বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : কানাগলিতে কানামাছি

– এ কোথায় নিয়ে এলে, দোস্ত? নতুন মডেলের বিয়েমডাব্লিউ’র দরজা ঠেলে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করে লম্বা-চওড়া সুঠামদেহী পৌঢ়ত্বের চৌকাঠে পা-রাখা লোকটি। মোটামুটি নির্জন এলাকা — মেইন রোড থেকে পুবদিকে চলে-যাওয়া এক রাস্তার মুখে এসে থেমেছে ওরা।

– ড্রাইভার, তুমি আশে পাশে কোথাও ভালো পার্কিং-প্লেস দেখে গাড়ি নিয়ে ওয়েট কর, কাজ শেষ হলে ফোন করব, এখান থেকেই আমাদের তুলবে। ঠিক হ্যায়? ডান হাতের তর্জনী তুলে প্রভুত্বব্যঞ্জক ভঙ্গিতে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে ক’কদম এগিয়ে বলে গাড়ির মালিক: হ্যাঁ, কী যেন বলছিলে, কোথায় নিয়ে এলাম? আমার নতুন পরিচিত। কী বললে? উহু, না, বন্ধুও না আত্মীয়ও না; তবে ক’দিনে ভালোই জমেছে। ওভাবে তাকাচ্ছ যে! একটু রোমাঞ্চ বোধ করছ মনে হয়! হে হে হে...

– গাড়িটা দারুণ! এত দামি গাড়িতে এই প্রথম চড়লাম, তা কত পড়েছে?

– তুমি এখনও গেঁয়োই রয়ে গেছ দেখছি, মাশকুর! কারও বেতন, বয়স, গাড়ি-বাড়ি-নারী এগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা বড়ই সেকেলে ... কী বুঝলে? হে হে হে...


– ভালোই মুডে আছ দেখছি করম আলি! ব্যাপারটা বুঝে উঠতে দেবে তো?


– নো; নো করম আলি, আমার নাম ঠিকভাবে বল...।

– বেঠিক আবার কী বললাম, ওই নামই তো তোমার ছিল বলে জানি! একটু যেন দ্বিধার ছোঁয়া মাশকুরের সুরে।

– দ্যাটস্ রাইট, চোদ্দ বছর আগে ছিল। বত্রিশ বছর আগে দেশের নাম কী ছিল? ঈষৎ ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে করম আলি।

– পূর্ব পাকিস্তান...

– এই তো স্মার্ট অ্যানসার! তখন আমরা ছিলাম নমঃশূদ্র — বঙ্গাল। এখন তো আমাদের ব্রাহ্মণ হবার পালা, সবার না হলেও যারা সাহসী তাদের। আই অ্যাম নাউ ক্রম্যালি চৌধুরী। অনেকে সম্মান করে সম্বোধন করে ডক্টর ক্রম্যালি চৌধুরী... আন্ডারস্ট্যান্ড?

– তাই? বিএ পর্যন্ত তো একসঙ্গেই পড়েছি। এরই মধ্যে ডক্টরেটও নেওয়া হয়ে গেছে? ভালো। বেশ ডক্টর ক্রম্যালি, হো হো হো; তা কত বছর পর দেখা হল, বল তো?

– খুব বেশি কই, বছর পনের-ষোল... তাও আজ ভাগ্যিস দেশের অমন নামকরা লোকটা মারা গিয়েছিল; তার শোকসভায় তুমি না এলে তো সারাজীবনে দেখা হত কি না সন্দেহ! জোর কদমে হাঁটতে হাঁটতে বলে ক্রম্যালি ।

– দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতি তোমার ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখে ভালো লাগছে... উনি একসময় আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সাংবাদিকতা করি তো, সেই সুবাদে...।

– শ্রদ্ধা দেখানোর দুটো কারণ, এসব উপলক্ষে পরিচিত অনেক বিখ্যাত লোকের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের মারফত নতুন বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়; টিভি ক্যামেরা তো আবার লাইভ কাভার করে অতি বিখ্যাত কেউ মারা গেলে... লোকটা বিখ্যাত শুধু নন, সরকারি দলের সমর্থক বিশিষ্ট একজন বুদ্ধিজীবীও ছিলেন, তুমি তো ভালোই জানো, নাকি? এই যে এসে গেছি আমাদের গন্তব্যে, হ্যাঁ এসে গেছি। গলিটা এখানেই শেষ। ব্লাইন্ড এলি। কথা শেষ করা আর কলবেল টেপা একসঙ্গে চলে ক্রম্যালির।

সদ্যনির্মিত সুদৃশ্য ভবনের নিচতলা। ভেতর থেকে মেয়েলি কণ্ঠের সাড়া মেলে: কে?

– ডক্টর ক্রম্যালি...

দরজা খুলে যায়। সম্মুখে দাঁড়ানো ফরসা দিঘল এক যুবতী, মুখে স্মিত হাসি। মাশকুরের দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে ওদেরকে নিয়ে বসায় ড্রয়িংরুমে। সাজানো-গোছানো ড্রইংরুম, ফার্নিচারগুলো ঝকঝকে, দেখে বোঝা যায় খুব বেশি দিন আগে কেনা নয়। রুচির ছাপ লক্ষণীয়। মেঝের টাইলে আলো পড়ে ঠিকরে আসছে, দেওয়ালে ঝোলানো কয়েকটি কারুকর্ম, নামকরা শিল্পীর পেইটিঙের বাঁধানো ছবি, কাঠের ওপর খোদাই করে আরবিতে লেখা কলেমা তৈয়বা। দরজা খুললে প্রথমে নজরে পড়ে ডাইনিং স্পেস, ডান দিকে মোড় নিলে ড্রইং। মোটা কাপড়ের কার্টেন দিয়ে আড়াল করা।

পুরু গদিমোড়া সোফায় পাশাপাশি বসে দু’বন্ধু। সাইড টেবিল — যেখানে সাজানো ফুলদানি, একটা পত্রিকাও রাখা। কী মনে করে টেবিলের ওপর থেকে বাংলা দৈনিকটা তুলে নিয়ে চোখ বোলায় মাশকুর, তারপর রেখে দেয়। বাসি পত্রিকা, ১৯ আগস্ট, ২০০৩। লিড নিউজ: হামাসের আত্মঘাতি হামলায় জেরুজালেমে ২৩জন ইসরায়েলি নিহত।

কিছুক্ষণের মধ্যে ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করে এক ভদ্রলোক। পরনে ঢিলেঢালা ফতুয়া-পাজামা। বয়সে তরুণ — ত্রিশ-বত্রিশ হবে হয়তো। গায়ের রং মেটে, খুব ছোট করে ছাঁটা মাথার চুল — তারপরও বোঝা যায় কোঁকড়া, যেমন সাধারণত নিগ্রোদের হয়ে থাকে। চেহারা আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন আদলের। ধারালো নাক, টানা চোখ আর মোটা কুচকুচে কালো ভুরু।

– আমার হাজব্যান্ড, ওয়াসিফ আল ওয়াক্কাস...। লোকটাকে মাশকুরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় সেই যুবতী।

– আই অ্যাম মাশকুর... মাশকুর আহমেদ। গ্লাড টু মিট ইউ। সোফা থেকে সমুখে একটু ঝুঁকে করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে মাশকুর ।

– ওর দেশ প্যালেস্টাইনে, ক্রম্যালি আগ বাড়িয়ে বলে। মাশকুরের মধ্যে অদ্ভুত এক শিহরণ খেলে যায়; প্যালেস্টাইন — ফিলিস্তিন; অনেক দেশের লোকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়েছে, ফিলিস্তিনি এই প্রথম।

– উই আর উইথ ফিলিস্তিনিস, সাপোর্ট দেয়ার জাস্ট স্ট্রাগল এগেইনস্ট ইজরায়েলি জায়োনিস্টস্। ফিলিং থ্রিলড টু মিট অ্যা ম্যান অফ দ্যাট ল্যান্ড...!

– থ্যানকু। ইনরেজি বলা দরকার নাই, বানগালা বুজি, বলিতে বারি; অনেক দিন হইল বানগালাদেশে আছি। মাশকুরকে থামিয়ে দিয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলে লোকটি। আমি সির্ফ ফিলিস্তিনি না, জরদানেরও সিতিজেন। আব্বা তাকে জরদান, বেবসা করে...।

মাশকুরের এটুকু জানা আছে আরবরা প ট ড ঢ ঠ ভ এ-জাতীয় বেশকিছু ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারে না — সৈয়দ মুজতবা আলীর কোন লেখায় যেন পড়েছিল। লোকটা যে আরব তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। তবু আরেকটু বাজিয়ে দেখা যাক না কেন। জিজ্ঞেস করে: ঢাকা কেমন লাগে?

– দাকা বালো, কারেন্ত তাকে না, এইতা অসুবিদা...

– পাকিস্তান গেছেন কখনো?

– না, বাকিস্তান না যাই...।

বেশ মজা পেয়ে যায় লোকটার কথা বলার ভঙ্গিতে — উচ্চারণে। অনেক বাংলা শব্দও আরবি ধাঁচে উচ্চারণ করছিল। বিশেষ করে ক ও গ অক্ষরদুটো। যুবতীটি বসে ছিল সামনের সোফায় — বয়স? দেখে মনে হয় পঁচিশ পেরোয়নি এখনও। আকর্ষণীয় দৈহিক গড়ন, পাকা কামরাঙার মত গায়ের রঙ, পাতলা ঠোঁট, ঠোঁটের ওপরে বামদিকে সর্ষেদানা তিল, ফিনফিনে একমাথা লম্বা চুল। পরনে গাঢ় সবুজ রঙের সালোয়ার-কামিজ। ওর দিকে মনোযোগ দেয় এবার মাশকুর, বলে: আপনি তো বোধহয় বাঙালি?

– সিলোটি, আমার বাড়ি সিলেটর কমলগঞ্জ। আরে, দেখেন সিলেটের ভাষায় কথা বলতেছি, আপনার বুঝতে অসুবিধা হবে...।

– সিলেটি ভাষায় কথা বললে আমি বরং খুশি হব, পুরনো সেই দিনগুলোর আমেজ কিছুটা হলেও ফিরে পাব।

– গেছইননি কুনো দিন?

– বলেন কী! গেছি মানে? দু’বছর ছিলাম ওখানে; অবশ্য খুব ছোটকালে। কী সুন্দর ছিল তখন কমলগঞ্জ! সমশেরনগর আলীনগর মাধবপুর শ্রীমঙ্গল — সব ঘুরেছি। ভানুগাছ বাজার থেকে সরু রেললাইনের ওপর দিয়ে ঘোড়া-টানা ট্রলি চলত, যেত বহুদূর, কোথায় এখন একদম মনে নেই; মাধবপুরের দিকে কি? চা-বাগান, গাছ-গাছালি। আর কী পাখি! হরিয়াল, টিয়া, চা-পাখি — ইংরেজিতে বলে স্নাইপ, ঘুঘু আরও কত, নাম মনে নেই।

– ওইসব কী আর আছে অখন? কুন সময় আছলাইন কমলগঞ্জ, কুন বছর?

– তা উনিশ শ’ পঞ্চান্ন-ছাপ্পানোর দিকে। খুবই ছোট তখন, সবে ক্লাশ ফাইভে পড়ি...

– মাই গো মাই, অখন গেলে তো চিনতাই ফারতা নায়...! দালানকুঠা, রাস্তাঘাট... কত উন্নতি...!

– একবার ঘুরে আসব ভাবছি... ধলাই নদী, নদীর ওপর পুল... পুলের পাশে বান্দরের-লাঠি গাছ, শুদ্ধ ভাষায় যাকে বলে সোনালু গাছ... আহা...!

– ধলাই নদী আছে; পুলও আছে, বান্দরর-লাঠি ফাইবা কুন খানো?

মাশকুর একা আলাপ করে যাচ্ছিল; বন্ধুটির আলাপে আগ্রহ নেই। মোবাইল ফোনে বারবার কথা বলছিল; একবার উঠে ভেতরের ঘর থেকে ঘুরে এল। ওর ভাবসাব-আচরণে বোঝা যাচ্ছিল, এ পরিবারের সঙ্গে ভালোই ঘনিষ্ঠতা।

– আপনার চাকরি নাকি ব্যবসা? ওয়াসিফকে জিজ্ঞেস করে মাশকুর।

লোকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, কথার জবাব নেই।

আবার প্রশ্ন: কী কাজ করছেন এখন?

সদ্য তন্দ্রাছুট লোকের মত আলতো মাথা ঝাঁকিয়ে, একটু নড়েচড়ে বসে বলল: কী বলিলেন, কী কাজ করি? আগে জরদান এমব্যাসিতে কাম করতাম — সারবিস। এখন যারা আরবদেশে যায় তারারে সাহায্য করি। আরবিতে কাগজবত্র লেখিয়া দেই। অনেক রকম কাম করিয়া দেই।

– ভালোই আয়-ইনকাম হয় এ-কাজে?

– নাহ্, ওই ফয়সায় ফেমিলি চলে না। আগে আব্বা তাকা ফাথাইতো অহন ফাথায় না — বন্দ...।

– বন্ধ কেন?

– আব্বা জানিত ফরাশুনা করিবার লাগিয়া দাকা আসছি। ঘাজিবুর বোর্দবাজারে আইইউতিতে বর্তি হইছিলাম। কিন্তু বাদ দেই। আব্বা যখন এ কতা জানিল তখন তাকা বন্দ...।

– এখন কী করবেন তাহলে?

এ প্রশ্নেরও কোনো জবাব মেলে না।

কী কারণে জানি বেশ বিচলিত দেখাচ্ছিল লোকটিকে। অসহায়ভাবে বারবার তাকাচ্ছিল ওর স্ত্রী নায়নার দিকে। তারপর উঠে ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।

এরই মধ্যে সেন্টার টেবিলের ওপর নাস্তা সাজানো হয়েছে। নায়না-ই এক ফাঁকে ভেতর ঘরে গিয়ে নাস্তার ব্যবস্থা করেছে। বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করে বলে: কামোর বিটি ফাওয়া যায় না। কিতা যে জামেলা!

– আপনার স্বামীর সাথে আলাপ করে খুব ভালো লাগল।

– তাই নি? খুব বালা মানুষ, কিন্তু দুনিয়াদারির কুন্তা বুজে না। তেলোর দুনিয়া ছাড়িয়া ফুবো, তাও আবার এ লাখান গরিব দেশো খেউ আয় নি? নাস্তা খাইন। ঠান্ডা — মানে কোল্ড ড্রিঙ্কস না চা, কিতা দিতাম?

– চা হলেই ভালো...। এ দেশে না এলে এই ভালো মানুষটার দেখা কি আপনি পেতেন?

– হুম...। কপালের চামড়ায় চিকন ভাঁজ পড়ল নায়নার। এ দেশো আসার আগেই...

কী হল, ফোন করেছিলে? নায়নাকে থামিয়ে দিয়ে, ওদের কথার মধ্যে ঢুকে পড়ে ক্রম্যালি: কী, ওভাবে তাকাচ্ছ কেন বন্ধু? নায়না আমার ছোট বোনের মত, কি তাই না?

নিঃশব্দে মাথা নাড়ে নায়না।

ফোনে ফারাম না, এনগেজড্। দেখি, আবার দেখি। এত দেরি খরিয়া আইন! সোফা থেকে উঠে ভেতরের দিকে যায় নায়না।

মাশকুর চলে যায় অতি দূর অতীতের ধূসর জগতে। কমলগঞ্জ থানার ওসি ছিলেন ওর বাবা। থানার পেছনে সার-সার অ্যাসবেস্টসের ছাউনি-দেওয়া বাসা আর ব্যারাক। ও-গুলোর মধ্যে সব থেকে বড়টা ছিল ওদের। থানা-ঘরের সম্মুখে ছিল ঝাঁকড়া-মাথা হিজল গাছ। ওসি সাহেবের তাজি ঘোড়া বাঁধা থাকত গাছটার সঙ্গে। সে-সময় ঘোড়া আর বাইসাইকেল ছাড়া ব্যক্তিগত অন্য কোনও বাহন তেমন ছিল না। খুব ধনীরা কেই কেই অবশ্য হাতি পুষতেন। কমলগঞ্জ স্কুলে ওর সহপাঠী ছিল শ্যামলা এক মেয়ে — কী যেন নাম, কী নাম, উউউ... হুঁ, মনে পড়েছে বীণাপাণি। পুলের কাছেই, দক্ষিণদিকে, ধলাই নদীর পাড়ে ছিল ওদের বাসা। মেয়েটিকে ভালো লাগত মাশকুরের। খুব মিষ্টি ছিল ওর হাসি — ওপরের পাটির দাঁতের সারিতে ছিল একটা গেঁজ দাঁত। ওটাই যেন বাড়িয়ে দিত হাসির মাধুর্য! ওই বয়সের ভালো লাগার অনুভূতি বোঝানো দুরূহ। গুমোট বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে নির্মল ঝিরঝিরে বাতাসের স্পর্শ পেলে যে অনুভূতি, অনেকটা সে-রকমই। নাহ্, ভালোভাবে বোঝানো গেল না। যাবেও না। পুলের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকত বীণাপাণিদের ছোট্ট টিনে-ছাওয়া বাড়িটার দিকে। স্কুলে ছেলে মেয়ে আলাদা সারিতে বসত। ও বীণাপাণির কাছের সারিতে বসে সুযোগ পেলেই আড়চোখে দেখত ওকে। কমলগঞ্জ ছেড়ে চলে আসার অনেক বছর পর, যখন কলেজে পড়ে, একবার ভেবেছিল যাবে, যাবে সেই পুলের কাছে, বান্দরের-লাঠি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কাটাবে বেশ কিছু সময়। দেখা যদি হয়ে যায় বীণাপানির সঙ্গে, চিনবে কি? চিনলেও কি তাকাবে আগের চোখ নিয়ে? ধুত্তোর, কী সব আবোলতাবোল ভাবছি! লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ধাতস্ত হয় মাশকুর।

– আরে আমি তো চা লইয়া আইলাম; নাস্তা দেখি অমনিই ফরি রইছে; খাইন খাইন, চা ঠান্ডা অই যাইব তো। বলে ছোট কাঁচের বাটির মধ্যে ফল-ফলারি তুলে দেয় নায়না, সাথে কাঁটাচামচ।

নাস্তা খেতে খেতে নায়নার সঙ্গে আলাপে মেতে ওঠে মাশকুর। এক ধরনের নস্টালজিয়া নাকি অন্যকিছু উৎসাহ যোগাচ্ছিল ওকে এই আলাপে, কী জানি, বোঝে না সে।

– আপনার মা-বাবা কি সিলেটেই থাকেন? কমলগঞ্জে? আরে না না, কী যে বল ক্রম্যালি, ইন্টারভিউ নিতে যাব কোন দুঃখে? তুমি তো উসখুস করছ আর বারবার ফোন টিপেই চলেছ; ওনাদের দেশে আমার বাল্যকাল কেটেছে, বোঝোই তো বাল্যস্মৃতি...; না মানে তোমার অস্বস্তি লাগলে না হয় ক্ষান্ত দেই। পারমিশন দিচ্ছ? বেশ। যা বলছিলাম...

– আমার আব্বা বাঁচিয়া নাই। জর্ডানোই মারা গেছইন। আমরা যখন হনো আছলাম তখনই ওয়াসিফর লগে ফয়লা বালোবাসা তারফর গোফনে বিয়া। আব্বা মারা যাওয়ার ফর দেশো ফিরিয়া আসি। দেশো তো আব্বার সম্পত্তি আছিল; বহুত সম্পত্তি। কিন্তু ছাছারা শয়তানি খরিয়া হকল সম্পত্তি দখল খরিয়া লইতা চাইন। মামলা খরছি; দেখা যাউক কিতা অয়...।

– আপনার মা?

– অনই থাখইন, আমার লগে। অখন বেমার; বয়স তো আর খম নায়। ঊনষাইট ষাইট। বাতর ব্যথা। ডায়াবেটিস। চোখো খম দেখইন।

– কী ব্যাপার, খোঁজ-খবর কিছু হল? ক্রম্যালি অস্থির গলায় প্রশ্ন করে নায়নাকে।

– জি অয়, আধা ঘন্টা...।

হাত ঘড়িটা দেখে ক্রম্যালি, পোনে আটটা। ওয়াসিফের সঙ্গে খুচরো আলাপ চালিয়ে যায় ও।

– কমলগঞ্জের কোথায় আপনাদের বাড়ি? মাশকুরের প্রশ্ন।

– আপনে যে পুলর খতা খইছলা, ইটার তলে... ধলাই নদীর ফারো।

– বলেন কী, ওখানে তো আমার ছোটকালের ক্লাশমেটের বাড়ি ছিল, ফ্রক-পড়া ছোট্ট শ্যামলা মেয়ে, হিন্দু পরিবার...

– আমার আম্মাও হিন্দু আছলা, বালাবাসিয়া মুসলমান বিয়া খরইন...

– কিছু মনে না করলে, আপনার মায়ের নামটা যদি...

– মনো খরার কিতা আছে, আয়েশা খাতুন।

– বিয়ের আগে কী নাম ছিল, জানেন?

– অতো মনো নাই... কুন কালো এখবার কইছলা, মনো নাই...

– বীণাপাণি?

– অয় অয়, মনে ফরছে; আপনে চিনইন নি? উচ্ছ্বসিত, কিছুটা বা বিব্রত নায়না। ওর চেহারায় কেমন এক দুর্বোধ্য পরিবর্তন ফুটে ওঠে — দৃষ্টিতে ধরা দেয়।

– দেখা করা যাবে? মুখ ফসকে কথাটা বেরোতেই একটু বিব্রত বোধ করে মাশকুর। মনে মনে আওড়ায়: না থাক। কী দরকার সেই পুরনো স্মৃতিকে নষ্ট করবার? থাক, দেখা না করাই বরং ভালো...।

নায়না ওকে অনেকটা জোর করেই নিয়ে যায় যে ঘরে মা থাকে সে ঘরে। বিছানায় আলুথালু বেশে কাত হয়ে শুয়ে আছে স্থূলাঙ্গিনী এক মহিলা।

নায়না গলা চড়িয়ে ডাকে: আম্মা, দেখ কে আইছন। চিন নাকি, দেখ। আম্মায় খানো কম হুনইন; চিল্লাইয়া খথা না খইলে হুনইন না…।

মাশকুর চেঁচিয়ে বলে: আমি মাশকুর, সরি, ডাক নাম না বললে তো আবার চিনবে না; আমি কচি, তোমার সাথে ক্লাশ ফাইভে পড়তাম, ওসি সাহেবের ছেলে কচি, চিনেছো বীণা...?

ঘোলা চোখে মাশকুরের দিকে একঝলক তাকিয়ে, মুখ বিকৃত করে পাশ ফিরে শোয় বীণাপাণি।

অব্যক্ত বিষাদে মন ছেয়ে যায় মাশকুরের। কী দরকার ছিল এত কিছু জানবার! কী দরকার ছিল দেখা করবার! কী দরকার ছিল!

ভারী পর্দা ঠেলে ড্রইংরুমে এসে বসতে না বসতেই মিউজিকাল কলবেল বেজে ওঠে। ত্রস্তে উঠে যায় নায়না। মাশকুর লক্ষ করে, কেমন এক অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে নায়না তাকায় ক্রম্যালির দিকে।

– তুমি ওয়াসিফের সাথে আলাপ কর। আমি একটু জরুরি আলাপ সেরে আসি; বেশিক্ষণ না, এই খুব বেশি হলে আধঘন্টা। যাবার সময় মাশকুরকে উদ্দেশ করে বলে ক্রম্যালি ।

দেওয়াল ঘড়িটাতে চোখ পড়ে মাশকুরের। আটটা বিশ। ন’টার আগে এখান থেকে বেরোনো হচ্ছে না, বোঝা হয়ে যায়। বাসা তো ধারেকাছে নয়, শহরের শেষপ্রান্তে; বাস পেলে হয়! তাছাড়াও একদম ভালো লাগছে না কোনোকিছু — একদম না। জীবনের এত সুন্দর স্মৃটিটাকে দুমড়ে-মুচড়ে আজ নষ্ট করে ফেলল! কী অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য সব ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে যায়, যা স্বপ্নকেও হার মানায়! ওয়াসিফের সঙ্গে আলাপ জমাবার মানসিকতা নেই। তবু ভদ্রতার খাতিরে দু’এক কথা বলতেই হয়।

ড্রইংরুমে ঢোকে ক্রম্যালি ও নায়না। বেশ প্রফুল্ল দেখায় ওদেরকে। ক্রম্যালির চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ। সম্মুখের সোফাতে একটু ঝুঁকে বসে নায়না তরল হাসিমাখা মুখে ক্রম্যালিকে জিজ্ঞেস করে: ভাই কি জানইন নি...?

কথা শেষ করতে দেয় না ক্রম্যালি, বলে: আজ তা হলে ওঠা যাক, কি বল নায়না?

আবার জোর কদমে হাঁটতে থাকে ক্রম্যালি। ওর সঙ্গে হেঁটে পেরে ওঠা ভার।

– দৌড়োচ্ছ কেন, স্বাভাবিকভাবে হাঁটো, না হয় দু’মিনিট বেশি সময় লাগবে। ওই মেয়েটা যে বলল, কী জানার কথা বলল?

– আরে রাখো তোমার প্যাচাল। সাংবাদিকদের নিয়ে এই হল সমস্যা! সবকিছু জানতে হবে, তার কী মানে আছে?

ক্রম্যালি কখন ড্রাইভারকে ফোন করেছিল টের পায়নি মাশকুর। গাড়ি ঠিক জায়গা মতই দাঁড়িয়ে আছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন