সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র অনুগল্প : তিরি ও গাছ

জানালা গলে ভেজা বাতাস এসে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে গায়ে। দেবিকার স্বপ্ন আর ঘুম দুটোই ভাঙল একসাথে। কোথাও বৃষ্টি হয়েছে – দূরে। মনে হচ্ছিল গা ভিজে গেছে বুঝি। ডাকল কেউ?

– হে দিদিমুনি-ই!

এখনও গেল না আঁধার...

ভোর হচ্ছে, রোদ নেই। কালচে মেঘলা আকাশ। চোখ আঠাল হয়ে জুড়ে আছে ঘুমের আমেজে। জেগে আছে মস্তিষ্ক। অকারণ বিজবিজে অস্বস্তি। জণ্ডিসে গত সপ্তাহে মারা গেছে বিনোদ বলে চোদ্দ বছরের ছেলেটা। তিরির জড়িবুটি চিকিৎসায় বেঁচেছিল এ্যাদ্দিন।

- আপনি এখান থেকে তিরিটাকে শহরটাতে লিয়ে যান মেডাম...

তিনদিন আগে ফোনে নবীন-এ্যালোসিয়াস-টোপ্পো বলেছিল। কেন? ওদের চার্চের ফাদার। গুমসুম লেগেছিল আবহাওয়া।

- সেকী? তিরিকে নিয়ে এলে তোমাদের ওদিকের কাজকম্মো এগুবে ফাদার?



তিরি-তিরি-তিরি। ভোমরার মতো কালো গোল, চারফিট মানুষ। চঞ্চল, আঁটোসাঁটো মাঝবয়সী। ছোটো ত্যানা-পরা। দুকুড়ি পার হয়েছে অনেককাল। পনেরবছর আগে ওর মরদটা ফট্‌ করে মরে গিয়েছিল লিভার ফেটে। তিরি সবার ঘরে ঘরে যায়,

- দারু ছোড়্‌দে বাপ গো... তুর বেটা শিখছে... কাম করিস না, খানা জুটছেনা... ইৎনা দারু পীলে মরে যাবি রে বাপ!

সাইকেলে ধাঁধাঁ হাফ-প্যাডিল করে ক’মাইল দূরে ব্লক অফিসে উপস্থিত। কর্মচারীদের মাথা খেয়ে ফেলে।

- পানি নাইগো আমাদের গাঁওতে, ইন্দারা শুকাই গেল। টিউকল পুঁততে অডার বের কর গো... আর ইলেটিরির ব্যবস্থা করাও দিকিন সরকারকে বলে। আমাদের বুতরুগুলা পড়ালিখা সীখবে না?...

- শুনলাম তুই নাকি জমি দিছিস প্রাইমেরি ইস্কুলবাড়ি বানানোর জন্যে?

- দিলম দু’কাট্‌ঠা। আছে। একলা অওরৎ, চলে যাবে ঠিক। বুত্রু আসছে কত...

- তুই যে শহর থেকে রোশনি লিয়ে আসিস দিদিমনি... আমার কী খুশি লাগে তখন...

মাসে মাত্র দুতিন দিনই যায় দেবিকা। দূরপাল্লার কাঁচা ভীড়ের বাসে ঝক্কর ঝক্কর করে। বাঁধানো সড়ক পেরিয়ে ঢুকে অন্য দুনিয়া যেন। ভীষণ উঁচু শালগাছটা চার্চের কাছাকাছি। দূর থেকে চার্চের মাথায় ক্রস। তার পাশে তিরির কুঁড়ে। গতমাসটায় একবারও যেতে পারেনি দেবিকা।

- তিরি, তুমি?

- তুকে ইয়াদ করলাম...

- তুমি এলে কি করে? এতটা সাইকেল চালিয়ে? অন্ধকারে?

- দিদিমুনি, বল দেখি, বিনোদকে কি আমি মারতে পারি? ওর মতো উমরের বেটা থাকত হত আমার... তু উকথা বিসোয়াস করিস?

- কে বলেছে এই বাজে কথা? হেলথ-সেন্টারে সময়মতো নিলে বেঁচে যেত। কবের থেকে ছেলেটা অসুস্থ... জটিল...

- বলেছিলম উনলোগোঁ কো - ভালো দেখছি না, ডগদর দেখা। ওরা নেয় নাই। তুই কি আর যাবি নাইরে দিদিমুণি...?

- যাব তো। আসলে ব্যস্ত ছিলাম খুব... তোমার গলার ক্রসটা কি হল?


হাওয়ায় করঞ্জ তেলের হালকা গন্ধ উড়ে গেল। ধড়ফড় করে বিছানা ছাড়ল দেবিকা। একগাদা কাজ। চায়ের কাপটা রান্নাঘরে মায়ের কাছ থেকে নিয়ে এসে সোজা বারান্দায়। দেবলে খবরের কাগজ এগিয়ে দিল।

- দেখেছিস দিদি?

রাজধানী থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে গ্রামে তিন মহিলাকে ডাইনি সন্দেহে, উলঙ্গ করে পিটিয়ে, পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলেছে গ্রামবাসীরা। অভিযোগ, চোদ্দবছরের ছেলে বিনোদকে ঈর্ষা-প্রণোদিত হয়ে এরা মন্ত্রবলে হত্যা করেছে। তিন ডাইনের প্রধান তিরি-মেরি-এক্কা(৪৫)। সহকারী দুজন মংলী(৩৭), আর খুশি(২৬)। তিরি-এক্কা গ্রামের উন্নয়ন এবং সমাজসেবামূলক কাজে প্রবৃত্ত থাকত। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। তদন্ত চলছে।

কাগজের রঙিন ছবিটা তিরির ঘরের পেছনে খুউব লম্বা শালগাছটার।

ডেরাটা ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে। দেওয়াল, চালা আর খুঁটি গড়াগড়ি।

ওখানেই রুখা মাটিতে তিরির রক্ত শুকিয়েছিল।

তিরির গলার দস্তার ক্রসটা ওখানে পড়েছে?

এখনও গেলনা আঁধার...


- জানিস দিদিমনি, যদি ঈ পেড়টার মাথামেঁ চড়ে যেতম, পুরো গাঁওটা দেখা যেত... কে কেমন আছে, কার কি দুখ!

- থাকো তিরি, গাছের মতো উঁচু হয়ে। নজর রেখো সকলের।

















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন