শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা'র গল্প : জোড়া শালিখের ভোরে

একটা স্বপ্ন মহুয়া প্রায়ই দেখে। দুঃস্বপ্ন বা ভয়ের না স্বপ্নটা। তেমন হাস্যকর কিছুও না। কিন্তু যাকেই বলে, সে-ই খুব হাসে। বলে- এটা কি তেমন কোন স্বপ্ন হল, যা প্রতিমাসে কেউ পাঁচ/ছ’বার করে দেখবে? সবার কথা শুনে এখন তারও অবাক লাগে। সত্যিই তো, কেন এই স্বপ্ন এতবার দেখে?

স্বপ্নটা শুরু হয় হাঁটাহাঁটি দিয়ে। এটা ঠিক সে হাঁটে, হাঁটতে বরাবরই ভালোবাসে। কিন্তু এরপরের অংশে স্বপ্নে যা দেখে তা মোটেও তার শখ বা আহামরি প্রিয় কিছু নয়। দেখে, একা ঘুরতে ঘুরতে বিশাল কোন জঙ্গল ধরণের বাগানে চলে এসেছে। তারপর হঠাৎ করে দেখতে শুরু করে, ঘাস-মাটিতে ঝরা পাতার ফাঁকে ফাঁকে ছোট/বড় বিভিন্ন ধরনের আম পড়ে আছে। স্বপ্নের ভেতরেই সেই আম সে কুড়াতে থাকে। কুড়াতেই থাকে, আম কুড়ানো আর শেষ হয় না। স্বপ্নের সময়টায় আম একটানা পাড়াতে ভাল লাগলেও, ঘুম ভাঙ্গলে বিরক্ত লাগে। একঘেয়েমির তেতো এক বিরক্তিতে মহুয়ার মন ভার হয়ে যায়।

আজ থেকে ছয় বছর আগের সেই কাল-বোশেখী’র ভোরেও এই অতি পরিচিত স্বপ্নটি দেখেই সে জেগে উঠেছিল। সেদিন সেই ঝড়-বাদলের ভোরে ঘুম ভেঙে, বিছানা থেকে নামতেই, বাইরে যাবার ‘অন্যরকম এক ইচ্ছে’ হয়েছিল। ইচ্ছেটা তেমন ‘বিশেষ কোথাও’ যাবার নয়; ইচ্ছে হয়েছিল শুধু ‘একটু কোথাও যাবার’। আর সে ইচ্ছে থেকেই কত কিছু, কত কথা-গল্প, সুখ-দুঃখ! জীবনটাও কি একটু বদলে গেল? কি জানি, হয়তো না। হয়তো যা হবার তা এমনিই হয়; শুধু শুধু সে স্বপ্নের দোহাই খুঁজছিল।

এখনো স্পষ্ট মনে আছে জীবনের প্রথম দেখা সে ভোরের প্রতিটি দৃশ্য। ভোরটা ছিল অদ্ভুত আলো আঁধারিতে বিভোর। তখন অদ্ভুত মনে হলেও, পরে অবশ্য দেখেছে ভোর মোটামুটি এমনই হয়। ঝড় থামা থমথমে শান্ত সে ভোরে, আড়মোড়া ভেঙে ঘরের বাইরে যখন পা বাড়িয়েছিল, চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে মনে হয়েছিল একটু বিষণ্ণ। চওড়া হল-বারান্দা পেরিয়ে নতুন ভবনের সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নামতেই সত্যিকারের আম কুড়োবার কথাটা তখন হুট করেই মাথায় এল। আর মাথায় আসতেই, বড় বড় পা ফেলে হোস্টেলের পেছন দিকের পাঁচিল ঘেঁষা বুড়ো আম গাছটার কাছে চলে গেল। স্বপ্ন-দৃশ্যের বাস্তব রূপায়ন দেখল, মন্দ নয়। বরং বাচ্চাদের মতো খুঁজে খুঁজে আম কুড়ানো যথেষ্টই আনন্দের। ওড়নায় ৭/৮ টা ছোট আম জড়িয়ে নিয়ে ‘রোকেয়া মূর্তি’র পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা রেইনট্রি গাছের তলায় দাঁড়াল। অবাক হয়ে দেখল, ‘সন্ধ্যায় ট্যাঁ ট্যাঁ করে ঘরে ফেরা’ রোজ দেখা এক ঝাঁক্টিয়ে পাখি ভোরে দল বেঁধে কোথায় যেন বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

টিয়া পাখির দলবেঁধে এমন উড়ে যাওয়ার ভেতরে কী যেন একটা আছে! তাকিয়ে থেকে ওদেরকে বিব্রত করতে ইচ্ছে করে না; কিন্তু আবার না তাকিয়েও পারা যায় না। মহুয়া দেখল পাখিরা এক সারি হয়ে সোনালু গাছের পাশ ঘেঁষে উড়ে চলে গেল, আর দেখা গেল না। রোকেয়া হলের গেটের বাইরে, ফুটপাত ঘেঁষে ঝাঁকড়া ডালপালা মেলে এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকে এই বিশাল সোনালু ফুলের গাছটা। মহুয়ার হঠাৎ ভীষণ ইচ্ছা হল - এই ধূপছায়া ভোরের রঙে মিলে-মিশে হলুদ সোনালু ফুলগুলো কেমন লাগছে, তা দেখতে! যদিও সে জানে এতো সকালে হলের গেট বন্ধ থাকে। তবু মনে হল, খুব করে অনুরোধ করলে দাদু নিশ্চয়ই বাইরে যেতে দেবে। গেটে গিয়ে দেখল, গেটের দায়িত্বে তখন নিখিল দাদু। হ্যা যা ভেবেছিল তাই! তাকে গিয়ে একবার বলতেই রাজি করানো গেল না। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরে নিমরাজি হয়েই তবে দিয়েছিলেন যেতে। তাও বারবার করে বলে দিয়েছিলেন, যেন সে এই অন্ধকারে দূরে কোথাও না যায়। আর কোন অসুবিধা মনে করলেই যেন তাকে ডাক দেয়। মহুয়া হেসে, ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে দ্রুত গেটের বাইরে পা বাড়ায়।



ওই সামান্য আলোয় হলের গেট থেকে টিএসসি’র দিকে তাকিয়ে সামনের চার রাস্তার মিলে যাওয়াকে মহুয়ার ছাই রঙ্গা চারটা নদী মনে ধীরে ধীরে সূর্য ওঠার এ সময়ে চারপাশের রঙ যে এত দ্রুত বদলায় তা কখনও জানা ছিল না। মহুয়ার চকিতে মনে হল, সূর্যাস্তের সঙ্গে সূর্যোদয়ের একটা দারুন মিল আছে। দুটো’র রূপই বিষণ্ণ। সূর্যাস্ত ভাল মতোন দেখা থাকলেও, সূর্যোদয়ের এই রূপ বলতে গেলে সে প্রথমবারের মতোই দেখছে। আশপাশের বদলে যাওয়া রঙের খেলা আরেকটু দেখে মহুয়ার মনে হল, দুটোতেই মিল থাকলেও সূর্যোদয়ের বিষণ্ণতার ভেতরে একটা চাপা আনন্দ আছে, যা সূর্যাস্তের বিষণ্ণতায় নেই। ‘কি যেন হবে’ কিংবা ‘কি যেন হতে যাচ্ছে’, এমন একটা অনুভব আছে সূর্যোদয়ে! আসলেই আছে কিনা তা অবশ্য পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না, মনে মনে ভেবে নেয় ক্লাশে গিয়ে শায়লাকে জিজ্ঞেস করবে।

শায়লা তাদের ক্লাশের অন্যতম বুদ্ধিমতী এক মেয়ে, তাছাড়া শায়লা’র মাঝে কেমন যেন ‘কবি-কবি ভাব’ও আছে।

সোনালু গাছের কাছে এসে মহুয়া ভীষণ চমকে গেলো। কি অদ্ভুত একটা রঙ ছিল চারপাশটা জুড়ে, সত্যি আশ্চর্য একটা রঙ! নাকি কোনো রঙই তা নয়? হয়তো পুরোটাই বিভ্রম! সোনালু গাছটার খুব কাছে গিয়ে মনে হল, ধূসর আবছা আলোর ভেতর থোকায় থোকায় কিছু সোনার মোহর ফুটে রয়েছে। গাছটার নিচের দিকের একটা ডাল আবার ফুলসহ ইলেকট্রিকের মোটা তারের উপর ঝুলে আছে। বোঝাই যাচ্ছে, এটা পড়েছে এই একটু আগের প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে। ওই ঝুলতে থাকা সোনালু ফুলের পাশেই দুটো শালিখ আবার খুব মন দিয়ে একজন আরেকজনকে আদর করছে। বোধহয়, ঝড়ে আহত হয়েছিল কোন একজন, আর তাই চলছে এই শুশ্রূষা। সব মিলিয়ে তার অপার্থিবই মনে হল; মনে হল জাদু-জাদু এক সাদা-কালো ভোর, যা কিনা আবার একই সঙ্গে হাজারটা রঙে রঙিনও। সেই ভোরের অংশ বলেই বোধহয়, ঐদিনের পর থেকে শালিখ তার খুবই প্রিয় পাখি হয়ে যায়। যেখানেই সে যাক না কেন, তার চোখগুলো কেন যেন ‘জোড়া শালিখ’ খুঁজতে চায়।

ঝড় থেমে গেলেও তখনো থেমে থেমে বেশ বাতাস হচ্ছিলো। হঠাৎ এক দমকা বাতাসে কোত্থেকে যেন গাছের ছোট্ট একটা ডাল শালিখকে সঙ্গে নিয়ে দুম করে নিচে পড়ে গেল। ডালের একটা অংশ আবার ঐ শালিখের গায়ে এসে পড়ল। পাখিদের চলাফেরা খুবই দ্রুত, সুতরাং বাতাস হবার মুহূর্তেই তাদের উড়ে যাবার কথা। একজন উড়েও গেল; আরেকজন হুড়মুড় করে পড়ে গেল, উড়তে পারল না। মহুয়া বুঝল, না উড়তে পারা শালিখটিই আহত। তখন উড়ে গিয়ে দূরে বসলেও উড়ে যাওয়া পাখিটি আবার ফিরে এলো। আর তার না উড়তে পারা বন্ধুটির খুব কাছে এসে ছটফট করে ডানা ঝাঁপটাতে লাগল। মহুয়া তখন দৌড়ে গেল ছোট্ট ডালটা সরিয়ে দিতে। দিলোও; কিন্তু কি যে হল, ওই পড়ে থাকা ডাল-পালার ভেতর থেকে পিছিয়ে আসতে গিয়ে দড়াম করে সে নিজেই পড়ে গেল কাদা পানিতে। বেশ জোরে পড়েছে, তখনই ব্যথা টের পাচ্ছে। কি যে আছে কপালে! এই ব্যথার মাঝেও হাসি পেয়ে গেল মহুয়ার।

শালিখ দুটো ছ’টাকা দামের জামতলার রসগোল্লার মতো গোল্লা গোল্লা চোখ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাও ভাল, শুধু পাখি-আঁখির উপর দিয়েই গেল, ভাগ্যিস কোন মনুষ্য-চোখ দ্যাখেনি। ধীরে ধীরে পিছলে পড়া পা টা গুটিয়ে নিতে গিয়ে বুঝল, বাম পা মোচকে গেছে, সহজে উঠতে পারবে না। কোমরটাও কেমন টনটন করছে, কিভাবে যে উঠবে ভাবতে থাকে তা। এমন সময় আচমকা গম্ভীর গলায় কে যেন আদেশের স্বরে বলে উঠলো, “নিন হাতটা নিন। আমার হাত ধরে উঠুন।” এই সাত সকালে সে একের পর এক চমকিত হলেও সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে এবারে ভয়ানক চমকে উঠল। বলা ভাল, প্রচণ্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। বুক ধড়ফড়ানি শুরু হল, যা কিছুতেই যাচ্ছিল না। কোত্থেকে উদয় হল এই লোক? নিশ্চয়ই কোন বাজে উদ্দেশ্য আছে! কয়েক সেকেন্ডেই অবশ্য ভয় কাটল। ভয় কেটে গিয়ে এবার রাগ তৈরি হল। কী আশ্চর্য, সে এতক্ষণ এই যে এভাবে নিজের মনে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, হাসছিল - সব তাহলে এই মানুষটা দেখছিল? মাথায় আগুন ধরে গেল মহুয়ার; চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, “কে আপনি? এখানে কি করছেন? আর শুনুন, আমি আপনার হাত ধরব, কোন দুঃখে? ভালোয় ভালোয় যান এখান থেকে!” চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে তার কিছুই হল না। বরং মহুয়াকে অবাক করে দিয়ে অট্টহাসি হাসা শুরু করল অচেনা সেই মানুষটা। আবার হঠাৎ হাসি থামিয়ে খুব জরুরি একটা কাজ মনে পড়েছে, এমন ভাব করে পাশে ছড়ানো-ছিটানো আমগুলো কুড়াতে লাগল। মহুয়া দেখল, পা পিছলে পড়ে যাবার সময় কোঁচড় থেকে এগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল। আমগুলো সব কুড়িয়ে অনেক কষ্টে সবকটা একসঙ্গে হাতে নিয়ে বলল, “নিন, আঁচলে আমগুলো তুলে নিন। সখ করে কুড়িয়েছিলেন নিশ্চয়ই!” বলেই আবার হাসল। এবার আর তেমন করে নয়। এবারে মিটিমিটি মিষ্টি হাসি। মিটমিটিয়ে হাসতেই থাকল, থামল না; নেশা জাগানো ঘোর লাগা সে হাসি।

হ্যা, এভাবেই তাদের সেই প্রথম পরিচয়। একদম সিনেমা বা নাটকের মতোই। এখনো মনে হলে মহুয়ার হাসি পায়, কি অদ্ভুত! প্রথমদিনেই দীর্ঘ আলাপ! পরে সে অনেক ভেবেছে। কি ছিল সে হাসিতে? কেন তার এমন হল! কেন অমনভাবে ঐ মানুষটার মাঝে, সাঁতার না জানা সাঁতারুর মতো ডুবে গেল। মফস্বল শহর দিনাজপুরের স্কুল-কলেজেও তো অনেকেই এসেছিল, মহুয়ার জন্য। তখনই বরং এমন হুটহাট প্রেমে পড়ার বয়স। ভার্সিটির প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষ, তৃতীয় বর্ষ পার করার পর তো আর এমন হবার কথা নয়। বিশেষত সেই মহুয়া, যে কিনা বরাবরই বেশ বাস্তববাদী। পত্র-পত্রিকায় পড়ে আর আশেপাশে দেখে তো দিন দিন ছেলেদের প্রতি বিরূপই হয়ে উঠেছিল সে। তাহলে? কিন্তু হয়েছিল, যেভাবেই হোক হয়েছিল। কাল-বোশেখীর ঝড়ের মতো উত্তাল-উদ্দাম এক ভালোলাগায় সে দুলে গিয়েছিল। কেঁপে কেঁপে উঠেছিল সেই তিন বছরের প্রতিদিনের ভালবাসায়। ঐ দিনগুলোতে মহুয়ার সব সময়ই মনে হতো, তাদের প্রেমটা অন্যরকম। হয়তো অন্য প্রেমিকদেরদেরও তেমনটাই মনে হয়। কিন্তু তার মনে হতো তাদের প্রেমটা সত্যিই আলাদা ধরণের। তাদের দুজনার বয়সে বেশ একটুখানি ফারাকের জন্য নয় নিশ্চয়ই! তার ‘প্রিয় মানুষ’টা একজন বাউন্ডুলে উঠতি কবি কিংবা প্রথমসারির এক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার স্বনামধন্য সম্পাদক বলেও নয় সম্ভবত! তাহলে? তাহলে কেন এমন মনে হতো? ও বলত, “একটা চরম বেরসিক মেয়ে এমন হুড়মুড়িয়ে বেসামাল প্রেমে পড়ল তো, তাই তার প্রেমটা একটু অন্যরকম হয়ে গেল!” মহুয়া বিশ্বাস করত কিনা বোঝা না গেলেও এরপর জিজ্ঞেস করত, “আচ্ছা বলো তো, ঐ চার-পাঁচ ঘণ্টার লাগাতার আলাপে সেদিন কি এমন পরস্পরের জেনেছিলাম যে এভাবে প্রেমে পড়লাম?” ও গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করত, “আমার নাম ইভান জেনেছিলে তো তাই”। মহুয়া অবাক হয়ে তাকাতো, “মানে?” ও হেসে ব্যাখ্যা করত, “ঐ যে ছোট বেলায় পড়া ‘রুশ দেশের উপকথা’ না তোমার সব চেয়ে প্রিয় বই ছিল? আর সেই বই এর ‘বোকা ইভান’কে না তোমার ভীষণ ভাল লাগত?” মহুয়া ইভানের চোখ দেখেই বুঝত ইয়ার্কি করে এসব বলছে। মহুয়া তারপর নিজেই ভাবতে শুরু করতো। ঠিক এলো কারণটি বের করতে না পারলেও, সে অনুমান করতে পারতো - অনেক অনেক গুলো টুকিটাকি কারণের মাঝে এই ‘ইভান’ নামটিও সত্যি একটি কারণ। কারণ না হলেও ছোট কোন অনুঘটকের কাজ অবশ্যই করেছে এই নাম। ছেলেবেলা থেকেই সবসময় সে অনেক গল্পের বই পড়ে; কিন্তু এত এত বই এর মাঝেও অল্প কিছু বই বা গল্প কেমন যেন তার চোখে, কানে, মুখে লেগে থাকে। সবসময়। সম্ভবত সারা জীবনের জন্য বুকেও গেঁথে যায়। রুশদেশের সেই বোকা ইভান বুঝি তার তেমনি; ‘সিভকা বুরকা জাদুকা লোড়কা, সাদা ঘোড়া সামনে এসে দাঁড়া......’ লাইনগুলো মনে হলেই এখনো বুকের ভেতরে সিরসির করে। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পায় সেই রূপালী-সাদা ঘোড়ায় চেপে তেজস্বী ইভান বিষণ্ণ চোখে দূরে কি যেন দেখছে! কখনোই কেউ জানবে না, তার মনে হয় ইভান আসলে তাকেই দেখছে।

অদ্ভুত আনন্দময় সে সম্পর্ক, সেই প্রেম। সে প্রেম যে কারণেই হোক না কেন, দিনগুলো তাদের হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ছিল। কিংবা এও বলা যায় গহীন জলে তারা ডুবছিল, আবার পমুহূর্তেই ভাসছিল। তখন কতবার সে ভেবেছে, আহ জীবন যদি শুধু এটুকুই হতো! এই তো এভাবেই উড়নচণ্ডী সে কাল তার পার হল। তারপর যা হয় আর কি! ইভান অস্থির করে তুলল, বিয়ের জন্য। হ্যা ঠিকই আছে, কিন্তু মহুয়ার কোন ‘না’ না থাকলেও, তার মফস্বলের কলেজ-শিক্ষক বাবা এবং গৃহবধূ মা, আত্মীয় স্বজন একটু আপত্তি জানালো। তবে খুব যে তেমন বাঁধা, তা নয়। এই যেমন মহুয়ার মনেও একটু কখনো এসেছে ইভান আর তার অনেক পার্থক্য। উঠতি কবি’র খ্যাতি তো আছেই; সঙ্গে পারিবারিক ধন-সম্পদ-রুচির ব্যবধান, বয়সের ফারাক সহ আরও কত কিছুই যে কত দ্বিধার জন্ম দেয় মফস্বলের মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যবিত্ত এক মেয়ের মনে। মহুয়া জানে, এসব দ্বিধা সিনেমা স্টাইলে উড়িয়েও দেয়া যায় না, এক ফুঁৎকারে। তবু ইভান এসব কিছুই শুনতে চায়নি কখনও। বরং একনাগাড়ে স্বরচিত কবিতার সেই অংশগুলো ভরাট গলায় আবৃত্তি করেছে যেগুলো মহুয়ার পছন্দ; তার দ্বিধাকে ভুলিয়ে দিতে। মহুয়ার বাবা আরেফিন সাহেব এর ইচ্ছে ছিল, তাঁর মেয়ে আগে অন্তত কোন চাকরিতে ঢুকুক, তারপর না হয় বিয়েটা হোক। কিন্তু ইভান এবং তার পরিবার সেসময়টুকু দিতে রাজি হল না। সুতরাং মহুয়া আর ইভানের বিয়ে হয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পরপর দারুণ একটা মসৃণ-মিহি সময় আসে, তাদেরও আসলো।

ঘোরাঘুরি আর প্রেমে-অপ্রেমে গতিময় একটি বছর কাটিয়ে ইভান বেশ একটু মনোযোগী হয়ে উঠলো তার পত্রিকা আর লেখালেখি নিয়ে। মহুয়াও ভাবল বেকার জীবন থেকে বেরুনো দরকার। ছাত্রী হিসেবে মোটামুটি ভালই ছিল। দুই মাস মন দিয়ে চাকরি খুঁজতেই দুই জায়গা থেকে ডাক পেল। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ‘এসিসট্যান্ট লেকচারার’ হিসেবে আর একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ‘টেরিটরি সেলস ম্যানেজার’ হিসেবে। মার্কেটিং এর ছাত্রী হিসেবে, মার্কেটিং -এই দারুণ এক ক্যারিয়ার শুরু করার সুযোগ পেয়ে সে যখন আনন্দ-উত্তেজনায় ভাসছে, তখনই অবাক হয়ে দেখল তার কি চাকরি করা উচিত তা প্রিয়জনেরাই ঠিক করে দিচ্ছে। ইভান একটু ঘুরিয়ে বলল। আর ইভানের বাবা-মা সরাসরি বললেন, মেয়েদের জন্য শিক্ষকতার মতো নিরাপদ এবং মহান পেশা আর কিছু হয় না! যেই মহুয়া’র বাবা-মা কখনোই তাদের তিন ভাই বোনের কারোর পড়ালেখা বা কোন কিছুতেই কখনো বাঁধ সাধেননি, সেই মহুয়া’র মা আর বড় বোন বললেন, যেহেতু ইভান প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিতে বলছে, মহুয়ার জন্য সেটাই ভাল হবে। মেয়েদের নিজের পছন্দের চাকরি করতে গেলে সংসারে বিনা কারণে অশান্তি আসে। শুধু বাবা আস্তে করে বললেন, ‘মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে চাকরি করা যায় না। তাতে নিজের ভেতরে কারণে অকারণে অদ্ভুত এক রক্তক্ষরণ হয়।’ মহুয়া ভাবতেই পারেনি, সে নিজে কী চাকরি করবে তা অন্য কেউ ঠিক করতে চাইবে। শিক্ষকতা মহান এবং নিরাপদ পেশা কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পছন্দ নয়। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে নানা, দাদা, বাবা, চাচা, মামা, খালা, ফুফুদের বেশিরভাগই শিক্ষকতায় নিয়োজিত। এবং যদিও তাঁদের কাউকেই সে পেশা নিয়ে তেমন বিশেষ অভিযোগ করতেও কখনো শোনেনি, তবু কেন যেন ‘শিক্ষকতা’ তাকে নিজ-পেশা হিসেবে টানেনি। বিশেষ কোন নারীবাদী চিন্তা থেকে নয়, সে কষ্ট পাচ্ছিলো ইভানের মাঝে মুদ্রা’র উল্টোপিঠ ধরণের রূপটি দেখে। এই ইভানই তো গত মাসে এক বিশাল তুলনামূলক তাত্ত্বিক আলোচনা লিখেছিল কাব্যে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে, ওদের সাহিত্য সাময়িকীর এক তৃতীয়াংশ জুড়ে। দুজন মিলে এই নিয়ে বাসাতেও কত উদাহরণ, কত আলোচনা হল। মহুয়া কারো সঙ্গে কোন যুক্তি-তর্কে গেল না। নিজের পছন্দেই টেরিটোরি সেলস ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করল। কাজ শুরু করে মুগ্ধ হয়ে গেল। এইটা মূলত পুরুষদের ক্ষেত্র। কোম্পানির হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার সাদিয়া ম্যামের কাছে জানলো, সে-ই নাকি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা হিসেবে এমন কাজে এসেছে। বাবা তা জানতে পেরে এমনই আপ্লুত হলেন যে জনে জনে আত্মীয়-স্বজন সবাইকে জানাতে লাগলেন। ইভান শুনে কেমন এক অচেনা হাসি হাসল। অল্প করে বল, ভাল তো।

উচ্চকণ্ঠ বা প্রতিবাদী বলতে যা বোঝায়, মহুয়া তা নয়। চুপচাপ নিরবিলি নিজ লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে সে তার কাজ করে যেতে পছন্দ করে। কোথাও কোনদিন কারোর সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ না করেও নিজের মতে থাকতে চায় এবং পারে। সংসার, চাকরি দুই জায়গাতেই পুরনো সে মন্ত্রে চলছিল। অফিসে এ মন্ত্র ভালই কাজে দিলণ। তবে সংসার বুঝি এক অন্যরকম জায়গা, মন্ত্রের পুরুতমশাই পুরুষ হলে একই সে মন্ত্রের কার্যকারিতা একরকম আর নারী হলে আলাদা। ইভানের পত্রিকা অফিসে কাজ, সুতরাং রাত হয় বাড়ি ফিরতে। পছন্দ না হলেও প্রথম থেকেই তা যুক্তি দিয়ে নিজেকে মানিয়েছে মহুয়া। এখন ওরও মাসে এক বা দুদিন বাসায় ফিরতে রাত বারোটা, একটা বেজে যায়। কখনো থাকে সেলস টিম এর মান্থলি মিটিং , কখনো বা কোম্পানির ‘প্রোডাক্ট ওরিয়েন্টেশন’ উপলক্ষে এমডি’র থ্রো করা পার্টি। কিন্তু তার এই ‘দেরি করে ফেরা’ ইভানের খুব অপছন্দ হতে শুরু করল। মহুয়া অবাক হয়ে কিছু বোঝাতে গেলে, ইভান তারও চেয়ে বেশি অবাক হয়। ইভানের সঙ্গে মহুয়া’র কেন তুলনা হচ্ছে সেটা ভেবেই। ইভানের ফোনে দিনরাত ভক্তদের মেসেজ আর ফোনকল। বলাবাহুল্য সেখানে নারীর উপস্থিতিই বেশি। ইভানও নিয়মিত থাকে সেসব যোগাযোগে। মহুয়াকে বলে, ভক্তদের সঙ্গে এই কমিউনিকেশন তার কবি পরিচিতি বাড়াবে। কিন্তু মহুয়া যখন একদিন কলিগ জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে অফিসের কাজেই মার্কেট ভিজিটে গিয়ে সময় স্বল্পতায় ঐ মার্কেটেই লাঞ্চ সেরে নিল, ইভান তখন চোখ কপালে তুলেছে। এসব টুকিটাকি লেগেই চলেছিল। বরং দিনে দিনে আরও বাড়ছিলো। মহুয়ার আর ভালো লাগছিল না। একদিন নরম করে ইভানকে বোঝালো, ‘চলো নিজেরা একটু বসি। শুধু তুমি আর আমি।’ এক ২৬শে মার্চের সরকারী ছুটির দিনে দুজনই ঠিক করল সারা দিন ঘুরে বেড়াবে আর নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে। মহুয়া, ইভান কী খেয়াল করল, তাদের দুজনেরই তাতে সমান উৎসাহ আছে? মহুয়া দেখল ইভান অনেকদিন পর আবার আগের মতো হাল্কা রসিকতায় সকালকে মাতিয়ে আলোয় ঠেলে দিচ্ছে। সেই প্রথমদিকের মতো একটু পর পর খুনসুটি করছে। অনেকদিন পর নির্ভার পাখায় উড়ে উড়ে মহুয়া আর ইভান প্রায় সারা ঢাকা ঘুরে তবে বাসায় ফিরল। মহুয়ার মনে হল ইভানের বাবা-মাও এতে খুশি হলেন। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে, সব গুছিয়ে, বাসা’র মূল গৃহকর্মী মনো’বুবু কে পরের দিনের রান্নাবান্নাও বুঝিয়ে বলে যখন ঘুমাতে এলো; ইভানও তাকে তাই বলল। ‘জানো, মা আপাকে লং ডিসটেন্স কল লাগিয়েছিল সিডনীতে! সবিস্তারে আমাদের খোশ মেজাজের নিউজ পাচার করল। টুকরা টাকরা খোঁচা তাতে মেশানো থাকলেও শেষে বুঝলাম ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছেন।’ মহুয়া হাসে। বলে, ‘এভাবে বলছো কেন? মা তো। তিনি খুশি হবেন না? ছেলে-ছেলের বৌকে অশান্তি করতে দেখার চাইতে অপছন্দের ঘোরাঘুরি করতে দেখলেও নিশ্চয় খুশিই হন।’ ইভান মহুয়াকে হাতে জড়িয়ে নিতে নিতে বলে, ‘তাহলে আমাদের ‘কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নিকাশ-ঘর পরিকল্পনা’ সফল হয়েছে, বলছো?’

মহুয়াকে রোজ অনেক রান্নাবান্না করতে হয় না। তারপরও অফিসে যাওয়ার আগে ও পরে কত যে কাজ থাকে সারাদিন! সকালে মনোবুবু’র সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে সবাইকে নাস্তা খাইয়ে নিজের লাঞ্চ রেডি করে। দুপুরে ইভান কী খেয়ে, কী পরে অফিসে যাবে তাও সে ঠিক করে। বাসায় ফিরে সবাইকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে ঠায় জেগে থাকে ইভানের অপেক্ষায়। ছুটির দিন তাদের একটিই। ইভান সে দিন ইচ্ছেমতো শুয়ে, গড়িয়ে ফোনের মেসেজ বিনিময়ে আবার কখনো বা বাসার কাছাকাছি থাকা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেই কাটিয়ে দেয়। আর সে? একটি বিবাহিত মেয়ে পছন্দমতো কঠিন কর্মক্ষেত্রে থাকতে চাইলে এমন অনবসরের জীবন তো হবেই, ইভান বলে। সে তার আগের অবিবাহিত জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে চায় না, তুলনা করতে চায় না ইভানের জীবনের সঙ্গেও। যদিও দুজনই বাইরে অনেকখানি সময় দেওয়া কাজই করছে। তবু না। ইভানের বাবা-মা চাকরি নিয়ে তেমন আর উচ্চবাচ্য না করলেও, বোঝা যায় এ তাদের পছন্দ নয়। মহুয়ার মাও ফোনে দুই কথার পর তৃতীয় কথা হলেই মনে করিয়ে দেন, মেয়েদেরকে মানিয়েই চলতে হয়। মাঝেমাঝেই সে বিরক্ত হয়ে যায়। ছোট্ট করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে, হ্যা মা জানি। আর মনে মনে বলে, ‘মা আমি কী কারো কাছে, কোথাও কোন অনুযোগ করেছি? দেখছো না সব মানিয়ে নিচ্ছি। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তেই তো মানাচ্ছি। নিজেকে ছেঁটে ছেঁটে চারপাশ থেকে ছোট করে রাখছি। অফিস থেকে সবাই মিলে যে নেপালে গেল সপ্তাহব্যাপী ‘ইয়ার এন্ডিং সেলস কনফারেন্স’-এ, আমি কী গিয়েছি? থাইল্যান্ডে একটা যে তিন মাসের ট্রেনিং প্রোগ্রামে যাবার সুযোগ হল, তা কি শেষ পর্যন্ত আমি নিয়েছি? অফিসে এই নিয়ে কী যে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে, তাও নেইনি। কিন্তু মা, এবার নেবো। বেশি না, একটুখানি ঘুরে দাঁড়াব।’

ইভান সেভাবে মনে রাখতে না পারলেও, এভাবে একাই নিকাশঘরের হিসেব মিলিয়ে দিন চলছিলো মহুয়ার। সমস্যা বাঁধলো তখনই, যখন গতবছরের শেষদিকে এশিয়া রিজিওনের হেডকোয়ার্টার থেকে আবারও তার নাম এলো ব্যাঙ্গালোরে এক মাসের একটা ট্রেনিং এর জন্য। ঢাকার রিজিওনাল সেলস ডিরেক্টর সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘মহুয়া, এবার এ সুযোগ মিস করলে আমরা কিন্তু আপনার মান্থলি এবং কোয়ার্টারলি সেলস পারফরম্যান্সকে রিডিউস করে সেলস-রিপোর্ট তৈরি করব।’ সব শুনে ইভান কী কী বলেছিল, তা আর বিশদ মনে করতে চায় না মহুয়া। বরং নতুন করে ভাবতে বসে মানুষের মনের অদ্ভুত কিছু জটিলতা নিয়ে। ইভানকে তার ‘খারাপ’ ভাবতে ইচ্ছে করে না। আর তাছাড়া এই যে, সামান্য কিছু ঘটলেই ও এমন মাথা গরম করে মিসবিহেভ করে তার জন্য তো ও একাই দায়ী নয়। ওর বাবা-মা আদর-আহ্লাদ দিয়ে দিয়েই না তাঁদের ‘একমাত্র ছেলে’কে এমন স্বেচ্ছাচারী মেজাজী বানিয়েছেন। তবু সে তাকে যখন কোথাও কোন ছাড় দিচ্ছিল না, তখন একবার মুখের উপরই বলেছিল, ‘তুমি একটা হিপোক্রেট।’ ইভান চিৎকার করে অস্বীকার করেছিল। বলেছিল, ‘মানুষের ভেতরটায় হেক্সাগন, অকটাগনের মতো বা তারও বেশি অনেকগুলো কোণ থাকে। তুমি আগে আমার একটা কোণ দেখেছ, সবগুলো দেখতে পাওনি। এ ব্যর্থতা তোমারই। তুমি তোমার পছন্দের কাজই করে চলেছ, আমার সঙ্গে কোথাও মানিয়ে নিতে পারোনি।’ কে ক্রমাগত মানিয়ে চলছিল, তা মহুয়া জানে; তাই আর সে প্রসঙ্গে যায়নি। শুধু বলেছিল, ‘আচ্ছা আমি নাহয় তোমার সবকটা কোণ দেখতে পাইনি! কিন্তু তোমার কবিতা? সাহিত্য সাময়িকীতে চমকে যাওয়া শব্দগুচ্ছের ছোট কিন্তু ভারী সুন্দর কথার প্রবন্ধগুলো? সেগুলোও কী ভুল কথার?’ ইভান ভয়ানক রেগে গিয়ে বলেছিল, ‘কবিতা? কবিতা’র তুমি কী বোঝ? আমার সঙ্গে পরিচয়ের আগে কবিতার সুর-ছন্দের সত্যিকারের কান তোমার ছিল?’ নিজেই শোনা যায় কী যায় না, এমন স্বরে মহুয়া বলেছিল, ‘সুর-ছন্দের কান হয়তো ছিল না! কিন্তু কবিতার বিষয়বস্তু আমি বুঝি। এবং আগেও বুঝতাম।’

নিজের ইচ্ছেগুলোকে পাত্তা না দিতে দিতে, দেখে সব কেমন মরিচা পড়ে জং ধরে গিয়েছে। যেমন পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটা পেরিয়ে গেল, তার একদিনও বইমেলায় যাওয়া হল না। বন্ধুরা পর পর দুই শুক্রবারে ফোন করল; এক শুক্রবারে গ্রামের বাড়ি থেকে আসা চাচাশ্বশুরদেরকে আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকতে হল। আরেক শুক্রবারে শাশুড়িকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হল; উনার চোখে হঠাৎ একটু সমস্যা হচ্ছিল। তাছাড়া উত্তরা থেকে বাংলা একাডেমির দূরত্বও অনেক। কিন্তু খুব কী অনেক? বুঝে উঠতে পারে না! ইভানের তো প্রায়ই যাওয়া হয়। ওর মুখেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শুনে নেয় প্রিয় লেখকের, প্রিয় বই এর আর প্রিয় স্টলগুলোর কথা। চোখ বন্ধ করে কল্পনায় একটু হেঁটেও আসে পছন্দের প্রকাশনী গুলোর সামনে দিয়ে। রাতে ঘুমোবার আগে। অবশ্য মেলায় এবার একবারেই যে যায়নি, তা নয়। গিয়েছিল। মেলার শেষদিন তার মার্কেট ভিজিট ছিল নিউমার্কেট আর গাউছিয়ায়। মার্কেট এর কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে, সে এক ঘণ্টার জন্য সময় বের করে রিক্সা নিলো বাংলা একাডেমি। রিক্সায় উঠেই টের পায়, বুকের মাঝে আনন্দের কাঁপুনি কিছুতেই থামছে না। ঠিক করল, গিয়েই প্রথমে যে কোন একজন লেখকের বই কিনবে। বাছাবাছি করবে না। তারপর বিশাল ঐ বট গাছের বাঁধানো গুঁড়িটাতে বসে আরাম করে পড়বে। দুপুর- বিকেলের মাঝামাঝির এসময়টায় বইমেলায় থাকতে পারাটা তার মতে পৃথিবীর সেরা তিন সৌভাগ্যের একটি। ফাঁকা ফাঁকা এ দুপুরগুলোয় বিরামহীন কোকিলের ডাকাডাকিতে চত্বরে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় পা ডুবিয়ে হাঁটাহাঁটি কিংবা ইচ্ছে হলেই হাঁটা থামিয়ে যে কোন একটি স্টলে ঢুকে নতুন বই এর ঘ্রাণ নাকে মেখে পছন্দের একটা পড়তে শুরু করে দেওয়া কিংবা এসব কিছুই না করেও, খোলা মাঠের মাঝে টুপ করে বসে মেলা দেখা- আহ সব মনে পড়ে যায় এক লহমায়। ভার্সিটিতে থাকা কালীন ক্লাশ এর ফাঁকে ফাঁকে প্রায় প্রতিদিনই এ সময়ে মেলায় আসা ছিল তার রুটিনমাফিক কাজ। এখানে এই অসময়টায় আসা তার চাইই চাই। নাহ, বুঝে নেয় এবং মেনেও নেয়, এখন আর অতখানি সম্ভব না। বটতলায় মসৃণ বাতাসে একটু বই পড়েই, সে শেষ বিশ মিনিট দৌড়ে দৌড়ে লিস্ট করে রাখা কিছু বই কিনবে। এই ভেবে একটা বই এর স্টলের দিকে এগোয়। সেখানে একটা বই দেখতে শুরু করতেই হো হো করে ছুটে আসা এক জোরালো হাসিতে পিছনে ফিরল। আর অবাক হয়ে গেল। দেখলো, ইভান আর একটা মেয়ে। বটগাছ এর বাঁধানো গুঁড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। খুব মগ্ন হয়ে কথা বলতে বলতে। এমন কোন ভয়ঙ্কর দৃশ্য এটি নয়, বরং ইভানের সঙ্গে এই দৃশ্য খুবই মানানসই। তারপরও, মানুষের মনই তো! কখন কী যে হয়! ইচ্ছে করলেই ও গিয়ে কথা বলতে পারত। ওদের সঙ্গেই হয়তো হাঁটতেও পারত। কিন্তু কিছুই আর সে করল না। মেলা থেকে বেরিয়ে সোজা একটা সিএনজি নিয়ে দক্ষিণ কাফরুলে চলে গেল পরবর্তী মার্কেটের ভিজিটে। এভাবে নাকি কিভাবে সে জানে না; ধীরে ধীরে খেয়াল করে- বন্ধুবান্ধব, সখ বা প্রিয় সব কিছু থেকে সে বেশ দূরে সরে গিয়েছে। মেনে নেয়, এও জীবনের অংশ। জীবনের সব স্তরে ‘সখ’ বা ‘সব ভালো লাগা’ কে সঙ্গী করা যায় না। তাই ‘কাজ’ -এই মন স্থির করল। আর তখনই ঠিক করলো মহুয়া এবার ট্রেনিং এ যাবে।

সেবারের সে ট্রেনিং –এ, সে ইন্ডিয়ায় গিয়েছিল। গিয়ে প্রথম প্রথম ট্রেনিং –এ মন দিতে খুব সমস্যা হয়েছিল, কিন্তু তারপরও সে ভালই করেছিল। ট্রেনিং শেষে রাজস্থানে একটা ট্রিপ ছিল ওদের জন্য। সবাই মিলে হৈ হৈ করে অনেক ঘুরেও বেড়াল। মরুভূমিতে উটের পিঠে লাল-সোনালির জমকালো ড্রেস পরে স্থানীয় এক তরুণ দম্পতি অনেক ছবি তুলল। দেখতে কী যে ভাল লাগছিল! মহুয়ার হঠাৎ মনে পড়ে যায়, সত্যজিত রায়ের কোন একটা ছবির লোকেশন ছিল রাজস্থানে। সেই সিনেমা দেখতে বসে ইভান আর সে ফেলুদা’র থ্রিলিং ভুলে, রাজস্থানের সৌন্দর্য নিয়ে এমনই জল্পনা কল্পনায় মেতেছিল যে পরে আর সে সিনেমার খেই তারা ধরতে পারেনি! আহ এখন সে ‘সেই রাজস্থানে’। তখন তখনই সে ঠিক করে নেয় এই ডিসেম্বরে তারা দুজন মিলে আসবে। ঐ দম্পতির মতো অমন জবরজং হয়ে অনেকগুলো ছবিও তুলবে। সবাই অনেক শপিং মলেও ঘুরল। শপিং এ মহুয়ার তেমন আগ্রহ না থাকলেও, অন্যদের দেখাদেখি সেও অনেক কিছু কিনল। খুঁজে খুঁজে ইভানের প্রিয় নীল রঙ এর পাঞ্জাবি, কোলাপুরি স্যান্ডেল, ভালো কাশ্মীরী শাল ভেবে একটা নকল কাশ্মীরী শালও সে কিনে ফেলল। দেশে ফিরে বাসায় এসে বুঝল, ইভান তার এই যাওয়াকে জটিলতার অন্য স্তরে নিয়ে গেছে। ইদানিং তার মেয়ে ভক্তদের সঙ্গে মেসেজ বিনিময়ে বা ফোনালাপে ইচ্ছে করেই যেন সে প্রকাশ্য হয়ে পড়ছে। বেশ কয়েকবার এভাবে চোখে ভাসতেই বা কানে আসতেই তার আর ভাল লাগল না। ইভানকে তা নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর যা পেল তাতে তার অতি সহজ মনও অদ্ভুত জটিলতার গন্ধ পেল। মহুয়া খুব ঝগড়া করল। প্রথমবারের মতো। তারপর উত্তরা থেকে মোহাম্মদপুরে চলে গেল তার ভাইয়া’র বাসায়।

অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মহুয়া এবার ভাবতে বসে, কেন আজ সে এমন করছে? ছয় বছরের সবকিছু কেন এমন গড়গড় করে মনে করছে! যেন হুড়মুড় করে আকর্ষণীয় কোন এক ইতিহাস বই এর পাতায় সে মুখ থুবড়ে পড়েছে! নাহ ‘মন খারাপ করা’ বিষয়গুলো আর সে ভাববে না। আজ তো তার এক অন্যরকম দিন। যেই দিনটার জন্য সে এতদিন অপেক্ষায় ছিল। ঠিক সাত মাস সতেরো দিন। মাঝের এই দিনগুলো কী যে বিশৃঙ্খল। কত মানুষের কত যে প্রশ্ন। শুধু যেই মানুষটার কাছে কিছু শুনতে চায়, সে-ই নিশ্চুপ। মা, ভাইয়া, আপু সবাই সামনে পেলেই বুঝিয়েছে বা জ্ঞান দিয়েছে। শ্বশুর, শাশুড়ি’র সঙ্গেও মাঝে সাঝে কথা হলে, উনারাও মহুয়ার আরও অনেক সফট হওয়া উচিৎ বলে মনে করেছেন। শুধু আরেফিন সাহেব মানে মহুয়ার বাবা কিছু বলেননি বা মনে করেননি। কিংবা হয়তো করেছেন, মহুয়াকে তা জানাননি। কখনো কখনো ছুটির দিনে, শান্ত-চুপচাপ এই মানুষটা মহুয়ার ঘরে এসে টুক টুক করে গল্প করেছেন। মা, বাবা, ভাইবোনদের নিয়ে তাদের পাঁচজনের কবেকার পুরনো সব গল্প করে গিয়েছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। অথচ মহুয়া জানে বাবা এসেছিলেন অন্য কথা বলতে। মা-ই তাঁকে পাঠিয়েছিলেন; রাগ-অভিমান ভুলে, নিজকে আরও অনেকখানি পাল্টে নিয়ে ইভানের কাছে ফিরে যেতে। আত্মীয়-স্বজন তো আছেই, অফিসের বন্ধুসম মানুষজনকেও দেখেছে, তাকে নিয়ে ফিসফিস করতে। আচ্ছা আলাদা থাকতে শুরু করা ছেলেটিকে নিয়েও কী এমন গুঞ্জরন চলতে থাকে তার আশপাশে? মানুষজনের অসীম কৌতূহলের হাত থেকে বাঁচতে, নাকি মা’র দুশ্চিন্তা কমাতে, নাকি তারই ইভানের জন্য কৌটোয় বন্ধ করে রাখা প্রেমগুলো জোর করে ঠেলে বাইরে আসাতে—সে জানে না; সে ভাবছিল সে ফিরে যাবে। একটাই তো জীবন, কী হবে এতো ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে? কতজনার তো ডানাই থাকে না, সে নাহয় কেটেই দিল!

সে ঠিক করে ফেলে, চাকরিটা ছেড়ে দেবে। অন্য কোন কিছুও আর করবে না সে। ইভানের বৌ হয়েই বাকী জীবন কাটিয়ে দেবে। গত একমাস যাবৎ নিজের সঙ্গে চূড়ান্ত কাটাকুটি করেই সে এমন ভাবনায় এসেছে। অন্য সবও মোটামুটি ঠিক করে নিয়েছে। যেমন অফিসে এক মাসের নোটিস দিতে হয়। তাও সে দিয়েছে। শুধু মনে একটা বিষয় খুঁতখুঁত করছে। ইভান যে একবারও নিজে থেকে এলো না বা যেতে বলল না! মাস তিনেক আগে সে যখন তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের জন্য বহু আকাংক্ষিত সাহিত্য পুরষ্কারটি পেল, মহুয়া মেসেজে অভিনন্দন জানিয়ে ছিল। সেও দ্রুত ধন্যবাদ জানাল। এই, এইটুকুই যোগাযোগ হয়েছে তাদের এই এতদিনে। কিন্তু আবার নিজেকে বোঝাল, সেও যেমন মনে মনে তাকে চেয়েছে, ইভানও নিশ্চয়ই তেমন করেই তাকে ভেবেছে। যত যাইহোক, ভালোবাসা তো তাদের ছিল। সত্যিই ছিল। ও যে একটু মেয়ে-পরিবেষ্টিত থাকে, এও হয়তো তেমন খারাপ চোখে দেখার কিছু নেই। কবি-সাহিত্যিকদের এমন নারী ভক্তকূল থাকেই। যখনই, যতবারই নেতিবাচক কোন কথা মনে এলো, সে তাদের সেই ভোরটির কথা মনে করল। সাদা-কালো-খয়েরি-হলুদ শালিখের কথা মনে হল। আর নতুন করে ভীষণ ভালো লাগল! কী যে ভালো! এই চারদিন ধরে পাগলের মতো ইভানের কথা মনে হচ্ছে! মনে হচ্ছে, তাকে না পেলে সে মরেই যাবে। বাসায় সবাইকে জানিয়ে দিল, সে চলে যাবে। ইভানের কাছে। সবাই ভীষণ খুশি হল। মা আনন্দে কেঁদেই ফেলল। এটা দেখে মহুয়ার ভালো লাগল না। বলবে না, বলবে না করেও শেষে বলেই ফেলল, ‘আমি তোমার কাছে এতই কাঁটা হয়ে ছিলাম, মা?’ মা বললো, ‘না রে, তা না। মা না হলে বুঝবি না।’ মহুয়া একটু হেসে শুধরে দেয়, ‘মেয়ে’র মা! তাই না মা?’

পরদিন অফিস থেকে ফেরে ফুরফুরে মনে। সারাদিন সে কথা সাজিয়েছে, কী কী বলবে ইভানকে। অফিসে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে, এত আনমনা কেন? সে শুধু হেসেছে। বাসায় এসে হাতমুখ ধুয়ে যেই ফোন টা নিয়ে বসেছে, অমনি কী যে অবাক কাণ্ড; ইভান ফোন করেছে। সে বিশ্বাস করতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়েই থাকে। অবিশ্বাসের ঘোর কাটতে কাটতেই ফোন কেটে গেল। তাড়াতাড়ি মহুয়া ফোন ব্যাক করল। কথা হল। অনেক অনেক দিন পর। যদিও তেমন বিশেষ কথা কিছু হয়নি। ও দেখা করতে চায়। কাল আসবে মহুয়ার ভাইয়ের এ বাসায়। এরপর মহুয়া কী সব কিছু আলো আলো দেখতে শুরু করলো? এ বাসায় যে ঘরে সে থাকে, তা বাসার পেছনের দিকে। এ ঘরের জানালা ঘেঁষে আছে বিশাল একটা তেঁতুল গাছ। ঘরটা সে জন্য একটু অন্ধকার অন্ধকার। সে যখন চলে আসল, মা তো কিছুতেই এ ঘরে থাকতে দেবেন না! তাঁদের ঘরটা দিয়ে দিতে চাইলেন, বললেন তেঁতুল গাছের পাশে অল্প বয়সী মেয়ের থাকা ঠিক না। মহুয়া হেসেই বাঁচে না! জোর করেই বরং থাকতে শুরু করল, এ ঘরেই। ভাইয়া-ভাবী আর তাদের চার বছরের মেয়ে ‘আকাশিয়া’ ড্রয়িং রুমের পাশে বড় ঘরটায় থাকে আর মা,বাবা মাঝের ঘরে। ঢাকা শহরে যে এমন বিশাল ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ থাকতে পারে, তা এ বাসায় না আসলে কেউ মনে হয় জানতেই পারবে না! ফোনটা রেখেই দেখলো তেঁতুলের ঝিরি ঝিরি পাতায় পড়ন্ত সূর্য নতুন করে হেলেদুলে নাচছে। দেখে জানালার পাশের ডালে গম্ভীর ধরণের মুখ করে বসে থাকা চড়ুই দুটোও পর্যন্ত আজ হাসছে। আজ অনেকদিন বাদে আকাশিয়া’র সঙ্গে অনেক্ষন খুনসুটি করল, সবার সঙ্গে বসে একটু টিভিও দেখল। হাস্যকর একটা রান্না’র অনুষ্ঠান হচ্ছিল, সেটাই সবাই আজ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখল আর একটু পরপর হাসাহাসি করল। একেকটা দিন যেন কেমন! সব কিছু মনে হয় কোমল, রঙিন। অনেক রাত হয়ে গেল ঘুমাতে। সকালে উঠতে তাই একটু দেরিও হল। খুব ভাল ঘুম হয়েছে, এখন একটা লং শাওয়ার নিয়ে পুরোপুরি ঝরঝরে হয়ে সাজতে বসবে। নীল সুতির জামদানীটা বের করলো, আজ এটা পরবে। ইভানের দেয়া প্রথম উপহার। বিয়ের আগে, ওদের সম্পর্কের শুরুর দিকে এটি পাওয়া।

গোসল সেরে ফিরতে বেশ একটু দেরি হল। দেখে বাসার সবাই ড্রয়িংরুমে বসে আছে। ভাবীর হাতে বড় একটা হলুদ খাম। সে আসতেই ভাবী তাকে খামটা দিলো। মহুয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কী এটা? ভাবী জানালেন ইভান এসেছিল। তাড়া আছে তাই আর বসেনি। মহুয়া এতক্ষণ কিছুই খেয়াল করেনি। এখন চারপাশে চোখ বোলাতেই দেখল বাবা নিস্পলক বাইরে তাকিয়ে, মা ঘন ঘন চোখ মুছছেন। ভাইয়া অফিসের কাপড় পরে রেডি, কিন্তু এখনও কেন যেন যায়নি। ভাইয়া হঠাৎ সোফা থেকে উঠে এসে মহুয়াকে জড়িয়ে ধরল। দেখলো, ভাইয়ার চোখেও টলটলা পানি। বুঝে নিল মুহূর্তেই। তবে ঐ মুহূর্তেই নিজে কী কী সব ভাবল, সে নিজেও বুঝল না। শুধু একটা জিনিস খেয়াল করল অবাক হয়ে, ‘ময়ূর-পুচ্ছ-জমানো-ইতিহাস বই’টার পাতা আর সে উলটাচ্ছে না। ভাইয়া তাকে খুব আদর করে ধরে তার ঝিরি ঝিরি তেঁতুল পাতার হাওয়ায় দোলানো ঘরে এনে বসাল। মহুয়া ফিস ফিস করে বললো, ‘ভাইয়া তোমরা এতো কষ্ট পাচ্ছ কেন? জানো, আমার খুব অন্যরকম এক নিশ্চিন্ততার নির্ভার লাগছে!’ ভাইয়া তাড়াতাড়ি করে বলল, ‘মন খারাপ করিস না। যা হয়েছে তা নিশ্চয়ই ভালো’র জন্যই হয়েছে। ঐ যে ঐ মেয়েটার সঙ্গে যা একটু আধটু কানে আসছিল, ওসব তো ভালো লাগছিল না! কিন্তু ...কিন্তু কষ্ট হচ্ছে। তুই যে বড় আশা নিয়ে নতুন করে ভাবতে চেয়েছিলি!’ মহুয়া অনেক্ষন হাসল। তারপর ভাইয়াকে কিংবা হয়তো নিজেকেই বলে চলল, “হ্যা, ফিলিংসটা বোধহয় মেয়েদের সহজে যায় না। আমারও কোথাও না কোথাও একটু থেকেই যাচ্ছিল। হয়তো থাকবেও, তবে তাতে কিছু যায় আসে না। মজার ব্যাপার কী জানো, এখন বুঝতে পারছি আমার এই ‘ইচ্ছা’ বা ‘আশা’ আমার ‘একান্ত আমার’ ছিল না; মা এবং সব প্রিয়জন বা আশপাশের মানুষজনের ইচ্ছাতেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ...... বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমার খুব ভাল লাগছে। সব কিছু সুন্দর লাগছে। মেকআপ এর রঙ চড়ানো রঙিন সুন্দর নয়। একদম আটপৌরে সুন্দর। ... ভাইয়া, দ্যাখো দ্যাখো, অনেক অনেক দিন বাদে এখানে একটা শালিখ জোড়াও চলে এসেছে। চড়ুই দুটোর পাশে বসে তেঁতুল পাতার তালে তালে কেমন মিহি করে দুলছে। ... আচ্ছা ভাইয়া, এক জীবনে ‘নিজে’কে বোঝা-য় ‘নিজে’র এতো বাকী থাকে? কত কত জীবন হয়তো নিজেকে না বুঝেই, নিজের এলো চাওয়াকে না জেনেই কেটে যায়! জীবনের পরতে পরতে ‘নতুন নিজে’কে আবিষ্কারের আনন্দই তো হতে পারে গোটা একটা জীবনের পরম পাওয়া, তাই না?”

৮টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. লেখিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই সুন্দর গল্পটির জন্য। ভাষার অসাধারণ প্রয়োগ আর কল্পণার ডানায় স্বপ্নে বিভোর করা এই গল্প যেন সবার জানা সেই গল্পটাই, তবু এ যেন ভিন্ন কোথাও । যাদু মাখা কথার কাব্য, সাবলীল লেখা আর পরিশেষে ভিন্ন এক পরিসমাপ্তি গল্পে ভিণ্ণ মাত্রার স্বাদ এনেছে। লেখাটি গভীড় ভাবে ছুঁয়ে গেল, আবারও ভাবতে শেখালো প্রচলিত সমাজ এর শুদ্ধতা এবং নারী-পুরুষ এর সততা আর অধিকার নিয়ে।
    আবারও ধন্যবাদ। নতুন লেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

    উত্তরমুছুন
  3. গল্পটি চুম্বকের মতো টানে!! এক কথায় অসাধারণ। লেখিকাকে শুভকামনা জানাই ...

    উত্তরমুছুন
  4. ভালো লাগলো। লেখালেখি নিয়মিত থাকবে আশাকরি। শুভ কামনা।

    উত্তরমুছুন
  5. লিখতে লিখতে ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে সে একদিন দারুন লিখিয়ে হয়ে উঠল -এ এক অবাক বিস্ময়। একটু করে পড়ি, আর ক্রমশ: 'লেখক' হয়ে উঠার গল্পটা কে ও যেন সাথে আবিষ্কার করি।

    মনে হয়, মেলা গল্পের প্লট ভিড় করে আছে মাথায়, মগজের অলিন্দে তারা হেটে বেড়ায়, আর বলে- 'ভাষা দাও, যতি চিহ্নের অলংকার দাও - আমরা সেজে গুজে ঝকমকে 'গল্প' হয়ে নেমে পড়ি'। ব্যাপার টা সহজ নয়, এমন গল্পের প্লট তো কতজনার ই থাকে! গল্পের প্রাণ লাগে, সে প্রাণ আনতে একটা ভাবুক মন লাগে যা' স্বচ্ছ করে দেখতে পায় ভিতর এর 'ভিতর' টা কে। এখানে প্রাণ এর দেখা মিলেছে। গল্পটা কলকল করে কথা বলে উঠতে চেয়েছে, মৌলিক, সৃজনশীল আর প্রতিশ্রুতিময় - বহু দূর যাবার পথ তার সামনে।
    শুধু একটা কথা - মনে হয় গল্পের প্লট গুলোর তাড়া ছিল। হুরোহুড়ি করে নেমে পড়তে চেয়েছে, তাই কোথাও কোথাও গল্পের পোশাক এর সেলাই গুলো এলোমেলো, যেটা পরের বার পরিপাটি হয়ে আসবে - সেই আসার প্রতীক্ষায় থাকি। শুভকামনা।

    উত্তরমুছুন
  6. ফেরদৌস, আমি যখন তোমার বয়েসী বা তার কিছু ছোট, খোকনদা (কুলদা) তখন ময়মনসিং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সেই সময়ে আমাদের ভাষা বিনিময়ের মাধ্যম ছিল চিঠি। ওর চিঠিগুলো ছিল একেকটা আস্ত সাহিত্য। ওর নিজের দেখতে পারা এবং অন্যকে দেখাতে পারার যে ক্ষমতা সেইটি ‘খুব সাধারন’ নয়। তুমি যদি সেই ক্ষমতার বিষয়টি বুঝে থাকো তাহলে নিজে থেকেই অনেক বিষয়ে সচেতন হবে। শুরুতে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা ভাংচুর হবে। কিন্তু তাও লিখে যেতে হবে। তোমার ভাষা ভীষন সাবলীল ঝরঝরা। শুধু বলবো, ‘লিখে যাও’। অনেক অনেক প্রার্থনা আর শুভকামনা রইল।

    উত্তরমুছুন
  7. অপূর্ব অদ্ভুত সুন্দর মন ছুঁয়ে যায় আবার খারাপও হয়

    উত্তরমুছুন
  8. গল্পের প্রতিটি লাইন আকর্ষণীয়!!!! অদ্ভুত সুন্দর। চমৎকার!!!!!!

    উত্তরমুছুন