সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

ইশরাত তানিয়া'র গল্প : মুরগির রান

সেদিন ছিল জুন মাসের পনেরো তারিখ। আগের রাতে টানা বৃষ্টি হয়েছিল। সকালে বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় চারপাশটা যেন কান্না শেষের থমথমে চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। হালকা সোনালি আলো মেঘের ফোঁকর চুইয়ে নিচে নেমে এসেছিল। একেবারে আমার মন পর্যন্ত। জানালা দিয়ে দেখছিলাম মিষ্টি কমলা রঙের আভা ছড়িয়ে আছে ইউক্যালিপটাসের চিকন পাতায়, কিশোর ঘাসের ডগায়। এমন কি বিধ্বস্ত গাঢ় নীল ট্র্যাম্পোলিন- যেটায় উঠে আমার বাচ্চারা লাফালাফি করতে ভালোবাসত- সেটি পর্যন্ত নরম আলোয় করুণ দেখাচ্ছিল। ঠান্ডা হাওয়ায় স্নায়ু শিথিল হয়ে যাচ্ছিল।

সেদিন আমি ভাবছিলাম দুপুরের খাবারের জন্য কী রান্না করা যেতে পারে। সত্যি, এমন একটি পরিবেশে কবিতা কিংবা গানের কথা না এসে আমার মনে খাবারের কথাই ঘোরাফেরা করছিল। এর আগের দিন বাঁধাকপির ভাজি আর মুসুরের ডাল দিয়ে মুলা তরকারি রেঁধেছিলাম। দক্ষ রাঁধুনি হিসেবে আমার নাম ডাক ছিল। সামান্য ভাজি, ভর্তা থেকে শুরু করে ভুরিভোজ- কোরমা, পোলাউ, কাবাব সবকিছুতেই আমার রান্নার সুনাম ছিল।

আমি কখনোই তেমন ভোজনরসিক ছিলাম না। নিজের রান্না তেমন আহামরি কিছু মনে হতো না বরং কিছুটা মামুলি লাগত। প্রায়ই স্বাদ তিতকুটে মনে হতো। তখন আমি ভীষণ অস্থির হয়ে যেতাম। বাচ্চাদের যখন যাকে সামনে পেতাম তাকে দিয়েই একাধিক বার স্বাদ পরীক্ষা করতাম। বাচ্চারা বলত-‘স্বাদ ঠিক আছে।’ আমি ওদের চেপে ধরতাম- ‘ভালো করে খেয়াল করতো তিতা লাগছে কি না?’ ওরা বিরক্ত হতো- ‘বললাম তো ঠিক আছে। তিতা তোমার মুখে।’ সে দিনগুলোতে সচরাচর ওরা কেউ রান্নাঘরের আশেপাশে ভিড়ত না। আমাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করত। 

হ্যাঁ, তাই-ই, একেকটি দিন তেতো মুখ নিয়ে আমার কেটে যেত। আমি জানি না কেন এমন হতো। কোনো কারণ ছাড়াই স্বাদগ্রন্থিরা হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে যেত। সে যাই হোক, জানালায় দাঁড়িয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মুরগির মাংস রান্না করব। আমার তিন বাচ্চাই মুরগি খেতে ভালোবাসত। ওদের বাবাও। বিশেষ করে আমার স্বামী মুরগির হাড় চিবোতে পছন্দ করত। ফ্রিজ থেকে হিমায়িত মুরগির রান বের করে আমি

পানিতে ভিজিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল কফি পানের জন্য সেটা সঠিক সময় ছিল। গরম কফি পান করতে করতে মাংসগুলো আলগা হয়ে আসবে। 

সামান্য গরম পানিতে আমি মাংস ধুয়ে নিচ্ছিলাম। মুরগির রানের ছয় টুকরো। সংখ্যাটি এখনো আমার মনে আছে কারণ লাল রঙের যে সসপ্যানে আমি রান্না করতাম তাতে ঠিকঠাক মতো ছয়টি রান এঁটে যেত। বেশি টুকরো দিলে নাড়তে অসুবিধা হতো। পাঁচজনের খাবার হিসেবে বরাবরই এক টুকরো বাড়তি থেকে যেত। কেউ না কেউ খেত নিশ্চয়ই। এত দিন পর আমার মনে পড়ে না কেন আমি মুরগির পাঁচটি টুকরোর বদলে ছয়টি রান রান্না করতাম। 

মুরগির রান ধোয়ার সময় আমি চামড়া আলাদা করে ছাড়িয়ে নিতাম। আমরা কেউই চামড়া খেতে পছন্দ করতাম না। খাবার সময় এটাকে এক প্রকার উপদ্রব মনে হতো। চামড়া ধীরে ধীরে মাংস থেকে ছাড়িয়ে আচমকা হ্যাঁচকা টানে আলাদা করে ফেলতে হতো। টান দেবার সময় জোর কম হলে আর চামড়া ছুটত না। তখন ছুরি দিয়ে চামড়া আলগা করে নিতে হতো। 

পিচ্ছিল চামড়া টানাটানি করতে গিয়ে মনে হয়েছিল কিছু দিন পরই দেশে ফিরে যাব, বোনের সদ্যজাত মেয়ের জন্য কী নেয়া যেতে পারে? মায়ের জন্য নরম মাফলার, ভাবির জন্য ক্রিম, বাচ্চাদের দাদার বাড়ির কথা তখনো ভাবিনি। নিজের বাড়ির লোকের কথাই আগে মনে পড়েছিল। কার জন্য কী কিনতে হবে মনে মনে আমি তালিকা তৈরি করছিলাম। 

হাত ধুয়ে সসপ্যানের তেলে পেঁয়াজ ভেজে আমি একে একে আদা রসুনের পেস্ট দিয়েছিলাম। লবন, মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, জিরা-গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে মৃদু তাপে মশলা কষাচ্ছিলাম। অল্প আঁচে মশলা কষাতে দিয়ে সিঙ্কে রাখা মুরগির চতুর্থ রানটি হাতে নিয়েছিলাম। মশলা হতে হতে আমি রানের বাকি টুকরোগুলো তৈরি করে ফেলেছিলাম। আচমকা বেখেয়ালি টান লেগে রানের চামড়াটা ছিঁড়ে গিয়েছিল। একেবারে বেকায়দায়। টেনে আর চামড়া ছোটান যাচ্ছিল না তাই টুকরোটা আলাদা করে চপিং বোর্ডের ওপর রেখেছিলাম।

আমি চুলে চেস্টনাট রঙ ব্যবহার করতাম। গাঢ় বাদামি রঙটি আমার গায়ের রঙের সাথে বেশ মানিয়ে যেত। উদ্ভট মনে হতো না। চুল রাঙাবার জন্য রবিবার সকাল ছিল আমার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। সেদিন বাচ্চাদের স্কুলের তাড়া থাকত না। আমার স্বামীও ঘরের কাজে আমাকে সাহায্য করত। এমনকি মাঝে মাঝে আমার চুলে রঙের ব্রাশ বুলিয়ে দিত। 

রানের আর দুটো টুকরো বাকি ছিল। আমি ভাবছিলাম সেদিনের আগের রাতে ভালোবাসার কথা। সেটি তেমন উপভোগ্য ছিল না। মনে হচ্ছিল বার বার পড়ে শেষ করা একটি থ্রিলার বই মুখের ওপর তুলে ধরে পড়ছিলাম। বিশ বছরে সে বইয়ের আদ্যোপান্ত প্রতিটি অক্ষর আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। 

পঞ্চম টুকরোটি হাতে নিয়ে আমার অস্বস্তি লাগা শুরু হয়েছিল। এমন লাগছিল যেন অস্বাভাবিক কিছু একটা আমি হাতে ধরে রেখেছিলাম। মুরগির রানটিতে ভালো করে হাত বুলিয়ে দেখছিলাম। পিচ্ছিল নরম মাংসল রানের নিচের দিকে হাড়টা ভাঙা। পুরু চামড়াটা তুলে ফেলার পরও পাতলা আরেকটি চামড়ার আবরণে ভাঙা জায়গাটি ঢাকা ছিল। 

দেখে বোঝা যাচ্ছিল না কিন্তু হাতের স্পর্শে বুঝতে পেরেছিলাম হাড়টি ভাঙা। দৃঢ় একটি হাড় নড়বড়ে হয়ে সামান্য বেঁকে গিয়েছিল। বুড়ো আঙুলের চাপে হাড়ের ভাঙা জায়গাটি নড়ে উঠছিল। ঠিক তখনই আমার চোখের সামনে দিয়ে একটি মুরগি খুঁড়িয়ে হেঁটে গিয়েছিল। মোরগও হতে পারত কিন্তু আমি মুরগিই দেখেছিলাম। 

আহত রানটি ফেলে দেবার কোন মানেই হয় না। ছয়টি রানের প্রতিটি টুকরো হাতের মুঠোতে চেপে চেপে পানি ঝরিয়ে আমি সসপ্যানে দিয়েছিলাম। শুধু ভাঙা রানটিতে চাপ দিতে পারছিলাম না। আমার কাছে রানটি জীবন্ত মনে হচ্ছিল। কষানো মশলায় আলোগোছে এমনভাবে রানটি দিয়েছিলাম যেন সেটি আবার ব্যথা না পায়। আমি কি আগে বলেছিলাম আমার স্বামী মুরগির হাড় চিবুতে ভালোবাসে? দাঁতের নিচে হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দটি শুনতে আমার ভালো লাগত না। কড়মড় শব্দটিকে খুব নিষ্ঠুর এবং অশ্লীল মনে হতো। 

আমি ভাবছিলাম কেমন করে মুরগির এই রানটি ভেঙে গিয়েছিল। মাংস প্রক্রিয়াজাত করার সময় এমন হবার কথা নয়। আগে থেকে কেউ হয়তো ভাঙা পা লক্ষ্য করেনি। তাহলে সেটি স্টোরে আসার আগেই বাতিল হয়ে যেত। মাংস নাড়তে গিয়ে আমার কেবলই ঐ রানের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল- কারো পালা মুরগি হতে পারে। ফার্মের মুরগি হবে না। খাঁচার ভেতর আর পা ভাঙে কিভাবে? চরে বেড়ানো মুরগিই ছিল হয়তো। এখানে যেটাকে ‘ফ্রি রেঞ্জ’ চিকেন বলা হতো। 

হঠাৎ মনে পড়েছিল আমি মাংসে গরম মশলা দিতে ভুলে গিয়েছি। তড়িঘড়ি করে এলাচি-লবঙ্গ-দারচিনি-তেজপাতা দিয়ে মাংস নেড়ে সসপ্যান ঢেকে দিয়েছিলাম। তারপর স্বচ্ছ কাঁচের ঢাকনির ভেতর দিয়ে আমি ভাঙা হাড়ের টুকরোটি দেখছিলাম। টগবগিয়ে পানি ফুটছিল। ঢাকনি চাপা সসপ্যান থেকে রান্না হওয়ার বিজবিজ শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম অনেক হয়েছে এবার টুকরোটি উঠিয়ে বিনে ফেলে দেই। 

গনগনে তাপে মাংস সিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকনি সরাতেই সুস্বাদু গন্ধ নিয়ে এক ঝলক বাষ্প বেরিয়ে এসেছিল। আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম গরম বাষ্পের হলকায় আমার ত্বকের রোমকূপ খুলে গিয়েছিল। সসপ্যানের দিকে ঝুঁকে আমি ভেতরে তাকিয়ে ছিলাম। রঙ বলে দিচ্ছিল খেতে স্বাদু হবে। মাংসের ওপর তেল ভেসে উঠেছিল। সেই তেলের নিচে ঝোলের মধ্যে অস্পস্টভাবে ভেসে ছিল চামড়া ছুটে হাড় বের হয়ে উল্টে যাওয়া বিকৃত এক টুকরো মুরগির রান।     


লেখক পরিচিতি
ইশরাত তানিয়া
গল্পকার। অনুবাদক।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন