বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

ইশরাত তানিয়া'র গল্প-- বাবাইয়ের এমন একটি অলৌকিক বাবুই


ঝাঁ চকচকে কফি শপে প্রাতীচ্য সুরের আবহময় মূর্ছনায় নরম ঢাউস সোফায় বসে ওরা কথা বলছে। ত্রিশোর্ধ্ব চার জন। গড় বয়স হতে পারে পঁয়ত্রিশ। সবাই প্রতিষ্ঠিত। কর্ম ব্যস্ততার মাঝে এক টুকরো অবসর ধরা দিয়েছে মধ্য নভেম্বরের এক বিকেলে। আকাশ দর্শনসাধ্য না হলেও আলো আঁধারির খেলায় ক্লান্ত বিকেল এলিয়ে পড়ছে অলসতর সন্ধ্যার বুকে। বেশ অনুভব করতে পারছে বাবাই। ক্যাপাচিনোর ফেননিভ পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে পুরু কাঁচ দিয়ে ঘেরা জানালার ভার্টিকাল ব্লাইন্ডসের ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের দৃশ্যটি দেখছে সে।

এই চারজনের মধ্যে বাবাই হচ্ছে মূল বক্তা। তার বক্তব্য তথ্য সমৃদ্ধ, যুক্তিপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম বিদ্রুপ-রসিকতার পরিমিত প্রলেপ মিশ্রিত। মানুষ কে প্রভাবিত করার একটি সহজাত সম্মোহনী ক্ষমতা তার আছে। সবাই তাকে শুনতে ভালবাসে। ছোট একটি সোফায় বসে বাবাই ইংরেজি সাহিত্যের একটি বই হাতে নিয়ে পাতা উলটে দেখছে যদিও বাকি তিন জনের কথোপকথনের একটি শব্দও তার কান এড়িয়ে যাচ্ছে না।

ওরা সুনির্দিষ্ট ভাবে কোন কথা বলছে না। চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী আলোচ্য বিষয়গুলোর প্রসঙ্গ বিস্ময়কর গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। কখনও ই-বুক রিডার জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক আলোচনাকে, কখনও এলিস মুনরো থামিয়ে দিচ্ছে মুনলাইট সোনাটা। ঢেউয়ের পর ঢেউ এর মতো কাফকা-মার্কেজ-কাম্যু আসছে আর বাখ-বীটোভেন ফিরে যাচ্ছে। এত কথার মাঝে বাবাই বারবার চোখ নামিয়ে বাঁহাতের ঘড়ি দেখছে, মনে হচ্ছে বাসায় ফিরে যাবার তাড়া আছে তার। 

বাবাইয়ের বাম দিকে আরেকটি সোফায় বসে আছে আবির আর তিতির। সুমনা বসে আছে বাবাই এর বিপরীতে। মুখোমুখি। বেশ কদিন হলো ঠান্ডা লেগে সুমনার চোখ টলটলে হয়ে আছে। কথা বললেই গলা ধরে আসছে। আজকে বাবাই তেমন কথা বলছে না সচরাচর যেমন দেখা যায়। একটু আগে সুমনা যখন আবহাওয়ার অদ্ভুত আচরণ প্রসঙ্গে কিছু বলছিল বাবাই তখন ভ্রুকুঞ্চিত চোখে পূর্ণদৃষ্টিতে সুমনার দিকে তাকিয়েছিল যেন সে বুঝতে চেষ্টা করছিল সুমনা কি বলতে চায়। বাবাই খুব কমই পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায়। সেই দৃষ্টি একবার সুমনার চোখ ছুঁয়ে সুমনাকে ছাড়িয়ে চলে গিয়েছে অনেক দূরে। এই ভ্রুভঙ্গী বিরক্তিকর কোন কারণে নয়, কিছু একটা ভাবছে বাবাই।



‘বাবাই, দেখো, আমি প্যারোট বানিয়েছি!’ দুটি হাত করজোড় করে মধ্যমা আর অনামিকা হাতের পাতার দিকে ঠেলে দিয়ে দু’হাতের তর্জনী আর কনিষ্ঠ আঙ্গুল একই রকম রেখে বাবুই তার বাবার সামনে তুলে ধরেছিল। বাবাই হাত থেকে হেমিংওয়ে নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালো। সে সর্বোচ্চ কল্পনা শক্তি দিয়েও আঙ্গুলে কোন টিয়া পাখির কাঠামো খুঁজে পাচ্ছিল না। তবু বলল, ‘কী সুন্দর টিয়া পাখি! লাল ঠোঁট, সবুজ পাখা!’ অদৃশ্য টিয়া পাখির সদ্য স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে বাবুই এর মুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠেছিল তারপর সে বাবাই এর পেটে মাথা রেখে শুয়ে আনমনে বলেছিল, ‘রেড ঠোঁট, গ্রীন পাখা।’

আজকে বাবাইয়ের ক্লাস নেই। ইউনিভার্সিটি বন্ধ। বাবাই শুয়ে ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ এ চোখ বুলাচ্ছিল। বাবাইয়ের বুকের ঠিক সামান্য নিচে আড়াআড়ি ভাবে পেটের উপর মাথা রেখে দুটো পা সামনে মেলে দিয়ে বসে ছিল বাবুই। বাবুই পিঠ দিয়ে হেলান দিয়েছিল বাবাইয়ের গায়ে। বাবাইয়ের খুব ভালো লাগছিল বাবুইয়ের স্পর্শ। বাবুই এর মুখের এক পাশ দেখতে পাচ্ছিলো বাবাই। জানালার গ্রিলের ভিতর দিয়ে নরম কমলা রঙের আলো এসে পড়ছিল বাবুই এর মুখে। ছোট্ট-ফোলা-লালচে গাল আর ভেজা পেলব গোলাপি ঠোঁট ঝিকমিকিয়ে রোদেলা হয়ে উঠছিল। মুগ্ধ চোখে বাবাই তাকিয়েছিল আত্মজার দিকে।

‘জানো বাবাই, চাঁদ আকাশ থেকে পড়ে গিয়েছে।’ বাবার দিকে না তাকিয়েই বলেছিল বাবুই।

‘পড়ে গেল?’ বাবাই বিস্মিত।

‘হ্যাঁ তো! এই যে আকাশ থেকে ওয়ালে এসেছে তারপর ওয়াল থেকে পড়ে খাটের নীচে চলে গিয়েছে।’ হাতের আঙ্গুলগুলো টিয়া পাখি থেকে স্বাভাবিক হয়েছিল কারণ বাবুই আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে দেয়ালের একটি নির্দিষ্ট অংশ চিহ্নিত করেছিল।

‘তারপর কি হলো চাঁদের?’

‘ও ব্যথা পেয়েছে আর ময়লা হয়ে গিয়েছে।’

‘তুমি ওকে ওঠাওনি, বাবুই?’

‘ওতো আমার হাত ধরেনি।’ অভিমানে বাবুইয়ের নিচের ঠোঁট কেঁপে উঠে সামান্য উলটে যায়।

‘তুমি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলে? খুব ভালো করেছ!’ বাবাই খুশী হয়েছিল, ‘চাঁদ তোমার হাত ধরেনি কেন বাবুই?’

‘বাবাই, তুমি একটা বোকা! ও আমার সাথে মন খারাপ করেছে!’

‘ওহ, চাঁদ এখন কোথায়, মা?’

‘বনে-জঙ্গলে চলে গিয়েছে!’

মন খারাপ হলে কোথায় যেতে হয় বাবুই জেনে গিয়েছিল। কিছু ব্যাপার জন্ম থেকেই মানুষ জেনে যায়। না জানলে বড় কষ্ট! বাবুইয়ের হাতের আঙ্গুল আবার টিয়া পাখি হয়ে গিয়েছিল।



কফি মাগে দ্বিতীয় চুমুক দিল তিতির। একটা বিদেশি এনজিও তে চাকরী করে ও। চীফ রিসার্চ অফিসার। সেইন্ট মার্টিনে সমুদ্রের কাছে গিয়েছিল সে। বেড়াতে। ট্যানড হয়ে ফিরেছে। ওয়েল ফিটেড ডেনিম আর কালো কাফতান কাট লং কামিজ পরেছে তিতির সাথে অ্যাপ্লেক করা প্যাস্টেল শেডের ওড়না। চুলে পনিটেল করাতে ‘খুকি’ ভাব এসেছে ওর চেহারায়। গ্রীবা টানটান করে তিতির স্মিত মুখে বসে আছে।

দেখে বোঝার উপায় নেই যে প্রিয় ঘরে প্রিয়তর বিছানায় শুয়ে, প্রিয়তম কোলবালিশ বুকে জড়িয়ে ধরেও বিগত কয়েকটি রাতে ঘুম হয়নি তিতিরের। চাকরিটা পর্যন্ত এখন অসহ্য লাগছে ওর। অনঘ-তিতিরের ভালবাসার মঞ্চে যবনিকাপতন হয়ে গেছে। প্রেমমাখা স্বর্ণময় তীরের তীক্ষ্ণ ফলা হৃদয় থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করলে ব্যথা অনিবার্য কিন্তু তিতির অপমান কিংবা বেদনার চেয়ে বেশি বিস্ময় বোধ করেছে। এত স্বাভাবিকভাবে সব কিছু শেষ করে দিল অনঘ! এইতো কিছুদিন আগে অনঘের আদর টাদর খেয়ে মেরুন বর্ণ ধারণ করেছিল গম রঙা তিতির; সেদিন হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসে কাঁপছিল। অনঘ যে প্রেমের বদলে তীরের মুখে বিষ মাখিয়েছিল তা বুঝতে আর বাকি নেই তিতিরের। সেই বিষে তিতির, তিতির না হয়ে নীলকন্ঠ পাখি হয়ে গেছে।

কফিটা গলা পর্যন্ত নামতেই তিতিরের মনে পড়ল এমন একটি কফিঘরেই অনঘ কেমন দুম করে বলে দিল সে আর তিতির কে ভালবাসে না। তিতির এখনও জানে না কেন অনঘের এমন দুর্দান্ত শিকড়-বাকড়ে জড়ান, ডাল পালায় ঈষৎ বিস্তৃত অথচ সুদৃঢ় ভালবাসা বাতাসের প্রবল ঠোকাঠুকি ছাড়াই মাটি থেকে এমন ভাবে উপড়ে গেল। আদৌ সেটা ভালবাসা ছিল কি না এ কথা ভাবতে ভাবতে তিতির তৃতীয়বার কফিকাপে ঠোঁট ছোঁয়াল। অনঘের ইন্টেলেকচুয়ালিটির মুখোশটা খুলে যাওয়াতে বরং নিজেকে নিরাপদ মনে হচ্ছে তিতিরের। তবুও একটু পর পর ওর চোখ চলে যাচ্ছে ফোনের ইনবক্সে। নো ম্যাসেজ। একটু নিরাশা। দু’টি মিসড কলের কোনটিই অনঘের নয়। তার অনুভূতির বাকি অংশ কষ্ট আর উদ্বেগে ভাগাভাগি করে নিল স্বল্পায়ু ভালবাসা।

তিতির ভাবছিল অতৃপ্ত আত্মার মতো কত দিন এ মৃত সম্পর্ক তাকে তাড়া করে বেড়াবে। কত ঝরা পাতা উড়ে যায় বাতাসে! পাতার সাথে ধুলোও ওড়ে। এ সবই তিতিরের জানা কথা। তবুও অকস্মাৎ চোখে ঢুকে পড়ে অজস্র উষ্ণ ধুলো আর বালুর কণা। চোখ থেকে বালু দূর করার জন্যই যেন তিতির বাবাই এর দিকে তাকাল। বাবাইও তাকিয়ে আছে তিতিরের দিকে। তিতির চোখ ফিরিয়ে নিল না, তাকিয়েই রইল। কফি শপ থেকে তিতির যেন চলে গেল নিঝুম রাতের জনমানবহীন প্ল্যাটফর্মে, সেখানে সারাদিনের কেনা-বেচার ঝামেলা মিটিয়ে চায়ের দোকানের ঝাপ ফেলে চলে গেছে দোকানি, স্টেশান মাস্টার কাজ শেষ করে অফিস ঘরে তালা দিয়ে ফিরে গেছে ঘরে। খুব একা একা লাগে তিতিরের। অনন্তকাল ধরে সে বাবাইয়ের দিকে নয় যেন রেললাইনের দিকে তাকিয়ে আছে; সুখের আশ্চর্য ট্রেন যেন ঐ অখ্যাত ছোট স্টেশনে কোন দিনও থামবে না!

বুকের ভিতরে পাক খেয়ে উঠে আসে কান্নাটা চাপাতে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে তিতির।

নিজেকে সামলে নেয়ার প্রানপণ চেষ্টা করে ও বলল, ‘জীবনানন্দের যেই সব শেয়ালেরা কবিতাটি পড়েছেন?’

‘পড়েছি’, বাবাই বলল, ‘বাংলায় কিন্তু ডাবল প্লুরাল হয় না তাই কবিতার নামটি আধিক্য দোষে দুষ্ট।’

সবাই চমৎকৃত হয় বাবাই এর কথায়। দেখা যাচ্ছে তিতির ছাড়া বাকি তিন জনের মধ্যে শুধু বাবাই এ কবিতা পড়েছে।

আবির বলে, ‘তাহলে যেই শেয়ালেরা এই নাম ঠিক হবে?’

সুমনা খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘কিংবা যেইসব শেয়াল হতে পারে।’

তিতিরের ওড়নার এক প্রান্ত লুটিয়ে পড়েছে মেঝেতে, আরেক প্রান্ত দেখা যাচ্ছে না। সেটি কাঁধে আটকে আছে হাতব্যাগের লম্বা স্ট্র্যাপের নীচে। তিতিরের ঔদাসীন্য লক্ষ্য করে বাবাই। কেন যেন তার মনে হয় ঝড়ো বাতাস আর মেঘের আস্ফালনে তিতিরের ভিতরটা একটা ছোট পাখির মতোই কাঁপছে। তিতির আর অনঘের আসন্ন বিয়ের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল বাবাই ঠিক তখনি তিতির সুমনার দিকে একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ঋষির জন্য।’

সুমনা প্যাকেট থেকে সাদা-কালো-বাদামী প্রিন্টেড টি শার্ট বের করে। ‘খুব সুন্দর কালার কম্বিনেশান!’ উচ্ছ্বসিত সুমনা বলল। ঋষি সুমনার তিন বছরের ছেলে। ‘ঋষির জন্য বড় হয়ে গেল নাকি?’ তিতির জিজ্ঞেস করে। টি শার্ট ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছে সুমনা, ‘বড় হলেই তো ভাল। ক’দিন পরেও পরানো যাবে।’ টিশার্টের ব্যাপারে বাবাই কিছু বলে না, তিতির-অনঘের প্রসঙ্গেও না। কি যে হলো বাবাইয়ের, আবিষ্ট হয়ে চামচ দিয়ে সে পেয়ালার কফি নাড়ছে। বাবাই তিতিরকে কিছু বলতে গিয়েও বলল না।



‘একটা জায়গায় বেড়াতে যাবে বাবুই আমার সাথে?’ বাবাই এর কথা শেষ হতে না হতেই বাবুই বলল, ‘যাবো,’ বাবাই এর হাত ধরে সে পৃথিবীর যে কোন জায়গায় চলে যেতে পারে।

টিয়া পাখির খেলা ভুলে বাবুই বার্বি ডলের চুল আঁচড়াচ্ছিল, বলল, ‘কোথায় যাবো?’

বাবাই বলল, ‘তুমি বলো।’

‘তুমি বলো,’ বাবুই তখনও বার্বির চুল আঁচড়াচ্ছে।

‘তুমি বলো,’ বাবাই বলল। এটা হলো বাবাই এবং বাবুই এর ‘তুমি বলো’ খেলা।

এবার বাবুই মিষ্টি করে হেসে বাবাই এর দিকে ফিরে তাকিয়ে বাবাই এর মুখে দুষ্টমীর হাসি দেখে বলল, ‘তুমিই বলো না!’

বাবাই রহস্যময় গলায় বলল, ‘অদূরপুর!’

‘অদূরপুর কোথায়,বাবাই?’

বাবাই ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘এইতো কাছেই, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে যেতে হয়, সুদূরপুরের পরেই অদূরপুর।’

‘এখনই বেরু করতে যাবো?’ বাবুই জিজ্ঞেস করেছিল।

‘না। এখন ঘুমু।’

‘বেরু!’ বাবুই এর গলা এক ধাপ উঁচুতে উঠে।

বাবাইয়ের গলা এক ধাপ নিচে নামে, ‘ঘুমু!’

বাবাই এর গলা জড়িয়ে ধরেছিল বাবুই, ‘শুধু তুমি আর আমি যাবো বেরু করতে?’

‘অন্য কাউকে সাথে নিতে চাও?’ বাবাই জিজ্ঞেস করেছিল।

‘টেডি, ডোরা,’ বাবাই এর কানে ফিসফিস করে বলে বাবুই, ‘আর মিস্টার ডিয়ার।’

ঘরে বাবাই আর বাবুই ছাড়া অন্য কেউ ছিল না তবু বাবুই ফিসফিস করে কথা বলছিল। সে যাই হোক, বাবুই এর গায়ের মিষ্টি গন্ধে নাক মুখ ডুবিয়ে বাবাই এর মন ভরে গিয়েছিল। বাবাই এর কাঁধে মাথা রেখে, গলা জড়িয়ে ধরে বাবুই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আক্ষরিক অর্থেই বাবাইয়ের বুকটা ভরে গিয়েছিল। অপত্যস্নেহে বাবাইয়ের চোখের কোণ কি ভিজে উঠেছিল? ভিজে উঠলেও তা বোঝা যাচ্ছিল না।



তিতিরের দেয়া টিশার্টের ব্যাগ পাশে নামিয়ে রেখেছে সুমনা। গোল মুখ, উজ্জ্বল বর্ণের চেহারা সুমনার, কাঁধ পর্যন্ত কালো চুলে বাদামী রঙের হাইলাইট করা। ওর চোখে কালো ফ্রেমের হাফ রীম চশমা, কপালে মেরুন টিপ। সাদা জমির উপর ছোট ছোট লাল-কালো বরফি বুটির মনিপুরী তাঁতের শাড়ি পরেছে সে। চওড়া লাল পাড় ঘেঁষে কালো টেম্পল মোটিফ। সে আনমনে চেয়ে আছে। কোনো বা কারো দিকে নয়। কিছুতেই কফি শপে মন বসছে না তার। শুধু তাকিয়েই আছে, কিছু দেখছে না কিংবা হয়তো দেখছে।

আকন্ঠ ডুবে আছে সুমনা মধুগন্ধে ভরা জীবনের প্রেমে। ভরপুর জীবন তার। হাসি আর গানের স্বর্ণশস্যে একেবারে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’ অবস্থা। স্বামী-পুত্র-সংসার নিয়ে ভরা ‘ছোট সে তরী’। তবু এক অতৃপ্তি তাকে তাড়া করে ফেরে। জীবনের এই আনন্দ মিশ্রিত দুঃখের মতো অতৃপ্তিকে সুমনা ভাল না বেসে পারে না। মনে মনে একটা ছবি আঁকছে সে, হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি গন্ধকে সে জল রঙের সাথে আঠা মিশিয়ে এঁকে যাচ্ছে। সুমনা হঠাৎ খেয়াল করল বাবাই স্বগতোক্তির মতো গাইছে -

কেবল তুমিই কি গো এমনি ভাবে রাঙিয়ে মোরে পালিয়ে যাবে

তুমি সাধ করে, নাথ, ধরা দিয়ে আমারও রঙ বক্ষে নিয়ো-

এই হৃৎকমলের রাঙা রেণু রাঙাবে ওই উত্তরীয়॥

সুমনা ভাবছে আকাশপাতাল। নাথ! কোথায় তুমি প্রেমময় সৃষ্টিশীল সর্বসত্তা? বাবাই একদিন সুমনাকে বলেছিল যে প্রাণই ঈশ্বর। প্রাণেই তাঁর আবির্ভাব এবং বসবাস। আত্মদর্শন। অনেকটুকু এগিয়ে গিয়ে পিছন ফিরে তাকানো। আলোর পাপড়ি মেলে দিচ্ছে সহস্র হৃৎকমল। পরমাত্মাকে রাঙ্গিয়ে দেয়ার কী করুণ আকাঙ্ক্ষা বাবাইয়ের! কী নিবিষ্ট কাতরতা। কে যে কাকে রাঙিয়ে দিচ্ছে প্রাণের খেলায় বোঝে না সুমনা। সেই রঙে এক ছবি আঁকতে চায় সে। পোট্রেট বলা যায়, সুমনা ভাবছে কোনও মুখায়ব। কেমন ঝাপসা, যেন মেঘাবৃত সে মুখ।

আড্ডার এক পর্যায়ে আবির সুমনা কে প্রশ্ন করল, ‘ইম্প্রেশানিস্ট শব্দটি কিভাবে এলো?’

সুমনা বলল, ‘ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মানে-দেগা-মনের জন্য নতুন শিল্পরীতি প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন একটা কাজ ছিল।’ এটুকু বলে থেমে যায় সুমনা। কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। এই বুঝি সরে গেল মেঘটা... যাহ্‌, হাওয়ায় ভেসে হারিয়ে গেলো সে মুখ। প্রভু! পোট্রেট না হয়ে জীবনের মতোই নানান কিছুর বিক্ষিপ্ত টুকরো সেঁটে কোলাজ হয়ে যাচ্ছে ছবিটা।

আবির বলে, ‘কি হলো, সুমনা?’

বাবাই একটু হাসল, ‘কী যে এলোমেলো কথা বলো, সুমনা! ক্লদ মনের একটি ছবির নাম ছিল ইম্প্রেশানঃ সানরাইজ। সমালোচনা করে বলা হয়েছিল এই ছবিটিতে ইম্প্রেশান আছে কিন্তু সানরাইজ নেই। তারপর থেকেই বিদ্রুপ করে ঐসব শিল্পীদের ইম্প্রেশানিস্ট বলা হতো।’

অপ্রস্তুত গলায় সুমনা বলে, ‘আমি তো ঠিকই বলছিলাম।’

‘ঠিক বলোনি! তুমি আবিরের প্রশ্নটি খেয়াল করনি, তোমাদের কথা আমি শুনছিলাম। ইম্প্রেশানিস্টদের উৎপত্তি আর প্রতিষ্ঠা আলাদা দুটি প্রসঙ্গ।’

বাবাই এর কথা শুনে লজ্জিত হাসি হাসে সুমনা। বেচারী এখনও বুঝতে পারছেনা নিজের অজান্তে কি অপ্রাসঙ্গিক কথা সে বলল। আজকে ক্ষণে ক্ষণে সুমনা অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। সাধারনত বাবাইয়ের কথা সে মনোযোগ দিয়ে শুনে। বাবাই অন্যরকম। বাবাইয়ের কথা শুনলে সুমনার ভাবনাতানপুরার তারগুলো বেশ টিউনড হয়ে যায়। স্ প র্স র্স। সারগামের সুরে ভাবনারা ভাসতে থাকে। কখনও অহি ভৈঁরো, কখনোও রাগ ইমন। তখন চোখ বুজলেই সুমনা দেখে রংধনুর রঙের আবেশে অজস্র নোটেশান কেঁপে কেঁপে ভেসে যাচ্ছে। ভাবনাগুলোর বাতাসে মিলিয়ে যাবার একটা প্রবণতা আছে। সুমনা তাই ভাবনাগুলোকে কাগজে-কলমে জড়িয়ে ধরে রাখে।

ডান হাত কফির পেয়ালা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাঁ হাত দিয়ে কপালের উপর লুটোপুটি খাওয়া এক গুচ্ছ কেশচূর্ণ ঠেলে পিছনে সরিয়ে দেয় সুমনা। এমন সন্ধ্যার ছায়ামাখা পড়ন্ত বিকেলে ইমন কল্যাণের সুর বাজার কথা ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। বার বার সুমনার মানশ্চক্ষে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে এক অস্পষ্ট মুখ। স্বরলিপির শুদ্ধ ম স্বরটি সামান্য হেলে কেন যেন কোমল ম এর সুরে লাগছে না।

‘পানিটা দাও’, বলল তিতির। আবির পানির বোতল তিতিরের হাতে দিল। বাবাই, আবির আর তিতির কথা বলছে। সুমনার আশেপাশে কয়েকটি শব্দ- রেনোয়াঁ, মোনালিসা, রেনেসাঁ- পায়রার মতো ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে গেল। ‘পাবলো’ শব্দটি শুনল সে কিন্তু নেরুদা, কোয়েলহো নাকি পিকাসো তা বুঝতে পারল না।

বাবাই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে সুমনার কাছে জানতে চাইল, ‘ঋষির স্কুল কবে থেকে আরম্ভ হবে?’ এখনও সুমনার কাছে কফির সুবাস ছাপিয়ে কার্তিকের ফুল পাতা ছড়ানো বৈকালিক গন্ধ আসছে ঝলক ঝলক। গন্ধটাকে কল্পনা করছে সুমনা। বেশ উড়ছিল সে; বাবাইয়ের কথা শুনে মনের ডানা গুটিয়ে মর্ত্যলোকের কফিশপে নেমে এল। ‘নেক্সট অগাস্ট’, বলল সুমনা। সুমনা লক্ষ্য করে বাবাইয়ের চোখ আবারও কালোবেল্ট হাতঘড়ির সাদা ডায়ালের দিকে।



ডান হাতে বাবাইয়ের বাম হাতের তর্জনী মুঠো করে ধরে হাঁটছিল বাবুই। বাবাইয়ের হাত ধরে হাঁটার পরও হাঁটায় তাল মিলানো যাচ্ছিল না। অনেকটা পথ হেঁটে বাবুই থেমে গিয়েছিল, দু’হাত উপরে উঠিয়ে বলল, ‘কোলে নাও, নাও না!’ বাবাই বলল, ‘উঁহু, হাঁটতে হবে।’

বাবুইয়ের গোলাপি ঠোঁট কেঁপে উঠেছিল কান্নায়, ‘অদূরপুর পচা!’ চোখ উপচে পানি পড়ে বাবুইয়ের।

‘কোলে নিচ্ছি, মা’, বলে বাবাই বাবুইকে কোলে তুলে নিতেই সে হেসে উঠেছিল আর বাবাইয়ের গালে চুমু খেয়েছিল জল টলমল চোখে। কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে বাবাই একই সাথে কিছু মেঘ আর কিছু রোদ্দুর দেখেছিল।

বড় বড় পাতায় ছাওয়া একটা বাদাম গাছের ছায়ায় বসে বাবুই কে জিজ্ঞেস করেছিল বাবাই, ‘তুমি পাখি হবে, বাবুই?’

‘পাখি আমার বন্ধু হবে?’ বাবুই উত্তর না দিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন করেছিল।

‘হবে’, বলে ছোট একটা ডাল হাতে নিয়ে বাবাই মাটিতে একটা প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলছিল। কয়েকটা আঁচড় কাটতেই ক্রমশ সেটা চমৎকার পাখি হয়ে উঠছিল। বাবুই নিশ্চিত হতে চাইছে, ‘বাবাই, তুমিও কি পাখি হবে?’

‘তা হবো’, বাবাই বলল, ‘তুমি আর আমি উড়ে উড়ে ঐ চাঁপা গাছটার ডালে গিয়ে বসব।’

বাবাইয়ের কোলে একটি হাত রেখেছিল বাবুই, ‘তুমি কিন্তু আমাকে একা রেখে উড়ে যেয়ো না তাহলে আমি ভয় পাবো!’

‘তুমি ভীতুর ডিম একটা!’ বাবাই বলল। বাবাইয়ের কথা শুনে খিল খিল করে হেসেছিল বাবুই।

চোখ দুটি বুজে মনে মনে হলদে পাখি হয়ে উড়ে গিয়েছিল বাবাই আর বাবুই। কত রকম খেলাই যে বাবাইয়ের সাথে খেলে বাবুই! বাবুই এই খেলাটার নাম দিয়েছিল ‘পাখি-পাখি’।



শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ কফি ঘরের বাতাসে কেনি জির দ্য মোমেন্ট ভাসছে। আবিরের মন প্রসন্ন। কয়েক দিন ধরে তার মা অসুস্থ হলেও আজকে সকাল থেকে মায়ের শরীরটা ভাল, এমনকি এক কাপ চা পর্যন্ত বানিয়ে আনলেন আবিরের জন্য। আবির ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়, জনপদ-সাগর-জঙ্গল-পাহাড় সর্বত্র। শিল্প-সাহিত্যানুরাগী, গান ভাল বোঝে কিন্তু গাইতে গেলেই তার সম গিয়ে সপ্তকে ঠেকে।

অসাধারণ প্রানবন্ত এবং সুদর্শন একজন মানুষ আবির। সর্ট কুর্তা আর ক্যাসুয়াল প্যান্ট এ আবিরকে বেশ ট্রেন্ডি দেখাচ্ছে। ইদানীং এক ভীষণ ঝামেলায় পড়েছে আবির। তিতিরকে ভালো লাগার তীব্র এক অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে রাখছে সারাক্ষণ। সেই ভালো লাগা সদ্য ভালোবাসা হয়ে অচিন বনের সোনাঝুরির ডাল পেরিয়ে, ভাঙ্গা পাঁচিল টপকে, মনের এক চিলতে উঠোনে এসে পড়েছে। জগৎ এখন তিতিরময়।

টেবিল থেকে পানির বোতল নিয়ে তিতিরের হাতে দিতে সময় লেগেছে তিন সেকেন্ডের সামান্য বেশি কিন্তু পুরোপুরি চার সেকেন্ডও নয়। ঠাণ্ডা পানির বোতলে হাত রাখতেই আবিরের মনে হলো, যে পথ চলে গেছে তিতিরের মনের দিকে তার দু’পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ ফুলে ফুলে ভারাবনত হয়ে আছে। সারাটা পথ জুড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের ডাল-পাতা ছুঁয়ে আসা আলোছায়ার আলপনা আঁকা। কোন এক চিত্রী যেন পথে পথে তুলি দিয়ে আলো আর ছায়া এঁকে রেখেছে। কেন যে তার পথগুলো এসে তিতিরের পথেই মিলে যায়! আহ, তিতির! পৃথিবীর সমস্ত রূপ-সুগন্ধ-মাধুর্য নিয়ে এ পথ দিয়ে বাতাস বয়ে যায় শুধু তোমাকে ছুঁয়ে যাবে বলেই। এ হাওয়ার সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই।

তিতির কে ছুঁয়ে আসা দিকহারানো বাতাস কৃষ্ণচুড়ার পাতায় পাতায় মর্মরিত হয়। পাতার সাথে কেঁপে উঠে আবিরও। তিতিরের স্পর্শ ছাড়াই। পথের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে আবির। এতেই তার আনন্দ। যা কিছু সুন্দর, তা দূর থেকে দেখাই ভাল। কাছে গেলেই ভুল-ত্রুটিগুলো বড় বেশি চোখে ধরা দেয়। যা কিছু নিজস্ব তা গোপন থাকাই শ্রেয়। না-বলা ভালবাসার মৌতাতে বিভোর হয়ে তিতিরের কথা ভাবতে ভাল লাগে আবিরের। আবিরের খুব জানতে ইচ্ছে করে যেদিন মেঘের আর হু হু করে বয়ে যাওয়া বাতাসের, সেদিন কি তিতিরের মন আর্দ্রতায় ভিজে যায়? আলো সম্পর্কে কি ভাবে তিতির? কিংবা অন্ধকার? বৈশাখের ভোরের হাওয়া কেমন লাগে তিতিরের? সময় দ্রুততম। তিন সেকেন্ড পেরিয়ে গেল। পানির বোতল এখন তিতিরের হাতে।

বাবাই জিজ্ঞেস করলো, ‘কবে বিয়ে করছ, আবির?’

আবির তিতির কে নিয়ে চিন্তার জাল বুনছিল। তীব্রতম সুখে চিনচিনে সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করছে সে। বুকের কোনখানে তা ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারছে না। কফির পেয়ালা হাত থেকে নামিয়ে রেখে আবির বলল, ‘আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এই কথা? আপনিই তো বলেছিলেন যে বেশি জড়িয়ে রাখতে গেলে ভালবাসার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যায়!’

‘মানব সভ্যতার বিকাশে পরিবার, দাম্পত্য, গার্হস্থ্য ব্যাপারগুলোর অবদান কি অস্বীকার করা যায়’ তিতির বলে।

‘একা আমিতো ভালই আছি,’ আবির বলল।

‘মানব-মানবী একে অন্যকে পরিপূর্ণ করে তোলে। কেউ কি সত্যি স্বয়ংসম্পূর্ণ?’ সুমনা বলে, ‘চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনায় মিলে মিশেই জীবন কেটে যায় নর-নারীর।’

‘দেখো,’ সোফার বাঁ দিকের হাত রাখার জায়গায় সামান্য ভর দিয়ে বলল বাবাই, ‘নিঃসন্দেহে মানব-মানবী একে অন্যের পরিপূরক। কিন্তু স্বেচ্ছারোপিত একাকীত্ব কারো জন্য আনএ্যভয়েডেবল হতে পারে। দৈনন্দিন দাম্পত্যের টানা-পোড়েন আর অভ্যস্ততার চক্রে যে লেজে-গোবরে হতে চায়নি তার জন্য দাম্পত্য জীবন রীতিমত দুর্বিষহ।’

‘এটা ঠিক বলেছেন। কেউ একা বাঁচতে চাইলে তার সেটাই করা উচিৎ, মরে মরে বেঁচে থাকার চেয়ে যদি আনন্দ নিয়ে একা বেঁচে থাকা যায় তাহলে একাকীত্বে এত দ্বিধা কেন?’ তিতির বলল।

‘নিজের মনে যদি রাজা হয়ে থাকা যায় তবে পরাধীনতায় কে বেঁচে থাকতে চায়?’ আবিরের কথা তিতিরের সাথে বেশ মিলে গেল।

‘এই যে এমন রাজা’, সুমনা আবির কে বলল, ‘রানী ছাড়া রাজাকে ভাবা যায়? প্রেক্ষাপট পৌরাণিক বা সমসাময়িক যাই হোক না কেন।’

‘রাজর্ষি শব্দটি ভুলে গেছো? রাজা হয়েও যে ঋষির মতো জীবনযাপন করে!’ বাবাইয়ের কথায় বৈরাগ্য ঝরে পড়ে।

‘সবাই দেখি আজকে ঘর-ভোলানো সুরে গাইছে!’ ছদ্ম বিস্ময়ে সুমনা বলল।

‘লোকালয় ছেড়ে নির্বাসনে যাওয়ার প্ল্যান আছে নাকি?’ তিতির আবির কে জিজ্ঞেস করে।

‘না, কোনো দিন বিয়ে করব না এমন কিছু তো বলিনি, চলার পথে একেক সময় একাকীত্ব বহন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।’ আবির বলল তিতিরের দিকে তাকিয়ে।

‘তাহলে, জীবনে ইচ্ছাকৃত ভাবে কিছু শূন্যস্থান রেখে দেয়া ভাল, এইতো?’ প্রশ্ন করে সুমনা।

‘প্রকৃতি অথবা শিল্পের মতোই জীবনে কিছু ফাঁক ফোকর থাকুক না, ক্ষতি কি সুমনা?’ আবির বলে।

‘সেই শূন্যস্থান যে যার মতো করে কল্পনার রঙ আর ভাবনার মায়ায় ভরে নাও!’ কথাটি বলে বাবাই স্বপ্নগ্রস্ত হয়ে গেল।

আবিরের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আসাধারণ। সবার সাথে থেকেও বাবাইয়ের মন যে অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। এত সাধারণ থেকেও বাবাইয়ের অসাধারণত্ব তাকে মুগ্ধ করে রাখে। আবিরের মনে হয় বাবাই নিজেই এক উদাস রাজর্ষি ।



নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল বাবাই আর বাবুই। নদীতে নৌকা ভেসে যাচ্ছিল সাথে কচুরিপানা আর মেঘের ছায়া। নদীর উপর থেকে ভেসে আসা বাতাসে বাবুই এর রেশমি চুলগুলো উড়ছিল। বাবাইকে সে বলল, ‘নদীর কাছে আসলে বসতে হয়, তাইনা বাবাই?’

বাবাই হাসে মেয়ের কথা শুনে। ‘হুম’, বলে বাবাই চারপাশে তাকিয়ে দেখল। তারপর শুকনো বালু দেখে বাবুই কে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল।

‘বাবাই, নদীতে কি পুকুর থাকে?’

‘না, পাখি, সবচেয়ে ছোট নদী কে পুকুর বলে।’

বাবাই প্রশ্ন করে বাবুইকে, ‘আমরা এখানে কেন এসেছি জানো বাবুই?’

‘কথা বলতে!’

‘ভাল বলেছ। তোমার কথা একজন বিশ্ব বিখ্যাত মানুষ তাঁর গল্পে বলে গেছেন জানো?’

‘কে?’ খুব আগ্রহ নিয়ে বাবুই জানতে চায়।

‘তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গল্পে অবশ্য তোমার নাম বাবুই নয়।’

‘তাহলে আমার নাম কি?’

‘গল্পে তোমার নাম মিনি, সে গল্পেও তুমি একদণ্ড কথা না বলে থাকতে পারো না!’

বাবাইয়ের বেশির ভাগ কথাই বাবুই বুঝতে পারে না। শুধু বাবাইয়ের সাথে থাকতে ওর ভাললাগে। বাবাইয়ের হাত ধরে হাঁটতে ভাললাগে। তরুণ রবীন্দ্রনাথের চেহারা বাবুই চিনেছিল বাবাইয়ের পড়ার টেবিলের ওপর রাখা সঞ্চয়িতার প্রচ্ছদ দেখে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। তবে রবীন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে গল্প লেখায় বাবুই খুশি হয়েছিল।

‘বাবুই, তুমি নিজেকে দেখেছ?’ বাবাই জিজ্ঞেস করল বাবুইকে।

‘দেখেছি,’ বাবুই হাসি মুখে বলল।

‘কি দিয়ে দেখেছ?’

‘বাবাই দিয়ে।‘

বাবাই হেসে ফেলেছিল বাবুই এর কথা শুনে, ‘আর?’

‘আয়না দিয়ে।’

‘চোখ দিয়ে?’

বাবুই কয়েকবার হ্যাঁসূচক মাথা নেড়েছিল।

‘মন দিয়ে তুমি নিজেকে দেখো বাবুই। চোখ দিয়ে আয়নায় কি সবটুকু দেখতে পাওয়া যায়?’

বাবুই বাবাইয়ের কথার এক বর্ণও বুঝতে পারছিলনা।

বাবাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তুমি ভিতরটাকে দেখবে মন দিয়ে।’

‘দেখব। যখন আমি তোমার মতো বড় হবো তখন!’ বাবুই কিছু না বুঝেই বলেছিল।

বাবাই বসেছিল বাবুইয়ের ছোট্ট হাত ধরে। নদীর দিকে তাকিয়ে বাবুই দেখছিল লাল রঙ গুলিয়ে কেমন করে পানিতে মিশে যাচ্ছে সূর্য। অস্তাচলের দিকে তাকিয়ে বাবাই ভাবছিল ক্ষণস্থায়ী মানব জীবনের কথা। বাবাই স্তব্ধ হয়ে বসেছিল। মহাকালের পদপ্রান্তে জীবন কী তুচ্ছ অথচ জীবনের কী দুর্দান্ত প্রতাপ, কী প্রচণ্ড তার শক্তি! ভাবনার একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরে নেমে গিয়েছিল বাবাই। জীবনকে একটি অর্ধপঠিত বই বলে মনে হয়েছিল তার। যার শেষ পাতাগুলো কখনই উল্টানো হয়ে ওঠে না। গ্রন্থিক অবিরাম লিখে চলেছে অথচ পাঠকের কাছে চিরকালের অজানা রয়ে যায় শেষাংশ। প্রাণ ভরে জীবনটাকে যতদূর সম্ভব পড়ে যায় বাবাই। সম্মোহিত হয়ে দিনের ফুরিয়ে যাওয়া দেখছিল বাবাই আর বাবুই। গোধূলির ম্লান আলোয় বাবাইয়ের জীবনবোধ তরঙ্গায়িত হয়ে ছুঁয়ে গিয়েছিল বাবুইকে। বাবাই এবং বাবুইয়ের অজ্ঞাতেই।



অবশেষে ওদের কফি পান শেষ হয়। ওরা চারজন কফি শপের বাইরে এসে দাঁড়ায়। আবির এখন তাকিয়ে আছে তিতিরের দিকে, তিতির সুমনার দিকে, সুমনা বাবাইয়ের দিকে আর বাবাই আবিরের দিকে। দৃষ্টির একটা চতুর্ভুজ তৈরি হয়েছে। তিতির সুমনা কে যাওয়ার পথে নামিয়ে দিবে। আবির বিদায় নিয়ে চলে গেল।

বাবাইয়ের দিকে তাকাল সুমনা তারপর বলল, ‘সবাইকে ভালবেসে গেলেন, কিন্তু আপনাকে ভালবাসার অধিকার কাউকে দিলেন না। আশ্চর্য নির্জন মানুষ আপনি!’ সুমনার কার্তিকের বাতাসে তামাকের গন্ধ এসে মিশে যায়।

‘অধিকার!’ অস্ফুট প্রতিধ্বনি বাবাইয়ের স্বরে। বাবাই এর ঠোঁটে মৃদু হাসি উঁকি দেয়। বাবাই বলে, ‘বাড়ী যাও, সুমনা।’

তিতির কিছু না বলে বাবাইয়ের জ্বলন্ত সিগারেটের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ওদের পিছনে ফেলে বাবাই হাঁটতে থাকে আর বাবুইয়ের কথা ভাবে। গতকাল রাতে বাবুইকে প্রথমবার দেখেছিল বাবাই। জেগে থাকার খানিকটা সময় পর যখন তার দু’টি চোখের পাতা ক্লান্ত হয়ে এসেছিল। “চাঁদ আমার হাত ধরেনি” এরকমই কিছু একটা বলেছিল বাবুই অভিমান করে। তারপর কি হয়েছিল? কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে আজ সারাটা বিকেল বাবুই এর কথা মনে করার প্রানপণ চেষ্টা করেছে বাবাই।

প্রায় কিছুই মনে পড়ে না, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে বাবাইয়ের। বাবুই যেন বাবাইয়ের মতোই একাকী। বাবাইয়ের মনে হয় বহুদূরে কোথাও নিঃসঙ্গ বাবুই অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। ‘কোথায় গেলি, বাবুই? ঘুমিয়ে গেছিস?’ বাবাই রোদে, চাঁদে, পাখির ডানায়, চাঁপা গাছের ডালে বাবুইকে খোঁজে। ‘এবার তোকে নিয়ে বন-পাহাড়ে পালিয়ে যাব, আর ফিরব না!’ নিজের মনে বলে বাবাই। বাবাই আর বাবুইকে কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।

বেদনায় নীল নিঃস্ব জরায়ুর মতো বাবাইয়ের পিতৃহৃদয়ের শূন্য নিলয়-অলিন্দ নীলাভ হয়ে যায়। বাবাই হাঁটতে থাকে। আত্মমগ্ন। গতকাল রাতে বাবুইকে শেষবার দেখেছিল বাবাই। জেগে ওঠার ঠিক খানিকটা সময় আগে।


লেখক পরিচিতি
ইশরাত তানিয়ার জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৮০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে পিএইচডি করছেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। কবি। গল্পকার। মানবিক সম্পর্ক, নৈরাশ্য, স্বপ্ন, প্রকৃতি, প্রেম, অতীন্দ্রিয়তা বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি এবং ভাবনা কেন্দ্র করে তাঁর সাহিত্যকর্ম আবর্তিত হয়েছে।

৩টি মন্তব্য:

  1. প্রথম তোমার কবিতা পড়ে চমকে উঠেছিলাম। অতহপর তোমার কবিতার আমি নিয়মিত পাঠক। তোমার কবিতায় আমি একটা অনির্দেশ্য অভিযোগ পাই যা প্রায়শই বেদনার গাঢ় রংগে রাংগানো এবং অভিমাননী। এই প্রথম তোমার কোন গদ্য পড়লাম। এখানেও সেই বিষন্ন অভিমানের ঝুরো মেঘ যা পাওয়াকে নাপাওয়ার চেয়েও মহৎ করে তোলে, আর এইতো শিল্পের চিরকালীন জয়। তোমাকে বোন বলে ভাবতে ভাল লাগে। তুমি দাদাকে অহঙ্কৃত করেছ।

    উত্তরমুছুন
  2. প্রথম তোমার কবিতা পড়ে চমকে উঠেছিলাম। অতহপর তোমার কবিতার আমি নিয়মিত পাঠক। তোমার কবিতায় আমি একটা অনির্দেশ্য অভিযোগ পাই যা প্রায়শই বেদনার গাঢ় রংগে রাংগানো এবং অভিমাননী। এই প্রথম তোমার কোন গদ্য পড়লাম। এখানেও সেই বিষন্ন অভিমানের ঝুরো মেঘ যা পাওয়াকে নাপাওয়ার চেয়েও মহৎ করে তোলে, আর এইতো শিল্পের চিরকালীন জয়। তোমাকে বোন বলে ভাবতে ভাল লাগে। তুমি দাদাকে অহঙ্কৃত করেছ।

    উত্তরমুছুন
  3. কৃতজ্ঞতা দাদা! আশীর্বাদ করবেন যেন নিজেকে উত্তরোত্তর অতিক্রম করে যেতে পারি।

    উত্তরমুছুন