সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প : আগস্টের অপচ্ছায়া

অনুবাদক : অমিতাভ রায়


দুপুরের একটু আগে আমরা আরেসো পৌঁছে গেলাম। দুর্গটা খুঁজে বের করতেই দু’ঘণ্টা লেগে গেল। দুর্গটা কিনেছেন ভেনেজুয়েলার কথাশিল্পী মিগুয়েল ওতেরো সিলভা। তুসকানির গ্রামাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত প্রান্তে শান্ত মনোরম পরিবেশে রেঁনেসা আমলের এই দুর্গের অবস্থান। আগস্টের গোড়ার দিকের গুমোট গরমে এক জমজমাট রবিবার। রাস্তায় পর্যটকদের ভিড়। সামান্য কিছু চেনা-জানা লোক খুঁজে পাওয়াও সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর গাড়িতে ফিরে এলাম।
শহর ছেড়ে একটা রাস্তা ধরলাম। দু’পাশে সাইপ্রাস গাছের সারি। কিন্তু কোথাও কোনও দিকচিহ্ন নেই। জনৈকা বৃদ্ধা হাঁসের যত্নআত্তি করছিলেন। তিনিই দুর্গটার অবস্থান নির্দিষ্টভাবে বলতে পারলেন। বিদায় জানাবার আগে তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমাদের ওই দুর্গে রাত কাটাবার কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা। শুধু মধ্যাহ্নভোজই আমাদের উদ্দেশ্য বলে তাঁকে জানালাম। আসলে সেটাই ছিল আমাদের প্রাথমিক অভিপ্রায়। বৃদ্ধা বললেন, “সেই ভালো। ওটা তো প্রেতপুরী”

গিন্নি আর আমি বৃদ্ধার সরল বিশ্বাসে হেসে উঠলাম। কারণ, দিনেদুপুরে আমরা কেউই অশরীরী কোনও কিছুতেই বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমাদের দু’ছেলে, যাদের একজনের বয়স সাত, আরেকজনের ন’ বছর, দারুণ মজা পেয়ে গেল। রক্তমাংসের শরীরে কোনও প্রেতের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যাবে এই ভাবনায় ওরা মজে গেল।

মিগুয়েল ওতেরো সিলভা অনবদ্য অতিথিপরায়ণ। যেমন দারুণ পান-রসিক তেমনি ভালো লেখক। মধ্যাহ্নভোজের আসরে এমন সব খাদ্য সাজিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, যেগুলোকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব। আমরা দেরিতে পৌঁছেছি। খাবার টেবিলে বসার আগে দুর্গের ভেতরটা দেখার সময় হল না। তবে বাইরের দিক থেকে দুর্গটার চেহারা ভয় পাওয়ার মত নয়। ফুলে ছাওয়া খোলা উঠোনে বসে খাবার খেতে খেতে গোটা শহরটার দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠল। মন থেকে যে কোনও অস্বস্তি উবে যাওয়ার জন্য এমন দৃশ্য যথেষ্ট। এই পাহাড়ের মধ্যে ভিড় করে থাকা বাড়িগুলোয় যেখানে নব্বই হাজার লোকের জায়গাই হয় না সেখানে কত অমর প্রতিভার জন্ম হয়েছে বিশ্বাস করা কঠিন। মিগুয়েল ওতেরো সিলভা তাঁর ক্যারিবিয়ান কায়দায় ঠাট্টা ছুঁড়ে দিয়ে বললেন,--‘তাঁদের মধ্যে কেউই আরেসোর সবচেয়ে নামী নয়’।

তিনি বললেন,--‘তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন,--লুদোভিকো’। শুধুই নাম। পরিবারের কোনও পদবি নেই। লুদোভিকো শিল্পকলা আর যুদ্ধের মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর যন্ত্রণা দিয়ে গড়া এই দুর্গ। খাবার পুরো সময়টুকু ধরে লুদোভিকোর কথা শোনালেন মিগুয়েল। লুদোভিকোর বিপুল ক্ষমতা, বিপন্ন প্রেম, ভয়ংকর মৃত্যুর কথাই আমাদের শোনালেন। তিনি আমাদের শোনালেন কেমন করে হৃদয়ের ক্ষণিক উন্মাদনায় লুদোভিকো তাঁর প্রেমিকাকে সেই বিছানার ওপর ছুরি মেরেছিলেন যেখানে তার একটু আগেই তাঁরা শরীর নিয়ে প্রেমোন্মত্ত ছিলেন। পোষা হিংস্র ও লড়িয়ে কুকুরটাকে নিজের ওপর লেলিয়ে দিয়ে লুদোভিকো কীভাবে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলেন,--সে কাহিনীও শোনা হল। বেশ গুরুত্ব দিয়ে মিগুয়েল আমাদের আশ্বস্ত করলেন যে মাঝরাতের পর বাড়িটার অন্ধকার ধরে লুদোভিকোর প্রেত হেঁটে-চলে বেড়িয়ে নিজের প্রেমের পায়শ্চিত্তের শ্রান্তি খুঁজে বেড়ায়।

দুর্গটা সত্যিই বিশাল আর আলো-আঁধারিতে বিষাদময়। কিন্তু ভরা পেটে দিনের আলোয়, খোশ মেজাজে লুদোভিকোর এই কাহিনীটিকে মিগুয়েলের অতিথি আপ্যায়নের অনেক আকর্ষণীয় উপাদানের একটা বলে মনে হল। খাবার পর একটু ঝিমিয়ে নিয়ে কোনও আসন্ন বিপদের আশঙ্কা ছাড়াই ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বিরাশিটা ঘর। মালিক পরম্পরায় সেগুলোর কিছু পরিবর্তন হয়েছে। দোতলাটা সম্পূর্ণ সংস্কার করিয়েছেন মিগুয়েল। আধুনিক কায়দায় শোবার ঘর। মার্বেল পাথরের মেঝে। বিশ্রাম, বসা ও শোয়ার জন্য এক-একটা আলাদা ঘর। ব্যায়ামের সরঞ্জামও আছে। এর ওপর আছে চমৎকার ফুলে সাজানো খোলামেলা একটা আঙিনা যেখানে বসে আমরা মধ্যাহ্নভোজ সেরেছি।

তিনতলাটাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। শতাব্দীর পর শতাব্দী। ছিরিছাঁদহীন ঘরের পর ঘরে বহুযুগের পুরনো আসবাবপত্র নিয়তির ভরসায় পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে। একদম ওপরতলায় একটা ঘর যেমন ছিল ঠিক তেমনিভাবেই সংরক্ষিত রয়েছে। লুদোভিকোর শোয়ার ঘরটা পরিদর্শনের কথা সময় ভুলে গেছে।

এ এক অলীক মুহূর্ত। বিছানাটা পড়ে আছে। সোনালি সুতোয় বোনা পর্দা। চাদরের বিস্ময়কর কারুকাজ আত্মনিবেদিত প্রেমিকের শুকনো রক্ত এখনও জমাট হয়ে আছে। ফায়ার প্লেসের ছাইগুলো জমে বরফ হয়ে গেছে। শেষ জ্বালানি কাঠটাও পাথরে রূপান্তরিত। অস্ত্রাগারে অস্ত্রের ঝলকানি। সোনার ফ্রেমে বাঁধানো ফ্লোরেনটিনের কোনও এক মহান শিল্পীর আঁকা এক বিষণ্ণ নাইটের তেলরঙা ছবিটা দেওয়ালে ঝুলছে। ছবিটা এখনও সমকালকে পেরিয়ে আসতে পারেনি। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল,---শোয়ার ঘরের সর্বত্র তাজা স্টবেরির অলৌকিক গন্ধ।

তুসকানির গ্রীষ্মের দিনগুলো দীর্ঘ আর অলস। রাত প্রায় ন’টা পর্যন্ত দিগন্ত দেখা যায়। পাঁচটা বাজার পর দুর্গের মধ্যে হাঁটা শেষ হল। তারপর সানফ্রান্সেস্কো গির্জার দেওয়ালে পিয়েরো দেইয়া ফ্রান্সেস্কোর আঁকা ছবি দেখার জন্য মিগুয়েল জোরাজুরি করতে লাগল। তারও পরে আঙিনার মধ্যে একটা গাছের তলায় বসে কফি খেতে খেতে কেটে গেল আরও কিছুটা সময়। অবশেষে স্যুটকেস নিতে ফিরে এসে দেখি, আমাদের জন্য খাবার সাজানো রয়েছে। সান্ধ্যভোজে আমরা বসে গেলাম।

খাওয়াদাওয়া সারবার সময় রক্তিম সন্ধ্যাকাশে শুধু একটি তারা ভাসছিল। ছেলেরা রান্নাঘর থেকে মশাল জ্বালিয়ে ওপরতলায় অন্ধকার খুঁজতে চলল। টেবিলে বসে আমরা সিঁড়িতে বুনো ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। শোকার্ত দরজার শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিবর্ণ ঘরের মধ্য থেকে সহর্ষ চিৎকারে লুদোভিকোকে ডাকা হচ্ছে। রাতে এখানো ঘুমানোর কুচিন্তা যাদের মাথায় খেলেছে এটা তাদেরই চিৎকার। কিন্তু ওদের বারণ করার মতো সামাজিক সাহসিকতা আমরা দেখাতে পারলাম না।

যা ভেবেছিলাম তার উলটো হল। ঘুমটা ভালোই হল। দোতলার একটা শোয়ার ঘরে আমি আর আমার স্ত্রী, ছেলেরা পাশের ঘরে। দুটো ঘরকেই আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। কোনও ঘরেই বিষণ্ন ব্যাপারটা নেই। ঘুমের জন্য প্রতীক্ষা করতে করতে ঘড়ির কাঁটার বারোটা নিদ্রাহীন আঘাত শুনতে লাগলাম। হাঁস পালন করা সেই বৃদ্ধার ভয়ংকর সাবধানবানী আমার মনে পড়ল। কিন্তু আমরা এত ক্লান্ত যে চট করে এক গভীর এবং ছেদহীন ঘুমে ঢলে পড়লাম। সকাল সাতটার পর ঘুম থেকে উঠে দেখি জানালায় লতিয়ে ওঠা আঙুরলতায় সূর্য ঝলমল করছে। পাশ থেকে আমার স্ত্রী নি্রীহভাবে শান্ত স্বরে মন্তব্য করল,--‘কী বোকামি’। আমি নিজের মনে বললাম,--‘এই যুগে, এই জগতে,--এখনও অশরীরীতে বিশ্বাস!’



ঠিক তখনই তাজা স্ট্রবেরির গন্ধে চমকে উঠলাম। শেষ কাঠের টুকরোটা পাথর হয়ে গেছে। এক বিষণ্ন নাইটের সোনার ফ্রেমে বাঁধানো ছবি তিন শতাব্দী পেরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। গতরাতে যেখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তোতলার শোয়ার ঘরে, আমরা সেখানে নেই। আমরা পড়ে আছি লুদোভিকোর শোয়ার ঘরের শামিয়ানার নিচে। জানালায় ধুলো ভরা পর্দা, আর আমরা লুদোভিকোর অভিশপ্ত বিছানায়, এখনও গরম রক্তে ভেজা চাদরের ওপর পড়ে আছি।

1 টি মন্তব্য:

  1. প্লেন একটা নেমন্তন্নর বিবরণ শেষ প্যারাগ্রাফে আন্তর্জাতিক গল্পের মাত্রায় আছড়ে পড়লো।

    উত্তরমুছুন