বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর চিরপরিচিত গল্প

আশরাফ উদ্দীন আহমদ

নরেন্দ্রনাথ চোখের সামনে দেখেছেন উদ্বাস্তুদের লড়াইয়ের চিত্র, নিজের পৈতৃক বাড়ি-ঘর ফেলে অথবা ছেড়ে-ছুড়ে দেশান্তর হতে হয় তার স্বজাতির মানুষকে। তাঁর উপন্যাস-গল্পে নিতান্ত বাস্তব ঘটনাগুলো একে একে উঠে এসেছে, কোনো ছল বা রঙ মেশানোর প্রয়োজন হয়নি। গল্প যেন আপনা থেকেই ধরা দিয়েছে তার কলমের ডগায়, আর তাই তিনি জীবনশিল্পী, মানুষের কথাকার।


রবীন্দ্রনাথের হাতে আধুনিক ছোটগল্পের যে ব্যাপ্তি তা এককথায় বিস্ময়কর, জীবন ও জগত সম্পর্কে তার যে চিন্তার বিশালতা, এখানেই রবীন্দ্র সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য, প্রকৃতপক্ষে বাংলা ছোটগল্প নির্মাণে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। পরবর্তী সময়ে বাংলা ছোটগল্পে মানিক-তারা-বিভূতিদের আগমন হলেও রবীন্দ্রগল্পের স্বাদ কোনোভাবেই ভুলে যাওয়ার নয়। তারপর সেই সিঁড়ি বেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় আরেক সাহিত্যিক বাংলা আধুনিক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন মেধা-প্রজ্ঞা দিয়ে, বিশেষ করে বাংলা ছোটগল্পের জগতকে ভরিয়ে দিয়েছেন দু'হাত উজাড় করে, তিনি নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৬-১৯৭৫) জন্ম : সদরদী গ্রাম, ভাঙা থানাধীন ফরিদপুর জেলায়। ম্যাট্রিকুলেশন ভাঙা হাইস্কুল থেকে, ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ এবং বঙ্গবাসী কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। বাল্যকালে লেখালেখির শুরু, অবশ্যই তা কবিতা দিয়ে, কিন্তু কবিতাতেই শুধু আটকে থাকেননি, সংক্ষিপ্ত গ-ি পেরিয়ে বৃহত্তর আঙ্গিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজেকে। 'মৃত্যু ও জীবন' ('দেশ' ১৩৪৩ বাং) প্রকাশ হয়, তখন তার কুড়ি বছর বয়স, আর ছাবি্বশ বছর বয়সে রচিত প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস 'হরিবংশ' (পরবর্তী সময়ে নতুন নামকরণ 'দ্বীপপুঞ্জ') ('দেশ' ১৩৪৯ বাং) এই দুটো লেখা দিয়েই তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন কলকাতার মতো আধুনিক রুচিশীল সাহিত্য মহলে, এবং দৃষ্টি কাড়েন অনেক বাঘা-বাঘা সাহিত্যিকদের।

১৯৪৭ ইং সালে নরেন্দ্রনাথের একত্রিশ বছর বয়সে দেশ ভাগের মতো ঘটনা ঘটে যায়। ছিন্নমূল সহায়-সম্বলহীন মানুষদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন, নিজের জন্য এক চিলতে মাটি, মাথা গোঁজার জন্য একটা আচ্ছাদন আর স্বজনদের নিরাপত্তার কারণে ছুটে বেড়াতে হয় সে-সময়। সেই লড়াই শুধু তারই নয়, আরো হাজার-হাজার মানুষের, নরেন্দ্রনাথ চোখের সামনে দেখেছেন উদ্বাস্তুদের লড়াইয়ের চিত্র, নিজের পৈতৃক বাড়ি-ঘর ফেলে অথবা ছেড়ে-ছুড়ে দেশান্তর হতে হয় তার স্বজাতির মানুষকে। তাঁর উপন্যাস-গল্পে নিতান্ত বাস্তব ঘটনাগুলো একে একে উঠে এসেছে, কোনো ছল বা রঙ মিশানোর প্রয়োজন হয়নি। গল্প যেন আপনা থেকেই ধরা দিয়েছে তার কলমের ডগায়, আর তাই তিনি জীবনশিল্পী, মানুষের কথাকার।

পরবর্তীকালে দেখা যায় বাংলা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য একটা স্থান দখল করে নিয়েছেন তিনি, নরেন্দ্রনাথের মূল উপাদান চেনা মানুষ, চেনা পরিবেশ, অতীত ও বর্তমানের ছবি-স্মৃতিকথা আর শ্রুতকাহিনী। গ্রামীণ জীবনের ছবি এবং গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না মিলেমিশে এক হয়ে গেছে তার সাহিত্যে, মানুষকে তিনি দেখেছেন সত্যিকার মানুষ হিসেবে, একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়েই তাদের জীবনকাহিনীকে তুলে ধরেছেন, কোনো রকম হালকা রঙের ছোঁয়া নেই তাতে, নিজের ঢঙে নিজের আঙ্গিকে নিজের মতো করে কাহিনী বিন্যাস করেছেন বরাবর, কখনো উচ্চ মাত্রা দিয়ে নিজের প-িতি জাহির করেননি, সর্বসাধারণ এসেছে সাবলীলভাবে তার কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্রে, জোর-জবরদস্তি করে নিজের মুন্সীয়ানা প্রয়োগ করেননি বলেই গল্পগুলো পেয়েছে জীবনের গতি, পেয়েছে অনাবিল ছন্দ।

নরেন্দ্রনাথের গল্পের ভাব বা ভাষারীতি-প্রকাশভঙ্গি ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রে যতখানি কাহিনী বুননের দিকে যত্নবান, তেমনি ভাষানির্মাণের বেলায়ও দেখা যায় সমান পারদর্শী, কখনো তা কাব্যিকতায় পৌঁছে গেলেও নিজেকে বাঁধতে জানেন, আবার প্রতিটি চরিত্রের মুখে আলাদা-আলাদাভাবে সংলাপ দেওয়ার সময়েও তার মুন্সীয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে তিনি কাহিনীর গভীরে ডুব দিয়ে তার ভেতরের মনিমুক্তা আহরণ করতে জানেন, তার গল্পের শরীরে প্রয়োজন মতো প্রতীক-উপমা এবং রূপকের কাজও বেশ গুছিয়ে করেছেন বোঝা যায়। বস্তুত, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে ছোটগল্পের আসনটি নরেন্দ্রনাথের জন্যই পাকাপোক্তভাবেই নির্মিত হয়ে আছে দীর্ঘকাল যাবৎ, সেই সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে সুবিবেচিত, উপন্যাসে যেমন তার সাফল্য এবং ছোটগল্পেও তেমনিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, জীবনযাপনের খুঁটিনাটি বিষয়-বৈচিত্র্যকে তিনি সাবলীলভাবে তুলে এনেছেন, এখানেই তাঁর গল্পের চরম সার্থকতা। বর্তমান সময়ের সাহিত্যিকদের অবশ্যই করণীয়, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সাহিত্যকে অধ্যায়ন করা, বিশেষ করে তাঁর গল্পের অস্থি-মজ্জায় প্রবেশ করে জীবনকে গভীর ভাবে দেখা, কারণ শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের ভেতরে মুখ ডুবিয়ে রাখলেই ভালো গল্প রচনা করা সম্ভব নয়, এর জন্য অবশ্যই ভ্রমণ অপরিহার্য, জীবনকে দেখা, জীবনের কাছে থেকে কিছু ছেঁকে নেওয়াটাই একটা শিল্প, ভালো গল্প তার হাতেই সফলভাবে আসতে পারে, যে জীবনের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে একত্র হয়ে গেছে। নরেন্দ্রনাথ মিত্র বেশ কিছু উপন্যাস এবং পঞ্চাশটি গল্পগ্রন্থের (যা প্রায় পাঁচ শতাধিক গল্পে সজ্জিত) এই মহান সাহিত্যিক, আজ আধুনিক বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে একজন বিস্মৃতপ্রায় বলা যায়, কারণ তার কোনো গল্পগ্রন্থ বাজারে পাওয়া যায় না। ১৯৬১ ইং সালে কথাসাহিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ 'আনন্দ পুরস্কার'-এ ভূষিত করা হয়। তার গল্প দেশ-বিদেশের অনেক সুনাম কুড়িয়েছে, রবীন্দ্রনাথের পরপরই বাংলা আধুনিক গল্পে নরেন্দ্রনাথের নামটি স্মরণীয়। এখানে তাঁর কয়েকটি অবশ্যপাঠ্য গল্প নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, গল্পগুলো পাঠ করলে পাঠক জীবন-জগত সম্পর্কে অনেকটা বাস্তব জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে।

'হেডমাস্টার' গল্পে পাঠক একজন চিরপরিচিত কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবুকে দেখতে পান, পাকিস্তানের কোনো এক অখ্যাত গাঁয়ের স্কুলের হেডমাস্টার, পাকিস্তান হওয়ার পর চৌধুরীরা অর্থাৎ সামন্ত হিন্দু পরিবারগুলো (যারা মোটা অংকের সাহায্য-সহযোগিতা করতো এবং স্কুলের বেশিরভাগ হিন্দু ছাত্রেরা) একে-একে তল্পি-তল্পা গুটিয়ে চলে যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, তাতে স্কুলের দীর্ণদশা-হতশ্রী অবস্থা, হেডমাস্টার কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবুও স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে কলিকাতা পাড়ি জমান এবং তারই স্কুলের একসময়ের ছাত্র নিরুপম নন্দীর কাছে একটা চাকরির জন্য শরণাপন্ন হন, কিন্তু হেডমাস্টার আর মাস্টারি চাকরি নেবেন না পণ করেছেন, এদিকে এত মানুষের অন্ন সংস্থানের জন্য একটা ব্যবস্থা নিরুপমকেই করতে হবে মাস্টার মশাইয়ের স্ত্রী লাবণ্যরেখা অনুরোধ করেন, শেষাবধি তার ব্যাংকেই রাখতে হয়, কিন্তু মাস্টারমশাই কোনোরকম প্রগলভতা-অন্যায়, ভুল ইংরাজি-ফাজলামি সহ্য করতে পারেন না, বরাবরই মাস্টারদের যে চরিত্র, সবাইকে ছাত্র জ্ঞানে দেখা, তাই তিনি করেন এবং চাকরি ক্ষেত্রে কে সিনিয়র বা বস তাও দৃষ্টি দেন না, মোট কথা স্বভাব তার, ভুলত্রুটি দেখলেই সবাইকে ধমকান, এতে ডিপার্টমেন্টের সবাই নাখোশ হন এবং সমস্ত বিভাগ থেকেই তিনি ফেরৎ আসেন, শেষপর্যন্ত নিরুপম বাধ্য হয়ে ব্যাংকের বেয়াড়াদের দায়িত্ব হেডমাস্টারকে দেন, পাঠক লক্ষ্য করেছে, একদিন সন্ধ্যাবেলায় দেখা গেলো, হেডমাস্টার সত্যি সত্যি ব্যাংকের বেয়াড়াদের পড়াচ্ছেন এবং তাদের 'স্বাধীনতা' শব্দের অর্থ বোঝাচ্ছেন। গল্পটি 'দেশ' পত্রিকায় (পূজা সংখ্যা ১৩৫৬) প্রকাশিত হয়, একজন আদর্শবান মাস্টারের প্রকৃত চরিত্রটি গাল্পিক বেশ চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন, এখানেই হয়তো গল্পটির সার্থকতা।

'দোলা' গল্পে অতুলকে দেখি, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র কর্তব্যপরায়ণতা-দায়িত্ববোধ দেখাতে গিয়ে নিজেই জড়িয়ে গেছেন বৃহৎ এক চোরাবালিতে, অফিসের কেরানী মতিলাল দে, সামান্য চাকরির পয়সায় জীবনে কিছুই করতে পারেননি, আত্মীয়স্বজন পরিজন থেকে পরিত্যক্ত একটা পরিবার, একদিন মতিলাল দে দেহত্যাগ করেন এবং সেই সৎকারের দায়ভার বর্তায় অতুলের কাঁধে, অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও সেই গুরুদায়িত্ব তাকেই নিতে হয়, একটা পরিবারের অধিকর্তা হয়ে দাঁড়াতে হয় একসময়, কিন্তু সমাজ সেটাকেও শুভ চোখে দেখেনি, সমাজের লোকগুলো ভালো করতে না পারলেও খারাপটা করতে পারে, বদনাম দেয় ললাটে উভয়ের, কারণ আমাদের সমাজ আত্মীয়তার বন্ধন ছাড়া আর কোনো বন্ধন মানে না। এদিকে মতিবাবুর বিধবা স্ত্রী এবং চার চারটে মেয়ের দায়িত্বের বোঝা ফেলে দিতে পারেননি হতভাগা অতুল, বরং একপর্যায়ে বড় মেয়ে শান্তিকে বিয়ে করে সংসারের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার পরামর্শ দেয় মতিলালবাবুর স্ত্রী, কথানুযায়ী তাই করে অতুল। কিন্তু বেশি বয়সের কারণে মন সে পুরোপুরি পায়নি, শান্তি একদিন পালিয়ে যায় প্রণবের সঙ্গে, নারী-পুরুষের যে সাংসারিক জটিলতা তার ছবি ফুটে উঠেছে, একসময় শান্তুির মা তার মেজো মেয়ে সুধাকে বিয়ে করার জন্য বলে, কিন্তু অতুল রাজি হয়নি, নানান দোলাচলে গল্পটি একটা কঠিন গন্তব্যে গিয়ে মিশেছে। 'দোলা' 'দেশ' পত্রিকায় (পূজা সংখ্যা ১৩৬৫) প্রকাশ পায়। ভালোবাসা যে কতো কঠিন এবং তা পাওয়া যে আরো কঠিন তারই চিত্র এখানে নরেন্দ্রনাথ তুলে ধরেছেন, অর্থ দিয়ে অনেক কিছু হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু ভালোবাসাটা অন্য কিছু, সেটা পেতে আরো অনেক কিছু দিতে হয়।

'বিকল্প' (শনিবারের চিঠি, ভাদ্র ১৩৬২) প্রকাশ, গল্পটিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বড়গল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন, প্রাবন্ধিক আবু সয়ীদ আইয়ুব (দ্রষ্টব্য : সাপ্তাহিক 'দেশ' ১৮/০২/১৯৭৮ ইং) একজন কৃপণ পিতা হরগোবিন্দ এবং তার দুটো ছেলে-মেয়ে সুধা ও হাবুলের মনস্তাত্তি্বক জটিলতার চিত্র অংকিত হয়েছে গল্পে, সন্তানদের প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসেন পিতা হরগোবিন্দ, মাতা না থাকার কারণে একটু বেশি আস্কারা দিয়েছেন তিনি, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, সিনেমা দেখাতে যাওয়া, ভালোমন্দ কিনে দেওয়া, সোনার অলংকার গড়িয়ে দেওয়া, সবই করেন এমনকি মেয়ের বিয়ের জন্য ভালো পাত্রও দেখেন, কিন্তু একজন ইন্দুভূষণ, হাবুলের প্রাইভেট টিউটর, সুধার জীবনটাকে অন্য রকমভাবে তছনছ করে ফেলে। ভালোবাসা নামের প্রজাপতির রেণু মেখে সুধা হয়ে ওঠে মহীরুশী, অবশ্যই হরগোবিন্দ বাবু তা মেনে নিতে পারেননি, মেয়ের জন্য ভালো-ভালো পাত্রের খোঁজ আসে, কিন্তু সুধা কোনোটিকেই পছন্দ করতে পারে না, বাবা-ভাইকে রেঁধে খাওয়ানো বা দেখাশোনার কথা বলে পাশ কেটে যায়, হরগোবিন্দ বাবু সন্দেহ করেন ইন্দুভূষণকে, একদিন তিনি হুমকি দেন এবং চেনা-পরিচিত ছেলে-ছোকরা দিয়ে ইন্দুকে উত্তম-মধ্যমের ব্যবস্থা করেন। সত্যি সত্যিই একটু বেশি হয়ে যায়, সপ্তাহখানেক জ্বরবিকারে হাসপাতালে থেকে ইন্দুভূষণের মৃত্যু হয়। এ-সংবাদ শোনার পর থেকে সুধার বেশবাস চরিত্র-আচরণ পুরোদস্তুর পাল্টে যায়। পাঠক আরেক সুধাকে প্রত্যক্ষ করে। একটা মৃত্যুই যেন একটা জীবনকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, সুধা প্রতিবাদি হয়ে ওঠে, এমনকি মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়, হরগোবিন্দ বাবু যখন বলেন, 'তুই কি বিধবা, তোদের কি বিয়ে হয়েছিলো?' সুধা তখন সাফ জবাব দেয়, 'মন্ত্রপড়া বিয়েটাই কি সব?' তারপর দেখা যায়, সুধা বিয়ে না করার প্রতীজ্ঞায় অটল থাকে, বাপ-ভাইয়ের সংসারে একজন নিষ্ঠাবতী সেবিকা হয়েই জীবনযাপন করবে, হরগোবিন্দ বাবা হয়ে সব দেখেন এবং কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না, বারংবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন অথচ সুধা অনড়। বাবার মিনতির যেন ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়, একজন ইন্দুভূষণের স্মৃতি তাকে উন্মাতাল করে। গল্পটির মধ্যে ভালোবাসাকে ভালোবাসার জায়গায় রেখে বিচার করা হয়েছে, একজন ইন্দুবাবুকে মনের অজান্তে সুধা ভালোবেসে ফেলে, সেখানে কোনো পাপ ছিলো, অথচ কেউই মেনে নিতে পারেনি, গল্পের ভেতরে লেখক ভালোবাসার ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, ভাষার এমন সরলতা সত্যিই মূগ্ধ করে বৃহৎ পাঠককে।

'গ-ী' গল্পটিতে ('দেশ' ৬ পৌষ ১৩৭৫) একজন মৃগাঙ্ক বাবুকে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত যত্ন করে, মাঝবয়সি একজন ধোঁপদুরস্ত ভদ্রলোক, যার সন্তান-সন্ততি নেই, কলিকাতায় ওকালতি করেন, স্ত্রী নীলিমার সঙ্গে মৃগাঙ্ক বাবুর মনের সঙ্গে কোনো মিল নেই, স্বামীর অনেক কিছুই পছন্দ করেন না, শুধু যে একজন কৃপণ মানুষ, তাই নয়, মানুষকে পছন্দও করেন না, ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভাবেন, বাড়ি-গাড়ি খাট-পালঙ্ক গয়না যেভাবে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন টাকা আর টাকাকে, কিন্তু মানুষকে ভালোবাসতে পারেন না, টাকা দিয়ে সব কিছুকে বিচার করেন। এক মাসের ছুটিতে যখন সাগরপাড়ের তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন, সেসময় সে বাড়িতে আরেক ভ্রমণপিপাসু সলিল তার স্ত্রী-সন্তানসহ ভাড়া নিতে আসে, রীণার সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ঘুচে নীলিমা কেমন বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়, যাতে একটা মাতা-কন্যা সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলা যায়, কিন্তু মৃগাঙ্ক বাবু কোনোভাবে মেনে নিতে পারেনি, মানসিক একটা জটিলতার চিত্র গল্পজুড়ে পাঠক অনুভব করবে, প্রকৃতপক্ষে কতিপয় মানুষ আপন গ-ীর মধ্যে থাকতেই বেশি পছন্দ বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, বাড়তি ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তারপর মৃগাঙ্ক বাবু আবার নিঃসন্তান, তার ভেতরের হাহাকার হয়তো কেউই তেমন করে বুঝতে পারে না, গল্পটিতে নরেন্দ্রনাথ মানুষের অনেকখানিক ভেতরে প্রবেশ করে বাস্তবিক ঘটনা তুলে ধরেছেন। মানুষের ওপর দেখে বিচার করা বোধ করি সমীচিন নয়, মনের অভ্যন্তরে আরেক মানুষ থাকে, সে যে কতোখানি ভালো বা মন্দ তার হদিস কে রাখে।

'পালঙ্ক' একটা প্রতীকী গল্প। এখানে আভিজাত্য বা বংশগৌরব এবং সেই সঙ্গে দারিদ্র্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, সামন্তবাদের এ'রূপ গল্পের আপাদমস্তক শরীর জুড়ে, অবস্থাপন্ন রাজমোহন এবং প্রান্তিক কৃষক অর্থাৎ ভূমিহীন নিঃস্ব জীর্ণ-শীর্ণ শরীরের এক মানুষ মকবুলের মধ্যের চরম লড়াই পাঠক প্রত্যক্ষ করে, ছেলেবউ অসীমার বাপের দেওয়া (যৌতুক হিসেবে) পালঙ্ক নিয়েই গল্পের কাহিনী এগিয়েছে, রাজমোহন বাবু বাড়ির কোনো জিনিস বেচাবিক্রি করেন না, কিন্তু অসীমার মস্ত চিঠি পেয়ে রাজমোহন অপমানিত বোধ করেন, এবং এক জবানে পালঙ্ক মকবুলকে নামমাত্র (পঞ্চাশ টাকা) মূল্যে দিয়ে দেন, পরবর্তী সময়ে এই পালঙ্ককে সম্ভ্রান্তের এক প্রতীক হিসেবে দাঁড় করায় গাল্পিক, দেশভাগ হলেও রাজমোহন পৈতৃক ভিটা ছেড়ে যাবেন না পণ করেছেন, পাকিস্তানের মাটি কামড়ে থাকবেন, এবং নিজের জেদ-কর্তৃত্ব বজায় রেখে, শেষমুহূর্তে পাঠক লক্ষ্য করে, পালঙ্ক'র জন্য ঝড়-বৃষ্টির রাত্রে জ্বর গায়ে রাজমোহন বাবু মকবুলের বাড়ি এসে উপস্থিত হয় এবং যখন দেখতে পান ওই পালঙ্কে দুটি শিশু শুয়ে আছে মরার মতো, দৃশ্যটা দেখে রাজমোহনের বোধের দরোজায় প্রচ- ধাক্কা লাগে, মনে হয় রাঁধাগোবিন্দ শুয়ে আছে তার সাধের অহংকারের পালঙ্কে। অভাব-অনটনের মধ্যেও যে মকবুল বেশি টাকা দাম পাওয়ার পরও পালঙ্ক হাতছাড়া করেনি, তাই দেখে বিস্ময়ে হতবাক, পালঙ্ক তখন আর শুধুমাত্র নকশা করা কাঠের একটা বস্তু থাকে না, গৌরবের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। দুজন দু'দিগন্তের মানুষ তাদের আভিজাত্য-বৈভব আর অহংকারের তাছে পরাভূত হয়, ছোট-বড় নির্বিশেষে এককাতারে মিলিত হতে দেখা যায়। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের 'পালঙ্ক' গল্পটিকে (আনন্দবাজার পত্রিকা, পূজা সংখ্যা ১৩৫৯) পরবর্তী সময়ে পরিচালক রাজেন তরফদার চলচ্চিত্রে রূপায়িত করেন।

'ঘাম' গল্পটিও জটিল এবং মনস্তাত্তি্বক, দাম্পত্যজীবনের কলহ যেমন আছে, আরো আছে তার ভেতরে ভালোবাসা, নিঃসন্তান একটা দাম্পতির ছবি নরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত মমতার সঙ্গে এঁকেছেন, বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা সন্তানের জন্য সুনন্দার মন আকুলিবিকুলি করে, আর তাই সে স্বামী বিজনের বারণ সত্ত্বেও পাশের ফ্ল্যাটের অমূল্যবাবুর নবজাতকটিকে ভালোবাসে, আদর করে_ যা বিজন সহ্য করতে পারে না, ঈর্ষা কেন যে ওকে কুরে-কুরে ধ্বংস করে বোঝে না সুনন্দা। 'ঘাম' গল্পে পাঠক আরো দেখে অতি বাৎসল্যে সুনন্দার সর্বাঙ্গ থেকে স্তন্য বের না হয়ে ঘাম বের হতে থাকে। মাতৃত্বস্বাদ নারী জনমকে সার্থক করে, বিজন-সুনন্দার জীবনে সে স্বাদ পূরণ না হওয়ার কারণে একটা হাহাকার লক্ষ্য করা যায়। 'ঘাম' গল্পটি সম্বন্ধে সাহিত্যিক কায়েস আহমেদ বলেছেন, 'তাঁর ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে নরেন্দ্রনাথ মিত্র বাংলা সাহিত্যে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, তার 'রস' 'ঘাম' ইত্যাদি বহু গল্প বাংলা সাহিত্যে চিরায়ত সম্পদ হয়ে থাকবে। (প্রকাশ, 'চতুরঙ্গ' পৌষ ১৩৭০)।

বাংলা সাহিত্যের চিরস্মরণীয় একটা ছোটগল্প 'রস' (মাসিক চতুরঙ্গ' পৌষ ১৩৫৪, প্রকাশ) যা নরেন্দ্রনাথ মিত্রকে এনে দিয়েছে সাফল্য, দিয়েছে খ্যাতি-সম্মান, জীবদ্দশায় যতো গল্প লিখেছেন 'রস' অবশ্যই বাংলা ছোটগল্পকে করেছে সমৃদ্ধ, ভালোবাসার সঙ্গে জীবিকার অন্যান্য প্রয়োজনের দ্বন্দ্ব নিয়ে গ্রামীণ পরিম-লের 'রস' গল্পটি পাঠককে করেছে বিমোহিত, গল্পটি শুধু ভালোবাসার গল্প নয়, ভালোবাসার সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রতারণা লুকিয়ে, এবং রয়েছে রূপসী রমণীর সঙ্গে জীবিকার চাহিদার সংঘাত।

মোতালেফ শুধু নিজের স্বার্থেই একদিন মোল্লা ডেকে কলমা পড়ে নিকা করে ঘরে তুললো মাজুখাতুনকে, সে ছিলো ওস্তাদ রাজেক মৃধার বিধবা স্ত্রী, নিজের একটা মেয়ে ছিলো, কাঠিখালির শেখেদের ঘরে বিয়ে দিয়েছে, মোতালেফও একবার সংসার করেছিলো, বউ বছর খানিক হলো মারা গেছে, কিন্তু বিয়ে করলে কী হবে, তার মন পড়ে রয় চরকান্দার এলেম শেখের বাড়িতে, এলেম শেখের নাদুস-নুদুস অষ্টাদশী মেয়ে ফুলবানুকে যে তার চায়। এলেম শেখ ধড়িবাজ মানুষ, সে পাঁচ কুড়ি টাকা চায়, তবেই সে ফুলবানুকে দেবে মোতালেফের হাতে, নয়তো নয়। ফুলবানু ইতিমধ্যে একহাত ঘুরেও এসেছে, গফুরকে ভালো লাগেনি বলেই বাপের বাড়ি চলে আসে।

চরকান্দার নদীর ঘাটে ফুলজানকে যেদিন প্রথম দেখে, মন আর থির থাকে না, শীতের মৌসুমে যতো কষ্ট করেই হোক না কেনো টাকা মোতালেফকে রোজগার করতে হবে, পুরো পাঁচ কুড়ি টাকা বলে কথা! সমস্ত শীতকালটা অক্লান্ত পরিশ্রম করলো মাজুখাতুন-মোতালেফ, মোতালেফ খেজুর রস সংগ্রহ করার বিস্তৃত বিবরণের কয়েকটি বাক্য : 'অনেক খাটুনি, অনেক খেজমৎ... শুকনো শক্ত খেজুর গাছ থেকে রস বের করতে হলে আগে ঘাম বের করতে হয় গায়ের, এতো আর মার দুধ নয়, গাইয়ের দুধ নয় যে বোঁটায় বানের মুখ দিলেই হলো...

ওদিকে মাজুখাতুনও সেই ভোর হওয়ার আগে রাতের অন্ধকার থাকতে-থাকতে উনানে রসের জ্বাল দিতে-দিতে জেরবার, তারপর সেই রসের জ্বাল আঁঠালো হয়ে পাটালি হয়, অনেক কষ্ট আর পরিশ্রমের ফল। শীত শেষ হলে রসের আর কাজ থাকে না, তখন অন্য পেশা। তারপর জৈবিক তাড়নায় মোতালেফ দু'বারে পাঁচ কুড়ি টাকা এলেম শেখকে বুঝিয়ে দিয়ে ফুলজানকে ঘরে তোলে, এবং মাজুবিবির স্বভাব-চরিত্র খারাপ, রাজেকের দাদা ওয়াহেদের সঙ্গে তার আচার-আচরণ আপত্তিকর, এরূপ মিথ্যে বদনাম দিয়ে মাজুখাতুনকে তালাক দেয়।

মাজুবিবি জিভ কেটে বললো, আউ-আউ ছি-ছি... তোমার গতরই কেবল সোন্দর মোতিমেঞা, ভিতর সোন্দার না, এতো শয়তানি, এতো ছলচাতুরি তোমার মনে, গুড়ের সময় পিঁপড়ার মতো লাইগা ছিলা, আর গুড় যাই ফুরাইলো অমনি দূর-দূর...

শীতের পরে এলো বসন্ত, মাজুখাতুনের পরে এলো ফুলবানু। দিনরাত ভালী আদরে তোয়াজে মোতালেফ রাখলো বিবিকে, এভাবে দিন যায় মাস যায়, বসন্ত-বর্ষা আশ্বিন-কার্তিক কেটে যায়, ঘুরে আসে ফের শীত। রসের দিন মোতালেফকে টানে, সে শুধু কঠিন গাছ কেটে রস নামিয়ে আনে, তারপর শুরু হয় জ্বাল দেওয়ার কাজ, কিন্তু ফুলবানু জানে না কীভাবে জলের মতো খেজুর রস জ্বাল দিয়ে পাটালি গুড় তৈরি করতে হয়, উঠোনভর্তি রসের হাঁড়ি দেখে তার ক্লান্তি লাগে, মোতালেফের তখন মাজুখাতুনের কথা মনে পড়ে যায়। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যাও বা পাটালি করে কিন্তু তা পোড়া-পোড়া গন্ধ হয়ে যায়। যা হাটে বিক্রি করতে নিয়ে গেলে বিক্রি হয় কিন্তু পরের হাটবারে মানুষজন অপমান করে, দূরে সরে যায়। এভাবে দিন যায়, গুড় বিক্রি লাটে ওঠে, গাছ কাটায় সার হয়।

গল্পের শেষ দৃশ্যে পাঠক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করে যে, একদিন ভোরবেলা দু'হাঁড়ি রস নিয়ে নৌকায় নদী পার হয়ে নাদির শেখের বাড়ি উপস্থিত হয় মোতালেফ, তার ফরিয়াদ নাদিরের বউ যেন সেই রস জ্বাল দিয়ে দুই সের গুড় তৈরি করে দেয়, কারণ এ'বছর এক ছটাক পছন্দসই গুড় সে হাটে বেচতে পারে নাই। গলা শুনে মাজুখাতুনের মন ভিজে যায়, কয়েক মাস আগে নাদির শেখ নিকা করেছে তাকে, মোতালেফ বাঁখারির বেড়ার ফাঁকে ওর চোখ দেখে, ছলছল করে উঠছে, কিন্তু কেউই কিছুই বলছে না। ('রস' গল্পটির হিন্দি চলচ্চিত্র নাম 'সওদাগর'। এতে মোতালেফ চরিত্রে ছিলেন অমিতাভ বচ্চন)। কথাসাহিত্যে গ্রামীণ বাস্তবতায় খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের প্রতিটি কণিকা কিন্তু মূর্ত হয়েছে গাল্পিকের শ্রমদ্বীপ্ত ভাষায়। 'রস' গল্পের এই ছবি দেখবার মতো ছিলো। নরেন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছিলেন সেটুকুই, যেটুকু ব্যাঞ্জনায়িত করে তুলবে মোতালেফ ও মাজু খাতুনের হৃদয়দ্বন্দ্বকে। সহজ ভাষাতেই জটিল মনস্তাত্তি্বক এবং কঠিন আর্থ-সামাজিক পরিবেশকে রূপদান করেছিলেন, গল্পের ভাববস্তুর উপস্থাপনায় সরলতার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করলেন ভাষার প্রতিটি অনুপুঙ্খে এবং তা প্রধান করে তুললেন।

সম্পূর্ণ পূর্ববাংলা অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত আরেকটি গল্প 'সোহাগিনী' ('তুফানী' নামে প্রকাশ 'দেশ' পূজা সংখ্যা ১৩৬৪ বাং) বাংলা সাহিত্যের একটি ভিন্ন ধারার গল্প বলতেই হয়, কৃষাণ জীবনের চলমান চমৎকার বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি আছে স্ত্রীলোকের মন সম্পর্কে বিশ্লেষণ, আরো আছে বন্ধুত্বের গল্প। কাহিনীটি শুরু হয়েছে, চ-ীপুর মাঠে ধান কাটতে থাকা কৃষাণ মোতি মিঞা-মবদুল শেখ আর বিহারী ম-লের গল্পের মধ্য দিয়ে, তিন জনের মধ্যে মতি মিঞার বয়স বেশি আর মবদুল সবার ছোট। মতি মিঞার পূর্ব জীবনের গল্প বয়ানের ভেতর পাঠক খুঁজে পায় নরেন্দ্রনাথ মিত্রের 'সোহাগিনী'কে, যে তুফানী ছিলো মতির অনেক-অনেক কালের চেনা-জানা স্বপ্ন-ভালোবাসা, ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছে তাকে, মতির বাপ রজ্জাক সিকদার আর তুফানীর বাবা বদন চৌকিদার দুজনের মধ্যে তেলেঝোলে সম্পর্ক থাকলেও কখনো তা আবার আদায়-কাঁচকলায় গিয়েও ঠেকে, কিন্তু সেটাও বেশিক্ষণের জন্য নয়। কিন্তু মতির ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই সমাজে, তুফানীর ভালোবাসারও কানাকড়ি দাম নেই, জাতধম্ম দিয়ে যে সমাজ বিভক্ত, তুফানীর বাবা পীরপুরের ঘরামী বনমালী ভক্তের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেয়, তখনো তুফানীর বয়স অল্প, তাই গায়েগতরে বড় না হওয়া পর্যন্ত তুফানী চ-ীপুরে থেকে যায়। মতি মিঞা ওসব বিয়েশাদী বোঝে না, সে ভালোবাসে তুফানীকে, দিন যায় মাস যায়, বছর চলে যায়, বনমালী নিয়ে যায় বউকে তারপর। কানে-কানে খরব পায় মোছলা মতির সঙ্গে তুফানীর সম্পর্কের কথা। একদিন পথে আসতে মতির সঙ্গে বনমালীর দেখা, মিষ্টি-মিষ্টি দু'চারটে কথা শুনিয়ে দেয় মতিকে, বাড়ির কাঁঠালের কোয়ার গল্পের উদাহরণ দিয়ে বাঁকাভাবে তাকে ইঙ্গিত করে, মতি সবই বোঝে, একবার ভাবে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে। কিন্তু বনমালী বড় সেয়ানা, ভাবভঙ্গি দেখে কেটে পড়ে। তারপর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মা পূজা, নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা চলে, মতি মিঞার 'বাইচা' হিসাবে সুখ্যাতি আছে, সে নৌকা বাইচে অংশ নেয়, জয়যুক্ত হয়, সোনা মুন্সী তাকে বিশাল কলসটা উপহার দেয়, মিঠাই-ম-া আর চিড়া-গুড় খেতে-খেতে আর গান গাইতে-গাইতে নৌকা নিয়ে যাচ্ছিলো, অকস্মাৎ কাপুইড়া সদরদির মোল্লাদের ঘাটের কাছে কা- ঘটলো, পীরপুরের তালুকদারদের নৌকার গলুই ধাক্কা দিলো, তারপর তুমুল ঝগড়া বাঁধলো, আচমকা বর্শা এসে মতির কাঁধে পড়লো, পরে জানা গেলো পীরপুরের সেই নৌকায় বনমালী ছিলো, ওই কাজটা করিয়েছে, সেই কাঁধের ঘায়ের জন্য মতি সমস্ত কালবর্ষাটা ভুগেছিলো, মতি শুনেছে তুফানী স্বামীর বাড়ি থাকে এবং ওর ছেলে হবে, ন'মাসে সাধ দেবে পিসী, তাই বাড়ি আনে, একদিন তুফানী দেখতে আসে মতিকে, মোরগবলী ফুল হাতে নিয়ে, কিন্তু ওকে দেখে মতি নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি, এতকালের ভালোবাসা যেন একদমকায় ফেটে বের হয়ে এলো, তুফানী বিস্ময়ে রুদ্ধ হয়ে গেলো।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মতি মিঞা আবার পুরানো দিনের গল্পটি কৃষাণদের কাছে বলতে লাগলো : তুফানীর স্বামী আর বাবা হাট থেকে ফিরছিলো, বাড়িতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করে, বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে নামতে দেখে বনমালীর তর সইলো না, চুলে মুঠি ধরে টানতে-টানতে নিয়ে লাথির পর লাথি, লাথির পর লাথি, তুফানীর বাবা বললো, খবরদার আমার মেয়ের গায়ে হাত দেবা না, আমার মাইয়া আমি যারে খুশি দেবো, ডাকাইতরে আর না। তুফানীর ব্যথা আর যায় না, ডাক্তার আসলো, সব চিকিৎসা দিলো কিন্তু তুফানী আর কথা বললো না।

এবার সত্যি সত্যিই মবদুল আর বিহারী দেখলো মতি মিঞা হাতের পিঠে ভিজে চোখ দুটো মুছে নিচ্ছে।

গল্পটিতে কী যেন এক আর্কষণ ছড়িয়ে দিয়েছে নরেন্দ্রনাথ, মনের ভেতর কেমন আকুলিবিকুলি করে, গল্পের ছলে এভাবে কি কেউ কাঁদাতে পারে, ভালোবাসার রূপটিকে আরো গভীরভাবে বোঝাতে শেষ দৃশ্যে আরো কঠিন এবং মর্মস্পর্শী করে তুললেন, গাঙের তীরে শ্মশানে তুফানীকে দাহ করা হলো, সেখানে না উপস্থিত হতে পারলো বনমালী না হতে পারলো মতি, যদিও মতি যাওয়ার জন্য উন্মাদ কিন্তু ওর বাপ-মা আটকে রেখেছিলো, কিন্তু শেষরাত্রে ডিঙ্গিখানা নিয়ে শ্মশানে যায়, ইচ্ছে ছিলো পোড়া মাটি-ছাই নিয়ে আসবে এবং পীরপুরে গিয়ে বনমালী শুয়োরকে খুন করবে। অথচ সেখানে দেখা হয় বনমালীর সঙ্গে, সেও সেখানে এসেছে শ্রদ্ধা জানাতে, শেষরাত্রের সেই চিতার ওপর দুজনই তাকিয়ে থাকে দুজনের দিকে, একজন হিন্দু একজন মোছলমান, একজন সোয়ামী আর একজন জার, একজন খুনি আর একজন লুচ্চা-বদমাইশ, কিন্তু দুজনই খাড়াইয়া-খাড়াইয়া সমানে পুড়তে লাগলো শ্মশানের চিতার ভস্মের মধ্যে। দুজন মানুষের ভালোবাসাকে এভাবে রঙতুলি দিয়ে বোঝাতে গিয়ে লেখক বিশাল পাঠকসমাজকে বিদঘুটে শ্মশানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, এবং কার ভালোবাসা কতোখানি সেই দৃশ্য চিত্রায়ণ করেছেন, মূলত দুজনই যে ভালোবাসে একটা নারীকে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কাজে কাজেই ভালোবাসা অন্ধ প্রেমিকই পারে ভালোবাসাকে ভাগ না দিয়ে নিজের কাছে পুরোটা রাখতে। বাস্তবিক অর্থে গল্পটির মধ্যে প্রকৃত ভালোবাসা উঠে এসেছে, কিন্তু ভালোবাসা যে কখনো-সখনো হিংস্র হয়ে ওঠে তার রূপ গল্পটিতে চিত্রায়িত হয়েছে, নরেন্দ্রনাথ মিত্র সত্যিকার ভালোবাসা বোঝাতে পাঠককে একটা ধোঁয়া-আঁধারির মধ্যে নিয়ে গেছেন, যা বিবেককে নাড়া দেয় কঠিনভাবে।

দুজন নারী-পুরুষের ভালোবাসা এবং মনস্তাত্তি্বক জটিলতার গল্প 'একটি নাগরিক প্রেমের উপাখ্যান', সুরজিত এবং বিপাশা এই দুই মানুষের প্রেমের কাহিনী, হয়তো প্রেম কথাটা বলাও সমীচিন হবে না, কারণ বিপাশা এখনো যেহেতু সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, আসলে সুরজিতকে বিয়ে করবে কি না, দুজন যে দু'মেরুর বাসিন্দা, ধনী বাপের দুলালী বিপাশা অনেক ছেলেবন্ধুর সানি্নধ্যে বেড়ে উঠলেও কী কারণে গরিবের ছেলে সুরজিতকে ভালোবেসে ফেলে, যদিও সেটা কতোখানি ভালোবাসা ছিলো তাও চিন্তার বিষয়। এমনই একটা টানাপোড়েনের গল্প, যা পাঠকের মনকে অনেক ভাবনার খোরাক জোগাবে। যে বিপাশা বিলাস-ব্যসনে বড় হয়েছে, ধনী বাপের মেয়ে সে, কীভাবে পারবে একজন মাস্টারের সংসারে, যে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে উঠে এসেছে যেমন সত্য, কিন্তু মন তার এতোটুকু বদল হয়নি, যার স্বপ্ন নেই আশা নেই, তাকে কীভাবে আজীবন ভালোবাসবে, তাকে নিয়ে সংসার করবে, দোটানাপোড়েনে গল্পটি অন্য একটা রূপে পরিণত হয়েছে বোঝা যায়। জটিল এবং মনস্তাত্তি্বক এই গল্পটি 'আনন্দবাজার পত্রিকা'য় (দোল সংখ্যা ১৩৭১ বাং) প্রকাশিত হয়।

নরেন্দ্রনাথ মিত্র নেহাৎই সাধারণ মানুষের দিনযাপনের ভেতর থেকে মুক্তোর মতো গল্প আহরণ করতেন, বাস্তুচ্যুত গরিব মানুষেরা কলকাতা শহরে বাঁচার জন্য কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই করে চলছে সেই চিত্র অংকন করেছেন, দারিদ্র্যের মধ্যে একটু ভালো থাকার চেষ্টা, বেঁচে থাকার আপ্রাণ সংগ্রাম। বাস্তববাদী মানুষকে তিনি চিনেছেন, দেখেছেন চেনা গোষ্ঠীকে, যাবতীয় উপলব্ধি থেকে নরেন্দ্রনাথ তুলে এনেছেন সময়-মানুষ-প্রকৃতি এবং তার ইতিহাসকে, দৃশ্যের ভেতরের দৃশ্য বাঙালি পাঠককে গভীরভাবে দেখান, তাই তিনি আজো স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে আছেন এবং থাকবেন আরো অনেক-অনেক কাল অবধি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন