বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

রমাপদ চৌধুরীর গল্প : আজকের গল্প

ব্যাপারটা ঘটেছিল গত পূজোর সময়। কিন্তু এমন ঘটনা বোধ হয় প্রতিদিনই ঘটছে, প্রতি মুহূর্তে।

তিন টাকা বারো আনা দিয়ে এক জোড়া জুতো কিনেছিলাম, আমার আড়াই বছরের মেয়ের জন্যে। তার ছোট ছোট পায়ের মাপমতো এক জোড়া লাল টুকটুকে জুতো খুঁজে বের করেছিলাম, অনেক ঘুরে, অনেক ভিড় ঠেলে।

বুলার তখনই দু’দশটা বুলি ফুটেছে মুখে, আধো-আধো উচ্চারণের দু-একটা পাকা-পাকা কথাও। পূজোর সময় সকলের জন্যেই কিছু না কিছু কেনা হয়, কেনাকাটাই রীতি।


তাই বুলাকে কাছে ডেকে বললাম, তুমি কি নেবে বুলা? কি আনব তোমার জন্যে?

আধো-আধো উত্তর দিল বুলা।--দুতো।

হেসে বললাম, দুটো তো বুঝলাম, কি? লজেঞ্জ?

--না, না, দুতো। প্রতিবাদে মাথা নাড়ল বুলা।

‘দুতো’ যে ‘দুটো’র শিশুভ্রংশ, সে বিষয়ে সন্দেহ করার কারণ ছিল না। তাই একে একে অনেক জিনিসের নাম করে গেলাম। অর্থাৎ কোন্‌ জিনিসটি চায় সে, জেনে নেবার জন্যে। আর প্রতিবারেই সে সজোরে ঘাড় নেড়ে বলে ওঠে, না, না, দুতো।

শেষ পর্যন্ত সে বোধ হয় আমার বুদ্ধি সম্পর্কে নিরাশ হয়েই বললে, দুতো দানো না, দুতো। পায়ে থাকে? বলে নিজেই ছুটে গিয়ে তার দাদুর ভারি চটিজোড়া পায়ে গলিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে এল।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম।

বুঝলাম প্রশ্ন করার আগেই বোঝা উচিত ছিল। কারণ সারাটা দিন এই একটিই কাজ বুলার। কেউ জুতো খুলে রাখলেই হল। বুলা তার জুতো, চটি বা স্যান্ডেলের ফোকরে আড়াই ইঞ্চি মাপের ক্ষুদে ক্ষুদে পা জোড়া ঢুকিয়ে দেবে, আর সারা বাড়ি টেনে টেনে বেড়াবে সেই জুতো জোড়া। এবং শেষ পর্যন্ত সেটা যে কোথায় রেখে আসবে, ঠিক-ঠিকানা নেই। খুঁজে বের করা দুরূহ।

তাই সকলেই একবাক্যে বললে, হ্যাঁ, ওর জন্যে এক জোড়া ভাল দেখে জুতো কিনতে হবে।

বাবা বললেন, সেই মখমলের জুতো চাই--লাল মখমলের ওপর সোনালী জরির কাজ…

বললাম, ওর জন্যে আবার দামী জুতো!

সকলেই প্রতিবাদ করে উঠল তীব্র স্বরে।--দামী জুতো তো ওদের জন্যেই।

বাবা শুধু বললেন, দামী কেন হবে, এক টাকা দু আনা করে তো দাম ছিল।

এক টাকা দু আনা! হেসে বললাম, সে মান্ধাতার আমলে ছিল।

বাবা বললেন, মান্ধাতার আমলে নয়, এই ঊনচল্লিশ সালেও ছিল। মঞ্জরীর মেয়ের জন্যে কিনেছিলাম সেবার। তা সব জিনিস তো চার গণ দাম বেড়েছে, গভর্নমেন্টই বলে, তা হলে এখন দাম বড় জোর সাড়ে চার টাকা।

নিজের পকেটের দৌঁড় যা-ই হোক না কেন, সাড়ে চার টাকা দামের কোনও জিনিসকে আজ আর দামী বলার উপায় নেই। মাছ হঠাৎ একদিন আড়াই টাকা সের পাওয়া গেলে রীতিমত উল্লাস দেখা দেয় সকলের মুখে-চোখে, আপিসে সারাটা দিন আলোচনা চলে--মাছ সস্তা হয়ে গেছে।

তাই বাধ্য হয়েই বলতে হল, দেখব যদি পাওয়া যায়।

পাওয়া যে যাবে না, আমি জানতাম। প্রথম প্রথম বুলাকে সঙ্গে নিয়েই দোকান দোকান ঘুরলাম, শু-শোভিত ফুটপাতের দেয়াল থেকে বড় বড় দোকান অব্ধি।

শেষে আশাভরসা ছেড়ে দিয়ে বুলার ছোট ছোট পায়ের মাপ নিতে হল কাগজের ওপর পেন্সিলের দাগ কেটে। এবং সেটা কাবুলিওয়ালার মেয়ের পাঞ্জার ছাপের মতো সযত্নে ভাঁজ করে পকেটে রেখে সারা কোলকাতা চষে বেড়াতে হল।

একটা করে দোকানে ঢুকি আর রেডিওর অনুরোধের আসরে রেকর্ড বাজানোর মতো একই অনুরোধ বারবার : লাল মখমলের ওপর সোনালি জরির…

কথা শেষ করার আগেই দোকানদার না-বাচক ঘাড় নাড়ে। কেউ কেউ সতেরো রকমের চামড়ার নাম করে, কেউ বা বলে, ওসব আজকাল চলে না মশাই, প্লাস্টিক নিন, প্লাস্টিকের নতুন ডিজাইন…

আমার বাড়ির গলির মুখেই তো কয়েকটা জুতোর দেয়াল-দোকান আছে, তা হলে আর এতো দূর আসব কেন।

শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিতে হল, কারণ এক জোড়া মনের মতো জুতো খুঁজতে খুঁজতেই সপ্তমীর দিন এসে গেল।

সুতরাং বাধ্য হয়েই সাদাসিধে এক জোড়া জুতো কিনে আনতে হল তিন টাকা বারো আনা দিয়ে। লাল টুকটুকে এক জোড়া জুতো। দুপাশে সাদা বোতাম।

আর সে জুতো পেয়ে কি ফুর্তি বুলার।--আমার দুতো? আমার?

বললাম, হ্যাঁ, তোমার।

জুতোমোজা পরিয়ে দিতেই গটগট করে হাঁটতে শুরু করল সে, ওপরে নীচে, এ-ঘর ও-ঘর। যেন কত বড় একটা সম্পদ পেয়েছে। শুধু কি তাই, বোধ হয় জুতো পেয়ে সে নিজেকে অনেক বড় মনে করল, ভাবতে পারল, সেও বড় হয়েছে। তার চোখে জুতোটাই বোধ হয় প্রবীণতার একমাত্র প্রতীক।

তিন টাকা বারো আনার মধ্যে যে কারও এক-পৃথিবী আনন্দ থাকতে পারে, তার আগে কোনওদিন মনেই হয়নি।





সন্ধের সময় বাড়ি ফিরেই দেখি, সা্মনের গলি দিয়ে কাতারে কাতারে লোক চলেছে প্রতিমা দেখতে। সমস্ত শহরটাই যেন আলোয় উজ্বল হয়ে উঠেছে। শাড়ি, গাড়ি, আলো, বাজনা। সকলের কাছে বুঝি এমনি এক-একটা তিন টাকা বারো আনার বৃত্তে পৃথিবীর সব আনন্দ বাঁধা আছে। দোষ কি আড়াই বছরের ছোট মেয়ে বুলার!

কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই দেখি সকলেই কেমন বিচলিত। বাবার মুখ গম্ভীর, আরও গম্ভীরতা আড়াই বছরের ছোট মুখে।

কি ব্যাপার! ব্যাপার গুরুতর। বুলার এক পাটি জুতো পাওয়া যাচ্ছে না।

পাওয়া যাচ্ছে না? কেন? কি হল?

শুনলাম একে একে।

সকলেই যখন নিজের নিজের সাজ-পোষাক নিয়ে ব্যস্ত, প্রতিমা দেখতে যাবার জন্যে, তখন বাচ্চা মেয়েটাও ব্যস্ততা দেখিয়েছিল। জুতোমোজা পরিয়ে দিতে বলে ছিল। আর যেহেতু তাকে বলা হয়েছিল, আমরা আগে কাপড় পরে নিয়ে তোমাকে জুতো জামা পরিয়ে দেব, সেই কারণে রেগে গিয়ে এক পাটি জুতো জানালা গলিয়ে ফেলে দিয়েছে সে।

ফেলে যে দিয়েছে তা স্বীকার করেছে বুলা নিজেই। এবং ফেলে দিয়ে মুখ গম্ভীর করে বসে আছে সে।

চাকর-ঠাকুর, বাবা, আমি--সকলে মিলে নিচের রাস্তা, ফুটপাত তন্নতন্ন করে খুঁজলাম।

না, কোথাও নেই। হয়তো এই চলমান ভিড়ে পায়ে পায়ে কোথাও নিরুদ্দেশ হয়েছে এক পাটি জুতো।

মনটা সকলেরই খারাপ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত যদি বা এক জোড়া জুতো কেনা হল, তা একটা দিনই পরা গেল না, পুজোর দিন ক’টাও পরতে পেল না বেচারী।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর হাল ছেড়ে দেওয়া হল। ভাবলাম, সকালে গিয়ে আরেক জোড়া কিনে আনব। আরও তিন ্টাকা বার আনা। তা হোক।

কিন্তু সকালে গণশা বাজার থেকে ফিরে এসেই খবর দিলে, জুতো পাওয়া গেছে।

--কোথায় পাওয়া গেছে?

গণশা বললে, হ্যাঁ, পাওয়া যাবে।

সে আবার কি কথা!




সমস্ত ব্যাপারটা শুনে তো হেসে বাঁচি না। বলে কি! তাও কি কখনো হয়। গণেশ নিশ্চিত মিছে কথা বলছে। আর মিছে কথা বলাটাই তো ওর পক্ষে স্বাভাবিক। অর্থাৎ ওর সব কথাই যেখানে অবিশ্বাস্য মনে করা আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক, সেখানে সত্যিই কিছু অবিশ্বাস্য বলে বসলে বিশ্বাস করব কি করে। এককালে যা কিছু হারাত, গিন্নিরা বলতেন, কেষ্টা বেটাই চোর, এ যুগে সেটা স্পষ্ট করে বলার সাহস কারও নেই, কারণ সঙ্গে সঙ্গে এ যুগের কেষ্টারা কাঁধে শার্ট ফেলে পকেট থেকে চিরুনি বের করে অ্যালবার্ট কেটে টিনের স্যুটকেসটি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে। এবং তারপর ভোরে উঠে কয়লা ভাঙা থেকে করে রাত্তিরে মশারি টাঙানো অবধি শুনতে হবে, আনতে তো পারো না একটা, চাকর-বাকর তাড়াতেই ওস্তাদ...ইত্যাদি।

তাই ভয়ে ভয়ে বললাম, দূর, তাই কখনো হয়।

গণেশ গলার স্বর চড়াল। --দেখে এলুম, চলুন না দেখিয়ে দিচ্ছি।

ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, এক পাটি হারানো জুতো পাওয়া গেছে, অর্থাৎ এক পাটি জুতোর হদিস পাওয়া গেছে। গলির মোড়ের অসংখ্য দেয়াল-দোকানের একটিতে নাকি সেটি টাঙানো আছে--নীচে দাম লেখা আছে বারো আনা।

রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে তারা--এ কথা নাকি স্বীকার করেছে, কিন্তু বারো আনা দাম দিয়ে কিনতে হবে।

হারানো জিনিস কুড়িয়ে পেলে অনেকে ফেরত দেয়, কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়, পুলিসে জমা দেয়, কত কি তো জানা ছিল। এমন কথা কখনো শুনিনি যে, এক পাটি জুতো, তাও কুড়িয়ে পেয়েছে--অথচ দাম দিতে হবে।

গেলাম সে দোকানে। অন্য পাটি হাতে নিয়ে।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে গণেশ। সেই হারানো পাটিটাই।

বললাম, কুড়িয়ে পেয়েছেন তবু দাম নেবেন কেন?

দোকা্নী চড়া গলায় বললে, দাম ছাড়া কোন্‌ জিনিসটা আজকাল পাওয়া যায় মশাই?

বললাম, এক পাটি জুতো, আমি না নিলে তো বিক্রি হবে না।

দোকানদার হাসল।--আপনিই কিনবেন স্যার, বারো আনা দিয়ে। তিন টাকা তো আপনার লাভ হবে।

দামটাও জানে তা হলে! কিন্তু কেমন একটা গোঁ চেপে গেল। হঠাৎ মনে হল, রবীন্দ্রনাথের কথাই ঠিক, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে দুজনেই সমান অপরাধী। ইচ্ছে হল, পুলিশে দিই লোকটাকে। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম, কাজ হবে না তাতে, উলটে আমাকেই হয়রান হতে হবে।

ফিরে এলাম বাড়িতে। ভাবলাম, দিনে দিনে সমস্ত দেশটা কত বদলে গেছে। টাকা ছাড়া আর কিছুই চেনে না আজকের মানুষ। এক পাটি জুতো কুড়িয়ে পেয়েও টাকা রোজগারের ফিকির খোঁজে।

বাড়িতে ফিরে এসে বললাম, নেব না ও জুতো। আমার তিন টাকা লোকসান হয় হোক, ওকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।

তারপর রেগে গিয়ে হাতের এক পাটি জুতো ছুঁড়ে ফেলে দিলাম রাস্তায়। ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বলব না, যেন ছুঁড়ে মারলাম। ওই অর্থলোভী দোকানীর উদ্দেশেই নয়, আজকের অর্থগৃধ্নু সমাজের উদ্দেশে, আজকের ন্যায়নীতিবর্জিত মানুষের উদ্দেশে।

একটা অদ্ভুত আনন্দ পেলাম পরমুহূর্তে, যেন একটা মস্ত বড় লোভ জয় করেছি। একটা সৎ কাজে তিনটি টাকা বিসর্জন দিয়েছি।



পুনশ্চ--জীবনের এই ছোট্ট ঘটনাটিকে যেখানে শেষ করলাম, সেই অবধি লিখলে তুচ্ছ এই কাহিনীটুকু গল্প হতে পারত। আরও চটকদার গল্প হত যদি বলতাম, ছুঁড়ে দেওয়া পাটিটাও পরের দিন দেখলাম ওই দোকানের দেয়ালে, হারানো পাটিটার পাশে। কিন্তু যেহেতু গল্পের চেয়েও বড় কথা জীবন, তাই শেষটুকুও বলা প্রয়োজন। অর্থাৎ জুতোটা ছুঁড়ে ফেলে দেবার পরক্ষণেই বোকামি বুঝতে পেরে নিজেই গিয়ে সেটা কুড়িয়ে এনেছিলাম এবং তারপর গলির মোড়ের দোকান থেকে বারো আনা দিয়ে হারানো এক পাটি জুতোকে উদ্ধার করে তিনটি টাকা বাঁচিয়েছিলাম। ন্যায়নীতি দম্ভ টেকেনি। কারণ আমিও তো আজকের মানুষ।


(১৩৬৬) ১৯৫৯

৫টি মন্তব্য:

  1. বেশ ভালো লাগল--গল্পের ভেতর রণিত হয়ে রয়েছে অপর এক মনস্তত্ত্ব

    উত্তরমুছুন
  2. রমাপদ চৌধুরীর গল্প এখনও পড়ি নি। এটা প্রথম পাঠ করলাম। এমনভাবে ওনি গল্পটা বলেছেন চমৎকার বরলে ভুল হবে হয়ত। সমাজের একটা বড় ধরণের সমস্যা ফুটিয়ে তুলেছেন একটি ছোট বাচ্চার জুতার মাধ্যমে। এমন লেখক কয়জন আছে। আজকাল এমন লেখা খুজে পাই না। বা কেউ হয়ত আর লেখেন না।

    উত্তরমুছুন
  3. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  4. গল্পটি পুরোনো ধরনের গল্প হয়ে ওঠেনি বলে নতুন ধরনের শিক্ষনীয় গল্প হতে কোথাও বাধেনি।

    উত্তরমুছুন
  5. গল্পটি ঠিকঠাক পুরোনো গল্প হয়ে ওঠেনি বলে নতুন ধরনের শিক্ষনীয় গল্প হতে বাধেনি।

    উত্তরমুছুন