সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

বাবলু ভট্টাচার্য-এর গল্প : জোনাকিরা নক্ষত্র হতে পারে না

জীবনের রহস্য-টহস্য, ভূপতি কাছে এখন শেষ পাতায় চলে আসা ডিটেকটিভ উপন্যাসের মতই উদঘাটিত প্রায়। মনে হয় যা কিছু পাবার ছিল, হয়তো তা পাওয়া হয়ে গেছে।

এই বয়সটাই ভালো না। কেমন একটা স্থিতির ভাব এসে যায়। যৌবনের দুরন্ত দিনগুলির স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসে। বুকের ভেতরে প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের উত্তাপ তেমন করে আর অনুভূত হয় না। বরং একটা আরামের কোমল-ওম অঘ্রাণের রাতে গায়ে হাল্কা চাদরের মত জড়িয়ে থাকে। উঠে দৌড়তে ইচ্ছে করে না আর, বসে থাকতেই ভালো লাগে।


এইসব ভাবনাগুলো সব সময় মনে আসে না। কিন্তু কখনো-সখনো রাতে টেবিলে কনুই রেখে কোন বইয়ের পাতায় ঝাপসা হয়ে আসা চোখে ভূপতি দেখতে পায়, তার বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে যাচ্ছে। দেখতে পায়, নিজের ছায়া শরীরকে পিছনে ফেলে সামনে ছুটে চলেছে, পিছিয়ে পড়ছে ভূপতি, ক্রমশ, ক্রমশ...। শেষ পর্যন্ত ছায়াটা যখন চোখের আড়ালে চলে যাবে, তখনো কি ভূপতি এই রকম থাকবে? না কি সেখানেই সব শেষ?

আপাত-স্থিতির প্রশান্তি আর প্রসন্নতা সেই মুহূর্তে ওলট-পালট হয়ে যায়। সাদা আকাশে কালো মেঘের মতো গ্লানি আর ব্যর্থতা-বোধ গুমরে ওঠে। মনে হয়, কত কিছু করার ছিলো, কত প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতি―কিছুই করা হল না। সব কিছুই অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। আর? আর এ সব কিছুরই জন্যে দায়ী সে―তাঁর অকর্মণ্যতা, বিচ্যুতি, মুঢ়তা...।

চোখ থেকে চশমা খুলে টেবিলের উপর রাখে ভূপতি। ঘড়িতে রাত প্রায় বারোটা। অনেকক্ষণ হলো বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্যদিন হলে ভূপতিও এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়তো। এই ঘরে আলো জ্বলত না। শুধু দক্ষিণ দিকে রান্না ঘোরের উল্টো দিকের ছোট ঘরটায় মিটমিটে একটা আলো ছাড়া সারা বাড়িটাই ঘুমের অন্ধকারে তলিয়ে থাকতো। ওই একটা ঘরেই শুধু সারারাত আলো জ্বলে। ঘরটাতে তার বাবা থাকেন।

গোটা ঘরটাতে আসবাব বলতে একটা সামান্য চৌকি আর তার ওপরে একটা মলিন বিছানা। মশারিটাও প্রায় সারাক্ষণই টাঙানো থাকে। বাবা বিছানা ছেড়ে কোথাও যান না, যেতে পারেন না। বার্ধক্য, ব্যাধি―এইসব মিলে-ঝুলে এখন তিনি নিতান্তই স্থবির।

স্থিতি মানেই তো মৃত্যু! সুখ মানেও কি তাই!―ভূপতি ভাবে।

কলেজ জীবনের ঝোড়ো দিনগুলো কি রকম স্বপ্ন মনে হয়। কোথায় গেলো হাতের মুঠোর মধ্যে জগতটাকে চটকে অন্য রকম কিছু করে ফেলার সেই পাগলামি? অবিরাম সংঘর্ষ, শুধু সংঘর্ষ? নিজের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, পৃথিবীর সঙ্গে? ভিসুভিয়াসের ধারে নির্মিত সেই নগরী কবে কখন ভেঙে-চুড়ে সমতল হয়ে গেছে, ভূপতি তার কিছুই টের পায়নি। আশ্চর্য! এতটুকু বেদনাবোধও সেজন্যে তার বুকের ভেতর জমা হয়ে নেই আজ। কেন, কেমন করে এ রকম হলো?

একি পঁয়তাল্লিশের অভিশাপ? একেই কি বলে কালস্রোত? বইয়ের ওপর চোখ রেখেও ভূপতি অন্যমনস্ক হয়ে যায়।

সেই অন্যমনস্কতার ভেতরেও টের পায় মানুষটা জেগে আছে। এক-জানালার খুপরি ঘরটার ভেতরে সর্বক্ষণ বিছানা পাতা যার―সেই বৃদ্ধ মানুষটা। ভূপতি জানে, সারারাতই জেগে থাকে। সারাদিন সারারাত জেগেই থাকে নাকি? কেন জেগে থাকে? ঘুম আসে না বলে, নাকি বার্ধক্যের সঙ্গি সেই ইনসমনিয়া?

ভাবতে ভাবতে হঠাৎই কি রিকম মনে হল, ভূপতি উঠে দাঁড়াল। মশারির ভেতরে তাকিয়ে দেখতে পেল নিঃসারে ঘুমাচ্ছে সবাই। পাশের ঘরে ছেলে অপুর নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আলতো পায়ে সেই খুপরি ঘরটার দিকে পা বাড়াল ভূপতি। এই নিশুতি রাতে, যখন বাইরে গাছ-পালারাও ঘুমিয়ে পড়ে, তখন বৃদ্ধ মানুষ জেগে থাকে কেন? জেগে থেকে কিসের পাহাদারি করে? বৃদ্ধের কাছ থেকে গভীর, গূঢ় এই তত্ত্ব জেনে নেবে সে আজ। পঁয়তাল্লিশের পরে পরেই তো পঞ্চাশ, পঞ্চাশ পেরুলেই ষাট। তারপরেই তিন মাথা এক―জাগরণ, প্রতীক্ষা, সময়ের মালা জপ করে যাওয়া শুধু।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অল্প আলোয় মশারির ভেতরে তাকাল ভূপতি। বসে থাকা একটা ছায়া মূর্তি আবছা আলোয় চোখের সামনে ভেসে উঠল। বাবা বলে চেনাই যায় না। মাথার চুলগুলি ধপধপে সাদা। সারা মুখে বহু দিনের না কামানো পাকা দাড়ি। দু’কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে অগোছালো নোংরা বিছানার ওপরে উবু হয়ে বসে আছে মানুষটা।

বিছানার ওপাশ থেকে একটা চাপা দুর্গন্ধ আসছে। হয়তো বহুক্ষণ আগে করা পেচ্ছাপ শুকিয়ে আসার গন্ধ। কেউ জল ঢেলে দিয়ে যায়নি। সেই দুর্গন্ধ উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেলো ভূপতি। দু’হাতে মশারিটা তুলে ধরতে গিয়েও কি ভেবে হাত নামিয়ে নিলো। তারপর মশারির একপ্রান্তে মুখ এনে ফিসফিস করে ডাকল, বাবা―

কোন উত্তর নেই। মানুষটা ফিরেও তাকাল না।

ভূপতি অপেক্ষা করল। কি ব্যাপার? তবে কি সত্যি সত্যি মানুষটা ঘুমোচ্ছে নাকি? তা হলে এতদিন ভূপতি যা দেখে এসেছে, ভেবে এসেছে সবই তার চোখের ভুল, মনের ভুল। মশারির গায়ে প্রায় মুখটাকে লাগিয়ে গলাটাকে আর একটু চড়িয়ে ভূপতি আবার ডাকল, বাবা―

ধীরে ধীরে এবারে ভাবলেশহীন চোখ দু’টো তুলে মূর্তিটা তার দিকে তাকাল।

―হুঁ?

ভূপতির ভুল হয়নি। ঠিকই দেখেছে সে। চল্লিশের পরে চোখে ছানি পড়তে শুরু করলেও দেখার শক্তি অনেক বেড়ে যায়। অভিজ্ঞতার অণুবীক্ষণ নিরন্তর কাজ করে চলে। যেদিকেই তাকানো যায় দৃষ্টিটা অস্থি-মজ্জা ভেদ করে একেবারে অভ্যন্তরে চলে যায়। সব কিছু দু’চোখের জমিতে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভূপতির ভুল হয়নি। আসলে বাবা কানে খাটো। একবারের ডাকে তাই বুঝতে পারেন নি। আর এই মধ্যরাতে অপরিচ্ছন্ন এই শয়ন ঘরে কেউ যে আসতে পারে, এ ধারণার স্বপক্ষে কারণও কিছু নেই।

খুব গোপনে কোন কথা শুধানোর মত ফিসফিস করে ভূপতি বলল― ঘুমোও না কেন তুমি, বাবা?

ভূপতি লক্ষ্য করেনি, মশারির ভেতরে একটা জোনাকি ঢুকেছিল। হয়তো এতক্ষণ কোন একটা কোণের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছিল পোকাটা। বাতাসে শব্দের তরঙ্গ হতেই বোধ হয় সচকিত হয়ে সেটা এবার মশারির ভেতরে পাক খেতে লাগল। মশারির দেয়ালে, ছাদে ধাক্কা খেতে খেতে জোনাকিটা একবার ভূপতি আর সেই বৃদ্ধ মানুষটার সামনে এসে আধো-অন্ধকার জায়গাটুকু আলকিত করে দিয়ে পলকে আবার একধারে উড়ে চলে গেলো। সেই ক্ষণিক দ্যুতিতে ভূপতির নজর এড়ালো না, বৃদ্ধ তারই দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ভূপতির মনে হল, সেই চোখ দু’টো তাকে ফিসফিস করে বলতে চাইছে―ঘুম আসে না রে বাবা। আমার মতো ব্যর্থ মানুষের ঘুম কি কখনো আসে? তোমরা তো জান, বাবা হয়ে তোমাদের জন্যে কতটুকু করতে পেরেছি আমি।

ঘাড় নাড়ল ভূপতি। ঠিক কথা। সত্যি কথা। টাকার জন্যেই তার ডাক্তারি পড়া হয়নি। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবার বদলে সে গেলো টাইপ আর শর্টহ্যান্ডের কমার্শিয়াল কলেজে ভর্তি হতে। একটা যাচ্ছেতাই ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলো বোনটার।

কেন যে হঠাৎই এই সময় নিজের ছেলেমেয়ের কথা মনে পড়ে গেলো ভূপতির। সে বুঝতে পারল না। ব্যাঙ্কের একাউকান্টে কত টাকা জমা আছে? সামনের বছর অপু যদি বিবিএ-তে ভর্তি হতে পারে, ভূপতি কি পারবে তার কোর্সটা শেষ করাতে। দুর্গার জন্যে অবশ্য এখনো যথেষ্ট সময় আছে। কিন্তু তার যখন ২০-২২ হবে, ভূপতি কি তখন পরিষ্কার গলায় বলতে পারবে, আমি তৈরি। ভালো ছেলের সন্ধান পেলেই দুর্গার বিয়ে দিয়ে দেব।

বুকের বাঁ দিকে সেই ক্ষীণ একটা ব্যথা ঝিঁঝিঁর ডাকের মত আবার বেজে উঠতে শুনতে পেল ভূপতি। কিছুদিন থেকে মাঝে মাঝেই এই অনুভূতিটা আজকাল তার হচ্ছে। অনেকবার ভেবেছে, একবার ডাক্তার দেখিয়ে নেবে কিন্তু যদি কিছুই না হয়। খামাকা ডাক্তারের ফিসটা বেরিয়ে যাবে। দেখাই যাক না আরও কটা দিন।

দুর্গার বিয়ে পর্যন্ত তাকে সুস্থ থাকতেইই হবে। বাবা যা পারেন নি, ভূপতিকে তা পারতেই হবে। একটা ভালো ছেলের সঙ্গে দুর্গার বিয়ে দিতে হবে। বিয়ের পরেও তার মুখে যাতে সকলে হাসির আভাস দেখতে পায়, যেমন করেই হোক ভূপতিকে তার ব্যবস্থা করতেই হবে।

কাল থেকে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেবে ভূপতি। অফিসে টিফিনের দরকার নেই। এই বয়সে খাওয়া-দাওয়া যত কমানো যায় ততই শরীরের জন্যে ভালো। তবু বুকের ভিতরে সেই ঝিঁঝিঁ পোকাটা ডেকেই যায়। ভূপতি আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় না। ভীষণ একটা অস্থিরতা ভিতরটাকে তোলপাড় করে দেয়। তার মুখ ঘামে ভরে যায়। শেষকালে ফিসফিস করে গোপনে কথা ভাঙার মত করে বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে ভূপতি জানায়, বাবা, আমার পঁয়তাল্লিশ হল। বুকের বাঁ পাশে প্রায়ই চিনচিন করে একটা ব্যথা। ব্যাঙ্ক একাউন্টে সে রকম কোন ব্যালান্স নেই। অপুর বিবিএ। দুর্গার বিয়ে দিতে খুব বেশি দেরি নেই। বাবা, তুমি যেখানে থেমে গিয়েছিলে, আমি তার থেকে এক কদমও এগিয়ে যেতে পারি নি। বাবা...

জোনাকিটা আবার ফিরে এসেছে। উদাম পাছায় সবুজাভ আলো জ্বলছে, নিভছে। আলো এতোটা বেশি নয় যে, সব কিছু পরিষ্কার দেখা যাবে। দূরে, বহু দূরে ধাই করে জ্বলে থাকলেও সবকিছু জ্যোৎন্সায় স্নান করে ওঠবে। জোনাকিটা আবার ভূপতি আর বৃদ্ধের মাঝখানের শূন্য আঁধারে পলাতক হতেই ভূপতি দেখতে পেল বৃদ্ধের মাথাটা ঝুলে রয়েছে, চোখ দু’টো আধ-বোজা।

ধা করে রক্ত চড়ে যায় ভূপতির মাথায়। কি―ঘুমানো হচ্ছে? ঘুমের ভান? তোমাকে চিনতে আমার বাকি আছে ভেবেছ? পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে সহ্য করে আসছি তোমাকে। তোমার জন্যে ডাক্তার না হয়ে, কেরানি হয়ে ধুঁকতে হচ্ছে আমাকে। তোমার জন্যে বোনের চোখের জল কোনদিন শুকালো না। তোমার জন্যে আজও এই পলেস্তারাখসা পোড়ো বাড়িটাতেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হচ্ছে আমাদের, তোমার জন্যেই...

হঠাৎ থেমে গেলো ভূপতি। এইবার তার অবাক হবার পালা। কি আশ্চর্য! নোংরা মশারি ফেলা বিছানাটার ভেতরে দু’হাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে উবু হয়ে থাকা সাদা মাথার এই বৃদ্ধের চোখ দু’টো যে অবিকল তারই মত, ঘাড়ের ওপরে লাগানো মুখটার সঙ্গে আয়নায় দেখা নিজের মুখের অদ্ভুত সাদৃশ্য। গোটা চেহারাটাই যেন বলে দিচ্ছে লোকটা আর কেউ নয়, ভূপতি। ভূপতি বসু।

আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর পরে নোংরা এই বিছানাটাকে আকড়ে ধরে পড়ে আছে উবু হয়ে। তার মশারির ভিতরে আটকে পড়া একটা জোনাকি পাগলের মত দেয়ালে, ছাদে ঠোক্কর খেতে খেতে উড়ে বেড়াচ্ছে আর এমনি এক মাঝ রাতে গূঢ় গম্ভীর এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এসে তারই সামনে হাটু গেঁড়ে বসে আছে তারই সন্তান পঁয়তাল্লিশ বছরের আশুতোষ।



লেখক পরিচিতি :
বাবলু ভট্টাচার্য
চলচ্চিত্রকার। গল্পকার। অনুবাদক।

চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন কলকাতায়, পরে ইউরোপে। প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের সহকারি হিসেবে সরাসরি চলচ্চিত্রে আগমন। যমুনার বালুচরের মানুষদের জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘চরাচর’, চিত্রশিল্পী এস.এম সুলতান ও সংগীতশিল্পী কলিম শরাফী’র জীবনচিত্র তার অনন্য কাজ। প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি টেলিভিশনের জন্যে নাটক রচনা এবং পরিচালনা করেছেন অনেক। এখন তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরিতে মগ্ন।

যশোর জেলার মনিরামপুরের পাড়ালা গ্রামে তার জন্ম। ছেলেবেলার গভীর অন্বেষা থেকে তিনি পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরে বেরিয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন