শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

কেট চপিনের গল্প : একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়!

অনুবাদঃ সুদর্শনা রহমান


লেখিকা পরিচিতিঃ কেট চপিন ১৮৫০ সনের ৮ই ফেব্রুয়ারি আমেরিকার লুসিয়ানা প্রদেশের, মিসৌরি শহরে (Missouri) জন্ম গ্রহণ করেন। একজন সাধারণ গৃহ বধূ হিসাবে জীবন শুরু করলেও স্বামীর অকস্মাৎ মৃত্যুর পর, ছয় সন্তানের জননী এই নারীর জীবন অমূল বদলে যায়। এ সময়ে তিনি প্রচণ্ড অর্থ কষ্টের সম্মুখীন হন, সেই সাথে আক্রান্ত হন মানসিক বিষাদে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পরামর্শে এবং উৎসাহে তিনি লেখা শুরু করেন। পরিবর্তী সময়ে যা তাঁকে এনে দেয় অর্থ এবং খ্যাতি দুটোই। অনেকের মত তিনিই ছিলেন প্রথম আধুনিক নারীবাদী লেখিকা, এবং তাঁর লেখা ছোট গল্পগুলোই এ মতবাদের স্পষ্ট সমর্থন করে।


ছোট গল্প লেখিকা হিসাবে সুনাম অর্জন করলেও তিনি বিখ্যাত হন তাঁর উপন্যাস " The Awakening (1899)’’ সুবাদে।



শ্রীমতী কারুমার খামার বাড়ির সামনের বিরাট খোলামেলা বারান্দার আরামদায়ক এক কোনে চুপটি করে বসেছিলেন। এখানে বসেই তিনি সারা বাড়ির তদারকি করেন, আর কম বয়সী রক্ষিতা কুমারী মিলা অমারি বাকী কাজ গুলো দেখে। বাড়ির সামনে রাস্তার ওপারে দিগন্তবিস্তৃত ঢেউ খেলানো পাকা গমের খেতের উপর সূর্যের আলো এমন ঝলমিলি করছিল যেন, মনে হয় ওটা সোনালী সুমুদ্দুর। খেতের অদূরেই কুলকুল শব্দে একে বেঁকে বয়ে চলেছে মিসৌরি নদীর স্বচ্ছ কাকচক্ষু জল রুপোলী পাতের মতো। জলের তলায় ছড়ানো অসংখ্য সবুজ/ হলুদ পাথরকুঁচিগুলো পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। দুপাশে নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি উইলো গাছ, তাদের চিরল চিরল পাতায় আলোর নাচন নদীর জলে অপরূপ এক জটিল নকশা সৃষ্টি করেছে!

কারুমার খামার বাড়িটা গ্রাম্য আর দশটা খামার বাড়ির মতোই খোলামেলা আর প্রশস্ত। বাড়ির মতোই বাড়ির মালিকীনও ছিলেন লম্বা চওড়া মানুষ, সেই তুলনায় রক্ষিতা মিলা অমারি ছিল ছোট্টখাটো আর রোগা পাতলা। প্রতিদিন সন্ধ্যা ঘনাবার মুখে ঘণ্টা বাজিয়ে মিলা অমারি গমের খেতে যে দিন মজুররা কাজ করতো তাদের খাবার ডাক দিত। ঘণ্টা বাজার আওয়াজে পেয়ে মজুরের দল হুড়মুড় করে বাড়ির সামনের আঙিনা পেরিয়ে খাবার ঘরের দিকে ছুট লাগাতো। মিলা কিন্তু কক্ষনো ভুলেও কোনো মজুরের মুখের দিকে ফিরে তাকাতো না। কেন তাকাবে? খেটে খাওয়ায় নোংরা পোশাক পড়া, অশিক্ষিত, অপরিচ্ছন্ন লোকগুলোর মধ্যে এমন কোনো বিশেষত্ব তো আর ছিল না, যে জন্য তাদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে!

বারান্দার রেলিঙয়ের ওপর মিলা মনের ভুলে আধপড়া খবরের কাগজ রেখে দিয়েছিল। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় উড়ে গিয়ে সামনের বাগানে পরলো কাগজটা আর সেই সময়েই গম খেতের মজুররা খাবার ঘরের দিকে আসছিল। এক যুবক মজুর কাগজটা কুড়িয়ে এনে মিলার হাতে দিলো। মিলা এই প্রথম লক্ষ্য করলো, যুবকটির রোঁদে পোড়া শক্তপোক্ত তামাটে শরীর, চওড়া চৌকো মজবুত কাঁধ, কিশোরসুলভ মুখে গাঢ় নীল রঙের মায়াময় চোখ, হাল্কা গোলাপি ঠোঁট, কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া কটা চুল আর চঞ্চল চলার ভঙ্গী। সব কিছু মিলিয়ে তাকে দেখাচ্ছিল টগবগে তেজী বন্য ঘোড়ার মতো!

এরপর থেকে যতবার কৃষাণ যুবকটি ভেতর বাড়িতে খাবার জন্য আসে মিলা তার দিকে তাকিয়ে একটুকরো মৃদু সৌজন্যের হাসি উপহার দেয়। যদিও তা যুবকটির অগোচরেই রয়ে যায়, মালিকের কুমারী রক্ষিতার দিকে চোখ তুলে চাওয়ার মতো ধৃষ্টতা কি অত সহজ ব্যপার! অনিন্দ্য সুন্দরী বসর কুড়ির রক্ষিতাটি নিজের রুপ লাবণ্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন, খেত মজুরগুলো যে ওর দিকে চোরা নজর হানে তাও সে খুব ভাল করেই জানে। মজুরদের আহ্বানে মিলা ভ্রুক্ষেপও করে না। কিন্তু, সেবার গ্রীষ্মের দিনগুলো যেন মিলার জন্য অন্য রকমের বার্তা বয়ে এনেছিল আর সে সময়টাই বোধহয় এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা। শ্রীমতী কারুমার কিন্তু নীরবে মিলার এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।

‘শ্রীমতী কারুমার, আপনার খেতে যে মজুররাও কাজ করে তারা কে? কোথা থেকে ওদের এনেছেন?’ কৌতূহলী প্রশ্ন করে মিলা।

‘ সে কতো রকম যায়গা থেকে তার কি আর ঠিক আছে। এ গ্রামের আশে পাশে থেকে কিছু মানুষ যোগাড় করেছি, কিছু আবার ভবঘুরে, এই আরকি,’

‘ আর চওড়া কাঁধের জোয়ান ছেলেটা, ওকি আপনাদের প্রতিবেশী? মনে আছে সেই যে ছেলেটা যে আমাকে আরেকদিন কাগজ কুড়িয়ে এনে দিয়েছিল?’

‘ ও ওই ছেলেটা, যে স্টিম চালিত ট্র্যাক্টর চালায় । ও নিজেও একেবারে স্টিম ইঞ্জিনের মতো চটপটে’।

‘ হ্যাঁ, ছেলেটা দেখলে কেমন যেন দাগী আসামী টাইপের মনে হয়। না জেনে শুনে এমন অচেনা একজনকে কাজে রাখাটা বোধয় ঠিক হয়নি’।

‘ধুর, কি যে সব আবোল তাবোল কথা না তোমার। ও তো কথা বলতে পারে না আর, কানেও শোনে না। তুমি না এখনো সেই ছোট্ট ভীতু মেয়েটি রয়ে গেছো’।

‘না, না আমি মোটেও ভীতু নই। আচ্ছা, তাহলে ওকেই বলুন না কাল যেন আমাকে গাড়ি করে চার্চে পৌঁছে দেয়। দেখবেন আমি একটুও ভয় পাবো না,’ অপ্রস্তুত হাসে মিলা।

মিলাকে চার্চে নিয়ে যাবার প্রস্তাবকে পাত্তাই দেয় না অভদ্র কৃষাণ যুবকটি, কাল সে নদীতে মাছ ধরতে যাবে। শ্রীমতী কারুমার বলেন, ‘হ্যরিকে বলছি মিলা, ও তোমাকে নিয়ে যাবে চার্চে। ও ভাল ছেলে, ওকে তুমি বিশ্বাস করতে পারো’।

‘ ওকে আমার ধন্যবাদ জানাবেন। কিন্তু তার আর দরকার হবে না, শুনলাম কাল নাকি প্রচণ্ড গরম পরতে পারে। এতো গরমে বাইরে যেতে চাইছি না আর তাছাড়া অনেকগুলো চিঠির জবাব দেয়া বাকী রয়ে গেছে যে। ভাবছি কাল ওগুলো শেষ করবো।’

রাগে দুঃখে মিলার চোখে পানি চলে এলো। সামান্য এক দিন মজুরের এতো বড় স্পর্ধা যে, মিলা অমারির মতো মানুষকে উপেক্ষা করে! সেদিন সন্ধ্যায় যুবকটির সাথে আবার দেখা, ছেলেটি মিলার দিকে লাজুক ভাবে চাইলো, যেন বা তার চোখে অনুতাপের ছায়া, কিন্তু মিলার মনের তিক্ততা তাতে এতোটুকুও কমলো না।

পরের দিন অতোটা গরম ছিল না, তাই একখানা বই হাতে মিলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরলো। হলদেটে গমের গাছগুলো প্রায় মিলার কোমর অব্দি উঁচু, খেতের আলের সরু আঁকাবাঁকা পথটি ধরে ধীরে, ধীরে নদীর দিকে হেটে যেতে লাগলো। মিলার বাদামী চোখ সোনালী গমের আভায় ধাঁধিয়ে যাবার যোগাড়, বাতাসের দোলায় পুরুষ্টু গমের শীষগুলো দোল খাচ্ছিল। মধ্যাহ্নের রোঁদের তেজ কমে এসেছে, বাতাসে ছড়িয়ে পরেছে বনজ সুবাস, পাখ পাখালির কলগুজনে মুখরিত চারিধার।

গাছের আড়াল থেকে মিলা দেখতে পেলো অভাব্য যুবকটা নিবিষ্ট মনে ছিপের ফাতনার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। পাতার মচমচে আওয়াজে যুবকটি ভ্রু কুঁচকে ফিরে তাকাতেই মিলার সাথে তার চোখাচোখি হলো।

রাগ ভুলে মিলা বিনয়ী ভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘ মাছ ধরছো’?

‘জী, মাদাম,’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো সে।

‘ আমি যদি এখানে দাঁড়িয়ে থেকে মাছ ধরা দেখি তোমার অসুবিধা হবে না তো?’

‘না, মাদাম।’

হাতের বইটা শক্ত করে ধরে মিলা অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখতে লাগলো। হাওয়ায় তার মাথার খড়ের টুপিটা এক কোনে হেলে পরেছিল, কোঁকড়ানো তামাটে চুল গুলো মুখের উপর ঝপটা মারছিল, রোঁদের তাতে তার গাল আর ঠোঁট এখনো লালচে বর্ণ হয়ে আছে।

কৃষক যুবকটার পরনে রবিবাসরীয় পোশাক, যদিও তার দশা ওর অন্য পোশাকগুলোর চাইতে খুব একটা তফাৎ নয়। যুবকটি এতক্ষণে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। মিলার মনে মেয়েলী কৌতূহল খেলে যাচ্ছিল, আচ্ছা কতক্ষণ ও এমন ধৈর্য ধরে ছিপ নিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে?

‘আমাকে একটা ছিপ দাও না দয়া করে! আমি একবার চেষ্টা করে দেখতাম কিছু ধরতে পারি কিনা?’

‘জী, মাদাম’।

‘উজবুক কোথাকার একটা। জী মাদাম, না মাদাম কি একঘেয়ে জবাব দিয়ে যাচ্ছে তখন থেকে,’ মনে,মনে মুখ ভেংচে বলে মিলা।

হাতের বইটা সাবধানে গাছের গুঁড়ির উপর রেখে, ছিপটা নিয়ে ধীরে,ধীরে পা টিপে, টিপে পানির কিনারে এসে দাঁড়ালো মিলা। এবার যুবকটার চুপ করে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকবার পালা।

হঠাৎ মিলা জোরে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘ ওই দেখ ছিপ টেনে নিয়ে যাচ্ছে’।

‘ দাঁড়ান দাঁড়ান, এখনই টানবেন না।’

যুবকটা নিঃশব্দ পায়ে লাফিয়ে মিলার পাশে এসে শক্ত হাতে ছিপটা ধরলো, যেন মিলা তাড়াহুড়া করে ছিপ গোটাতে শুরু না করে। অজান্তেই, যুবকের তামাটে হাতের থাবা নেম এলো মিলার দুধসাদা হাতের উপর। যুবকটির চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছিল মিলার উপ্তত গাল, মিলার উড়ন্ত চুল ঢেকে দিচ্ছিল তার চোখমুখ। ভাল করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুবকটি মিলাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করলো। কতক্ষণ, একমুহূর্ত নাকি অনন্ত কাল? মিলা কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারেনি। শুধু রক্তশূন্য মুখে তাকিয়ে দেখলো, যে পথ সে এসেছিল সেই পথে যুবকটি মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে মনে হলো, এই বিশ্বচরাচরে সে যেন একাকী মানুষ। আজ এখন যা ঘটে গেল তার সাক্ষী শুধু বনবনানী আর বুনো পাখীর ঝাঁক। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হলো তার। কি করে কাউকে জানাবে মিলা কি ঘটে গেল তার সাথে, কে বললে বিশ্বাস করবে যে তার সুকুমার ঠোঁটের কৌমার্য লুঠ হয়ে গেল এক চাষাভুষার হাতে। শ্রীমতী কারুমারের সামনে গিয়ে কোন মুখে দাঁড়াবে সে? তার চাইতে প্রথমে নিজের ঘরে গিয়ে বরঞ্চ, শান্ত মাথায় পুরো ব্যপারটা ভাল করে ভেবে দেখা যাক। নাহয় পরে ভেবে ঠিক করা যাবে কি করলে ভাল হয়। তার চাইতে না হয় গোপন রাখাই ভাল এ কলঙ্কজনক অধ্যায়, জানি না কতদিন লাগবে আমার এমন ঘৃণিত বিষয় ভুলে যেতে? নিজেকে বড় এলো মেলো লাগের মিলার, আপন মনে বিড় বিড় করতে থাকে সে।

সে দিন রাতে মিলা সারাটা সময় ফুঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে কেঁদে কাঁটাল। সত্য গোপন করার যাতনা বুকের ভিতর ভারী বোঝার মতো চেপে বেসেছে মিলার। দিন ভর ও ছটফটিয়ে কাটিয়েছে। একদিকে ভয়ে ত্রাসে সে দিশা হারা অন্যদিকে, জীবনে প্রথম এমন অনাস্বাদিত চুম্বনের আস্বাদ কুড়িটি বসন্ত অজ্ঞাত ছিল ভেবে ওর শরীর রোমাঞ্চে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। দংশন ও কি এমন মধুর হতে পারে? মিঠে জ্বালা ওর ঘুম কেড়ে নিলো সে রাতে। দুঃস্বপ্ন ভেবে মিলা যতই করে ভুলে থাকাবার চেষ্টা করলো তত বেশী ওর মন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো।

পরের দিন সকালে দেখতে পেলো নদীর ধারে ওর ফেলে আসা বইটা বারান্দায় চেয়ারের ওপর সযত্নে রাখা, সেই দুষ্কর্মের একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী যেন ওটা। মিলা চেষ্টা করলো যতটা সম্ভব স্বাভাবিক আচরণ করতে। এমন কি যখন দুষ্কর্মের আসামী ওর সামনে দিয়েই যাওয়া, আসা করলো তবুও মিলা চোখ তুলে তাকায়নি।

একদিন, যখন যুবক কৃষাণটি শ্রীমতী কারুমারের সাথে কথা বলছিল মিলা দূর থেকে চোরা চাউনিতে একনজর দেখল। মিলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেছে এমন ভাবে ও তাকিয়ে রইলো। সেদিনই ও মনঃস্থির করে ফেললো এই খামার বাড়িতে আর এক মুহূর্তও নয়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে ওকে দূরে কোথাও চলে যেতে হবে। গোপনে নিজের সব জিনিস পত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে রইলো মিলা।

বিকেলের ডাকে যে চিঠিগুলো এসে পৌঁছেছিল সেগুলোর উপর একবার শেষ নজর বুলিয়ে দেখছিল মিলা। নিজের নাম লেখা চিঠিটা খুলে দেখতে পেলো ওতে লেখা, ‘ আমার প্রিয়তমা মিলা, আমি এখন তোমার থেকে অনেক দূরে নারাংসেট নামের একটা যায়গায় আছি। শ্রীমতী কারুমারের চিঠিতে জেনেছি তুমি আছো পাহাড় আর বনানী ঘেরা শ্রীমতী কারুমারের খামার বাড়িতে। শুনেছি শ্রীমতী কারুমার এবার ফরেড এভলীন নামের এক হাট্টাকাট্টা করিৎকর্মা কৃষাণকে কাজে রেখেছে। যুবক কৃষাণটি নাকি চাষের যন্ত্র চালাতে বড় দক্ষ, ও অঞ্চলে আবার এমন কৃষাণ পাওয়া দুষ্কর। তিনি লিখেছেন এই অভাব্য মূর্খ কৃষাণকে নাকি তোমার একেবারে সহ্য হয় না। তবে, লেখা পড়া না জানলেও নাকি ও মানুষ হিসাবে মন্দ নয়। যাই হোক সে বেচারার সাথে যেন অকারণে কঠোর হয়োনা। শ্রীমতী কারুমারের মতে, যুবকটির মন সোনার মতই খাঁটি!’

চিঠিটা পড়ে মিলা ভেবেছিল যে কৃষাণটির এতো সুখ্যাতি সামান্য হলেও তার লজ্জাতপ্ত হৃদয়ের জ্বালা একটুও হলেও কম হবে হয়তো। কিন্তু হায়, এ যন্ত্রণা যে কোনও কিছুতেই প্রশমিত হবার নয় তা আর তার চেয়ে ভাল যে জানে?

গোধূলির আবীর মাখা আকাশ আর পেকে ওঠা পুরুষ্টু সোনালী গমের সুবাতাস ভারী হয়ে আছে চারিধার। মিলা আনমনে সরু খেতের আল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল । খেতের ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ালো, যখন দেখলো ঠিক বিপরীত দিক থেকে আসামী কৃষাণটা হেঁটে ওর দিকেই আসছে। কি করবে এখন মিলা? ছোট বাচ্চা মেয়ের মতো এক ছুটে পালিয়ে যাবে নাকি, ভীত ত্রস্ত খরগোশ ছানার মতো গমের খেতের ভেতরে লুকিয়ে পরবে? নাকি যতটা সম্ভব সরে গিয়ে ভদ্রভাবে লোকটাকে পথ করে দেবে?

কৃষাণটির কিন্তু চলে যাবার কোনও লক্ষ্যই দেখা গেলো না, মিলার মুখোমুখি ঠায় দাঁড়িয়ে পরলো বুক চিতিয়ে। মাথা থেকে টুপীটা খুলে হাতে নিলো কৃষাণটি, মুখে ওর স্পষ্ট ফুটে উঠলো অপ্রস্তুত হাসি।

‘কুমারী অমারি, গত এক সপ্তাহের প্রতিটা ঘণ্টা আমি অপেক্ষা করেছিলাম । আপনাকে শুধু এই কথাটা বলতে চেয়েছিলাম যে, আমার চাইতে ভাগ্যবান শিকারি আর কেউ নেই এই দুনিয়ায়।’

মিলা কৃষাণটির কথায় কোনও প্রতিবাদই করে না। কিন্তু ওর চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গী সাক্ষ্য দেয় যে কৃষাণটার বক্তব্যের সাথে মিলা সম্পূর্ণ একমত।

কৃষাণটা আবার বলে, ‘ আপনার যদি বাবা বা ভাই অথবা অন্য কেউ থাকতো তাহলে, হয়তো আপনি তাঁদের জানাতেন ঘটনাটা।’

‘ আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, দয়া করে এসব আর অন্য কান করবে না। যা ঘটেছিল আমি সব ভুলে যাবার চেষ্টা করছি । অনুগ্রহ করে এসব কথা আর নাড়াচাড়া কোরো না।’

‘ ওহ, ভুলে যেতে চাইছেন! তাহলে হয়তো এই আসামীকেও এক সময় আপনি দয়া করে মাফ করে দেবেন আশাকরি?’ খুবই ব্যগ্র হয়ে জানতে চায় কৃষাণটা।

‘কোনো এক সময়,’ কৃষাণের কথাটাই আবার ঘুরিয়ে উচ্চারণ করে মিলা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। তবুও যেন কিছুই দেখছিল না মিলা,’ হয়তো কোনো এক সময়; যখন আমি নিজেকে মাফ করতে পারবো,’ যেন ওর চোখ দুটো কথা গুলো উচ্চারণ করে।

কৃষাণটা স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থেকে মিলার উন্নত কিন্তু ছিপছিপে শরীরটাকে ক্রমশঃ দূরে সরে যেতে দেখল। তখন ও সে বোঝার চেষ্টা করছিল কি বলতে চেয়েছিল মিলা? হঠাৎ ওর মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশিরানি অনুভূতি বয়ে গেলো, সহসা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল মিলার না বলা কথাগুলো!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন