সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

সন্ধ্যামালতী

সন্ধ্যামালতী
তারাপদ রায়

সূর্যদেব যখন অস্তাচলে, দিগ্বধূর ললাটে যখন সন্ধ্যাতারা সিন্দুর বিন্দুর মতো জ্বলে ওঠে, আকাশের আনাচে-কানাচে যখন একটি-দুটি করে গ্রহ নক্ষত্র বেরিয়ে আসে, যখন সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী— সেই সময় সন্ধ্যামালতী ফুল ফুটে ওঠে মর পৃথিবীর গৃহস্থ বাড়ির অঙ্গনে। আবছায়া অন্ধকার উঠোনে, সিঁড়ির পাশে, বারান্দার নীচে সন্ধ্যামালতী ফুলগুলি আকাশের তারার মতো ঝলমল করে।


লাল-নীল-সাদা, সবুজ-হলুদ ঘুড়ি বানানোর রঙিন কাগজের মতো সন্ধ্যামালতী ফুলের নানা রকম রং। ছোট ছোট, জবা কিংবা টগর ফুলগাছের থেকেও অনেক ছোট, অনেকটা গাঁদা ফুলগাছের মতো দেড় হাত-দু হাত উচ্চতার গাছগুলির ডালপাতা, আকার-আয়তন সবই একরকম। গাছ দেখে বলা যাবে না সে গাছে কী রকম রঙের ফুল ফুটবে, গাছগুলি হয়তো নিজেরাও জানে না। দিনের বেলায় এ ফুল ঘুমিয়ে থাকে, জেগে ওঠে রোদ মুছে যাওয়ার পরে দিনের অবসানে। একে-একে ফুটে ওঠে উঠোনে, অঙ্গনে।

অনেক দিন আগে অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়া গত জন্মে পদ্মা-ধলেশ্বরীর ওপারে এক ঘুম-ঘুম মফস্সল শহরে আমাদের যে পুরনো বাসাবাড়ি ছিল সে বাড়ির ভাঙা দালানের আর কাছারি ঘরের সামনের উঠোন জুড়ে ছিল সন্ধ্যামালতী ফুলগাছের ঝাড়। সে সব ফুলগাছের প্রায় কোনও যত্ন ছিল না। পেঁপের বিচির মতো, গোলমরিচের মতো কালো-কালো, গোল সন্ধ্যামালতী ফুলের বিচি শুকিয়ে গেলে প্রকাণ্ড চাই ঝরে পড়ত।

একা একাই গাছ জন্মাত, বৃষ্টির জলে গাছ বেড়ে উঠত, ফুল ফুটত, লাল-নীল-সবুজ, হলুদ-হলুদ। কোন গাছে কী ফুল ফুটবে কেউ জানত না। কবে এই ফুলগুলো কে এনে দালানের বারান্দার পাশে লাগিয়েছিল, সে কথাও সবাই মনে রাখেনি।

আমাদের অল্প বয়সে পর পর কয়েক বছর এত বেশি সন্ধ্যামালতী ফুল ফুটেছিল, পড়ন্ত দিনের আলোছায়ায় আমাদের বাইরের উঠোন রঙিন হয়ে উঠত। সামনের জেলা বোর্ডের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে লোকে তাকিয়ে দেখত।

দাদা একদিন প্রস্তাব করল, বাড়ির নাম দেওয়া হোক ‘সন্ধ্যামালতী কুটির’। আমাদের কবিস্বভাব ছোটপিসি তখন বিয়ের পরে পিত্রালয়ে দ্বিরামঙ্গলে এসেছে। পিসি শুনে বলল, ‘কুটির’ কেন? আমাদের এত বড় দালান বাড়ি, শব্দের সঙ্গে শব্দ মিলিয়ে নাম হোক, ‘সন্ধ্যামালতী সদন’।

আমাদের ও দিকের জলজ ভূখণ্ডে নৌকোর নাম রাখা হত, কিন্তু বাড়িঘরের নাম রাখার রেয়াজ ছিল না। তাই ‘সন্ধ্যামালতী কুটির’ কিংবা ‘সন্ধ্যামালতী সদন’ কোনও নামই রাখা হয়নি আমাদের পুরনো বাড়ির।

কিন্তু আমার বাবা শেষ বয়েসে মৃত্যুর আগের বছর ‘সন্ধ্যামালতী’ নামে একটি চটি কবিতার বই লিখেছিলেন, সেই বইয়ের বেদনাময় উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল:

আজ ভাবি, ভাল হয়েছিল মোর ভুল,
তখন কুসুমগুলি আছিল মুকুল।
হের তারা সারাদিনে ফুটিতেছে আজি,
অপরাহ্ণে ভরিলাম এ পূজার সাজি।

এই রচনা আমার স্বর্গত পিতৃদেবের কবিতা পাঠককে পড়ানোর জন্য নয়। কিন্তু মনের মধ্যে কোথায় যেন কী একটা দুর্বলতা থেকে যায়, কখন কী ভাবে প্রকাশিত হয়। কোনও সঙ্কোচ সাবধানতাই তাকে ঠেকাতে পারে না।

আমার বাবা কবি ছিলেন না। ছাত্রজীবনে স্কুল কলেজে শেক্সপিয়ার, মিল্টন, রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয় পড়েছিলেন। বাড়িতে সঞ্চয়িতা। সঞ্চিতা, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র এবং পরবর্তী অনেকের বই ছিল। কিন্তু আমাদের অল্প বয়েসে বাবাকে লিখতে দেখিনি। কবিতা রচনায় হাত দেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার মার মৃত্যুর পর শূন্য বাড়িতে, হয়তো একাকীত্বের কারণেই।

অবশ্য খুব যে নিঃসঙ্গ ছিলেন সেও বলা যায় না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর পেশা নিয়ে, আইন-আদালত, মক্কেল-মুহুরি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

আমার বাবা উকিল ছিলেন। মফস্সস্বল শহরের শতাব্দী প্রাচীন ওকালতি সেরেস্তার তিনিই ছিলেন শেষ ব্যবহারজীবী। তিনি তাঁর পারিবারিক পেশায় খুবই সফল হয়েছিলেন, পাকিস্তান হওয়ার পরেও এবং বাংলাদেশেও।

বাবা এমনিতে সাদামাঠা, সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন কিন্তু পুরুষানুক্রমে প্রাপ্ত আইন জ্ঞান এবং সাধারণ বুদ্ধি তাঁকে আইন ব্যবসায় সাফল্য এনে দিয়েছিল।

ছুটিছাটায় যখন বাড়িতে যেতাম, মা-বাবা থাকতেন বলেই পাসপোর্ট-ভিসা করে নিয়মিতই যেতে হত, আমি কখনও-কখনও সকাল-সন্ধ্যায় কাছারি ঘরে বাবার কাছাকাছি একটা চেয়ার টেনে বসতাম।

টিনের বিশাল চারখানা কাছারিঘর, সামনে লম্বা টানা একচালা বারান্দা। কয়েকটা কাঠের বেঞ্চি, হেলান দেওয়া বেঞ্চি, দুয়েকটা তক্তপোশ মুহুরিবাবুদের, অনেকগুলো হাতলওলা এবং হাতল ছাড়া কাঠের চেয়ার। ঘর গিজগিজ করছে। মক্কেল-সাক্ষী, মুহুরি-টাউট, জুনিয়ার উকিল। ভিড় ঘর-বারান্দা উপচিয়ে সামনের এলোমেলো সন্ধ্যামালতীর ঝোপের চারপাশে নেমে যেত। বাবা হয়তো তখন কাছারি ঘরে জাল সাবানের মামলার আসামিকে তার প্রস্তুত দ্রব্য দেখে ধমকাচ্ছেন, ‘এত ভাল জাল সাবান বানাতে পারো, নিজেরা একটা নতুন নামে সাবান বানাতে পারো না, ঝক্কি-ঝামেলা থাকবে না, ফ্যাক্টরির মালিক হবে, ব্যাঙ্ক টাকা ধার দেবে, সমাজে সম্মান হবে আর তার বদলে এখন জেল খাটতে যাচ্ছ।’ গ্যাবার্ভিনের সাফারি-স্যুট পরিহিত, চুলে কলপ দেওয়া এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বাবার সামনে বসেছিলেন। বাবা যখন বললেন, ‘বাংলা নাম দাও, বাংলাদেশের নামী ধলেশ্বরী, যমুনা..., তিনি হাত জোড় করে বললেন, ‘স্যার, বাংলা নামে কোনও সাবান বিক্রি হবে না বাজারে।’

আরেকবার, এর অনেক দিন আগে, সেটা পাকিস্তানি আমল। দেখেছিলাম, বাবা কাছারি ঘরে ডাকাতির মামলার আসামিদের সঙ্গে কথা বলছেন, হঠাৎ নথি দেখে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে পরান মণ্ডল কে?’

সাদা হাফ শার্ট গায়ে, ধুতি দু’ ভাঁজ করে পরা কুচকুচে কালো, লম্বা, স্বাস্থ্যবান যুবকটি সামনেই বসে ছিল, সে বলল, ‘আমি।’ বাবা তাঁকে ধমকিয়ে বললেন, ‘তোমার এত সাহস, তুমি হিন্দুর ছেলে, পাকিস্তানে ডাকাতি করো।’

কিন্তু এত সবের মধ্যেও বাবা খেয়াল রাখতেন উপচিয়ে পড়া ভিড় উঠোনের সন্ধ্যামালতীর গাছগুলোর ক্ষতি না করে, মাড়িয়ে না দেয়।

মাঝেমধ্যেই তিনি নিজের চেয়ার থেকে উঠে ঘরবারান্দা পেরিয়ে উঠোনের পাশের সিঁড়িতে এসে দেখতেন, কেউ সন্ধ্যামালতীর গাছগুলো পদদলিত করছে কি না, কোনও ক্ষতি করছে কি না গাছগুলোর। পরে নিজেই সে গাছগুলো সোজা করে দিতেন।

তবে কদাচিৎ এ রকম করতে হত। তখন বাবা বলতেন, ‘সরে যান, সামনের দালানের বারান্দায় গিয়ে বসুন, এখানে ফুলগাছগুলো মাড়াবেন না।’

আসলে সন্ধ্যামালতীর গাছগুলো ছিল আমাদের বাড়ির আত্মা।

অনেক কাল আগের কথা। ইংরেজ আমলের মধ্য সময়ের ব্যাপার। সিপাহি বিদ্রোহের কয়েক বছর পরের ঘটনা।

সিপাহি বিদ্রোহের পরে ইংরেজরা জেলা এবং মহকুমা প্রশাসন গোছানোয় মন দিয়েছিল। আমাদের এলাকায় নবাবি আমলে মহকুমা সদর ছিল আটিয়া নগর।

এখানে নগর মানে গণ্ডগ্রাম। গণ্ডগ্রাম মানে বড় গ্রাম এবং একই সঙ্গে বড় গঞ্জ। কিন্তু সরাসরি জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের অসুবিধা ছিল বলে ইংরেজ কর্মকর্তারা মহকুমা সদর আটিয়া নগর থেকে সরিয়ে আনেন মাইল দশেক উত্তরে।

নতুন জায়গাটায় মহকুমা পত্তনের সুবিধে ছিল। আইল মানে আল, শস্যখেতের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার পথ, সেই টানা আইলের মধ্যে এবং দু’ পাশে উঁচু ডাঙা জমি, খুব বড় বন্যা না হলে বছর বছর ডুবে যায় না। এক লটে কয়েকশো একর জমি। জমির পশ্চিম দিক ধরে বয়ে গেছে ছোট, গ্রাম্য নদী। সেই নদী থেকে খাল কেটে ডাঙা জমির মধ্য দিয়ে নদীর পূর্ব বাঁকের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে, খাল কাটা মাটি দিয়ে ডাঙা জমিকে সমতল করে শহর পত্তন হল, নতুন প্রশাসনিক সদর। আটিয়া নগর থেকে মহকুমা উঠে এল টানা-আইলে, সাহেবি উচ্চারণে যা হল টাঙাইল।

আটিয়ায় কাজীর আদালতে চোখা চাপকান পরে নবাবি আমল থেকে পারসিক ভাষায় সওয়াল-জবাব করে এসেছেন আমার পূর্বপুরুষেরা। তাঁরা ছিলেন ভকিল, উকিলের আগের পর্যায়।

আমার প্রপিতামহের আমলে আটিয়া থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মহকুমা সদর উঠে এল টাঙাইলে। জীবিকার প্রয়োজনে ভকিল ভদ্রলোককে আটিয়ার পুরনো বাসাবাড়ি গুটিয়ে নতুন সদরে চলে আসতে হয়।

নতুন জায়গা, ফাঁকা এলাকা, অনেকটা জমি কিনে তিনি নতুন বাড়ি বানালেন। আটিয়ার বাড়ি নিয়ে, তাঁর মনের মধ্যে নিশ্চয় খুব মমত্ববোধ ছিল, সে বাড়ি যেমন ছিল, তালাবন্ধ করে ঠিক তেমনই রেখে দিয়েছিলেন। শুধু সে বাড়ির বাইরের উঠোন থেকে এক গুচ্ছ সন্ধ্যামালতী ফুলের চারা এনে নতুন বাড়ির বাইরের আর ভেতরের উঠোনে লাগিয়েছিলেন।

সেই সন্ধ্যামালতী ফুলের গাছগুলো এক শতাব্দী আমাদের পাকাবাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়ে গেল। খুব আদর যত্ন, সেবা নয়, একা একাই ভালবেসে থেকে গেল।

এই ফুলগাছগুলি সম্পর্কে বাবার ছিল গভীর দুর্বলতা। শেষ জীবনে একটা পুরো কবিতার বই লিখে ফেললেন ‘সন্ধ্যামালতী’ নাম দিয়ে।

আমাদের সেই বাড়িঘর এখন আর কিছু নেই, সন্ধ্যামালতী ফুলগাছগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে। শুধু ওই ফুলের নামে একটি কীটদষ্ট কাব্যগ্রন্থ আমাদের বাড়িতে যত্ন করে রাখা আছে। কেউ পড়ে না, শুধু আমি মাঝে মাঝে পাতা উল্টিয়ে দেখি।

[দুই]

আমার মা ও সন্ধ্যামালতী

সন্ধ্যামালতী ফুল নিয়ে আমার মায়ের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম, বোধহয় একটু দুঃখের।

আমার মা জন্মেছিলেন গত শতকের দ্বিতীয় দশকের গোড়ায়। মায়ের যখন সাত-আট বছর বয়েস, মানে আজ থেকে প্রায় আশি-নব্বুই বছর আগেকার ঘটনা বলছি।

আশ্চর্য সব নামের গ্রাম ছিল আমাদের এলাকায়। তার মধ্যে একটি গ্রামের নাম হল আকুরটাকুর। সেই আকুরটাকুর গ্রামে থাকতেন মায়ের এক মাসি। সরযূমাসি, মার কাছে তাঁর নাম শুনেছি, আমি তাঁকে কখনও দেখিনি। তিনি ছিলেন এক অভাগী। দুটি কন্যা সুদ্ধ তাঁকে ফেলে তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। একান্নবর্তী পরিবারে স্বামী নিরুদ্দেশ হওয়ার পুরো দায়িত্ব তাঁর ওপরে বর্তায়। নিতান্ত অনিচ্ছায় তিনি দুই কন্যা নিয়ে ভিন্ন হয়ে যান, শ্বশুরবাড়ির মধ্যেই এক প্রান্তে তিনি আলাদা সংসার পাতেন। এজমালি সংসারের কিছু ভাগ চাষের ফসল, সারা বছরে দু’বার আউস আর রবিশস্য আর সেই সঙ্গে নিজের হাতে কাঠের চড়কায় বোনা সুতো বেচে সামান্য আয়, তাই দিয়ে কোনও ক্রমে তিনি দুই মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতেন। এদের মধ্যে একজন আমার মায়ের থেকে মাস ছয়েকের বড়, অন্যজন মাস দুয়েকের ছোট। দুজনেই মার প্রিয় বান্ধবী।

একবার আমার দিদিমা আমার মাকে নিয়ে আকুরটাকুরে বোনের বাড়িতে এসেছিলেন। দিদিমা ভাগ্যবতী ছিলেন। আমার মাতামহ সামান্য অবস্থা থেকে পাটের ব্যবসায় ধনী হয়েছিলেন। মায়ের মাসির বাড়ির উঠোনে এক ঝাঁক সন্ধ্যামালতী ফুলের গাছ ছিল। সন্ধ্যামালতী ফুলের যা নিয়ম সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে ফুটে ওঠে, সেই নিয়মেই আকুরটাকুরের সেই দরিদ্র কুটিরের সন্ধ্যামালতী ফুলগুলো ফুটত। মায়ের মাসির কড়া নিয়ম ছিল, সন্ধ্যাবেলা ফুলগুলো না ফোটা পর্যন্ত মেয়েদের খাবার দিতেন না।

যখন সব সন্ধ্যামালতী ফুল ফুটে যেত, তখন তিনি তাঁর মেয়েদের এবং বোনঝিকে খেতে দিতেন। সেটাই ছিল একযোগে বৈকালিক এবং সান্ধ্য আহার।

মার কাছে গল্প শুনেছি, সারাদিন ছুটোছুটির পর খুব খিদে লাগত বলে, মা আর তাঁর দুই মাসতুতো বোন দুপুরের পর থেকেই সন্ধ্যামালতীর কুঁড়িগুলো একটা একটা করে ছাড়িয়ে ফুল ফোটাতেন। যাতে ফুল ফুটে গেছে বলে মাসি তাড়াতাড়ি খেতে দেন।

এ প্রয়াসে তেমন সুফল পাওয়া যেত না। কারণ সন্ধ্যামালতীর অধিকাংশ কুঁড়ি ফোটানোর আগেই সত্যিকারের সন্ধ্যা হয়ে যেত। আসল কুঁড়িগুলি তখন নিজে নিজেই ফুটত। আর মাসিও সব ফুল ফোটবার আগে খেতে দিতেন না।

[তিন]

আমি ও সন্ধ্যামালতী

এক পাশে ছোট পাহাড়ের সারি, যার চূড়া পর্যন্ত লোকালয় রয়েছে। আর এক পাশে মহাসাগরের খাঁড়ি বা লেগুন। এই দুয়ের মাঝখানে ছবির মতো সুন্দর ছোট এক বিদেশি শহর।

মার্কিন মুলুকের এই শহর, বিদ্যানগরী রূপে ভুবনবিদিত। এই শহরেরই এক বাসাবাড়িতে এই পড়ন্ত বয়সে বছরের কয়েক মাস ছেলের কাছে কাটাই।

নিস্তরঙ্গ শান্ত জীবন। কোথাও কোনও উত্তেজনা নেই, কেউ আলোড়িত করে না, বিড়ম্বিত করে না।

প্রথম যে বার আসি, সে বারই লক্ষ করেছিলাম, বাড়ির উঠোনে রাস্তার ধার ঘেঁষে সন্ধ্যামালতীর সারি। কোনও রকম যত্ন নেই, দেখার কেউ নেই। সন্ধ্যাবেলায় আপন মনে একা একাই ফুটে ওঠে।

একদিন ছেলেকে জিজ্ঞাসা করি, ‘এই ফুলগাছগুলো কে লাগাল।’ ছেলে বলল, ‘আমি লাগাইনি।’ তার পর যোগ করল, ‘হয়তো কোনওকালে এ বাড়ির অন্য কোনও ভাড়াটে লাগিয়েছিল। তারপর আগাছার মতো হয়ে গেছে।’

আমি নিজে বিকেলে বাড়ির বারান্দার পর্চে একটা হালকা বেতের চেয়ার নিয়ে বসি। প্রত্যেক দিনই বসি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসে। বারান্দার ও পাশে আকাশ, আকাশের পশ্চিম প্রান্তে সন্ধ্যাতারা ফুটে ওঠে। একটা একটা করে সন্ধ্যামালতীও ফুটে ওঠে পর্চের নীচে। ফুলের ঝোপে।

সন্ধ্যাতারার দিকে তাকিয়ে থাকি। সন্ধ্যামালতীর ফুটে ওঠা দেখি। কবে সেই কৈশোরকালে ইংরেজি কবিতা পড়েছিলাম ‘সূর্যাস্ত, সন্ধ্যাতারা এবং আমার জন্য একটা পরিষ্কার ডাক’, সেই ডাক, পৃথিবী পেরিয়ে যাবার সেই ডাক, সে বয়সে তো প্রায় পৌঁছে গেছি।

অন্ধকারে ফুটে ওঠা সন্ধ্যামালতীগুলির দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট দেখতে পাই বালিকা বয়সিনী আমার মা একটা একটা করে ফুলগুলো ফোটাচ্ছে। বাবাকে দেখতে পাই কাছারি ঘরের সামনে কাত হয়ে পড়ে থাকা সন্ধ্যামালতীর গাছ পাটকাঠি পুঁতে তার সঙ্গে দড়ি বেঁধে সোজা করে দিচ্ছেন।

আসন্ন তন্দ্রায় আরও বহু দূরে দেখতে পাই, নদীর পাড়ের ডাঙা রাস্তা দিয়ে একটা গরুর গাড়ি আসছে। আটিয়া থেকে নতুন সদরে। সেই গাড়িটায় গোড়া সুদ্ধ যত্ন করে ওপড়ানো সন্ধ্যামালতীর গাছ গোছা করে বাঁধা আছে। ওগুলো কাল সকালে আমাদের নতুন বাড়ির উঠোনে লাগানো হবে।

তারপর কত দিন সেই সন্ধ্যামালতীর উঠোন বিস্তৃত হয়ে গেছে হাজার হাজার মাইল দূরে এই সমুদ্র পারে অন্য যুগের অন্য এক বাসা বাড়ির প্রাঙ্গণে।

দিন যায়, হাওয়া ওঠে, সন্ধ্যামালতীর ফুল দুলে ওঠে রাতের বাতাসে। কত ঝড়, অন্ধকার, মেঘ, রোদবৃষ্টি। এরই মধ্যে কখন ছেলে এসে ডাকে, ‘বাবা, বিছানায় চলো।’

1 টি মন্তব্য:

  1. কতো সহজ, সরল। আন্তরিকতার দিগন্ত বিদারি বিস্তৃতি।
    -সাধন দাস।

    উত্তরমুছুন