বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

তমাল রায়-এর গল্প : ঈশা খাঁ, ঈশ্বর ইতিহাস এবং


সেতুর ওপারে যারা, তারা অপেক্ষা করত সকালের। আর এপারের লোকেরা কেবল রাতের। সকালের সাথে রাতের তেমন কোনো বিরোধ আছে এমন কথা ইতিহাস বইয়ে অন্তত লেখা নেই। লেখা আছে সম্রাট শাহজাহানের 

কথা, মমতাজের কথা, তাজমহলের কথা আর হ্যাঁ ঈশা খাঁর কথা আছে জাস্ট এক লাইন ।


উস্তাদ ঈশা সিরাজি পারস্য থেকে এসেছিলেন, এখন ইরান। ১৬৩১ থেকে ১৬৫৩ এই বাইশ বছর ধরে না’কি তাজমহল তৈরী হয়েছিল। ২০০০০ শ্রমিক দিন রাত পরিশ্রম করে এই আশ্চর্য তৈরী করেছিলেন। আচ্ছা ঈশা খাঁর দিন পছন্দ ছিল না’কি রাত? ইতিহাসে একবার না’কি ঈশা খাঁদের কথাও লেখা হবে এমনটাই জানিয়েছিল আমাদের টাউনের গোপাল কাকা। কী করে যে গোপাল কাকা এত কিছু জানে মাঝেমাঝে ভেবে অবাক হয়ে যাই। আর তখনই প্রশ্নটা বোকার মত করে বসে আমাদের হাঁদু - আর কাকা তোমার নাম থাকবে না? ব্যস কী মুশকিলে যে ফেললো হাঁদু। ও নিজেও তা জানে না। গোপাল কাকা বলতে শুরু করলেন এ টাউনের জন্য তিনি কী কী করেছেন। কতটা করেছেন। শুনতে শুনতে রাত গড়াল। ঘরে ফিরছি দেখি কাকা একটা বন্ধ দোকানের সামনে একা বসে গান ধরেছেন - আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা..। কাকা এক সময় সত্যিই খুব ভালো গাইতেন। পাড়া ঘরে সব জলসায় ডাক পড়তো তার। এখন অবশ্য চোলাই খেয়ে নড়তে পারছে না। শোনা কথা কাকা না’কি উত্তম কুমারের মত টেরি রাখতেন। আর ধর ধর করে এই টাউনের মেয়েরা তার প্রেমে পড়ত। শেষ মেশ কাকা অবশ্য বিয়ে করেন তার পাশের বাড়ির নীরজা সুন্দরীকে। নীরজা পিসিকে কেন যে সুন্দরী বলত লোক, বুঝতেই পারিনি কখনো, মনে হয় ব্যাঙ্গ করে বলত। নীরজা পিসি এ তল্লাটে বিখ্যাত ছিলেন তার ঝগড়ুটে স্বভাবের জন্য। পাড়া প্রতিবেশীদের ঝগড়ায় তাকে ভাড়া করার কথাও শুনেছি। ভাড়া মানে তখন তো আর পয়সা দিয়ে কেউ ভাড়া করত না। হয়ত বলল - নীরু আজ তোকে ইলিশ খাওয়াবো সরষে বাটা দিয়ে। ব্যস, নীরু পিসি চললেন ঝগড়া করতে ওদের হয়ে। সে যাই হোক কাকার অনেক গুণ। এ তল্লাটে কাকাই সেই অর্থে লাস্ট মাতাল। মাতাল আর দেবদাসদের যুগ তো শেষ হতে চলল। তেমন ট্রাডিশনাল মাতাল আর কই যে বৌ এর সায়া পড়ে পাজামার পার্টিশন খুঁজছে, যে এখনো রাস্তায় মাতলামি করে শুয়ে পড়ে। কথায় কথায় ইংরাজি বলে, আর গান গায়। মানে এ সেই দেবদাস এর শেষ উত্তরাধিকার। যা হোক টেনে তুললাম। বললাম কাকা বাড়ি চল। কাকা আমার কাঁধে হাত রেখে চললেন হেঁটে। কাকা এখন ম্যাকবেথের ডায়ালগ ঝাড়ছে, আমি হতচ্ছাড়া আর কী বুঝি। মাঝে মাঝে ধরতাই দিচ্ছি - বাহ বাহ, দারুণ।

এভাবে পথ চলার মজা হচ্ছে লোক দাঁড়াবে, দেখবে। টিটকিরি মারবে। মারছেও। অন্য সময় হলে কাকা থান ইঁট তুলতো, ছুঁড়ত আর কাঁদতে শুরু করত। আজ সাথে আমি। তাই ওসবে আজ তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। কেবল মাঝে মাঝে মাতৃমন্ত্র আওড়াচ্ছে। শালা থেকে বান... আমি বকলে চুপ। কতক্ষণ ঠিক হেঁটেছি খেয়াল নেই। কাকা দাসেদের বাগানের সামনে দাঁড়ালো। বললো- ‘অরু ভেতরে যাবি?’

বললাম – কেন? কাকা কট মট করে তাকালো। বলল – ‘ঈশা খাঁর কথা বলছিলি তো, চল দেখাই’

-মানে?

- মানে আবার কি,বড় বকাস।

কাকা হঠাৎ খুব সিরিয়াস। চাপ লাগে এসব সময়। বলেই ফেললাম

- এখানে ঈশাঁ খাঁ থাকেন? যা শালা কাকা তুমি পুরো আউট তো।

কাকা কোনো কথা না বলে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল আমায়। আমিও যোগ্য স্যাঙাতের মত ঢুকলাম ভেতরে।



রাত মানে রাতই, আর দিন মানে যে দিন এ বিশ্বাস অবশ্য আমাদের তেমন ছিল না। শ্মশানের পাশে বাড়ি। সারা রাত মরা আসে, আর হরি বোল এর সাউন্ড, মরা পার্টির মদ খেয়ে হল্লাগোলে মনে হয় সক্কাল বেলার অফিস পাড়া। সকাল আর রাতের তফাৎই বুঝি না।

আসলে উস্তাদ ঈশা বলে কেউ ছিল না। কিস্যু করেইনি। আহমেদ লহৌরি বলে এক পারসিয়ান ছিলেন মূল স্থপতি। তার ছেলে না’কি একখান বই ও লিখে ফেলেছে।

লাও বোঝো এবার কী করবে! কী বুঝলাম? কিছুই না। মাই বাপ। এ সব খুব গোলমেলে। গোপাল কাকা বলে আমরা শুনি। গোপাল কাকারই বা এই চোলাই খেয়ে এত কিছু মগজে আসে কী করে কে জানে। আচ্ছা একশো বছর পর এসে যদি কেউ আমার ছেলেকে বলে - তোর দাদু বলে কেউ ছিল না! যা ফোট। ভাবতেও পারি বটে। আমার আবার ছেলে, তার আবার ছেলে...বিয়ে করবে কে আমায়! এসব ভাবতে ভাবতেই কাকার পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলাম। কেউ কোত্থাও নেই। শুনসান। কেবল বর্ষাকাল বলে ব্যাঙেদের কনসার্ট বসেছে। সোনা, কোলা আর কি কি প্রজাতি অত কি ছাই জানি, তাহলে পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে ব্যাংবাজি করব কেন! কাকা কানের কাছে এসে বলল - ‘এখানে ঈশ্বর আসেন রোজ রাতে, দেখবি?’ আমি বললাম

- সে কে? কল্যাণের গ্র্যান্ড ফাদার?

- আরে ধুর বোকা গড। দা ওমনিপোটেন্ট।

- ওমনিভোরাস পড়েছি কাকা জীবন বিজ্ঞান বইতে। তা কাকা তুমিও মাইরি… ইয়ে আছো এসব দেখাবে বললে আমিও তাহলে মারতাম একটা পাঁইট তোমার সাথেই। কাকার রাগ হল।

- যা তুই চলে যা। আমি একাই দেখবো।

- সে কি আর আর সম্ভব কাকা। এভাবে তোমায় ফেলে যাবো? নীরু পিসি নেই... কী করে পারি বল!

গুটিশুটি কাকার পাশে একটা পুরনো ইঁটের হেলান দেওয়া বেদিতে বসলাম। মশা কামড়াচ্ছে পায়ে। হাই তুলছি। কাকা কিন্তু 'এটেনশন' পোজে বসে। যা শালা লোকটার নেশা কেটে গেল না’কি। প্রায় ৪৫ মিনিট হল চুপ করে বসে আছি একটা বুড়োর সাথে এই রাত্তিরে, ভাল লাগে কার। ধুর! চাঁদটাও মহা খচ্চর। একটু ভালো করে আলো দিবি তো। জানিস আমরা এখানে এসেছি। তা’না চোখ মারছে হালকা করে, অনেকটা অন্ধকারও। বললাম- কাকা বাড়ি ফিরবে না? কাকা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে 'সসস' চুপ করতে বলল। ইশারা করল সামনের দিকে। তাকালাম। দেখি একটু দূরে - কেমন একটা আলো পড়েছে। পাতার ওপর থেকে জল পড়ছে টুপ টাপ। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। সেই আলো আর অন্ধকারে কী যেন নড়ছে। নেড়ি কুকুর টুকুর হবে বোধ হয়। এসব পুরনো বাড়ি ঘর তো কুকুর বেড়ালেরই আস্তানা। আমি আকাশ, মাটি আর বোসেদের পেল্লাই একলা ভূতের মত বাড়িটার দিকে তাকাই... কাকা চিমটি কাটছে। সামনে তাকাতে বলছে। তাকালাম, দেখি মিহি আলোর মধ্যে কেমন একটা দারুণ সুন্দর কে যেন একটা ইয়া বিশাল জোব না আলখাল্লা পরা, ঈষা খাঁ? এখানে? কন্দর্পকান্তি পুরুষ এর মত। ঠিক বললাম তো? ‘কন্দর্প’ই তো...নাকি রবি ঠাকুর? জমিদার ছিল। বাপ ঠাকুর্দার অঢেল পয়সা, কে বলতে পারে এটাও ওদেরই প্রপার্টি হয়ত, দাসেরা জোর করে ঢুকে পড়েছিল, চোখ কচলালাম। একটা অটোগ্রাফ নিয়ে আসলে হত মাইরি। চার্চের ফাদারদের মত। যিশু খ্রিষ্ট নয়তো পেছন দিক ফিরে। কাকা ইশারা করলো বাঁ দিকে তাকাতে। তাকালাম। দেখি পড়ে থাকা শুকনো ভিজে পাতা গুলো উড়তে শুরু করেছে। গোল হয়ে। আরে নেশা তো করিনি তাহলে কী হল ! নিম্নচাপ হলে এমনটা হয় শুনেছি। সাথে খুব জোর বাতাস। কাকাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম, যদি উড়িয়ে নিয়ে ফেলে বাতাস... ওমা হাত উঠছে না, কেমন একটা অবশ লাগছে। আর চার্চ বেলের মত আওয়াজ না’কি মন্দিরের বড় ঘন্টার – ঢং - ঢং - ঢং। কানে আঙুল ঢুকিয়ে খুব জোর নাড়লাম। পেট গরম হল না’কি কাকার সাথে থেকে। কে কীভাবে কোথা থেকে এলো? পাখী ডাকছে, শুনছি। এসময়ে তো পাখী টাখি ডাকে না কেবল প্যাঁচা ছাড়া। আর এ তল্লাটের পাখীর ডাক আমি চিনি মোটামুটি, এতো এখানকার নয়। অন্যরকম ডাক। এবার কেমন ভয় লাগছে, হিসি পাচ্ছে খুব জোর... দেখি ওই লম্বা প্রায় ছ’ফুটের ওপর বেশী লোকটা নীচু হল। পায়ের কাছে একটা সাদা লোমওলা কুকুর লেজ নাড়ছে। কোলে তুলে নিলো, তার গায়ে হাত বোলাচ্ছে। রুটি বা বিস্কিট কিছু একটা খাওয়াচ্ছে। এবার সামনের দিকে তাকালেন, মুখের কিছুই দেখা যায় না, চোখ দুটো আগুণের গোলার মত জ্বলছে। ভুত প্রেত তো বিশ্বাস তেমন করি না, এ তাহলে কে? ঘুরে গেল উলটো দিকে। এবার কান্নার শব্দ পেলাম, ওই অত্ত বড় লোকটা এভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদে কেন কে জানে। পশ্চিম দিকে ফিরলো, মানে আমাদের যেদিকে শ্মশান সেই দিক করে, হাওয়ায় কী সব হাত টাত নাড়ল আর ওমনি কী যেন একটা তৈরী হয়ে গেল। আরে এ ছবি তো আমার চেনা, ইতিহাস বইতে দেখেছি। যদিও পাস করতাম না কখনো, তবুও দেখেছি। ছবিগুলো দেখতাম। হ্যাঁ, এতো পুরো তাজমহল এর মতই। লোকটা এবার খুব ধীর পায়ে হেঁটে সোজা ভেতরে ঢুকে গেল তাজমহলের। গোপাল কাকা এতক্ষণ ঠিকই ছিল, এবার অরুউউউউউ... বলে গোঁত্তা মারল। লাও বোঝা ঠেলা। আমি কই ভাবছি একবারটি গিয়ে আমার পোড়া কপালটা দেখিয়ে বলব এতে কিছু লিখে দিন মাই লর্ড। তার আর সুযোগ কই। খেয়াল নেই কতক্ষণ এভাবে ছিলাম। কাকার ডাকেই হুঁশ ফিরলো। বললো - ‘চলে গেছে। এবার চল অরু’। মানে কাকার হুস ফিরেছে আগেই। পথে ফিরতে দেখলাম আমাদের রাস্তা গুলো হলুদ আলোর নীচে আরও সুন্দর, মায়াময় লাগছে। বাতাসে একটা মিষ্টি গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে - কাকা আমি মহাপাপী, নইলে মাই লর্ড একবার অন্তত আসত, কি বল? কাকা তোমার কাছে আসেন? আমার কি নেশা হল, কাকা? এ পথ দিয়েই কি ঈশ্বর হেঁটে হেঁটে গেছিলেন দাসেদের বাগানে?

কাকা মাথা নাড়ল। এতগুলো কথা বললাম কাকা চুপ। হ্যাঁ বলল, না’কি না বুঝলাম না।

নেড়ি কুকুর গুলো যেমন রাত হলে পেছন পেছন হাঁটে সেভাবেই হাঁটছে। কিন্তু শব্দ করছে না। আশ্চর্য তো! আমরা সেতুর ওপর উঠলাম। নীচে আমাদের কানা নদী রুপো চিকচিক করছে। কেমন একটা লাগছে। মনে হচ্ছে আমার মত হাড্ডা কাড্ডা লোক ও এখন অনায়াসে কবিতা লিখে ফেলতে পারে, প্রেমে পড়তে পারে, আমার প্রেমেও কেউ হয়ত পড়তে পারে। পুরো পথে আসতে আসতে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলাম, কাকা একটারও উত্তর দিল দেয়নি।



সেতুর এপারে আমরা যারা, তারা রাতের অপেক্ষায় থাকতাম। আর ওপারের লোকেরা অপেক্ষা করতো সকালের। ঈশা খাঁ বলে তেমন কেউ ছিল কি? P.N.Oak নামের তাজমহল বিশেষজ্ঞ জানিয়েছিলেন মমতাজের সমাধি টমাধি কিস্যু ছিল না ওখানে। ছিল এক হিন্দু মন্দির। সেখানে না’কি শিব ঠাকুর এর পুজো টুজো করত লোকজন, মন্দির ভেঙ্গে তাজমহল তৈরী ...কী বুঝলাম? কিস্যু না। ইতিহাস ব্যাপারটা সত্যিই গোলমেলে। সত্যিই ঈশা খাঁ বলে কেউ ছিল না? সবই বানানো গল্প? পুরো কনফিউজিং। কিন্তু এই ধূপধুনো, পাতা ওড়া রাত, আর লম্বা ছ’ফুট-এর মাইলর্ড এসব কি চোখের ভুল? আর ওই কুকুরটা সেই বা কে? কেন কাঁদল? আর ম্যাজিক এর মত শূন্যে তাজমহল নির্মাণ...উফফ ! কেমন একটা শান্তির ভাব যেন ভেতরে, মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে যেমন হয় ঠিক তেমনটা। এবার হয় মরবো না হলে গড়বো...

কাকার বাড়ি আসলে ওপারেই। কিন্তু কী জানি কেন কাকার পছন্দ ছিল রাত। কাকা রবি ঠাকুর বা অমর্ত্য সেন নয়। যে তার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। কিন্তু কাকা বলত রাত তার প্রিয় কারণ সে সৃষ্টি করে। আর যে কোনো সৃষ্টিই আদতে অন্ধকারে নির্মিত। মায়ের পেট থেকে ব্ল্যাক হোল টু বিগ ব্যাং...কী সব কাকা আমাদের যে বলে যায় মাথায় কিছু ঢোকেই না। ধীর গতিতে হাঁটছিল এই নেশারু মানুষটা। আচ্ছা গোপাল কাকা কি আদতে দার্শনিক, সক্রেটিস বা প্লেটোর মত? বা আমাদের মায়ের থানের বাবা বাসুদেবের মত? সে রাতে কাকাকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছালে দেখি জেগে বসে আছে তার মেয়ে ইন্দু। ইন্দুকে আগেও দেখেছি। সে’তো এত সুন্দরী ছিল না। তাহলে? আজ তো ডানাকাটা পরী মনে হচ্ছে। আমার এ নশ্বর জীবনে এত সুন্দরী কোনো নারী আমি আর দেখিনি। ইন্দুকে কেমন মমতাজ মনে হচ্ছিল। কথাও তেমন বলিনি কখনো, কাকা ভেতরে সোজা ঢুকে গেল, ইন্দু কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে দরজা বন্ধ করতে এসেছিল। আমার মাথায় তখন মাইলর্ড- আমি কি ডরাই কভূ ভিখিরি রাঘবে, কোবতেও চলে আসছে এখন ভেতরে। কেমন করে যেন বলে বসলাম – পরী আমার তো কেউ নেই, আমায় বিয়ে করবে? ‘পরী’ নামে যে কেন ডেকে বসলাম কে জানে। ও মনে হয় বুঝলোও। একটু চুপ করে থাকল। কান লাল হল, একটু লজ্জ্বায় মাথা নীচু করে ইন্দু বলল –‘অনেক রাত হল, এবার বাড়ি যান’। আর আমিও কেমন বাধ্য ছেলের মত ঈশ্বর হাঁটা পথে ফিরে চললাম বাড়ি।


গোপাল কাকা মারা গেছে ক'বছর হল। ইন্দু এখন আমার ঘরণী। আমাদের সন্তানের নাম দিয়েছি ঈশ্বর, ডাক নাম ঈশা। দাসেদের বাগানে এখনো ঈশ্বর নামে কিনা জানি না। তবে মারা যাবার দুদিন আগে কাকা ডেকে পাঠিয়েছিলেন আমায়। বলেছিলেন – ‘জানিস অরু ঈশ্বর বল বা ঈশা খাঁ সে আসলে আলাদা কেউ নয় তোর ভেতরের শুভ চেতনার উন্মোচন। তোর ভেতরে একটা সাধু আছে আর একটা শয়তান। এই শুম্ভ নিশুম্ভে খুব যুদ্ধ হয় আর তা থেকে তৈরী হয় সুন্দরের, শিল্পের অথবা তাজমহলের’।

হয়ত তাই। হয়ত নয়। ধুর আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরে কী যায় আসে। বলা হয়নি ঈশ্বর জন্মানর পর আমার কেন জানি মনে হয় আমাদের ছোট বাড়িটা তাজমহল হয়ে গেছে।


সেতুর ওপারে যারা, তারা অপেক্ষা করত সকালের। আর এপারের লোকেরা কেবল রাতের।

আমাদের এই টাউনটা এখন আর আগের মত নেই। বদলে গেছি আমিও।

আর ঈশা খাঁ দের কথা যাতে ইতিহাস বইয়ে থাকে সেই চেষ্টার জন্য আমি তেড়ে ফুঁড়ে লেগেছি।

ডিসট্যান্সে ইতিহাসে এমএ করছি। আর নিজেই ইতিহাস বই লিখতে শুরু করেছি। মজা লাগছে শুনে? তা লাগুক। জানি না অবশ্য সে বই কোনো স্কুল পাঠ্য হয়ে উঠবে কি’না। বই হলে পাঠক প্লীজ গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেবেন না। শুধু নবাবী বিলকি ঝিলকিতে কি আর সুন্দরের নির্মাণ হয়। বিশ্বাস করুন ঈশা খাঁ হোক বা লহৌরি এরাও ঈশ্বরই। এনারা ছিলেন নইলে আমার মত হাড় হাভাতের জীবনটা তাজমহলের মত সুন্দর হত কোনোদিন।


.............................................
লেখক পরিচিতি
তমাল রায়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বরানগরে, ১৯৭০ সালে জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। গল্পকার। সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সম্পাদনায় বের হচ্ছে সাহিত্যের ছোটকাগজ 'ঐহিক'। প্রকাশিত গল্পের বই দু'টি-
নিঝুমপুরের না-রূপকথা (২০০৯),
তিতিরের নৌকো যাত্রা (২০১৩)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন