বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

মল্লিকা ধরের গল্প : অনিঃশেষ

১।

সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে যাই, গভীর নীল ঢেউয়ে জ্বলজ্বল করে কীসের যেন দীপ্তি। আর, আবহসঙ্গীতের মতন অবিরল ঢেউপতনের শব্দ। আসে আর যায়, ওঠে আর পড়ে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতন, বিরতি নেই, ক্লান্তি নেই, অনন্ত কাল উঠছে আর পড়ছে।


বাতিঘরের আলো এসে পড়ে চোখে, দূরে বাঁকের কাছে মিনারের মতন বাতিঘর। নগ্ন নির্জন একটি উত্তোলিত হাতের মতন আকাশে উঁচিয়ে আছে, মুঠোতে আলো। আলো ঘুরে যায়, দূর সমুদ্রের জল আলোকিত হয়ে উঠে, চকমকে আলো দূর থেকে দূরে কুয়াশা হয়ে মিলিয়ে যায়। কাছের ডুবো পাহাড়টি কালচে স্তূপের মতন দেখায় রাত্রির রহস্যভরা আলোয়। অথচ এই শিলাটি দিনের বেলায় কত অন্যরকম। সবুজ একটি পাহাড়, বর্ষার জলে সবুজতর। ছোটো কুন্ডে খেলা করে রঙীন মাছেরা। কত লতাপল্লব, কত শঙ্খকঙ্কণ।

বাতিঘরের আলো আরো ঘোরে, আরো দূরের দিকে আলো ফেলে, এইবারে এদিকে শুধু নক্ষত্রের আলো। আবিল আলোর চেয়ে একদম অন্যরকম, শুদ্ধ পরমজ্যোতির মতন, তিরতিরে রহস্যময়।

অগভীর জলে নেমে পড়ে হেঁটে যাই সবুজে ঢাকা শিলাটির দিকে, ওখানে যেন কিছু আছে, কিছু আহ্বান, কিছু নির্দেশ। খালি পা জলের ছোঁয়া পেয়ে খুশী হয়ে ওঠে, সে খুশী উঠে আসে মেরুশিরা বেয়ে উপরে। সালোয়ারের পায়ের গোছের কাছটা ভিজে গেলো। আহা, ও তো কত তৃষ্ণার্ত ছিলো এতক্ষণ! শিরশিরে জল শ্যাওলা জলজলতা সাবধানে পেরিয়ে আসি। এইবারে চড়াই বেয়ে উপরে উঠতে হবে।

উঠতে উঠতে একটু হাঁপ ধরে, নিঃশ্বাস ঘনতর হয়, ঢালে গা এলিয়ে বসে পড়ি। তাড়া তো নেই কিছু। অদ্ভুত একটা অনুভূতি উঠে আসে তলপেট থেকে। সেখানে হাত রাখি, তিরতিরে কম্পন। সে এখন ঐ জলের মাছেদের মতন ছোট্টো, অমনই প্রায় দেখতেও। ওর লেজের ছোট্টো ছোট্টো খুশি-খুশি ঝাপটা আমাকে বিস্মৃত বহু বহু পূর্ব জন্মে নিয়ে যায়।

তীক্ষ্ণ শিসধ্বনির মতন শক্তিশালী শব্দ তরঙ্গের আহ্বান এসে লাগতো মহাসমুদ্রের বিশাল বিস্তার পেরিয়ে। পৃথিবীজোড়া যোগাযোগ-ব্যবস্থা ছিলো আমাদের, এইসব ছোট্টো ছোট্টো চিপভরা সেলফোন আর মস্ত মস্ত উঁচু টাওয়ার
তৈরীর বহু বহু যুগ আগেই। হাতডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে সাঁতরে যেতাম, ঠিক ও যেদিক থেকে আসতো তার উল্টোদিকে। এ খেলাটা আমাদের খুব পছন্দের ছিলো। ওর মসৃণ সুন্দর গা আর মিটমিটে দু'খানা চোখ...

আমরা সাঁতরাতে সাঁতরাতে পার হয়ে যাচ্ছিলাম ছায়াবৃত্ত, দিন থেকে
রাত্রির মধ্যে ঢুকে পড়ছিলাম। সন্ধ্যার সমুদ্রজোড়া অগণিত তিমিদের গান। অদ্ভুৎ সংকেতধ্বনির মতন। তীক্ষ্ণ অথচ কী সুরময়!

সে কাছিয়ে এসেছিলো আরেকটু, ঘন হয়ে সাঁতরাতে সাঁতরাতে সহসা ঠোক্কর লাগিয়েছিলো হাতডানার নীচে। আরো ঘন রাত্রির মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে সন্ধ্যাভ্রচ্ছটা মিলিয়ে এলো, আকাশ জুড়ে তারাদের জ্যোতি আবেষ্টনীর মধ্যে অর্ধনিদ্রামগ্ন দুখানা জলচর জীব আমরা সাঁতরাচ্ছিলাম, ক্রমে আমাদের গতি ধীর থেকে ধীরতর হয়ে গেছিলো।

ঘুমেলা রাত্রিসমুদ্র কিন্তু অক্লান্ত গান গেয়ে যাচ্ছিলো, যেমন গায়।
তীব্র আবেশে আমরা ঘন হচ্ছিলাম, ভেসে যেতে যেতে।


২।

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম এবারে, বিশ্রাম নেওয়া হয়ে গেছে। এইবারে উঠতে পারবো মনে হচ্ছে। উঠতে উঠতে আরো আরো দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। ঘূর্ণমান বাতিঘরের আলো এসে পড়ছে চোখ মুখ ও চুলের অন্ধকারে।

পায়ের গোছের কাছ থেকে শিরশিরে একটা পুলকবেদনা উঠে আসে। সামনে অল্প ঝুঁকে পড়ে উঠতে থাকি আস্তে আস্তে। উপমের গলা শুনতে পাই, অল্প রাগী অল্প খুশি বেশ কিছুটা উদ্ধত গলার স্বর উপমের। শেষ কবে শুনেছিলাম? মাসখানেক আগে? ও ফোন করেছিলো ওর নেভাল বেস থেকে। খুব সকাল ছিলো তখন। সারা পাড়া ঘুমিয়ে। আমিও বিছানা ছাড়িনি তখনো। বালিশের পাশে সেলফোনটা সুন্দর সুরে ডেকেছিলো। ঐ রিঙ-টোন উপমেরই পছন্দ।

আহ, কেন এখানে এসেছি এই এত রাতে? কেন রাতসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে? আমি নিজে নাকি ঐ ভেতরের ও আমাকে টেনে আনে এখানে? উপম যখন কাছে ছিলো, দু'জনে আসতাম প্রত্যেক বিকেলে। হাত ধরাধরি করে উঠতাম বাচ্চা বাচ্চা দু'খানা ছেলেমেয়ের মতন। উপরে পৌঁছে আমাদের খোলা গলার হাসি সমুদ্রবাতাসে উড়ে যেতো সূর্যাস্তলোকের দিকে, ঐ দূর পশ্চিমে যেখানে সমুদ্র রাঙা হয়ে থাকতো সন্ধ্যারঙে।

সহসা উপমের জন্য মনকেমন করতে থাকে। কিন্তু ওকে ফোন করা যাবে না, বারণ। কেবল ওই ফোন করতে পারে আমায়। কী করছে এখন উপম? প্রচন্ড রোদে ছোটাছুটি করে কাজ করছে? কাজের ফাঁকে কফি খাচ্ছে? আমার কথা ভাবছে? ওর সময়ের সঙ্গে আমার সময়ের প্রায় ঘন্টা এগারোর তফাৎ।

সময়ের কথা ভাবতেই আবার বসে পড়ি, এবারে একটা অবশ করা ক্লান্তি আমার দেহ ঢেকে দিতে থাকে। খুব ঘুম পাচ্ছে, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। হঠাৎ কী হলো?

ঘুরে যায় দিন ও রাত্রি, গ্রীষ্ম শীত, নক্ষত্ররাশি পাক খায় খগোলকে।
প্রতিদিন প্রতিরাতে একটু একটু করে সরে যায়। বদলে যায় ঋতু। কাল মাপার পথ দেখিয়ে দেয়। নইলে ... নইলে কেমন করেই বা বুঝতাম পেরিয়ে গেল মাস, যদি না ভরভরন্ত চাঁদ বারে বারে ক্ষয়ে গিয়ে বারে বারে পূর্ণ হতো? সূর্য সরে না যেতো রাশি থেকে রাশিতে? প্রচেতা নক্ষত্রধারা কল্প থেকে কল্পান্তে নতুন ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলে না উঠতো? পর্যাবৃত্ত গতি না থাকলে সময়ের কী অর্থ
হতো?

কেমন করে, কোন্‌ পথে এলাম এখানে? চোখ মেলে দেখেছিলাম এই আশ্চর্য অচেনা উপত্যকা! চারিদিকে সবুজ নীল সাদা পাহাড়ের দল ঘিরে রেখেছে গোল উপত্যকাটি। একদিকে শুধু একটু ফাঁকা, ঘোর কালো গভীর গিরিখাত সেদিকে। বইছে ঘূর্ণীজল, আর রয়েছে প্রায় চিরস্থায়ী কুয়াশা সেখানে।

ওদিকেই নাকি পৃথিবীর শেষ, তারপরে স্বর্গের দেবতাদের দেশ।
উপত্যকাবাসী উপজাতিটির বাদামী রঙের মানুষগুলোর ঘোর বিশ্বাস এই। প্রতি বছর সুদিনের শুরুতে তাই দেবতাকে পশু উৎসর্গ করা হয় ঐ গিরিখাতে পশুগুলিকে ছেড়ে দিয়ে। ঘূর্ণীজল আর কুয়াশা পেরিয়ে একদিন নাকি ওরা পৌঁছে যাবে দেবতাদের কাছে।

উপজাতির মধ্যে মড়ক লেগেছে, শিশু-পুরুষ-মেয়েদের সংখ্যা কমে গেছে, বৃদ্ধা যাদুকরী দিলারা তাই খুব চিন্তিত। সে রোজ একটানা ক্লান্ত সাপখেলানো সুরে সমস্ত সন্ধ্যা ও রাত্রির অর্ধেক জুড়ে অদৃশ্য দেবতার কাছে প্রার্থনা জানায় যেন তিনি অনেক মানুষ পাঠান, জন্ম যেন মৃত্যুকে ছাপিয়ে যায়। মহামারীর কোনো ওষুধ কি পাওয়া যাবে না অরণ্যে? সে নিজে মরে যাবার আগেই কি কোনোভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না? বহুকাল আগেও তো একবার লেগেছিলো মড়ক, কিন্তু পাওয়া গেলো জরিবুটি খুঁজে। নিজের নির্জন গিরিবাস থেকে উল্টোদিকের সবুজ পাহাড়টির দিকে তাকায় দিলারা, ওখানে সর্পযাদুকর তিহুক...

দিলারার জরাজীর্ণ জরায়ুতে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে না ফোঁটা কুঁড়িরা, দিলারা আর তিহুকের না জন্মানো শিশুরা... তারা হয়তো নিয়ে আসতে পারতো প্রতিষেধক, ঐ বোকা যাদুকর কিছুতেই হারিয়ে দিতে পারলো না দিলারাকে। এখন অর সময় নেই, তিহুক হয়তো এখন সত্যি সত্যি হারিয়ে দেবে দিলারাকে, কিন্তু দিলারা... তার প্লাবনজল শুকিয়ে গেছে কবে, পড়ে অছে ফুটিফাটা মাটি শুধু।

বড়ো হয়ে গেছে তার বেঁচে থাকা সন্তানেরা, গুনতি করা যায় না এত ছেলেমেয়ে, তাদের নিজেদের এখন ছেলেমেয়েভরা সংসার। হঠাৎ সেইসব কলকাকলিভরা সুখসংসারে কোথা থেকে এসে পড়েছে মৃত্যুর করাল ডানার অমোঘ ছায়া।

তিহুক কিন্তু একা, এত অজস্র বৎসর ধরে একা একা, কঠোর কুমার। কেন? কেন তিহুক কারুকেনিলো না?

দিলারা লঘু হস্তস্পর্শে চমকে ওঠে, পিছনে ফেরে, তারাভরা আকাশের পশ্চাৎপটের উপরে তিহুকের দেহরেখা দেখতে পায় তীক্ষ্ণচক্ষু যাদুকরী । তার অগ্নিহীন গুহার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তিহুক। দিলারা উঠে দাঁড়ায়, বলে, " যাদুকর! কী বললো তোমার গণনা? পাওয়া যাবে জরিবুটি? ঠেকানো যাবে মড়ক?"

তিহুকের চোখ দু'খানা জ্বলজ্বল করে অন্ধকারে, লুব্ধক তারার আলোয়- ফিসফিস করে সে বলে, "কেন জিজ্ঞেস করছো দিলারা? এ জাত মরবে। নিঃশেষ হয়ে যাবে। পাপে ভরে গেছে এই দুনিয়া, এদের মরে যাওয়াই ভালো। তারপরে ফের নতুন সৃষ্টি..."

দিলারার গলা কাঁপে, "তিহুক! এসব কী বলছো? এরা সব মরে যাবে? আমার ছেলেমেয়েরা..."

তিহুক অত্যন্ত তিক্ত গলায় বলে, "স্বার্থপর মানুষ কেবল নিজেরটা বাঁচাতে চায়। কিন্তু ঈশ্বর সেকথা ভাবেন না। তার কী এসে যায় ক'টা মানুষ মরলে? "

"তিহুক! তুমি জানো ওষুধ। এই মহামারীর ওষুধ। জেনেও বলবে না কেন? "

দিলারা দু'হাতে মুখ ঢাকে। তিহুক এগিয়ে গিয়ে ওর বাহু চেপে ধরে নির্মম ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, "প্রতিশোধ! দিলারা, প্রতিশোধ!"

দিলারা শিথিল হয়ে গেছে তিহুকের স্পর্শে, এই প্রথম তিহুক ওকে সত্যি সত্যি স্পর্শ করেছে। তিহুকের বলিষ্ঠ দুটো হাতের মধ্যে নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে দিলারার শীর্ণ বাহুদ্বয়। দু'হাতে মুখ ঢেকে তিরতির করে কাঁপছে সে। সে শিহরিত হচ্ছে নিবিড় বেদনার পুলকে, বুকে তীব্র ব্যথা, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।

ও ফিরে যেতে চায় ওর তারুণ্যে , প্রথম পুষ্পাঞ্জলি হারিয়ে গেছে সময়ের কোন্‌ আড়ালে, স্মৃতিতেও নেই কে প্রথম নিয়েছিলো ওকে। অথবা ও নিয়েছিলো কাকে। কিন্তু কেউ কেউ কেউ দিতে পারেনি এই অনুভূতি, কেউ না। মনে হলো যেন এতকাল পশুর মতন সঙ্গম করে গেছে সে, আরো অসংখ্য পশুর মতন অনুভূতিহীন। অথচ সে জানতো মানুষটি আছে কোথাও, কাছে অথবা দূরে। বড়ো দেরি হয়ে গেলো।

কম্পিত দু'হাতে তিহুকের গলা জড়িয়ে ধরে ওর মুখের কাছে মুখ এনে কাঁদতে কাঁদতে দিলারা বলে, "বোকা বোকা বোকা। প্রকান্ড একটা বোকা তুমি তিহুক। কেন কেন কেন তুমি সেদিন পরাজয় মেনে নিয়ে চলে গেলে? কেন ফিরে এলে না? কেন আর একবার বললে না?"

তৃষ্ণার্তের মতন দিলারার মুখে মুখ রাখে তিহুক। চোখ বন্ধ করে সুখের প্রতিটি পলাতক মুহূর্তকে স্মৃতিতে গেঁথে গেঁথে রাখে দিলারা। দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে তিহুককে। তারপরে মুখ গুঁজে দেয় ওর বুকে, আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভিজিয়ে দিতে থাকে ওর বুক।

উপত্যকাঘেরা পাহাড়ের গিরিখাতে তখন প্রবেশ করছিলো বহিরাগতেরা। নতুন দেশের নতুন মানুষেরা। তাদের পরনে পশুচর্ম বা গাছের ছাল নয়, কাপড়! তাদের মুখ নরম, তাদের রঙ হাল্কা বাদামী, তাদের চুলে আলো ঠিকরে পড়ে।

সেই অদ্ভুত কালরাত্রির শেষে তিহুক পর্বতশৃঙ্গ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলো। ওর শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবার পরে আর ওর একবিন্দু বাঁচার ইচ্ছে ছিলো না মৃত্যুভয়ভীত সেই উপত্যকায়।

দিলারা কিন্তু পারেনি, আশা তাকে সবলে পিছনে টেনে রাখলো। উড়ে যাওয়া শরীরের উপরে-নীচে নীল শূন্যতার সঙ্গমের অসহ্য রতিসুখের অতি কাছ থেকে ফিরে এলো দিলারা। দৃঢ়হস্ত আশা তার দুই কানে ফিসফিসিয়ে বলছিলো তখনো তার বাকী আছে জীবনের কিছু ঋণ।

চোখে মেললাম, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম এই সমুদ্রশিলায়। দূরের বাতিঘর দূর সমুদ্রে আলো ফেলছে, ঐ পুবে কৃষ্ণপক্ষের খন্ডচন্দ্র উঠে আসছে। এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম? শিরশিরে নোনা সমুদ্রবাতাস মুখে ছোঁয়া দিয়ে গেলো।

উঠে এলাম চূড়ায়, অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম, ঐ দিগন্তের আড়ালে কোথায় কতদূরে ফটফটে দিনের আলোয় হয়তো কাজে ব্যস্ত আমার উপম।

নোনতা অশ্রুতে ভরে গেল চোখ। কেন ওকে কাছে পেতে এত ইচ্ছে করছে? আমার দু'খানা হাত অবলম্বহীন শ্বেতকপোতীর মতন খুঁজছে ওর হাতের উষ্ণ আশ্রয়নীড়!

উপরে তাকালাম, মাথার উপরে জ্বলজ্বল করছে চিত্রা তারা। এই তারাকে নাকি চীনদেশে বলে দীর্ঘ আয়ুর দেবতা। শাউ শিং। বনের মতন সবুজ পোশাক পরা একমুখ মেঘের মতন সাদা দাড়ি শাউশিংএর। মুখে লেগে আছে হাসি। ওঁর গল্পটি ভারী সুন্দর। জীবনদেবতা শাউশিং আর রাত্রিনীল পোশাক পরা মৃত্যুদেবতা পিতাউ পৃথিবীর সমস্ত জাতকজাতিকাদের জীবন নিয়ে দাবা খেলেন। সেই খেলার ফলাফল অনুযায়ী মানুষের আয়ু ঠিক হয়।

একজন স্বল্পায়ু তরুণ একবার মৃত্যুর মাত্র কিছু দিন আগে বনে শিকার করতে গিয়ে পথ হারিয়ে গভীর অরণ্যে ক্রীড়ারত দুই বৃদ্ধের দেখা পান। তাঁরাই ছিলেন শাউশিং আর পিতাউ।তরুণের কাকুতি মিনতিতে গলে গিয়ে এনারা ওর আয়ু ১৯ থেকে উল্টিয়ে ৯১ করে দেন !

হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন মনে জাগলো। আচ্ছা, যে আসছে সে কেমন হবে? সুন্দর? সুস্থসবল? দীর্ঘায়ু?


৩।

গ্রীষ্মের চাঁদের আলোয় চকচক করছিলো আগন্তুকদের মুখ। চুল আর চোখ। বহুদূরের গ্রীষ্মদগ্ধ অনাবৃষ্টিপীড়িত তৃণভূমি থেকে সবুজতর ভূমির সন্ধানে ওরা এসে ঢুকেছিলো ঐ পাহাড়ের মালায় ঘেরা উপত্যকাটিতে।

ওদের সঙ্গে অনেক পশু ছিলো, তৃণভোজী পালিত পশু,যারা ওদের খাদ্য ও আবরণ জোগায়। আর ছিলো পালিত কিছু মাংসাশী পশু যারা পাহারা দিয়ে রক্ষা করে পশুধন। হাতে ছিলো দীর্ঘ বর্শা, কাঁধে তীরভরা তূণ ও ধনুক। পরনে হাল্কা কাপড়। ওরা ছিলো সতর্ক ও সদাপ্রস্তুত। নিজেদের তাঁবু টাবু খাটিয়ে চারিদিকে আগুন জ্বেলে পাহারা বন্দোবস্ত করে তবে ওরা নিদ্রা গেল।

উপত্যকার মড়কলাগা হতাবশিষ্ট উপজাতিটি ওদের তেমন কোনো বাধাই দিতে পারেনি। ওদের কাছে ভালো ভালো ভেষজ ছিলো, মহামারীর প্রতিষেধক। ওরা রোগগ্রস্ত এই অসহায় মানুষদেরও চিকিৎসা করলো, ক্রীতদাস পাবে বলে।

উপত্যকাবাসী এদের বিশ্বাস ছিলো হাল্কা বাদামী উজ্জ্বলচক্ষু ঐ মানুষেরা আকাশ থেকে আসা মানুষ। নইলে ওদের মুখ এত নরম কেন? ওদের রঙ এত ফর্সা কেন? কেন ওদের কারু কারু চোখে আকাশের রঙ?

তাই মহামারী দূর করে ওরা যখন পুরোপুরি দখল নিয়ে বসেছে, শিশু পরিণতবয়স্ক নির্বিশেষে এদের প্রায় সকলকেই দাসদাসীতে পরিণত করেছে, অত্যাচার করে তীব্র জয়ের আনন্দ পয়েছে, তখনো এই সরল বিশ্বাসীরা ওদের
আকাশের মানুষ ভেবে গেছে। চাবুক খেয়েও বিশ্বাসে চিড় ধরেনি, দু'হাত দিয়ে রক্ত মুছতে মুছতে নীরবে চলে গেছে কাজ করতে।

প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিলো এক তীব্র গ্রীষ্মবেলায়, উপত্যকার গাঢ় বাদামী একটি তরুণ এক শীর্ণ বৃদ্ধকে প্রহারোদ্যত প্রভুর হাতের চাবুক কেড়ে নিয়ে বলেছিলো, "কেন মারছো বুড়ো মানুষকে? ও মরে যাবে মারলে। ওর বদলে আমায় মারো।"

কেড়ে নেওয়া চাবুকটা প্রভুর হাতে দিয়ে নিজের পিঠের অল্পছিন্ন আবরণ মুক্ত করে দিয়ে বলেছিলো, " এসো, শুরু করো। ও বেচারাকে ছেড়ে দাও।" ছেলেটার পিঠ শুকনো চাবুকদাগে ভর্তি ছিলো, কোনো কোনোটা আধাশুকনো।

অত্যন্ত অবাক হয়ে প্রভু জিজ্ঞেস করেছিলো," এই বুড়ো তোমার কেউ হয়, তোমার আত্মীয়? ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে মার খেতে চাইছো?"

ছেলেটা মাথা নেড়ে বললো, " না, আমার আত্মীয় না। না, তাই বা কীকরে বলি? আমাদেরই তো একজন।"

আর, বুড়ো মানুষটি যে শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে গেল, সে এত অবাক হয়েছিলো যে কোনো কথাই বলতে পারেনি, খুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো শুধু।

প্রভুর হাত থেকে খসে পড়ে গেছিলো চাবুকটা, ছেলেটার হাত ধরে সে বলেছিলো," তোমাকে রোজ দেখি কাজ করতে, কিন্তু তোমার নাম তো জানিনা। কী বলে ডাকবো?"

তরুণ এরকম আশাই করেনি, অবাক হয়ে বলেছিলো," আমার নাম? আমার নাম তিন্দুক। কিন্তু ফেলে দিলে যে ওটা! মারবে না?"

"না,না, তোমায়...কেন শুধু শুধু... কিছু দোষ নেই তো তোমার... কিছু মনে না করো যদি, আমার ঘরে আসবে? এই এত দুপুর, এত গরম, নিশ্চয় তেষ্টা পেয়েছে তোমার। জল আর একটু খাবার দেবো তোমায়। তোমার কথা একটু শুনবো, আসবে?"

তিন্দুক একটু হাসলো, বললো," চলো। আমার কথা কী আর শুনবে? কিছুই তেমন নেই। তবু চলো। সত্যি বড্ড তেষ্টা পেয়েছিলো।"

তিন্দুকের হাত ধরে প্রভু নিজের তাঁবুতে নিয়ে যান। জল আর মিষ্টি দেন। তিন্দুক আগে জলটুকু খেয়ে এমন করে ধন্যবাদ দেয় যে প্রভু বিস্মিত, এতটা সভ্য ব্যবহার যেন তিনি ক্রীতদাসের কাছ থেকে আশাই করেননি!

শান্তমুখ দুঃখী ছেলেটি তার ক্রীতদাস, এটা মনে হতেই কেমন যেন লাগে ওনার। "তিন্দুক, কে কে আছে তোমার বাড়ীতে?"

তিন্দুক মাথা নীচু করে থাকে, কিছু বলে না। হঠাৎ প্রভুর ঘাড়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে ওঠে, এই ছেলেটা তার অধীনস্থ, একে তিনি এইবারে যা খুশী করতে পারেন এটা মনে হতেই।

তিনি ওর বাহুর কাছটা জোরে চেপে ধরে বলেন,"কথার উত্তর দাও না কেন? শাস্তি পেতে চাও?" অন্য হাতে চাবুক উঠে আসে।

চাবুক খেতে খেতে শিথিল হয়ে গড়িয়ে পড়ে যায় তিন্দুক, দুর্বল বিষন্ন গলায় বলে, "আমার কেউ নেই, একলা থাকি, তাই কিছু বলিনি। কী বলবো? মাঝে মাঝে তোমার লোকেরা খুব মারে, খুব বেশী কেটে গেলে বুড়ী দিলারার কাছে যাই। ও দয়া করে ওষুধ দেয়। তাড়াতাড়ি ঘা সেরে যায়, ওর ওষুধ ভালো।"

প্রভু ওকে ধরে তোলেন, "তোমার কেউ নেই? তোমার মা বাবা ভাই বোন?"

শুকনো গলায় তিন্দুক খাবি খেয়ে খেয়ে বলে," কেউ নেই। বাড়ীতে একলা গিয়ে পড়ে থাকি মেঝেতে, অন্যেরা বাড়ীতে গিয়ে খাবার পায়, আমি বাইরে থেকেই খেয়ে দেয়ে বাড়ী গিয়ে শুধু ঘুমাই। কতদিন কিছু খাইও না। এখানে মহামারী অসুখের সময় আমি অরণ্যে শিকারে গেছিলাম, ফিরে এসে ... ফিরে এসে দেখি সবাই .... ঘুমিয়ে গেছে একদম চিরদিনের জন্য। মাটি খুঁড়ে সমাধি দিয়েছিলাম।" তিন্দুক ডানহাত তুলে চোখ মোছে।

অত্যাচারী লোকটি তিন্দুকের কপালে হাত বুলিয়ে বলেন," আমি জানতাম না। তোমার কষ্ট হলো। মাফ করো। উত্তর দিচ্ছ না দেখে রাগ হলো। "

"না, ঠিক আছে। তাতে কী হয়েছে? " তিন্দুক কেমন অদ্ভুত অভিমানী গলায় বলে।

লোকটি তিন্দুককে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, "আমার এখানে থাকো। কেউ নেই বললে তোমার। আমার এই এত তাঁবু, এত পশু, এত দাসদাসী, স্ত্রী আছেন বেশ ক'জন, কন্যারা আছে,কিন্তু কোনো ছেলে নেই আমার। তুমি থাকবে আমার সঙ্গে? তোমায় খুব ভালো লেগেছে আমার, তোমার খুব সাহস আর অনেক শক্তি। তোমার মনটি অতুলনীয়। এর আগে আমি কাউকে দেখিনি অন্যকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে বিপন্ন করে। তুমি প্রথম।"

তিন্দুক কিন্তু কুঁকড়ে যায়, বলে," আমার আচার-বিচার যে অন্যরকম। তোমার এখানে থাকলে হয়তো তা পালন করা সম্ভব হবে না। তুমি হয়তো রেগে যাবে, ব্যঙ্গ করবে। আমি যে অসভ্য ক্রীতদাস, তাই আমার দূরে থাকাই তো ভালো।"

খুব ব্যথিত হয়ে প্রভু বললেন, "কেন ব্যঙ্গ করবো? তুমি স্বাধীনভাবে তোমার আচার-বিচার পালন করবে। "

কুঁকড়ে গিয়ে তিন্দুক বলে," তুমি যদি চাও, আমি কাজের পরে এসে তোমার সেবা করবো। কিন্তু সারারাত থাকতে বোলো না। জানি, তোমরা আমাদের অসভ্য বলো, আমাদের ভালো চোখে দেখো না। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা আর কারুর ক্ষতি করিনা।"

তিন্দুক কিছুতেই রাতে থাকতে রাজী হয় না। প্রভুও জোর করতে পারেন না, ভালোবেসে ফেলেছেন যে! তাকে কি আর জোর করা যায়?


৪।

ঘুম ভেঙে গেল। সকালের নরম রাঙা আলো পড়েছে জানালা দিয়ে দেয়ালে। চৌকো আলোকিত অংশটায় কী যে খুশী!

টুং টুং করে বেজে ওঠে বালিশের পাশে রাখা মুঠাফোন, কানে তুলে নিই চট করে। ওপারে উপম! ও কীকরে জানলো কাল রাতে মনখারাপ করেছিলো ওর জন্য?

বেশ অনেকক্ষণ কথা হলো। ওর ছুটি পেতে আরো মাস পাঁচেক। ততদিনে নতুন মানুষটির পৃথিবীর আলো দেখার সময় হয়ে যাবে।

নদীর ধারার মতন বয়ে যায় কাল। আমাদের ঘড়িতে অবিরত টিকটিকটিক টিক....ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ে উড়ে ঋতু বদলে যেতে থাকে।

এখন অতদূর হাঁটতে রীতিমতন কষ্ট হয় এতখানি ভার নিয়ে। তবু প্রত্যেক বিকেলে না গিয়ে পারিনে। ছোট্টো ছোট্টো ধাক্কায় ভেতরের সে ঠেলতে থাকে আমায়। ও কী করে বোঝে? ও কি দেখতে পায় সমুদ্র? ওর অন্যরকম বিশ্বে ? কেমন সমুদ্রগর্জন শোনে ও?

কাপড় সরিয়ে হাত রাখি সাবধানে। তিরতির করছে। ওটা কি ওর হৃদপিন্ড? মুখ? হাতের মুঠি?

উপম এলো অবশেষে। এতদিনের তৃষ্ণায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা পরস্পরের উপরে। ওষ্ঠাধর ছিঁড়ে যেতে লাগলো তীব্র আগ্রাসী চুম্বনে, তীব্র কান্নার ঝড়ে বেসমাল হয়ে পড়লাম, বুকের উপরে ওর হাত চেপে রেখে কাঁদতে লাগলাম।

পেটের উপরে কান রেখে ঘুমিয়ে পড়লো বেচারা উপম। খুব খুব ক্লান্তি এসে গ্রাস করে ফেললো আমাকেও। গাঢ়তর পর্দার মতন ঢেকে দিলো চেতনা।

তিন্দুক আর রুশার বিবাহ। সে এক অদ্ভুত বিবাহ। তিন্দুক রুশাকে নিয়ে পালাচ্ছিলো। রুশা ওর বস্ত্রের মধ্যে লুকানো লৌহ অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলো তিন্দুকের বুকে। রক্তে ভেসে যেতে যেতেও তিন্দুকের দৌড়ের গতি কমলো না।

অবশেষে পাহাড়ে পৌঁছে রুশাকে নামিয়ে তিন্দুক দু'হাত ভরে গোলা আবীরের মতন রক্ত রুশার সোনালী চুলে মাখিয়ে দিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে গেলো। বাকশক্তিহীন হয়ে বসে রইলো রুশা। অস্তগামী চাঁদের আলোয় ওর নীল চোখে জল চকচক করে উঠলো।

সমুদ্রের ভীমকল্লোলে জেগে উঠলাম আমি আর উপম একই সঙ্গে। এমন ভয়াবহ গর্জন আগে আর শুনিনি। উপম আমাকে দুইবাহুতে তুলে নিয়ে বললো, "উর্বী, পালাতে হবে, সমুদ্র ছুটে আসছে। উঁচু জায়গায় ছুটে পালাতে হবে। এসব ডুবে যাবে এখনি।"

অর্ধচেতনায় সমুদ্রদুলুনির মধ্যে ওর গলা জড়িয়ে রাখি দুই হাতে। ভেতরে অনুভব করি তীব্র ধাক্কা, সে ছটফট করছে। ভয়ে নাকি উত্তেজনায়?

আমরা উঁচু পাথুরে টিলায় এসে পৌঁছই। প্রলয় তরঙ্গ আছড়ে পড়ছে পাড়ে পাড়ে, দূর থেকে অদ্ভুত শব্দ সমষ্টি এসে পৌঁছচ্ছে ক্লান্ত চেতনায়।

টিলার সবচেয়ে উঁচু অংশে একটি শক্ত গুল্মের নীচে উপম শুইয়ে দিলো আমায়। নিজেও ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়লো পাশে।

দিলারার গুহায় সকাল হচ্ছে। রুশা আর তিন্দুক সেখানে পৌঁছেছে হাত ধরাধরি করে। তিন্দুকের চোখেমুখে ঝর্ণার জলের ঝাপটা দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিলো রুশা। উদয়োন্মুখ ঊষার আলোয় গুহার বাইরে বেরিয়ে এসে দিলারা দেখলো রুশার টলটলে চোখে আকাশ। আকাশের কন্যা সে, ঐ দিগন্তকুহেলীর পারে একদিন নেমেছিলো পৃথিবীকে ভালোবেসে।

দু'জনকে বিবাহ দেবার সময় দিলারা রুশার মুখখানি দুইহাতে ধরে বলে, "তুমি সত্যি আকাশ থেকে এসেছ?"

রুশা মাথা নাড়ে, বলে, "না,না, দূরের দেশ থেকে।"

দিলারা বলে, "তাহলে তোমার চোখে কেন আকাশ? আমার চোখে তো নেই?"

রুশা অস্ফুটে কী যেন বললো, দিলারা শুনতে পায় না।

ঘুম ভেঙে গেল। উপম নারকেল পেড়ে এনেছে টিলার ওধারের গাছ থেকে। পাথরের ফলা দিয়ে খোসা ছাড়িয়ে পাথরে ঠুকে ঠুকে ভেঙে জল দিলো মুখে। আহ, শান্তি। এত তৃষ্ণার্ত ছিলাম বুঝতে পারিনি।

চারিদিক জলে জলময়। মাঝেখানে দ্বীপের মতন একটু জায়গার উপরে আমরা দু'জন। পৃথিবী জুড়ে কী অবস্থা? কিছুই জানিনা, কোনো খবরই নেই।

পরস্পরের হাতে হাত রেখে শুয়ে থাকি দু'জন। সহসা জলভাঙার শব্দ, সে বাইরে আসতে চাইছে। তীব্র যন্ত্রনায় দেহ ছিঁড়ে যেতে থাকে, দু'হাতে এত শক্ত করে উপমের হাত ধরি যে ওর হাত নীল হয়ে ওঠে। "উর্বী উর্বী, প্লীজ, বি স্টেডি। কোনো ভয় নেই। "

দিনের আলো মিলিয়ে আসে যন্ত্রণার প্রহরগুলির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে। নিশ্চেতনার পর্দা এসে সন্ধ্যার মতো অবশ করে দেয়।

নদীর কিনারে দিলারার জটাবাঁধা চুল পলি মেখে জলে দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছে রুশা। ঝিনুক দিয়ে কেটে দিচ্ছে নখ। অবাক হয়ে দেখছে দিলারা, তার সম্মুখে আকাশের কন্যা! এত আলো ঐ আকাশনীল দু'চোখে।

"কেন আমায় সত্যি করে বলো না রুশা, তুমি কি আকাশ থেকে এসেছ? কেমন সে জায়গা?"

রুশা হাসে, সে দিলারাকে বিশ্বাস করাতে পারেনা।

"দিলারা তোমার চোখেও তো আকাশ! তুমি কি আকাশ থেকে এসেছ?"

বিষন্ন দুঃখীর মতন দিলারা বলে, "কই আমার চোখে আকাশ? আমার চোখ তো কালো, তোমার মতন নীল তো নয়!"

দৃশ্যটা মিলিয়ে যায়। তারপরে দেখি শেষরাত্রের অন্ধকারে ঘুমন্ত দিলারাকে ঠেলে তুলছে রুশা, "দিলারা, দিলারা, ওঠো ওঠো। "

-"কী হলো?" চমকে জেগে ওঠে দিলারা।

রুশা ওকে গুহার বাইরে এনে তারায় ভরা আকাশের নীচে দাঁড় করিয়ে বলে, "কে বলেছে তোমার চোখে আকাশ নেই? এবারে বলো তুমি কোথা থেকে এসেছ।"

দিলারা তারার আলোয় স্বপ্নকন্যার সম্মুখে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট অনুভব করে তার ও তিহুকের অনাগত শিশুরা খিলখিল করে খেলে বেড়াচ্ছে তিন্দুক রুশার উঠানে, তাদের চোখে টলটলে আকাশ।

মন্ত্র পড়ে রুশাকে সর্বস্ব সমর্পণ করে দিলারা ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাজ শেষ হয়ে গেছে।

ভোররাত্রে নিশ্চেতনা কেটে যায়। তীব্র চিৎকারে আঁধার ভেদ করে বেরিয়ে আসে ভবিষ্যতের পৃথিবী, তার চোখে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে আকাশ। ধবল দুগ্ধধারে ঢেকে যেতে থাকে পাথর, গুল্মকান্ড ও মাটি। সন্তানের তৃষ্ণার্ত
মুখ এসে থামে দুগ্ধধারায়।

প্রলয় পরের পৃথিবীতে হে উপম, বহন করে নিয়ে যাও এই আত্মা, এই যুগাতীত রহস্য, এই কাল ভেদ করে আসা মৃত্যুঞ্জয়ী অনিঃশেষ ধারা। উর্বীর ব্যবহৃত জড়দেহ শুয়ে থাক এখানেই, এই গুল্মছায়ায়, সমুদ্রকিনারের পাহাড়ে।

মধুর বাতাস প্রবাহিত হোক, সমুদ্র মধুক্ষরণ করুক, মধুর হোক পৃথিবীর ধূলি। রাত্রি মধুর হোক, মধুময়ী হোক সন্ধ্যা উষা.....

(শেষ)


লেখক পরিচিতিঃ

মল্লিকা ধরের প্রথম উপন্যাস "অশেষ আকাশ",বই আকারে প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে। দ্বিতীয় উপন্যাস "অনন্ত আগামী", বই আকারে প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারীতে। দুটি বইই আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত।
উপন্যাস ছাড়া লেখিকা ছোটোগল্পও লিখে থাকেন। কয়েকটি ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছে "দেশ" পত্রিকায়। প্রকাশিত ছোটোগল্পগুলোর নাম ঊষাসন্ততি, উজানের যাত্রী, উর্বীরূহ, উপত্যকা পার হয়ে।
মুদ্রিত মাধ্যমে ছাড়াও লেখিকা ব্লগে ও অনলাইন পত্রিকাতেও লেখালিখি করেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন