শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

অ্যামোস তুতুওলা এর গল্প অজন্তলা, অনিষ্টকারী অতিথি

                                                                                                       
অনুবাদ: মনোজিৎকুমার দাস

লেখক পরিচিতি: অ্যামোস (১৯২০-১৯৯৭) স্বশিক্ষিত নাইজেরিয়ান লেখক । যোরুবা বিশেষ করে ভূতপ্রেত সংক্রান্ত বিষয়ের লোককাহিনির পুস্তকাবলীর লেখক হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত। অ্যামোস তুতুওলা’র প্রথম উপন্যাস ‘পাম ওয়াইন ডিংকার্ড ’ ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয়।এ উপন্যাস প্রকাশের পর তা সারাবিশ্বে সাড়া জাগায়। বিখ্যাত কবি ডিলান টমাস এ উপন্যাস সম্বন্ধে প্রচুর প্রশংসা করেন। অন্যদিকে , তুতুওলা নাইজেরিয়াতে সমালোচিত হন তাঁর এ উপন্যাসে আফ্রিকার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে আদিম কাহিনি তুলে ধরার জন্যে । : অ্যামোস তুতুওলা লেখা ‘ ব্যাড ফর ব্যাড এন্ড আদার স্টোরিস’ এর অন্তর্ভুক্ত গল্পটিকে ‘ অজন্তলা , অনিষ্টকারী অতিথি’ নামে বঙ্গানুবাদ করা হলো।

এক সময় এক গ্রামে একজন শিকারী ও তার বউ বসবাস করতো। বউটি পোয়াতি হলে গ্রামের বয়স্ক লোকেরা স্বামী বেচারীকে এই বলে সাবধান করে দিয়ে বলল,“ এখন বন্য পশু শিকার করা থেকে বিরত থাকবে তুমি। যদি তুমি বন্য পশু শিকার বন্ধ না কর তবে তোমার বউ ভয়ঙ্কর আকৃতির শিশু প্রসব করবে।” লোকগুলো তাদের বাড়িতে ফিরে গেলে শিকারীটি বলল, “ যত সব কুসংস্কার! বউরা পোয়াতি হলে বাচ্চা প্রসব না করা পর্যন্ত অন্যান্য শিকাররা মোটেই পশু শিকার করতো না, এই ভয়ে যে তাদের বউদের প্রসব করা বাচ্চারা বনের জন্তু জানোয়ারের মতো চেহারা লাভ করে বনে ফিরে যায়।

প্রসবেব সময় হলে ওই শিকারীর বউ একটা ছেলে জন্ম দিল। পুরুষ শিশুটি তার মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েই বিস্মিত কন্ঠে বলল,“ হা! হা! হা ! এ কেমন পৃথিবী! আমি কী জন্যে এখানে এলাম? আমি ভেবেছিলাম, আমি যে স্বর্গ থেকে আসছি তার মতোই এই পৃথিবীটাও সুন্দর হবে! তাকিয়ে দেখ এখানকার সব কিছু কেমন নোংরা! আমি অবশ্যই এখানে বেশি সময় ন্ থেকে স্বর্গে ফিরে যাব!” এ কথা বলেই রক্তের মাঝেই সে উঠে দাঁড়িয়ে কম্পিত পায়ে তার মায়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল ।

“ হা! বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে দেখ, জন্মেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁটতে শুরু করল!”বাড়ির লোকগুলো হতবাক হয়ে বলে উঠল । “ ও কতটা লম্বাটা. দেখ দেখ!আমি জীবনে কখনো কোন মহিলাকে এ ধরনের ভয়ঙ্কর বাচ্চা জন্ম দিতে দেখিনি।” বাচ্চাটির মা দু:খ ভারাক্রান্ত কন্ঠে বলল। বাচ্চাটি নিজেই সাবান দিয়ে তার নিজের শরীর থেকে রক্তটক্ত পরিষ্কার করল। তারপর সে তার মায়ের একটা কাপড় দিয়ে তার শরীরটা মুছে একটা উঁচু টুলের উপর বসে বিরক্তির চোখে প্রত্যেকের দিকে তাকাল।

“ হা! আমার খুব খিদে পেয়েছে, এখন আমি কী খাব? ”। তারপর সে তার মায়ের ঘরের পাশের ঘর থেকে থাবারের মিষ্টি গন্ধ পেয়ে বলল,“ হ্যাঁ, ঘরটা থেকে খাবারের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসায় আমার ভাল লাগছে। এখন ওই ঘরেই আমি যাব।” । ওখানে উপস্থিত লোকদেরকে কোন প্রকার তোয়াক্কা না করেই সে টুল থেকে নেমে ঘরটার দিকে হাঁটা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। সে বিশ কিংবা তারো বেশি লোকের জন্যে তৈরি সব খাবার সে একাই খেয়ে সাবার করে ফেলল। তারপর সে সব থালাবাসন ও ঘটিবাটি লাথি মেরে ফেলে দিয়ে টুকরো টুকরো করল। সে ওইগুলো করার পর ওখানে উপস্থিত লোকগুলোর মাঝ খানে গিয়ে বসল।

ঘন্টাখানের পরে সন্ধ্যার দিকে গ্রামের লোকজন মা ও নবজাতক শিশুটি কেমন আছে দেখতে এসে প্রসূতি মাকে বলল.“শুভ সন্ধ্যা! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ নিরাপদে তোমার বাচ্চা প্রসব হওয়ায়। আশা করি এখন তোমার আর কোন কষ্টটষ্ট হবে না।

“ না কষ্টটষ্ট নেই, তবে--------” অসুখী মা প্রত্যুত্তরে বলল।

“ নি:সন্দেহে এ প্রকৃত শিশু নয়, তার বাবা যে পশুগুলো শিকার করেছিল তাদের কারো একটা আত্মা। ” ওখানে উপস্থিত লোকগুলো ওখান থেকে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে যেতে বলল। ছেলেটি জন্মানোর সাতদিন পরে এক সকালে কয়েকজন প্রবীণ লোক ছেলেটির বাবার বাড়িতে হাজির হল নবজাতক শিশুটির নামকরণ করার উদ্দেশ্যে। নবজাতক যে স্বভাবের হোক না কেন জন্মের সাত দিনের দিন নবজাতকের নামকরণ করতে হয় তাদের রীতি অনুযায়ী। শিশুটি নিজে হেঁটেই নাজির হয়ে প্রবীণ লোকজনের মাঝে গিয়ে বসে পড়ল।তারপর সে সেখানে “ শিশুটি দীর্ঘজীবী হোক ”বলে প্রার্থনারত প্রবীণ লোকজনের প্রত্যেকের চোখের দিকে তাকাল। সে সময় প্রার্থনারত প্রবীণ লোকজনেরা বলতে থাকল,“ নবজাতক শিশুর মাতা তোমাকে সুস্বাগতম। তোমাকে নিরাপদে সন্তান প্রসব করার ব্যবস্থা করায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আমরা আশা করি সন্তান প্রসব করার পর তুমি সুস্থ সামর্থ আছ. , তাই তো ? তারা তাদের কথা শেষ করার আগে তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিল যখন শিশুটি নিজেই তার নিজের নাম উচ্চস্বরে ঘোষণা করল, “ আমার নাম অজন্তলা । অন্য আর কোন নাম আমাকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”লোকজন দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলে বিস্ময়ে বিড়বিড় করতে লাগল। শিশুটির নামকরণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত লেকজনদের আপ্যায়ণ করার জন্যে মধু, নানা প্রকারেরর মদ, মিষ্টান্ন সহ নানা প্রকারের খাবার দাবারের আয়েজন করা হল । কিন্তু তারা পানাহার করতে যাবে ঠিক এমন সময় একটা অঘটন ঘটে গেল অজন্তলা অপ্রত্যাশিত ভাবে উঁচু থেকে লাফ দিয়ে পড়ে একজন লোকের পেটের মধ্যে একটা ধারাল লৌহা ঢুকিয়ে দিল । সে আর একজন মানুষের পেটের মধ্যে লৌহ শলাকা ঢুকাতে উদ্যত হলে লোকজন হুড়মুড় করে ওখান থেকে বের হয়ে গেল। তারা তার নাগালের বাইরে যাওয়ার জন্যে পড়িমড়ি করে ছুঁট লাগাল। শিশুটি তাদের পিছু নিয়ে তাদের নাগাল না পেয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। “ আর কোন প্রকার সন্দেহ নেই যে অজন্তলা নামের শিশুটি একটা বন্য প্রাণির আত্মা না হয়েই পারে না। আমরা আগেই শিশুটির বাবাকে সতর্ক করেছিলাম যে তোমার পোয়াতি বউ বাচ্চা খালাস না করা পর্যন্ত কোন পশু হত্যা করবে না। কিন্তু তা সে শোনে নি। তারই প্রতিফল এখন ফলছে।

গ্রামবাসীরা বলল।

“ ওহ , হ্যাঁ! ওই লম্বা আর মোটাসোটা লাঠিটি দিয়েই কাজ হবে।” অজন্তলা মাটির থেকে লঠিটা হাতে তুলে নিতে নিতে বলল। দরজা বন্ধ করে দিয়ে সে প্রথমে বাবাকে এবং পরে পরিবারেরর অন্যান্যদের বেদম ভাবে প্রহার করল। দরজা খোলার আগে তারা জানতেই পারল না বেলা কতটা হয়েছে। দরজা খোলা মাত্র তারা ঘর থেকে বের হয়ে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। অবশ্য সে তার মায়ের গা স্পশর্ করল না ।

“ আর কী করতে হবে? হ্যাঁ আরো অনেক কিছু করার আছে।” তারপর সে কী করবে তা মনে মনে ঠিক করে নিয়ে একটা কুড়াল হাতে তুলে নিয়ে বাড়ির দেওয়ালটা কাটতে লাগল। তার মা তাকে সাবধান করে দিয়ে বলল, “ ওটা করো না।” “ ওহ! তোমার দেখছি কোন বোধ শক্তি নেই। তা বেশ এখন তোমাকে উচিত শিা দেব। অন্যদেরকেও আমি উচিত শিা দিয়েছি।” তারপর সে তার মায়ে গালে সাতটা চড় বসিয়ে দিল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি বলল,“ অহ! অজন্তলা , তুমি তো একটা নিষ্ঠুর ছেলে, তুমি তোমার নিজের গালে চড় মারলে।” লোকটা কথা শেষ হতে না হতেই অজন্তলা তার মায়ের কাছ থেকে সরে এসে বারান্দা থেকে নিচেয় লাফ দিয়ে পড়ে ওই লোকটাকে সাতটা চড় দিল।

“হা অজন্তলা, থাম !” কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য লোকটি বলল আদেশের সুরে । লোকটা “ হা” বলা শুনে অজন্তলাকে থ মেরে যেতে দেখে ধারে কাছের লোকজন হতবাক হল। অজন্তলা এটা ভেবে ভয় পেয়ে গেল গ্রামের লোকজন তার পিতার বাড়িতে চড়াও হয়ে তার মাকে মেরেও ফেলতে পারে।

অবশেষে , একদিন সকালে অজন্তলার মা তাকে একটা ঘন বনের মধ্যে নিয়ে গেল। শিশুটির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে মিষ্টি ফল তার সঙ্গে দিল। “ দয়া করে এ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থ্কাবে যতণ না আমি ফিরে আসছি। আমি আমাদের খাবার সংগ্রহের জন্যে অন্য আর একটা বনে যাচ্ছি।” অজন্তলার মা কৌশল করে তাকে ফেলে রেখে গ্রামে ফিরে গেলে তার বাবা চুপি চুপি জিজ্ঞেস করল,“ অজন্তলা কোথায় “ভয়ঙ্কর ছেলেটিকে বনের মধ্যে রেখে এসেছি।” “ সে কি সেখানে থাকতে রাজি হয়েছে?” বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। “ হ্যাঁ, আমি ফন্দি করে তাকে রাজি করিয়েছি।” মা জবাবে বলল। “ এজন্যে আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি দেখছি, তুমি মাঝেমাঝে বয়স্কলোকদের মনের গোপন কথা ও সাবধানবাণী বুঝতে পার।” “ এ সব কথা বলে তুমি কী বলতে চাচ্ছ, গো?” তার বউ ধীরে সুস্থে জানতে চাইল। “ কথাটা হল তুমি পেয়াতি হলে কয়েকজন বয়স্কলোক তোমার পোয়াতি কালে আমাকে বনের পশু শিকার করতে বারণ করে সাবধান করে দিয়েছিল। তাদের সেই সাবধান বাণী না মানার ফলই অজন্তলার জন্ম। আমার বিশ্বাস , তোমার পোয়াতিকালে আমি যে সব পশুদের হত্যা করেছিলাম তাদের একজনই হচ্ছে এই অজন্তলা।“হু ! এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই! ”বউটা বুঝতে পারল কেন অজন্তলা এমন আচরণ করছে,এবার সে বিশ্বাস করতে পারল যে তার ছেলে মানুষ নয়।

অজন্তলা গাছের নিচে অপোর পর অপো করে চলল। কিন্তু তার মা তার কাছে ফিরে এল না। সে তার মাকে খুঁজে বের করার জন্যে বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে ছোট্ট একটা কুটিরের কাছে এসে পৌছিল। কুটির টার চারপাশে একটা ফসলের মাঠ। কুটির ও ফসলের মাঠের মালিক তিন ভাই। তাদের নাম গোট. লায়ন ও র‌্যাম, তাদের বয়স বেশই। তারা ওই সময়ের মানুষ , তারা সুখে ও শান্তিতে কুটিরটিতে বসবাস করছিল। “শুভ দিন , ,মহাশয়রা,” অজন্তলা পায়ে পায়ে কুটিরটির মধ্যে প্রবেশ করে তিন ভাইকে অভিবাদন করল। সে সময় একত্রে বসে তারা বিশ্রাম করছিল, আর সে সময়ই ছেলেটি তাদের সঙ্গে মিলিত হল। “ হ্যালো, শুভ দিন, বৎস!” মি.র‌্যাম অভিবাদনের জবাবে বলল। অন্যদিকে, আর দুই ভাই অজন্তলার দিকে চেয়ে ভাবল ছেলেটি কী বলতে চাচ্ছে।“ মহাশয়েরা , আমি পথ হারানো একটা ছেলে আমি আজ বাড়ি পৌঁছাতে পারবো না। হয়তো দু’সপ্তাহের মাঝেও না। আপনারা যদি আমাকে আপনাদের অতিথি হিসেবে আপনাদের কাছে কয়েকদিন থাকতে দেন তবে আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।তারপর আমি আমার পথ খুঁজে নেব।,” অজন্তলা অতি বিনয়ের সঙ্গে সুবোধ ছেলের মতো তার আর্জি তাদের কাছে পেশ করল।“অবশ্যই আমরা তোমার প্রতি দয়া দেখাবো কয়েক সপ্তাহ এখানে থাকার অনুমতি দিয়ে তুমি বাচ্চ্ বয়সী হওয়া সত্ত্বেও ।” সকলের প থেকে মি. র‌্যাম বলল। “ মহাশয়, ঈশ্বর ও আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।” অজন্তলা খুশি হয়ে বলল। তার ব্যবহারে সন্তুষ্ঠ হয়ে তারা তাকে তাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দিল। বিলাশবহুল জীবনযাপন করতে দেখে কয়েকদিন পরে অজন্তলা তাদের কাছে জানতে চ্ইাল,“মহাশয়েরা দয়া করে আমাকে আপনাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দিন। আমি আর আপাতত আর কোথায় যাব না। আমি আপনাদের আদেশ অরে অরে পালন করবো।” তারা সবাই তার প্রস্তাবে রাজি হল। পরদিন সকালে, অজন্তলা মি.গোটের সঙ্গে তাদের েেতর বেড়া দিতে গেল।তে থেকে প্রচুর পরিমাণে ফলের ঝুড়িতে তুলে অজন্তলার মাথায় দিল।

“ ওহ! এখন আমাকে কী করতে হবে, মি.গোট?”তার কথা শুনে মি. গোট তাকে বলল। “ হো! হো! হো! তুমি বলতে চাচ্ছ? এখন আমাকে তোমার জ্ঞান দিতে হবে।” মি, গোট তার দিকে তাকিয়ে ভাবল যে অজন্তলা এতই ছোট যে সে তার কোন তি করতে পারবে না।

অজন্তলা দূরত্বটুকু কাঁকড়ার মতো হেঁটে মি. গোটের কাছে এসে এক মুঠো ধুলো হাতে করে হাজির হয়ে তা হঠাৎ করে মি. গোটের চোখে ছুড়ে মারে। মি.গোট হতভম্ব হয়ে সাহায্যের জন্যে চিৎকার করতে থাকে। অজন্তলা তাকে সাহায্যের পরিবর্তে মি. গোটের কপালে একটা ভারী পাথর দিয়ে আঘাত করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। মি. গোটের কপাল থেকে প্রচুর পরিমাণে রক্তরণ হতে থাকে। কিছু সময় পরে অজন্তলা মি. গোটকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে মি. গোটের মাথায় ঝুড়িটা চাপিয়ে দেয়। বাড়ি ফেরার পথে অজন্তলা মি. গোটকে সাবধান করে দেয় এই বলে যে সে যেন খামারে যে সব ঘটনা ঘটে তা যেন বাড়ি ফিরে কাউকে না বলে। ইচ্ছেই হোক আর অনিচ্ছেই হোক মি. গোট অজন্তলার কথায় রাজি হয়, পাছে সে তাকে আরো বড় তি করতে পারে ভেবে।

“হায়! মি.গোট , খামারে গিয়ে তোমার মাথায় ও চোখে কী ঘটেছে?” মি. গোট ও অজন্তলা বাড়িতে ঢোকার সময় বাড়ির অন্যান্যরা মি. গোটের কাছে জানতে চাইল। “ একটা বড় পাথর আমার মাথার উপর পড়ে গিয়েছিল ।” মি. গোট মাথার রক্ত মুছতে মুছতে জবাব দিল । পরদিন খামার থেকে ফলমূল তরিতরকারী আনতে যাবার পালা মি. র‌্যামের । অজন্তলা আগের দিনের মতই মি.র‌্যামের পিছু নিল, আর মি.গোটের সঙ্গে আগের দিন আচরণ করেছিল ঠিক তেমন আচরণ মি.র‌্যামের সঙ্গেও করল।


তারপর দিন মি. লায়ন খামারে গেল ফলমূল ও তরিতরকারী আনতে, সেদিনও অজন্তলা পিছু নিতে পিছপা হল না।

এই তিন ভাই অজন্তলার সাথে বসবাস করতে গিয়ে তিক্তবিরক্ত হয়ে উঠল. কারণ অজন্তলা তাদের কাছে ভয়ঙ্কর ও বলশালী হিসেবে নিজেকে জাহির করতে লাগল। ্একরাতে অজন্তলা বিছানায় ঘুমিয়েছিল। তিন ভাই কিন্তু জানতো না অজন্তলা বিছানায় ঘুমের ভান করলেও আসলে সে কখনোই ঘুমিয়ে পড়তো না। মি. র‌্যাম প্রথমে বলল,“ অনিষ্টকারী অতিথি অজন্তলার ভয়ে আমি ভীত, যদি আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাবার কথা না ভাবি তবে একদিন ও আমাদেরকে হত্যা করবে।” “ অবশ্যই, একদিন আমাদের সবাইকে হত্যা করবে। ” মি.গোট তার কথার সমর্থনে বলল।

“ আমি বলি কী এটাই সর্বোত্তম হবে এখনই আমাদের সমস্ত জিনিসপত্র বেঁধেছেদে প্যাক করে এ বাড়ি থেকে কাল সকালেই উচিত। আমি নিশ্চিত ও ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগে আমরা অনেক অনেক দূরে চলে যেতে পারব, যার ফলে ও আর আমাদের খুঁজে পাবে না।” মি. শান্ত কন্ঠে মন্তব্য করল। “ হ্যা , তুমি ঠিক কথাই বলেছ, মি. লায়ন। বড় একটা বাস্কেটে আমাদের সব জিনিসপত্র ও খাবার এখনই ভরে ফেলা উচিত হবে, যাতে আমর্ াভোর আমরা এখান থেকে রওনা হতে পারি। ” অন্য দু’জনে বলল।

তারা তারপর পরই তাদের জিনিসপত্র ও পথে খাবার জন্য প্রচুর খাবার একটা বাস্কেটে পুরে ফেলল।

কাজ সমাধা করার পর তারা বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এদিকে অজন্তলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে তাদের আলোচনা শুনতে পারায় সে অতি সাবধানে বিছানা থেকে উঠে বড়সড় ধরনের অনেকগুলো শুকনো পাতা দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ব্যাস্কেটটির তলায় ক্য়াদা করে লুকিয়ে থাকল।

ভোর পাঁচটায় তিন ভাই ঘুম থেকে জেগে উঠে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ল। মি. গোট বাস্কেটটা নিজের মাথায় নিল। তারা ভাবল অজন্তলা হাত থেকে রা পাবে। অথচ অজন্তলা বাস্কেটের ভেতরেই আছে তারা ঘুণারেও জানতো না।

বেশ কয়েক মাইল পেছনে ফেলে রাখার পর তারা একটা গাছের কাছে এল। তারা কয়েক মিনিট সেখানে বিশ্রাম করার জন্যে গাছটা নিচে বসল।

“ হায়! আমরা আমাদের কী সুন্দর বাড়ি ফেলে রেখে এলাম যা এখন আমাদের সব কিছু ভোগ করবে, “ মি. লায়ন দু:খিত কন্ঠে বলল।

“ তোমাদের কী কেউ বিশ্বাস করো অজন্তলা আমাদের সঙ্গে আছে? ”মি. র‌্যাম জানতে চাইল।

“ না ! আমি বিশ্বাস করি না, তবে মি গোট করলে করতে পারে,” মি. লায়ন বলল।

“ হ্যাঁ. আমার বিশ্বাস হয় মি. লায়নই বিশ্বাস করে।” মি. গোট বলল। মি. গোট বিস্ময় প্রকাশ করে আবার বলে উঠল,“ না! না! না ! আমি নই, মি . লায়ন তুমিই বিশ্বাস করো।” এবার মি. লায়ন গর্জে উঠে বলল, “ মি. গোট! আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত তুমিই এটা বিশ্বাস কর। “তুমি আমার বিরুদ্ধে কথা বলবে না, মি. লায়ন।” মি. গোট প্রতিবাদ করে বলল। “ মুখ সামলে কথা বলো, মি.গোট , তুমি এটা বিশ্বাস করো স্বীকার না করো তবে আমি আমি তোমাকে হত্যা করে এখনই তোমার শরীরটাকে খেয়ে ফেলব। তাছাড়া এখন আমি খুবই ুধার্ত। আমাকে মাংস খেতে হবে।” লায়ন আবার গর্জে উঠল।

“ ঠিক আছে, যদি আমি একজন হই, তবে আমাদের সঙ্গে আসার জন্যে অজন্তলা অনুরোধটাকে আমাদের মাঝ থেকে কে অনুমোদন করেছিল। এটা বিষয়টা ফয়সালা হওয়ার পর আমাকে খেয়ে ফেল। আমি যদি না হই তবে অজন্তলাকে আমাদের সঙ্গে আসতে কোন জিনিস সাহায্য করেছে, যা এখন আমাদের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে ।” মি. গোট অতিকষ্টে তার কথ্ াশেষ করা মাত্র অজন্তলা বাস্কেটের ভেতর থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে এলে তারা তার দিকে এক নজর না তাকিয়েই ভয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল। মি. লায়ন পালিয়ে বনে চলে গেল, অন্যদিকে মি. গোট ও মি.র‌্যাম গ্রামে এলো । আর আজকের দিনে তারাই হচ্ছে আমাদের গৃহপালিত পশু। ওই দিন থেকেই তারা একে অপরের শত্র“। আর সেই কারণেই লায়ন গোট ও র‌্যামকে দেখামাত্রও হত্যা করে। অতীতে তার অজন্তলা সম্বন্ধে পরস্পরকে মিথ্যে না বললে এমনটা হতো না। এভাবেই অজন্তলা তিন ভাইকে পৃথক করে দিল।#


অনুবাদক পরিচিতি
মনোজিৎকুমার দাস

প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গল্পকার ও কবি
লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন