শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

মাচাদো ডি আসিস--এর গল্প : মধ্যরাতের মহোৎসব

অনুবাদঃ ফজল হাসান

গল্পসূত্রঃ ‘মধ্যরাতের মহোৎসব’ গল্পটি মাচাদো ডি আসিসের ইংরেজিতে ‘মিডনাইট ম্যাস্’ গল্পের অনুবাদ। পর্তুগীজ ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন উইলিয়াম এল গ্রসম্যান এবং হেলেন ক্যাল্ডওয়েল । গল্পটি ‘দ্য অক্সফোর্ড বুক অফ ল্যাটিন অ্যামেরিকান শর্ট স্টোরিজ’ গল্পসংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে । বলা হয়, ‘মধ্যরাতের মহোৎসব’ মাচাদো ডি আসিসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প । এই গল্পটির সঙ্গে জেমস জয়েসের ‘এরাবি’ গল্পের মিল রয়েছে, বিশেষ করে অধিবক্তা যুবকটির আবেগ এবং স্বপ্ন । এই গল্পের কাহিনী অলম্বনে ‘মিসা ডু গ্যালো’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় ।


অনেক বছর আগে একজন মহিলার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল । তখন সেই আলাপের কিছুই আমার বোধগম্য হয়নি। সেসময় আমার বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর এবং মহিলার বয়স ছিল তিরিশ । সময়টা ছিল বড়দিনের আগের সন্ধ্যা । প্রতিবেশী একজনের সঙ্গে বড়দিনের আগের রাতে উৎসবে যাওয়ার জন্য আমি সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে রেখেছি । প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা হয়েছে যে, আমি তাকে মাঝ রাতে ঘুম থেকে জাগাবো এবং আমরা একসঙ্গে উৎসবে যাবো ।

তখন আমি একটা দোতালা বাড়িতে থাকতাম । সেই বাড়ির মালিক ছিলেন নোটারী মেনেজেস । তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন আমার খালাতো বোন । কয়েক মাস আগে আমার আগমনের সময় তার দ্বিতীয় পত্নী, কনসিকাও, এবং তার মা অত্যন্ত আদরের সঙ্গে আমাকে বরণ করেছিলেন । কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আমি ম্যাঙ্গারাতিবা থেকে রিওতে গিয়েছিলাম । সেই সময় পড়াশুনা এবং বইয়ের ভেতর আমি সারাক্ষণ ডুবে থাকতাম । হাতে গোণা কয়েকজনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল । এছাড়া মাঝে মাঝে হাঁটতে বের হতাম । সদস্য সংখ্যার দিক থেকে পরিবারটি ছিল ছোট । সংসারে সদস্য ছিল মাত্র নোটারী, তার স্ত্রী, শাশুড়ী এবং দু’জন মহিলা দাসী । বলা যায়, রীতিমতো পুরোনো আমলের পরিবার । রাত দশটার আগে সবাই যে যার শোবার ঘরে চলে যেত এবং সাড়ে দশটার মধ্যে সমস্ত বাড়ী ঘুমের গভীর সমুদ্রে ডুবে যেত ।

মেনেজেসের মুখে ওর নাটক দেখতে যাওয়ার কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল আমি তো জীবনে একবারের বেশী নাটক দেখতে যাইনি । আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি তাকে বলেছিলাম । এসব অনুষ্ঠানে গেলে তার শাশুড়ী অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং দাসীরা মুখ টিপে হাসে । মেনেজেস আমার কথার কোনো জবাব দেননি । তিনি পরিপাটি পোশাক পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান এবং পরদিন প্রত্যুষে ফিরে আসেন । পরবর্তীতে আমি জানতে পেরেছি, মেনেজের সঙ্গে এক বিবাহিত মহিলার সম্পর্ক ছিল । মহিলা তার স্বামীর কাছ থেকে আলাদা থাকতো । মেনেজেস সপ্তাহের একরাত বাড়ির বাইরে কাটান । প্রথম দিকে কনসিকাওয়ের ভীষণ মন খারাপ হতো এবং তিনি যারপরনাই অভিমান করতেন । তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপের গভীর অনুভূতিটা ক্রমশ মিলিয়ে যায় । আস্তে আস্তে তিনি নিজেকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন এবং একসময় স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে তা গ্রহণ করেছেন ।

কনসিকাও সাদা মনের নিরীহ মানুষ । সবাই তাকে সমীহ করে দেবী বলে ডাকে । স্বামীর এহেন বৈরী ব্যবহার ও অনীহার পরেও তিনি এই সম্মান এবং প্রশংসা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতেন । সত্যি বলতে কি, তার ভেতরে এমন এক মহান গুণ ছিল যে, তিনি অতি দুঃখে কাঁদেননি এবং অতি সুখেও আনন্দ ও হাসির বন্যায় ভেসে যাননি । তার জীবনের সবকিছুই কেমন যেন জটিল এবং ক্ষয়িষ্ণু । তার চেহারা মধ্যম আকৃতির, যা সুশ্রীও নয়, আবার কুৎসিতও নয় । মোদ্দাকথা, তিনি একজন দয়ালু মহিলা । তিনি কারোর সঙ্গে রুষ্ট ভাষায় কথা বলতেন না এবং সবার ভুল-ত্রুটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন । আসলে তিনি জানতেনই না কিভাবে অন্যকে ঘৃণা করতে হয় । হয়তো অন্য কাউকে ভালোবাসার বিষয়টিও তার মধ্যে ছিল না ।

বড়দিনের আগের রাতে (সম্ভবত সেটা ছিল ১৮৬১, কিংবা ১৮৬২ সাল) নোটারী নাটক দেখতে গিয়েছিল । ম্যাঙ্গারাতিবা যাওয়ার কথা ছিল আমার, কিন্তু বড় শহরে বড়দিন উপলক্ষ্যে আয়োজিত মধ্যরাতের মহোৎসব দেখার জন্য আমি বাড়ী যাইনি । সেই রাতে পরিবারের সবাই সময় মতো নিজেদের শোবার ঘরে চলে গিয়েছিল । আমি একটা বেঞ্চের উপর বসেছিলাম । উৎসবে যাওয়ার জন্য আমি ভালো পোশাক পড়ে প্রস্তুত ছিলাম । কারোর ঘুম না ভাঙিয়ে অনায়াসে সেখান থেকে সদর দরজা পেরিয়ে চলে যেতে পারতাম । দরজার চাবি তিনটা । নোটারীর কাছে একটা চাবি, আমার কাছে আরেকটা এবং তৃতীয় চাবিটা ঘরে থাকে ।

‘মিষ্টার নোগিরা, আজ কি তোমার কোনো কাজ আছে ?’ কনসিকাওয়ের মা জিজ্ঞেস করেন ।

‘পড়াশুনা করবো, ম্যাডাম ইগনাসিয়া ।’

আমার কাছে পুরনো আমলের ‘দ্য থ্রি মাস্কিটিয়ার্স’য়ের অনুবাদ আছে । আমার মনে হয় ওটা আসল ছাপা কপি, কেননা বইটি ‘দ্য জার্নাল অফ কমার্স’য়ের একটা সংখ্যা । আমি বসার ঘরের মাঝখানে একটা টেবিলের সামনে চেয়ারে বসি এবং কেরোসিনের টিমটিমে আলোয় ডি’আর্টেগন্যানের দুংসাহসী বই পড়তে শুরু করি । তখন সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন । খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমি বইয়ের ভেতর সম্পর্ণ ডুবে যাই । সময় যেন লাফিয়ে চলে গেল । বইয়ের ভেতর গভীর মগ্নতায় ডুবে থাকার জন্য রীতিমতো বেখেয়ালী হয়েও আমি ঘড়িতে এগারোটা বাজার শব্দ শুনতে পেলাম । একসময় ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ এসে আমার মগ্নতায় আঘাত করে এবং সঙ্গে সঙ্গে আমি বই থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিই । খাবার ঘরের মাঝখানের সরু পথ থেকে মৃদু পায়ে হাঁটার শব্দ ভেসে আসে । আমি মাথা তুলে তাকাই এবং দেখি কনসিকাও দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন ।

‘এখনও উৎসবে যাওনি ?’ তিনি জিজ্ঞেস করেন ।

‘না, যাইনি । আমার মনে হয়, এখনও মধ্যরাত হয়নি ।’

‘কি অসাধারণ ধৈর্য্য তোমার !’

কনসিকাওয়ের পায়ে শোবার ঘরের স্যান্ডেল । তিনি প্রায় নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করেন । তার পড়নে আটপৌড়ে সাদা রঙের পোশাক । তার দেহের নমনীয় অঙ্গ-ভঙ্গিতে একধরনের মাদকতা ফুটে উঠেছে, ঠিক যেন আমার হাতের এই উপন্যাসের মতোই উদ্দীপ্ত । আমি বই বন্ধ করি । তিনি আমার বিপরীত দিকে সোফার কাছে মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসেন । আমার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ নিজেকে আড়াল করার জন্য বললেন, ‘না, বিনা কারণেই আমার ঘুম ভেঙে গেছে ।’

আমি সরাসরি তার মুখের দিকে তাকাই এবং আমার মনের গভীরে এক সন্দেহের দানা বাঁধে । কেননা তার চোখ দেখে আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি যে, তিনি একটু আগে ঘুম থেকে জাগেননি । যাহোক, মিথ্যা বলার জন্য তিনি যেন কোনোধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে না পড়েন, তার জন্য আমি তাড়াতাড়ি আমার মন থেকে সন্দেহের ভূতটাকে তাড়াতে চাইলাম । হয়তো তার এই জেগে থাকার জন্য আমি দায়ী । তাই আমাকে খুশী করার জন্য তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন । ইতিমধ্যে আমি বলেছি যে, তিনি একজন দয়ালু এবং সাদা মনের ভালো মানুষ ।

‘আমার মনে হয়, আপনি এখন খুব বেশী সময় নেবেন না,’ ইতস্ততঃ কন্ঠে আমি বললাম ।

‘তুমি কতটা ধৈর্য্যশীল যে বন্ধুর জন্য জেগে আছো এবং অপেক্ষা করছো, অথচ সে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে । তোমার কি ভূত-প্রেতের কোনো ভয় নেই ? আমি ভেবেছিলাম, এই গহীন রাতে আচমকা আমাকে দেখে ভয় পেয়ে তুমি চমকে উঠবে ।’

‘আমি যখন পায়ের শব্দ শুনেছি, তখন খানিকটা আশ্চ্যর্য্যান্বিত হয়েছি । কিন্তু পরক্ষণেই আপনাকে দেখতে পেয়ে আশ্বস্ত হই ।’

‘তুমি কি বই পড়ছো ? আমাকে বলো না । আমি জানি, তুমি ‘দ্য থ্রি মাস্কিটিয়ার্স’ পড়ছো ।’

‘হ্যাঁ, আলবৎ আপনি ঠিক বলেছেন । বইটা খুবই চমকপ্রদ ।’

‘তুমি কি উপন্যাস পড়তে পছন্দ করো ?’

‘হ্যাঁ ।’

‘তুমি কি কখনো ‘দ্য লিটল্ সুইটহার্ট’ উপন্যাসটি পড়েছ ?’

‘মিষ্টার ম্যাসিডোরের লেখা ? আমার কাছে ম্যাঙ্গারাতিবায় আছে ।’

‘আমি উপন্যাস পড়তে খুব ভালোবাসি, কিন্তু আমার হাতে উপন্যাস পড়ার মতো অফুরন্ত সময় নেই । তুমি আর কোন উপন্যাস পড়েছ ?’

আমি এক নিঃশ্বাসে হড়হড় করে কয়েকটি উপন্যাসের নাম বললাম । কনসিকাও চুপ করে আমার কথা শুনছিলেন । তিনি চেয়ারের পেছন দিকে মাথা এলিয়ে বসেছিলেন । তার অর্ধ-নির্মীলিত দৃষ্টি সরাসরি আমার চোখের উপর এসে স্থির হয়েছিল । মাঝে মাঝে তিনি জিহ্বা দিয়ে শুকনো ঠোঁট দুটি ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন । আমার কথা বলা শেষ হওয়ার পরও তিনি কোনো ট্যুঁ শব্দটিও করেননি । তখনই কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাদের চারপাশে নিস্তব্ধতার মিহি কুয়াশা নেমে এসেছিল । একসময় তিনি মাথা তোলেন এবং হাত দুটি আড়াআড়ি ভাঁজ করে তার উপর থুতুনি রাখেন । তার কনুই চেয়ারের হাতলের উপর বিছানো ছিল এবং তার বড় বড় চোখের দৃষ্টি আটকে ছিল আমার মুখের ওপর ।

‘তিনি হয়তো আমার ওপর বিরক্ত,’ আপনমনে আমি ভাবলাম । তারপর হঠাৎ কি ভেবে যেন খানিকটা জোরে বললাম, ‘ম্যাডাম কনসিকাও, আমার মনে হয় আপনার দেরী হয়ে যাচ্ছে এবং আমি ...’

‘না, এখনও সময় হয়নি । এইমাত্র আমি ঘড়ি দেখেছি, সাড়ে এগারোটা বাজে । এখনও সময় আছে । তুমি যদি কোনো রাত জাগো, তাহলে না ঘুমিয়ে কি পরদিন জেগে থাকতে পারো ?’

‘একবার মাত্র পেরেছি ।’

‘জানো, আমি পারি না । আমি যদি কোনো রাত জাগি, তাহলে নিদেন হলেও আমাকে পরের দিন আধা ঘন্টার জন্য ঘুমুতে হয় । তবে রাতে না-ঘুমানোটা এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গা সওয়া হয়ে গেছে ।’

‘আরে না । কি যে বলেন, ম্যাডাম কনসিকাও !’

আমি আমার কথার সঙ্গে আন্তরিকতার একবাটি ঘন রস মিশিয়ে এমন ভঙ্গিতে বললাম যার জন্য তিনি তৎক্ষণাৎ হেসে উঠলেন । সাধারণত তার অঙ্গ-ভঙ্গি ঢিমে তালের এবং তার দৃষ্টি শান্ত, নমনীয় । যাহোক, এই মুহূর্তে তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন । তারপর তিনি তার স্বামীর পড়ার ঘরের দরজা এবং জানালার মাঝামাঝি পথ পেরিয়ে কক্ষের উল্টোদিকে আলতো পায়ে এগিয়ে যান । যদিও তার দেহের গড়ন হালকা-পাতলা, তবে হাঁটার ভাব দেখলে মনে হয় তিনি যেন অতি কষ্টে তার শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন । আগে আমার এ রকম বদ্ধ ধারণা জন্মেনি । কক্ষের উল্টোদিকে যাওয়ার সময় তিনি কয়েকবার থেমে পাশের টেবিলের উপর কয়েকটা এলোমেলো জিনিস গুছিয়ে রাখলেন । অবশেষে তিনি সরাসরি আমার সামনে এসে থামলেন । আমাদের মাঝখানে শুধু টেবিল । যদিও তার চিন্তার পরিধি সীমিত, তবু আমাকে সজাগ এবং বাইরে যাওয়ার ভালো পোশাক পড়া দেখে তিনি রীতিমতো আশ্চার্য্যান্বিত হলেন । তিনি যা জানেন, আমি সেই কথাই বার কয়েক পুনরাবৃত্তি করি । মধ্যরাতে শহরে কোনো জমকালো বিরাট উৎসব হয়, তা আমি কখনই শুনিনি । তাই কিছুতেই আমি উৎসবে যাওয়ার সুযোগ হারাতে চাই না ।

‘গাঁও-গেরামের উৎসবের মতোই শহরের উৎসব । আসলে সব জায়গার উৎসব একই ধরনের, বিশেষ কোনো তফাৎ নেই ।’

‘আমিও তাই মনে করি । কিন্তু শহরের উৎসব জাঁকজমকপূর্ণ হয় এবং এসব উৎসবে বেশী মানুষের আগমন ঘটে । মফস্বল এলাকার চেয়ে ‘হলি উইক’ এই রিওতে অনেক ভালো এবং সুন্দর হয় । আমি সেইন্ট জন’স্ ডে অথবা সেইন্ট অ্যান্থোনী সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না ।’

কনসিকাও একটু একটু করে সামনের দিকে ঝুকে এসে মার্বেল পাথরের টেবিলের উপর কনুই রেখে দু’হাতের তালুর মাঝে মুখ রাখলেন । স্বাভাবিক ভাবেই বোতাম না লাগানো জামার হাতা শরীর থেকে খসে পড়ে এবং আমি তার অনাবৃত্ত হাত দেখতে পেলাম । তার হাতের রঙ শুভ্র এবং খুব বেশী সরু নয়, যা হয়তো একজন ভাবতে পারে । যদিও হর-হামেশা নয়, কিন্তু তার অনাবৃত্ত হাত আগেও আমি দেখেছি । তবে আজকের এই দেখা আমাকে অনেক বেশী মোহবিষ্ট এবং মুগ্ধ করেছে । তার খোলা হাতের শিরা-উপশিরাগুলো এতটাই নীল বর্ণের যে, এই আবছা অন্ধকারের মধ্যেও আমি তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি । বই ছাড়াও কনসিকাওয়ের উপস্থিতি এবং সান্নিধ্য জেগে থাকার মহৌষধ হিসেবে আমার জন্য কাজ করে । শহর এবং গ্রামের লোকজনেরা কিভাবে ধর্মীয় বিশেষ দিন পালন করে, সে বিষয়ে আমার মুখে যা-ই আসে, আমি অনর্গল তাই বলতে থাকি । আমি এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে লাফিয়ে যাচ্ছি, এমনকি মাঝে মাঝে একই বিষয়ে ফিরে আসছি । ইচ্ছে করেই আমি হাসি, যেন তিনিও আমার সঙ্গে তাল মলিয়ে হাসেন । তিনি হাসলে অনায়াসে আমি তার শুভ্র এবং উজ্জ্বল দাঁত দেখতে পারি । তার চোখের মনি কাজল কালো নয়, তবে গাঢ় রঙের । তার নাসিকা দীর্ঘ এবং একটু বাঁকা । যাহোক, সবকিছু মিলিয়ে তার চোখেমুখে একধরনের মায়াবী ভাব বিরাজ করে । যখনই আমি আমার কন্ঠস্বর একটু উপরে তুলি, তখনই তিনি ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘আস্তে কথা বলো । মায়ের ঘুম ভেঙে যাবে ।’

কনসিকাও যেভাবে বসেছিলেন, সেই বসা তিনি থেকে একচুলও নড়লেন না । তার এই স্থবির হয়ে বসে থাকার জন্য আমি মনে মনে খুবই খুশি হয়েছিলাম । কেননা আমাদের দু’জনের মুখ অত্যন্ত কাছাকাছি ছিল । আসলে আমরা এত কাছাকাছি ছিলাম যে, আমাদের জোরে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই । তাই আমরা দু’জনেই ফিসফিস করে কথা বলি । তার চেয়ে আমি বেশি কথা বলি । আসলে আমার অনেক কথা বলার আছে । মাঝে মাঝে তিনি খুবই মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনেন । তখন তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ পড়ে । কিছুক্ষণ পরে হয়তো ক্লান্তিতে তিনি নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ান এবং টেবিল ঘুরে উল্টোদিকের একটা সোফায় বসেন । আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সোফায় বসার পূর্ব মুহূর্ত পর্য্যন্ত তার পায়ের স্যান্ডেল দেখতে থাকি । বসার পরে গায়ের রাত্রিকালীন দীর্ঘ পোশাকে তার পা ঢেকে যায় । আমার মনে পড়ে, তার পায়ে কালো রঙের স্যান্ডেল ছিল । কনসিকাও কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললেন, ‘মায়ের শোবার ঘর বেশ একটু দূরে । কিন্তু তার ঘুম খুবই পাতলা । তিনি যদি এখন জেগে ওঠেন, তাহলে পুনরায় ঘুমোতে তার অনেকক্ষণ লাগবে ।’

‘আমারও অবস্থা তথৈবচ ।’

‘কি ?’ স্পষ্ট করে শোনার জন্য তিনি সামনের দিকে মাথা ঝুকে অস্ফুট গলায় জিজ্ঞেস করেন ।

তৎক্ষণাৎ আমি আমার চেয়ারটা তার সোফার কাছে টেনে নিয়ে পুনরায় কথাটা বললাম । আমার কথায় তিনি হেসে ওঠেন । কেননা তারও ঘুম পাতলা । আসলে আমাদের সবার ঘুমই হালকা ।

‘মায়ের মতো আমি । একবার ঘুম ভেঙে গেলে সহজে ঘুমোতে পারি না । তখন শুধু বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করি । একসময় উঠে মোমবাতি জ্বালাই এবং খানিকক্ষণ ঘরের ভেতর পায়চারি করি । তারপর আবার বিছানায় ফিরে এসে ঘুমোনোর চেষ্টা করি । কিন্তু আমার সব চেষ্টাই বিফলে যায় ।’

‘আজ রাতের মতো ।’

‘না, না,’ রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তিনি বললেন ।

তার এই ‘না, না,’ আমার বোধগম্য হয়নি । হয়তো তিনি আমার কথা ঠিক মতো বুঝতে পারেননি । তিনি কোমরের বেল্টের এক মাথা নিয়ে তার ডান হাঁটুতে আলতো করে স্পর্শ করেন এবং পরে পা বদল করে এক পায়ের ওপর অন্য পা রাখেন । তারপর তিনি স্বপ্ন নিয়ে কথা বলা শুরু করেন । তিনি একবারই দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তা ছিল তার বলিকা বয়সে । তিনি জানতে চাইলেন আমি জীবনে কখনও কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছি কি না । এভাবে আমাদের গল্পগুজব ধীরে ধীরে আপন গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে । আমি সময় এবং উৎসবের কথা বেমালুম ভুলে যাই । যেইমাত্র আমি আমার কথা শেষ করি, তখনই তিনি হয় আমার কথার ব্যাখ্যা চান, নতুবা নতুন কোনো প্রসঙ্গের অবতারণা করেন । ফলে কিছুতেই আমার কথা ফুরায় না । তবে মাঝে মাঝে তিনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আস্তে, আস্তে ...’

একসময় আমাদের কথার মাঝে মৌনতা এসে পথ আগলে দাঁড়ায় । দু’বার আমার মনে হয়েছে, তিনি হয়তো ঘুমিয়ে গেছেন । কিন্তু তার চোখের পাতা মাত্র কয়েক মুহূর্ত বন্ধ থাকে । তারপর আবার চট করে খুলে যায় । সেই চোখে কোনো ঘুম নেই, এমনকি কোনো ক্লান্তি নেই । ভালো করে দেখার জন্য তিনি মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করেন । একবার তিনি চোখের পাতা খুলে দেখতে পেলেন যে, বুঁদ হয়ে আমি হা করে তার দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছি । আমার মনে আছে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় চোখের পাতা বন্ধ করেন । তবে ধীরে ধীরে, নাকি ত্বরিৎ গতিতে তিনি চোখের পাতা বন্ধ করেছিলেন, তা এখন মনে নেই । সেই রাতের স্মৃতি আমাকে মোহবিষ্ট করে রেখেছে এবং আমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দোলাচলে দুলতে থাকি । তবে আমার স্পষ্ট মনে আছে, একসময় তাকে (বলা বাহুল্য, আমাদের মধ্যে শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, অন্য কিছু নয়) অপূর্ব সুন্দর লেগেছিল, যেন অমরাবতী থেকে নেমে আসা কোনো অপ্সরী । একসময় তিনি উঠে দাঁড়ান এবং দু’দিকে দু’হাত প্রসারিত করে আড়মোড়া ভাঙেন । তাকে সম্মান জানানোর জন্য আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করি । তিনি আমার ঘাড়ে একটা হাত রেখে বাঁধা দেন । আমি সুবোধ বালকের মতো বসে থাকি । সেই মুহর্তে আমার মনে হয়েছিল, তিনি কিছু বলবেন । কিন্তু কিছু না বলে তিনি ঘুরে গিয়ে চেয়ারে বসেন, যে চেয়ারে বসে আমি বই পড়েছি । তারপর তিনি সোফার পেছনের দেওয়ালে টাঙানো আয়নার দিকে আড়চোখে তাকান । তারপর তিনি আয়নার পাশে দেওয়ালে ঝুলানো কারুকাজ করা ছবির গল্প শুরু করেন ।

‘ছবিগুলো অনেক দিনের পুরোনো । এ ছবিগুলো সরিয়ে নতুন ছবি লাগানোর জন্য আমি চিকুইনহোকে বলেছি ।’

চিকুইনহো তার স্বামীর ডাকনাম । নিঃসন্দেহে এই ছবিগুলো পুরুষদের কাছে ভালো লাগবে । একটা ছবি ক্লিওপেট্রার এবং অন্যটির কথা মনে নেই । কিন্তু সেই ছবিটিও কোনো রমণীর ছিল । উভয় ছবিই ছিল গতানুগতিক । তখন আমি জানতাম না যে, ছবিগুলো কুৎসিৎ ছিল ।

‘অত্যন্ত সুন্দর ছবি,’ আমি বললাম ।

‘হ্যাঁ, তবে ছবিগুলো অতিরঞ্জিত এবং নোংরা অঙ্গ-ভঙ্গির । সত্যি কথা বলতে কি, আমি এ ধরনের ছবিই পছন্দ করি । অবশ্য এসব ছবি অবিবাহিত পুরুষদের ঘরে কিংবা নাপিতের দোকানে ভালো মানায় ।’

‘নাপিতের দোকান ! আমার ধারণা, আপনি কখনই সেখানে যাননি ।’

‘আমি অনুধাবন করতে পারি, খদ্দেররা যখন নাপিতের দোকানে অপেক্ষা করে, তখন তারা কি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে । তাদের কথাবার্তার মূলে থাকে মেয়ে মানুষ এবং অশ্লীল-চটুল বিষয় । সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই দোকানের মালিক খদ্দেরদের তুষ্ট করার জন্য তাদের মনের মতো ছবি টাঙিয়ে রাখে । আমার মনে হয়, এধরনের ছবি বাড়িতে মানায় না । আমার অন্য ধরনের পরিকল্পনা আছে । যাহোক, আমি মোটেও এসব ছবি পছন্দ করি না । আমার কাছে ‘আওয়ার লেডী অফ দ্য ইম্যাকিউলিট কনসেপশন’ আছে, যা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর এবং আমার ভীষণ পছন্দের । কিন্তু ওটা একটা মূর্তি । তাই দেওয়ালে ঝুলানো যাবে না । তবে আমি ওটা এখানে চাই না । আমার ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র ভজনালয়ে রেখেছি ।’

ভজনালয়ের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই চট করে উৎসবের কথা আমার মনে পড়লো । ভাবলাম, উৎসবে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে এবং এবার বিদায় নেবার পালা । আমার মনে হয়েছিল আমি ঠোঁট ফাঁক করে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি । বরং তার কথা শুনতে থাকি । তিনি এত সুন্দর করে কথা বলছিলেন যে, আমি তার কথার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে ক্রমশ মুগ্ধতার গভীরে তলিয়ে যেতে থাকি । তিনি শৈশবে ধর্মের প্রতি তার প্রচন্ড বিশ্বাসের কথা বলেন । তারপর কোনো রকম বাঁধা ছাড়াই তিনি অনর্গল একের পর এক ঘটনাবহুল জীবনের কাহিনী বলে যেতে থাকেন, এমনকি নাচ-গান এবং পাকোয়েতা দ্বীপে ভ্রমণের গল্পও বলেন । একসময় তিনি অতীতের কাহিনী বলতে বলতে ক্লান্তি বোধ করেন এবং পরবর্তীতে বিষয় বদল করে বর্তমানের কাহিনী, বিশেষ করে ঘর-সংসারের গল্প বলা আরম্ভ করেন । বিয়ের আগে সবাই ভেবেছিল যে, বিয়ের পরে তার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে । আসলে তেমন কোনো অঘটন ঘটেনি । তিনি তা বললেন না, কিন্তু আমি জানি, বিয়ের সময় তার বয়স ছিল সাতাশ বছর ।

কনসিকাও এতক্ষণ মূর্তির মতো ঠায় বসেছিলেন এবং কোনো নড়াচড়া করেননি । তার চোখ ছোট হয়ে গেছে এবং তিনি অলস দৃষ্টিতে দেওয়ালের দিকে তাকান ।

‘দেওয়ালের ছবি বদলাতে হবে,’ স্বগোক্তির মতো করে তিনি বললেন ।

কিছু বলার খাতিরে আমি তার কথার সঙ্গে সহমত পোষণ করি । এক মুহূর্তে আমি চাই এবং অন্য মুহর্তে আমি চাইনা যে, আমাদের গল্প শেষ হয়ে যাক । পাছে তিনি মনে করেন যে, আমি তাকে অবজ্ঞা করেছি, তাই ভদ্র ভাবে আমি তার মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিই । তারপর কি ভেবে যেন পুনরায় তার দিকে তাকাই । আমাদের গল্প ক্রমশ থিতিয়ে আসে । বাইরের রাস্তা জনমানবহীন, নিস্তব্ধ-নিথর ।

একসময় আমাদের কথা থেমে যায় (আমি বলতে পারবো না কতক্ষণ) এবং আমরা মৌনতার বেড়াজালে আটকা পড়ে থাকি । সেই সময় শুধু পড়ার ঘর থেকে একটা ইঁদুরের কান্নার মতো শব্দ ভেসে আসছিল । এ নিয়ে আমি কথা বলতে চাইলাম, কিন্তু কিভাবে শুরু করবো, তাই ভেবে পাচ্ছিলাম না । তখন কনসিকাও কেমন যেন আচ্ছন্ন ছিল । হঠাৎ জানালার পাল্লায় খটখট শব্দ শুনতে পেলাম । বাইরে থেকে কন্ঠস্বর ভেসে এলোঃ

‘মধ্যরাতের উৎসব, মধ্যরাতের উৎসব ।’

‘তোমার বন্ধু এসেছে,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কনসিকাও বললেন । একটু থেমে তিনি আরও বললেন, ‘ব্যাপারটা রীতিমতো হাস্যকর । ঘুম থেকে তাকে জাগানোর কথা ছিল তোমার, অথচ সে তোমাকে জাগাতে এসেছে । জলদি করো, দেরি হয়ে যাচ্ছে । বিদায় ।’

‘ইতিমধ্যে সময় হয়ে গেছে ?’

‘অবশ্যই ।’

‘মধ্যরাতের উৎসব !’ জানালায় ঘন ঘন শব্দের সঙ্গে বাইরে থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসে ।

‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, ওকে আর দাঁড়িয়ে রেখো না । এটা সম্পূর্ণ আমার দোষ । আগামিকাল দেখা হওয়া পর্য্যন্ত বিদায় ।’

বলেই কনসিকাও রীতিমতো কোমড় দুলিয়ে আলতো পায়ে কড়িডোর ধরে চলে গেলেন । আমি রাস্তায় বেরিয়ে আসি এবং বন্ধুর সঙ্গে গির্জার দিকে হাঁটতে থাকি । ধর্মীয় প্রার্থনার সময় আমি কল্পনার অচিন দেশে হারিয়ে যাই । তখন যাজক এবং আমার মাঝখানে এসে কনসিকাও দাঁড়ান, যা আমার সতেরো বছর জীবনকে দারণ ভাবে উত্তেজিত করে । পরদিন সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় আমি তাকে মধ্যরাতের মহোৎসবের গল্প করি । সেই সময় আমার কথা শোনার জন্য তার উৎসাহ উপেক্ষা করে আমি যেসব মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাদের কথাও বলি । যাহোক, পরে দিনের বেলা আমি তাকে অন্য সব দিনের মতোই সাধারণ আটপৌড়ে অবস্থায় দেখি । তার চোখেমুখে কিংবা কথাবার্তা ও ব্যবহারে গতরাতের আলাপের কোনো কিছুই আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি ।

আমি কয়েক বছর পরে ম্যাঙ্গারাতিবাতে গিয়েছিলাম । মার্চ মাসে আমি রিও-তে ফিরে এসে জানতে পারি যে, অ্যাপ্যাপ্লেক্সি রোগে আক্রান্ত হয়ে নোটারী মৃত্যুবরণ করেছে । স্বামীর মৃত্যুর পরে কনসিকাও এনজেনহো নভো জেলায় বসবাস শুরু করেন । আমি সেখানে যাইনি এবং তার সঙ্গে দেখা করিনি । পরবর্তীতে আমি জানতে পেরেছি যে, তিনি তার মৃত স্বামীর শিক্ষানবিস কারণিককে শাদী করেছে ।



লেখক পরিচিতিঃ

উনবিংশ শতাব্দির ব্রাজিলের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, কবি এবং নাট্যকার মাচাদো ডি আসিসের পুরো নাম খোয়াকিম মারিয়া মাচাদো ডি আসিস । তার জন্ম ব্রাজিলের তৎকালীন রাজধানী রিও ডি জেনিরো শহরে, ১৮৩৯ সালের ২১ জুন । তার বাবা ছিলেন একজন রঙ মিস্ত্রী এবং মা ছিলেন ধোপানী । তিনি নিজে নিজেই পড়াশুনা করেন । লেখক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আগে তিনি ছাপাখানার শিক্ষানবীস কর্মচারী এবং সাংবাদিক ছিলেন । তিনি অসংখ্য উপন্যাস রচনা করেছেন । তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘পসটিউম্যাস মেম্যোয়্যার অফ ব্রাস কিউবাস, ‘ডম কাসমুরো’, ‘মিসট্রেস গার্সিয়া’ এবং ‘হেলেনা’ ইত্যাদি । তিনি দুই শ’য়ের অধিক ছোটগল্প রচনা করেন, যা ১৮৭০ সাল থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত সাতটি ছোটগল্প সংকলনে অন্তর্ভূক্ত করা হয় । তবে মাত্র দুই ডজনেরও কম সংখ্যক ছোটগল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয় এবং এসব গল্প ‘ব্রাজিলিয়ান টেইলস্’ (১৯২১), ‘দ্য সাইক্রিয়াট্রিস্ট অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৬৩) এবং ‘‘দ্য ডেভিল চার্চ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৭৭)’ সংকলনে প্রকাশিত হয় । তবে জীবদ্দশায় লেখক হিসেবে তিনি মাতৃভূমির বাইরে অন্য কোনো দেশে পরিচিতি লাভ করেননি । হোসে সারামাগো, কার্লোস ফুয়েন্তে, সুসান সনট্যাগ এবং হ্যারল্ড ব্লুম তার সাহিত্য কর্মের দারুণ ভক্ত । অনেকের মতে তিনি জোনাথান সুইফট্ এবং লরেন্স স্টার্ণের সমতূল্য । অন্যদিকে অনেকে তাকে গুস্তাব ফ্লুবার্ট, হেনরী জেমস্ এবং স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে তুলনা করেন । অ্যালেন গিন্সবার্গ তাকে ‘আরেকজন কাফকা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন । বলা হয়, নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে মাদাচোর সাহিত্যকর্ম ছিল ব্রাজিলের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রধান অবলম্বন । তিনি ‘ব্রাজিলিয়ান একাডেমী অফ লেটার্স’ প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি ১৯০৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রিও ডি জেনিরোতে দেহত্যাগ করেন ।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন