সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

মৌসুমী কাদেরের গল্প : যৌবন বটিকা

মেরেঙ্গা বাজারে বাবুলের দোকানে ভিড়টা আজ বেশী। হাটবারে বটগাছের গোড়ায় গানের আসর বসে সন্ধ্যায়। বিকাল থেকে লোক জড় হতে থাকে। বটগাছের ঠিক পিছনেই বাবুলের চায়ের দোকান। দুইটা লম্বা বেঞ্চ, পান-সিগারেট, চা-বিস্কুট, রুটি-কলা এই তার সম্পদ। আশ্বিন মাসে উৎসব আর উৎসব থাকে না, মহোৎসব হয়ে ওঠে। অনেক দূর দূরান্ত থেকে জটাধারী সাধু সন্যাসীরা ঝাঁকড়া চুলের ঝাঁকুনি দিয়ে খোল বাজিয়ে গানের আসরে বসে গাঁজা টানে। বটগাছটিকে নিয়ে অনেক কুসংস্কার আছে এই এলাকায়। অতি প্রাচীন এই বিরাট গাছটির নিচে নাকি একসময় কোন এক সন্যাসী ধ্যান করতেন।
তারই কল্যাণে বহু অসুস্থ, দুঃস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে। তাই হাটবারে আজো লোকেরা গাছের গোড়ায় ঢেলে দেয় খাঁটি গাভীর দুধ, কেউ ছিটিয়ে দেয় মিষ্টি, কেউ দেয় টাকা পয়সা। বাবুল মিয়া বটগাছটিকে দেখাশোনা করার জন্য ভাগে টাকা পায়। দোকানে ব্যবসাও ভাল চলে। বাবুল মিয়ার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবন এই বটগাছের চারপাশেই কেটেছে। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে এই মেরেঙ্গা বাজার। বটগাছের কারণে, গ্রামের আর সব বাজারের চেয়ে এর সৌর্ন্দয্য একটু বেশী। বড় রাস্তার পাশ ঘেসে ঢালু নেমে গেছে জমি। তারপরই সমান্তরাল মাঠ, এই মাঠের পূর্ব দিকে বটগাছ।

বটগাছের দু’পাশে কাঁচাপাকা মিলিয়ে ১০/১২টা ঘর। মনোহরী, পাইকারী সব দোকানই আছে এখানে। হাটবারে দোকান বাদ দিয়ে মাঠেই ছালা পেতে পসরা বসায় দোকানীরা। শহর থেকে খবর এসেছে সামনের হাটবারে বটতলায় শুরু হবে আশ্বিনের মেলা। মাসব্যাপী এই মেলা চলবে। ভীনদেশ থেকে সাধুসন্যাসীরা আসবেন। তাই নিয়ে আজ গরম গরম আলাপচারিতা চলছে স্থানীয় গায়েনদের মধ্যে। শোনা যাচেছ যাত্রাপার্টিও ভাড়া করা হয়েছে। ফুলতারা অপেরা হাউজ। এরা বিখ্যাত যাত্রা দল। কলকাতা থেকে শিল্পীরা গান গাইতে আসে এই যাত্রা দলে। ফুলতারা ফকেনুর এখন আর গাইতে পারে না, বয়স হয়েছে, তাই ভাড়া করা গায়েনরা আসে। ফুলতারা’র এক যুবতী কন্যা আছে, সেও নাকি যাত্রা দলে থাকবে। চায়ের দোকানে এইসব জমজমাট গালগপ্প আর আড্ডা চলছে। বাবুল মিয়া ভাবছে, এইবার ভাতের হোটেল চালু করলে মন্দ হয় না। দূর দূরান্ত থেকে সাধু সন্যাসীরা আসবে, এরা এত খাবার পাবে কই? তাছাড়া গত বছর হাশেমুদ্দিন ভাল ব্যবসা করেছিল হোটেল খুলে। বর্ষা সবে শেষ হলো। ভাদ্রের শেষ এখন। পহেলা আশ্বিন থেকে যাত্রাপালা শুরু । গ্রামের খালবিল ভরে আছে জলে। বাজারের ধার ঘেষে জলডাঙা নদী, নদীর ধার ভরে গেছে সাদা কাশফুলে। গ্রামের ছেলেপেলেরা শিউলী কুড়িয়ে জড় করছে বটগাছের নিচে। তাল পাকা শুরু হয়েছে। হাটে নিশ্চয়ই তালপিঠা পাওয়া যাবে। বাবুল মিয়া ভাবে, কতদিন তালপিঠা খাওয়া হয় না। আহারে, মা বেচেঁ থাকলে নিশ্চয়ই তাকে তালপিঠা খাওয়াতেন। বাবুল মিয়ার সুঠাম শরীর। তেল চকচকে গা। গ্রামের আর দশটা পুরুষের মতন নয় । উপরের দাঁত কটা একটু উঁচু। এছাড়া আর কোন খুঁত নেই ওর। বয়স যখন বারো তেরো তখন থেকেই ক্ষেত খামারে বলদ টানতে টানতে কামলা খাটা শরীরটা, গামলা ভর্তি ভাত আর কাচাঁমরিচে বেড়ে উঠেছে। অগ্রহায়ণ মাসে, মিয়া বাড়ীতে সে তিন গামলা ভাত খেতো। মিয়া সাহেব কইত, ‘খা,খা, যত খুশী খা, ফসল এইবার ভালই হইছে। তুই খাবি আর তোর দুই যমজ বলদ খাইবো ... হা, হা, হা।’ মিয়া সাহেবের তিরস্কার বাবুল মিয়ার খুবই খারাপ লাগতো। তার সাথে বলদ গরুর তুলনা; এইটা কি মানা যায়? যাই হোক এখন আর দুঃখ নাই। বাজারের দোকানটাই তার বাড়ীঘর সব। গ্রামের কত লোকজন তারে চেনে। ‘বাবুলের চায়ের দোকান’ কইলেই যে কেউ দেখিয়ে দেয়। তারপরও বাবুলের মনটা কেমন আনচান করে। শরীরটা কেমন করে। ভালোবাসা চায়। মনে হয়, একটা বিয়া করন দরকার।


(২)
বটগাছের চারপাশ জুড়ে সামিয়ানা টানানো হয়েছে। বটগাছসহ পুরো সামিয়ানায় মরিচবাতি জ্বলছে। রাস্তার দিক মুখ করে ‘স্টেজ’ বানানো হয়েছে। স্টেজের পেছনে ড্রেসিং রুম। স্টেজের বাম পাশে বাজিয়েরা যন্ত্রপাতি নিয়ে তৈরী। গায়েন দল বসেছে একসাথেই। স্টেজের ডানদিকে মেয়েদের বসার বিশেষ ব্যবস্থা। লম্বা লম্বা বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন রংয়ের বাতি মাথার উপর ফিট করা হয়েছে। ঢাকা শহরের ‘লাইট হাউজ’ নাকি এই বাতি সরবরাহ করেছে। সকাল থেকে বহুবার মেরেঙ্গা থেকে নান্দাইল পর্যন্ত মাইকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, “ভাইসব, ভাইসব, আজ রোজ রবিবার, ১লা আশ্বিন, কিশোরগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক মেরেঙ্গা বাজারের বটতলা প্রাঙ্গণে, এক বিশাল যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছে কলকাতার বিখ্যাত যাত্রাদল ‘ফুলতারা অপেরা হাউজ’, ভাইসব, ‘ফুলতারা অপেরা হাউজ।’ ভাইসব, কলকাতার বিখ্যাত অভিনেত্রী‘ফুলতারা ফকেনূর’, ও তার কন্যা, ‘চানতারা কোহিনূর’ এতে অভিনয় করবেন। ভাইসব, বিখ্যাত রচয়িতা দ্বিজ কানাই প্রণীত ও চন্দ্রকুমার দে’র সংগৃহীত সেই ‘মহুয়া’ আবার আমরা আমাদের এই গ্রামে দেখতে পাবো।আপনারা আজই টিকিট সংগ্রহ করুন। টিকিটের মূল্য মাত্র দশ টাকা, ভাইসব মাত্র দশ টাকা।বাবুল আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকান চালিয়েছে। কিন্তু এখন আর পারা গেল না, যাত্রা তার দেখা চাই। ময়মনসিংহ গীতিকার নাম, স্থানীয় কবিরা, দোকানে আলাপ সালাপ করে। কয়েকটা গানও পাগলা হারুন গায়; বাবুল তার কয়েকটা নিজের গলায় তুলে নিয়েছে । ঐ ময়মনসিংহ গীতিকায় মহুয়ার পালা আছে, বইটা বাবুল জানে। কিন্তু আজ তা চোখের সামনে দেখতে পাবে, এইরকম রহস্য, ওর শরীরে শিহরণ তৈরী করে।দর্শকসারিতে প্রাণচঞ্চল গুঞ্জন। মহুয়ার চরিত্রে অভিনয় করবে ‘চানতারা কোহিনুর’। সে নাকি অপূর্ব সুন্দরী। গ্রামবাসীরা সুন্দর বলছে, বাবুল ভাবছে,সুন্দরী হলে কিরকম দেখতে হয়? বড় বড় চোখ, রং ফর্সা, নাক চোখা, লম্বা চুল...বাবুল বোঝে না। ওর মায়ের চেহারাটাও মনে নাই; ‘সুন্দর নারী’ বলে কিছু কি ওর জানা নাই? গ্রামের বাজারে কত নারীরা আসে, একেবারে গায়ে গতরে যৌবন ঝরে পড়ে, বাবুল বোঝে, বিবাহিত আর অবিবাহিতদের পার্থক্য। চানতারা তো ভীনদেশী মানুষ, ওর শরীরে কি গাঁয়ের গন্ধ আছে? বাবুল তাকায়, নিজের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে, ‘একটা বিয়া করলে মন্দ হয় না’। বাজিয়েরা বাজনা বাজানো শুরু করেছে। মানে আর বেশীক্ষন দেরী নাই। বাবুল লুঙ্গিটা কুচা দিয়া মাটিতে বসে পড়ে। গায়ে একটা লাল শার্ট। পাশে বসা রমজান, খোঁচা দিয়া জিগ্যেশ করে, ‘কিরে? এত সাজগোজ করসোশ যে? মনের মধ্যে রঙ লাগছে? দেহি...পান আছে নাকি লগে? তাইলে একটা খাইতাম।’ বাবুল আর রমজান পান চিবাচেছ, এমন সময় জটাধারী এক স সন্যাসী ছালা গায়ে দিয়ে বাবুলের পিছে এসে বসলো। বাবুল খুবই বিরক্ত হয়ে রমজানকে বলে, ‘আমরার গেরামে কত ফাগল আইসে, দ্যাখসুইন? এই তার জ্বালায় আর শান্তিতে বইতাম পারতাম না।’ বলতে বলতেই বাজনার শব্দ বেড়ে গেল; গেরুয়া পোষাক পরা এক বাউল স্টেজে উঠে হাত পা নেড়েচেড়ে গান শুরু করলো। দর্শকরা সব নড়েচড়ে বসলো। ফুলতারা স্টেজে এসে টেনে টেনে কি সব বললো, বাবুল তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলো না। কিন্তু দর্শকরা সব হাততালি দিল। কত কথা, কত গান...কত দুঃখ, কত ভাসান, একসময় ‘চানতারা’ উঠে আসে স্টেজে।

বাবুল আর কিছু দেখতে পায় না। আর কিছু শুনতে পায় না। আহা হা, কি অপরূপ সুন্দরী, মেরেঙা বাজারে এমন সুন্দরী বাবুল আর দ্যাখে নাই। একবার ঢাকা গেছিল বাবুল, ওই খানেও দ্যাখে নাই। একটা গাঢ় কলাপাতা সবুজ শাড়ী গায়। পেটের উপরের অংশ খোলা, মসৃণ, বুকজোড়া পাহাড়ের মত খাড়া উঁচু। গলাটা একটু সরু, মুখমন্ডল পান পাতার মতন। চুলগুলো সমান্তরাল, চকচকে কালো। বাবুলের মনে হয় মাথায় উপর সামিয়ানা নাই। চারপাশে এত লোকজন কিছুই নাই। বাবুল একা দর্শকসারিতে বসা। চানতারা ওকে এসে জিগ্যেস করছে, ‘তোমার বাড়ী কোথায়গো?’বাবুল বলে, ‘বাড়ী নাই, এই বাজারেই থাকি।’চানতারা ওকে আবার জিগ্যেস করে, ‘আত্মীয়স্বজন নাই?’ বাবুল বলে, ‘না, কেউ নাই।’ চানতারা চুক চুক করে মুখ দিয়ে শব্দ করে বলে, ‘আহারে কেউ নাই? তোমারে খাওয়ায় কেগো?’ বলে বাবুলের কাঁধে হাত রাখে।বাবুলের শরীরটা চনমন করে ওঠে। খপ করে সে চানতারার হাত ধরে ফেলে, তারপর এক ঝটকায় বুকের সাথে লেপ্টে ধরে বলে, ‘আমরার গেরামে আইসুইন যহন তহন দ্যাখবাইননে, এরম শরীর আর একটাও নাই।’ বানাইলা ক্যামনে এমন শরীরটা? চানতারা বলে.. ‘পড়া নাই, লেহা নাই, আর কি করতাম? বলদ টানসি, রিশকা টানসি, আর প্যাট ভইরা কাঁচামরিচ দিয়া ভাত খাইসি।’ চানতারা তাকিয়ে দ্যাখে বাবুলের কালো চকচকে সুঠাম শরীর; ডান হাতের তলা দিয়ে বাবুলের বুকের উপর ঘসতে ঘসতে বলে, তোমার নাম কি?
বাবুল বলে, ‘বাবুল মিয়া’। তারপর ও চানতারার সরম্ন কোমর জড়িয়ে ধরে। চানতারা ওকে সমানে চড়, কিল, ঘুসি মারতে থাকে। বাবুল চোখ খুলে দ্যাখে, চানতারা না, রমজান ওকে মারছে আর বলছে, ‘হারামজাদা, ঘুমাস, আর স্বপ্ন দ্যাখস? বলদের লাহান শরীরটা নিয়া ঘুরস, যাত্রার তুই বুঝবি কি?’বাবুল ধড়ফড় করে জেগে ওঠে। কোমরে বাঁধা গামছাটা টেনে তুলে মুখটা মোছে, তারপর দুই হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙে।


(৩)
যাত্রা উপলক্ষ্যে বেচাকেনা ভালো হচেছ। সকাল থেকে সারাদিন প্রায় ৩০০ কাপ চা বিক্রি হয়েছে। বাবুল একটা গানের যন্ত্র কিনেছে। টু ইন ওয়ান।রজ্জব আলী দেওয়ান, শমশের আলীর গান ভালো চলে। মমতাজের গলায় বিচ্ছেদের গান শুনে লোকে এক কাপের জায়গায় দুই কাপ চা খায়। খবর আসছে, ঢাকার অবস্থা ভালো না। মারামারি হচ্ছে, গোলাগোলি হচ্ছে, লোকজন মারা যাচ্ছে। সকাল থেকে রেডিও বাজছে। সংবাদ, বিশেষ সংবাদ, খবর পরিক্রমা সব শেষ হয়ে যায়, তাও লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে।এই এলাকায় আওয়ামী লীগ, বি,এন,পি সমান সমান লড়াই চলছে। মোশাররফ এম.পি বহুকাল রাজত্ব করলেও আওয়ামী লীগের সাপোর্ট কমে না। ছাত্র নেতা সুজন মাঝি (আসলে নামে মাঝি, কামে না) চমৎকার বক্তৃতা দিতে জানে। ওর পড়াশুনা বিস্তর। ওর বক্তৃতা শোনার জন্য আজ ও লোকজন জড় হয়েছে। আজকে সুজন শুরু করলো শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ারে দিয়া। ‘ভাইসব, আপনারা আজ এই ঐতিহাসিক বটতলায় একত্রিত হয়েছেন এক আনন্দ উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য। কলকাতার বিখ্যাত যাত্রাদল আপনাদেরকে মুগ্ধ করে রাখছে। কিন্তু ভাইসব, ভুলে যাবেন না, দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি আমাদের একটা পবিত্র দায়িত্ব আছে। আজ সন্ত্রসীরা সরকার এবং ড়্গমতাশীল ব্যক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় যেভাবে লালিত পালিত হচ্ছে, তাতে করে আমাদের বসে থাকার, আর আনন্দ উৎসব করার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আপনারা জানেন, আনর্জাতিক চাপ এবং জনগণকে খুশী করার জন্য গুটিকয়েক নামকরা সন্ত্রাসী জেলে ঢোকানো হয়েছে। কিন্তু যারা আমাদের মধ্যেই মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচেছ, তাদের কি আমরা চিনতে পারছি? ভাইয়েরা এবং বোনেরা আমার, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল একটা শক্ত আদর্শগত আন্দোলন, একটা অধার্মিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই। কিন্তু এখন আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? যখন যে দলই ক্ষমতায় যাচ্ছে, জনগণের সাথে তারা প্রতারণা করছে। তাদের একমাত্র লক্ষ্যই হোল ‘টাকা’ আর ‘ক্ষমতা’। চলেন আপনাদেরকে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার গল্প শোনাই...’ লোকজন হা করে সুজনের বক্তৃতা শুনছে। মুহূর্তেই জড় হয়ে গেল শ’খানেক লোক। বাবুলের দোকানের সামনে এত বড় জটলা, চা, পান-সিগারেট ধুমসে বিক্রি হচ্ছে। বাজার এখন জমজমাট। তবে জিনিষপত্রের দাম চড়া। গ্রামবাসীরা এ মৌসুমে যে ফসল ফলিয়েছে তার সবটাই বিক্রি করে দিচ্ছে। এই অঞ্চলের লাল আলু, মাসকলাইযের ডাল, আর চ্যাপা শুটকি প্রসিদ্ধ। ব্যাপারীরা ট্রাক ভর্তি করে মাল নিয়ে যেত। কিন্তু এবছর ব্যাপারীরা চড়া দামেও মাল পাচ্ছে না। বাবুল হঠাৎ লড়্গ্য করলো, যাত্রা প্যান্ডেল থেকে যাত্রা দলের নায়িকা, ‘চানতারা’ ও তার সখিরা এদিকে হেঁটে আসছে। নায়িকাকে দেখে একগাদি পোলাপান হৈ হৈ করে চিৎকার করে উঠলো। লোকজন সুজন মাঝির বক্তৃতা ফেলে ‘চানতারাকে’ ঘিরে ফেললো। কেউ কেউ নায়িকাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলো। চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘ওই হারামজাদা পোলাপান, সর...সর, ম্যাডামরে যাইতে দে, ওই শুয়োরের বাচ্চা, কথা শুনোস না?...বাইনচতের বাইনচত।’ বাবুল দোকান ফেলে যেতে পারছে না। তাই দোকানেই দাঁড়িয়ে পড়ল সে। একটা সাদা গাড়ী রাস্তায় অপেক্ষা করছিল। ‘চানতারা’ ও তার সখিরা ওই গাড়ীতে উঠে ভুস করে কোথায় চলে গেল! সুজন মাঝি ঘর্মাক্ত হয়ে বাবুলের দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চিতে বসে পড়ল। গলায় হতাশার সুর। বললো,

: বাবুল্যা...এক কাপ চা খাওয়া। আর একটা ‘স্টার’ দিস।
: ‘ভাইসাব, দুধ চা দিতাম?’ একটা টোস বিস্কুট দেই?
: যা খুশী দে, শালা, দেশটা উচ্ছন্নে গেল। কেউ দেশের কথা ভাবে না। দেশপ্রেম ? কি অর্থহীন! কি অর্থহীন! সুজন মাঝি বিড়বিড় করতে থাকে। ‘মানুষ কিছুই ভাবে না, যাত্রা দেইখা সময় নষ্ট করে।’
: ভাইসাব, একটা কতা কইতাম?
: ক’।
: আমরার এম.পি সাবের গাড়ীডা দ্যাখসুইননি? নায়িকারে লইয়া গেল!!
: তোরতো বুদ্ধি হইসেরে বাবুল্যা? ...হ, দেখসি...সামনে ইলেকশন বুজসনা, যাত্রা ফাত্রা দিয়া গ্রামের মাইনসের মাথা খাইতাসে, শালা, স্বৈরাচার! ফুর্তি করে, আয়েস করে, আর মাইনসের টাকা লুট কইরা খায়!! কত মাইনসের জমি বেদখল করসে জানস? সুজন মাঝি উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
: মাইনসের কাম-কাজ নাই, পয়সা নাই..দ্যাখসুইননা..জটাইল্লা জোয়ান কয়ডা বটতলায় বইসে! নেশা করতাসে..কাইলকা ভাইসাব মৌলবীসাবে আইব আবার, ফতুয়া দিবো কইসে?
: কস কি?
: হ’.. এম.পি সাবের নেশা না থাকলে ভাইসাব যাত্রা দ্যাহন যাইত না।
: ওই হারামজাদা চুপ কর! যাত্রা না! যত সব নষ্টামী! যাত্রা দ্যাহন লাগবোনা! ফালতু!
: ‘ভাইসাব, হূনসুইননি, ঢাকায় নাহি ম্যালা গন্ডগোল হইতাসে?
: হ্যা, আওয়ামী লীগের জনসভায় বোমা ফুটসে, বাবুল্যা. রেডিওটা ধরতো?


(৪)
বাবুল মিয়ার মন খারাপ। এ বছর যাত্রা দেখে শান্তি হলো না, মেলাটা জমে জমেও ঠিক তেমন জমলো না। মৌলবীরা হুমকি দিচ্ছে! মানুষের মনের মধ্যে ভয় ঢুকেছে, মেলা ছেড়ে অনেকেই আগে আগে বাড়ী চলে গেছে। কত স্বপ্ন ছিল বাবুলের তালের পিঠা খাওয়ার! ব্যবসা ভালই হোল কিন্তু ভাতের হোটেল দেওয়া গেলো না। ‘ফুলতারা অপেরা হাউজ’ নাইট শো বন্ধ করে দিয়েছে। ভাটি অঞ্চল থেকে এবার একজন সাধুবাবা বসেছেন বটতলায়, উনি নাকি গত দশ দিন কিছুই খান নাই। লোকে খুব বলাবলি করছে। বাবুল মিয়া দোকান থেকে দ্যাখে, সাধুবাবার চারপাশে ভীড়। লাল নীল রঙের পতাকা আর মরিচবাতি দিয়ে মাজারের মত সাজানো হয়েছে। আর সাধুবাবা তার মধ্যে বসে ধ্যান করছেন। সাধুবাবার ভবিষ্যদ্বাণী নাকি একদম ফলে যাচ্ছে। মেলার আর ৩ দিন বাকি। বাবুল তাই সন্ধেবেলায়ই আজ ঝাঁপি নামালো। সাধুবাবার আস্তানায় গিয়ে দেখে, তিনি তেমন বৃদ্ধ নন। বয়স আটত্রিশ কি চল্লিশ হবে। কিন্তু পাকা চুল-দাড়ি-মোচ সব মিলিয়ে এমন জটলা! যে বয়স মনে হয় ষাট। একটা লম্বা লাইনে দশ পনের জন দাঁড়ানো। বাবুলও গিয়ে সে লাইনে দাঁড়ালো। ভাদুইরা গ্রামের বেল্লাল বললো, ওর দশ বছরের বিমার পোলাটা নাকি সাধুবাবার পানিপড়া খেয়ে ভালো হয়ে গেসে। লোকজনের হাতে পানির বোতল। সাধুবাবা নাকি এক পয়সাও নেয় না। তবু লোকজন খুশী হয়ে এটা সেটা দিয়ে যায়। বাবুল সাধু বাবার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। চোখের সামনে ভেসে উঠে গেন্ডারী বাগান, সারি সারি গাছ, শৈশব, একটা পাতলা ফিনফিনে লুঙ্গি, কোমরে গামছা, গামছার ভেতরে গেঁথে থাকা হাইসা, খালি গা। পায়ের নিচে শুকনা পাতার শব্দ। মচমচ মচমচ...। হাইসাটা কোমর থেকে খুলে ডান হাতের মুঠোয় নেয় বাবুল। খুঁজতে থাকে মোটা তাজা লম্বা একটা গেন্ডারী। কাদা ভর্তি পায়ের উপর দিয়ে সুড়সুড় করে হেঁটে যায় লালপিঁপড়ার ঝাঁক, কামড় খেয়ে কাদার মধ্যে পা দুটা ডলতে থাকে বাবুল। খচখচ করে ২ কোপে গেন্ডারীটা কেটে হাতের মুঠোয় তুলে নেয়। দূর থেকে লালমিয়ার চিৎকার শোনা যায়,
‘ওই খ্যাতের মধ্যে ক্যাডারে?’ বাবুল মিয়া দৌ-ড়। প্রাণপনে দৌড়ে গিয়ে মিয়াবাড়ীর উঠানে পৌঁছায়, হাসিবু বলে, ‘যা, যা, খাটের নিচে লুকা, আব্বা তোরে জবাই কইরা ফালাইবো’ । হাসিবু, হাসিবু, হাসিবুরে...তুই কইরে, হাসিবু... বিয়ের পর সেই যে হাসিবু ‘নাই’ হয়ে গেল, আর কোনদিন বাবুল তাকে দ্যাখেনি। শরীরের মধ্যে মেঘ ভাসে, মেরেঙা বাজারের বাতাসে অতীতগুলো আটকে আছে। বাবুল মাথা তুলে উপরে তাকায়, বটগাছ, জটাধারী বট, নিচে জটাধারী মানুষ, কি পার্থক্য মানুষ ও বৃক্ষের! সাধুবাবা সজোরে হাঁক দিয়ে ওঠেন, ‘হক মাওলা...’, বাবুল কেঁপে ওঠে, ‘চানতারার’ জন্য বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন