান্নির মতন মুখ করে ঝলমল।
রাঙা ঠোঁট যেন তার তেলাকুচি ফল।।

-ভেলুয়া/ হাঁহলা পালা/ চট্টগ্রাম/ পূর্ববঙ্গ গীতিকা, খন্ড-২য়/ পৃঃ ৮৭৬, ৮৭৭

শীর্ণকায় চেহারা, উজিয়ে থাকা কন্ঠার হাড়, হাতে- গলায় ফুটে ওঠা নীলচে শিরা, কোনোদিনও তেল না পড়া রুক্ষ চুলের জটা, চেহারার অদ্ভূত কাঠিন্য বলে দিচ্ছে তার আজীবন তপস্যা, অপেক্ষার কথা। ঝুঁকে চৌকির তলা থেকে ফলের খলই বের করে অজাবি। বেছে বেছে পাকা দেখে ইয়াব্বড় দুটো আতা দেয় আমাকে, বলে, তুমি বইয়া খাও, আমি কাম শেষ করি।

মন দিয়ে ধান কোটে অজাবি। আমি বসে বসে অজাবিকে দেখি। একটা স্মিত হাসি লেগে থাকে মুখে। এক সময় ধান কোটা শেষ হয়। কুলোয় করে ধান ঝাড়ে অজাবি, ঝাড়ু দিয়ে একজায়গায় জড়ো করে ধানের তুষ। হাঁস-মুরগির খাবার হবে এই তুষ। প্রথমবার বানার পরে ঝেঁড়ে-ঝুঁড়ে যে চাল বেরোয়, সে ভীষণ লাল হয়, বাজারে কেউ কিনবে না। ঝাড়া চাল আবার গাইলে দেয় অজাবি। গাইলে পাড় পড়ে আস্তে আস্তে। চাল যেন ভেঙ্গে না যায়। চাল থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয় মিহি তুষ। ভয় কেটে গিয়ে যবে থেকে অজাবির সঙ্গে আমার ভাব হয়েছে, বাড়ি গেলে দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটত আমার অজাবির সঙ্গে। সকাল সকাল অজাবি চা খেত তেজপাতা আর গুড় দিয়ে। দুধ বিহিন, লাল চা। দেখতে মোটেই ভাল হতো না সেটা। তেজপাতা, গুড় আর চা পাতা দিয়ে জ্বাল দেওয়ার ফলে ফ্যাকাশে একটা রঙ হতো চায়ের। যদিও সকাল বেলায় অজাবির সঙ্গে বসে ওই চা খেতে আমার ভীষণ ভাল লাগত। যেখানেই যাই, যাই করি, ঘুরে ফিরে অসংখ্যবার আমি যেতাম অজাবির ঘরে। খর দুপুরে অজাবির চৌকির উপর শুয়ে থাকতাম, অজাবি বাতাস করত তালপাখা দিয়ে।

দ্যাও দ্যাও গো সোন্দরী
লম্বা পাংখার বাতাস দ্যাও।
দ্যাও দ্যাও গো সোন্দরী
ময়ুর পাঙ্খার বাতাস দ্যাও।।
ক্যামন কইরা দিমু গো বাতাস
তোমার বইন ঘরে আছে।.
আমার বুইনেক দিমু গো বিয়া
ছয় মাসের দূরে।।
তুমি আমি থাকমু গো
এক জোড়ের ময়ূর রে।
দ্যাও দ্যাও গো সোন্দরী
লম্বা পাংখার বাতাস দ্যাও।
দ্যাও দ্যাও গো সোন্দরী
আভের পাংখার বাতাস দ্যাও।।

- মেয়েলী গীত/ সিরাজগঞ্জ

বর্ষায় যখন বৃষ্টি-কাদায় কোথাও যাওয়া যেত না, ছাতা মাথায় দিয়ে পিছল উঠোন পেরিয়ে আমি চলে যেতাম অজাবির ঘরে। অজাবি তখন উনুন জ্বালিয়ে খোলায় করে শুকনো শিমের বিচি ভেজে দিত। কুড়মুড়ে সিমের বিচি চিবিয়ে খাওয়ার সময় যে শব্দ হতো, তাই নিয়ে অজাবি ছড়া বলত, ‘শিম বিচি কটকট/ কাঁঠাল বিচি মট মট/ কেডা খায় কেডা খায়? সামাবিবি খায়!!’


-চার-

বরই গাছ বইস্যে তোতা
বরই খাইবার লাই
আঁর যাদু কাঁদেললে
লাল বরইবার লাই।

ন কাঁদিস ন কাঁদিস ন কাঁদিস তুই
তোর লাই আইন্‌নুম পাইন্যাগুলা
হাডত গেলে মুই
আনি দিয়ুম বরই তোরে
উ উ চাই।।

উড়ি যাআরে তোতা পাখি
নিদ্রা অলির কাছে
কইও তারে আইত ত্বরা
আঁর যাদুর কাছে
আরও কইও যাদুর চোগর
ঘুম দিত আই।।

-অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী/ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান/ কল্যাণী ঘোষ/ পৃঃ ৩৩৯


অজাবির উত্তরের উঠোনের পূব ভিটেয় পাশাপাশি দু’খানি ঘর। ওসমান দাদা, অজাবির বড় ভাইয়ের ঘর। টিনের চাল, দর্মার বেড়ার বড় ঘরখানি থাকার। পাশেই শুধু বাঁশের খুঁটির উপর খড়ের দোচালা ঘরখানি দেওয়ালবিহিন। এটি রান্নাঘর। এদিক-সেদিক কিছু এলুমিনিয়ামের হাড়ি-বাসন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে দিনভর। গোছ-গাছের কোনো বালাই নেই। মেটে উনুনের পাশে কয়েকটি মাটির কলসি সার দিয়ে রাখা। হ্যাঁ। এই রান্নাঘরেও রয়েছে চারকোনা লুডোর ছক্কার মতো দেখতে লেপা-পোঁছা এক মাটির ঢিপি- পৈডাল। যাতে ভাতের হাড়ি রেখে মাড় গালা হয়। একপাশে একখানা চৌকি রাখা, যা কিনা সকাল হলেই জোহ্‌রা বিবি উঠোনে এনে ফ্যালে। সেই চৌকির উপর সে একে একে ঘর থেকে এনে বিছিয়ে দেয় যাবতীয় কাঁথা-লেপ-তোষক। সকাল থেকে সন্ধে অব্দি গোটা দিন রোদে থাকে সমস্ত কাঁথা-বিছানা। মাঝে-মধ্যেই উল্টে-পাল্টে উপর-নিচ করে দেয় বিছানা-পত্তরকে। বেঁটে-খাটো গাট্টা গোট্টা দেখতে জোহরা বিবি কোনোদিন শাড়ির সঙ্গে জামা পরে না। ঘন লম্বা চুল আঁট করে চুড়ো খোঁপায় বাঁধা। আটপৌরে করে পরা শাড়ি আলগোছে ফেলা থাকে গায়ে। উদোম পিঠে জোহরা বিবি সারাদিন গা এলিয়ে শুয়ে থাকে উঠোনে ফেলা চৌকির উপর। রোদের তাত লাগলে চৌকি ধরে একটু ছায়ায় টেনে নেয়।

জোহরা বিবির উঠোনে সব সময়েই পাড়ার লোকের আনা-গোনা। জোহরা বিবিকে অজাবির অপছন্দ করা, তার সঙ্গে বনিবনা না থাকার এটাও একটা কারণ। আশে-পাশের বাড়ি-ঘরের বৌ-ঝি সকলের সঙ্গেই ভাব জোহরা বিবির। যার যার কাজ কর্ম সেরে এখানেই জিরোতে আসে সকলে। কাঁধে লাঠি নিয়ে কখনও একা তো কখনও সঙ্গী-সাথী নিয়ে যখন তখন এসে হাজির হয় সুজন। হাসিনার মা বুবুর ছোট মেয়ে শাফিনার সঙ্গে তার ভাব। একবার এসে উঠোনে রাখা চৌকির উপর বসল তো দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা তারপর সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। সুজনের সাড়া পেলেই পাশের বাড়ি থেকে গুটি গুটি পায়ে এসে হাজির হয় শাফিনা। চুপচাপ কখনই বসে থাকে না শাফিনা। নারকেল ঝাড়ু হাতে নিয়ে জোহরা বিবির উঠোন ঝাঁট দেওয়া, বড় গামলায় জল-মাটি নিয়ে রান্নাঘর, উনুন লেপে দেওয়া, কাঁখে কলসি নিয়ে আমাদের বাংলা উঠোনের টিপকল থেকে পানি নিয়ে এসে রান্নাঘরে রেখে সেখানেই মাটির উপর বসে থাকে সে। এমনভাবে কাজগুলো করে যেন এই কাজ করতেই তার আসা। সুজন বসে বসে বিড়ি ফোঁকে, আর ওদিকে শাফিনা বসে বসে মেঝেয় আঁকি-বুকি কাটে। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়। জোহরা বিবির চৌকি এসে জায়গা নেয় রান্নাঘরে। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত। ছোট কুপি জ্বলে জোহরা বিবির উনুনের পাশে মাটির পৈডালের উপর। চৌকির সঙ্গে জায়গা বদল হয় সুজনেরও। উঠোনে, অজাবির বাগানে, ঘন অন্ধকারে।

জোহরা বিবির উঠোনের শেষ মাথায়, দক্ষিণ দিকে এক বড়ই গাছ। অজাবির ‘মিডা বরই’এর গাছ। এই ‘মিডা বরই’ গাছ এর বড়ইয়ের মতো মিষ্টি আর শাঁসওয়ালা বড়ই আর কোত্থাও হয় না। মাটিতে পড়া মাত্র ফেটে যায় রসালো পাকা বড়ই। এই বড়ইয়ের লোভে পাড়ার ছেলেপুলে শীতকালে জোহরা বিবির উঠোন ছাড়ে না। যদ্দিন গাছে বড়ই থাকে, অজাবির সমস্ত দিন কেটে যায় লম্বা বেত হাতে নিয়ে উত্তরের জানালায় বসে বড়ই গাছ পাহারা দিয়ে। পাড়ার ছোট থেকে বড় সকল ছেলে-মেয়েদের নজর এই মিডা গাছের বড়ইয়ের উপর। অজাবিকে পছন্দ করে না বলেই হয়ত কেউ গাছতলায় গিয়ে ঢিল দিয়ে বড়ই পাড়লে বা গাছতলায় পড়ে থাকা বড়ই কুড়োতে এলে কাউকে কিছু বলে না চৌকিতে এলিয়ে থাকা জোহরা বিবি।

এই পাড়ায় বড়ই গাছ আরও অনেক আছে। প্রায় সবার বাড়িতেই একটা-দুটো করে বড়ইয়ের গাছ। অজাবিরই আরেকটা গাছ আছে উত্তরের বাগানের ভিতর, আমাদের বাড়ির লাগোয়া। ইয়া বড় বড় গোল গোল বড়ই হয় তাতে। দেখতে দারুণ সুন্দর এই বড়ই। কাঁচা বড়ইয়ের রঙ ফিকে সবুজ, যত বড় হয়, পোক্ত হয়, রঙ আস্তে আস্তে আরও ফিকে হতে হতে একসময় হলুদ রঙ ধরে। এই গাছের বড়ই পাড়তে হলে অজাবির বাগানে যাওয়ারও দরকার নেই, আমাদের ছাদের উপরেই গাছটার অর্ধেক ডাল-পালা। কিন্তু হলে কী হবে? সে এমন টক আর তিতকুটে বড়ই যে নুন-মরিচ বাটা-ধনেপাতা-কচি আমের বোল দিয়ে ভর্তা করলেও খাওয়া যায় না। মুখই তেতো হয়ে যায়। একমাত্র আচার করা ছাড়া কোনো গতি এই বড়ইয়ের নেই বলে বড়ইয়ের ভারে গাছের ডাল নুয়ে এসে আমাদের ছাদে শুয়ে পড়লেও আমরা খেতে পারি না। যদি ভাবি যে চাচি আচার করে দেবে নিয়ে যাই কতগুলো তুলে- তবে সেই আশার গুড়েও বালি। অজাবিকে জিজ্ঞেস না করে একটা বড়ইতেও হাত দেওয়া মানা। অজাবিকে জিজ্ঞেস করলে হয়ত বড়ই দেবে, হয়ত দেবে না। কে জানে। আমরা তো জিজ্ঞেস করার সাহসটুকুও কোনওদিন অর্জন করতে পারিনি। জিজ্ঞেস করতে গেলে হয়ত অজাবি জীনের কাছ থেকে শেখা দোয়া পড়ে পায়রা বানিয়ে রেখে দিল খাঁচার ভিতর। তখন কী হবে?

বাগানের গাছে বড় শান্তিতে বড় হয়, পোক্ত হয় বড়ই । মোটা এক কাণ্ডের গা থেকে সরু সরু কাঁটাওয়ালা ডাল বেরিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে বেশ ঝাঁকড়া চেহারা এই গাছটার। বড়ই গাছে উঠে কেউ বড়ই পাড়বে, কাঁটার জন্যে সেই উপায় নেই। গাছের ডাল ধরে ঝাঁকিয়ে দিলে পোক্ত, পাকা বড়ই সব বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। টুপ টাপ। টুপ টাপ। বাগানের প্রতিটা গাছের উপর অজাবির তীক্ষ্ণ নজর। কোন গাছে কখন ফল ধরল, পেলে এলো কিনা, কোন বছর ফলন খুব ভালো হয়েছিল, সব অজাবির নখদর্পণে। পশ্চিমের দরজার চৌকাঠে বসে বসে অজাবি দেখে, কবে গাছ থেকে বড়ই নামাতে হবে, নারকেলগুলো এবার ঝুনো হয়ে এসেছে। উত্তরের জানালায় অজাবির মৃদু হাঁক শোনা যায়, ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ, মিন্টু মিঞা ঘরো আছে নি গো, বড়ই তো নামান লাগব গাছ থেইক্যা...’

বড় বড় বেতের ডালায় করে অজাবি ঘরের চালের উপর শুকোতে দেয় তেতো গাছের বড়ই। একটা ডালায় বোটা ছাড়ানো বড়ই, যাতে নুন হলুদ মাখানো। অন্য ডালায় এমনি এমনি বড়ই শুকোয়। রোদে পড়া মাত্র বড়ইয়ের গায়ে কালচে লাল রঙের ছোপ ছোপ দাগ পড়ে। একদিন রোদে থাকলেই গোটা বড়ইটাই কালচে লাল হয়ে যায়। আচারের বড়ই আধ শুকনো হয়ে এলে শুকনো লঙ্কা, পাঁচ ফোঁড়ন খোলায় সেঁকে নিয়ে শিলে গুড়ো করে বড়ইয়ের গায়ে মাখিয়ে দেয়। তারপর কাঁচের বৈয়মে ভরে দেয় সর্ষের তেল দিয়ে। সমুখ দরজা খুলে ঘরের এক হাত উঁচু ভিটের যে বিঘত খানেক অংশ বেড়ার বাইরে রয়েছে, সেখানে সারসার শুকোতে দেয় আচারের বৈয়ম। নানান রকমের বৈয়ম সেগুলো। কোনোটা পেটমোটা হরলিক্সের বৈয়ম তো কোনোটা লম্বাটে গোল মাল্টোভা’র। আট-দশ বৈয়ম আচার দেয় অজাবি। এই আচারের বেশির ভাগই যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, উন্দা বিবির মেয়ে রুসমত আরার জন্যে। ছোটফুফু ভাগ পায় আচারের। ভাগ পায় চাচিও। এইভাবেই সকাল বেলায় জানালায় বেরিয়ে আসে অজাবির মুখ, জানালার গরাদের ফাঁকে আচারের বৈয়ম। ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ, আচার আনসিলাম তুমার আর পারুলের লাইগ্যা।’

ফুপাতো বোন রুণাকে নিয়ে আমি বড়ই তলায় গেলে জোহরা বিবি আমাদেরকে বলে, ‘সামাবিবি কি বরই খাইতে আইসে নিহি? খাড়ও, গাছ ঝাঁকাইয়া দেই।’ একবার জানলার দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় জোহরা বিবি, অজাবিকে দেখা যায় কিনা। অজাবিকে দেখা যায় না। সে তখন হয়ত সবে গিয়ে শুয়েছে একটু। গাছের গোড়ায় গিয়ে ইচ্ছে মতন গাছ ঝাঁকিয়ে দেয় জোহরা বিবি। শব্দ পেয়ে এসে জোটে পাড়ার আর সব ছেলে-মেয়েরাও। বৃষ্টির মতন বড়ই ঝরে পড়ে গাছতলায়। পাকা পাকা হলদে রঙা বড়ই। মাটিতে পড়ামাত্র ফেটে চৌচির হয়ে যায় বলে একজন কেউ গাছ ধরে ঝাঁকালে বাকিরা সব কোচড় মেলে গাছতলায় ছুটোছুটি করতে থাকে, যে কটা কোচড়ে পড়ে! জামার কোচড়ে হয়ত সবে বড়ই কুড়োতে শুরু করেছি, অমনি অজাবির গলা শোনা যায়, ‘কেডা রে? শয়তান মাগী আবার আমার গাছত হাত দিসে?’ বেত হাতে পড়ি-মরি করে ছুটে আসে অজাবি। তাকে বিন্দুমাত্রও আমল না দিয়ে একমনে বড়ই কুড়িয়ে আঁচলে তোলে জোহরা বিবি। অজাবি তখন দৌড়ুচ্ছে আর সব ছেলে-মেয়েদের পিছন পিছন। অজাবিকে এতটুকুও আমল না দিয়ে জামার কোচড়ে এক আঁচল বড়ই ঢেলে দেয় জোহরা বিবি। বলে, ‘যাও, মিন্টুর বউয়েরে গিয়া কও, ভর্তা বানাইয়া দিবনে।’ শূন্য আঁচল আবার নিজের গায়ে আলগোছে ফেলতে ফেলতে রাজার বেটির মত হেঁটে নিজের চৌকির দিকে এগিয়ে যায় জোহরা বিবি। সেখানে ততক্ষণে তার কোলের ছেলেটি শুয়ে হাত-পা ছুঁড়ে চিল চিৎকার জুড়েছে। ছেলের পাশে গিয়ে শুয়ে ছেলের মুখে মাই তুলে দেয় জোহরা বিবি। যাবতীয় হাত-পা ছোঁড়া বন্ধ হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে।



-পাঁচ-

‘’হান্‌রে লাঠি–হান্‌রে কুঠার, গাছের ছ্যান আর রাম-দা-ঘুরা,
হাতের মাথায় যা পাস যেথায় তাই লয়ে আজ আয়রে তোরা”
“আলী! আলী! আলী!! আলী!!!”রূপার যেন কন্ঠ ফাটি,
ইস্রাফিলের শিঙ্গা বাজে কাপ্‌ছে আকাশ কাপ্‌ছে মাটি।
ভারি সুরে সব লেঠেলে লাঠির পরে হানল লাঠি,
“আলী-আলী” শব্দে তাদের আকশ যেন ভাঙ্গবে ফাটি।
আগে আগে ছুটল রূপা–বৌ বৌ বৌ সড়কি ঘোরে,
কাল সাপের ফণার মত বাবরী মাথার চুল যে ওড়ে
চলল পাছে হাজার লেঠেল “আলী-আলী” শব্দ করি,
পায়ের ঘায়ে মাঠের ধুলো আকাশ বুঝি ফেলবে ভরি!
চলল তারা মাঠ পেরিয়ে চলল তারা বিল ডিঙিয়ে
কখন ছুটে কখন হেঁটে বুকে বুকে তাল ঠুকিয়ে।

-নক্সী কাঁথার মাঠ/ জসীম উদ্‌দীন/ পৃঃ ৫৭, ৫৮

জোহরা বিবি, ওসমান দাদার বউ। মুন্‌সিবাড়ির মেয়ে। না না, বাড়ির নাম মুন্‌সি নয়, পাড়ার নাম মুন্‌সিবাড়ি। উত্তরগাঁওয়ের শেষ সীমানায়, যেখান থেকে ফসলের মাঠ শুরু হচ্ছে, সেখানে মুনসিবাড়ি। পাড়ার শেষ বাড়িটা সগীর মোল্লার। বাড়ির সামনে বিশাল বড় এক পুকুর। পুকুরের পশ্চিমপাড়ে মুনসিবাড়ির কবরস্থান। বাঁশের বেড়ার ঘেরা কবর সব। এই কবরস্থানে কোনো বড় গাছ নেই। নেই কোনো বাঁশের ঝাড়। প্রতি বছরই বর্ষার জলে পার ডুবে যায় বলে কোনো গাছ বাঁচে না এখানে। বর্ষার জল কবরস্থানকে ধুয়ে মুছে নিয়ে চলে যায়। মাটি ফেলে পার উঁচু করে পাড়ার লোকে কবর বাঁচানোর চেষ্টা করে। কোনোবার বাঁচে, কোনোবার পার ডুবিয়ে, পুকুরের সীমানা ভেঙ্গে দিয়ে জল চলে আসে সগীর মোল্লার বাংলা উঠোনে। জলের মাঝে জেগে থাকে শুধু বাঁশের বেড়ায় ঘেরা কয়েকটি কবরের সীমানা।

এককালে এই পাড়া তো বটেই, গোটা উত্তরগাঁও শাসন করতেন জোহ্‌রা বিবির বাবা সগীর মোল্লা। সেই শাসন লাঠি দিয়ে, মাতব্বরি দিয়ে। কেউ তাঁকে মাতব্বর বানায়নি, তিনি নিজেই নিজেকে মাতব্বর বানিয়েছিলেন লাঠির জোরে। যেটুকু জমি-বাড়ি তাঁর আছে, তার থেকে কয়েক গুণ বেশি তিনি ভোগ করেন, দখলের জোরে। বাড়িরে সীমানা কিছুদিন পর পরই বেড়ে বেড়ে যায়। সীমানার বেড়া সরে সরে যায় অন্যের বাড়ির সীমানায়। সে নিয়ে অহোরাত্রি ঝগড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। ঝগড়া শুধু চেঁচামেচি, গালি-গালাজেই ক্ষান্ত থাকে এমন নয়। দু-চারদিন পর পরই প্রতিবেশীদের কারোর মাথা ফাটে, কারোর হাত-পা ভাঙ্গে। প্রতিবেশী বউ-ঝিদের বিলাপ আর শাপ-শাপান্তে যদি কাজ হতো তবে বহুকাল আগেই জোহরা বিবির বাপ-ভাইদের কবরে বটগাছ গজাতো। কিন্তু তা হবার নয়। থানা পুলিশ? নালিশ নিয়ে পাঁচ মাইল দূরের থানা অব্দিও কেউ কেউ পৌঁছে যায় বটে, লম্বা দড়ি নিয়ে কনস্টেবলও হাজির হয় ছ’মাসে ন’মাসে। কিন্তু ওই অব্দিই। সেই দড়ি জোহরা বিবির বাপ-ভাইকে পরাবে এমন ক্ষমতা থানার কনস্টেবলেরও নেই। উল্টে পাড়ার লোককেই দোষী সাব্যস্ত করে তাদের এই বলে ধমকানো হয়, এর পরে যদি উল্টো-পাল্টা নালিশ নিয়ে কেউ থানায় যায়, তবে সক্কলকে থানাতেই বেঁধে রাখা হবে, গাঁয়ে আর ফিরতে দেওয়া হবে না!

মুনশী বাড়ির একমাত্র টিপকলখানি সগীর মোল্লার বাংলা উঠোনে। কোন টিপে যে সরকারী টিপকল নিজের উঠোনে বসিয়ে নিয়েছিলেন সগীর মোল্লা, তা বরাবরের ধন্দ। খাবার জল আনতে সগীর মোল্লার উঠোনে তাই যেতেই হয় পাড়ার সমস্ত লোককে। সেই কলে মাতব্বরি চলে মোল্লার ছোট মেয়ে সূর্যিনার। লম্বা, দীঘল চেহারা; সূর্যিনার গায়ের রঙ কালো। ছিপছিপে চেহারার সূর্যিনার পিঠের উপর এক ঢাল কুচুকুচে কালো চুল। সরু, লম্বা গলার উপরে লম্বাটে চেহারা। নাকে বেশর, কানে ছোট বালী, হাতে রং-বেরঙের কাঁচের চুড়ি। পরনে ডুরে শাড়ি। এহেন সূর্যিনা সারাদিন কল পাহারা দেয়। কে কত কলসি জল নেবে, কখন নেবে সমস্ত সিদ্ধান্ত সূর্যিনার। তার চোখ এড়িয়ে এক বদনা জলও কেউ নেবে সে উপায় নেই। সারাদিন বাংলা উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে বসে পাড়ার মেয়েদের নিয়ে জটলা করে। পিঠের উপর চুলের ঢাল ছড়িয়ে দিয়ে উকুন বাছায় সূর্যিনা। নিজেও অন্যের উকুন বেছে দেয়। আগে-পিছে করে তিন-চারজন বসে, সবাই সবার মাথার উকুন বাছছে! নিজেদের মধ্যে হাসাহাসিও করে, এই দল বেঁধে উকুন বাছার মত করে যদি দল বেঁধে সবার বিয়ে হয়? হাহা হিহি আর হোহো। আর তারপর একজন আরেকজনের পিছনে করে সবাই গিয়ে একই ঘরে ঢুকল! বাঁধভাঙ্গা হাসিতে একে অন্যের উপর গড়িয়ে পড়ে। সমবেত হাসির শব্দে ভেতরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে সুজন। রকম দেখে চিৎকার করে ওঠে, ‘ওই ছিনাল মাগী, ব্যাডা মানুষ দেহস না? শরম লাগে না তর? বেশরমের জাত! সারাদিন বাংলাত পইড়া থাহস ক্যা? বাড়ির ভিতরে যা।’ ভাইয়ের গালিকে থোড়াই পরোয়া করে সূর্যিনা। চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকায়, শীতল একটা দৃষ্টি দিয়ে ভাইকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করে, তারপর উকুন বাছার আবেশে বুজে আসে তার গভীর কালো দুই চোখ।

সুজন। বাবরি কাটা চুল। নাভির অনেকটা নিচে শক্ত করে বাঁধা লুঙ্গির উপরে গামছাখানি কষে বেঁধে রাখা। তার বারো মাস তেল চকচকে খালি গা। হাতের লাঠি গদার মত করে ধরে কাঁধের উপর রাখা। বেটে খাটো, পেশীবহুল শরীরের সুজন উদোম গায়ে লাঠি কাঁধে সারাদিন পাড়া টহল দেয় বেড়ায়। কার জমিতে ধান কাটা হবে, কার বোনা হবে, মুনিষ দরকার, লোক নিয়ে হাজির হবে সুজন। তার দেওয়া মুনিষের দাম বেশি, কিন্তু একবার সুজন হাজির হয়েছে মানে জমির মালিক চুপ। আজকাল আর দরও করতে হয় না সুজনকে, শুধু লাঠিটা নিয়ে চেহারাটা দেখিয়ে দিলেই হয়। ভাগের টাকা তো মুনিষই বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে সন্ধেবেলা। সুজনকে বখশিস না দিয়ে উপায় নেই। মাঠের ফসল মাঠেই পড়ে থাকবে, কেটে আনার লোক পাওয়া যাবে না। সুজন শুধু লাঠি হাতে চক্কর দেবে মাঠের চারদিকে। ঘাড় নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ না বলা ইস্তক সব মুনিষ যে যার বাড়ি বসে থাকবে, সে ঘরে ভাত থাকুক আর না থাকুক। কে আর হাত-পা ভেঙ্গে, মাথা ফাটিয়ে ঘরে পড়ে থাকতে চায়? হাসপাতাল তো সেই দশ মাইল দূরের সদরে, সেই অব্দি পৌঁছুনোর টাকাই বা আসবে কোথা থেকে? তার চাইতে এই ভালো। সুজনকে তার বখরা দিয়ে দাও, নিরাপদে থাকো। এহেন সুজনের বোন জোহরা বিবি যবে থেকে ওসমান দাদার ঘরে এসে উঠেছে, সেই থেকে বাকি ভাই-বোনেদের সঙ্গে বোল-চাল বন্ধ।

জোহরা বিবির ঘর, উঠোন মিলিয়ে যেটুকু জমি তার থেকে বেশি জমি অজাবির ভাগে পড়েছে পশ্চিমের এই উঠোনে। এখানে অজাবির সবজি বাগান। হেন সবজি নেই যা অজাবি এখানে ফলায় না। ছোট- বড় নানান রকম মাচা বাঁধা আছে এদিকটায়। লাউ-কুমড়ো-শিম তো হয় অজাবির ঘরের চালেই, বাগানে মাচায় হয় পুঁই, উচ্ছে, বরবটি, ঝিঙ্গে। যেখানে সেখানে কিছুটা করে বেগুন, লঙ্কা, লেবুর গাছ। এছাড়াও আছে এক কচুবন। উঠোনের শেষপ্রান্ত ঢালু হয়ে যেখানটায় বির্চায় গিয়ে নেমেছে, সেই ঢালে রয়েছে এক বড়সড় কচুর বন।

মেঘরাজা, তুই আমার সোন্দর ভাই।
একগুড়ি মেঘের লাইগ্যা দুয়ার ভিজ্যা যায়।।
দুয়ার ভিজ্যা যাইতে যাইতে দিনে দিল ডাক।
এক টানে ভইরা গেল কচুক্ষেতের ফাঁক।।
কচুক্ষেতের পানি পুড়ে টলমল করে।
মার চক্ষের পানি পুড়ি বুক ভাইঙ্গা পড়ে।।
আবের কুলা বেতের বান, ঝুম্মুর কইরা মেঘ আন।

– মেঘরাজার মাগন/ কুমিল্লা/ লোকসংস্কৃতি ১০ম খণ্ড/ বাংলা একাডেমি/ পৃঃ১৫

শীতকালে অজাবির বির্চায় ওসমান দাদা ভাগে চাষ দেয় টমাটো- যাকে অজাবি বলে বিলিতি বেগুন, মিষ্টি আলু, দেশী আলু আর ধনে। তরকারি যা হয়, অর্ধেক অজাবির, বাকি অর্ধেক ওসমান দাদার। বাগান পেরিয়ে বির্চার গোড়া অব্দি গেলেও বির্চায় পা রাখে না অজাবি। কার্তিক-অঘ্রাণ মাসে যখন তরকারির গাছগুলো বাতাসে দোল খায়, বাগানের ঢালে দাঁড়িয়ে গাছেদের দিকে তাকিয়ে থাকে অজাবি।

প্রায় দিনই সকালে উনুন থেকে তোলা ছাই খলইতে করে নিয়ে বির্চার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওসমান দাদা তখন খুরপি দিয়ে গাছের গোড়ার মাটি নিড়িয়ে দিচ্ছে। গোটা বির্চাকে কয়েক ভাগ ভাগ করে নিয়ে ছোটো ছোটো আলাদা জমি তৈরি করেছে ওসমান দাদা। একেবারে শেষমাথায়, খালের ধার ধরে মিষ্টি আলু, আর দেশী আলুর ক্ষেত। বাগানের ঢাল ধরে টম্যাটো, বেগুন, কাঁচা লঙ্কা। মাঝখানে ধনে। অজাবির হাত থেকে ছাইয়ের খলই নিয়ে গিয়ে হাতে করে ছাই ছিটিয়ে দেয় টুকরো টুকরো ভাগে ভাগ করা বিলিতি বেগুন, বেগুন, আলুর গাছের উপর। ধনে গাছে পোকা হয় না বলে ধনেগাছে ছাই দেয় না ওসমান দাদা। দু’দিন চারদিন পর পরই ক্ষেতে ছাই দেয় অজাবি। লাউ-কুমড়োতে পোকা হয় না কিন্তু শিমে প্রচুর পোকা হয় বলে অজাবি ছাই ছড়িয়ে দেয় ঘরের কোণ থেকে চালে উঠে যাওয়া শিমগাছেও। নিচে দাঁড়িয়ে যেটুকু পারে ছিটিয়ে দেয়, ঘরের চালে উঠতে পারে না বলে ওসমান দাদাকে ডাকে। মই লাগিয়ে ওসমান দাদা খলই হাতে উঠে যায় ঘরের চালে। মুঠো মুঠো ছাই ছড়ায় গোটা শিমগাছ জুড়ে। নিচে দাঁড়িয়ে গাছে ছাই দেওয়ার তদারকি করে অজাবি, একটা পাতাও যাতে বাদ না যায়। সব মিলিয়ে সম্বৎসর অজাবি আনাজ পায় নিজের জমি থেকেই। এ নিয়ে জোহরা বিবির অভিযোগের অন্ত নেই। অন্ত নেই শাপ-শাপান্তেরও। ‘অত বড় বাড়ি ফাগলনী একলা দখল কইরা রাখসে, ভাইঝি, ভাইপুতেরা সব খাইয়া না খাইয়া থাহে, চোখ নাই ফাগলনীর? দেহে না? ফাগল না ছাতা, নিজেরডা যে ষোল্লো আনার উফরে আডারো আনা বোজে হেরে মাইনষে ফাগল কয় ক্যা?? বাগান ভরা ফল, আনাইজ, ফাগলনীর হাতে কুনুদিন একটা কিছু ওডে ভাইয়ের নাম কইরা? অ আল্লা, তুমার বিচার নাই? আল্লার দুইন্যাত বিচার নাই গোওওও...অত মানুষ মরে, অজা মরে না ক্যা? আজরাইলে কি করে? অজারে দেহে না? অজারে তুইল্যা লইয়া যা রে, অ আজরাইল...


-ছয়-

আষাঢ় গেল শ্রাবণ আইলো
গাঙ্গে নতুন পানি
আমারো যৌবনখানি
করে আনাগুনি।।
শ্রাবণ মাস চলিয়া গেল
হইয়াছি মাতাল
ভাদ্র মাসে গাছের তলে
ঝইরা পড়ে তাল।।
তালের পিঠা বানাইয়া
কারে বা খাওয়াই
এদিক সেদিক চাইয়া দেখলাম
মনের মানুষ নাই।।

-ছাদ পেটানোর গান/ ফটিক আলি/ বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারা/ওয়াকিল আহমেদ

গাছটায় তাল আসে ঝেঁপে। কচি তালের কাঁদির উপর জোহরা বিবির খুব লোভ। মাঝে মধ্যেই সে ওসমান দাদাকে বলে এক কাঁদি কচি তাল নামিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু ওসমান দাদা গাছের ধারে-কাছেও যায় না। অজাবির যেন তার সঙ্গে জন্মের শত্রুতা। গাছের আশে পাশেও তাকে দেখতে পেলে রে রে করে তেড়ে আসে। জোহরা বিবির গালি-গালাজ, শাপ-শাপান্ত আরেকবার করে শুরু হয়। চোখ পাকিয়ে তার দিকে পেছন ফিরে অজাবি বলে, ‘ছুডু মাইনষের বাইচ্চা, আমার গাছত হাত দিলে ধান-কাডা কাছি দিয়া কুচি কুচি কইরা কাইট্যা তালগাছের উফরে ছিডাইয়া দিমু। শহুন দেখসস নি শহুন? শহুন দিয়া খাওয়াই দিমু, সব বদমাইশি একবারে শেষ কইরা ফ্যালামু, হারামজাদী ছুডুমানুষ কুনহানকার।’ অজাবির গালি-গালাজকে আমল দেয় না জোহরা বিবি। কিন্তু কচি তালশাঁসের কথাও তার মাথা থেকে নামে না। দু-চারদিন সব চুপচাপ, শান্ত থাকে। কোনো গালি-গালাজ নেই, ঝগড়া-বিবাদ নেই। সেদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে অজাবি উত্তরের জানালা খুলে দেখে জোহরা বিবির দোর দেওয়া। সাড়া শব্দ নেই কারও। প্রাতঃকর্ম সম্পাদন করে কী খেয়াল হতে একবার জোহরা বিবির উঠোনে যায়। দোর এখনও বন্ধ! কী মনে হতে পেছন ফিরে তালগাছের দিকে তাকাতেই অজাবি বুঝে যায় জোহরা বিবির দোর কেন বন্ধ। তারপর শুরু হয় চীৎকার।

দাদি, বড়কাকা, চাচি সকলেই বেরিয়ে উত্তরের উঠোনে যায়। সেখানে হাত-পা ছড়িয়ে উঠোনে বসে বিলাপ করছে অজাবি। কী হয়েছে জানতে চাইলে হাত দিয়ে তালগাছ দেখিয়ে দেয়। গাছের দিকে তাকিয়ে সবাই চুপ করে যায়। একদিকের অর্ধেক তালের কাঁদি গাছ থেকে কেটে নিয়েছে কেউ। শুধু তাই নয়, গাছের গায়ে যেখানে সেখানে কুপিয়েছে ধানকাটা কাস্তে দিয়ে, কষ গড়াচ্ছে সেই কোপানো জায়গা থেকে। পাতা সুদ্ধু গাছের অর্ধেক ডাল কেটে ফেলে দিয়েছে নিচে। সেগুলো ডাঁই হয়ে পড়ে আছে গাছতলায়। গাছের গায়ে ওই কোপের দাগ আর ওভাবে ডাল-পাতা নিচে পড়ে থাকাতে সবাই বুঝে যায়, শুধুমাত্র তাল চুরিই উদ্দেশ্য ছিল না। প্রচণ্ড রাগ নিয়ে কেউ ডাল-পালা তো কেটেইছে, কুপিয়েছে গাছকেও। একে একে অনেকেই এসে জমা হয়েছে জোহরা বিবির উঠোনে। কাকা এগিয়ে যায় ঘরের দিকে, হাত দিয়ে দোর ঠেলতে গিয়ে দেখে, বাইরে থেকে শিকল তুলে ছোট্ট তালা লাগানো আছে দরজায়। চাচি গিয়ে হাত ধরে অজাবিকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। অজাবির স্বর তখন নিচু, ফিসফিস করে কী সব বলছে আর হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে। অঝোরে জল ঝরছে দুই চোখ দিয়ে।

শ্রাবণের মাঝামাঝি গাছে তাল পাকতে শুরু করে। জোহরা বিবির উঠোন ছাড়িয়ে, বির্চা ছাড়িয়ে, মুনশীবাড়ির পুকুর পেরিয়ে অনেক অনেক দূর অব্দি যায় ঝিম ধরানো একটা মাদক গন্ধ। পাকা তালের গন্ধ। দিনে-দুপুরে, সন্ধ্যায় বা মাঝ রাত্তিরে ঝপাৎ করে শব্দ তুলে তাল পড়ে তালতলায়। দুই হাতের আঁজলায় আঁটে না এতবড় তাল। রসালো তাল নিচে পড়েই একদিকে থেঁতলে যায়। পড়ি মরি করে আশে-পাশের বাড়ি থেকে ছেলে-বুড়ো দৌড়ায় অজাবির তালগাছের দিকে। গাছ থেকে পড়ে যাওয়া তাল কুড়োতে এলে অজাবি কাউকে কিছু বলে না। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার তালতলায় হেঁটে আসা অজাবির অভ্যেস। দুটো-তিনটে তাল হাতে-কোঁচড়ে করে নিয়ে কোনোদিন আমাদের উত্তরের জানালায় এসে দাঁড়ায়, ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ’ বলে আস্তে করে ডাক দেয়। চাচি হয়ত তখন রান্নাঘরে দাদার জন্যে সুজি রাঁধছে বা ডেকচি থেকে চা ঢালছে কাপে। অজাবির আওয়াজ শুনে উঠে এসে জানালার দিকে এগিয়ে গেলে কোচড় থেকে তাল বার করে জানালার বাইরে গরাদের সামনে তুলে ধরে। চাচি বারান্দা পেরিয়ে অজাবির ঘরের দিকে এগুলে অজাবিও বাগান পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে আসে। আটপৌরে করে পরা চাচির শাড়ির আঁচল অজাবির দিকে এগিয়ে দিলে নিজের কোচড় থেকে অজাবি তাল তুলে চাচির আঁচলে ঢেলে দেয়। দু-দিন, চারদিন পর পর ভোরবেলায় উত্তরের জানালায় অজাবির এই মৃদু হাঁক শোনা যায় গোটা তালের মরশুম জুড়েই।


-সাত-

জামাই আইলো বানিজ কইরা
সপ্ত ডিঙ্গা নাও
পিঠা-চিড়া বায়না কমলা
মজা কইরা খাও।।
গুড়া কোটো গুড়া কোটো
ঢেহি ক্যারক্যার করে
ত্যালের পিঠা বানাও কমলা
ভাঙ্গা আঞ্জুন ঘরে।।

-মেয়েলী গীত/ বাংলা একাডেমী ফোকলোর সংকলন-৭০/ পৃ; ১০

কোনো কোনো দিন অজাবি একটাই তাল তোলে গাছতলা থেকে। যত তালই পড়ে থাকুক না কেন, একটাই তাল তুলে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যায় অজাবি। গাঢ় খয়েরি রঙের খোসা ছাড়ায় টেনে টেনে। নিচে এলুমিনিয়ামের গামলা রেখে বেতের চালুনি নিয়ে বাবু হয়ে বসে মেঝেতে। খোসা ছাড়ানো হয়ে গেলে দুই হাতে ধরে তালকে ভাঙ্গে। তিন বিচির তাল। রস আর আঁশে টই টুম্বুর একটা বিচি নিয়ে চালুনিতে ঘষে ঘষে রস তোলে অজাবি। গাঢ় কমলা রঙের ঘন রস গড়িয়ে গড়িয়ে গামলায় নামে বেতের চালুনির ঝাঁঝরি দিয়ে। একে একে তিনতে বিচি থেকেই রস নিংড়ে নিয়ে বিচিগুলো বাগানে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলে দিয়ে আসে অজাবি। একটু খেয়াল করে তাকালে দেখা যায়, যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য তালের বিচি। হয়ত এমনি ছড়িয়ে ফেলে রাখে অজাবি। বা হয়ত ভাবে, অনেক অনেক গাছ হবে এই সব বিচি থেকে।

এমনিতে প্রায় সব গাছের তালেই একটা তিত্‌কুটে ভাব থাকে বলে তালের রসকে অনেকেই পরিস্কার একটা বড় শাড়ি ছেঁড়া বা গামছায় করে ঝুলিয়ে বেঁধে রেখে দেয়। এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে জল ঝরে গামছায় বাঁধা তালের রস থেকে। কয়েক ঘন্টা এভাবে থাকার ফলে যেটুকু জল থাকে রসে তার সবটুকু ঝরে যায়। রস হয় আরও ঘন, থকথকে। আঙুলের ডগায় করে একটু খানি অই ঝরে পড়া জল মুখে দিলেই বোঝা যায় কতখানি তেতো মিশে ছিল তালে। ভুরভুর করে মাদক গন্ধ ছড়ায় তাল। গামছা থেকে রস আবার গামলায়। খানিকটা গুড় হাতে করে নিয়ে গুড়ো গুড়ো করে তালের ছাকা রসে মেশায়। বাঁ হাতে আটার কৌটো ধরে রেখে ডান হাতে একটু একটু করে তালের রসে আটা মেশায় অজাবি। রুটি বেলার মত শক্ত আর টাইট করে আটা মাখে অজাবি। তালের বড়া বা পোয়া নয়, অজাবি রুটি বানাবে তালের।

ছোট্ট রান্নাঘরে হাঁস-মুরগির পলোর পাশে খড়ের উপর বাবু হয়ে বসে তালের রুটি বানানো দেখি আমি। মাঝে মধ্যে একটা দুটো কথা বলে অজাবি। আব্বা কবে আসবে, গাছে তাল থাকতে থাকতে আব্বা আসবে কিনা, আমি কবে সিলেট ফিরে যাব, আম্মা কেন এলো না। নানান কথা। পুরনো এক চারপেয়ে জলচৌকির মত দেখতে রুটির চৌকি বের করে অজাবি তার চৌকির তলা থেকে। ধুয়ে-মুছে নিয়ে গোল গোল লেচি বানিয়ে রুটি বানায়, পরোটার মত মোটা বেশ বড়সড় রুটি। মাটির খোলা- যাতে অজাবি রোজ চটা বানায়, তাতেই সেঁকা হয় রুটি। একে একে বেশ কয়েকটা রুটি বানায়। বড় বড় লেচি দিয়ে বড় বড় গোল মোগলাই পরোটার মত রুটি। হালকা আঁচে বার বার করে উলটে- পালটে সেঁকা হয় রুটি। সোঁদা আর আটা পোড়া একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় বাতাসে। পাতার জ্বালের ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ, তাল, গুড়, রুটির গায়ে লেগে থাকা আটার গুড়ো, হালকা পোড়া পোড়া রুটি। অদ্ভুত এক গন্ধ। সব মিলে মিশে এমন এক মিষ্টি, নেশা ধরানো গন্ধ আমি জীবনে আর কোথাও কখনও পাইনি। একটা দুটো করে শুকনো পাতা এগিয়ে দিই অজাবির দিকে। খোলা থেকে একটা একটা করে রুটি সেঁকে নামায় অজাবি। দুটো রুটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে তামচিনের থালায় করে আমাকে খেতে দেয় অজাবি। তালের রুটি। বলে, ‘গরম গরম খাও সামাবিবি, ফুঁ দিয়া দিয়া খাও!’ হালকা একটা মিষ্টি ভাব আছে রুটিটায়। উমমম... এই স্বাদও কি আর কখনও কোথাও পাওয়া যায়? না তাকে লিখে ফেলা যায় কলমের আঁচড়ে!

নিজের কাজ ছাড়াও কাকাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাঝে মধ্যে যেতে হয় অজাবির জন্যে। এমনিতে কিছু বলার থাকলে বা কিছু দিতে হলে সকালবেলায় এসে উত্তরের জানালায় দাঁড়ায় অজাবি। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠাতে হলে সন্ধ্যাবেলায় আসে। তখন হয়ত কাকা আমাদের সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে খাটের পরে বসে চিড়ে ভাজা খাচ্ছে গোটা গোটা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে। জানালার বাইরে অন্ধকারে অজাবি এসে দাঁড়ায়, ‘মিন্টু মিঞা, অ মিন্টু মিঞা।’ ‘কিতা কইন হুফু?’ অজাবি বলে, ‘ক’কটা তাল আর নাইরল দিতে চাইসিলাম বু’জানেরে, দিয়া আইতে ফারবানি?’ কাকা বলে, ‘হ হুফু, সকালে দিয়েন, দিয়া আমু নে।’ আস্তে করে নিজের হাত দুটো জানলার গরাদের বাইরে তোলে অজাবি, দুই হাতে ধরে রেখেছে এক ধান তোলার খলই, তাতে শুধু তাল আর নারকেলই নয়, বাগানের সমস্ত মরশুমি ফলই রয়েছে। অজাবির গাছের তাল দিয়ে বড়া বানায় চাচি। তালের মরশুমে কাকা মাঝে-মধ্যেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ভগবতী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে নিয়ে আসত তালের বড়া। ছোট ছোট গোল গোল নাড়ুর মত দেখতে, চিনির রসে ডোবানো কুড়কুড়ে বড়া মুখে দিতেই ভেঙ্গে গিয়ে গোটা মুখ ভরে যেত রসে। সেই তালবড়া খেতে লাগত যেন অমৃত। সে যে না খেয়েছে বুঝবে না। কিন্তু সেই বড়া তো রোজ আসে না, কাকা যেদিন কোনো কাজে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়, সেদিন আসে তাও তো ঐ কেবলমাত্র মরশুমে।

বারান্দায় বসে তালের রস বার করে গামছায় বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়, নিচে রাখা গামলায় জল পড়ে টুপ, টুপ, টুপ। হাসিনার মা বুবু চাল কোটে বিকেলবেলায়। তালের রসে একটু একটু করে চালের গুড়ো মেশায় চাচি। ঘন, থকথকে একটা কাই তৈরি না হওয়া পর্যন্ত চালের গুড়ো দিতেই থাকে অল্প অল্প করে। গাঢ় কমলা রঙের রসে ধপধপে সাদা চালের গুড়ো মিশে খানিকটা ফিকে করে দিয়েছে তালের রঙকে। চাচিকে সেকথা বলতে চাচি বললো, ‘ভাজনের পরে সিরা দিলে কী রঙ বাইর অয়, দেখিস!’ কড়াইয়ে সাদা তেল গরম হয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। হাতে করে কাই নিয়ে ডালের বড়া যেমন করে বানায়, তেমনি করে একে একে কড়াই ভর্তি করে দেয় ছোট ছোট বড়ায়। তেলে পড়েই কাই গিয়ে বসে যায় কড়াইয়ের তলায়। ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় কড়াই থেকে ওঠা ভাপের সঙ্গে। খানিকটা ভাজা হতেই কড়াইয়ের গা ছেড়ে দিয়ে গোল গোল আলুর আকার নিয়ে কড়াইয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে তালের বড়া। ঝাঁঝরি হাতা দিয়ে নেড়ে নেড়ে কড়া করে ভাজে চাচি। প্রথমে গাঢ় সোনালি তারপর ধীরে ধীরে রঙ পালটে পান্তুয়ার মত রঙ ধরে বড়াগুলো। হাতায় করে তেল ছেঁকে কড়াই থেকে নামিয়ে ঘন করে জ্বাল দেওয়া চিনির সিরায় ছেড়ে দেয় সব ক’টা বড়া। গরম বড়া সিরায় পড়ে ছরররর করে একটা শব্দ তোলে। খুব বেশিক্ষণ বড়াগুলোকে সিরায় রাখে না চাচি। চিনির রস বড়ায় ঢুকে গিয়ে বড়াগুলো সিরার মধ্যে ভাসতে শুরু করা মাত্রই সিরা থেকে ওগুলোকে তুলে বড় গামলায় রাখে। বাতাসে তালের ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ। গামলার দিকে হাত বাড়াতে গেলে চাচি বলে, ‘একটু ঠাণ্ডা হোক, তারপর খাইস, নইলে মুখ পুইড়া যাইব।’


-আট-

ঘরের পাছে আমগাছটি
আল্লা টুনু পাহির বাসা রে
টুনু ডাহে ট্যান-ট্যানাইয়া
আল্লা বিলাই ওঠে গাছে রে
আল্লা টুনু পাহীক ধইরাছে রে
মরুগ ডাহে কুক্কু কইরা
আল্লা হিয়াল ওঠে গাছে রে
হিয়াল ওঠে গাছে রে।।

আল্লা নালটি মুরগ ধইরাছে রে।
ঘরের পাছে তেঁতুল গাছটি
আল্লা কাইয়া পাহীর বাসা রে
কাইয়া ডাহে কা-কা কইরা
আল্লা হগুন পড়ে রে।
হগুন পড়ে গাছে রে
আল্লা কাইয়ার ছাও ধইরাছে রে।।

-মেয়েলী গীত। সিরাজগঞ্জ

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলেই অজাবি পলো দিয়ে আটকে রাখা হাঁস-মুরগিগুলোকে ছেড়ে দেয়। মাঝরাত্তির থেকেই তাদের ডাকাডাকিতে কান ঝালাপালা অজাবির। ছাড়া পেয়েই ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে সব ক’টি প্রাণী দরজার বাইরে। হাঁসের কোঁয়াক কোঁয়াক, মুরগির কোঁকর কোঁ আর ছানাদের চিঁ চিঁ ডাকে মুখর হয় অজাবির আঙিনা। সব ক’টা হাঁস-মুরগি ছানা-পোনা সমেত বেরিয়ে গেলে হাঁসের থাকার জায়গা থেকে ডিম তোলে অজাবি। রাত্রি বেলায় ডিম দেয় হাঁস, সারা রাত সেই ডিম আগলে বসে থাকে, সকালে গেরস্থ এসে সেই ডিম তোলে। ডিম ক’টা কোচড়ে করে নিয়ে সিকেয় ঝোলানো মেটে হাড়িতে রাখে অজাবি। একবার গুনে দেখে নিয়ে নিজে নিজেই বলে, ‘এইবার দুইডা মুরগি দিয়া আণ্ডা বওয়ান লাগব, এক মুরগি দিয়া হইত না!’ দরজার বাইরে ততক্ষণে খাবারের জন্যে সব ক’টা হাঁস, মুরগি চেঁচামেচি জুড়েছে। খলইতে রাখা ধানের মিহি তুষ গামলায় নিয়ে ভাতের মাড় দিয়ে ‘কুড়া’ মাখে অজাবি। কুড়া, হাঁস-মুরগির খাবার। রোজ সন্ধ্যায় তার ভাত রান্না হয়ে গেলে ভাতের মাড়টা মেটে হাড়িতে করে অজাবির ঘরে রেখে যায় শাফিনা, অজাবির হাঁস-মুরগিদের জন্যে। সঙ্গে নিয়ে যায় আগের দিনের দিয়ে যাওয়া হাড়ি। গোলা থেকে এক খাবলা ধান নিয়ে অজাবি মিশিয়ে দেয় মাড় আর তুষের সঙ্গে। কুড়া মাখা হয়ে গেলে দরজার বাইরে রাখতেই এক সঙ্গে সব কটা হাঁস আর মুরগি ঝাঁপিয়ে পড়ে কুড়ার গামলায়।

ধান বানার সময় চাল ঝেড়ে যে আধভাঙ্গা, গুড়ো হয়ে যাওয়া চাল- খুঁদ আলাদা করে অজাবি, সেটা সে সব সময় রেখে দেয় ছোট, সদ্যফোটা ছানাদের জন্যে। সিকে থেকে সেই খুঁদের হাড়ি নিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে দেখে ছানা সহ মুরগি দুটো আলাদা দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে মাটি খুঁটছে আর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে গররর গররররর শব্দ করতে করতে চরকির মত ঘুরছে। ভিড়ের মধ্যে সে যাবে না ছানা নিয়ে এদিকে ছানারা কিছু খায়নি, সেই রাগে গররর গরররর। বাইরে গিয়ে মুঠো ভরে খুঁদ মাটিতে ছড়িয়ে দেয় অজাবি, মুখে বলে, আঃ আঃ তিতিইইই আঃ তিতিইইই... খুটে খুটে খুদ খায় ছানারা। আহ্লাদে গরররর গররর করে মুরগি মায়েরা। সৈয়দ দাদার হুঁকো থেকে তুলে রাখা পোড়া তামাক এনে চৌকাঠে বসে দাঁত মাজে অজাবি। ছানাদের দেখতে দেখতে। মুরগির ছানারা অনেক বেশি চটপটে হয় হাঁসের ছানাদের চাইতে। একে তো হাঁসের ছানা ফোটাতে হয় মুরগির ডিমের সঙ্গে, তার উপর মুরগির ছানা ফোটে একুশ দিনে সেখানে হাঁসের ছানা ফোটে পুরো তিরিশ দিনে। মুরগি যখন পাখনা তুলে গর্বিত ভঙ্গীতে ছানা নিয়ে উঠোনে ঘুরে বেরায় হাঁসের ডিমগুলো তখনও থাকে না ফোটা অবস্থায়। ডিম নিয়ে বসে থাকা অন্য মুরগির নিচে দিতে হয় না ফোটা হাঁসের ডিমগুলোকে। দিন সাতেক পরে যখন ডিম ফুটে ছোট্ট ছোট্ট প্রায় লোমবিহিন ছানা বের হয়, মুরগি তখনও বসে তার নিজের ডিম নিয়ে। অজাবির তখন ভারী বিপদ। এদিকে আগের মুরগি এই ছানাদের নেবে না কারণ সে নিজের ছানাদের চিনে গেছে, আর এই যে মুরগি শেষের কয়েকদিন তা দিল, তার তো এখনও ছানা নিয়ে বেরোতে সাত-আট দিন বাকি! হাঁসের ছানা এমনিতেই ভীষণ কমজোরি হয় তায় মুরগি যদি সঙ্গে না নিয়ে ঘোরে তবে তো যে কোনো মুহূর্তেই দাঁড়কাক বা চিলে নিয়ে যাবে!

হাঁসের ছানাদের ঘর থেকে বার করে না অজাবি। ছোট্ট ছোট্ট ঠোঁটগুলো কি ভীষণ নরম! শুধু কুড়া খাইয়ে তো এদের বাঁচানো যাবে না... সুতরাং উত্তরের জানালায় অজাবির মুখ, ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ, মিন্টু মিঞা গরো আছে নি গো?’ কাকা বাড়িতে না থাকলে চাচিকেই বলে অজাবি, ‘তুমরার মুনিষেরে কইয়া বন্দের থেইক্যা আমারে কতকডি শামুক আনাইয়া দ্যাও না বউ, আমার আঁসের ছানা নইলে বাঁচত না!’ বর্ষার পানি সরে গিয়ে অল্প যেটুকু জল ধানগাছের গোড়ায় থেকে যায়, তাতে প্রচুর ছোট ছোট শামুক থাকে। সেই শামুক চাই অজাবির, হাঁসের ছানার জন্যে। বিকেলে মজিদ ভাই শামুক এনে দিলে অজাবি সেগুলোকে নিয়ে বসে। খোলা ভেঙ্গে ভেঙ্গে ভিতর থেকে শামুক বের করে অল্প কুড়া মাখে মিহি খুঁদ, তুষ আর মাড় দিয়ে। একটু একটু করে নিজের হাতে খাইয়ে দেয় ছানাগুলোকে। সকালে অল্পক্ষণের জন্যে শাড়ির আঁচলে করে হাঁসের ছানাদের বার করে ওদের গায়ে রোদ লাগানোর জন্যে। কোচড়ে করে ঘর থেকে বার করে মাটিতে বসে কোচড় বিছিয়ে দিলে টলোমলো পায়ে ছানারা মাটিতে নামে। বেত হাতে নিয়ে অজাবি হাঁসের ছানা আগলে বসে থাকে যাতে মুরগি এসে ঠুকরে না দেয় বা চিলে না নিয়ে যায়। যদ্দিন একটু বড় হয়ে অন্য হাঁসেদের দলে না মিশে যাচ্ছে তদ্দিন পর্যন্ত এভাবেই তাদের দেখা-শোনা করে অজাবি।

সকালে ছাড়া পেয়ে খেয়ে দেয়ে নিয়ে ডানা নেড়ে নেড়ে দুলতে দুলতে কোঁয়্যাক কোঁয়্যাক ডাক ছেড়ে হাঁসের দল হাঁটা দেয় বাগানের মধ্যেকার সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে। বির্চা পেরিয়ে সোজা খালে গিয়ে থামে। খালে জল না থাকলে হয় ডানদিকের লস্করদের পুকুরে নয় আমাদের পুকুরে এসে নামে। পুকুরে সাঁতার কাটে, খুঁটে খুঁটে ভেসে থাকা কচুরিপানার জড় খায়। কখনও বা জল থেকে উঠে পারে বসে থাকে দল বেঁধে। রোদ পোহায়, ঠোঁট দিয়ে একজনের আরেকজনের গা খুঁটে দেয়। এসবে যখন আর মন ভরে না তখন উঠে দুলে দুলে হাঁটা দেয় ফিরতি পথে, বির্চা পেরিয়ে বাগানের পায়ে চলা সরু পথ, তারপর অজাবির দরজা, মুখে কোঁয়্যাক কোঁয়্যাক ডাক। অজাবির কান যেন পাতা থাকে হাঁসেদের পথের পরে। ওদের আসার শব্দ সে পায় অনেক দূর থেকে, পুকুরের ঢাল থেকে বির্চায় যখন ওরা পা রাখে তখনই সে কুড়া মাখতে শুরু করে। দিনের মধ্যে দুই-তিনবার হাঁসগুলো এসে খেয়ে যায়। বিপদ হয় তখন, যখন ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে খাল বা পুকুরে না নেমে শামুক খাওয়ার জন্যে ডানদিক ফিরে সোজা ফসলের মাঠ- ‘বন্দ’এর দিকে পা বাড়ায়। চলার আনন্দে ওরা চলতেই থাকে, সঙ্গী-সাথীও জুটে যায় রাস্তায়, চেনা বন্দ পেরিয়ে চলে যায় আরও দূরে। মাঝে মধ্যেই ফেরার পথ ভুলে হয়ে যায়। কখনও অন্য দলে ভিড়ে অন্য বাড়িতে গিয়ে ওঠে একটা বা দুটো হাঁস। তো কখনও অন্যের হাঁস চলে আসে অজাবির বাড়ি। কখনও বন্দ থেকে কেউ তুলে নিয়ে যায় একটা বা দুটো হাঁস।

প্রতিদিন সন্ধেবেলায় হাঁসেদের পথ চেয়ে, তাদের ডেকে এনে ঘরে ঢোকানো নিত্যদিনের কাজ অজাবির। বিকেল শেষ হয়ে এলেই শোনা যায় অজাবি তার বাগানের ঢালে, বির্চার মুখে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার জন্যে হাঁসেদের ডাকছে, ‘আয় আয় আয়, চৈ চৈ চৈ, আয়, আয়...’ সব ক’টা হাঁস যেদিন নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসে, তাদেরকে ধরে ধরে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে পলোর নিচে ঢুকিয়ে দেয়। বিপদ মাঝে মাধ্যেই হয়, অজাবি দেখতে পায়, একটা বা দুটো হাঁস ঘরে ফেরেনি। অজাবি নিজে কারও বাড়ি যায় না, নিজের সীমানার বাইরে পা রাখে না বলে হাঁস খুঁজতেও যেতে পারে না। উত্তরের জানালায় এসে দাঁড়ায়, ‘মিন্টুর বউ, অ মিন্টুর বউ, আমার আঁস তো গরো আইসে না।’ রান্নাঘরে হাসিনার মা বুবু তখন রাতের রান্নার যোগাড় করছে, সেখান থেকেই বলে, ‘অজাবি, আফনে গরো যাইন, আমি হাসিনারে পাডাই আঁস খুঁজত বইল্যা। কুন আঁসটা গেসে?’ অজাবি বলে দেয়, ‘সাদা আঁসের জুড়াডা গো!’ বুবু বলে, ‘অজাবি গোঁসা কইরইন না য্যান, আফনের এই সাদা আঁসের জুড়া বড় বদ, প্রত্যেক দিনই যেদিক মন চায় যায় গিয়া!’ রাগে গর গর করে অজাবি, বলে, ‘তুমারে অত কতা কইতে কইসে কেডা? আমার আঁস বদ! তুমি গিয়া আমার আঁস খুঁইজ্যা আনো।’ গর গর করে হাসিনার মা বুবুও। নিজের মনেই বলে, ‘হ। বদ আঁসেরে বদ কওন যাইত না! রোজ দিনই যেদিক মন চায়, হেদিক যাইব গিয়া, আর হাইনঝা অইলেই আমারে ডাকব, আঁস খুঁজনের লাইগা, আঁসেরে বদ কওন যাইত না! অজাবির আঁস! ভালা আঁস...!’ হাসিনা পাড়ার সকলের খোঁয়াড় খুলে খুলে দেখে হারিয়ে যাওয়া হাঁস ধরে নিয়ে এসে অজাবির হাতে দেয়। নিশ্চিন্ত অজাবি হাঁস কোলে নিয়ে তার গায়ে হাত বোলায়, বলে, ‘কই কই যাও গিয়া তুমরা? কেউ যদি ধইরা কাইট্যা খাইয়া ফ্যালায়, তয় কী অইব হ্যাঁ?’ হাসিনার দিকে না তাকিয়েই বলে, ‘এক পুরা ধান লইয়া যা, পিডা বানাইয়া খাইস!’

-নয়-

আইজ বানায় তালের পিডা কাইল বানায় খৈ।
ছিক্কাতে তুলিয়া রাখে গামছা বান্ধা দৈ।।
শাইল ধানের চিড়া কত যতন করিয়া।
হাঁড়ীতে ভরিয়া রাখে ছিক্কাতে তুলিয়া।।
এই মতন খাদ্য কত মদিনা বানায়।
হায়রে পরাণের খসম ফির‍্যা নাহি চায়।।
ভালা ভালা মাছ আর মোরগের ছালুন।
আইজ আইব বল্যা রাখে খসমের কারণ।।

-দেওয়ানা মদিনা/ মনসুর বয়াতি/ মৈমনসিংহ-গীতিকা/ পৃ-৩৪৫


সারাদিনে অজাবি দু’বার খায়। একবার সকালে, আরেকবার সেই সন্ধ্যায়। বাজার থেকে কাকার এনে দেওয়া আটাকে নরম করে মাখে অজাবি। এতটাই নরম যে ওতে রুটি বেলা যাবে না। শুকনো পাতা দিয়ে জ্বাল ধরিয়ে চুলায় বসায় একটা বড় মাটির খোলা। দেখতে অনেকটা চিতইয়ের খোলার মতই কিন্ত মুখ আরও খোলা, ছড়ানো। বুঝতে পারি, এটাই অজাবির চাটু। নরম লেই লেই করে মাখা আটা হাতের মুঠো ভর্তি করে নিয়ে গরম খোলায় দেয় অজাবি। চটা। আটার চটা বানায় অজাবি। হাতে করেই যতটা সম্ভব ছড়িয়ে দেয় গোল রুটির মতো করে। মেটে বড় সরা দিয়ে ঢেকে দেয় খোলা। ধিমে আঁচে চটা হয়। সরার গায়ে বাষ্প জমে যখন ছ্যাৎ ছ্যাৎ শব্দ বেরোয় খোলা থেকে, অজাবি বুঝে যায়, চটা হয়ে গেছে। উনুনের পেছনে টিনের বেড়ার গায়ে গোঁজা লোহার খুন্তি টেনে নিয়ে খোলা থেকে চটা নামিয়ে কানা উঠে যাওয়া সাদা তামচিনের থালায় রাখে। উনুনের পাশেই রাখা আছে নুন, হলুদ আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে সেদ্ধ করে রাখা পাঁচমিশালি তরকারি। দু’খানা করে চটা আর বড় বাটিতে এক বাটি তরকারি সেদ্ধ। এই অজাবির খাবার। মাঝে ক্ষিদে পেলে খলইতে রাখা মরশুমি ফল।

অজাবি চাল খায় না বলে চালের বানানো কোনো পিঠাও খায় না। কিন্তু তাই বলে পিঠা খায় না এমন নয়। অজাবি যে সব পিঠা খায়, সব আটা দিয়ে বানিয়ে খায়। মাঝে মধ্যেই গুড় দিয়ে আটার পোয়া বানায় অজাবি। গুড়কে জ্বাল দিয়ে সিরা করে নিয়ে ঠাণ্ডা করে অজাবি। ঠাণ্ডা সিরায় অল্প অল্প করে আটা মেশায়। মেশাতেই থাকে যতক্ষণ না ঘন থকথকে হয়ে আসে। পোয়া বানানোর জন্যে লোহার কড়াই বেরোয় শোবার ঘরের চৌকির তলা থেকে। বাগান থেকে কুড়িয়ে এনে জমিয়ে রাখা শুকনো ডাল দিয়ে জ্বাল ধরায়। সর্ষের তেল কড়াইয়ে দিয়ে ভালো করে জ্বাল দেয়, অনেকক্ষণ জ্বাল দেওয়ার পরে যখন মনে হয় পিঠায় সর্ষের তেলের গন্ধ হবে না, তখন এক চুয়োর আটার কাই কড়াইয়ে দেয়। ছ্যাৎ করে আওয়াজ তুলে সঙ্গে সঙ্গেই ফুলে ওঠে পোয়া। জ্বাল টেনে দিয়ে খুন্তির মাথা দিয়ে পিঠা উলটে দেয় অজাবি। লুচির মত ফুলে ওঠা পিঠার পেটে খুন্তির তীক্ষ্ণ মাথা দিয়ে পিঠাকে তুলে এনে কড়াইয়ের গায়ে ঝুলিয়ে রেখে তেল ঝরায় অজাবি। অন্য হাতে তেলে দেয় আরেক চুয়োর কাই। পিঠা নামিয়ে শাক-সব্জি ধোওয়ার বেতের টুকরিতে রাখে। সব কটা পিঠা হয়ে গেলে পিঠার টুকরি স্থান পায় শোবার ঘরে টিনের তোরঙ্গের উপর। বড় মেটে সরা দিয়ে চাপা দিয়ে রাখে পিঠা।

জাড়ের রাইতে পৌষ মাসে
বিছন্যা হইলো ঠার
তুই আইলিন্যারে বন্ধু
আমি কাইন্দা জারেজার
মাঘ মাসে শীত সকালে
পিঠা খাওয়ার ধুম
তুই রইলি পরবাসে
হামি কি করতুং।

-ফার্স গান// নবাবগঞ্জের আলকাপ গান/ মাহবুব ইলিয়াস/ পৃ-৩৭


মাঝে মধ্যেই, যখন হাঁস-মুরগিতে ঘর ভরে যায়, ওদের রাখার জায়গা থাকে না তখন প্রায় দিনই একটা করে হাঁস বা মুরগি ধরে জবাই করে অজাবি। হাঁস বা মুরগি জবাই করতে সাধারণত দু’জন মানুষ লাগে। একজন ঠ্যাং ধরে অপরজন এক হাতে মাথা ধরে রেখে অন্য হাতে জবাই করে। অজাবি এই সব নিয়ম কানুনের ধার কোনোকালেই ধারে না। মাছ কোটার মতো বটি নিয়ে বসে মুরগি বা হাঁস কাটে সে। তারপর কোটা-বাছা করে রান্না করে মেটে হাড়িতে। আদা-রশুন বা পেঁয়াজ-তেজপাতা-গরম মশলা কিছুই লাগে না অজাবির মাংস রাঁধতে। যেভাবে তরকারি সেদ্ধ করে ঠিক ওভাবেই নুন-হলুদ আর লঙ্কা দিয়ে মেখে জ্বালে বসিয়ে দেয়। উপরে শুধু ছড়িয়ে দেয় খানিকটা সর্ষের তেল। ব্যস। মাংসে যেন এটুকুই স্পেশাল। দু’বেলা জ্বাল দিয়ে দিয়ে দুই-তিনদিন এখন চলবে এই মাংস।

ঈদের ছুটিতে আমরা সবাই বাড়িতে, যদিও ঈদের আরও দিন দশ বাকি। বাড়ি এসেছে সৈয়দ দাদা। দেশ-গাঁয়ে রাত যেমন হয় তাড়াতাড়ি, তেমনি দিনও শুরু হয় খুব সকালে, আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই। রোজার সময় এশার নামাজের সঙ্গে সঙ্গেই সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে মাঝরাত্তিরে উঠে সেহরি খেতে হবে বলে, তখন হয়ত ন’টাও বাজেনি। রাত একটা-দেড়টার সময় সেহরি জাগানোর লোক যখন ঘন্টা বাজিয়ে, হাম্‌দ-নাত্‌ গেয়ে গেয়ে পাড়ায় পাড়ায় হেঁটে সবাইকে জাগায়, চাচি তখন উঠে সেহরির জন্যে ভাত বসায়। দাদি উঠে সবাইকে ডাকতে শুরু করে। একে একে সবাই উঠে মুখ-হাত ধোয়, কেউ বারান্দায় বসে নিমডাল দিয়ে দাঁত ‘মেসওয়াক’ করে। সন্ধ্যা রাত্রে পেতে রাখা দই, কলা আর গরম ভাত। বারান্দায় বসে দাঁত মাজতে মাজতে কাকা হাঁক দেয়, ‘সৈয়দ কাহা, অ সৈয়দ কাহা, ‘ফতা খাইতা না? রাইত যে শেষ হইয়া গেল।’ উপবাস ভঙ্গের জন্যে যে খাবার বানানো হয়, প্রায়দিনই এক থালি চাচি সাজিয়ে দেয় অজাবির জন্যে। কখনও সেটা আমি দিয়ে আসি, কখনও কাকা। অজাবি বলে, ‘আমি তো রোজা করি না, তয় ইফতার কিয়ের লাইগ্যা?’ কোনোদিন সৈয়দ দাদা নিজের ঘরে বসে অজাবির সঙ্গে ইফতার খায় তো কোনোদিন আমাদের খাবার টেবিলে বসে সবার সঙ্গে ইফতার করে। ইফতার করতে আসার সময় সৈয়দ দাদা হাতে করে কোনোদিন নিয়ে আসে বাতাবী লেবু তো কোনোদিন আতা তো কোনোদিন শরীফা।

ঈদের দু’দিন আগে আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে আব্বা বাড়ি এলো। সবার জন্যে ঈদের শাড়ি, জামা কাপড়ের সঙ্গে আনল অনেক কটা আনারস। দড়ি দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় বাঁধা আনারস। সিলেটে আনারস খুব ভালো হয়, মিষ্টি আর রসালো। ইফতারের পরে অজাবির ঘরে গিয়ে দিয়ে এলো একজোড়া আনারস আর কালো পেড়ে নীল তাঁতের শাড়ি, সৈয়দ দাদার পাঞ্জাবী, লুঙ্গি। প্রতি ঈদেই শাড়ি, পাঞ্জাবী- লুঙ্গি আসে ওসমান দাদা আর জোহরা বিবির জন্যেও। চৌকির মাথার দিকে রাখা টিনের তোরঙ্গের উপর থেকে কাপড়ের ঢাকা খুলে বড় বড় দুটো আতা এনে আব্বার হাতে দেয় অজাবি। বলে, ‘সামাবিবিরে জিগাইসিলাম তুমি কুন সময় আইবা, তুমার লাইগা রাইখ্যা দিসিলাম আতাফল দুইডা, খাইও যে।’


-দশ-

পিঞ্জরার পাখিরে ওরে পাখি আমি তোরে ডাকি
দুনিয়ার মায়ায় ভুলে ঘুমাইছ নাকি রে।।
কত ভাবে আদর কইরারে ওরে বেঈমান আমি তোরে রাখি
যাইবার কালে রে একবার ফিরাইবা না আখিরে।।
কোন অচিনা জঙ্গলাতেরে পাখি মারলা গিয়া লুকি
গোপনে শুনাইয়া যাইও হইতাম চির সুখি রে।।
জগত জোড়া একটি পাখিরে, ওরে পাখি বুঝিবার নাই বাকি
গুণ দেখাইবার নাই ক্ষমতা শক্তি নাইযে লেখি রে।।
বাউল চান মিয়া/ নেত্রকোণার বাউল গীতি/ গোলাম এরশাদুর রহমান/ পৃ-১৮৮

ঈদের দিনে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁস-মুরগিদের খাবার-দাবার দিয়ে তারপর নারকেল শলার ঝাঁড়ু হাতে নেয় অজাবি। নিজের ঘর-দোর ঝাঁট দেয়, ঝেঁড়ে মুছে পরিস্কার করে ঝুল, ধুলো। ঝাঁটা হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার সমুখটায় এসে যখন দাঁড়ায়, তখন সেজকাকা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। অজাবিকে দেখতে পেয়ে বলে, ‘ফুফুর শরীরটা ভালা নি, একেবারে দেখি শুকাইয়া গ্যাসেন গিয়া। আমি ঝাঁড়ু দিতাসি, আফনে ঘরো যাইন।’ সৈয়দ দাদা ততক্ষণে স্নান করে নতুন পাঞ্জাবী, লুঙ্গি পরে হাজির। ঝাঁড়ু রেখে দিয়ে অজাবি চা বানায়। তেজপাতা আর গুড় দেওয়া রঙ চা। চায়ের সঙ্গে আগের দিন বানিয়ে রাখা নারকেলের মুইঠ্যা, আটার পোয়া। খেয়ে দেয়ে আমাদের উঠোনে এসে হাঁক দেয় সৈয়দ দাদা, ‘কুন সময় বাইর অইবেন ভাইসাব, সূরুজ উইঠ্যা গ্যাসে গিয়া।’

বৃষ্টি-বাদলায় ঈদের নামাজ হয় বাংলা উঠোনে। দিন ভালো থাকলে গ্রামের দক্ষিণে হাইস্কুলের পাশে ঈদগায়ের মাঠে। দু’দিন বৃষ্টি থেমেছে, জামাত তাই ঈদগায়েই হবে। চারদিকে বর্ষার জল থই থই। আমাদের পাড়া থেকে বড় বড় রাস্তায় যাওয়ার যে কাঁচা সড়ক আছে, সেটি জলের তলায়। খাল পারাপার করার জন্যে যে নৌকাগুলো খালের পশ্চিমদিকে বাঁধা থাকে, আজ তাদের সব কটি বাংলা উঠোনের শেষমাথায়, যেখানে বর্ষার জল এসে থেমেছে, সেখানটায় দাঁড়িয়ে, সওয়ারী নিয়ে ঈদগা’র মাঠে যাবে বলে। সবার গায়ে নতুন পাঞ্জাবী-লুঙ্গি, মাথায় টুপি। হাইস্কুলের পাশের খালে নৌকা বেঁধে তারাও নামাজ পড়বে তারপর আবার সওয়ারীদের ফিরিয়ে নিয়ে আসবে, যেখান থেকে নিয়ে এসেছিল।

বাড়িতে বাড়িতে বৌ-ঝিয়েরা ব্যস্ত রান্নাঘরে। আগের দিন পাড়ার ছেলেরা চাঁদা তুলে গরু কিনে নিয়ে এসে মোড়ের মাথায় সেই গরু জবাই করেছে। দেড় সের- দু’সের করে ভাগা বানিয়ে মাংস বিক্রি করে যার যার ভাগের টাকা বুঝে নিয়ে নৌকায় চেপে বড় রাস্তার ধারের বাজারে গেছে। মাংস বেচা টাকায় ঘরে এসেছে পোলাওয়ের চাল, সেমুই, চিনি আর দরকারি মসলাপাতি। পাড়ার সবার বাড়িতেই আজ মাংস-পোলাও। সেমুই আর ফিরনি। খাবারের মিশ্র সুগন্ধে ম ম করছে গোটা পাড়া। অজাবির ঘরেও মাংসের ভাগা নিয়ে এসেছে সৈয়দ দাদা। মাংসও একইভাবে তরকারির মত সেদ্ধ করে অজাবি। নুন, হলুদ আর মরিচ বাটা দিয়ে। সঙ্গে দেয় কয়েকটি তেজপাতা আর মাখানো মাংসে উপর থেকে ঢেলে দেয় খানিকটা সর্ষের তেল। তার মাংস রান্নায় এটুকুই থাকে বিশেষত্ব। আগের দিন সন্ধেবেলায় আকাশ চিরে যখন সরু এক চিলতে চাঁদ, ঈদের চাঁদ দেখা গেল, পাড়ার ছেলেরা ঢ্যড়া পিটিয়ে গান গেয়ে গেয়ে গোটা পাড়া ঘুরে বেড়ালো। ঘরে ঘরে রেডিওতে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান। দাদির রেডিওটা যখন তার বালিশের পাশ থেকে চুপি চুপি নিয়ে আসি, দেখেও না দেখার ভান করে দাদি। চাচির ঘরে মেঝেতে মাদুর পেতে বসে হাতে মেহেদি লাগাতে লাগাতে রেডিওতে জোর ভলিউমে শুনি সৈনিকদের অনুরোধের আসর ‘দুর্বার’। দুর্বারেও আজ শুধুই ঈদের গান।

ঈদের দিনে নাকি সব মানুষ সমান হয়ে যায়। কোনো ‘আশরাফ- আতরাফ’ বা ‘ছোটো জাত, বড় জাত’ থাকে না। সবাই এক সমান হয়ে যায়। সবার ঘরে সবার দাওয়াৎ। সকলের তরে সকলের দরোজা খোলা। সকাল বেলায় ঝপঝপ পুকুরে গোসল করে নতুন জামা পরে এক ছুট অজাবির ঘরে। সেখানে সাহানা, জোহরা বিবির মেয়ে অজাবির চৌকিতে বসে নারকেলের মুইঠ্যা খাচ্ছে ছোটো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। পরনে জোহরা বিবির নতুন শাড়ি। গোসল করেছে অজাবিও। পরনে কালো সরু পাড়ের নীল তাঁতের শাড়ি। তার বিছানার উপর তখনও পড়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি নতুন শাড়ি। শাড়ি এনেছে সৈয়দ দাদা, শাড়ি এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। একইভাবে কোমরে গিঁট দিয়ে আটপৌরে করে পরা নতুন শাড়ি, খালি গা। সদ্য গোসল করে পরা ফুলে থাকা নতুন শাড়িতে অজাবিকে দেখাচ্ছে যেন এইমাত্র মাটিতে নেমে আসা কোনো পরী।

সৈয়দ দাদা যখন বুকে অসুখ নিয়ে চাকরী ছেড়ে দিয়ে বরাবরের মতো বাড়ি ফিরে এল, সেদিন থেকে অজাবির সমস্ত হাঁক-ডাক বন্ধ হয়ে গেল। দুষ্টু ছেলের দল দুপুরবেলার ঘরের চালে ঢিল দিলেও অজাবি বেত নিয়ে বেরোয় না। উঠোনে মোড়া পেতে চাদর গায়ে সৈয়দ দাদা চুপচাপ বসে থাকে। মাঝে মধ্যেই তার কাছে এসে বসে থাকে ওসমান দাদা। সূর্য পাটে গেলে অন্ধকার ঘন হয়ে থমকে থাকে এই বাড়ির চারপাশে। সবজি বাগানে লাউ-কুমড়ো শিম গাছ শুকিয়ে খসে পড়ে মাচা থেকে। ঘাস-আগাছার জঙ্গলে হারিয়ে গেছে দেশী আলু আর পোকা ধরা বেগুন গাছেরা। একরাশ টোমাটো বুকে পিঠে সাজিয়ে নিয়ে নেতিয়ে পড়ে আছে অজাবির বিলাতি বেগুনের গাছগুলো, কেউ আর যত্ন করে শুকনো ডালে ভর দিয়ে বেঁধে দেয় না তাদের। পাখিদের আধখাওয়া পাকা ফল পড়ে থাকে বাগান জুড়ে। ছ’মাসের মাথায় চলে গেল সৈয়দ দাদা। অজাবির সামনের দিকের দরজা আরো নড়বড়ে হয়ে নেতিয়ে পড়েছে। সেই কাঠের দরজা আর কোনদিনই খোলা হল না। একাকীত্বের সংসারে আরো একা হয়ে গেল অজাবি। রকমারি ফলের বাগানের একা তালগাছটির মত।



লেখক পরিচিতি
সামরান হুদা
জন্ম সিলেট। বাংলাদেশ।
বর্তমানে কলকাতাবাসী।
গল্পকার।

প্রকাশিত বই : তিতাস কোন নদীর নাম নয়
অতঃপর অন্তঃপুরে


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন